একষট্টি

প্রীতম বসু

চন্দ্রকান্ত সেন বেরিয়ে গেলে নাইট্রোজেন বললেন, ‘সকালটা মাটি করে দিয়ে গেল। লোকটা আমাদের থ্রেট করতে এসেছিল!’

‘স্যার, আপনি গোবিন্দদাস কবিরাজের কথা এত বললেন। আমি তো পাঠ্যপুস্তকে গোবিন্দদাস কবিরাজের কয়েকটা পদ্য ছাড়া আর কিছুই পড়ি নি। উনি কি এতই বিখ্যাত কবি ছিলেন?” ত

“দ্যাখ, বড় কবি আর বিখ্যাত কবির মধ্যে পার্থক্য আছে। আমার মতে অলটাইম প্রথম পাঁচজন বাঙালি কবির মধ্যে একজন হলেন গোবিন্দদাস কবিরাজ।’ এবার নাইট্রোজেন হাওয়ায় আঙুল নাচিয়ে নাচিয়ে বলতে লাগলেন,

চীত চোর গৌর অঙ্গ

রঙ্গে ফিরত ভকত সঙ্গ

মদনমোহন ছন্দুয়া।

হেম-বরণ-হরণ দেহ

পুরল তরুণ করুণ মেহ

তপত জগত বন্ধুয়া ৷৷

আহা! গোবিন্দদাসের ছন্দ, পদবিন্যাস আর অলঙ্কার দক্ষ বায়েনের মৃদঙ্গের তালে তালে জীবন্ত হয়ে ওঠে। গায়ে কাঁটা দেয়। অলঙ্কারের রাজা। তোমাদের প্রজন্মের বাঙালি তো এই স্বাদ জানলই না। বাঙালি হয়ে যদি আরেকবার জন্ম নিতে পারি, তবে আমি এই গোবিন্দদাস কবিরাজের ওপর পিএইচডি করব। শুধু ওঁর মঞ্জরীভাবের ওপর গবেষণা করেই একটা জীবন কাটিয়ে দেওয়া যায়।’ “মঞ্জরী কী, স্যার?”

‘মঞ্জরী?” নাইট্রজেনের মুখ থেকে বিরক্তির ছাপ অন্তর্হিত হয়ে গেল। প্ৰশান্ত মুখে আবৃত্তির কণ্ঠে বলতে লাগলেন - -

‘রতিরসে শ্রমযুত, নাগরী নাগর, মুখভরি তাম্বুল যোগায়

মলয়জ কুঙ্কুম, মৃগমদকপূর, মিলি তহিঁ গাত লাগায়

অপরূপ প্রিয় সখী প্ৰেম।’

পদাবলী আধো আধো বুঝল। ‘মঞ্জরী কি সখী?”

নাইট্রোজেন বলে চললেন -

নিজ প্রাণ কোটি দেই নিরমঞ্চই, নহ তুল লাখবান হেম।।

মনোরম মাল্য। দুহুঁ গলে অর্পই, বীজই শীত মৃদু বাত।

সুগন্ধ সুশীতল, করু জল অর্পণ, যৈছে হোয়ত দুহুঁ সাঁত।।

দুহুক চরণ পুনঃ মৃদুসম্বাহন করি শ্রম করলহি দূর।

ইঙ্গিতে শয়ন, করল সখীগণ, সকল মনোরথ পূর।।

কুসুম শেজে দুহুঁ নিদ্রিত হেরই, সেবন পরাগন সুখ।

রাধামোহন, দাস কিয়ে হেরব, মেটব ভব ভয় দুঃখ।।

পদাবলী বলল, “তাহলে সখী না, দাসী?”

নাইট্রোজেন বললেন, ‘মঞ্জরী সখীও না, দাসীও না। এক অদ্ভুত ফিলোজফি। মঞ্জরীরা শ্রীকৃষ্ণকে ভগবান বলে মনে করলেও রাধার ওপর তাদের চূড়ান্ত আনুগত্য। রাধার সঙ্গে অন্যায় করলে মঞ্জরীরা ওদের ভগবান কৃষ্ণকেও ধিক্কার করতে ছাড়ে না।’

‘কিন্তু এটা কী ভাবে সম্ভব যে রাধার জন্য একজন বৈষ্ণব তার দেবতা শ্রীকৃষ্ণকে গালাগালি করছে? এটা কি বাস্তব?’ পদাবলী ভাবল কিন্তু মুখে প্রকাশ করল না।

‘সেজন্য কবির আধ্যাত্মিক ভাব কী ছিল তা না জেনে কীর্তন গাইলে সেই কীর্তনে পদাবলীর আসল মর্ম ফুটবে না।’

পদাবলী নিজেকে শামুকের মত গুটিয়ে নিল। এই জ্ঞান নিয়ে সে ছিদাম বায়েনের সামনে কীর্তন গেয়েছে! সে তো কীর্তনের কিছুই জানে না! অন্যমনস্ক হয়ে ছিল পদাবলী, ঘোর কাটল প্রফেসরের কথায় রতি আসবে না।’ –

‘নাঃ, আজ মনে হচ্ছে রতি আসবে না কথাটা শুনে পদাবলীর মন যে খারাপ হয়ে গেল সেটা নাইট্রোজেনের মত ঝানু প্রফেসরের নজর এড়াল না। রতির সৌন্দর্যের যা আকর্ষণ তাতে পদাবলীর বয়সের ছেলেদের রতির রূপমুগ্ধ হওয়াটাই স্বাভাবিক। কিন্তু পদাবলীর দৃষ্টিতে প্রফেসর আরও অনেক অপ্রকাশিত ভাবের চোরাস্রোত দেখেছে। শুধু রতির সৌন্দর্যই না, রতির কীর্তনও পদাবলীকে এক অবাস্তব জগতে ঠেলে দেয়। তাই কীর্তনের রিহার্সাল পদাবলীকে চুম্বকের মত টানে। পদাবলী বলল, ‘আসবে না? আরেকটু দেখি?”

- “এত বেলা হয়ে গেল পরাশর বলেছিল ও রতিকে নামিয়ে দিয়ে যাবে।’ বাইরের রাস্তায় একটা গাড়ি জোরে ব্রেক কষল। ‘ওই বুঝি পরাশর এল। ভীষণ রেকলেস গাড়ি ড্রাইভ করে ও।’

‘আমি দেখছি,’ পদাবলী ছুটে গেল। বাইরে এসে দেখল একটা ঝাঁ চকচকে বিলিতি গাড়ি থেমেছে। গাড়ির ইঞ্জিন চালু আছে। ড্রাইভারের সিটে বসে পরাশর সেন!

এবার গাড়ির অন্যদিকের দরজা খুলে গেল। হাসতে হাসতে রতি গাড়ি থেকে নামার জন্য এক পা মাটিতে রাখল, সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে দ্বিতীয় পা মাটিতে রাখার আগেই পরাশর সেন গাড়িটা অ্যাক্সিলারেট করল। রতি রাস্তার ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়ল। পদাবলী অস্ফুট আর্তনাদ করে রতির দিকে দৌড়ে গেল। রতির মুখে যন্ত্রণার ছাপ। পার্স ছিটকে গেছে রাস্তায়। পদাবলী রতিকে ধরে ধরে দাঁড় করাল। রতির চোখ দিয়ে যন্ত্রণায় কান্না বেরিয়ে আসছে। পদাবলী এ দৃশ্য সহ্য করতে পারল না। কেউ রতির সঙ্গে এরকম ব্যবহার করবে? পদাবলী রতির হাত ছেড়ে দৌড়ে গিয়ে গাড়ির কাচে থাপ্পড় মারল। গাড়িটা থামল, পরাশর সেন দরজা খুলে বেরিয়ে এল আর সঙ্গে সঙ্গে পদাবলী চেঁচিয়ে উঠল – এভাবে কেউ গাড়ি চালায়? গাড়ি চালাতে না পারলে ড্রাইভার রাখুন। ছিঃ! -

পরমুহূর্তে পদাবলীর সম্বিত ফিরে এল। ও এখনও রতির পাশেই দাঁড়িয়ে। শুধু শরীর। ওর বিদ্রোহী মন শরীর ছেড়ে ছিটকে বেরিয়ে ওর ভগবান পরাশর সেনকে তিরস্কার করে এল। রতির যন্ত্রণা ওকে এক নিমেষের জন্য বাস্তবতার বাইরে ঠেলে দিয়েছিল। মন যেন অজান্তেই মঞ্জরী-সাধক হয়ে গেছিল। তাই কি? রাধিকার দুর্দশা দেখে এভাবেই কি মঞ্জরীরা তাদের ভগবানকে পর্যন্ত তিরস্কার করতে দ্বিধা করত না? তাহলে আমাদের মনের মধ্যেও মঞ্জরী বিরাজ করে?

পরাশর সেন গাড়ি থামিয়ে ছুটে রতির কাছে এল। নিচু হয়ে বসে ঝুঁকে হাত দিয়ে রতির পা স্পর্শ করতেই রতি পা সরিয়ে নিল। পরাশর সেন বললেন, ‘এঃ হে! অনেকটা ছড়ে গেছে, রক্ত পড়ছে! আমি সরি, রতি! খুব লেগেছে তাই না? আমি আজকাল এত অন্যমনস্ক হয়ে গেছি! মাথায় ঘুরছে আজকের ছবিটাতে তোমার গলার শিরাতে কী শেড দেব।’

‘আমি ঠিক আছি,’ রতি বলল পরাশর সেনকে। ‘কিন্তু আপনি প্লীজ এত অন্যমনস্ক হয়ে ড্রাইভ করবেন না। আপনার অ্যাকসিডেন্ট হতে পারে।’

বাইরে ভিড় জমছে। পরাশর সেনকে কেউ কেউ চিনতে পেরে গেছে। রতি বলল, “আপনি বেরিয়ে যান। আপনার এখানে থাকাটা ঠিক হচ্ছে না।’

পরাশর সেন তাড়াতাড়ি গাড়িতে ঢুকে পড়ে গাড়ি স্টার্ট করলেন। পদাবলী রতির পার্স রাস্তা থেকে তুলে, রতিকে ধরে ধরে নাইট্রোজেনের বাড়িতে নিয়ে ঢুকল। নাইট্রোজেন তাড়াতাড়ি ভিতরের ঘর থেকে একটা অ্যালুমিনিয়ামের

ফার্স্ট এইড বক্স নিয়ে এসে তার ভিতর থেকে তুলো, ডেটল, ব্যাণ্ড-এইড বের করলেন। রতির পায়ের গোড়ালি ছড়ে গিয়ে রক্ত বেরোচ্ছে। পদাবলী তুলোতে ডেটল লাগিয়ে রতির গোড়ালিতে চেপে ধরল। মেয়েটার মুখে যন্ত্রণার মধ্যেও অদ্ভুত হাসি খেলে গেল।

‘আপনি হাসছেন?” পদাবলী বিস্মিত।

‘মাস্টারমশাই, চণ্ডীদাস কীভাবে আমাদের মত সাধারণ মেয়েদের মনের কথা এত সুন্দর ভাবে আঁকত? ভাষায় কোনও আড়ম্বর নেই, আমাদের প্রাণের ভিতর ঢুকে যেত ওঁর কথার আলপনা।’ তারপর রতি নিজের গোড়ালির দিকে তাকিয়ে আপনমনে গুনগুন করে গেয়ে উঠল -

‘এ কথা কহিবে সই এ কথা কহিবে

অবলা এমন তপঃ করিয়াছে কবে ?

পুরুষ - পরশমণি নন্দের কুমার

কি ধন লাগিয়া ধরে চরণে আমার।’

তারপর গান থামিয়ে নাইট্রোজেনের দিকে অর্থপূর্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে পদাবলীর বিস্মিত দৃষ্টির দিকে তাকাল রতি, ওর ঠোঁটে জেগে উঠেছে হালকা হাসি - রাধা বলছে, আমি তো কৃষ্ণের যোগ্য নই। তিনি তো পরশমণি, যা ছুঁয়ে ফেলেন তাই সোনা হয়ে যায়। স্বয়ং কুবেরও তাঁর কাছে ধন প্রার্থনা করেন। কিন্তু সেই শ্রীকৃষ্ণও কী ধনের জন্য আমার মত অবলার পা ধরে? আমি কী এমন তপস্যা করেছি?”

ডেটলের উগ্র গন্ধ চারপাশে। পদাবলী জানে এখানে রাধা কে আর কৃষ্ণই বা কে? রতি ততক্ষণে গান ধরেছে -

কলঙ্কী বলিয়া ডাকে সব লোকে, তাহাতে নাহিক দুখ,

বঁধু, তোমার লাগিয়া কলঙ্কের হার গলায় পরিতে সুখ।

সকল অধ্যায়
১.
প্রাককথন
২.
এক
৩.
দুই
৪.
তিন
৫.
চার
৬.
পাঁচ
৭.
ছয়
৮.
সাত
৯.
আট
১০.
নয়
১১.
দশ
১২.
এগার
১৩.
বারো
১৪.
তেরো
১৫.
চোদ্দ
১৬.
পনের
১৭.
ষোলো
১৮.
সতের
১৯.
আঠারো
২০.
ঊনিশ
২১.
কুড়ি
২২.
একুশ
২৩.
বাইশ
২৪.
তেইশ
২৫.
চব্বিশ
২৬.
পঁচিশ
২৭.
ছাব্বিশ
২৮.
সাতাশ
২৯.
আটাশ
৩০.
ঊনত্রিশ
৩১.
ত্ৰিশ
৩২.
একত্রিশ
৩৩.
বত্রিশ
৩৪.
তেত্রিশ
৩৫.
চৌত্রিশ
৩৬.
পঁয়ত্রিশ
৩৭.
ছত্রিশ
৩৮.
সাঁইত্রিশ
৩৯.
আটত্রিশ
৪০.
ঊনচল্লিশ
৪১.
চল্লিশ
৪২.
একচল্লিশ
৪৩.
বিয়াল্লিশ
৪৪.
তেতাল্লিশ
৪৫.
চুয়াল্লিশ
৪৬.
পঁয়তাল্লিশ
৪৭.
ছেচল্লিশ
৪৮.
সাতচল্লিশ
৪৯.
আটচল্লিশ
৫০.
ঊনপঞ্চাশ
৫১.
পঞ্চাশ
৫২.
একান্ন
৫৩.
বাহান্ন
৫৪.
তিপ্পান্ন
৫৫.
চুয়ান্ন
৫৬.
পঞ্চান্ন
৫৭.
ছাপ্পান্ন
৫৮.
সাতান্ন
৫৯.
আটান্ন
৬০.
ঊনষাট
৬১.
ষাট
৬২.
একষট্টি
৬৩.
বাষট্টি
৬৪.
তেষট্টি
৬৫.
চৌষট্টি
৬৬.
পঁয়ষট্টি
৬৭.
ছেষট্টি
৬৮.
সাতষট্টি
৬৯.
আটষট্টি
৭০.
ঊনসত্তর
৭১.
সত্তর
৭২.
একাত্তর
৭৩.
বাহাত্তর

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%