আট

প্রীতম বসু

দামিনী দাম             দমন রুচি দরশনে

দূরে গেও দরপকি দাপ

শোণ কুসুম তাহে       কোন গণিয়েরে

প্রাতর অরুণ সন্তাপ

পদাবলী চোখ বুজে ছোটবেলায় চলে গেল। ঠাম্মা এভাবেই গাইত। ঠাম্মার পাশে বসে পদাবলীও ঠাম্মার দেখাদেখি চোখ বুজত, কিন্তু কিছুক্ষণ পর চোখ পিটপিট করে তাকাত। এক একদিন দেখত ঠাম্মার চোখের কোনা দিয়ে একটা ক্ষীণধারা নিম্নগামী। আজ ছিদাম বায়েন ইজিচেয়ারে। পায়ের কাছে মেঝেতে গোপাল ঠাকুর। মন দিয়ে গাইল আজ পদাবলী, মাঝে একবার চোখ খুলে দেখল ছিদাম বায়েন চোখ বন্ধ করে শুনছে, ওর হাতের আঙ্গুলগুলো হালকাভাবে হাওয়ায় নাচছে আর ওষ্ঠ মৃদু মৃদু কাঁপছে। কাল নাইট্রোজেন বলেছিল বড় দশকোশী - ঝাখি ঝাখি ঝাখি ঝা ঝাখি ঝাখি ঝাখি ঝাগুরু - পদাবলী বুঝল ছিদাম বায়েন বিড়বিড় করে বড় দশকোশী আওড়াচ্ছে আর আঙুলের কাঁপনে হাওয়ায় বাজছে বড় দশকোশীর ঠেকা। -

গান শেষ হলে ছিদাম বায়েন চোখ খুলল - ‘তোমার গলা খুব পরিষ্কার, কিন্তু চিত্ত ভরল না। তোমার মনে ভক্তিরসের ভেজা ভাবটা নেই। মনে হচ্ছে শুকনো বালির ওপর দিয়ে নদী পার হচ্ছি, পা ভিজছে না, পায়ে বালি কটকট করে লাগছে। আগেরটা তাও ভাল ছিল, বরং তুমি অরুণিত চরণেটা আজ আরেকবার গাও।’ তারপর গোপাল ঠাকুরকে বলল ‘গোপাল, তুই ঠেকা দে ৷ ‘ -

গোপাল ঠাকুর খোল টেনে বাঁয়া-ডাইনার আলাতলা-চুনাতলাতে কয়েকটা চাঁটি মেরে ঘাড় নাড়িয়ে বডি ল্যাংগুয়েজে জানাল সে তৈরি। ছিদাম বায়েন পদাবলীকে বলল, ‘গোবিন্দ, তোমার সঙ্গে আখর দেবে কেমন?”

ঢোঁক গিলল পদাবলী, আখর আবার কী? কিন্তু এখন ওসব নিয়ে ভাবার অবকাশ নেই, শুধু সাহস করে এগিয়ে যাওয়া। পদাবলী চোখ বুজে আবার শুরু করল, কিন্তু ভেসে এল গোবিন্দ অধিকারীর ভাঙা সুরেলা গলা – ‘আমার শ্যামের অরু-উ-উ’ পদাবলী চুপ করে গেল। এবার গোবিন্দ অধিকারী ইশারায় পদাবলীকে বলল শুরু করতে। পদাবলী ঠাম্মার মত অ-রু-উ-উ করে লম্বা টান টানল, তারপর অনেকক্ষণ ধরে চ-র-অ-অ-ণে গাইল। দ্বিতীয়বার গাইবার আগে গোবিন্দ অধিকারী “আমার শ্যাম বিনোদিয়া” বলে সুরেলা গলায় শব্দ ঢেলে দিল। এই শ্যাম বিনোদিয়া এসব বলে ঠাম্মা গাইত না, কিন্তু পদাবলী এবার একটু বুঝে গেছে। গোবিন্দ ঠাকুরের শ্যাম বিনোদিয়া শেষ হতেই ও আবার অ-রু-উ-উ করে লম্বা টান টানল, এভাবে অরুণিত চরণে রণিত মণিমঞ্জির শেষ হতে ছিদাম বায়েন বলল, ‘গোবিন্দ, উত্তরাধটা তুই-ই শেষ কর।’ এবার গোবিন্দ অধিকারী পাশে বসা গোপাল ঠাকুরকে নিচু গলায় বলল, ‘কাটান দিও, ঠাকুর, ‘ তারপর হাত নাড়িয়ে সুরেলা গলায় বলল .‘শ্যামের কিবা সে চলনের ভঙ্গি কিয়ে আধো’ – তারপর টেনে টেনে গাইতে লাগল – আধো-ও আধো-ও পদ চঅ-লনির-অ-সা-আ-আ-ল। পাশে গোপাল ঠাকুর মৃদঙ্গে। ছিদাম বায়েনের দু‘চোখ বন্ধ। ঠোঁট যেন বীজমন্ত্র জপছে - ঝা তাখি নেতা খেতা তা। -

কীর্তন শেষ হলে ছিদাম বায়েন চোখ খুলল। তারপর পদাবলীকে বলল, *এদের গলায় তোমার মত সুর নেই, কিন্তু ভক্তিরসে ভেজা।’

পদাবলী মৌন রইল। ঠাম্মারও গলায় ভক্তি ছিল। ওর নেই তো কী আর করা যায়।

“প্রাণনাথ কীর্তনীয়ারও প্রথমে ভক্তির অভাব ছিল। তারপর -

পদাবলীর মনে হল এই সুযোগ হাতছাড়া করা ঠিক হবে না। এখনই প্রাণনাথ কীর্তনীয়ার কথাটা পাড়লে অনেক কিছু জানা যাবে। কিন্তু ছিদাম বায়েনের দুচোখে ক্লান্তির ছাপ। গোবিন্দ অধিকারীরও অনুরোধ আছে। এখন একে অত কথা বলানো অমানবিক কাজ হবে।

“কাল যে ফটোগুলো দেখিয়েছিলে, সেগুলো ভালভাবে দেখলাম আজ দিনের আলোয়,’ ছিদাম বায়েন একটা খামে ফটোগুলো ঢুকিয়ে রেখেছে। ‘এই নাও। চোখে ছানি পড়েছে, কী দেখতে কী দেখি। নাঃ। আমি দেখলাম আমার দেখায় ভুল ছিল। ইনি অন্য মহিলা। তোমার ঠাকুমাকে আমি চিনি না। শরীরটা ভাল না। আজ এসো। গোবিন্দ, তুই ওকে স্টেশনে ছেড়ে আয়।’

এরপর আর কোনও কথা হয় না। ছিদাম বায়েনকে প্রণাম করে পদাবলী বিষণ্ণ চিত্তে বেরিয়ে এল। কিন্তু মনের সন্দেহ আরও গাঢ়। পরিচয় অস্বীকার করার সময় ছিদাম বায়েনের গলাটা কেঁপে উঠল কি? নাকি ওর শোনার ভুল? গোবিন্দ অধিকারী বাড়ির দরজা পর্যন্ত এল। পদাবলী বলল, ‘আপনাকে কষ্ট

করে আসতে হবে না স্টেশন পর্যন্ত। আমি চলে যেতে পারব।’

‘ঠিক আছে,’ গোবিন্দ অধিকারী খুশিই হল। হঠাৎ ওর মুখে উৎকণ্ঠা জেগে উঠল। শব্দটা কানে গেছে পদাবলীরও। ও পিছন ফিরে তাকাল। তিনটে মোটর সাইকেল ডহরের পাশের ঘেঁসের রাস্তা দিয়ে ধুলো উড়িয়ে এদিকে আসছে।

‘এদিকে মোটর সাইকেল?” পদাবলী বিস্মিত।

গোবিন্দ অধিকারী মোটর সাইকেল আরোহীদের দিকে ভুরু কুঁচকে তাকিয়ে রইল। মোটর সাইকেলগুলো নীলমাধবের মন্দিরের কাছাকাছি গিয়ে থামল। মোটর সাইকেল থেকে নামল পাঁচজন আরোহী। দু‘জনকে দূর থেকেই চিনতে পারল পদাবলী – মনু সেন আর তার পিছনে অতি কষ্টেসৃষ্টে বসেছে পিপে আকৃতির মুনশি।

‘এদের মতলব ভাল না,’ গোবিন্দ অধিকারী হনহন করে হাঁটা লাগাল মন্দিরের দিকে। পদাবলীও গোবিন্দ অধিকারীর সঙ্গে সঙ্গে চলল।

মোটর সাইকেলের বাকি তিনজনকে দেখলেই মনে হয় সমাজবিরোধী কাজ কারবার করে। ওদের একজন একটা ক্যামেরা বের করে খিচিক্ খিচিক্‌ করে মন্দিরের এপাশ ওপাশে ছবি তুলে যাচ্ছে।

‘এখানে কী হচ্ছেটা কী?’ গোবিন্দ অধিকারী প্রায় ছুটতে ছুটতে এসে পৌঁছাল।

‘ভাঙা ছাতটার ফটো নে, হুলো, মনু সেন প্রশ্নটা কানেই নিল না।

গোবিন্দ অধিকারী এবার মুনশির কাছে গিয়ে বলল, ‘মুনশিজী অন্যের জমিতে এভাবে প্রবেশ করে ফটো তোলা এটা কী ধরণের অসভ্যতা হচ্ছে? এসব কেন করছেন?’

‘মুনশিকাকা,’ মনু সেন তর্জনী নাড়াল। ‘আপনাকে কোনও উত্তর দিতে হবে না।’ তারপর

ফটোগ্রাফারকে তাড়া লাগাল মনু সেন “তোর হয়েছে?” ‘দেওয়ালের ছবিগুলো একবার নিয়ে নিই,’ ফটোগ্রাফার হুলো বলল। হুলো এবার গোবিন্দ অধিকারীর কাছে এসে বলল, ‘মন্দিরটা একবার খুলে

দিন তো দাদু। ভিতরের কণ্ডিশনটা কেমন তার কয়েকটা ছবি তুলে নিই।’ ‘কী করতে চান আপনারা?’ গোবিন্দ অধিকারী রাগে ফেটে পড়ল। প্রৌঢ়দের অনেকে দাদু সম্বোধন পছন্দ করে না।

* আরেকজন একটু ওস্তাদি মেরে কাঁটা ঝোপের মধ্যে দিয়ে ব্যালেন্স করে করে মন্দিরের সিঁড়িতে পৌছাল আর প্রায় সঙ্গে সঙ্গে পড়িমরি করে ছুটে ফিরে এল – ‘সাপ-সাপ-য়্যাব্বড় কেউটে।’

‘কেউটে না গোখরো, গোবিন্দ অধিকারী বলল। ‘পদ্মগোখরো। মন্দিরের ভিতরেই ওদের বাসা। কাগজে পড়েন নি, নীলমাধবের বিগ্রহ চুরি করতে এসে একটা চোর সাপের কামড়ে নিজেই নীল হয়ে গেল? সেটা আমাদের এই মন্দিরেই তো ঘটেছিল। মন্দির খুলে দিই তাহলে, ভিতরে যাবেন?”

“না না থাক তবে,’ হুলো বলল।

মনু সেন গোবিন্দ অধিকারীর কাছে এসে পদাবলীর দিকে অবহেলাভরে তর্জনী দেখিয়ে বলল, ‘এই জটায়ুটা আপনার ফুল-টাইম অ্যাসিস্ট্যান্ট বুঝি? মায়ের প্যাণ্ডেলে যখন প্রমিস করেছি করতালতলীতে কীর্তন আর থাকবে না তখন থাকবে না।’ মনু সেন মোটরবাইকের প্যাডেলে চাপ দিল।

তিনটে বাইক ধুলো উড়িয়ে ভটভট করতে করতে দূরে চলে গেল। গোবিন্দ অধিকারী একটা বড় শ্বাস নিয়ে বলল, ‘ওদের আস্পর্ধা দেখে আমি অবাক হয়ে যাচ্ছি। দেশে আইন কানুন কিছু নেই? কিন্তু ওরা এখানে দলবল নিয়ে এল কেন? যাক্ গে, তোমার ট্রেনের সময় হয়ে যাচ্ছে। চল আমি তোমায় স্টেশনে ছেড়ে আসি।’

‘না না। আমি চলে যাব। আপনাকে কষ্ট করে আসতে হবে না।’

*এরা খুন-খারাবি পর্যন্ত করতে পারে। তোমায় আমি একা ছাড়ব না।’

‘ঠিক আছে, চলুন তাহলে,’ পদাবলী বলল।

- “কেন দু‘জনে পথ চলতে লাগল। গোবিন্দ অধিকারী কিছুক্ষণ একদম চুপ। লোকটার জন্য কষ্ট হচ্ছিল পদাবলীর। অন্যায় অত্যাচারের শিকার। লোকটা বেশ ভয় পেয়ে গেছে। পদাবলীর দিকে চিন্তিত চোখে জিজ্ঞাসা করল বলতো ওরা মন্দিরের ফটো তুলছিল? ওদের মাথায় নিশ্চয়ই কিছু বদ মতলব আছে। কিন্তু ফটো তুলবে কেন?’ পদাবলীও ভেবে পাচ্ছিল না কারণটা। কিন্তু গোবিন্দ অধিকারীর শরীর একটু বেশি রকমই খারাপ মনে হল ওর। লোকটা টলতে টলতে হাঁটছে। ভয় হল পদাবলীর – ‘আপনি একটু বসবেন?’

‘একটু জিরিয়ে নিই। মাথাটা একটু ঘুরে উঠল,’ গোবিন্দ অধিকারী রাজি হল। ডহরের পাড়ে দু‘জনে কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে রইল। এক ঝাঁক হলদে খঞ্জন দূরের জলা থেকে আকাশে উড়ে গেল, জলে গোপনে আসা ঘড়িয়ালের উপস্থিতি টের পেয়েছে বোধহয়। ঘড়িয়াল শিকারের পিছনে পিছনে এসে কলার খোলের মত মাঝে মাঝে ভেসে উঠে আবার ডুবে যায়। কিন্তু পাখিগুলো ঠিক টের পায়। গোবিন্দ অধিকারী জলে নেমে গিয়ে আঁজলা ভরে জল তুলে থপ থপ করে মাথার ব্রহ্মতালু ভিজিয়ে বলল, ‘চল। এবার ঠিক লাগছে।’

‘চলুন,’ পদাবলী বুঝল এবার প্রসঙ্গ পালটানো দরকার, নতুবা লোকটা ভেবে ভেবে অসুস্থ হয়ে পড়বে। পদাবলী কথা ঘোরালো ‘সনাতন চাবিওয়ালার কাহিনী খুবই করুণ বলছিলেন।’ -

গোবিন্দ অধিকারী মাথা নাড়ল। ‘সনাতন চাবিওয়ালা ধনীদের সিন্দুকের জন্য অদ্ভুত সব তালা তৈরি করত। সে সব তালার চাবির ছিদ্রই থাকত না। যেমন যশোরের রাজবাড়িতে মহারাজের পিতামহের বিশাল ছবির ফ্রেমের পিছনে বানানো হয়েছিল এক সিন্দুক। দেওয়ালে সাঁটা ফ্রেমে বাঁধানো ছবিটাই ছিল সিন্দুকের গা। আর সেই সিন্দুকের কোনও চাবির ছিদ্র ছিল না। রাজার পিতামহের ছবির দুই চোখে একসঙ্গে দুটো সরু শলাকা দিয়ে ধাক্কা মারলে সে ছবি সামনের দিকে ঝুঁকে পড়ত, তখন তাকে মাটিতে শুইয়ে সাবধানে সিন্দুকে ঢুকতে হত।’

‘সনাতন নিজে বানিয়েছিল এই সিন্দুকের তালা?”

‘হ্যাঁ। কিন্তু লোকটার কপাল খারাপ ছিল।’

‘কেন?’

‘ডেভিড সাহেবের তালা ব্যবসার প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল বুথ সাহেব। বুথ সাহেবের এদেশের উপরমহলে প্রচুর প্রভাব সত্ত্বেও বুথ সাহেব ডেভিড সাহেবের সঙ্গে ব্যবসায় পেরে উঠছিল না। বুথ সাহেব সনাতনকে তার তালা ব্যবসায় যোগ দিতে বলে। উদ্দেশ্য ডেভিড সাহেবের তালা তৈরির গোপন কারিগরী শিখে নেওয়া। কিন্তু সনাতন ডেভিড সাহেবের ওপর আনুগত্যের জন্য সে প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে। তারপর একদিন কলকাতায় সাহেবদের টাঁকশালে তালা মেরামত করতে গেছিল সনাতন। কাজ করে বাড়ি ফিরে দেখে বাড়ির সামনে লাল পাগড়ি ইংরেজ পুলিশ। টাঁকশাল থেকে নাকি কয়েকটা সোনার বাট চুরি হয়েছে। পুলিশ সনাতনের ঘর তল্লাশি করতে চায়। সনাতন অবাক, কিন্তু আরও অবাক হল যখন ওর ঘর থেকেই পুলিশ খুঁজে পেল সেই সোনার বাটগুলো। সনাতনকে পুলিশ গ্রেপ্তার করল। রাতে কোতোয়ালিতে সনাতনের কাছে এল বুথ সাহেব। সনাতনকে বলল যে সে সনাতনকে মুক্ত করিয়ে দেবে যদি সনাতন ডেভিড সাহেবের কোম্পানি ছেড়ে তার কোম্পানিতে যোগ দেয়। সনাতন ঘৃণার সঙ্গে বুথ সাহেবের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করল।’

‘তারপর?’

‘ম্যাজিস্ট্রেটের এজলাসে তারপর একটা প্রহসন বিচার হল। বিচারে সনাতনের তিন বছর জেল হল। সনাতন চাবিওয়ালা হয়ে গেল সনাতন চোর।’ ‘তারপর?’

“জেলে প্রতি সন্ধ্যায় সনাতন মৃদঙ্গ বাজিয়ে কীর্তন গাইত। দেখতে দেখতে আরও কিছু জেলের বন্দীরা সনাতনের কীর্তন শুনতে জড়ো হত। ইংরেজ জেলার দেখল এই গান-বাজনা বন্দীদের বেশ শান্ত রাখে। বন্দীরা নিজেদের মধ্যে মারপিট করে না। তাই জেলার সনাতনের এই কীর্তনে উৎসাহ দিতে লাগল। সনাতনকে সে নানা পদাবলীর বই, পুঁথি এসব এনে এনে দিত। প্রচুর পড়াশোনা করতে করতে সনাতন একটা পুঁথি পেল। সনাতন গোস্বামীর লেখা।

পুঁথিটা পড়ে সনাতন চোর বুঝতে পারল রূপ-সনাতন গোস্বামীর অনেক সোনামোহর লুকানো আছে আমাদের করতালতলীর চৈতন্যপুখুরীর পাঁকের নিচে।’ ‘বাপরে! তারপর?’

‘সনাতন জেল থেকে ছাড়া পেয়ে এল করতালতলীতে। এখানে যুধিষ্ঠির অধিকারীর কীর্তনের আখড়া ছিল। সনাতনের মৃদঙ্গের হাত খুব মিষ্টি ছিল, সহজেই যুধিষ্ঠির অধিকারীর কীর্তনের দলে শ্রীখোল বাজাবার শিরবায়েন হয়ে গেল। ও কীর্তনের দলে বিভিন্ন আসরে মৃদঙ্গ বাজাতো, আর রোজ রাতে গোপনে চৈতন্যপুখুরীর জলায় ডুব দিয়ে দিয়ে পাঁকের ভিতরে হাত চালিয়ে ওই ধনরত্ন খুঁজে বের করার চেষ্টা করত। রোজ গভীর রাতে সকলের অজান্তে এসে পাঁক ঘাটাঘাটি করে ধনরত্ন খুঁজে পাওয়া মোটেই সহজ ব্যাপার না। কিন্তু সনাতন হাল ছাড়ল না। এভাবে এক রাতে পাক ঘাঁটতে ঘাঁটতে সনাতন খুঁজে পেল নীলমাধবের সেই অনিন্দ্যসুন্দর মূর্তি যা নীলকর সাহেবদের ভয়ে পুরোহিত পাঁকে গুঁজে রেখেছিল। আর তার পায়ের কাছেই পড়ে ছিল কলসের মধ্যে অজিন-চামড়ার থলেতে রূপ-সনাতনের ধনরত্ন।’

“ইন্টারেস্টিং!” পদাবলীর আগ্রহ বেড়ে গেল।

‘প্রভুর মূর্তিতে কী জাদু ছিল কে জানে? সনাতন সেই মূর্তি ধুয়ে পাঁক পরিষ্কার করে বাড়ি এসে সারারাত প্রভুর মূর্তির পুজো করে কাঁদতে লাগল। সকালবেলা সনাতন যুধিষ্ঠির অধিকারীর হাতে মহাপ্রভুর মূর্তি আর রূপসনাতনের ধনরত্ন সঁপে বলল ও সরকারী তহবিলে এই ধনরত্ন জমা করবে।’ “তাই করল?”

“ও তাই করত, কিন্তু যুধিষ্ঠির অধিকারী বলল, ইংরেজরা এসব রূপ-সনাতন গোস্বামীর পুঁথির কথা বিশ্বাস করবে না। ওদের চোখে সনাতন জেল খাটা চোর। ইংরেজরা সন্দেহ করবে যে সনাতন এই ধনরত্ন চুরি করেছে। ওকে হয়তো আবার জেলে পুরে দিতে পারে। থলের মধ্যে সুলতানী মোহর। যুধিষ্ঠির অধিকারী বলল যে সনাতন গোস্বামী চেয়েছিলেন এই অর্থ বাংলার বিভিন্ন মন্দির সংস্কারের কাজে ব্যয় করতে। আমরা বরং এই অর্থ দিয়ে এই মন্দির আবার বানাই আর সেখানে এই নীলমাধবের মূর্তির পুনপ্রতিষ্ঠা করি। সনাতন রাজি হল, জমিদারের ধনরত্নের একাংশ শহরে গিয়ে কলকাতার মোতি বাঈজীকে বেচে দিয়ে সেই টাকায় আবার শ্রীকৃষ্ণের মন্দির বানানো হল।’

“বাকি ধনরত্ন?”

‘বাকি ধনরত্ন সনাতন এখানে কোথাও লোকচক্ষুর অন্তরালে রেখেছিল। তার হদিশ পাওয়া যায় নি। যাই হোক সেই মন্দির তৈরি হল। নীলকরদের স্থানে তৈরি মন্দিরের নাম হয়ে গেল নীলমাধবের মন্দির।’

‘সেই ধনরত্নের কথা সনাতন কারুকে বলে যায় নি?”

‘সনাতন বায়েন যুধিষ্ঠিরকে বলেছিল সে একটা কীর্তন লিখেছে তাতে সে সাংকেতিক ভাবে লিখেছে রূপ-সনাতন গোস্বামীর ধনরত্ন সে কোথায় রেখেছে। কিন্তু, সেই কীর্তন সে যুধিষ্ঠির অধিকারীকে শিখিয়ে যাবার সুযোগ পায় নি।’ ‘কেন?’

“একটা অশুভ ঘটনা ঘটল। তখন জমিদারবাড়িতে খুব ঘটা করে দুর্গাপূজা হত, আর দশমীর রাতে কীর্তন হত। সেদিন যুধিষ্ঠির অধিকারী মূলগায়েন আর সনাতন শিরবায়েন। সনাতন মেলজমাট সবে শেষ করেছে এমন সময় আসরে জমিদারবাবুর সঙ্গে ঢুকল তার অতিথি বুথ সাহেব। সনাতনকে দেখেই বুথ সাহেব চিৎকার করে বলল – এই লোকটা এখানে কেন? দিস ম্যান ইজ থিফ। এ তিন বৎসর চুরির দায়ে জেলে ছিল!”

“তারপর?”

‘জমিদার তখন সাহেবকে সন্তুষ্ট করার জন্য হুকুম দিল - কীর্তন বন্ধ ! অন্য বায়েন নিয়ে এস। কিছুক্ষণ বাদানুবাদ হল, কিন্তু জমিদার অনড়। জমিদার অন্নদাতা, তাই যুধিষ্ঠির অধিকারী তখন মাথা নিচু করতে বাধ্য হল। সনাতনকে সরিয়ে কোলবায়েনকে শিরবায়েন করে কীর্তন শুরু করতে বলল। যুধিষ্ঠির অধিকারী যে তাকে সরিয়ে কীর্তন করতে পারে এটা সনাতনের কাছে অবিশ্বাস্য ছিল। অভিমানে পাশে কিছুক্ষণ পাথরের মত দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কীর্তন শুনল, ওর চোখ দিয়ে টপটপ করে জল ঝরছিল, তারপর একসময় মণ্ডপ ছেড়ে বেরিয়ে গেল। যুধিষ্ঠির অধিকারী মরমে মরে যাচ্ছিল, বিবেকের গ্লানিতে গলা দিয়ে গানের ভাষায় ভক্তি মেলাতে পারছিল না, সেও কোলগায়েনের ওপর দায়িত্ব দিয়ে মণ্ডপ ছেড়ে বেরিয়ে এল সনাতনের অভিমান ভাঙাতে। যুধিষ্ঠির অধিকারী দেখল সনাতনের পিরান আর হাঁটু পর্যন্ত ধুতি পরা চেহারা আলপথে অন্ধকারে মিলিয়ে যাচ্ছে চৈতন্যপুখুরীর দিকে। যুধিষ্ঠির অধিকারী অনেক দূর থেকে চেঁচিয়ে সনাতন সনাতন বলে ডাকল। কিন্তু সনাতন ফিরেও তাকালো না। আল ছেড়ে অন্ধকার মাঠে পঞ্চমুখী বুনো জবার ঝাড়ে নেমে পড়ল সনাতন। যুধিষ্ঠির ঝোপঝাড়ের জোনাকির আলো ঠেলে সনাতনের পিছনে দৌড়োতে দৌড়োতে নীলমাধবের মন্দিরের কাছাকাছি চলে এল। সনাতন মন্দিরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল। যুধিষ্ঠির অধিকারী কিছুক্ষণ পর মন্দিরের সিঁড়িতে পৌঁছে দেখল দরজার নিচের ফাঁক দিয়ে বোঝা যাচ্ছে সনাতন ভিতরে পিদিম জ্বালিয়েছে।

যুধিষ্ঠির দরজায় ধাক্কা দিল, কিন্তু দরজা বন্ধ। তারপর একসময় মন্দিরের ভিতরের বাতি নিভে গেল। আর মন্দিরের ঘন্টা ঢং ঢং করে বাজতে লাগল। এবার যুধিষ্ঠির অধিকারী ভয় পেয়ে আবার দরজা ধাক্কাল, সনাতন দরজা খুলল না। যুধিষ্ঠির এবার তাড়াতাড়ি পুজো বাড়িতে ফিরে এসে কয়েকজন মানুষকে জড়ো করে মন্দিরে ফিরে এল। সকলে মিলে ঠেলে বন্ধ দরজা ভেঙে ভিতরে ঢুকে দেখল মন্দিরে সনাতন নেই আর মন্দিরের সারা দেওয়াল জুড়ে লেখা একটা কীর্তন। পঞ্চমুখী জবাফুল দিয়ে লিখে গেছে সনাতন, ঠিক মনে হচ্ছে কেউ যেন রক্ত দিয়ে লিখেছে। সনাতনের আর কোনওদিন কোনও সন্ধান পাওয়া যায় নি। যুধিষ্ঠির অধিকারী সেই কীর্তন তুলটে লিখে রাখল। সেই কীৰ্ত্তন হল সনাতন কীর্তন।

‘এটা মনগড়া আজগুবি গল্পকথা নয়তো?’

কে জানে? তবে যুধিষ্ঠির অধিকারীকে লোকে নাকি বলত কলির যুধিষ্ঠির।’ আপনি কি সনাতন কীর্তনের পদগুলো জানেন?”

“আমি? না না, আমি কক্ষনো শুনিনি সেই পদ। আমি শুধু সনাতন কীর্তনের গল্পই শুনেছি।’

‘ছিদাম দাদু জানেন?’

“বাবা একসময় জানত। কিন্তু এখন ভুলে গেছে। বাবার সব কিছু ভুলে যাওয়ার রোগ। মাঝে মাঝে আমার নামটা পর্যন্ত ভুলে যায়।

স্টেশন এসে গেছে। পদাবলী বলল, ‘গোবিন্দকাকা, আপনি বাড়ি যান৷ এখানে ওদের দেখছি না। আমি ঠিক ফিরে যেতে পারব। প্রেসারটা একবার চেক করিয়ে নেবেন।’

“তুমি মাঝে মাঝে এসো। তোমার সঙ্গে কথা বললে মনে হয় তুমি আমাদের করতালতলীর মাটির ছেলে। কত মিষ্টি করে গোবিন্দকাকা বলে ডাকলে। আর ওই মনু হারামজাদা-‘ গোবিন্দ অধিকারীর দু‘চোখ আবার কঠোর হয়ে উঠল। গোবিন্দ অধিকারী বাড়ির পথ ধরল।

পদাবলী আজ অনেক কিছু জানল। সনাতন চোর থেকেই সনাতন কীর্তন! এই তথ্যটা কি নাইট্রোজেন জানেন?

সকল অধ্যায়
১.
প্রাককথন
২.
এক
৩.
দুই
৪.
তিন
৫.
চার
৬.
পাঁচ
৭.
ছয়
৮.
সাত
৯.
আট
১০.
নয়
১১.
দশ
১২.
এগার
১৩.
বারো
১৪.
তেরো
১৫.
চোদ্দ
১৬.
পনের
১৭.
ষোলো
১৮.
সতের
১৯.
আঠারো
২০.
ঊনিশ
২১.
কুড়ি
২২.
একুশ
২৩.
বাইশ
২৪.
তেইশ
২৫.
চব্বিশ
২৬.
পঁচিশ
২৭.
ছাব্বিশ
২৮.
সাতাশ
২৯.
আটাশ
৩০.
ঊনত্রিশ
৩১.
ত্ৰিশ
৩২.
একত্রিশ
৩৩.
বত্রিশ
৩৪.
তেত্রিশ
৩৫.
চৌত্রিশ
৩৬.
পঁয়ত্রিশ
৩৭.
ছত্রিশ
৩৮.
সাঁইত্রিশ
৩৯.
আটত্রিশ
৪০.
ঊনচল্লিশ
৪১.
চল্লিশ
৪২.
একচল্লিশ
৪৩.
বিয়াল্লিশ
৪৪.
তেতাল্লিশ
৪৫.
চুয়াল্লিশ
৪৬.
পঁয়তাল্লিশ
৪৭.
ছেচল্লিশ
৪৮.
সাতচল্লিশ
৪৯.
আটচল্লিশ
৫০.
ঊনপঞ্চাশ
৫১.
পঞ্চাশ
৫২.
একান্ন
৫৩.
বাহান্ন
৫৪.
তিপ্পান্ন
৫৫.
চুয়ান্ন
৫৬.
পঞ্চান্ন
৫৭.
ছাপ্পান্ন
৫৮.
সাতান্ন
৫৯.
আটান্ন
৬০.
ঊনষাট
৬১.
ষাট
৬২.
একষট্টি
৬৩.
বাষট্টি
৬৪.
তেষট্টি
৬৫.
চৌষট্টি
৬৬.
পঁয়ষট্টি
৬৭.
ছেষট্টি
৬৮.
সাতষট্টি
৬৯.
আটষট্টি
৭০.
ঊনসত্তর
৭১.
সত্তর
৭২.
একাত্তর
৭৩.
বাহাত্তর

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%