প্রীতম বসু
পদাবলী স্টেশন থেকে কলেজস্ট্রীটে গিয়ে একটা সালিম আলি কিনে ব্যাগে ঢোকাল। তারপর সোজা পৌঁছোল নাইট্রোজেনের বাড়ি। নাইট্রোজেন টিভি বন্ধ করে বললেন, ‘নাক কেমন আছে?’
‘স্যার, আজ মন্দিরের গল্পটা শুনে এলাম?’ পদাবলীর চোখেমুখে টানটান উত্তেজনা। ‘নাক ভাল আছে।’
“সনাতন চোর?
পদাবলী হাঁ। স্যার এটাও জানেন? অথচ বলেননি? লোকটা পেটে কথা চেপে রাখতেও জানে! ‘কিন্তু আরেক সনাতনের গল্পও এখানে জড়িয়ে আছে। সনাতন গোস্বামীর মোহর।’
‘চল্লিশ বছর আগে আমিও এই গল্পটা শুনেছিলাম। ছিদাম বায়েন বলেছিল। ‘রূপ-সনাতন গোস্বামীর ধন-রত্নের কথাটা সত্যি?”
“সত্যি-মিথ্যা নিজে যাচাই কর, আমি তোমায় তথ্যগুলো দিতে পারি।” “তাহলে তো খুবই ভাল হয়, স্যার।”
যিনি ‘দাঁড়াও তাহলে চৈতন্যচরিতামৃতটা নিয়ে আসি, নাইট্রোজেন ভিতরের ঘরে চলে গেলেন, ফিরে এলেন একটা বাঁধানো বই নিয়ে। টেবিলে বইটা রেখে উনি বললেন, ‘সনাতন গোস্বামী তখনও সনাতন গোস্বামী হন নি। উনি ছিলেন সুলতান হুসেন শা‘র মহামন্ত্রী। সুলতান তাঁকে সাকর মল্লিক বলে ডাকতেন। রাজকার্যে অসম্ভব উন্নতি করেছিলেন সাকর মল্লিক, আর তাঁর ভাই, পরবর্তী কালে রূপ গোস্বামী নামে বিখ্যাত হলেন। তাঁকে হুসেন শা বলতেন দবীর খাস বা প্রধান মুনশি। তাঁদের ছোটভাই বল্লভ ছিলেন খাজাঞ্চীখানার হেড। শ্রীচৈতন্যের সান্নিধ্য তিন ভাইকে ভক্তিমার্গে নিয়ে আসে। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু নীলাচল থেকে তাঁকে গৌড়ে একটা পত্র পাঠান, সেই পত্র পড়ে সাকর মল্লিক তাঁর ভবিষ্যৎ পথ দেখতে পান। ‘
‘কী লেখা ছিল সেই পত্রে?”
“তাতে শ্রীচৈতন্য লিখেছিলেন -
পরব্যসনিনী নারী ব্যগ্রাপি গৃহকৰ্ম্মসু।
তদেবাস্বাদয়ত্যন্তর্নবসঙ্গ রসায়নম্।।
মানে অন্য পুরুষে আসক্ত কুলবধূ প্রকাশ্যে গৃহকর্মে ব্যস্ত থাকলেও তার মন
যেমন ব্যগ্র থাকে তার প্রেমিকের নবসঙ্গের রস আস্বাদনের জন্য, সেইরূপ বিষয়-আশয়ে ব্যাপৃত থাকলেও সব সময় ঈশ্বরের চরণ চিন্তা করবে।’ “তারপর?”
তারপর প্রভু শ্রীচৈতন্য নীলাচল থেকে বৃন্দাবনে চললেন। যেসব গ্রামের মধ্যে দিয়ে শ্রীচৈতন্য চলেছেন সেখান থেকে হাজার হাজার লোক হরিপ্রেমে উন্মত্ত হয়ে প্রভুর সঙ্গ নিতে লাগল। ফলে গৌড়ের কাছাকাছি যখন তিনি এসে পৌঁছালেন তখন জনস্রোত এক বিপুল আকার ধারণ করেছে। শ্রীচৈতন্য গৌড়ের কাছে রামকেলিতে এক তমাল গাছের নিচে অবস্থান করলেন। গোলমাল শুনে সুলতান তাঁর মন্ত্রী কেশব ছত্রিকে পাঠালেন কী ব্যাপার সেটা জানতে। মন্ত্রীর মুখে সব শুনে সুলতান উদ্বিগ্ন - এত জনপ্রিয় ব্যক্তি এই চৈতন্যদেব? সুলতানের ভয় হল সে আবার তার মসনদ দখল করে বসবে নাতো? সুলতানের মনের এই দ্বন্দ্ব সাকর মল্লিক বুঝলেন। তিনি বুঝতে পারলেন যে এ স্থান প্রভু শ্রীচৈতন্যের জন্য নিরাপদ নয়। তিনি ও তাঁর ভাই গভীর রাতে চুপিচুপি রামকেলিতে এসে প্রভু শ্রীচৈতন্যের সঙ্গে দেখা করলেন। প্রভু তাঁদের মুক্তিলাভের উপায় বললেন – বললেন কৃষ্ণ মহামন্ত্র জপ কর। আর তিনি দুই ভাইয়ের নাম দিলেন সনাতন আর রূপ। সনাতন প্রভুর নিরাপত্তার অভাব অনুভব করে রামকেলি থেকেই প্রভুকে নীলাচলে ফিরে যেতে অনুরোধ করলেন।” -
“তারপর?”
“শ্রীচৈতন্য নীলাচলে ফিরে গেলেন, কিন্তু রূপ গোস্বামীর মনে বৈরাগ্য উপস্থিত হল। এরপর তিনি শুনলেন যে নীলাচল থেকে প্রভু শ্রীচৈতন্য বিজয়া দশমীর দিন আবার বৃন্দাবনের দিকে গোপনে রওনা দিয়েছেন, এবার তিনি ঝাড়খণ্ডের জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে চলেছেন। সঙ্গে শুধু বলভদ্র নামে একজন ভক্ত। তখন রূপ গোস্বামী স্থির করলেন যে তিনি সব ছেড়েছুড়ে বৃন্দাবন চলে যাবেন। তখন সনাতন গোস্বামী তাঁকে বললেন, তোমার আমার যা কিছু অর্থ আছে তা সব সঙ্গে করে নিয়ে যাও। রূপ বললেন যাচ্ছি সন্ন্যাসী হতে অর্থ নিয়ে কী হবে? সনাতন বললেন, যৎকিঞ্চিৎ আমাদের ভ্রাতুষ্পুত্র জীবের জন্য রেখে বাকিটা দেবকার্যে ব্যয় করা হবে। এই অর্থ তুমি এমন কোথাও লুকিয়ে রেখ যাতে সুলতানের লোকজন তা কক্ষনো খুঁজে না পায়।”
“তারপর?” পদাবলী এইসব ইতিহাস কখনো শোনেনি।
“রূপ গোস্বামীর অন্তর্ধানের খবর পেয়ে সুলতান তো রুদ্রমূর্তি ধারণ করলেন। রূপের সঙ্গে তাঁর খাজাঞ্চীখানার অধ্যক্ষ রূপের ছোট ভাই বল্লভও নেই। সনাতন গোস্বামী অর্থাৎ হোসেন শাহের বিশ্বস্ত মুখ্যমন্ত্রী সাকর মল্লিকও অসুস্থ বলে রাজকার্যের জন্য রাজদরবারে আসছে না। ক্রুদ্ধ সুলতান কেশৰ ছত্রিকে আদেশ দিলেন সাকর মল্লিককে এক্ষুনি ডেকে আনতে আর দবীর খাসকে ধরে আনতে লোক পাঠাতে বললেন। কেশব ছত্রি সনাতন গোস্বামীর বাড়ি এসে দেখে তিনি অসুস্থ-টসুস্থ কিছুই না, তাঁর বাড়িতে ভাগবত পাঠের আসর বসেছে। কেশব ছত্রি সনাতনকে জানালেন সুলতান তাঁকে ডেকেছেন, কিন্তু সনাতন সুলতানের আদেশ অমান্য করে ভাগবত পাঠের আসর ছেড়ে গেলেন না। তখন রুষ্ট সুলতান নিজে সাকর মল্লিকের বাড়ি এসে তাঁকে আদেশ করলেন যে তাঁর সঙ্গে উড়িষ্যা আক্রমণে যেতে হবে। কিন্তু সাকর মল্লিক যেতে অস্বীকার করলেন। ক্রুদ্ধ সুলতান কারাধ্যক্ষ হবু সেখকে আদেশ দিল সনাতন গোস্বামীকে বন্দী করে কারাগারে নিক্ষেপ করতে। উড়িষ্যা থেকে ফিরে তার মৃতুদণ্ড দেবেন।
‘আর রূপ গোস্বামীর কী হল?”
‘প্রচুর ধনরত্ন নিয়ে রূপ গোস্বামী ভাই বল্লভের সঙ্গে রাতের অন্ধকারে গৌড় ত্যাগ করেন। চৈতন্যচরিতামৃতের ঊনবিংশ পরিচ্ছেদে লেখা আছে-
শ্রীরূপ গোসাঞি তবে নৌকাতে ভরিয়া।
আপনার ঘরে আইলা বহুধন লঞা।
ব্রাহ্মণ-বৈষ্ণবে দিল তার অর্দ্ধ ধনে।
এক চৌঠি ধন দিল কুটুম্ব-ভরণে।।
দণ্ড-বন্ধ লাগি চৌঠি সঞ্চয় করিল।
ভাল ভাল বিপ্র-স্থানে স্থাপ্য রাখিল।।
শেষ লাইনটা আমাদের জন্য ইমপরট্যান্ট। কিছু পবিত্র স্থানে তিনি ধনরত্ন লুকিয়ে রাখেন। অনেকের মতে একটা বিপ্র-স্থান ছিল চৈতন্যপুখুরী। তিনি ধনরত্নের কত অংশ এখানে লুকিয়ে রাখেন তা জানি না, কিন্তু জনশ্রুতি ছিল এই যে সনাতন চাবিওয়ালা সেই ধনরত্ন উদ্ধার করেছিল এই চৈতন্যপুখুরীর পাঁকের নিচ থেকে।
‘ ‘সনাতন গোস্বামীর কী হল?”
“রূপ গোস্বামী ইতিমধ্যে প্রয়াগে গিয়ে শ্রীচৈতন্যের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। দাদা কারাগারে বন্দি এই কথা শুনে তিনি দাদাকে গোপনে পত্র পাঠালেন।
দশ সহস্ৰ মুদ্রা তথা আছে মুদিস্থানে
তাহা দিয়া কর শীঘ্র আত্ম-বিমোচনে
তিনি মুদির কাছে দশ হাজার মুদ্রা রেখে এসেছেন, সনাতন যেন কারাধ্যক্ষ হবু সেখকে সেই মুদ্রা দিয়ে পালাবার ব্যবস্থা করেন। সনাতন গোস্বামী পত্র পেয়ে কারাধ্যক্ষকে বলল
পূর্ব্বে আমি তোমার করিয়াছি উপকার।
তুমি আমা ছাড়ি কর তার প্রত্যুপকার।।
পাঁচ সহস্র মুদ্রা দিব কর অঙ্গীকার।
পুণ্য অর্থ দুই লাভ হইবে তোমার।।
সনাতন গোস্বামী তাকে বুদ্ধি দিল এই অর্থ নিয়ে তুমিও পালাও। তুমি সারা জীবনে এত অর্থ উপার্জন করতে পারবে না।”
“তারপর?”
কারাধ্যক্ষের মনে উভয়সঙ্কট অবস্থা। সুলতান জানতে পারলে ওকে কেটে ফেলবে। সনাতন গোস্বামী উৎকোচের পরিমাণ বাড়ালেন। এই যে লেখা আছে - সাত হাজার মুদ্রা তার আগে রাশি কৈল। তারপর কারাধ্যক্ষ সেই অর্থ নিয়ে পালাল। আর সনাতন গোস্বামী বনপথে পাতড়া পাহাড় পার হয়ে বারাণসীতে গিয়ে প্রভুর সঙ্গে দেখা করলেন। সে এক অন্য গল্প।”
‘কিন্তু রূপ-সনাতন গোস্বামীর রাখা ধনরত্ন, চৈতন্যপুখুরী আর নীলমাধবের মন্দিরকে ঘিরে যে রহস্য তৈরি হল তা কি সত্যি?”
*বাউল, ফকির, কীর্তনীয়াদের তো তাই বিশ্বাস। তবে আমার কাছে কোনও প্রমাণ নেই এর।’
“তাহলে এটা সম্ভব যে সনাতন গোস্বামীর ধনরত্ন এই সনাতন চোর মন্দিরের আশেপাশে কোথাও লুকিয়ে রেখে তার হদিশ লিখে গেছে ওই সনাতন কীর্তনে?” নাইট্রোজেনের মুখে সেই পরিচিত রহস্যময় হাসি “আমি তাই বিশ্বাস করি।’
বেতের সোফা থেকে উঠল পদাবলী। ওর মনে হল নাইট্রোজেন খুব চাপা। এ বিষয়ে নাইট্রোজেন অনেক কিছু জানেন কিন্তু প্রকাশ করছেন না। এই সনাতন গোঁসাইয়ের ধনরত্ন নিয়ে নাইট্রোজেন অবলীলাক্রমে রেফারেন্স টেনে আনলেন, অথচ প্রফেসর সনাতন চোরের সম্পর্কে এত কিছু জানেন সেটা পদাবলীকে আগে বলেন নি। এমন কি প্রথম দিন এটাও বলেন নি যে তিনি সনাতন কীর্তনের কয়েকটা পদ জানেন। কেন লোকটা ঝেড়ে কাশছে না? লোকটা করতালতলী না যাওয়ার জন্য যে কারণ দেখাল সেটা কি সত্যি? নাকি অন্য কোনও কারণ লুকিয়ে আছে এর পিছনে?
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন