প্রীতম বসু
কলকাতা পৌঁছে পদাবলী স্টেশন থেকে সোজা নাইট্রোজেনের বাড়ি। *এনাফ ইজ এনাফ।’ নাইট্রোজেন সব শুনে বললেন। ‘অনেক হয়েছে। আর না। তোমার আর একা একা করতালতলী যাওয়া উচিত হবে না। এরা সব কিছু করতে পারে। জমিদাররা আগে লেঠেল পুষতো, এখন এসব গুণ্ডাদের পোষে।’
‘কিন্তু ওই জমিদার করতালতলীর কীর্তনের দলকে শেষ করে ছাড়বে, ও অজগরের মত ধীরে ধীরে গেলা শুরু করে দিয়েছে চৈতন্যপুখুরী আর ধুলডাঙাকে। গোবিন্দ অধিকারী এই অসম লড়াই একা লড়তে লড়তে শেষ হয়ে যাবে।’
‘কিন্তু ওখানে গেলে তুমি গোবিন্দ অধিকারীর আগে শেষ হয়ে যাবে। করতালতলীর কীর্তনের দলটা এই কলকাতাতেই তৈরি করতে হবে।’
‘কিন্তু হরি বায়েন তো রাজিই হল না। যা চোটপাট করতে লাগল সেদিন- ‘
“তোমরা বেরিয়ে যাওয়ার পর রাতে রতি ফোন করেছিল। রতি বলল হরি বায়েনকে ও বুঝিয়েছে যে করতালতলীতে কীর্তন বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। করতালতলীর কীর্তনকে বাঁচাতে হরি বায়েনকে এগিয়ে আসতেই হবে। অনেক সাধ্যসাধনায় হরি বায়েন রাজি হয়েছে খোল বাজাবে, কিন্তু এক শর্তে। গোবিন্দ অধিকারীর সঙ্গে এক আসরে কিছুতেই বাজাবে না। ওর প্রতিজ্ঞা আছে। রতি বলল সে বিষ্ণুপ্রিয়ার গান গাইবে, তার সঙ্গেই বাজাবে হরি বায়েন’
“এতো দারুণ খবর!’
‘কিন্তু শেষরক্ষা হল না,’ প্রফেসর বললেন। ‘আমার বন্ধু নিজে অত শিক্ষিত হয়েও তার বাড়িতে মায়ের শ্রাদ্ধে একজন বেশ্যা এসে মাথুর গাইবে এটা মানতে পারলেন না।’ নাইট্রোজেন মলিন হাসি হাসলেন।
“তাহলে?” পদাবলী মুষড়ে পড়ল।
‘আমি ওঁকে দোষ দিতে পারি না। অনেক আত্মীয়স্বজন আসে শ্রাদ্ধবাড়িতে। তবে আজ রতি কালিঘাটে গিয়ে ওর বাবার শ্রাদ্ধ করছে। বলল, ওর মায়ের কাছে ও ফিরে যাবে না। আমি ঠিক করলাম আমরা কীর্তনের একটা দল গড়ি। গোবিন্দ অধিকারীকে রাজি করিয়ে আমরা মন্দিরের সংস্কার করাব। তারপর নীলমাধবের পুজোর সময় একটা ছোটখাট কীর্তনের অনুষ্ঠান করব। সেখানে রতি গাইবে গীত গায়েনের লেখা বিষ্ণুপ্রিয়ার গান। ওর বাবার ইচ্ছা পূর্ণ হবে, রতিরও প্রতিজ্ঞা রক্ষা করা হয়ে যাবে। সেদিন আমি ইন্দুমতি বাঈকে নিয়ে যাব করতালতলীর মন্দিরে। মা মেয়ের যদি মিলন হয় সেদিন-‘
‘বাঃ, এতো দারুণ হবে,’ পদাবলী উচ্ছ্বসিত হয়ে বলল।
‘কিন্তু একটা সমস্যা আছে, প্রফেসর বললেন। ‘সোনাগাছির গণিকালয়ে কীর্তনের রিহার্সাল করা সম্ভব না। বোঝই তো কাস্টমাররা ওসব জায়গায় ভক্তি-টক্তি সামলাতে পারে না। গলা ছেড়ে হরে কৃষ্ণ শুনলে কাস্টমাররা ও তল্লাটেই যাবে না। অন্য দেহপসারিনীরা আপত্তি জানাবে। তাই রতি আর আমি ঠিক করেছি রিহার্সাল আমার বাড়িতেই হবে।
‘আপনার বাড়িতে?”
“কেন আপত্তি আছে?”
‘না না আপত্তি থাকবে কেন? এ তো খুব ভাল কথা, পদাবলী বলল। ‘কিন্তু গোবিন্দ অধিকারীকে এখন জানানো চলবে না,’ নাইট্রোজেন বললেন। ‘কেন স্যার?”
‘তাহলে হরি বায়েন আসবে না,’ নাইট্রোজেন বললেন। ‘আগে কিছুটা এগোক।’
‘ঠিক আছে, স্যার।’
পদাবলীর মনে একটা খটকা রয়ে গেল। করতালতলীর কীর্তনকে বাঁচাবার জন্য স্যারের এত উৎসাহ যে নিজের বাড়িতে কীর্তনের প্র্যাকটিস করাতে চাইছেন? তার ওপর একজন কীর্তনীয়া হল সোনাগাছির গণিকা! এর পিছনে নিশ্চয়ই কোনও কাহিনী আছে। নাইট্রোজেন তো ওকে একদমই অক্সিজেন নিতে দিচ্ছে না। অন্যমনস্ক হয়ে পদাবলী ভাবল যে নাইট্রোজেনের রহস্য প্রাণনাথ কীর্তনীয়ার রহস্যের থেকে কোনও অংশে কম নয়। কিন্তু এ মুহূর্তে নাইট্রোজেনের কাহিনী নিয়ে পদাবলী ভাবতে ইচ্ছুক না। ওর মাথায় ঘুরছে ছিদাম বায়েনের আজ বলা প্রাণনাথ কীর্তনীয়ার কাহিনী।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন