প্রীতম বসু
করতালতলীতে কুমুদরঞ্জনের বাড়ির দুঃখ শুষতে শুষতে দিন এগিয়ে চলল। কুমুদরঞ্জন মন্দিরে তাঁর দৈনন্দিন পুজোয় ডুবে থেকে পুত্রশোক ভোলার চেষ্টা করে চলেছেন। আজকাল ভোরে মন্দিরে গিয়ে আর দুপুরে বাড়ি ফেরেন না। সন্ধ্যায় একদম সন্ধ্যারতি সেরে তবে বাড়ি ফেরেন। খড়ুটি ঘরের জানলার বাইরের প্রকৃতিতে ক্রমশঃ দিন ছোট হয়ে রাত বড় হচ্ছে। উত্তরের বাতাসের শীতলতা বাড়িয়ে আশ্বিন, কার্তিক কেটে গিয়ে করতালতলীতে অগ্রহায়ণ মাসের মাঝামাঝি এসে গেল। প্রাণনাথের গোঁফ-দাড়ি-চুলে ওর পুরোনো মুখশ্রী ফিরে এসেছে। মন্দিরার কথাবার্তা ক্রমশঃ স্বাভাবিক হয়ে উঠলেও সারাক্ষণ ওর মুখে এক দুশ্চিন্তার ছাপ। কীভাবে প্রাণনাথ ধুলট থেকে পালাবে এই তার সর্বক্ষণের চিন্তা। প্রাণনাথ নানারকম গল্পে মন্দিরাকে ভুলাবার চেষ্টা করলেও মন্দিরার উদ্বেগ কাটাতে পারে না। প্রাণনাথ গোবিন্দদাসের পদাবলী থেকে পড়ল -
‘এক অনেক এক পুণ রাজসি
কনকাভরণ আকার
অভরণ-নামরূপ সব হেরই
কণক হেরি বণিজার
- গোবিন্দদাস বলছেন, ঈশ্বর, তুমি সুবর্ণের অলঙ্কারের মত। কত নাম – কুণ্ডল, কঙ্কণ, বলয়, হার। কিন্তু সোনার ব্যবসা যে করে, সে অলঙ্কারের নাম ও রূপে ভোলে না। তার শুধু নজর ওই বস্তুর মধ্যে কত ওজনের সোনা আছে।’ প্রাণনাথ হাসল।
‘হাসছ?”
‘তোমার অবস্থাও হয়েছে এই সোনার ব্যাপারীদের মত। তোমায় কত গল্প বলি, কিন্তু তুমি গল্পে ভোল না। তোমার একমাত্র নজর আমার পলায়নের কোনও পথ পাওয়া গেল কিনা। আমার পলায়ন ছাড়া এখন তোমার কাছে গোবিন্দদাস, চণ্ডীদাস, জ্ঞানদাস সবাই সমান।
‘আমি শুধু নীলমাধবকে ডাকি। ঠাকুর, একটা পথ দেখাও।’
কিন্তু প্রাণনাথের পলায়ন সত্যি খুবই কঠিন সমস্যা হয়ে উঠল। সেদিন ছিদাম মন্দির থেকে বাজার গেছিল। সেখানে থেকে খবর নিয়ে এসে উত্তেজিত গলায় উঠোনে দাঁড়িয়ে মন্দিরাকে বলল – ‘বাজারে আজ অনেক পুলিশ।’ -
প্রাণনাথ খড়্গটি ঘরের জানলায় এসে দাঁড়াল ‘কেন এত পুলিশ সেটা কি আন্দাজ করতে পারলে?” -
‘কলকাতায় কোন এক কর্নেল সিম্পসনের ওপর হামলা হয়েছে।’
‘অত্যাচারী ব্রিটিশ ইন্সপেক্টর জেনারেল কর্নেল সিম্পসন?”
‘তা জানিনে,’ ছিদাম বলল। ‘রাইটার্স বিল্ডিং নামে এক অফিসে তিনজন স্বদেশী নাকি বিলিতি পোষাক পরে ঢুকে পড়েছিল।’
‘এই সিম্পসন আর ড্যানিয়েলই মৃদঙ্গমের ওপর অকথ্য অত্যাচার করেছিল, ‘ প্রাণনাথ বলল। ওকে কি মারতে পেরেছে?’
হ্যাঁ, তিনজনের রিভলভার থেকে ছ’টা গুলি ওর শরীরে ঢুকে গিয়ে সিম্পসনকে শেষ করে দিয়েছে।’
প্রাণনাথ তৃপ্তি পেল। তারপর উদ্বেগের সঙ্গে জিজ্ঞাসা করল - ‘স্বদেশীদের কী হল?”
*একজন আত্মহত্যা করেছে। ওদের একজন নাকি নিজের মাথায় গুলি করেছিল। কিন্তু মরেনি। দু‘জনকে নাকি পুলিশ আহত অবস্থায় ধরে ফেলেছে। কলকাতায় নাকি পুলিশ ধর-পাকড় বাড়িয়ে দিয়েছে। সমস্ত থানায় নির্দেশ এসেছে চোখ কান খোলা রাখতে। কারুকে সন্দেহ হলেই গ্রেফতার করতে। ‘
“আমাদের ধুলটেও ওরা নিশ্চয়ই প্রচুর পুলিশ পাহারা রাখবে,’ মন্দিরা বলল। ‘প্রাণনাথদা, আমাকে তুমি সোনার বেনে বলে রসিকতা করছ বটে, কিন্তু আমার চিন্তায় চিন্তায় আজকাল রাতে ঘুম হচ্ছে না ৷ ‘
- পাঁচদিন পর ছিদাম আবার বাজার থেকে খবর নিয়ে এল “যে লোকটা নিজের মাথায় গুলি করেছিল, ও নাকি হাসপাতালে মারা গ্যাছে। কেউ বলে ও নাকি নিজের মাথার ঘায়ে আঙুল চালিয়ে সেপটিক করে ফেলেছে। আবার কেউ বলছে যে ইংরেজ পুলিশই নাকি ওই কাজটা করেছে পেট থেকে কথা বের করতে গিয়ে।’
প্রাণনাথ চুপ করে বসে রইল। মন ভারী হয়ে গেছে। ওর কিছু ভাল লাগছিল না। ও এখানে লুকিয়ে বসে আছে। কত কাজ বাকি রয়ে গেছে। আর তো মাঝে একটাই মাস। অপেক্ষা মাঘের শুক্লা সপ্তমীর। ধুলট শেষ হলেই প্রাণনাথ এ বাড়ি থেকে ফিরে যাবে নিজের কর্মক্ষেত্রে।
বিকালে মন্দিরা এল। ‘ভুবনকাকার মানসিক রোগ খুব দ্রুত খারাপের দিকে যাচ্ছে,’ মন্দিরা চিন্তান্বিত গলায় বলল। ‘ভুবনকাকা রোজ রাতের অন্ধকারে গোরা-দানো তাড়া করতে চুপি চুপি ঘর থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে। সুযোগ পেলেই গোঁজ আটকানো কলাগাছের সারিবাঁধা মান্দাস ভেলা নিয়ে জলার গভীরে গিয়ে রাতে বসে থাকে। দপ করে আলেয়া জ্বললেই সেদিকে দাঁড়ের বাড়ি মারে। আজ সকালে বাবা ছিদামদের বাড়ি গিয়ে ভুবনকাকাকে বুঝিয়েছে যে ওগুলো দানো না, গন্ধকের না ফসফরাসের গ্যাস দপ করে জ্বলে। ভুবনকাকা স্বাভাবিক মুখে বলল, ঠিক আছে আর যাব না।’
“আমার মনে হয় শহরের ভাল ডাক্তার দেখানো উচিত, প্রাণনাথ বলল।
‘ছিদাম বেচারা বুঝে উঠতে পারছে না বাবাকে নিয়ে কী করে। রসুল মাঝি বলেছে মসজিদে একঘটি চাবি ধোওয়া জল পাঠিয়ে দিতে। একজন সর্বরোগহরা গুণিন নাকি আছেন, তার মন্ত্র পড়া ফুঁ দেওয়া সেই জল তিনদিন গায়ে ছিটালে নাকি ভুবনকাকা ঠিক হয়ে যাবে।
রসুল মাঝির ফুঁ দেওয়া চাবি ধোওয়া জল এল। তিনদিন ছিটানো হল, কিন্তু ভুবন জমাদারের কোনও উন্নতি হল না। সেদিন রাতে জলের ধারে কুলেখাড়ার ঝোপে লুকিয়ে থাকা দানোকে দাঁড়ের বাড়ি মারতে গেছিল ভুবনকাকা। জলে পড়ে গিয়ে ভিজে চুবুচুবু হয়ে বাড়ি ফিরল, ঝোপে-কাঁটায় হাত কেটে রক্তারক্তি। পরদিন সকালবেলা মন্দিরাদের বাড়িতে পুলিশ এল। দারোগা বলল রায়সাহেব উপরমহলে আরজি জানিয়েছিলেন যে করতালতলীর ধুলট যেন বন্ধ না করা হয়। উপরমহল সেই আবেদন মঞ্জুর করেছে। এ বছর ধুলট হবে। পুলিশ যাওয়ার সময় কুমুদরঞ্জনকে বলে গেল প্রাণনাথ বসুকে আশেপাশে কোথাও দেখা গেলেই যেন পুলিশে খবর দেওয়া হয়।
ধুলট হবে এই খবরটা কুমুদরঞ্জনের মুখে আনন্দের ছটা ছড়িয়ে দিল। বারবার নীলমাধবকে প্রণাম জানালেন কুমুদরঞ্জন। চতুষ্পাঠীর জানলার ফাঁক দিয়ে দৃশ্যটা দেখল প্রাণনাথ। মন্দিরার হাসিটা কৃত্রিম লাগছে। মন্দিরাই জানে যে ধুলট প্রাণনাথের আত্মত্যাগে হচ্ছে।
রায়সাহেব অখিলরঞ্জন তার ঘরামি প্রজাদের পাঠিয়ে ধুলটের আখড়াগুলোতে খলপা আর মাথার ওপরের হোগলা ও শনের ছাউনি লাগাতে লাগলেন। সেদিন কুমুদরঞ্জন মন্দিরে, ছিদাম মাঠ থেকে ফিরে মন্দিরাকে বলল, “আজ দেখলাম বড় জমিদারবাবু নিজে দাঁড়িয়ে তদারকি করছেন। মন্দিরের সামনে মেরাপ বাঁধা হবে শুনে এলাম। একখানা ঢাউস তোরণ বানানো হচ্ছে ধুলডাঙায় ঢোকার। বাঁশ আর আগাশি দিয়ে চারদিক ঘিরে দেওয়া হচ্ছে।’
“থাম তুই, কতদিন তোকে বলেছি কাঁইবীচি মুখে রেখে কথা বলবি না। তোর জন্যই সব গণ্ডগোল হয়ে গেল। প্রাণনাথদা যাতে পালাতে না পারে তার
২৭৫।প্ৰাণনাথ হৈও তুমি
ব্যবস্থা চলছে।’ তারপর মন্দিরা উঠোন থেকে গলা উঁচু করে প্রাণনাথের উদ্দেশ্যে বলল, ‘তুমি আমাকে যদি তোমার পালাবার রাস্তার প্রমাণ না দিতে পার তবে তোমাকে ওই মাঠে আমি কিছুতেই যেতে দেব না।’
প্রাণনাথ জানলায় দাঁড়িয়ে বলল, ‘জমিদার অখিলরঞ্জন ভাবছে এটাই করতালতলীতে শেষ খুলট। কিন্তু আমি এমন কিছু একটা করে যাব যাতে কীর্তনের মহিমা দূর দূরান্তে ছড়িয়ে যায়।”
‘কীভাবে প্রাণনাথদা?” মন্দিরা বুঝতে পারে না প্রাণনাথের সব কথা।
আমি নিজেও জানিনা। তবে তোমাদের নীলমাধব যদি চান, একটা উপায় নিশ্চয়ই হবে। তবে আমাকে কীর্তনের তালিম ভালভাবে নিতে হবে আগে। তুমি জিজ্ঞাসা করেছিলে আমায় কীর্তন শেখাবেন কিনা?”
কি কাকাবাবুকে
মন্দিরা নিরুত্তর।
‘বুঝেছি,’ প্রাণনাথ বলল। ‘উনি এখনও আমার ওপর রাগ করে আছেন।’
দাদার মৃত্যু আমাদের সংসারটাকে এলোমেলো করে দিল,’ মন্দিরা বলল। দাদার মৃত্যুর জন্য বাবা তোমাকে দায়ী মনে করে, তাই তোমায় মনে হয় কক্ষনো ক্ষমা করতে পারবে না। বাবাকে আমি চিনি, কীর্তন শেখানো তো দূরের কথা, বাবা তোমার সঙ্গে আর কক্ষনো স্বাভাবিক হতে পারবে না। কিন্তু তুমি চিন্তা কোরোনা প্রাণনাথদা, আমি তোমায় কীর্তন শেখাব। বাবা তো আজকাল সারাদিন মন্দিরেই থাকে। আমি আর ছিদাম তোমায় সনাতন কীর্তনের গৌরচন্দ্রিকার তালিম দেব।’
‘কিন্তু আমি কীর্তন শিখব কীভাবে? যদি কেউ দেখে ফেলে?’
‘এই জলাভূমিতে লোকজন প্রায় আসেনা বললেই চলে। আজকাল ধুলডাঙায় ম্যারাপ বাঁধার কিছু লোক কাজ করছে। ছিদাম বাড়ির বাইরের মাঠে কাজের ছলে কড়া পাহারায় থাকবে। কারুকে দূর থেকে এদিকে আসতে দেখলেই আমাদের সাবধান করে দেবে। শুরু তো করা যাক, তারপর দেখাই যাক না নীলমাধবের কী ইচ্ছা।’
সে ভাবেই প্রাণনাথের কীর্তনশিক্ষা শুরু হল। শ্রীদাম রোজ সকালে সামনের মাঠে ফুলের গাছ পোঁতে, মাটি খোঁড়ে, খুটখাট কাজ করে আর মন্দিরা খড়টি ঘরে এসে প্রাণনাথকে কীর্তনের শিক্ষা দেয়। কীর্তন বোঝাতে বোঝাতে মন্দিরা নিজেই মৃদঙ্গ বাজায়। প্রাণনাথ একমনে শোনে মন্দিরার কীর্তন। একেক দিন একেক পদাবলী গান - বিদ্যাপতি, চণ্ডীদাস, গোবিন্দদাস কবিরাজ, জ্ঞানদাস।
প্রাণনাথ শিখতে লাগল কীর্তনের আখর, তাল, ছুট, ঝুমুর, বিভিন্ন রকমের কীর্তন - নামসংকীর্তন, লীলাকীর্তন, বিভিন্ন পদাবলী, গড়াণহাটি, মনোহরসাই। প্রাণনাথ মেধাবী ছাত্র, তীক্ষ্ণ বুদ্ধিসম্পন্ন, এরকম ছাত্রকে শিক্ষাদান যে কোনও শিক্ষকের পক্ষে আনন্দের ব্যাপার। মন্দিরাও মন দিয়ে প্রাণনাথকে কীর্তনের শিক্ষা দিতে লাগল। প্রাণনাথের ভাল লাগল যে এই কীর্তনের মধ্যে দিয়ে মন্দিরা দাদার মৃত্যুর দুঃখ ধীরে ধীরে ভুলছে।
প্রাণনাথ মাঝে মাঝে খুব বাস্তব প্রশ্ন করে। সেদিন মন্দিরা বোঝাচ্ছিল যে বৃন্দাবনে একজনই নায়ক ভগবান শ্রীকৃষ্ণ এবং তাকে আলম্বন ভাবে নিত্যকান্তা গোপীরা। এদের মধ্যে যারা অনূঢ়া বা অবিবাহিতা তারা শ্রীকৃষ্ণকে পতিরূপে প্রেম নিবেদন করছে, আর যারা বিবাহিতা তারা উপপতিভাবে শ্রীকৃষ্ণকে প্রেম নিবেদন করছে। এই উপপতিভাবময় রসই হল বৈষ্ণবশাস্ত্রের মধুর রস।
প্রাণনাথ বলল, ‘কিন্তু সে তো পরকীয়া প্রেম! সে তো অন্যায়? নিজের স্বামীকে লুকিয়ে অন্য পুরুষের সঙ্গে প্রেম! ভগবান শ্রীকৃষ্ণই বা কীভাবে একাধিক গোপিনীর সঙ্গে প্রেম করত?
মন্দিরা প্রাণনাথের এই প্রশ্নে সন্তুষ্ট হল। এ প্রশ্ন একজন নাস্তিকের পক্ষে খুবই সঙ্গত প্রশ্ন। মন্দিরা বলল, ‘আমাদের সাধারণ লৌকিক দৃষ্টিতে পরকীয়া প্রেম অবশ্যই অন্যায়। তুমি ঋষি দুর্বাসার পারণের কাহিনী জান?”
‘না।’
‘তবে শোন, তোমার প্রশ্নের উত্তর হয়তো তুমি পাবে,’ মন্দিরা মৃদঙ্গ সরিয়ে রাখল। ‘শ্রীকৃষ্ণ ধ্যানে বসে আছেন। কৃষ্ণের ধ্যানের শেষে রাধা তাঁকে জিজ্ঞাসা করল, প্রিয়ে, তুমি ধ্যানস্থ অবস্থায় কী চিন্তা করছিলে তা আমার জানতে খুব ইচ্ছা করছে। শ্রীকৃষ্ণ স্মিত হেসে বললেন, প্রিয়ে, আমি শয়নে স্বপনে-জাগরণে শুধু তোমার কথাই ভাবি। রাধা কুপিত হয়ে বলল, ওহে শঠ শিরোমণি, তোমায় আমি ভালই চিনি। তুমি আজ চন্দ্রাবলীর কুঞ্জে, তো কাল কুজীর বাসরে, তো পরশু অন্য কোনও গোপিনীর কাছে আসা যাওয়া কর। ওসব ছেড়ে সত্যি করে বলতো তুমি কার কথা ভাবছিলে? শ্রীকৃষ্ণ তখন বললেন, আমি আমার ভক্ত ঋষি দুর্বাসার কথা ভাবছিলাম। দুর্বাসা মুনি সারাদিনে দুর্বাঘাসের দুটো মাত্র রুটি খান। ওঁর একাদশীর উপবাস চলছে। কঠোর উপবাসের পর আবার সেই দুটো দুর্বাঘাসের রুটিই খাবে। এই কথা শুনে রাধা বলল, সত্যি ঋষির অস্থিচর্মসার চেহারা দেখে আমার দুঃখ হয়। আমার বাসনা ওঁর উপবাস পারণের সময় দুধ, ক্ষীর, ছানা, ননী ইত্যাদি খাওয়াই। কিন্তু দুর্বাসা রাগী মুনি, তাই আমার সাহস হয় না। শ্রীকৃষ্ণ রাধাকে বললেন, উনি বিষয়-বিবাগী, ত্যাগে ভোগে সমানভাবে নিস্পৃহ উনি। বেশ, তুমি এক কাজ কর, কাল দ্বাদশী, কাল ওঁর কাছে গিয়ে ভালভাবে চর্ব-চোষ্য আহার করিয়ে এস। আমি অভয় দিচ্ছি।’ ছিদাম বাইরে জানলার কাছে এসে গলা খাঁকারি দিল। মন্দিরা ক্ষিপ্ৰহস্তে মৃদঙ্গ তুলে দ্রুতপায়ে খড়্গটি ঘর থেকে বেরিয়ে দরজা টেনে দিল। প্রাণনাথ ঘরের কোনায় কাঠের পাটাতন তুলে ফেলল।
একজন মাঝবয়সী বৈরাগী ভিক্ষা চাইতে এসেছে। এখন সকলকেই সন্দেহ হয়। কে যে ভিক্ষুক আর কে টিকিটিকি কে জানে!
ভিখিরিকে সিধে দিয়ে বিদায় করে মন্দিরা আবার খড়ুটি ঘরে এসে ঢুকল। হেসে বলল, “ভারত স্বাধীন হলে তুমি যদি প্রধানমন্ত্রী-টন্ত্রী হও তবে ছিদামকে তোমার রক্ষামন্ত্রী বানিয়ে দিও।’
“আর তোমাকে মিউজিক মন্ত্রী,’ প্রাণনাথ হেসে বলল। ‘তারপর রাধার কী হল বল।’
“কৃষ্ণের অভয় পেয়ে রাধা পরদিন সকালে ক্ষীর-ননী এসব নিয়ে যমুনাতীরে উপস্থিত হয়ে দেখে যমুনার ভীষণ উগ্রমূর্তি। যমুনার উত্তাল ঢেউ দেখে কোনও মাঝি সাহস করছে না নদী পার হতে। বিমর্ষ রাধা কৃষ্ণের কাছে ফিরে গিয়ে জানাল। কৃষ্ণ রাধাকে উৎসাহ দিয়ে বলল, প্রিয়ে, তুমি মন খারাপ কোরো না। তুমি আবার যমুনায় যাও, গিয়ে যমুনাকে বল হে যমুনা, আমার কৃষ্ণ যদি অন্য কোনও গোপিনীকে কখনো স্পর্শ না করে থাকে তবে আমায় যেতে দাও। রাধা যমুনার পাড়ে গিয়ে তাই বলল, আর রাধা আশ্চর্য হয়ে দেখল যে যমুনার স্ফীত তরঙ্গ অবিলম্বে শান্তভাব ধারণ করে রাধাকে নদী পার হওয়ার পথ দিল। -
দুর্বাসার আশ্রমে গিয়ে রাধা করজোড়ে মুনিবরের কাছে উপবাস পারণের বাসনা জানাল। দুর্বাসা বললেন বেশ, তবে তোমার আনা খাদ্যসামগ্রী আমি স্পর্শ করব না, তুমি যদি স্বহস্তে আমায় খাইয়ে দাও তবে আমি খেয়ে নেব। রাধা রাজি হয়ে এক এক করে সমস্ত ক্ষীর, ননী, ছানা নিজের হাতে মুনিবরকে খাইয়ে দিতে লাগল। সব খাদ্যদ্রব্য নিঃশেষ হয়ে গেলে রাধা বলল, মুনিবর, আপনি সন্তুষ্ট তো? ঋষি বললেন, আমার সন্তুষ্টি-অসন্তুষ্টি বলে কিছু নেই। ভগবান যেভাবে রাখেন আমি সেভাবেই থাকি।
এবার আবার ফেরার পালা। রাধা ভাবল আসবার সময় শ্রীকৃষ্ণের কথায় যমুনা রাস্তা দিয়েছিল, এবার যমুনা কীভাবে পার হব? রাধা ঋষি দুর্বাসাকে তার উদ্বেগ জানাতে দুর্বাসা বললেন, বেশ, তুমি যমুনাকে বল যদি ঋষি দুর্বাসা আজ শুধুমাত্র দু‘খানা দুর্বাঘাসের রুটি ছাড়া আর কিছু না খেয়ে থাকেন, তবে যমুনা আমায় পথ দাও। রাধা বলল, সেকি আপনাকে আমি নিজের হাতে এত কিছু খাওয়ালাম? ঋষি বললেন, তুমি আমাকে অনেক কিছু খাওয়াতে পার, কিন্তু আমার কাছে সেসব দুর্বাঘাসের রুটির চেয়ে আলাদা কিছু মনে হয় নি। তুমি যমুনায় গিয়ে পরখ করে দেখ।
রাধা যমুনাতীরে গিয়ে যমুনার দুর্বার জলোচ্ছ্বাসের সামনে দাঁড়িয়ে দুর্বাসা ঋষির প্রশ্ন করা মাত্রই যমুনা শান্ত হয়ে পথ করে দিল। রাধা কৃষ্ণের কাছে ফিরে এসে সব বলাতে কৃষ্ণ হেসে বললেন, প্রিয়ে উনি অনাসক্ত মুনি। ওঁর কাছে খাদ্য শুধু ক্ষুধা নিবৃত্তির উপাদান। তার স্বাদ-বিস্বাদ-ভাল-মন্দ কিছু নেই। চন্দন-বৃষ্ঠা-সুখ-দুঃখ-জয়-পরাজয় সবই তাঁর কাছে সমজ্ঞান। উনি শুধু তোমাকে আনন্দ দিতেই তোমার খাদ্য গ্রহণ করেছিলেন। এবার রাধা বুঝল শ্রীকৃষ্ণও সেরকম সমস্ত জাগতিক ভোগে নির্লিপ্ত, অনাসক্ত। তিনি রাধার জন্য ব্যাকুলতা দেখান রাধাকে আনন্দ দেবার জন্যই।’ মন্দিরা এবার থামল। প্রাণনাথের মুখের দিকে তাকিয়ে হেসে বলল, ‘যেমন ছিলেন নিত্যানন্দ মহাপ্রভু। তিনি ছিলেন অবধূত সন্ন্যাসী। যিনি সম্পূর্ণ নিরাসক্ত হয়ে যুগপৎ ত্যাগ ও ভোগ সম আচরণ করেন তিনিই অবধূত। কিছু বুঝলে?”
‘সবটা না হলেও কিছুটা বুঝতে পারলাম। দুর্বাঘাসের রুটি আর ক্ষীর সমজ্ঞান। সেরকম কৃষ্ণও সব গোপিনীর সঙ্গেই রাধাভাবে প্রেম করেন। কিন্তু, পরকীয়া কেন? রাধা কৃষ্ণের মধ্যে স্বামী-স্ত্রীর প্রেমের সম্পর্ক তৈরি করে তা দিয়ে কেন প্রেমলীলা তৈরি হল না?”
‘পরকীয়া প্রেমে যে রূপ-রসের উল্লাস হয় তা বিবাহিত স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কে হয় না। বিবাহিত স্বামী-স্ত্রীর স্বকীয়া প্রেম হল সমঞ্জসা রতি। এতে না আছে কোনও বাধা, না আছে কোনও লোকনিন্দার ভয়। পরকীয়া প্রণয়ে এত বাধা আছে বলেই এই প্রণয় অতিদুর্লভ ও উৎকৃষ্ট।’
‘কিন্তু আমার মত সাধারণ মানুষের চোখে এ অন্যায়
‘রাধাকৃষ্ণের লীলা অলৌকিক। এই প্রেমে সিক্ষার প্রেরণা নেই। ভগবান তাঁর হ্লাদিনীশক্তির সঙ্গে নিত্য এই প্রেমলীলায় মেতে থাকেন। গোপিনীদের রাগানুগা ভক্তি, তাঁদের প্রণয়ের আকুলতাই ভক্ত ও ভগবানকে এক সূত্রে বেঁধে রেখেছে। গোপিনীদের এই প্রেমে কামের কোনও স্থান নেই। তাঁরা ভক্ত, নিজেকে ভগবানের কাছে সমর্পণ করেছেন। শ্রীকৃষ্ণের আনন্দেই তাঁদের আনন্দ। সহজে গোপীর প্রেম নহে প্রাকৃত কাম/ কামক্রীড়া সাম্যে তার কহি কাম নাম। একটা কথা সব সময় মনে রাখতে হবে আমাদের সমাজ জীবনে।’
ঐ পরকীয়া প্রেম সব সময় পরিত্যাজ্য। ওই প্রেমের মধ্যে কাম প্রবেশ করে মধুর ভাবকে নষ্ট করে ফেলে। কাল্পনিক ব্রজধামের বাইরে ঐ পরকীয়া প্রেমের বসতি নেই। সমুদ্র লক্ষন মহাবলী হনুমানের পক্ষেই সম্ভব, আমাদের মত সাধারণ মানুষের পক্ষে সে চেষ্টা করার কথা ভাবাই উচিত না। সেরকম পরকীয়া প্রেম বৃন্দাবনলীলার কল্পলোকেই সম্ভব, বাস্তবে নয়। তাই চৈতন্যচরিতামৃতে কবি চমৎকার ভাবে লিখে গেছেন-
পরকীয়াভাবে রতিরসের উল্লাস
ব্রজ বিনা তাহার অন্যত্র নাহি বাস।।
“চৈতন্যদেব এ ব্যাখ্যা মানতেন?”
‘চৈতন্যদেব স্বয়ং রূপ সনাতনকে ব্রজধামে পাঠান এবং যাত্রাকালে রূপ গোস্বামীকে সাবধান করে দিয়ে বলেন যে কৃষ্ণের এই পরকীয়া লীলা সাধারণ মানুষের বোধগম্য নয়। এই লীলা যেন বৃন্দাবনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে, যেন না আসে। বাইরে
কৃষ্ণকে বাহির নাহি কর ব্রজ হৈতে
ব্রজ ছাড়ি কৃষ্ণ কভু না যায় কাঁহাতে।
মহাপ্রভু চৈতন্যদেব রূপ গোস্বামীকে বৃন্দাবনে পাঠালেন শ্রীকৃষ্ণের বৃন্দাবনলীলা ও প্রেমধর্মের ব্যাখ্যা করার জন্য। রূপ-সনাতন সহ ছয়জন গোস্বামী বৃন্দাবনে থেকে এই অলৌকিক প্রেমলীলার মাধুর্যের বীজ বপন করে তাতে জলসিঞ্চন করতে থাকলেন।’
“সবটা বোঝা গেল না,’ প্রাণনাথ বলল।
“দাদা একটা অন্য ব্যাখ্যা দিত। দাদা বলত আমাদের সমাজে পরকীয়ার স্থান নেই, কিন্তু আমরা ক’জন বুকে হাত দিয়ে বলতে পারি আমাদের মনে কখনোই পরকীয়া বিরাজ করে নি? আমাদের হৃদে বৃন্দাবন। পরকীয়া যেন সেই বৃন্দাবনের বাইরে কখনো পা রাখতে না পারে, সেভাবে আমাদের নিজের মনের আঙিনায় লক্ষ্মণরেখা এঁকে দেওয়া উচিত।’
কিছু সঙ্গীত, কিছু তত্ত্বকথার শিক্ষা। এভাবেই রোজ প্রাণনাথের কীর্তন শিক্ষা এগিয়ে চলল। আর, অজান্তে একজন মানব ও একজন মানবী একে অপরের মনের কাছাকাছি আসতে লাগল। প্রথম প্রথম মন্দিরার আগমন প্রাণনাথের কাছে নিঃসঙ্গতা থেকে মুক্তি ছিল, ধীরে ধীরে মন্দিরার সঙ্গলাভের নেশা সেই মুক্তিকে আবৃত করে দিল। প্রাণনাথ অপেক্ষা করে থাকত কখন মন্দিরা আর ছিদাম সকালে মন্দির থেকে ফিরে আসবে আর মন্দিরা হাসি মুখে ওর খডুটি ঘরে এসে ঢুকবে। অনুরূপভাবে মন্দিরার জীবনেও প্রাণনাথ এক গুরুত্বপূর্ণ আসন গ্রহণ করে ফেলল। দাদার মৃত্যুর শোক মন্দিরার মুছে গিয়ে সেখানে এক অপূর্ব আকর্ষণ জায়গা জুড়ে বসল। কীর্তন ছাড়াও ওরা দু‘জনে অনেকক্ষণ অন্যান্য কথাও বলে যেত। কখনো কখনো ছিদাম অধৈর্য্য হয়ে বাইরে থেকে বলত – ‘তোমাদের হল? বাবাকে খেতে দিতে যেতে হবে।
- মন্দিরা লজ্জা পেয়ে গিয়ে তুলসী গাছের দিকে তাকিয়ে বলল “বাপরে। গল্পে গল্পে এত বেলা হয়ে গেল খেয়ালই নেই। ছিদাম তুই বাড়ি যা। ভুবনকাকার খিদে পেয়ে গেছে।’ মন্দিরা উঠে দাঁড়াল।
***
পরদিন বেলার দিকে কুমুদরঞ্জন দাওয়ায় বসে ধুলটের নিমন্ত্রণপত্র লিখছিলেন আর ছিদাম পাশে বসে কাগজ এগিয়ে দিচ্ছিল। দরজার বাইরে থেকে সুরেলা গান ভেসে এল
সব সুবর্ণের বাঁক খানি বিনানো পাটের শিকা।
কৃষ্ণ নিলেন দধির ভাণ্ড চলিলা রাধিকা।।
আগে যায় সুন্দরী পিছনে বড়াই।
‘পটুয়া!’ ছিদাম উত্তেজিত হয়ে দালান থেকে উঠোনে নেমে দরজার দিকে ছুটে গেল। কুমুদরঞ্জন অবাক হয়ে ছিদামের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইলেন। দরজা খুলতে দেখা গেল সত্যিই তিনজন পটুয়া। একজন বৃদ্ধ, একজন মাঝবয়সী আর তৃতীয়জন কিশোর। দেখে মনে হয় একই পরিবারের তিনপুরুষ। মাঝবয়সী মানুষটার মাথায় ভারখণ্ডের পটে সামনে শ্রীরাধা, মাঝে কাঁধে ভার নিয়ে চলেছেন শ্রীকৃষ্ণ, পিছনে বড়াই আর সকলের পিছনে আসছে তিনজন সখী।
ছিদাম আর ধৈর্য রাখতে পারল না, বলল, ‘রঘু পটুয়া!”
‘আমরাও আছি,’ বৃদ্ধ রসিকতা করে বলল।
“এসো এসো ভিতরে এসো, কুমুদরঞ্জন ডাকলেন।
‘না জমিদারগোঁসাই, আমরা বাইরে থেকেই গান গেয়ে দক্ষিণা নিয়ে চলে যাব। আপনারে আগে আমাদের পট দেখাই।’ বৃদ্ধের ইঙ্গিতে কিশোর তার মাথায় বহন করে আনা তাঁতে বোনা লম্বা কাপড়ের ওপর কৃষ্ণলীলার বস্ত্রহরণ, নৌকাখণ্ড, কালীয়দমন এসব খুলে খুলে দেখাল আর বুড়ো পটুয়া গান গাইতে লাগল -
কদম তলে যমুনা জলে
কালার বাঁশির সুরে
আইল চানে বাঁশির টানে
সংসার যায় দূরে
ও রাধা করবি কি তা বল
বুড়োর ছেলে আর নাতি গেয়ে উঠল -
ও রাধা করবি কি তা বল
নয়ন যে ছলছল
এভাবে পটসংগীত চলতে লাগল। হঠাৎ যেন ভূমি ফুঁড়ে আবির্ভাব হল তিনজন মাঝি শ্রেণীর লোক। মাথায় গামছা বাঁধা, খালি গা, পরনেও গামছার কপটী, একজনের হাতে দাঁড়, অন্যজনের কাঁধে ঝুলি।
লোকগুলো ছিল কোথায়? মন্দিরা অবাক। চৈতন্যপুখুরীর পাড়ের ঝোপে কি এরা লুকিয়ে থাকে? আর এই বাড়িতে কে আসছে যাচ্ছে তার নজর রাখে?
লোকগুলোকে দেখে কিন্তু পটুয়ারা গান থামাল না। কিন্তু পটুয়ারা যে সচেতন হয়ে গেল সেটা প্রাণনাথ খড়ুটি ঘরের জানলার ফাঁক দিয়ে দেখতে দেখতে পরিষ্কার বুঝতে পেরে গেল। লোকগুলো যে পুলিশের টিকটিকি এ ব্যাপারে প্রাণনাথের কোনও সন্দেহ নেই। এবার বৃদ্ধ পটুয়া কুমুদরঞ্জনকে বলল, ‘জমিদারগোঁসাই, আপনারে একটা পট দেখাই। আসাম গ্যাসলাম, ভট্টদেবের “সৎ সম্প্রদায় কথা” থেকে লেখাটা পটে লিখে আনলাম। ও মাঝিভাই, এই পটটা ধর তো, খুলি।’
মাঝিদের একজন পটের এক প্রান্ত ধরল। বৃদ্ধ অতি সাবধানে পটটা খুলল। বিশাল পট। এই পটে কোনও চিত্র আঁকা নেই, তার বদলে শুধু লেখা।
‘ছবি কই?’ কুমুদরঞ্জন বললেন।
“ছবি নাই, এই পটে শুধু লেখা, বৃদ্ধ বলল। ‘এই লেখাটা পেলাম আসামের মনিকূট পাহাড়ের পাদদেশে। চৈতন্য ঘোপা গুহায় চৈতন্যপন্থীদের মেলায় গান গাইতে এসেছিল শঙ্করদেবের পদের ঘোষা কীর্তন গানের কিছু সাধক। ওরাই দেখাল এটা। মা, তুমি এসে পড় দেখি পটখান।’
মন্দিরা জোরে জোরে পটের লেখা পড়তে লাগল -
“পাচে মহাপ্রভু তৈরপরা আসি করায়ার তীরে রহিলা। পাচে যেমন রাজা নরনারায়ণ হই উপর দেশর পরা অনেক লোকক নমাই আনি শঙ্করক গোমস্তা পাতি রাজ্য বসাইবে দিতে মাত্র, তেখানে চৈতন্য ভারতী প্রভু মাধব দর্শনে মনি কুটে আসিলা। বরাহকুণ্ডর উপরে গোঁফাত রহি মাধব দর্শন হৈল। পাচে রত্নেশ্বর বিপ্রক শরণ লগাই ভাগবত পঢ়াই রত্নপাঠক নাম দি মাধবর দ্বারত ভাগবত গঢ়িবে দিলা আরত যাত্রা মহোৎসব স কীর্ত্তন কর্ম্মকো মাধবর দ্বারত প্রবর্তাইলা। পাচে মহাপ্রভু পরশুকুঠারে যাই নামর নির্নয় লেখি ব্ৰহ্মকুণ্ডত স্নান করি উলটি আসি গোঁফাতে রহিলা।”
‘বাঃ, কী মিষ্টি গলা তোমার মা, বৃদ্ধ পটুয়া বলল।
‘শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু রাজা নরনারায়ণের সময় আসামে গেছিলেন?’ কুমুদরঞ্জন অবাক। ‘তা কীভাবে সম্ভব?”
‘এজন্যই তো পণ্ডিতদের জন্য পটে লিখে আনলাম গো, বৃদ্ধ পটুয়া হেসে বলল। ‘সদ্য লেখা। এখনো গান বাঁধি নি। পণ্ডিতরা আগে যাচাই করুক, তারপর গান বাঁধব। ও রঘু, ভাঁজ কর। এবার যেতে হবে।’
কিশোর এগিয়ে এল। ছিদাম বলল – “খুব ভাল পট তোমাদের।’ -
কিশোর মাথা নেড়ে বলল, “খুশি মনে যা দেবার দাও। নিয়ে আমরা এগোই।’ বুড়ো পটুয়া বলল, ‘আমি কিন্তু ঈশ্বরবৃত্তির চাল ছাড়া অন্য চালে অন্নভোজন করি না।’
‘চিন্তা নেই। নীলমাধবের যে চালে অন্নভোগ হয় সেই চালই আমি তোমায় দেব। আমি সাজিয়ে সিধে নিয়ে আসছি,’ মন্দিরা বাড়ির ভিতর ঢুকে গেল। পিছন পিছন ছিদামও গেল। কিছুক্ষণ পর দু‘জনে ফিরে এল। ছিদামের মাথায় ধামা ভরা চাল। তার ওপর ক্ষেতের বেগুন, শশা, একটা লাউ।
প্রাণনাথ জানে এই ধামার চালের ভিতর পাচার হচ্ছে মৃদঙ্গমের লেখা কাগজের পৃষ্ঠাগুলো। ওর বুক দুরদুর করছে। ছিদাম পারবে তো?
মাঝিরা তখনও সেখানে দাঁড়িয়ে। ছিদামের মাথায় ধামা দেখে ওদের চোখে চোখে ইশারা হয়ে গেল। একজন মাঝি এগিয়ে এসে বৃদ্ধ পটুয়াকে বলল, ‘দাদু। খেয়া ধরবে তো?’
‘খেয়া ধরব না তো কি হাওয়াই জাহাজ ধরব?’ বুড়ো পটুয়া গালের খোঁচা খোঁচা দাড়িতে হাত বোলাতে বোলাতে একগাল হাসল।
‘দাও, আমি তোমার এই সিধে নৌকায় তুলে দিই,’ মাঝি বলল।
প্রাণনাথ প্রমাদ গুনল। লোকটার মতলব ভাল না। ছিদাম কিন্তু লোকটাকে এতটুকু আমল দিল না দেব।’ - “তুমি তোমার কাজে যাও গে। আমি নৌকায় তুলে
২৮৩। প্ৰাণনাথ হৈও তুমি
মাঝি নাছোড় - ‘আরে দাও দাও। এত ভাল গান শুনলাম, এটুকু কাজ করলে তো পুন্যি হবে।’ লোকটা ছিদামের মাথা থেকে ধামাটা ধরার জন্য হাত বাড়াল।
ছিদাম এবার রাগ দেখাল - বললাম তো দরকার নেই!
‘আমি যখন বলছি দরকার আছে, তখন দরকার আছে। দেঃ! দেখি ভিতরে কী আছে?’ লোকটা চালের ধামা কাড়তে গেল। টানাটানিতে লাউটা মাটিতে পড়ে গেল। লোকটা কেড়ে নিল চাল ভরা ধামা ছিদামের মাথা থেকে।
প্রাণনাথের গলা শুকিয়ে গেল ভয়ে। এবার ধরা পড়ে যাবে। তারপর? মাঝি ধামাটা উল্টে দিল মাটিতে – বুড়ো পটুয়া হাঁ হাঁ করে ছুটে গেল ওর দিকে।
প্রাণনাথ হতবুদ্ধি। কিন্তু আরও বিস্মিত হল এই দেখে যে চাল মাটিতে ছড়িয়ে গেছে কিন্তু ভিতরে কাগজের একটা পাতাও নেই।
বুড়ো পটুয়া মাথা চাপড়াতে লাগল। অপ্রস্তুত মাঝি বলল, ‘আমি চাল তুলে দিচ্ছি ধামায়।’
*আমি বললাম না দেবতার চাল ছাড়া আমি অন্নভোজন করি না। তুই নিয়ে যে এই চাল। মাটিতে ছড়ানো চাল আমি খাই না। আমি উপবাসে থাকব তাও ভাল, কিন্তু এই চাল আমার হেঁসেলে কিছুতেই ঢুকবে না,’ বুড়ো পটুয়া রাগে গজগজ করতে লাগল।
মাঝি যারপরনাই অপ্রস্তুত। তার কুণ্ঠিত চোখের দিকে তাকিয়ে মন্দিরা বলল, “আমি আবার সিধে বানিয়ে দিচ্ছি। ছিদাম, তুই আমার সঙ্গে আয়।’
গালি খেয়ে পুলিশের টিকটিকিগুলো উদয়নপল্লীর দিকে চলতে লাগল। কিছুক্ষণ পর ছিদাম আবার ধামা মাথায় নিয়ে বেরিয়ে এল। ধামায় ভরা চাল, উপরে কিছু বেগুন, মুলো, উচ্ছে। কিশোর ছেলেটা সেই সিধের ধামা মাথায় তুলে নিল। তিন পটুয়া খেয়াঘাটের দিকে রওনা দিল।
কিছুক্ষণ পর মন্দিরা এল প্রাণনাথের ঘরে। মুখে চাপা হাসি। ‘কেমন বোকা বানালাম?”
‘মৃদঙ্গমের কাগজগুলো?”
‘রঘু পটুয়ার মাথার সিধের চালের নিচে।’
‘কার বুদ্ধি এটা?’
‘এসব দুর্বুদ্ধি ছিদাম ছাড়া আর কার হতে পারে?’
প্রাণনাথ হাসল - ‘আমার তো হৃদপিণ্ড প্রায় বন্ধ হয়ে গেছিল।’
মন্দিরা খিলখিল করে হাসল। তারপর বলল, তোমার গলায় এখনো ভক্তি আসছে না, প্রাণনাথদা।’
‘তাহলে কি আমি পারব না?’ প্রাণনাথ চিন্তিত স্বরে বলল। ‘এত তো চেষ্টা করছি।’
‘তোমাকে উজ্জ্বলনীলমণি পড়তে হবে, তবে ভক্তি আসবে।’
‘উজ্জ্বলনীলমণি। কীর্তনের বই?’ প্রাণনাথ কখনো এই বইয়ের নাম শোনেনি। ‘উজ্জ্বলনীলমণি না পড়লে কীর্তন বোঝা যায় না। কীর্তনে মোট চৌষট্টি রস আছে। এজন্য কীর্তনীয়াকে শুধু সংগীতজ্ঞ হলেই চলে না, তাকে রস আত্মস্থ করতে হয়। গুণীজনে বলেন বৈষ্ণব পদাবলী হল মন্ত্র, আর উজ্জ্বলনীলমণি হল সেই মন্ত্রপ্রয়োগ পদ্ধতির আকর গ্রন্থ। ভাল কীর্তনীয়া হতে গেলে বৈষ্ণবতত্ত্বের সঙ্গে পরিচিত হতে হবে। শ্রীমদ্ভাগবত, ভক্তিরসামৃতসিন্ধু, উজ্জ্বলনীলমণি, শ্রীচৈতন্যভাগবত, শ্রীচৈতন্যচরিতামৃত, রসমঞ্জরী, উজ্জ্বলচন্দ্রিকা, অলঙ্কারকৌস্তভ - এই কয়েকটা বইয়ের পাঠ আবশ্যক। কীর্তন যারা শোনে তারা যদি একবার উজ্জ্বলনীলমণি পড়ে নেয় তাহলে তারা বুঝতে পারবে কীর্তন কীভাবে শুনতে হয়।’
‘কে লিখেছেন?”
‘রূপ গোস্বামী। বইটা সন্ধ্যারতির আগে দিয়ে যাব।’
সন্ধ্যাবেলা মন্দির যাওয়ার সময় মন্দিরা খড়ুটি ঘরে ঢুকল। ‘বই।’
লাল শালুতে মোড়া। প্রাণনাথ দেখল -
উজ্জ্বলনীলমণি ~ শ্রীরূপ গোস্বামী
গীতগোবিন্দম্ ~ জয়দেব
‘তোমার ভক্তিমার্গ প্রশস্ত করে দেবে রূপ গোস্বামীর এই বই। ‘আমার ভক্তি হল এক সরু গলি যার দু‘পাশে অবিশ্বাসের দেওয়াল। ও মার্গ কখনো প্রশস্ত করা যাবে না। ‘
‘তুমি পড়েই দেখ না।’
‘তুমি এতসব বই পড়েছ?’
‘বাবা আমাকে আর দাদাকে পড়িয়েছিল। মনে গেঁথে রয়েছে। তাও বারবার পড়ি। দাদা তো পাশে পাশে পেন্সিল দিয়ে দাদার মতামত লিখে রেখেছে।’
“আচ্ছা?” বইটা খুলে পাতা ওল্টাতে লাগল প্রাণনাথ। সত্যিই মাঝে মাঝে পাতার নিচে, পাশে পেন্সিলের ছোট ছোট নোটস। মৃদঙ্গম খুব মন দিয়ে পড়েছে রূপ গোস্বামীর উজ্জ্বলনীলমণি।
*মধুর রস কী, তা শিখিয়েছে,’ মন্দিরা বলল। ‘একে কীর্তনের দেহের রক্তস্রোত বলতে পার।’
‘কী এই মধুর রস?’
‘নাট্যশাস্ত্রকার ভরত মুনি নব রসের কথা বলেছিলেন – শৃঙ্গার, হাস্য, করুণ, রৌদ্র, অদ্ভুত, বীর, ভয়ানক, বীভৎস ও শান্ত। কিন্তু বৈষ্ণবদের রস হল পাঁচটি - শান্ত, দাস্য, সখ্য, বাৎসল্য ও মধুর। পদাবলীতে সখ্য আর বাৎসল্যরসের পদ খুব বেশি নেই, কিন্তু রাধার বয়ঃসন্ধি, পূর্বরাগ থেকে শুরু করে মাথুরের বিরহগীতি পর্যন্ত হাজার হাজার মধুর রসের পদ লেখা হয়েছে। এই মধুর রস হল রসিক বৈষ্ণবদের কাছে সবচেয়ে প্রধান রস। আর এই রস রূপ গোস্বামী উজ্জ্বলনীলমণিতে ব্যাখ্যা করেছেন।’
“আর বাকি চারটে রস?’
‘সেগুলোও রূপ গোস্বামী ব্যাখ্যা করেছেন, তবে অন্য বইতে। সেই বইয়ের নাম হল ভক্তিরসামৃতসিন্ধু।’
‘আরও কিছু বল এই মধুর রস সম্বন্ধে।’
‘অনেকটা আমাদের শৃঙ্গার রসের মত হলেও মধুর রস এক অলৌকিক রস। এই রসের মাধ্যমেই শ্রীকৃষ্ণের মনের অবস্থা ফুটিয়ে তোলে কীর্তনীয়া।’
প্রাণনাথ চুপ করে রইল। মন্দিরা বুঝল মাথায় ঢোকেনি কিচ্ছু। সে বলল, ‘একদিনে এত কিছু বোঝাতে গেলে সব গণ্ডগোল হয়ে যাবে। তুমি বইটা পড়া শুরু কর। আমি তোমায় রোজ একটু একটু করে শেখাব এই মধুর রস।’
উজ্জ্বলনীলমণি পড়তে পড়তে প্রাণনাথ বুঝল এটা এক অভিনব সম্পদ। শৃঙ্গার রসে আবিষ্ট নর-নারীর মনঃসমীক্ষণ করেছেন এই রূপ গোস্বামী। তিনি শ্রীকৃষ্ণের সঙ্গে রাধিকা ও গোপাঙ্গনাদের বৃন্দাবনলীলাকে আশ্রয় করে লিখেছেন বটে এই বই, কিন্তু পার্থিব জীবনে মানুষের প্রাণের কথা, প্রেম-প্রণয়-ভালবাসা, উদ্বেগ, আনন্দ, উচ্ছ্বাস সব ফুটে উঠেছে বইটির প্রতি ছত্রে। প্রাণনাথ ফ্ৰয়েড, কার্ল ইয়ুন কিছুমাত্রায় পড়েছে, ওর পড়াশোনার পরিধি থেকে নিশ্চিত যে মানুষের মনস্তাত্ত্বিক বিষয়ে এত গভীর আলোচনা বিশ্বের মননশীল পাঠকের দরবারে অবশ্যই পরিচয় লাভের যোগ্য।
মন্দিরা যখন খাবার দিতে এসে বলল, ‘মধুর রস কী তা বুঝলে?” ‘আবছা আবছা। আলোর অভাবে বেশিক্ষণ পড়তে পারি নি।’
‘মধুর রসের গানই লীলাকীর্তনে বেশি শোনা যায়। মধুর রসের দুটো ভাগ। শ্রীকৃষ্ণ যখন রাধাকে মিলনের আকাঙ্ক্ষা করছেন অথচ রাধাকে পাচ্ছেন না, তখন যে অতৃপ্ত আকুতি তাকে বলে বিপ্রলম্ভ, আর অবশেষে মিলনের যে উল্লাস তাকে বলে সম্ভোগ। এবার থেকে যখন কীর্তন শুনবে, তখন খেয়াল করে দেখ ঝুলন, হোলি, রাস, নৌকাবিলাস এরা সব হল সম্ভোগ। এই সব কীর্তনে মিলনের উল্লাস প্রকাশ পায়। আর বিপ্রলম্ভ শুনতে পাবে পূর্বরাগের গানগুলিতে যেখানে মিলনের আকুতি প্রকাশিত হয়।’ -
‘পড়তে হবে বইটা ভালভাবে,’ প্রাণনাথ বইটাতে হাত বোলালো। ‘আশ্চর্য, আমাকে কেউ কখনো এই বইয়ের কথা বলেনি কেন?”
‘বইটা তুমি পড়ে দেখ। আমি বলছি তোমার খুব ভাল লাগবে,’ মন্দিরা বলল। ‘রূপ গোস্বামীর ভক্তিরসামৃতসিন্ধু ও উজ্জ্বলনীলমণি দেহকে মন্দির বানিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। রূপ গোস্বামীর শ্লোকে মানুষ তার নিজের অন্তরকে দেখতে পায়। মহাপ্রভু শ্রীচৈতন্যদেব রূপ গোস্বামীর শ্লোক পড়ে মুগ্ধ হয়ে স্বরূপ দামোদরকে বলছিলেন -
আমার অন্তরবার্তা রূপ জানিল কেমনে?
নিজেকে জানতে পারলে দেহ মন্দির হয়ে ওঠে। আর দেহ একবার মন্দির হয়ে উঠলে সেখানে কীর্তন সহজেই প্রকৃত স্থান পায়। মনে রাখতে হবে শ্রোতাদের মধ্যে অনেক সাধক ভক্ত থাকেন। তাঁদের কাছে পদাবলী হল উপাসনার অবলম্বন, এক ধ্যানের পবিত্র মন্ত্র। তাঁদের মনে অতি সাবধানে রসোদ্রক করা ও ভাব সঞ্চার করতে হলে নিজেকে সেই স্তরে জ্ঞানে, ভাবে উত্তীর্ণ করতে হবে। শুধু হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ বলে চেঁচালেই কীর্তন হয় না। রসে, ভাবে, ভাষায়, মাধুর্যে সফল কীর্তনীয়া শ্রোতাদের “ন বাহ্যং ন বেদনান্তরং” অবস্থা করে ছাড়ে।’
পরদিন সকাল থেকে প্রাণনাথ আবার ডুবে গেল উজ্জ্বলনীলমণিতে। পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে বর্ণনা করেছেন কবি প্রেমের পূর্বরাগ। আখের একটা মাত্র শিকড় থেকে অঙ্কুর হয়, সেই অঙ্কুর বড় হয়ে ইক্ষুদণ্ড আসে। ইক্ষুদণ্ডের বুকে আসে রস। সেই রস থেকে সৃষ্টি হয় গুড়, খণ্ড, শর্করা। তেমনি প্রেমের ক্ষেত্রে পূর্বরাগ হল প্রেমের অঙ্কুর। মনের সেই অঙ্কুর ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে আর মনে অনুরাগ, প্রেম ও প্রণয় সঞ্চারিত হয়। ওর পড়তে পড়তে মনে হল এই অপরূপ মাধুর্য্য এবং মাহাত্ম্যের শিক্ষা অবলুপ্ত হতে দেওয়া ঘোর অনুচিত।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন