প্রীতম বসু
কাল সারাদিন পদাবলীর মনে রতির মুখ ভেসেছে। রতি কীর্তন গাইছে যেন সুর আর সৌন্দর্য মাখামাখি। কাল হরি বায়েন বলল মেয়েটার কপাল খুব খারাপ। আজ প্রফেসরকে পদাবলী জিজ্ঞেস না করে পারল না কপাল খারাপ বলল, স্যার?” –
“কেন রতির
‘যার অত বিখ্যাত মা আর বাপ তাকে এ পরিবেশে মানায়?
‘মা ইন্দুমতি বাঈ। গোবিন্দ অধিকারীর মুখে সেদিন নামটা শুনলাম। খুব বিখ্যাত গায়িকা ছিল বুঝি?”
“এক সময় খুব খ্যাতনামা ঢপ কীর্তনীয়া ছিল ইন্দুমতি বাঈ। ঢপ কীর্তনের নাম শুনেছিস?”
‘গোবিন্দ অধিকারী বলছিলেন - রূপচাঁদের ঢপ কীর্তনের গান।
‘ঠিক। পরবর্তী কালে অঘোর দাস, দ্বারিক দাস, শ্যাম বাউল, মোহন দাস, মধুসূদন কিন্নর ঢপ গানের জপ্রিয়তা বাড়ান। এদের মধ্যে মধুসূদন কিন্নর বা মধু কানের ঢপ কীর্তন সাধারণ লোকের মনোরঞ্জন করেছিল। হাটেবাজারে সদ্য পয়সাওয়ালা বাবুমহলে খুব জনপ্রিয় হয়। কিন্তু কীর্তনের ভক্তিভাব ধীরে ধীরে কমতে থাকে। তারপর অনেক মেয়ে হালকা চালের ঢপ কীর্তন চটুল ভঙ্গীতে গেয়ে বাবুদের মহলে নাম কেনে। লোকে তখন লীলাকীর্তন ছেড়ে গর্ভাধান, উপনয়ন, চূড়াকরণ, জাতকর্ম, শ্রাদ্ধ, বাসর, অন্নপ্রাশন, পুজো-আচ্ছা সব কিছুতেই এই কীর্তনওয়ালীদের ডাকত। পটল বাঈ, পান্না বাঈ, ছাপ্পান্ন ছুরি, কমলা ঝরিয়া। রতির মা ইন্দুমতি বাঈ ছিল এক বিখ্যাত কীর্তনওয়ালী। বাবুদের মহলে খুব নাম। কত উৎসব অনুষ্ঠানে ইন্দুমতি বাঈয়ের ডাক পড়ত কীর্তনের আসরে। মাঘী পূর্ণিমায় শ্রীচৈতন্যদেবের জন্মতিথিতে নবদ্বীপ, নরহরি ঠাকুরের তিরোভাবে গৌরনরহরি মিলন মহোৎসবে শ্রীখণ্ড, সাঁজা উৎসবে কাঁদরা, বর্ধমানের ঝামটপুরে কৃষ্ণদাস কবিরাজের স্মরণ মহোৎসব, মালদার রামকেলিতে রূপসনাতনের স্মৃতিপূজার কীর্তন, তাছাড়া কাটোয়া, কালনা, শান্তিপুর, মঙ্গলডিহি সর্বত্র মতিবাঈয়ের জয়জয়কার। তারপর কীর্তনের আদলে এল হালকা গানের কৃষ্ণযাত্রা। কৃষ্ণলীলা ও চৈতন্যলীলার পালাগান আর যাত্রাভিনয়। নিমাই সন্ন্যাস, রাই উন্মাদিনী এসব দেখতে ভিড় উপচে পড়ত। কিন্তু এতে অষ্টসাত্ত্বিকভাব থাকত না। ধীরে ধীরে কীর্তনের জায়গা অনেকটা দখল করে নিল যাত্রাপালা। সেই সময় একদিন গীত বায়েনের মিষ্টি হাতুটি শুনে ইন্দুমতি বাঈ এমন তন্ময় হয়ে গেল যে সে মন দিয়ে ফেলল গীত বায়েনকে। প্রণয় থেকে বিবাহ, দু‘জনে ঘর বেঁধে ফেলল। ওদের মেয়ে রতি। বাবা বিখ্যাত বায়েন, মা সুকণ্ঠী ইন্দুমতি বাঈ। মেয়ে কীর্তন শিক্ষায় শ্রেষ্ঠ তালিম পেতে লাগল।
কত কেঁদে মরবি লো তুই শ্যাম অনুরাগে -
নব জলধররূপ বড় মনে লাগে -
ভেবেছিলি যাবে দিন তোর সোহাগে সোহাগে - কিন্তু কপালে সুখ লেখা না থাকলে যা হয়। রতি মন দিল এক বাউলকে। সে বাউল কিন্তু সোজাসুজি বলেই দিল রতিকে যে সে সহজিয়া। রতি তার সাধনসঙ্গিনী হয়ে থাকতে পারে, কিন্তু তার পক্ষে রতিকে বিবাহ সম্ভব না। রতি বাউলের প্রেমে এমনই মশগুল যে সে তাতেই রাজি। রতির বাপ-মা কিন্তু তখনকার এই লিভ টুগেদার সম্পর্কে বিশ্বাসী ছিল না। তারা রতির জন্য বৈষ্ণব ঘরে পাত্র খুঁজতে লাগল। কিন্তু তখন রতি তার বাউল নাগরের সঙ্গে বাড়ি থেকে পালিয়ে চলে গেল বারানসী। দু‘বছর পর সেই বাউল রতির মোহ থেকে নিজেকে মুক্ত করে আবার অন্য এক নারীর সঙ্গে সম্পর্ক করল। বেনারসে রতিকে তখন চরম দুর্দশার মধ্যে পড়তে হল। শরীর এত অনটন সহ্য করতে পারল না, রতি এক দুরারোগ্য সংক্রামক রোগে আক্রান্ত হল। রতি মরেই যেত যদি না ওকে দেখতে পেত সোনাগাছির বিখ্যাত রত্নাবাঈ। তীর্থ করতে বেনারস গেছিল রত্নাবাঈ। সে রতিকে নিজের মেয়ের মত যত্ন করে সারিয়ে তুলে বেনারস থেকে সোনাগাছিতে নিয়ে এল। তখন থেকে রতি সোনাগাছিতেই রয়ে গেল।’ তারপর নাইট্রোজেন গুনগুন করে গাইলেন -
ওগো, কালার পিরীতে কুলমান হারাইলাম সই, আর যাব কই!
না জাইলে কঠিনের সনে কেন প্রাণ সঁপিলাম, আর যাব কই!
যার জন্য পাগলী হইলেম সে বা কই আর আমি কই
পান খাইয়া চূণে মইলেম, মনে ছিল কাঁচা দই!
পদাবলী চুপ করে রইল। মনে বিষণ্ণতা ছড়িয়ে রয়েছে। ‘আপনাকে খুব শ্ৰদ্ধা করে দেখছি। রতি আপনাকে চিনল কীভাবে?”
‘কীর্তন নিয়ে গবেষণা করার সময় আমি রতিকে প্রথম দেখি। ওর গানের গলা শুনে আমি বিভোর, ওর বংশপরিচয় জেনে আমার খুব খারাপ লাগত। তখন পরাশর ওর কলঙ্কিনী-রাই সিরিজ আঁকার জন্য একজন মডেল খুঁজছিল। আমিই পরাশরকে নিয়ে গেছিলাম রতির কাছে।’
‘পরাশর? কলঙ্কিনী-রাই মানে -? বিখ্যাত -
‘হ্যাঁ, ঠিকই ধরেছ। বিখ্যাত পেইন্টার পরাশর সেন। গত বছর পদ্মশ্রী পেল।’ ‘প-রা-শ-র সেন?’ পদাবলীর মুখটা বিস্ময়ে হাঁ হয়ে গেল। পেইন্টার পরাশর সেন আপনার বন্ধু?”
‘তুমি ওর আঁকা ছবি দেখেছ?”
- ‘দেখেছি মানে? আমি ওঁর বিশাল ফ্যান। চণ্ডীদাসের স্তন-ক্ষীরে আঁখি-নীরে বসন ভিজিয়া পড়ে ওই ছবি যে ভক্তিতে এঁকেছেন তা কক্ষনো ভোলা যায়! অ্যাকাদেমীতে ওর এক্সিবিশন আমি কক্ষনো মিস করি না। উনি তো আমাদের গোটা বাঙালি জাতের গর্ব। গত বছরই নিউ দিল্লীর ফ্রেঞ্চ এম্বাসীতে ওঁকে ফ্রেঞ্চ অ্যাম্বাস্যাডার দ্য লিজিঅন অব অনারে সম্মানিত করল। পরাশর সেন আমাদের প্রজন্মের আর্টিস্টদের কাছে তো ভগবান। উনি তো দিল্লীতেই বেশি থাকেন।
‘ওকে তুমি সামনা সামনি কখনো দেখ নি?”
‘দু’বছর আগে একবার। খুব অল্প সময়ের জন্য। দিল্লীতে ত্রিবেণী কলা সঙ্গমের আর্ট এক্সিবিশনের জন্য আমার আঁকা দুটো গ্রাফাইট স্কেচ সিলেকটেড হয়েছিল। উনি এক্সিবিশন ওপেন করতে কনট প্লেসের কাছে মাণ্ডি হাউসের এক্সিবিশনে এসেছিলেন। ওনার অটোগ্রাফের জন্য যা হুড়োহুড়ি শুরু হল উনি কোনও রকমে ফিতে কেটেই গাড়িতে উঠে পড়লেন।’ ‘তুমি
আর্টিস্ট? বাঃ! এটা তো জানা ছিল না।’
- ‘সাদা-কালো। হবি বলতে পারেন। রেগুলার না। ঠাম্মা খুব ভাল ছবি আঁকতেন। সাদা-কালো স্কেচ। ঠাম্মাই আমাকে হাতে ধরে স্কেচ আঁকা শিখিয়েছিলেন।’ তারপর পদাবলীর হঠাৎ মনে পড়ল – ‘আচ্-ছা! ওই জন্যই রতির মুখটা আমার এত চেনা চেনা লাগছিল। কোথায় যেন দেখেছি, অথচ মনে করতে পারছিলাম না। কলঙ্কিনী রাই। ইয়েস। সেই বিখ্যাত পেইন্টার পরাশর সেন আপনার বন্ধু?”
‘হ্যাঁ, আমাকে দাদা বলে। ওর দাদা আমার চন্দননগরের ছোটবেলার স্কুলের বন্ধু। বেঞ্চে পাশাপাশি বসতাম। পরাশরকে আমি এইটুকু বয়স থেকে চিনি। ওরও গোঁড়া বৈষ্ণব পরিবারে জন্ম। তাই ওর ছবিতে ভক্তি গলে পড়াটাই স্বাভাবিক।’
“বাপরে! স্যার, একদিন আলাপ করিয়ে দেবেন?”
‘হ্যাঁ, আজই ও আসবে রতিকে ছাড়তে। তখন আলাপ করিয়ে দেব।’ ‘রতিকে ছাড়তে মানে?”
‘রতির কীর্তন শুনে পরাশর রতির প্রেমে মজে যায়। তারপর পরাশর ওর কলঙ্কিনী-রাই সিরিজের ছবি একের পর এক আঁকতে থাকে রতিকে ওর মডেল করে। এখনো সে এঁকে চলেছে। কিন্তু পরাশর আর রতির সম্পর্ক শুধু আর্টিস্ট আর মডেলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, ওদের মধ্যে শারীরিক সম্পর্ক শুরু হয় এবং তারপর ওরা একে অপরকে হৃদয়ে জায়গা দেয়। পরাশর আর রতি কিন্তু সামাজিক সম্পর্কে আবদ্ধ হতে পারেনি, কারণ পরাশরের নিজের স্ত্রী আছে, কন্যা আছে।’
‘কিন্তু এটা তো অন্যায়! ওঁর মত একজন গুণী মানুষের কি এই দ্বিচারিতা শোভা দেয়?’
‘প্রেম অন্ধ,’ নাইট্রোজেন হাসলেন। ‘এজন্যই বোধহয় ইউরোপে প্রণয়ের দেবতা কিউপিডকে অন্ধ বলে দেখিয়েছেন। চণ্ডীদাসের ভাষায় পরাণে পরাণ বাঁধা আপনা আপনি। পরাশর বলে রামী ধোপানি যদি চণ্ডীদাসের জীবনে না আসত তবে চণ্ডীদাস রাধাকৃষ্ণের প্রেমের অমৃতবর্ষী পদাবলীর মন্দাকিনী ধারার জন্ম দিতে পারতেন কিনা জানি না, তবে রতির প্রেম তার রং-তুলির জগতের সাধনায় তাকে এক উচ্চস্তরে নিয়ে গেছে। প্রেমের ব্যাপারে পরাশরের গুরু হল চণ্ডীদাস যে সমাজে একঘরে হয়েও রামী রজকিনীকে ত্যাগ করেনি। পরাশর হেসে চণ্ডীদাস আওড়ায়
আমি অতি হীন পিরীতি অধীন
পিরীতি আমার গুরু।
এ তিন আখর হৃদয়ে যাহার
সে জনা কল্পতরু।।
‘আর রতি?”
‘রতির কাছে পরাশর সেন হল ভগবান, তার স্বামী। যদিও রতি কখনোই তার সামাজিক স্বীকৃতি চায় নি। সে গণিকালয়ে রত্নাবাঈয়ের বাড়িতেই থাকত। রত্নাবাঈয়ের মৃত্যুর পর পরাশর সেই বাড়ি কিনে রতির নামে লিখে দিয়েছে। গণিকাবৃত্তি আজ রতির জীবিকা নয়। সান্ধ্য মজলিশে ঠুংরি, গজল এসব গায়।’
‘তাহলে আজকে ?
‘পরাশরের মেয়ে জনস হপকিনসে মেডিসিন পড়ে। ওর স্ত্রী বছরের এক মাস ওর মেয়ের কাছে গিয়ে থাকে। পরাশরও কখনো কখনো যায়। ওর স্ত্রী যখন বিদেশে থাকে তখন কখনো কখনো পরাশর রতিকে নিজের বাড়িতে নিয়ে যায়।
‘বৈষ্ণব পদাবলীর ভাষায় পরকীয়া প্রেম?’
নাইট্রোজেন হাসলেন। বৈষ্ণব পদাবলীর ভাষায় এটাকে বলে কাম।
সহজে গোপীর প্রেম নহে প্ৰাকৃত কাম
কামক্রীড়া সাম্যে তার কহি কাম নাম।’
নাইট্রোজেনের ফোন বাজল। ফোন ধরতে নাইট্রোজেন উঠে গেল, কিছুক্ষণ পর ফিরে এসে বলল, ‘রতি ফোন করেছিল। আজ আসবে না। পরাশর ছবিটা এঁকে চলেছে, রতিকে তাই বসে থাকতে হচ্ছে। কখন শেষ হবে তা জানে না।’ পদাবলীর মনটা খারাপ হয়ে গেল। পদাবলী বলল, “যাঃ, আজ রতির কীর্তন শোনা হল না। এত ভাল গায় -
“ভাল গায়েন না হলে সে কীর্তন আসর জমে না, প্রফেসর বললেন। ‘রতির গানের গলা যেমন অপূর্ব, ও গানটাও খুব ভক্তিভরে গায়। এজন্যই ওর কীর্তন মনকে যেন বৃন্দাবনে নিয়ে যায়। ভাল কীর্তনগানে শুধু শ্রোতা কেন, তখন গায়ক, বাদক, দোহার, শির যে কারোর মনে কীর্তনের প্রভাবে অষ্টসাত্ত্বিকভাবের উদয় হতে পারে।’
‘অষ্টসাত্ত্বিকভাব কথাটা আপনি অনেকবার বলেছেন। এটা কী, স্যার?’
‘কীর্তন শুনতে শুনতে ভাবের ঘোরে কেউ কেঁদে ওঠে, দু-চোখে অশ্রুধারা ঝরতে থাকে, কেউ পুলকে বিহ্বল হয়ে যায়, কেউ মাটিতে শুয়ে ভক্তিতে ভাববিকারে গড়াগড়ি দিচ্ছে এসব দৃশ্য ভাল কীর্তনগানে দেখা যায় - এই অশ্রু, কম্প, স্বেদ, পুলক, বৈবর্ণ, স্তম্ভ, স্বরভঙ্গ ও মূর্ছা হল অষ্টসাত্ত্বিকভাব
‘কিন্তু মূল গায়কের এরকম ভাববিকার ঘটলে তো সর্বনাশ, গানের সুর তালের তো দফারফা হয়ে যাবে!’
“আরে কীর্তনের আসরে সেই ভাববিকার হওয়া তো বৈষ্ণবের পক্ষে পরম সৌভাগ্য। শুনেছি প্রভু শ্রীচৈতন্যদেবের নগর সংকীর্তনের সময় অনেকের এরকম ভাববিকার হত। ভাবের ঘোরে রাস্তার ধুলোয় গড়াগড়ি দিচ্ছে। এরকম দৃশ্য দেখাও ভাগ্যের,’ নাইট্রোজেন বললেন।
‘আপনার দেখা কীর্তন অনুষ্ঠানে কখনো কারুকে এরকম মাটিতে গড়াগড়ি দিতে দেখেছেন?’
‘না, তবে একবার গড়াগড়ি দিয়েছিল, একজন দোহার,’ প্রফেসর বললেন।
‘অষ্টসাত্ত্বিকভাব?”
“দোহার মাটিতে শুয়ে মুখে গাঁজলা তুলছিল, আমরা ভাবলাম অষ্টসাত্ত্বিকভাব, শ্রোতারা ধন্য ধন্য করে উঠল। কিন্তু কোলবায়েন তাড়াতাড়ি খোল রেখে ওকে জুতোর চামড়ার গন্ধ শোঁকাতে তবে জ্ঞান এল, প্রফেসর হেসে বললেন। ‘মৃগী।’ নাইট্রোজেনের রসিকতায় পদাবলী হাসল। ‘আমি একটা কথা বলব, স্যার?” ‘বল।’
‘আমাদের প্রজন্মের অনেকেই ঈশ্বর বিশ্বাস করেনা। তাদের ভক্তি নেই। আমাদের প্রজন্ম তাহলে কীর্তনের এই ভক্তিগীতি কীভাবে গ্রহণ করবে?’
‘সে কথা ঠিক না,’ প্রফেসর বললেন। ‘বাংলার মাটি ভক্তিরসে ভরপুর। যে মাটিতে চৈতন্যদেব ও রামকৃষ্ণের মত অবতার জন্মায়, বুদ্ধদেব, মহাবীরের ধর্ম যে মাটিতে এত বেশি প্রচলিত হয় সে মাটির লোকেদের ভক্তি নেই এটা আমি মানতে পারছি না।’
‘সে সব পুরোনো দিনের কথা, তখন ভক্তি ছিল। আজকের দিনে কোথায় সেই ভক্তি?’ পদাবলী পালটা যুক্তি দিল।
‘ভক্তি চাপা পড়ে আছে। ভক্তি না থাকলে মহালয়ার দিন আজও কেন লক্ষ লক্ষ বাঙালি ভোররাতে রেডিও খুলে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের চণ্ডীপাঠ শোনে? দক্ষিণেশ্বর মন্দিরে বা কাশীপুর উদ্যানবাটীতে আজও কল্পতরু উৎসবে কত লম্বা লাইন হয়ে কখনো দেখেছ? সাধারণ বাঙালির মনে আলবাত ভক্তি আছে,’ প্রফেসর থামলেন। বৈষ্ণব পদাবলীর গীতিকবিতাগুলি বাঙালির নিজস্ব রত্নভাণ্ডার। রাষ্ট্রীয় বিপ্লব ও আবর্তনে মাঝে মাঝে এই রত্নভাণ্ডারের প্রবেশ পথ চাপা পড়ে যায়। কিন্তু মুহূর্তের পথপ্রদর্শন আবার দ্রুতলয়ে বাঙালির অঙ্গ সেই রত্নের সাজে সজ্জিত করে তোলে।’
‘বাঙালি এখন কীর্তন শোনে না। বাঙালি সাহেবদের ইংরেজি গান শোনে, ব্যাণ্ড শোনে।’
“কিন্তু সাহেবরা তো বাংলা কীর্তন শোনে,’ প্রফেসর বললেন। ‘মায়াপুরে যাও দেখবে কত সাহেব কীর্তনের নেশায় ঘর ছেড়ে এদেশে পড়ে রয়েছে। আর ব্যাণ্ড কাকে বলে? সিঙ্গার, মিউজিশিয়ানরা একটা গান লিখে, সুর দিয়ে, মিউজিক বাজিয়ে গায় - সেটাই তো ব্যাণ্ড, রাইট? তাহলে কীর্তনও তো নাথিং বাট আ ব্যাণ্ড। মূল গায়েন, শির বাদক, খোল, করতাল নিয়ে পাঁচ-ছ’জনের দল। এভরিওয়ান স্ট্যাণ্ডিং অন আ স্টেজ অ্যাণ্ড পারফর্মিং। কত পুরোনো বল তো আমাদের বাঙালির ব্যাণ্ডের হেরিটেজ! সেটাকে তোমরা কৃতিত্ব দিতে ভুলে যাও কীভাবে?”
প্রফেসরের বক্তব্যে যুক্তি ছিল, গলায় ছিল সরলতা। কিন্তু পদাবলী জানে না মনে কেন বিষাদ ছড়িয়ে আছে। পদাবলী নিজেকে প্রশ্ন করল রতির প্রতি তার আকর্ষণ কি কাম?
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন