প্রীতম বসু
বাইরে অন্ধকার নামল। মন্দিরা দরজার তালা খুলে রাতের খাবার নিয়ে এল। হবিষ্যান্ন আর ব্যঞ্জন সিদ্ধ।
‘কিছুক্ষণ আগে বাইরে গুলির আওয়াজ পেলাম?” প্রাণনাথ জিজ্ঞেস করল। “কাকা সাহেবদের নিয়ে জলায় পাখি শিকার করে ফিরছিল। বাবা চায় না করতালতলীতে পাখিদের এভাবে হত্যা করা হোক, কিন্তু কাকা বাবার কথা কানেই নেয় না।”
ঘাড়ে, মাথায় ভেজা গামছা মুছে খাবারের থালা টেনে নিল প্রাণনাথ।
‘ক’টা দিন যাক। অবস্থা একটু স্বাভাবিক হয়ে গেলে কুয়োয় গিয়ে চান করে নিতে পারবে।’ মন্দিরা বাইরে চলে গেল। আবার ফিরে এল, হাতে একটা সাদা কাগজ। মন্দিরা একটা শলাকা জ্বালল। একটা পেন্সিল স্কেচ। মৃদঙ্গম হাসছে। মন্দিরা বলল –“হয়েছে?”
“খুব সুন্দর হয়েছে,’ প্রাণনাথ বলল। ‘তবে মৃদঙ্গমের হাসি আরও উচ্ছ্বল ছিল।’
‘জানি,’ দেশলাইয়ের আগুন নিভে গেল। ‘আমার মনে এত কান্না যে এর চেয়ে ভাল পারলাম না।’
‘এই অবস্থার মধ্যেও যে তুমি এতটা আঁকলে, সেটাই অনেক।
‘আঁকছিলাম বলেই বোধহয় মনে দুঃখের আঘাত কম হয়ে যাচ্ছিল। বইটা পড়লে?’
‘হ্যাঁ,’ প্রাণনাথ বলল। ‘কিন্তু কিছুই বুঝতে পারছি না। উনি কীভাবে কারাগার, গরাদ, প্রাচীর সমস্ত কিছুতেই নারায়ণকে দেখছেন? আমি বিজ্ঞানের ছাত্র। এসব তো বিজ্ঞানভিত্তিক মোটেই নয়। আমার কাছে এসব অলীক লাগে। এরকম কারোর কখনো হয়?”
*দিক নেহারিতে সব শ্যামময় দেখি; মন্দিরা বলল। ‘চণ্ডীদাস লিখে গেছেন। আমি তোমাকে কী করে বোঝাব, তুমি তো ঈশ্বরে বিশ্বাস কর না। তবে চৈতন্যদেব বলেছেন -
সর্ব্বত্র কৃষ্ণের রূপ করে ঝলমল।
সে দেখিতে পায় যার আঁখি নিরমল ॥
রাধা সব সময় যেন কৃষ্ণকে দেখত। যমুনায় জল আনতে গিয়ে যমুনার জলেও যেন শ্রীকৃষ্ণের প্রতিবিম্ব দেখছে। সখীরা জলে কলসী নামাতে গেলে রাধা বারণ করছে তাদের
ঢেউ দিও না জলে বলে কিশোরী।
দরশনে দাগা দিলে হবে পাতকী
কলস জলে ডোবালে যে ঢেউ উঠবে তাতে জলে ভেসে ওঠা কৃষ্ণের ছায়া ভেঙে যাবে। রাধা আকাশেও নবজলধরের মধ্যে কৃষ্ণকে দেখলেন। তাঁর লম্বা ভুজদ্বয় প্রসারিত করে উনি সেই মেঘকে আলিঙ্গন করার চেষ্টা করছেন।
এলাইয়া বেণী, ফুলের গাঁথুনি, খসায়ে দেখয়ে চুলে
আকুল নয়নে চাহে মেঘপানে, কি কহে দু‘হাত তুলে।’
প্রাণনাথের সন্দেহ হল মন্দিরা কি এক আধ্যাত্মিক রোম্যান্টিসিজমের বুদবুদের মধ্যে ঢুকে গেছে? প্রাণনাথ বলল, ‘রাধাকৃষ্ণ তো কবির কল্পনা, তা সত্যি কীভাবে মানবো?’
‘রাধা হয়তো কবির কল্পনা, কিন্তু চৈতন্যদেব তো মানুষ ছিলেন। উনি সাগরের নীল জলকে কৃষ্ণ ভেবে তাতে লাফিয়ে পড়েছিলেন।’
প্রাণনাথের এই আলোচনায় অস্বস্তি লাগছিল। সে এমনিতেই ভগবানের অন্ধ গুণকীর্তন পছন্দ করে না। প্রাণনাথের মনে প্রশ্ন জাগল এটা কি অরবিন্দের মনের বিভ্রম ছিল? একটা মানুষের জীবনের গতি পালটে গেল এক বছরের কারাবাসে?
‘তুমি কীর্তন গাইছিলে,’ প্রাণনাথ বলল। ‘তোমার গলা এত সুন্দর।’
‘বাবা কীর্তন শুনে মনে আরাম পাচ্ছেন,’ মন্দিরা বলল। ‘দাদার মৃত্যু বাবার মনে যে গভীর ক্ষত সৃষ্টি করেছে, কীর্তনের প্রলেপে যদি সেই ক্ষত ধীরে ধীরে বোজে।’
প্রাণনাথ ঠিক বোঝে না কীর্তন কীভাবে মনের দুঃখের ক্ষত বুজিয়ে দেয়। এ কথাটা সে আগেও শুনেছে। ঠাকুরবাড়ির গগনঠাকুরের বড় ছেলে গেহেন্দ্রনাথের মৃত্যুতে গগনঠাকুর শোকে খুবই মুহ্যমান হয়ে পড়েছিলেন। তখন রবীন্দ্রনাথ কুষ্টিয়া থেকে শিবু কীর্তনীয়াকে জোঁড়াসাকোতে এনে কীর্তন শুরু করিয়েছিলেন। সেই কীর্তন শুনে গগনঠাকুর মনে খুব শান্তি পেতেন। বুড়ো দ্বিজেনঠাকুর কীর্তন শুনে হাপুস নয়নে নাকি কাঁদতেন। প্রাণনাথ ভেবে পায় না কীর্তনের কি এত শক্তি আছে? কেউ কীর্তন শুনে মনে এত আরাম পায় যে তার মনের ক্ষত শুকিয়ে যাবে? ওর তো কীর্তন দু‘দণ্ড শোনার পরই একঘেয়ে লাগে।
মন্দিরা বোধ হয় প্রাণনাথের মনের এই প্রশ্ন প্রাণনাথের চোখের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারল। মন্দিরা বলল, “অনেকে পদাবলী কীর্তন শুনে আরাম পায়। নীলাচলে চৈতন্যদেব তাঁর জীবনের শেষের দিকে শ্রীকৃষ্ণকে না পেয়ে উন্মাদ হয়ে উঠেছিলেন। গম্ভীরায় মেঝেতে মুখ ঘষে ঘষে রক্তাক্ত করে ফেলতেন। আর সেই ব্যথায় প্রলেপ দিত রায় রামানন্দ, স্বরূপ দামোদরের কণ্ঠে চণ্ডীদাস, বিদ্যাপতি, বিল্বমঙ্গল ঠাকুরের শ্রীকৃষ্ণকর্ণামৃত, জয়দেবের গীতগোবিন্দ পদাবলী। এসব শুনে তিনি মনে আরাম পেতেন। চৈতন্যচরিতামৃতে আছে
চণ্ডীদাস বিদ্যাপতি রায়ের নাটকগীতি
কর্ণামৃত শ্রীগীতগোবিন্দ
মহাপ্রভু রাত্রিদিনে স্বরূপ রামানন্দ সনে
গায় শুনে পরম আনন্দ।।
পদাবলী কীর্তনে দুঃখহরণ ওষধির গুণ আছে, যা মনে শান্তি এনে দেয়। প্রাণনাথ জানে তারও মনে শান্তি আনতে হবে। তার সামনে একটা পথ একজন দেখিয়েছে, কিন্তু সেপথে তার বিশ্বাস নেই। ঈশ্বরের কাছে আত্মসমর্পণ? সে তো দুর্বল মানুষের ধর্ম! প্রাণনাথ মনে মনে এক অবিশ্বাসের আসনে বসা ভগবানকে বলল, যদি তুমি সত্যিই থাক তবে আমায় অন্ততঃ এটুকু বলে দাও মৃদঙ্গমকে কেন হত্যা করেছে ইংরেজ। মৃদঙ্গম ওদের কোন গোপন কথা জানত? স্মরণে এল ভুবন ডোমের কথা, মৃদঙ্গম বলে গেছিল প্রাণনাথকে বোলো ও যেন আমার অন্তরটা খুঁজে দেখে। মৃদঙ্গমের অন্তর? মৃত মৃদঙ্গমের অন্তর সে খুঁজবে কীভাবে? মৃদঙ্গম তো সে উপায় রাখেনি। মৃদঙ্গমের একমাত্র অস্তিত্ব আছে সমাধি দেওয়া ওই ঘটের মধ্যে রাখা ওর চিতার ছাইয়ে। তবে কি ওই ঘটের মধ্যে কিছু রাখা ছিল? তাহলে ওই সমাধি খুঁড়ে ওই ঘটের মাটির ঢাকনা খুলে দেখতে হবে ভিতরে কী আছে। আজ রাতে? না, মৃদঙ্গমের শ্রাদ্ধটা মিটে যাক। তারপর মৃদঙ্গমের সমাধিতে গিয়ে তুলে আনবে ওই অস্থিকলস।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন