সাত

প্রীতম বসু

আজ করতালতলী স্টেশনে মুক্তা নেই। ভাগ্যিস নেই। ভোরে মেসে আয়নায় নিজেকে চিনতে কষ্ট হচ্ছিল পদাবলীর। নাকটা ফুলে বেঁকে শুয়োর আর কাকাতুয়ার মাঝামাঝি একটা আকৃতি নিয়েছে।

প্ল্যাটফর্মে নেমে নাকটা রুমালে ঢেকে তাড়াতাড়ি পথে নামল পদাবলী T হাঁটতে হাঁটতে মন্দিরের কাছে এসে পৌঁছে জলের দিকে তাকিয়ে থেমে গেল পদাবলী। জলায় হাঁটুজলে দাঁড়িয়ে গোবিন্দ অধিকারী। জলে অনেকদূর পর্যন্ত নল-চেঁচো-হোগলা-অন্যান্য নাম না জানা জলজ গুল্ম। দূরে দূরে লাল শাপলা। লোকটা কুঁজো হয়ে জল থেকে কী সব তুলে তুলে পাড়ে রাখছে। পদাবলীকে দেখে গোবিন্দ অধিকারী অবাক হয়ে জলের মধ্যে সোজা হয়ে দাঁড়াল - তুমি আবার এলে? তোমায় কাল না বারণ করলাম -

চলেই এলাম। করতালতলী আমায় কেমন যেন টানছে।’

“দেখ, তোমায় আমি সাবধান করে দিয়েছিলাম, ওটা আমার কর্তব্য। তুমি আমার কথা শুনলে না। আমাকে পরে কিছু বলতে পারবে না।’

না না, আমি পরীক্ষা দিতে আসিনি। ওঁকে একটা প্রণাম করে ফটো দুটো নিয়ে চলে যাব।”

গোবিন্দ অধিকারী খুশি হল। ‘নাক কেমন আছে?’ গোবিন্দ অধিকারী জল থেকে বলল পদাবলীকে।

“ঠিক আছে। আপনার তুলসীর রস বেশ কাজে দিয়েছে। ‘কী সুন্দর শাপলা।’ খুশি হল গোবিন্দ অধিকারী। ‘হ্যাঁ, খুব সকালেই দেখতে ভাল লাগে, কেননা বেলা বাড়লে শাপলা ফুল বুজে যায়।’

গোবিন্দ অধিকারীর হাঁটুর চারপাশে কচুরিপানার মত জলে ভাসছে গাঢ় সবুজ, লালচে সবুজ তিনকোনা লম্বা খাঁজকাটা পাতা। ওই পাতার মধ্যে থেকে ছিঁড়ে ছিঁড়ে জল থেকে কিছু ফলপাকুড় তুলে তুলে পাড়ে জড়ো করেছে, তার ওপর একটা গঙ্গাফড়িং বসে।

“খাও, গোবিন্দ অধিকারী জল থেকে উঠে মুঠো ভরা কালচে সবুজ ফল পদাবলীকে দিল। ‘বাবা খুব ভালবাসে পানিফল। তবে এখনও অত মিষ্টি শাঁস হয় নি। শীত জমিয়ে পড়লে পানিফল খুব মিষ্টি হয়ে যায়।’ গোবিন্দ অধিকারী পানিফলগুলো একটা ঝুড়িতে রাখল। পদাবলী লক্ষ্য করেছে যে কালকের মারপিটের পর থেকে গোবিন্দ অধিকারী ওর ওপর অনেকটা সদয়।

অল্পক্ষণ পরে, দু‘জনে গোবিন্দ অধিকারীর বাড়ির দিকে হাঁটতে লাগল। ‘ওই মন্দিরটা অনেক পুরোনো তাই না?” পদাবলী বলল।

‘হ্যাঁ, অনেক। কত ইতিহাসজড়িত এই মন্দির।”

‘কবেকার হবে?’

‘প্রথম বানানো হয়েছিল তখন চৈতন্যদেবের সময়।

‘অত পুরানো?”

‘লোককথা অনুযায়ী, মহাপ্রভু যখন গৌড় থেকে নীলাচলে ফিরছিলেন তখন এই স্থানে আসেন। উনি দেখেন পথের পাশে জলা ডহরের মধ্যে করতালের পিঠের আকৃতির মত দু‘জায়গায় কিছুটা স্থল জেগে রয়েছে। প্রভুর মনে হল ওখানে উনি শ্রীকৃষ্ণকে দেখতে পেলেন। প্রভু এক পার্ষদকে বললেন, তাঁর ইচ্ছে ওই দ্বীপের মত জায়গাতে গিয়ে কিছুক্ষণ নামসংকীর্তন করবেন। পার্ষদরা ডিঙি নিয়ে চৈতন্যমহাপ্রভুকে নিয়ে গেল ওই জলের উপর জেগে ওঠা স্থলে। প্রভু ওখানে জলায় স্নান করেন, আর তারপর মহাপ্রভু এখানে হরিনামকীর্তনে বিভোর হয়ে যান। ভক্তরা প্রভুকে দই-আতপচিড়া খাওয়ায়। তৃপ্ত মহাপ্রভু তারপর জলার জল অঞ্জলি ভরে খান। তার থেকেই এই জলাশয়ের নাম চৈতন্যপুখুরী।’

‘আর করতালতলী নামটা তবে থেকেই?”

‘হ্যাঁ, চারদিকে জলের মধ্যে করতালের পিঠের মত জেগে থাকা স্থল থেকে নাম হল করতালস্থলী। তারপর মেঠো মানুষদের মুখে মুখে সেই নাম হয়ে গেল করতালতলী।’ “আর মাধব নীল কেন?”

‘মহাপ্রভুর অন্তর্ধানের পর এই স্থানে একটা মন্দির তৈরি করা হয়। সেখানে বিগ্রহ মাধব নীল ছিল কিনা জানিনা। তারপর এ অঞ্চলে ইংরেজদের সময় নীলচাষ যখন শুরু হল তখন অত্যাচারী নীলকর সাহেবরা এই মন্দিরে মাধবের বিগ্রহ ভেঙে সরিয়ে সেখানে ওদের ফাঁসিঘর বানাবে ঠিক করল। তখন মন্দিরের পুরোহিত মাধবের মূর্তি মন্দির থেকে সরিয়ে নদীর পাড়ের নীলের ভাটিতে চুবিয়ে রেখেছিল। তারপর রাতের অন্ধকারে পুরোহিত সেই মূর্তি তুলে কোথাও চলে গেছিল। কোথায় গেল এ নিয়ে লোকে অনেক জল্পনা-কল্পনা শুরু হল। একজন ডাক হরকরা বলে যে সে নাকি রাতে চিঠির থলে নিয়ে ছুটতে ছুটতে দেখেছে চৈতন্যপুখুরীতে অনেক রাতে একজন মানুষ, তার মাথায় একটা মূর্তি। যেন সে জলে বিসর্জন দিতে নেমেছে। ডাক হরকরার অনেক দূরের পথ যাওয়ার ছিল তাই সে আর থামে নি।

‘ঠাকুরের মূর্তি পুকুরের নিচে লুকিয়ে রেখেছিল?’ পদাবলী অবাক।

‘এ আর নতুন কথা কী? আগে তো আকছার হত। দক্ষিণেশ্বরের আদ্যাপীঠের বিগ্রহ কোথা থেকে পাওয়া জানো?’

‘না।’

‘ইডেন গার্ডেনের পাশে একটা পুষ্করিণী থেকে। অন্নদাঠাকুর স্বপ্নে জানতে পেৱে সেই মূর্তি তুলে আনেন। তারপর ঠাকুরের আদেশে অনুরূপ এক মূর্তি বানিয়ে সেই মূর্তি গঙ্গায় বিসর্জন দেন।’

“তাই নাকি? কিন্তু কেউ এখানে জলের পাঁকে খুঁজে দেখেনি?’

বলছি, সব। রাতারাতি নীলমাধবের মন্দির হয়ে গেল ইংরেজদের ফাঁসিঘর। গ্রামবাসীরা যারা ওদের নীলচাষে বাধা দিত বা বিরোধিতা করত তাদের নীলকর সাহেবরা এই ফাঁসিঘরে লটকে দিত। তারপর তাদের আর হদিসই পাওয়া যেত না। তারপর এদিকে নীলের ব্যবসায় মুনাফা বেশি না হওয়ায় নীলকর সাহেবরা অন্য তালুকে চলে গেল। সেই ফাঁসিঘরে আবার মন্দির তৈরির পরিকল্পনা শুরু হল, কিন্তু পুরোহিত মাধবের সেই বিগ্রহ জলার পাঁকে কোথায় ফেলেছে তা কেউ খুঁজে পেল না। তখন বৈষ্ণবরা বলল যে যেখানে অত নরহত্যা হয়েছে সেখানে বোধহয় মাধব ফিরে যেতে চায় না।’

“তাহলে?”

“তারপর হল এক অদ্ভুত ঘটনা। একে ঈশ্বরের লীলা ছাড়া আর কী বলা যায়। হাওড়ায় এক কীর্তনের দলে মৃদঙ্গ বাজাতো এক সনাতন বায়েন। তবে এটা ওর পেশা না। সনাতনের পেশা ছিল তালা-চাবি বানানো। ওকে সবাই সনাতন চাবিওয়ালা নামেই জানত। সনাতন এক ডেভিড সাহেবের থেকে তালা বানাবার কাজ শিখেছিল হাতে কলমে। সে ছোটখাটো তালা না, বড় বড় সব খাজাঞ্চি খানার লক। এদেশের বড় বড় টাঁকশাল, ব্যাঙ্ক, কোষাখানা, কারাগার, অস্ত্রাগারের তালা আসতো বিলেতের ডেভিড সাহেবের কোম্পানি থেকে। কাস্টমারদের চাহিদা মেটাতে ডেভিড সাহেব এদেশে হাওড়ার গার্ডেনরিচে একটা কারখানা তৈরি করে। ডেভিড সাহেব সনাতনকে কারখানার মুখ্য কারিগর নিযুক্ত করল। সনাতনের মাথা খুব খেলত, ও নিজে নিজে অনেক উদ্ভট উদ্ভট তালা বানাতে লাগল। কিন্তু সনাতন চাবিওয়ালার কাহিনী খুবই করুণ।’

কথা বলতে বলতে ওরা ছিদাম বায়েনের বাড়ির কাছাকাছি চলে এসেছে। বাড়ির পাশে কাচ ভাঙা টেম্পোভ্যানটা দাঁড়িয়ে। ওটাকে দেখেই কালকের ঘটনার জন্য মাথায় আবার দপ করে রাগ জেগে উঠল পদাবলীর। ‘অমানুষ! কীর্তন শুনবি না তো বায়না করেছিলি কেন?”

গোবিন্দ অধিকারী দীর্ঘশ্বাস ফেলল - ‘বাংলার কীর্তনের অবস্থা এখন আমার এই টেম্পোভ্যানের মতই বিধ্বস্ত, লাঞ্ছিত।

গোবিন্দ অধিকারী ভ্যানের দরজা খুলে ভিতরে ঢুকল। পদাবলীও মাথা নিচু করে ভিতরে ঢুকল। ‘সাবধান, গোবিন্দ অধিকারী বলল। ‘এখনও অনেক কাচের কুচি ছড়িয়ে আছে।’

পদাবলী খুব সাবধানে পা ফেলে সামনে যে সিটটা পেল তাতে বসল। টেম্পোভ্যানের পিছনে ভাঙা হারমোনিয়াম, চামড়া কাটা খোল দেখে একটা অদ্ভুত প্রশ্ন পদাবলীর মনে জাগল কীর্তন ইজ ডেড? নাকি কীর্তন ইজ মার্ডারড? কাল মনু সেন যেভাবে কীর্তনকে খুন করল তার কী কোনও বিচার হবে না?

গোবিন্দ অধিকারী সাবধানে পা ফেলে ড্রাইভারের সিটের দিকে এগিয়ে গেল। ড্রাইভারের সিটের সামনে ঝুঁকে গাড়ির গ্লাভ বক্স থেকে গোবিন্দ অধিকারী বের করল একটা ধূপকাঠির বাক্স আর দেশলাই। তারপর মাথার ওপর গৌর-নিতাইএর ছবি থেকে বাসি শিউলি ফুলের মালা সরিয়ে চোখ বুজে জ্বলন্ত ধূপকাঠি ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে মন্ত্র পড়ল – তৃণাদপি সুনীচেন তরোরিব সহিষ্ণুনা, অমানিনা মানদেন কীর্তনায়ঃ সদা হরিঃ। -

গোবিন্দ অধিকারীর মন্ত্র পড়া শেষ হলে পদাবলী বলল, ‘এই মন্ত্রের মানে কী?”

‘এটা শ্রীচৈতন্যদেবের লেখা মন্ত্র,’ গোবিন্দ অধিকারী ধূপকাঠি জানলার কাছে নিয়ে গিয়ে ধূপকাঠির ডগায় এক টোকা মেরে আগুনটা জানলা দিয়ে বাইরে ছুঁড়ে ফেলল। তারপর কাঠিটা বাক্সে ঢোকাতে ঢোকাতে বলল, “তৃণের চেয়েও অবনত যিনি, যিনি তরুর মতই সহিষ্ণু, যিনি অন্যকে যথাযোগ্য মানমর্যাদা প্রদর্শন করেন, এমন ব্যক্তিই হরিস্মরণের যোগ্য।’ তারপর ভাঙা হারমোনিয়াম দেখিয়ে শ্লেষের সুরে বলল, ‘আজকের পৃথিবীতে সহিষ্ণু কীৰ্তনীয়া কী অসম্মানের সঙ্গে বাঁচে তা দেখে মনে হতাশা আসে। তোমাকে একটা অনুরোধ করি?’

‘এভাবে বলছেন কেন, নিশ্চয়ই করুন।’

‘বাবার আজকাল রাতে নিত্যি কম্পজ্বর আসে। কাল রাতেও লেপ মুড়ি দিয়ে কেঁপেছে। আমি চাইনা বাবা আজ বেশি কথা বলুক। তোমার কাছে কীর্তন শুনতে চেয়েছে, তুমি কীর্তন শোনাও কিন্তু আজ তুমি প্রাণনাথ কীর্তনীয়ার গল্প শুনতে চেও না। কথা বলতে বলতে বাবা হাঁফিয়ে যায়, পরে সারাদিন শ্বাসকষ্টে ভোগে।’

“আপনি একদম চিন্তা করবেন না, পদাবলী বলল। ‘ওঁর এতটুকু কষ্ট হোক এটা আমি মোটেই চাই না। তবে ওঁকে ডাক্তার দেখান।’

“আগে একবার দেখিয়েছিলাম। ঘরে পুরনো মিকচার রাখা আছে। তাই কাল খাইয়ে দিয়েছি। দেখি আর দু-এক দিন-‘

পদাবলী উঠে দাঁড়াল, মনে সন্দেহ – গোবিন্দ অধিকারী কি চায় না ওর বাবা কারোর সঙ্গে এবিষয়ে কথা বলুক? তাই কি লোকটা ওর বাবার কাছে কারুকে ঘেঁষতে দেয় না? কিন্তু কেন?

সকল অধ্যায়
১.
প্রাককথন
২.
এক
৩.
দুই
৪.
তিন
৫.
চার
৬.
পাঁচ
৭.
ছয়
৮.
সাত
৯.
আট
১০.
নয়
১১.
দশ
১২.
এগার
১৩.
বারো
১৪.
তেরো
১৫.
চোদ্দ
১৬.
পনের
১৭.
ষোলো
১৮.
সতের
১৯.
আঠারো
২০.
ঊনিশ
২১.
কুড়ি
২২.
একুশ
২৩.
বাইশ
২৪.
তেইশ
২৫.
চব্বিশ
২৬.
পঁচিশ
২৭.
ছাব্বিশ
২৮.
সাতাশ
২৯.
আটাশ
৩০.
ঊনত্রিশ
৩১.
ত্ৰিশ
৩২.
একত্রিশ
৩৩.
বত্রিশ
৩৪.
তেত্রিশ
৩৫.
চৌত্রিশ
৩৬.
পঁয়ত্রিশ
৩৭.
ছত্রিশ
৩৮.
সাঁইত্রিশ
৩৯.
আটত্রিশ
৪০.
ঊনচল্লিশ
৪১.
চল্লিশ
৪২.
একচল্লিশ
৪৩.
বিয়াল্লিশ
৪৪.
তেতাল্লিশ
৪৫.
চুয়াল্লিশ
৪৬.
পঁয়তাল্লিশ
৪৭.
ছেচল্লিশ
৪৮.
সাতচল্লিশ
৪৯.
আটচল্লিশ
৫০.
ঊনপঞ্চাশ
৫১.
পঞ্চাশ
৫২.
একান্ন
৫৩.
বাহান্ন
৫৪.
তিপ্পান্ন
৫৫.
চুয়ান্ন
৫৬.
পঞ্চান্ন
৫৭.
ছাপ্পান্ন
৫৮.
সাতান্ন
৫৯.
আটান্ন
৬০.
ঊনষাট
৬১.
ষাট
৬২.
একষট্টি
৬৩.
বাষট্টি
৬৪.
তেষট্টি
৬৫.
চৌষট্টি
৬৬.
পঁয়ষট্টি
৬৭.
ছেষট্টি
৬৮.
সাতষট্টি
৬৯.
আটষট্টি
৭০.
ঊনসত্তর
৭১.
সত্তর
৭২.
একাত্তর
৭৩.
বাহাত্তর

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%