প্রীতম বসু
আবাল্য পদাবলী একটা কথা ঠাম্মার কাছে শুনেছে যে মনে দাস্য ভাব না থাকলে নাকি খাঁটি কীর্তনীয়া হওয়া যায় না। ঠাম্মা অপূর্ব কীর্তন গাইত। নাতির নাম পদাবলী রাখলেও তাঁর নাতি কীর্তন একদম পছন্দ করত না। ঠাম্মা বলত তোর শরীরে রুদ্রভাব প্রখর, দাস্যভাবের ছিটেফোঁটাও নেই, তাই তোর দ্বারা কক্ষনো কীর্তন হবে না।
ঠাম্মার ডেফিনিশন অনুযায়ী করতালতলী কীর্তন কোম্পানির কর্ণধার এই প্রৌঢ় গোবিন্দ অধিকারীর শরীর দাস্যভাবে টইটম্বুর থাকার কথা। কিন্তু জীবনের সব অঙ্ক মেলে না।
গোবিন্দ অধিকারী মাথা নিচু করে ভ্যানে উঠল। সঙ্গের যুবক এই ভ্যানের ড্রাইভার। সে ড্রাইভারের সিটে বসে গাড়ির ইঞ্জিন স্টার্ট দিল। গোবিন্দ অধিকারী কুঁজো হয়ে দাঁড়িয়ে ড্রাইভারের সামনে মাথার ওপর গৌর-নিতাইএর ছবিতে শিউলি ফুলের মালা পরিয়ে চোখ বুজে জ্বলন্ত ধূপকাঠি ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে বিড়বিড় করে মন্ত্র পড়ার মত বলল – তৃণাদপি সুনীচেন তরোরিব সহিষ্ণুনা, অমানিনা মানদেন কীর্তনায়ঃ সদা হরিঃ। তারপর ড্যাশবোর্ডের ফাটা কাচের ফুয়েল ইণ্ডিকেটরের অধোমুখি কাঁটার দিকে তাকিয়ে তার কপালে শুকনো হরীতকীর মত ভাঁজ উপস্থিত হল। গোবিন্দ অধিকারী ড্রাইভারকে যথাযোগ্য সম্মান প্রদর্শন করে বলল – ‘এ্যাই হারামজাদা বিশে, আবার ডিজেল চুরি করেছিস?” -
‘মহাপোভুর ছবির সামনে গালি দেন কেন, কত্তামশাই?’ বিরক্ত ড্রাইভার ডিজেলের কাঁটার মিটারে দুটো থাপ্পড় মারতে মারতে বলল। ‘গাড়ির মেন্টেনেন্স
- না করিয়ে শুধু আমারে গালি দ্যান – আপনি এবার অন্য ড্রাইভার দেখে ন্যান।’ নিজের সিটে রাখা প্লাস্টিকের বোতল খুলে অঞ্জলি ভরে জল নিয়ে জ্বলন্ত ধূপকাঠিটা ছ্যাঁক করে নিভিয়ে কত্তামশাই অবিচলিত কণ্ঠে বলল, ‘কাল এগার কিলোমিটার পথ যেতে হবে। রাস্তায় তেল শেষ হলে শ্রীখোলের বদলে তোর মাথায় আমি তেওট বাজাবো। তোর মহাপোভুও তোকে বাঁচাতে পারবে না।’
“মহাপোভুর দিব্যি, কত্তামশাই। আমি
‘বদমাশ! একদম চুপ।’ অধিকারী যত্ন করে নিভিয়ে রাখা ধূপকাঠিটা ধূপের চোঙাকৃতি বাক্সে ঢুকিয়ে রাখল। ‘গাড়ি ছাড়, দেরি করিস না।’
বিশে ড্রাইভার বেজার মুখে কপালে তর্জনী ঠেকিয়ে মহাপ্রভুকে পেন্নাম ঠুকে ভ্যান ছাড়ল। ফাটা আয়না দিয়ে দেখা যাচ্ছে ড্রাইভারের বিরক্ত মুখটা। গোবিন্দ অধিকারী ওকে যেভাবে গালাগালি করল তা শুনে পদাবলীর খারাপই লাগল। মনে হচ্ছে এই গোবিন্দ অধিকারীর সম্বন্ধে নাইট্রোজেন কিছুমাত্র বাড়িয়ে বলে নি।
টেম্পোভ্যানে দু‘দিকে তিনজোড়া করে সিট। সিটের রেক্সিন ফেটে গেছে। সামনে ডান দিকের জানলার পাশের সিটে বসে অন্যমনস্ক ভাবে কী যেন ভাবছে এই গোবিন্দ অধিকারী। যতদূর চোখ যায় জলা আর জলা। জলাজমির মাঝে মাঝে কোথাও কোথাও জেগে ওঠা স্থলভাগে নিম্নভূমির বনাঞ্চল - নলখাগড়া, উলু, বল্লুয়া, চাল্লিয়া, বনতুলসীর ঝাড়, আবার সুউচ্চ হিজল, করচ ডালপালা মেলে ঠাসাঠাসি করে জেগে রয়েছে। ডহরে কোথাও জলে ভাসমান দামকচুরিপানার দঙ্গলে বসে আছে একসারি মেটে হাঁসের দল, আবার অন্যান্য জায়গায় জলে ধীর গতিতে সাঁতার কেটে ভেসে চলেছে ঝাঁকে ঝাঁকে রাঙামুড়ি, চখাচখি, কালাজাং, দিঘর, ভুতিহাঁস, ডাইখোল, রাজহাঁস, নেউ-পিপি – এদের প্রায় সকলেই পরিযায়ী পাখি। পাখি দেখতে যে মেয়েটা এসেছে অনেক দূরে সে। পদাবলী দূর থেকে কালাগলা মানিকজোড় বক দেখার চেষ্টা করল। মন বলছে ওটা যদি সে দেখতে পায় তবে ওই সুন্দরী মেয়েটার সঙ্গে হৃদ্যতা হতে পারে। কিন্তু এত সহজে তেনাদের দেখা পেলে তো হয়েই যেত। ড্রাইভার গাড়ি জোরে চালাবার জন্য এক্সিলারেটরের প্যাডেলে পা চেপে ধরেছে। পুরোনো ইঞ্জিন গোঁ গোঁ করছে, কিন্তু স্পিড বাড়ছে না। ‘ইঞ্জিনের পিস্টনে রিং বসাতে হবেই এবার কর্তা,’ ড্রাইভার হতাশ গলায় বলল। ‘যে কোনও দিন বসে যাবে।’ সামনের সিট থেকে গোবিন্দ অধিকারী বলল ‘হুম। তোদের খোরপোশ যে দিতে পারছি, এই যথেষ্ট। ইনকাম নেই এক আনা, পিস্টন! আমাদের সময় কীর্তনের দল খোল-কত্তাল নিয়ে দূর দূর গ্রামে হেঁটেই চলে যেত।’
“বাইশ কিলোমিটার হেঁটে যাবেন আসবেন?”
“নবদ্বীপ থেকে নীলাচল কত মাইল জানিস?”
“না, ওদিকে কখনো গাড়ি চালাই নি।’
‘প্রায় ছশ কিলোমিটার। প্রতিবছর রথযাত্রার সময় দলে দলে মানুষ গৌরাঙ্গ মহাপ্রভুর সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য অতটা পথ হেঁটে কীর্তন গাইতে গাইতে যেত। নীলাচলে রথকে ঘিরে কীর্তন গেয়ে নেচে কুঁদে আবার হেঁটে হেঁটেই ফিরে আসত। তোর মত পিস্টনের দরকার পড়ত না ওদের। তুই তো পারলে গোটা ভ্যানকেই পালটে দিবি।’
‘কী যে বলেন,’ বিশু পিছন ফিরে আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল, গোবিন্দ অধিকারী খিঁচিয়ে উঠল। ‘হারামজাদা, সামনে তাকা। খানা-খন্দে ফেলে ফেলে সাসপেনশনটা শেষ করেছিস। গাড়ির সিটে বসে এক মাইল যেতে না যেতে সিটে লাফিয়ে লাফিয়ে পাছা এমন ব্যথা হয়ে যায় নিজেকে মনে হয় রেসের মাঠের ঘোড়ার পিঠে বসে ছুটছি।’
বিশু ড্রাইভার আর কথা বাড়াল না। চুপচাপ চালাতে লাগল। স্টেশন পেরিয়ে রাস্তার বাঁদিকে একটা গুদামের সামনে টেম্পোভ্যান দাঁড় করাল। গোবিন্দ অধিকারী বলল – ‘মহাজনের দাঁড়িপাল্লাটায় খেয়াল রাখিস, বিশে।’
বিশে টেম্পো বন্ধ করল। একটা ঝাঁকা মাথায় নিয়ে বিশে চলল, পাশে পাশে গোবিন্দ অধিকারী। পদাবলী টেম্পোতেই রইল। দু‘জনে গুদামের ভিতরে ঢুকে গেল। বিশু ড্রাইভার আবার ফিরে এসে দ্বিতীয় ঝাঁকাটা মাথায় নিয়ে গুদামের ভিতরে অদৃশ্য হয়ে গেল।
মিনিট দশেক পর দু‘জনে ফিরে এল। গোবিন্দ অধিকারী গজগজ করছে, ‘দাঁড়িপাল্লায় নিশ্চয়ই ঘাপলা আছে। এত শাপলা বেচেও ছিটেফোঁটা পয়সা আসে না! এবার অন্য কাস্টমার ধরতে হবে, বিশে। শুনেছি কলকাতায় শাপলা ভাল দামে বেচে। আমাদের মুখ্য-সুখ্যু পেয়ে গলা কাটছে এই মহাজন।
বিশু ড্রাইভার আবার গাড়ি স্টার্ট দিল। কিছুক্ষণের মধ্যেই কীর্তন কোম্পানির টেম্পোভ্যান উঁচু পাঁচিল ঘেরা জমিদারবাড়ির সামনে এসে দাঁড়াল। দারোয়ান বড় লোহার গেট খুলে দিল, টেম্পোভ্যান কম্পাউণ্ডের ভিতরে ঢুকে দাঁড়াল। বেশ পুরোনো দিনের বনেদী চকমিলান দুই-মঞ্জিল হাভেলি। টানা বারান্দায় সারি সারি খড়খড়ি টানা বন্ধ দরজা। অধিকাংশ ঘরেই লোক থাকেনা মনে হল। গোবিন্দ অধিকারীর মাজা ধরে গেছিল, অনেক কষ্টে টেম্পোভ্যান থেকে নামল। পিছনে পিছনে পদাবলী। গোবিন্দ অধিকারী নিচু গলায় বলল, “একটা কথা, আজকালকার ছেলে-ছোকরারা কীর্তন শুনতেই চায় না। তোমারও যদি ভাল না লাগে তাও কীর্তন শুনে ভাল মানুষের পো‘র মত এমনভাবে মাথা নাড়িও যেন আমাদের নামসংকীর্তন খুব ভাল লাগছে, বুঝেছ?”
পদাবলী মাথা নাড়ল। ভিতরে একটা বাঁধানো চতুষ্কোণ পুকুরের চারপাশে কংক্রিট সিমেন্টের পথ। পথের পাশে পাশে শ্বেতপাথরের বিবসনা পরীদের মূর্তি। সামনে প্রশস্ত সিঁড়ি জমিদারবাড়ির উঁচু দালানে উঠে গেছে, ডান দিকে বাগানের মধ্যে দিয়ে পথ চলে গেছে নাটমন্দিরে। দেখলেই বোঝা যায় এক সময় এই হাভেলি গরিমায় রায়বাহাদুরের আবাসের উপযুক্ত ছিল। নাটমন্দিরের সামনে প্যাণ্ডেল বানিয়ে তাতে লাল-নীল-হলুদ বাল্বের আলোর মালা ঝুলছে, ডিজেল জেনারেটর ভটভট করে চলছে। জেনারেটারের আওয়াজকে ছাপিয়ে মাইকে ভেসে আসছে উচ্চৈঃস্বরে হিন্দি গান। আর ভিতরে মিউজিকের তালে তালে হাততালি।
দু‘জনে ধীর পায়ে এগোতে লাগল পুকুর পাড় ধরে প্যাণ্ডেলের দিকে। পিছন থেকে বিশে ড্রাইভার বলল- ‘কত্তামশাই, এখানে তো ভিতর থেকে হিন্দি গান ভেসে আসছে!’ বিশের চোখে বিস্ময়। ‘কীর্তন কোথায়?’
চারদিকে এই এক ধ্যাষ্টামো শুরু হয়েছে,’ গোবিন্দ অধিকারী হতাশ কণ্ঠে বলল। ‘হিন্দি সিনেমার গানের ভক্তিগীতি! আজকাল এই চলছে। আমাদের কীর্তনের সব্বোনাশ করে ছাড়ল এরা।’
“ভগবতী জাগরণ,’ বিশে ড্রাইভার বলল। ‘কলকাতায় আজকাল খুব হিট। হিন্দি সিনেমার ঝিনচ্যাক গানে দেবতার নাম বসিয়ে এইসব গান গাওয়া হয়। মিউজিক একদম এক, শুধু লাইন বদলে এরা ভক্তিগীতি করে গায়। ছেলে ছোকরারা যে তালি মারছে সেগুলো কিন্তু হিন্দি ফিল্মের গানের জন্যই।’
“থাম তুই, হতভাগা,’ বিশেকে ধমকে অধিকারী থমথমে মুখে নাটমন্দিরের দিকে এগিয়ে গেল। নাকে রসকলি, চন্দন চর্চিত কপাল, গেরুয়া বসন পরা কয়েকজন কীর্তনীয়া খোল, করতাল, হারমোনিয়াম নিয়ে নাটমন্দিরের বাইরের চাতালে বসেছিল, অধিকারীকে দেখে সকলে এগিয়ে এল।
‘গোপাল ঠাকুর, তোমরা এখানে বসে? কীর্তন গাইছ না কেন?’ গোবিন্দ অধিকারী অবাক।
‘পোলাপানগুলার কাণ্ডটা দ্যাখস,’ বৃদ্ধ গোপাল ঠাকুর বলল। ‘ছি ছি! লজ্জায় মাথা কাটা যায়। হিন্দি গান চলতাসে।’
“মদন কোথায়?” অধিকারী বলল।
‘ও ছোঁড়ার রক্ত গরম, কীর্তনে কি আর তার মনস্তুষ্টি হয়? বলে - যাই, বডি দুলিয়ে আসি।’
‘শিবু, কান ধরে হারামজাদাটাকে হিড়হিড় করে টেনে নিয়ে আয়,’ গোবিন্দ অধিকারীর মাথায় যেন দপ করে রাগ চড়ে গেল।
‘কত্তামশাই আগে টাকা-পয়সাটা এদের সঙ্গে মিটিয়ে নিলে হত না?’ পাশের
এক কীর্তনীয়া বুদ্ধি দিল। ‘এদের মতিগতি কিন্তু আমার ভাল ঠেকছে না।’ ‘ঠিক বলেছিস, শিশির,’ কথাটা গোবিন্দ অধিকারীর মনে ধরল। ‘শিবু, মুনশিজীকে বল গিয়ে আমরা বাইরে অপেক্ষা করছি।’
শিবু ভিতরে গেল, তারপর একটা টলটলায়মান পিপার আকৃতির গুঁফো তৈলচিক্কণ মানুষকে ধরে ধরে নিয়ে এল। মুখটা দেখে মনে হল যেন দুর্গা ঠাকুরের অসুরটাকে কাঠামো থেকে খুলে নিয়ে এসেছে। চোখ ঢুলুঢুলু, মুখে মদের গন্ধ। মুনশি এসেই চোটপাট করতে লাগল “টোটালি ব্যাকডেটেড! অধিকারী মশাই, এই বস্তাপচা মাল আর কত বছর চালাবেন?”
‘লীলাকীর্তন যুগ যুগ ধরে এরকমই -‘
‘লীলাকেত্তন? এটারেই বলে ছুঁচোর কেত্তন,’ মুনশি টলছে। ‘ভাগ্যিস আমার ছেলের বুদ্ধিতে ভগবতী জাগরণের ব্যবস্থা করে রেখেছিলাম। আপনাদের ওই মসকুইটো পিনপিন “কিচনো-কিচনো” শুনিয়ে আজকালকার ছেলে ছোকরাদের বসিয়ে রাখা যায়? এনাফ! এবার আপনারা আসুন, মুনশি দু‘হাত কপালে ঠেকাল।
‘আমাদের পেমেন্টটা-
‘পেমেন্ট!’ মুনশি খিঁচিয়ে উঠল। ‘লজ্জা করে না বলতে আপনার? এই চিমসে ঘাটের মড়াগুলোকে অন্তর্জলির খাটিয়া থেকে উঠিয়ে নিয়ে এসেছেন, একটা লেডিজ সিংগার নেই, পয়সা চাইছেন?’ মুনশি টলতে টলতে নেশার চোটে হেঁচকি তুলল। ‘মিউজিয়ামে আপনার খোল-কত্তালগুলো দিয়ে আসুন। কীর্তন ইজ ডেড। হিস্ট্রি। ভিতরে এসে দেখুন ক্যাসিও বাজছে। কী ঝিনচ্যাক আওয়াজ মাইরি, প্যাণ্ডেলের ভিতরে গেলে আপনারও পাছা দুলে উঠবে।’
‘এটা ঠিক না মুনশিজী, গোবিন্দ অধিকারী বলল। ‘বড়কর্তা এসেছেন? ওনার সঙ্গে কথা বলতে পারি?”
‘বড়কর্তা!’ মুনশি অবাক গলায় বলল। ‘বড়কর্তা এখন ইলেকশন নিয়ে ব্যস্ত। ওনার সময় আছে আপনার কীর্তন শুনে সময় নষ্ট করার? এখন দিনকাল সব পালটে গেছে, অধিকারী মশাই। ওনার ছেলেরাও প্রোমোটারিতে ভেরি বিজি। ওদের পছন্দের দিকে খেয়াল না রাখলে ওরা আর কক্ষনো এই অজ পাড়াগাঁতে আসবে? পুজো-আচ্ছায় আসে বলে তাও বাড়িটার মেরামতের জন্য খরচাপত্তর দেয়।’
‘আমাদের এতজন কীর্তনীয়া কাল রাতে থেকে ‘আপনার কেত্তন কোম্পানি কাল রাতে এক ঘন্টাও গায় নি,’ মুনশি কথার মাঝে কথা বলল। ‘তাও ওদের আজ সকালে পাউরুটি-চা-গরম জিলিপি, কাল রাতে মায়ের খিচুড়ি ভোগ খাইয়েছি। পুরোনো রিলেশন বলে কথা। জিজ্ঞেস করুন ওদের, খাতির করেছি কিনা?’ মুনশি শিবু ছোকরাটার দিকে সাক্ষী মানার জন্য তাকাল। ‘আর আপনার ওই হিরো, ঐ যে শির-গায়েনটা, কী যেন নাম, ভুলে গেছি। ওকেও এই ভগবতী জাগরনের দলে ঢোকাবার জন্য ছোটকর্তার সামনে আজ সকালে এই নাটমন্দিরেই একটা অডিশন দেওয়ালাম। কলকাতায় যাবে, স্টেজে গাইবে, অন্ততঃ ওর তো একটা হিল্লে হল। ট্যালেন্ট এই গাঁয়ে চাপা থাকবে এটা আমি চাই না।’
গোবিন্দ অধিকারী এবার হাতজোড় করে বলল, ‘মুনশিজী, এই কীর্তন গেয়েই এতগুলো মানুষের পেট চলে। এত পাওনাদার। এদের মায়না, টেম্পোভ্যানের ইনস্টলমেন্ট - আপনার সঙ্গে কথা হয়েছিল-‘
‘কথা হয়েছিল মানে?” নেশার ঘোরে মুনশি চেঁচিয়ে উঠল। আমি কথার খেলাপ করছি? আমি মিথ্যুক?”
“না না তা কেন?” গোবিন্দ অধিকারী নরম স্বরে বলল। ‘আজকাল কীর্তনের অর্ডারই নেই। আপনারা দু-একজনই আমাদের ভরসা। না হলে তো কীৰ্তন কোম্পানি উঠিয়েই দিতে হবে।’
‘উঠিয়ে দিতে হবে তো উঠিয়ে দিন,’ মুনশি আবার চেঁচিয়ে বলল। ‘আমাকে বলছেন কেন? ছেলেপুলে কীর্তন শুনতে চায় না, সেটা কি আমার দোষ? কেত্তন এখন পরলোক গমন করেছে আর আপনি সেই মড়া আগলে বসে আছেন। মড়া আগলিয়ে বসে থাকতে নেই অধিকারী মশাই, মড়াকে দাহ করতে হয়।’
- চেঁচামেচি শুনে ধীরে ধীরে ভিড় জমা হতে লাগল। একটা ষণ্ডা ছেলে গলায় সোনার চেন দুলিয়ে প্যাণ্ডেল থেকে বেরিয়ে এসে বলল ‘মুনশিকাকা, কী হয়েছে? কে বাওয়াল করছে এখানে? একটু পিসফুলি শুনতেও দেবে না?” পদাবলী বুঝল এই ছেলেরও পেটে অনেকটাই অরিষ্ট গেছে। তারপর গোবিন্দ অধিকারীকে দেখে ছেলেটা অনুযোগের স্বরে বলল, ‘এই যে কীর্তনদাদু, আপনাদের কীর্তনের কি রিটায়ারমেন্ট এজ নেই?”
“মানে?” গোবিন্দ অধিকারী বলল।
‘কীর্তন শুনতে বসলেই দেখি খোল কত্তাল নিয়ে একদল অ্যানিমিক সিনিয়ার সিটিজেন ফোঁকলা দাঁতে কিচনো-কিচনো করে চিল্লাচ্ছে। আর আমরা তাদের পিছনে চ্যারিটি করে যাচ্ছি। এন্টারটেনমেন্ট ভ্যালু জিরো।’
হঠাৎ যেন গোবিন্দ অধিকারীর শরীর থেকে দাস্যভাব ঝরে পড়ে গেল। গোবিন্দ অধিকারী শান্ত ভাবে বলল, ‘কীর্তন ভক্তির জন্য গাওয়া হয়, আপনাদের এনটারটেনমেন্টের জন্য না। আপনি নেশা করে আছেন, তাই আমার কথা বুঝতে পারবেন না। আমার টাকা দিয়ে দিন, আমি চলে যাচ্ছি।’
‘বাপের জমিদারি পেয়েছ?’ যণ্ডা ছেলেটা আপনি থেকে তুমিতে নেমে এল। ‘টাকা কি মাগনা নাকি? কেটে পড়ো তো এখান থেকে, ভালয় ভালয় বলছি।’ ‘আমার পাওনা টাকা মিটিয়ে দিন আগে,’ গোবিন্দ অধিকারী দৃঢ়কণ্ঠে বলল ৷ ‘পাওনা টাকা! ফোট এখান থেকে!”
‘আমার পাওনা টাকা মারছ কেন? এই তোমাদের বাপ-ঠাকুদ্দার শিক্ষা?”
‘কী বললি?” ছেলেটা অগ্নিদৃষ্টিতে তাকাল। ‘পাওনা! দাঁড়া, তোর পাওনা এক্ষুনি মিটিয়ে দিচ্ছি,’ ছেলেটা নিচু হয়ে প্যাণ্ডেলের পাশে পড়ে থাকা একটা মরচে ধরা লোহার পাইপ তুলে টেম্পোভ্যানের উইওশিন্ডে মারল ছুঁড়ে। সামনের কাচ ঝনঝন করে ভেঙে পড়ল। শালা বাপ তুলছে! এতবড় স্পর্ধা!”
গোবিন্দ অধিকারীর কাতর মুখ দেখে পদাবলীর মনে হল যেন কাচের টুকরোগুলো অধিকারীর বুকের ভিতর গিয়ে বিধল। যন্ত্রণায় ওর মুখ কাঁদোকাঁদো। চূড়ান্ত হতাশায়, রাগে গোবিন্দ অধিকারী বড়কর্তার ছেলের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল – ‘হারামজাদা!’ তারপর সপাটে এক চড় মারল।
ষণ্ডা ছেলেটা চারদিকে তাকাল, পাণ্ডেল থেকে লোকজন বাগানে বেরিয়ে এসেছে। ছোটখাটো ভিড় জমে গেছে। তাদের সামনে চড় খাওয়া মানে মানইজ্জত ধূলিসাৎ। ছেলেটা গোবিন্দ অধিকারীকে জোর এক ধাক্কা দিল, গোবিন্দ মাটিতে ছিটকে পড়ল, ওর চশমা উড়ে গিয়ে আছড়ে পড়ল ঘাসজমিতে। ছেলেটা এবার প্রতিহিংসার তাড়নায় গোপাল ঠাকুরের দিকে ছুটে গিয়ে ওর অতি পুরোনো রঙচটা হারমোনিয়ামটা তুলে মাটিতে আছাড় মারল, তারপর করতালটা শিবু দোহারের গলা থেকে টেনে আকাশের দিকে ছুঁড়ে মারল, শিবু দোহার তাকিয়ে দেখল করতালটা ঘোড়ানিমের আগডালে লটকে দুলতে লাগল। ষণ্ডা ছেলেটার মাথায় যেন খুন চেপে গেছে – আমাকে চড় মেরেছিস! তোর এত বড় সাহস? বায়েনের ঢোলটা মাটিতে ফেলে পকেট থেকে একটা ভাঁজ করা ছুরি বের করে তার বাঁয়ার চামড়ার ওপর আমূল বিধিয়ে খ্যাস খ্যাস করে টেনে দিল। অসহায় গোবিন্দ অধিকারী উঠে দাঁড়াতেই ছেলেটা গোবিন্দ অধিকারীর দিকে চাকু উঁচিয়ে ছুটে গেল – “তোকে আজ মার্ডার করে ফেলব’ -
পদাবলীর মনে হল ছেলেটা এত নেশা করেছে যে ওর এখন মাথার ঠিক নেই, খুন-টুন করেও বসতে পারে। গোবিন্দ অধিকারীর মুখ ভয়ে শুকিয়ে গেছে। পদাবলী ছুটে এগিয়ে গেল গোবিন্দ অধিকারীর দিকে। গোবিন্দ অধিকারীকে আড়াল করে দু‘হাত মেলে দাঁড়িয়ে ধমক লাগাল, ‘এটা কী বেয়াদপি হচ্ছে?”
‘এটা কোন হরিদাস পাল রে?’ বড়কর্তার ছেলে মুখ বেঁকিয়ে হাওয়ায় প্রশ্ন ছুঁড়ে দিল। ‘ক্যালকাটা-ক্যালকাটা লাগছে!’ তারপর গোবিন্দ অধিকারীর দিকে তাকিয়ে বলল, “শালা, আমার কম্পাউণ্ডে ঢুকে আমাকেই চোখ রাঙাচ্ছে !”
‘নিজের কম্পাউণ্ডে মাতলামো করে লোককে পেটাচ্ছ, তার প্রতিবাদ করলে দোষ!’ পদাবলী প্রতিবাদ করল। ‘সব ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।’
‘ক্ষতিপূরণ!’ ষণ্ডা ছেলেটা আর ধৈর্য ধরতে পারল না। পদাবলীর জিনসের জ্যাকেটের কলার ধরে হিড় হিড় করে টেনে পদাবলীর মুখ ওর নিজের মুখের কাছে আনল। ‘মেরে থোবড়া এমন বেঁকিয়ে দেব যে আর আয়নায় নিজেকে চিনতে পারবি না। হারামি, মনু সেনের সঙ্গে পাঙ্গা নিতে এসেছিস?”
পদাবলীর মাথায় দপ করে ঠাম্মার বলা সেই রুদ্রভাব ভর করল। পদাবলী এক ঝটকায় জ্যাকেট ছাড়িয়ে আনতে গিয়ে যণ্ডা ছেলেটার আঙুল মুচড়ে দিয়ে চিবিয়ে চিবিয়ে বলল, তোমায় আমি পুলিশে দেব।’
- পুলিশের নিকুচি করেছে,’ মনু সেন পদাবলীর নাকে এক ঘুষি মারল। যন্ত্রণায় পদাবলী চোখে অন্ধকার দেখল। নাক চেপে ধরল পদাবলী। নাক দিয়ে রক্ত বেরোচ্ছে। লোকটার গায়ে অসুরের মত শক্তি। মনু সেন এক হ্যাঁচকা টানে পদাবলীকে মাটিতে আছাড় মারল। তাতেও ওর রাগ গেল না, কোমরের পিছন থেকে একটা রিভলভার বের করল ‘মায়ের পোগ্রাম হচ্ছে, না হলে শালা এই স্পটেই তোর জিভ ফুটো করে দিতাম। পুলিশ মারাচ্ছ? পুলিশ আমি আমার মানিব্যাগের ভিতরে রাখি। আর একটা কথা বললে, মা কসম, তোর লাশ যাবে এখান থেকে।’ মনু সেন রিভলভারটা কোমরে গুঁজল। গোবিন্দ অধিকারীর দিকে তর্জনী তুলে চিৎকার করে বলল, ‘কীর্তন! শালা, কীর্তন মারাচ্ছ? কীর্তন তোমার পিছনে ঢোকাবো। এই নাটমন্দিরে প্রতিজ্ঞা করছি, তোমার করতালতলী থেকে কীর্তন আমি চিরকালের জন্য মুছে দেব। না দিলে আমার নাম মনু সেন না।’
দু‘জন হোমগার্ড দৌড়ে এল। পদাবলী এক হাতে নাক চেপে উঠে দাঁড়াল। রক্তে হাতের তালু ভিজে গেছে। একজন হোমগার্ড বলল – ‘ভাই, এখান থেকে চলে যান।’ তারপর বিশে ড্রাইভারকে নিচুস্বরে বলল, ‘এদের সরিয়ে নিয়ে যাও। এখানে ওরা সব মাল টেনে আছে। এরাই এখানকার পার্টির লিডার। পুলিশ কিছু করতে পারবে না।’ -
পদাবলীর চোয়াল রাগে দৃঢ় হয়ে উঠল। শিশির কীর্তনীয়া তাড়াতাড়ি ওকে সরিয়ে ভ্যানে ঢুকিয়ে দিল, না হলে ব্যাপারটা কত দূর গড়াতো কে জানে? কিছুক্ষণ পর কর্তা বুড়ো গোবিন্দ অধিকারী টেম্পোভ্যানে ঢুকল, মুখ থমথমে। দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বিষণ্ণ কণ্ঠে বলল, ‘আর না, অনেক কীর্তন হয়েছে। কীর্তনের দল আমি ভেঙে দেব।’
ভ্যানের সামনের কাচ ভেঙে গুঁড়োগুঁড়ো হয়ে সামনের সিটে, মেঝেতে ছড়িয়ে গেছিল। তাড়াতাড়ি সিট ঝেড়ে বিশে ড্রাইভার ভ্যান স্টার্ট দিয়ে ভ্যান বাইরের রাস্তায় নিয়ে এল। সকালে ভ্যান খালি ছিল, এখন গাদাগাদি করে বসতে হয়েছে। পিছনের লম্বা বেঞ্চের মত সিটে ভাঙা হারমোনিয়াম, ধর্ষিত খোল মাঝে রেখে দু‘পাশে বসে শির বায়েন নবীন, আর শিশির কীর্তনীয়া। পিছনের সিটে বসে কান দোহার শিবু। কিছুটা চালিয়ে রেল-লাইনের সামনে এসে টেম্পোভ্যান দাঁড়িয়ে গেল।
‘দাঁড় করালি কেন?’ বলে সামনের দিকে তাকিয়ে গোবিন্দ অধিকারী বুঝতে পারল। বিড়বিড় করে গালাগালি দিল, “হারামজাদাগুলো আর ক্রসিংয়ের ডাণ্ডা নামানোর সময় পেল না। এখন কখন রেলগাড়ি আসবে কে জানে?”
ভ্যানের সামনের ঝুরো কাচ খুলে খুলে আসছে। বিশে ড্রাইভার ভ্যানের পিছনের সিটের নিচ থেকে একটা শাবল বের করে জানলার কাচে ধীরে ধীরে টোকা দিয়ে দিয়ে ঝুলে থাকা কাচগুলো নিচে ফেলল। তারপর একটা তেল চিটচিটে বড় কাপড় হাতে জড়িয়ে কাচগুলো ঠেলে ঠেলে এক জায়গায় জড়ো করল। সামনের ভাঙা জানলা দিয়ে শেষ আশ্বিনের ঠাণ্ডা হাওয়া আসছে। শিবু গলা থেকে মাফলার খুলে তাকাল অধিকারীর দিকে। ‘কত্তামশাই, মাফলারটা মাথায় জড়িয়ে ন্যান, ঠাণ্ডা লাগলে আপনার শ্লেষ্মা বেড়ে যাবে।’
অধিকারী কোনও উত্তর দিল না, অন্যমনস্ক হাতের আঙুলগুলো হাঁটুতে দ্রুতলয়ে যেন আপত্তনের জমাটের বোল বাজিয়ে চলেছে – জাঝিনাঝি নাগজাজা ঝেইয়া জাঝেই। মনে হচ্ছে জমিদারপুত্রের প্রতিজ্ঞা তার মনে উদ্বেগ আর ক্রোধের যুগলবন্দী চালাচ্ছে। কীভাবে আর্থিক অনটন সামাল দেওয়া যায় গোবিন্দ অধিকারী এখন তাই ভাবছে, আর তার আঙুলের বোলের নাচনে তার দুশ্চিন্তা প্রতিফলিত হচ্ছে।
পদাবলী নাক থেকে হাত সরাল। এখানেই নেমে যাওয়া যাক। ফিরে যেতে হবে। করতালতলীর বিজয়ার প্রীতি শুভেচ্ছা ভালই পেল। পদাবলী অধিকারীর কাছে মুখ এগিয়ে নিয়ে বলল, ‘আজ তাহলে আমি আসি, ট্রেন পেয়ে যাব।’ ‘এটা কলকাতা থেকে আসছে। তোমার নাক দিয়ে এখনো রক্ত বেরোচ্ছে,’ অধিকারী বলল। ‘আমার বাড়ি চল, তুলসীপাতা বাটা রস একটা তুলো দিয়ে নাকে চেপে দিতে হবে।’
‘আপনার বাড়ি?” পদাবলীর মনটা আনন্দে নেচে উঠল।
দামাল ট্রেনটা লেভেল ক্রসিং কাঁপিয়ে দুর্বার গতিতে ছুটে চলে গেল। গোবিন্দ অধিকারী ঠিকই বলেছে ওটা কলকাতার দিক থেকেই এসেছে। বিশে টেম্পোভ্যানের সিটের নিচে শাবলটা ঢুকিয়ে রেখে আবার ভ্যান স্টার্ট করল। পদাবলী তৃপ্তিতে চোখ বুজল। মনে মনে জমিদারের কুলাঙ্গার পুত্রটাকে ধন্যবাদ দিল। ঠাম্মা হলে বলত ওই মারপিটের মধ্যে ঈশ্বরের কোনও মহান ইচ্ছা প্রকাশিত। আর মনে হচ্ছে প্রথম হার্ডলটা বোধহয় ও পেরিয়ে গেছে। পদাবলীর বুক দুরুদুরু করছে উত্তেজনায়। ছিদাম বায়েনের দর্শন হবে কি?
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন