প্রীতম বসু
জমিদার চন্দ্রকান্ত আর ভদ্রতার পরোয়া করল না। পাইপ হাতে গটগট করে চলে গেল অন্দরমহলের দিকে। আর প্রায় সঙ্গে সঙ্গে ভিতরে ঢুকল মনু সেন। মুনশি ন যযৌ ন তস্থৌ হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। মনু সেন বাপের সোফায় এসে বসে বলল, “শালা, নিমপাতাকে সারা রাত রসগোল্লার রসে চুবিয়ে রাখলেও তার তেতো কখনো যায়?’ মনু সেন টেবিলের ওপর দু‘পা তুলে দিল। ‘ড্যাড বেকার আমাকে দিয়ে এত ক্ষমা-টমা চাওয়ালো। যাক, ফালতু টাইম ওয়েস্ট করতে চাই না। সোজাসুজিই বলছি, আমাদের এই প্রপার্টি আমার ফেরত চাই। আমার পূর্বপুরুষের অর্থে বানানো ওই নীলমাধবের মন্দির-‘
‘নীলমাধবের মন্দির আপনার পূর্বপুরুষের টাকায় বানানো হয় নি। ওটা রূপসনাতন গোস্বামীর-‘
“থামো!” মনু সেন গোবিন্দ অধিকারীকে কথা শেষ করতে দিল না। “ওসব ভাট গপ্পো আমাকে শুনিও না।”
‘গপ্পো কেন হবে। চৈতন্যচরিতামৃতে লেখা আছে,’ পদাবলী সদ্য শেখা বিদ্যা সুযোগ পেয়ে গম্ভীর মুখে ব্যবহার করল।
‘সে তো রূপকথাতেও কত কিছুই লেখা থাকে। পাতালপুরীতে দৈত্যের রত্নখচিত প্রাসাদে বন্দী রাজকন্যা। সেসব কি সত্যি?’ তাচ্ছিল্যের ভঙ্গীতে বলল মনু সেন। ‘আমাদের পূর্বপুরুষ বিরূপাক্ষ সেনের পোষা ডাকাত দল ছিল। এরা দিনের বেলা বুড়িকোশীতে নৌকা নিয়ে জাল ফেলে মাছ ধরত আর রাতে কালো কাপড়ে মুখ ঢেকে দ্রুতগামী ছিপ নৌকা নিয়ে বোম্বেটেগিরি করত। বুড়িকোশীতে ধনীদের বজরা বা তীর্থযাত্রীদের ভাউলিয়া নৌকো দেখলে তার ওপর চড়াও হয়ে লুঠতরাজ করত। আর যা কিছু ধন-সম্পদ পেত তা কলসিতে চৈতন্যপুখুরির পাঁকে লুকিয়ে রাখত। পরে জমিদার বিরূপাক্ষ সেই কলসির ধনরত্ন নিজের প্রাসাদে নিয়ে আসতেন। তোমাদের সনাতন চোর এরকমই একটা কলসি পেয়ে গেছিল।’
“আমি বিশ্বাস করি না,’ গোবিন্দ অধিকারী দৃঢ়কণ্ঠে বলল।
‘তুমি কি ভাবছ একটা মন্দির তৈরি হচ্ছে আর কেউ জানবে না কে এত টাকা দিচ্ছে? জমিদার বিরূপাক্ষের কানেও গেছিল এই ধনকলসের কথা। কিন্তু আনফরচুনেটলি, সে স্বীকারও করতে পারছে না যে ওটা ওরই লুণ্ঠিত ধন। তাই চুপচাপ ওই ধনরাশি দিয়ে মন্দির বানানো হল। যাক্ গে, এসব ফালতু কথা তোমার সঙ্গে বলে সময় নষ্ট করার কোনও মানে হয় না। ওই প্রপার্টি আমার ফেরত চাই।’
‘অসম্ভব!’ গোবিন্দ অধিকারীর দু‘কানের পাশে রগ রাগে ফুলে উঠল।
‘ঠিক আছে। তবে দেখে নিও, এই মনু সেন কী করতে পারে।’ মনু সেনের চোখের দৃষ্টি ক্রমশঃ কঠোর হয়ে উঠল। ‘আমার প্রমিস আমি ভুলি নি। করতালতলী থেকে কীর্তন আমি চিরকালের জন্য মুছে দেব। যে এই গ্রামে খঞ্জনি বাজাবে আমি তার দুটো কবজিই ভেঙে দেব। দেখি কোন শালার হিম্মত আছে এই গ্রামে টুং-টুং করে খঞ্জনি বাজায়।’
গোবিন্দ অধিকারী ঠোঁট না ফাঁক করে ধিক্কারের হাসি হাসল। ‘কীর্তন বাঙালির রক্তে মিশে গেছে ছোটকর্তা। আপনার আর কত বড় ক্ষমতা? আপনার মত একসময় নবদ্বীপেও কাজী চাঁদ রায় রেগে গিয়ে খোল ভেঙে ভয় দেখিয়ে নবদ্বীপবাসীদের বলেছিল কীর্তন করলে দণ্ড পাবে। কাজীর অত ক্ষমতা, কিন্তু তিনি কি পেরেছিলেন? পারেন নি। চৈতন্যদেবের সঙ্গে হাজার হাজার মানুষ খোল, করতাল, জলন্ত মশাল হাতে কীর্তন গাইতে গাইতে, নাচতে নাচতে কাজীর বাড়ির দিকে মিছিল করে গেছিল। কাজী ভয় পেয়ে হার মেনেছিল। আপনিও পারবেন না ভয় দেখিয়ে ঈশ্বরভক্তিকে জোর করে বাংলার মানুষের মন থেকে মুছে ফেলতে।’
‘সকাল সকাল এই বুড়ো ভাম আমায় চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে?’ মনু সেন তার ধামাধরা মুনশির দিকে তাকাল সমর্থনের আশায়। ‘বাঘের গুহায় ঢুকে বাঘকে ধমকাচ্ছে?’
‘বাঘের গুহা!” পদাবলী তির্যকস্বরে বলল। ‘নিজের গর্তে
‘এ্যাই শালা! ও’দিন মার খেয়েও তোর শিক্ষা হয় নি?’ মনু সেন হিসহিস করে উঠল। ‘আমার বাড়িতে এসেছিস তাই তোর দু‘পাটি দাঁত ভেঙে দিলাম না। ভাল চাস তো চুপচাপ বেরিয়ে যা! ভাবছিস মনু সেন বাতেলা মারছে তাই না? আমার ক্ষমতা দু‘দিনে দেখতে পাবি।’
পদাবলীর আর এক মুহূর্ত এখানে থাকার আগ্রহ নেই। গোবিন্দ আধিকারীর হাত ধরে প্রায় জোর করেই ওকে বাইরে বের করে নিয়ে এল। গোবিন্দ অধিকারী নিজেও রাগে ফুঁসছে। বাইরের বাগানে অ্যাম্বাস্যাডারের ড্রাইভার এখন একটা তোয়ালে দিয়ে বাগানে ইতিউতি ছড়িয়ে থাকা শ্বেতপাথরের বিবসনা নারীমূর্তিদের গায়ের ধুলো সাফ করছে। এখন জমিদারের গাড়িতে ফিরে যাওয়ার চিন্তা করাটাই বাতুলতা।
ওরা দু‘জনে হেঁটে হেঁটে ট্রেন-স্টেশনে এল। গোবিন্দ অধিকারী রাগে গজগজ করছে। ‘বলে কিনা মোকদ্দমা করবে। আমার রাগে ব্রহ্মতালু জ্বলে যাচ্ছে। তবে, তোমার কিন্তু বেড়ে সাহস হে।’
*এই জলাজমির মালিকানার ব্যাপারটা কী?’
গোবিন্দ অধিকারী বিরক্তির সঙ্গে বলল, ‘সে অনেক কথা। তোমার ওসবের মধ্যে না ঢোকাই ভাল। ঠাকুরদার দূষিত রক্ত চন্দ্রকান্তের শিরা-উপশিরায় বইছে। এর থেকে আর কী ভাল আশা করা যায়? কবে যে এই বিশাল দায়িত্ব থেকে মুক্তি পাব?’
“কেন এর ঠাকুরদা কী করেছিলেন?’
‘কী করেছিলেন? জমিদার বরদারঞ্জনের ছোটপুত্র অখিলরঞ্জন কুলাঙ্গার ছিল। সেই সমস্ত জমিদারীর দেখাশোনা করত। বড় পুত্র কুমুদরঞ্জন অকৈতব। তাঁর মন সদা ভক্তিবিগলিত, বিষয়বাসনার ঊর্ধ্বে। কুমুদরঞ্জন বছরের অধিকাংশ সময় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মন্দিরে মন্দিরে ঘুরে বেড়াতেন। প্রতিবছর জগন্নাথধামে বেশ কিছুদিন কাটিয়ে আসতেন। হয়তো সেখানে গিয়ে শুনলেন ভুবনেশ্বরে আর ক’দিন পর শুরু হবে বৈষ্ণব মেলা সেখানে চৈতন্যদেবের শিষ্য উড়িষ্যার বিখ্যাত পঞ্চসখার কীর্তন শোনানো হবে আর থাকবে মারকন্দ দাসের বিখ্যাত কইলি গান তো কুমুদরঞ্জন ঘরবাড়ি ভুলে পড়ে রইলেন উড়িষ্যায়। কখনো শুনলেন তামিলনাড়ুতে কোন মন্দিরে প্রাচীন আলোয়ার কবিদের “দিব্য প্রবন্ধ” কীর্তন গানের চব্বিশ প্রহর নামগানের আসর বসছে, উনি চললেন তামিলনাড়। মানুষটা জমিদারির বিষয়-আশয়ের দিকে নজর না দিয়ে দিনরাত ভক্তিরসে বুঁদ হয়ে থাকতেন। কখনো কর্ণাটকে দাসকূট সঙ্গীত শুনতে ছুটছেন, আবার কখনো তাঞ্জোরে অপূর্ব সুর ও কাব্যের জগতে বিমোহিত হয়ে “প্রহ্লাদ ভক্তি বিজয়” শুনছেন, কখনো গুজরাতে চললেন রাসে নরসিংহ মেহেতার রাস সহস্রপদী শুনতে, আবার কখনো মহারাষ্ট্রে ছুটেছেন তুকারামের লেখা অভঙ্গ পদের কীর্তন গান শুনতে। তাছাড়া ঘরের কাছে জয়দেবের কেঁদুলি, মহাপ্রভুর নবদ্বীপে আসা যাওয়া তো আছেই।’
‘একদম সাত্ত্বিক মানুষ ছিলেন,’ পদাবলী বলল।
“হ্যাঁ, সকলে তাকে শ্রদ্ধার সঙ্গে ডাকত জমিদারগোঁসাই বলে। আর মানুষটার এই ভক্তিভাবের সুযোগ নিল ছোটভাই অখিলরঞ্জন। অখিলরঞ্জনের সঙ্গে ইংরেজ জজ-ম্যাজিস্ট্রেটদের খুব দহরম মহরম ছিল। অখিলরঞ্জন রায়সাহেব উপাধিও পেয়েছিল। ইংরেজদের সাহায্য নিয়ে সে নিজের দাদাকে বঞ্চিত করে জমিদারী ভাগাভাগি করে সিংহভাগের অধীশ্বর হয়ে বসল সে, আর দাদাকে দিল নদীর পাড়ের এই জলাজমি যা একসময় চৈতন্যপুখুরী নামে পরিচিত ছিল, আর এই নীলমাধবের মন্দির। তখন এদিকে জলায় রাতের বেলা আলেয়া দপ করে জ্বলত, শেয়াল ডাকত, কাছেই ছিল শ্মশান। তবে হ্যাঁ, লোকলজ্জার ভয়ে একটা কাজ করেছিল অখিলরঞ্জন, দুই জলার মাঝে জমি মাটি ফেলে উঁচু করে এই রাস্তাটা বানিয়ে দিয়েছিল জমিদার বাড়ি থেকে নীলমাধবের মন্দির হয়ে খেয়াঘাট পর্যন্ত যাতে কুমুদরঞ্জন আসা যাওয়া করতে পারে।
‘অতবড় জমিদারি! কুমুদরঞ্জন লড়াই করলেন না?”
‘আসলে মানুষটা বিবাগী ছিল। অনাসক্ত বৈরাগীকে জমিদারবাড়িতেই রাখো আর খড়ের কুঁড়েতেই রাখো, তাঁর কোনও কিছুতেই আসক্তি নেই,’ গোবিন্দ অধিকারী বলল। ‘তবে ক্রমশঃ ওনার সামাজিক মর্যাদা হ্রাস পেতে শুরু করল। অধিকাংশ মানুষই সাধু-সন্ন্যাসীর রূপে তাঁর কাছে আসত অর্থের আশায়। তারা বুঝে গেল এখন কুমুদরঞ্জনের সেই আর্থিক স্বচ্ছলতা নেই, তারা আসা বন্ধ করে দিল। কিছু গ্রামবাসী চাইল না কুমুদরঞ্জনের সঙ্গে জড়িয়ে থেকে অখিলরঞ্জনের চক্ষুশূল হতে, তাই তারাও আসা যাওয়া বন্ধ করে দিল। করতালতলীতে তখন এক ঘর মানুষও বাস করত না। শুধু কেউ মারা গেলে তাঁর আত্মীয়রা শ্মশানে চিতা জ্বালাতে এদিকে আসত। কুমুদরঞ্জন কিন্তু তাতেও অসুখী ছিলেন না। তিনি এখানেই নীলমাধবের মন্দির আর কীর্তন নিয়ে থাকতেন। আর এদিকে তাঁর একমাত্র প্রতিবেশী ছিল ভুবন ডোম। আমার দাদু। শ্মশানের প্রান্তেই ছিল তখন আমাদের কুঁড়ে। তারপর বুড়িকোশীতে অনেকবার বান এল, নদীর পাড় ভেঙে শ্মশানকেই গ্রাস করে নিল। শ্মশান অন্য জায়গায় সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হল, কিন্তু আমার দাদু জমিদারগোঁসাইকে ছেড়ে গেল না। নতুন শ্মশান অনেকটা দূরে গ্রামের একদম অন্যদিকে চিত্রাখালের ধারে। ডোমকে শ্মশানের গায়েই চব্বিশ ঘন্টা থাকতে হয় তাই জমিদার অখিলরঞ্জন আমার দাদুকে বললেন করতালতলী ছেড়ে চিত্রাখালের দিকে চলে যেতে। কিন্তু আমার দাদু জমিদারগোঁসাইকে করতালতলীতে একা ছেড়ে যেতে রাজি হল না। জমিদারগোঁসাই আমার দাদুর জন্য কাছেই একটা কুঁড়ে বানিয়ে দিল। শ্মশান অন্যত্র সরিয়ে নিয়ে জমিদার অখিলরঞ্জন অন্য ডোম আনায় দাদুর আয় একদম বন্ধ হয়ে গেল। একদিন জমিদারগোঁসাইয়ের কাছে খবর এল ইংরেজরা বিভিন্ন জেলে সৎকার করার জন্য অনেক ডোম খুঁজছে। কলকাতার প্রেসিডেন্সি জেলে নাকি ভাল মায়না, রিটায়ার করলে অনেক সুবিধা। জমিদারগোঁসাই দাদুকে বললেন এ সুযোগ কিছুতেই না ছাড়তে, বাবার দেখাশোনা মৃদঙ্গমজ্যাঠা, মন্দিরাপিসীদের সঙ্গে ঠিক হয়ে যাবে। জমিদার-৮৭।প্ৰাণনাথ হৈও তুমি
গোঁসাইয়ের কথায় দাদু অনিচ্ছাসত্ত্বেও জেলের চাকরি নিয়ে কলকাতা চলে গেল। বাবা রয়ে গেল জমিদারগোঁসাইয়ের স্নেহচ্ছায়ায়। চারদিকে পাথারি আর জলা। জমিদারগোঁসাই বুঝেছিলেন এই চৈতন্যপুখুরীকে তার ছোটভাইয়ের লোভ একদিন গ্রাস করবে। তাই জমিদারগোঁসাই মৃত্যুর আগে এই দেবোত্তর সম্পত্তি আমার বাবাকে দিয়ে গেলেন। বাবাকে খুব বিশ্বাস করতেন জমিদারগোঁসাই।’ দিলেন না?’
“কেন? নিজের ছেলে মেয়েকে সম্পত্তি
দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল গোবিন্দ অধিকারী - সে খুব দুঃখের কাহিনী। ওসব কথা থাক। এখন জমিদার আমাকে লোভ আর ভয় দেখাচ্ছে যাতে আমি এই জমি ওকে বিক্রি করে দিই। আর ওর ছেলে শাসাচ্ছে যে করতালতলী থেকে কীর্তন মুছে দেবে। আমার দেহে যতক্ষণ শেষ রক্তবিন্দু আছে আমি ততক্ষণ লড়াই করে যাব করতালতলীর কীর্তনকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য। জানিনে প্ৰভু নীলমাধবের কী ইচ্ছে।’
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন