প্রীতম বসু
পুজোর ছুটিতে হাতিবাগানের মেস প্রায় খালি। পদাবলীর দু‘জন রুমমেটের বিছানা লোহার খাটে গোটানো। বিকেলবেলা মেসের ঘরে একা বসে ঠাম্মার নোটবই হাতে সনাতন কীর্তনের পদগুলোর রহস্যভেদ করার চেষ্টা করতে করতে অন্যমনস্ক হয়ে দেওয়ালের দিকে তাকিয়ে ছিল পদাবলী। ঘরের সবুজ দেওয়ালে একদিকে ক্যালেণ্ডারে আদ্যা মা, পায়ের কাছে দু‘দিকে বসে রামকৃষ্ণ আর সারদামনি; অন্যদিকের দেওয়ালে রবীনা ট্যাণ্ডন, করিশমা কাপুরের লাস্যময় ছবি সেলোটেপ দিয়ে সাঁটা। দু‘জন রুমমেটের ফেভারিটদের ফটো। পদাবলীর মাথার কাছে ডেস্কে একটা আধ গোটান আর্টপেপার থেকে উঁকি মারছে অর্ধসমাপ্ত একজোড়া কালাগলা মানিকজোড়ের স্কেচ। মুক্তাকে উপহার দেবে। পাশে কয়েকটা পেন্সিল।
ধাঁধায় দাঁত ফোঁটাতে না পেরে ম্রিয়মাণ হয়ে মাথার চুলের ভিতর পেন্সিল চালাচ্ছিল পদাবলী, এমন সময় মধুদা এসে বলল - ফোন।
পদাবলী তাড়াতাড়ি নিচে মেস সুপারিনটেণ্ডেন্টের অফিসে গেল। ফোনের লাইনে অন্যপ্রান্তে গোবিন্দ অধিকারী। হাঁফাচ্ছে - ‘অনেক কিছু ঘটে গেছে। আমাকে এই টেলিফোন বুথের নম্বরে ফোন করতে পারবে?”
‘হ্যাঁ হ্যাঁ নম্বর বলুন।’ পদাবলী বুঝল কিছু একটা ভাল রকমের ঝামেলা হয়েছে। গোবিন্দ অধিকারী ফোন নম্বরটা বলল। পদাবলী নম্বরটা লিখে নিয়ে রাস্তার উল্টোদিকের টেলিফোন বুথে গিয়ে গোবিন্দ অধিকারীকে ফোন করল। ‘আমাদের সব্বোনাশ করে ছাড়বে ওই জমিদার চন্দ্রকান্ত সেন, গোবিন্দ অধিকারী ফোন ধরেই বলল।
“কী করেছে ও?”
‘গোটা ধুলডাঙা জুড়ে এখন ওলনের মাপজোখ চলছে। ইঞ্জিনিয়াররা দূরবীনের মত কীসব যন্ত্র দিয়ে পুরো এলাকাতে খুঁটি পুঁতে রাখছে। ওদের সঙ্গে কিছু বদমাশ টাইপের ছোকরা রয়েছে। চন্দ্রকান্ত নিজে এসেছিল ধুলটমাঠে ওই দূরবীনের মাপজোখ কেমন এগোচ্ছে তা দেখতে, সঙ্গে গগলস পরে বিডিও। আমি গিয়ে বললুম, আপনারা আমার জমিতে এসব কী করছেন? জমিদার তো আমকে দেখেই খেঁকিয়ে উঠল।’
“কেন?”
‘আমাকে জমিদার বলল - ছিঃ ছিঃ! অধিকারী তুমি কিনা বেশ্যাবাড়ি গেছিলে! তোমার এত অধঃপতন ঘটেছে! আমি বিশ্বাস করতে পারছি না! শরীরে এত কাম তো বিয়ে করনি কেন?”
‘বদমাশ!’
‘আমি বললাম - আপনি আমার কীর্তনের দল ভেঙে দিয়েছেন জমিদারবাবু। আমি নতুন দল গড়ার জন্য কীর্তনীয়া খুঁজছিলাম। জমিদার ধমক লাগিয়ে বলল - থাম। বেশ্যাবাড়িতে কৃষ্ণ খুঁজছ? তোমার লজ্জা করেনা বৈষ্ণব হয়ে বেশ্যাবাড়ি গেছ? আমি তখন জমিদারকে উপেক্ষা করে বিডিওকে বললাম এ জমি নীলমাধবের। এ জমিতে আপনারা রাস্তা বানাতে পারেন না। এটা অন্যায়!’
“বিডিও শুনে কী বলল?”
- *বিডিও কিছু বলার আগেই জমিদার হুঙ্কার দিয়ে বলল – আর একটা কথা বললে টেনে জিভ ছিড়ে নেব। থতমত খেয়ে গেলাম আমি।’ তারপর গোবিন্দ অধিকারী নার্ভাস গলায় বলল, ‘আমি বুঝতে পারছি না এখন আমার কী করা উচিত। ধনীদের বিলাসের জন্য রিসর্ট বানাচ্ছে, চৈতন্যপুখুরীর গোটা জলাটা ওরা বুজিয়ে দেবে, আর ওই মন্দির ওরা রাখবে না।”
পদাবলীর মনে হল এভাবেই শহুরে মানুষের আগ্রাসনে ধীরে ধীরে গ্রামগুলো থেকে কীর্তনের বিলুপ্তি ঘটবে। পদাবলী বলল, “আমাদের দুর্বল পেয়ে ওরা যা খুশি করতে পারে না। যত ছোট ছোট কীর্তনদলগুলো গ্রামে গ্রামে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে, তাদের একটা ছাতার নিচে আনতে হবে।’
“ছাতা? ইউনিয়ন খুলবে?’ গোবিন্দ অধিকারী ব্যাপারটা বুঝতে পারল না। ‘কীর্তন দলের ইউনিয়ন-‘
“না। আমি ভাবছি করতালতলীতে একটা ধুলট মেলা শুরু করলে কেমন হয়?’
‘ গোবিন্দ অধিকারীর দীর্ঘশ্বাস শুনল পদাবলী। ‘হাসপাতালে মৃত্যুশয্যায় আমার মা আমার দু-হাত ধরে বলেছিল - আমার স্বপ্ন ছিল যে চৈতন্যজলায় আবার মহাধূমধামের সঙ্গে ধুলট হবে। ধনী, গরিব, পণ্ডিত, মূর্খ, সাধক, গায়ক, বাদক, অধম, পতিত, দীনদুঃখী সকলে দলে দলে আসবে ধুলট মেলায় – আমি দেখে যেতে পারলাম না, কিন্তু আমায় কথা দে, তুই চেষ্টা করবি। চৈতন্যজলায় আবার ধুলট উৎসব শুরু করিস। আমি চাই করতালতলীতে কীর্তন তার আগের সম্মান ফিরে পাক।’ -
‘ঠিক আছে। এই মাঘী সপ্তমীতে আবার ধুলট শুরু হবে করতালতলীতে।’
‘সত্যি বলছ? ধুলট! আবার ধুলট হবে করতালতলীতে?’ গোবিন্দ অধিকারীর আপ্লুত কণ্ঠ। চৈতন্যপুখুরীর পাড়ে চারপাশে সারি সারি চাটাইয়ের টাপোর ফেলবে বৈরাগীরা? কীর্তনের মধুর আওয়াজ ছড়িয়ে যাবে বাতাসের রেণুতে রেণুতে?”
“আপনার চৈতন্যপুখুরীর পাশের মাঠে যদি একবার সাকসেসফুলি ধুলট হয় তবে প্রমোটারের বাপের সাধ্য হবে না ওই মাঠে রিসর্ট বানায়। কীর্তনীয়ারা আবার এক সম্মানের মঞ্চ পাবে যেখানে বিভিন্ন জেলা- গ্রাম থেকে কীর্তনীয়ারা এসে কীর্তন গেয়ে যাবে। আপনার ভগ্নপ্রায় নীলমাধবের মন্দিরের সংস্কারও হয়ে যাবে।”
‘কিন্তু সে কি সম্ভব?”
‘খাটতে হবে খুব।’
‘তুমি পথ বল, আমি প্রাণপাত করে খাটব।”
‘আমার মাথায় একটা প্ল্যান এসেছে,’ পদাবলী বলল। ‘কাল সকালে একবার আসতে পারবেন?”
‘ক’টায়?”
‘এগারটা নাগাদ?”
‘আমার একজনের সঙ্গে দেখা করার কথা।’
‘তাহলে দুপুরে আসুন একটা নাগাদ?”
‘ঠিক আছে। কাল আমি আসব। কিছু একটা কর। আমার তো মাথায় কিছু আসছে না। আমার সামনে যদি নীলমাধবের মন্দিরে কেউ হাত দেয় তবে আমি সেই হাত কেটে ফেলে দেব। তারপর যা হবার হোক।’ তারপর গোবিন্দ অধিকারীর মনে পড়ল। ‘তোমার ওই কালাগলা মানিকজোড়কে আমি আজ চৈতন্যপুখুরীতে দেখেছি।’
‘দেখেছেন? সত্যি?’ পদাবলী লাফিয়ে উঠল।
“হ্যাঁ, জমিদারগোঁসাইয়ের নিয়মে ডহরে মাছ ধরা বারণ, কিন্তু চোরগুলো লুকিয়ে লুকিয়ে ডহরের ভিতরে গিয়ে মাছ ধরার আওড়া, আটল, খাদুলের ফাঁদ পেতে রাখে। তারপর আবার রাতেরবেলায় গিয়ে যা মাছ ধরা পড়ে সেসব বালতিতে তুলে আনে। তাই আমি আর বিশে ডিঙি নিয়ে নিয়ে যাই, দেখতে কোথায় কোথায় এসব চোরা ফাঁদ পাতা আছে। ডহরের অনেক ভিতরের দিকের ডাঙায় যেদিকে কেউই যায় না, এক মানুষ উঁচু শন ঘাস, আঁশস্যাওড়া, বেতসের বন জলে পা ডুবিয়ে রয়েছে, সেদিকে হিজলের আগডালের তেমাথায় সরু সরু শুকনো ডালপালা দিয়ে মাচার মত বাসা বেঁধেছে কালাগলা মানিকজোড়। ওদের বাইরের জলে দেখা যায় না কেননা মাদীটা ডিম পেড়ে একদম নড়াচড়া করে না, বাসাতেই থাকে। একমাসের মধ্যে বাচ্চা ফুটবে।’
‘তাই!’ পদাবলীর মন খুশিতে ভরে গেল। ঠিক আছে, কাল আসুন। ফুলবাগানের বাটার সামনে। ঠিক একটায়।’
গোবিন্দ অধিকারী ফোন রেখে দিল। পদাবলী অনেকক্ষণ ধরে ভেবে ঠিক করল যে জমিদার চন্দ্রকান্ত এর পরে কী আঘাত হানবে তার জন্য বসে থাকলে চলবে না। অ্যাটাক ইজ দ্য বেস্ট ডিফেন্স। মাঘী পূর্ণিমা মানে ফেব্রুয়ারী। অনেক দেরি হয়ে যাবে। যা করার তাড়াতাড়ি করতে হবে। নভেম্বর মানে কার্তিক মাস। কার্তিক মাসে শুভ দিন কী আছে? পদাবলীর মনে পড়ল দীপাবলীর পরেই গোবর্ধন পুজো। বৈষ্ণবদের বিখ্যাত অন্নকূট উৎসব। হাতে যদিও সময় একদমই নেই, তবু উঠে পড়ে লাগলে সম্ভব। কিন্তু অন্নকূট উৎসব উপলক্ষে ধুলট উৎসব করা যায় কি? গোবিন্দ অধিকারীকে কাল জিজ্ঞাসা করতে হবে। বিজ্ঞাপন চারদিকে ছড়িয়ে দিতে হবে। পদাবলী মেসে ফিরে এসে ভেবে ভেবে একটা খসড়া বানাল।

তারপর পদাবলী তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে আবার বাইরের টেলিফোন বুথে এসে মুক্তাকে ফোন করল, ‘মুক্তা, কালাগলা মানিকজোড়কে ডহরে দেখা গেছে।’
‘রিয়্যালি!’ মুক্তা এত উত্তেজিত যেন মুক্তা ওয়েস্ট বেঙ্গল স্টেট লটারির ফার্স্ট প্রাইজ পেয়েছে এই শুভ সংবাদটা পদাবলী ওকে শোনাল। ‘তুমি দেখেছ?”
“না, যিনি দেখেছেন তাকে কাল আমি তোমার কাছে নিয়ে আসব, উনি বললেন মেয়ে পাখিটা হিজলের মগডালে বাসা বেঁধে তাতে ডিম পেড়েছে। একমাসের মধ্যে বাচ্চা ফুটবে।’
‘হাউ সুইট!” মুক্তা উচ্ছ্বসিত। ‘আমাকে দেখাতে পারবেন উনি?”
অসুবিধা হওয়া উচিত না। কিন্তু তোমার একটা সাহায্য চাই, মুক্তা, সে জন্য এখন ফোন করছি।’ ‘বল, বল, কী সাহায্য? আমি কিন্তু খুব এক্সাইটেড! আমি বিশ্বাস করতে পারছি না,’ মুক্তার গলায় উত্তেজনা।
‘কাল ওকেই জিজ্ঞাসা কর। আমার মনে তো হয় কোনও
পদাবলী সব খুলে বলল। মুক্তা চুপচাপ শুনে বলল আমি বাপিকে সব বলে রাখব। তুমি ওনাকে নিয়ে লালবাজারে এস। আমি বাপির অফিসে থাকব। ক’টার সময় আসবে?”
‘পৌনে দুটো নাগাদ?”
‘ফাইন। সি ইউ।’
পদাবলী এবার নাইট্রোজেনের বাড়ির দিকে রওনা দিল। স্যারকে খসড়াটা দেখাতে হবে। প্রফেসরকে রাজি করাতে হবে। ওঁর নাম থাকলে কলকাতার শিক্ষিত মহল, জার্নালিস্টদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা সহজ হবে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন