একাত্তর অধ্যায়

শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

একাত্তর

বড়বউ যে তন্ত্রমন্ত্র জানে তা তো জানত না বাসন্তী। মন্দিরের ভিতরে যে কালীমূর্তি রয়েছে তেমনটা জন্মেও দেখেনি সে। চৌকোমতো বিশাল মুখ, অ্যাই বড় বড় চোখে কী ভীষণ দৃষ্টি, আর সবচেয়ে আশ্চর্যের হচ্ছে জিবখানা। লাল টকটকে রক্ত মাখা জিবখানা তিন হাত নেমে পেটের নীচ অবধি চলে এসেছে। সেই মূর্তির মুখোমুখি লালপাড় গেরুয়া রঙের ছালের শাড়ি পরা বড়বউ বাসন্তীর দিকে পিছন ফিরে বসা। মাথার চুল পিঠ ঝেঁপে নেমে এসেছে বন্যার মতো। কীসব মন্তর যেন বলছে বড়বউ, বাসন্তী কি আর মন্তর-তন্তর বোঝে! সে শুধু হাঁ করে চেয়ে দেখছে কাণ্ডখানা। আজ কী একটা সর্বনাশ যেন হবে। কী হবে তা জানে না বাসন্তী, শুধু তার বুকটা দৌড়চ্ছে খুব। ডুগডুগির মতো আওয়াজ হচ্ছে বুকের ভিতরে। বড়বউয়ের মুখখানা দেখা যাচ্ছে না বটে, কিন্তু ভয়ে ভয়েও দেখতে বড় সাধ হচ্ছে বাসন্তীর। দেখলে হয়তো মূছাই যাবে। তবু না দেখেই বা থাকে কী করে সে? ভয়ে, দুশ্চিন্তায় তার চোখ ভর্তি জল, হেঁচকি তুলে তুলে ফেঁপাচ্ছে সে। ঠাকুর আমার কী হবে গো?

ঠিক এই সময়ে বড়বউ খুব ধীরে ধীরে মুখখানা ফেরাতে শুরু করল, মন্ত্রমুগ্ধের মতো চেয়ে আছে বাসন্তী। কী দেখবে, কাকে দেখবে কে জানে, কিন্তু চোখ যে ফিরিয়ে নেওয়ারও সাধ্য নেই তার। ঘাড় শক্ত হয়ে আছে। হার্টফেল হবে নাকি তার?

এলোচুলে আধখানা ঢাকা মুখখানা যখন তার দিকে ফিরে তাকাল তখন বাসন্তী দেখতে পেল, বড়বউয়ের মুখখানা কী সুন্দর। যেন লক্ষ্মীপ্রতিমা। কেমন পানপাতার মতো ডৌল, কী সুন্দর নাক, মুখ চোখ। কিন্তু চোখ দুখানা যেন জ্বলছে। দাউ দাউ করে জ্বলছে। অত বড় বড় চোখ যেন বাসন্তীকে ভস্ম করে দেবে।

বড়বউ একটু হেসে কঠিন হিমশীতল গলায় বলল, এসেছিস! তোর জন্যই বসে আছি। আয়, কাছে আয়… আয়,..

আর কাঁদতে কাঁদতে বাসন্তী হামাগুড়ি দিয়ে এগোবার চেষ্টা করছে। বড়বউ, তার কথা মান্যি না করলে উপায় আছে? বাসন্তী কি পারে মান্যি না করে ছুটে পালাতে? সে সাধ্যি তার নেই। কিন্তু সে কাঁদছে, ভীষণ কাঁদছে, আর এগোচ্ছে। কী হবে তা কে জানে। কোন সর্বনাশ!

ও দিদি, মাপ করে দাও, পায়ে পড়ি তোমার… ও দিদি…

নিজের চিৎকারেই ঘুম ভেঙে গেল বাসন্তীর। নিশুত রাতে, ধড়াস ধড়াস করছে বুক, গলা শুকিয়ে কাঠ, গাল বেয়ে চোখের জলের ভাসাভাসি। ঘুমের মধ্যেও কাঁদছিল সে। ভয়ে সে জবুথুবু হয়ে বসে রইল কিছুক্ষণ। তলপেটে হাত রাখল সাবধানে, বাচ্চাটার কোনও ক্ষতি হবে না তো ঠাকুর? রক্ষা করো। বাথরুমে অবধি যেতে পারছিল না ভয়ে।

শেষে মুক্তাকে ডেকে তুলল সে। মরণের বাবা না থাকলে মুক্তা এ-ঘরের মেঝেতে শোয়।

স্বপ্ন দেখেছ নাকি বউদিদি?

হ্যাঁ। ভীষণ খারাপ স্বপ্ন।

কাল শনিবারে একটু বারের পূজো দিও। এ অবস্থায় খারাপ স্বপ্ন দেখা ভাল নয়।

আর ভয় দেখাসনি বাপু, এমনিতেই ভয়ে মরে আছি।

ভয়, ভয় আর ভয়। এই বাচ্চাটা পেটে আসার পর থেকেই যেন কীসব হচ্ছে। এই নিয়ে তিন চারটে খারাপ স্বপ্ন দেখল গত এক মাসে। কী হবে কে জানে! ঠাকুর-দেবতাকে ডাকা ছাড়া সে আর কীই বা করতে পারে।

বড়বউকে এত ভয় কেন তার কে জানে!

ভয় যা আছে তা তার মনের মধ্যে আছে। ঝাঁপি না খুললে তো সাপ বেরোয় না। রসিকের বড় ছেলে এল, সে এসে থেকে গেল। ভয়-ভয় ভাব ছিল বটে বাসন্তীর। কিন্তু কেটেও গেল ভয়। ভারী ভাল ছেলেমেয়ে দুটো। সুমন তো তাকে শেষ অবধি মা ডেকে গেছে। দুজনের জন্য আজকাল মায়াও হয়েছে বাসন্তীর বুকের মধ্যে। কিন্তু বড়বউ তো আর ছেলেমেয়ে নয়। তাকেই তাই সবচেয়ে বেশি ভয়। বাসন্তী তো তার ভাগীদার, সতীন, চির-শত্তুর। তার সঙ্গে তো সহজে মিলমিশ হওয়ার নয়।

তবু বাসন্তী ভালমানুষের মতো মাঝে মাঝে মরণের বাপকে বলে, একবার দিদিকেও আনো না।

সুখে থাকতে কি তোমারে ভূতে কিলায় নাকি?

আহা, কী কথা! দিদিকে আমি ঠিক জল করে দেবো।

আর আহ্লাদের কাম নাই। তারে দেখলে তো ভয়ের চোটে সিটকাইয়া থাকবা, কাপড়ে-চোপড়ে হইয়া যাইব। তোমারে তো চিনি, এক নম্বরের ডরফোক।

আহা, দিদি তো আর ভয়ের জিনিস নয়।

হ্যায় যদি বাঘিনী, তবে তুমি হইলা মেচি বিলাই।

কথার কী ছিরি বাবা। আমার কিন্তু দেখতে ইচ্ছে করে।

চাও তো লইয়া আমু, শ্যায়ে কপাল চাপড়াই।

তার চেয়ে একবার আমাকেই কলকাতায় নিয়ে চলো না। গিয়ে একটিবার প্রণাম করে আসি।

ইঃ, প্রণাম করনের লিগ্যা দেখি হাত খাউজ্যাইতাছে!

মরণের বাপ ওরকমধারাই নানুষ। মুখের আগল নেই। মনের কথা সব মুখে বলে ফেলে, জলের মতো। কিন্তু মনে একটু খটকা তো আছেই বাসন্তীর।

সে বলে, দিদির তো আমার ওপর রাগ থাকারই কথা। তার জিনিসে ভাগ বসিয়েছি না!

কার যে জিনিস হেইবে কেডা কইব? আমি হইলাম ফাটা বাঁশের মইধ্যখানে। মাইনকা চিপি আর কারে কয়। শুন তো ভালমাইনষের মাইয়া, তুমি একখানে, তাইন আর একখানে, মইধ্যখানে মেলা ফাঁক। ওই ফাঁকটুক ফাল দিয়া পার হওনের কাম নাই। বোঝলা বলদা মাইয়ালোক?

বাসন্তী যা বলে তা তার মনের কথা নয়। বড়বউয়ের সঙ্গে দেখা করার কৌতূহল থাকলেও আগ্রহ তার নেই। ভীষণ ভয় পায় সে। আর ভয়ই তার ঘুমের মধ্যে নানা দুঃস্বপ্ন হয়ে ফিরে আসে। তবু মুখে ওসবও সে বলে, তার ভালমানুষিই তাকে দিয়ে বলায়। ভাবে, না বললে খারাপ দেখাবে। তার বর হয়তো ভাববে, সে বড়বউকে হিংসে করে।

ভালমানুষ হয়ে থাকার একটা নেশা আছে। বাসন্তী অনেক সময়ে তার বরের কাছে ইচ্ছের বিরুদ্ধেও ভালমানুষ সাজে। ওই একজনের চোখে সে মন্দ হতে চায় না কখনও। সে মানুষটার মাত্র অর্ধেক পেয়েছে, সেটুকুই আগলে রাখতে হবে তো। সম্পর্কটা তো অধিকারের নয়। মাকড়সা যেমন নাভির সুতোয় ঝুলে থাকে, এও যেন খানিকটা তাই। বাসন্তীর ভয় কি একটা! তার হাজারো ভয়। একটা ভয় থেকে আর একটা ভয় জন্মায়। তারপর ভয় যেন বিরাট বড় হাঁ করে গিলতে আসে।

ঠিক বটে, রসিক তাকে সুখে মুড়ে রেখেছে। ভালওবাসে খুব। তবু কেবলই মনে হয়, তারা কি আসল স্বামী-স্ত্রী? নাকি নকল? সাজা? যাত্রাপালার মতো মিথ্যে জিনিস? বাসন্তীর বুকে ডুগডুগি কি এমনি বাজে?

তার গর্ভে ওই লোকটার ছেলে হল, মেয়ে হল, আর একটাও আসছে, তবু কি আপন হল না লোকটা? তাহলে আর কীসে আপন হবে? মাঝে মাঝে আজকাল এই এক চিন্তা হয় তার। ওই যে এক না-দেখা বড়বউ আধখানা দখল করে আছে, ওই কাঁটাই মনের মধ্যে খচ খচ করে। আধখানা নয়, হয়তো আরও বেশিই দখল করে আছে বড়বউ। হয়তো সবটুকুই। তার মায়ের মুখে বিষ আছে বটে, কিন্তু হয়তো যখন বলে তখন মিথ্যে বলে না, তুই কি আর সত্যিকারের বউ! রাখা মেয়েমানুষের বেশি নোস, এই বলে রাখলুম, পরে বুঝবি।

স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক সোজা পথে যায় না কখনও। মাঝে মাঝেই পাশ ফেরে, বাঁক নেয়। ঠিক নদীর মতোই। শুকিয়ে চর পড়ে যায়, আবার ভেসে যায় প্লাবনে। কিন্তু এ তো ঠিক দুজনের সম্পর্ক নয়। তাদের হল তিন জনের সম্পর্ক। বড়বউ যে ঠিক কেমন ধারা তা জানেই না বাসন্তী। ওই অজানের সঙ্গে সে বৃথাই লড়াই করছে হয়তো।

মাঝে মাঝে একা একা খুব কাঁদে বাসন্তী। আজও দুপুরে একা ঘরে উপুড় হয়ে শুয়ে কাঁদছিল খুব। পাশেই হাম্মি ঘুমিয়ে আছে। আজকাল তার খুব গলায় দড়ি দিতে ইচ্ছে করে। ছেলেমেয়ে দুটোর জন্য পারে না। নইলে আজকাল কেবলই মনে হয়, তার জীবনটা একটা ফক্কিকারি মাত্র। কিছু নেই তার, এই ইটকাঠের ইমারত, ক বিঘে জমি এর কি কোনও দাম আছে? মানুষটাকেই তো সে পায়নি।

হ্যাঁ লা বাসন্তী, সে কি তোকে কখনও অনাদর করে? দূর ছাই?

না না, তা করে না মানছি।

রাগী মানুষ সে, তবু কখনও তোর সঙ্গে উঁচু গলায় কথা কয়?

না, কখনও নয়।

তোকে কি অবিশ্বাস করে? তোর হাতে ছেড়ে দেয় না সব কিছু?

দেয় তো।

আর সোহাগ করে না? মন চেয়ে কথা কয় না?

সেও কয়, মানছি।

তবে তোর আর চাই কী?

তা কি আর আমি এই বোকা-বুদ্ধি দিয়ে বুঝতে পারি?

মেয়েমানুষের কি বেশি চাইতে আছে? তারা তো নিজেদের বিলিয়ে দিতেই আসে। কত লাথিঝাঁটা খায়, কত উপপাস-কাপাসে দিন কাটায়, কত গঞ্জনা, কত গর্ভযন্ত্রণা সয়, কদিন সুখের মুখ দেখে বল তো একজন মেয়েমানুষ?

তা বইকী! জানি না বুঝি!

তাহলেই দেখ, অন্য সকলের মাপে তুই কি কিছু খারাপ আছিস?

অন্যদের যে ভাগীদার নেই!

কে বলল নেই? পুরুষমানুষ জাতটাই তো ছুঁকছুঁকে। তারা কি একটি নিয়ে থাকে? আর কেউ না জুটল তো বেশ্যাপাড়ায় যেতেও ছাড়ে নাকি?

উম্মা গো! কিন্তু আমার যে অন্য যন্ত্রণা।

যন্ত্রণা কীসের? বড়বউ?

সে নয় তো কে?

তোকে তো লুকোয়নি। দেখে-বুঝেই তো গলায় মালা দিলি।

বুঝলাম? বুঝলাম কোথায়! আমার বুঝি বুদ্ধি আছে?

বুদ্ধি ভাল জিনিস। তা বলে এটাই তো সব নয়। অত যে ভালবাসিস তার দাম নেই বুঝি?

ভালবাসার কী দাম বলো!

হ্যাঁ লা, তবে কি নিষ্কন্টক হতে চাস?

চাইলে?

সর্বনাশী! তুই নিষ্কন্টক হতে চাইলে যে বড়বউকে মরতে হয়! তাই চাস? তবে মা কালীর কাছে তার মরণ চেয়ে জোড়া পাঁটা মানত কর।

বাবা গো! ও কী কথা! আমি তাই বললাম বুঝি?

তুই চাইলে সে মরবে বোধহয়, কিন্তু তারপর আর সারা জীবন তোর বরের মুখের দিকে নিষ্পাপ চোখে তাকাতে পারবি কখনও?

চাইনি গো, চাইনি।

তাহলে কী চাস পষ্ট করে বল তো!

আচ্ছা, এমন বুঝি হয় না যে, সে আমাকে ভালই বেসে ফেলল।

বড়বউ?

হ্যাঁ।

তাই কি বাসে পাগল? দুনিয়াটা কি তোর হাতের মোয়া? যা চাইবি তাই বুঝি পাওয়া যায়!

আমি তো তার পায়ে পড়তেও রাজি।

পায়ে পড়লেই যদি সব হত, ওলো, দুনিয়াটা তোর মনের মতো হবে বলেই ধরে নিয়েছিস বুঝি? অত সোজা নয়। দুনিয়া তার নিয়মে চলবে, যতই তুই চোখের জল ফেলিস আর বুক থাবড়ে হা-হুতোশ করিস। বরং দুনিয়ার নিয়ম মেনে চল দেখি।

দুনিয়ার নিয়ম যদি বুঝতুম।

কিছু পাবি, কিছু ছাড়বি— এই হল নিয়ম। সবারই তো ভাগ আছে রে, সেইটে আগে বুঝে নে। যার যার হক্কের জিনিস তার তারটা তো ছাড়তেই হবে তোকে।

ওইটেই তো সইতে পারিনা। এই একটা জিনিসই তো নিজের মতো করে চেয়েছি। আমার বর।

শোন বোকা, খুব যে বর-বর করিস, হ্যাঁ লা সে যদি আজ মরে তবে তো তোর পাখিই উড়ে গেল।

ওম্মা গো! ও কী সর্বনেশে কথা! ওরকম বলতে আছে?

কেন, সে কি মরবে না একদিন, যেমন সবাই মরে? ভেবে দেখতে বলছি, তাকে যে খানিক পেয়েছিস বলিস, কেউ কি বরকে পুরো পায়? পুরো কেউ পেয়েছে আজ অবধি? সব ওই সিকি বা আধুলি, ষোলো আনা নয়।

কিন্তু সে তো আমাকে সবটুকুই পেয়েছে। দিইনি আমি নিজের সব কিছু তাকে? জান বেটে দিইনি?

ছাই দিয়েছিস। সে তোকে রাজরানি করে রেখেছে, গায়ে আঁচটি লাগতে দেয়নি, তাই তোর অত ভালবাসার দেখনাই। তার যদি চালচুলো না থাকত, এমন ভালবাসা না থাকত তখন দেখতুম কেমন তোর একবগ্গা পিরিত।

তোমার মুখে আগুন।

তাই দে, কিন্তু ওঠ, চুল বাঁধ, সাজুগুজু কর। ওসব করলে মন ভাল হয়ে যায়।

কান্নার মধ্যেই ঘুমিয়ে পড়েছিল বাসন্তী।

ঘুম ভাঙল চেঁচানিতে।

বলি, আঁচলের আড়ালে ও কী নিয়ে যাচ্ছ গো ঠাকরোন?

তা দিয়ে তোর দরকার কী রে মাগী?

অ্যাই খবর্দার, ওসব খারাপ কথা বলবে না বলছি।

আহা, কী এমন বললুম! মাগীকে মাগী বলবে না তো কি মেসোমশাই বলতে হবে নাকি লা? বড়লোকের চাকরানি বলে কি পাখা গজিয়েছে?

কথা চাপা দিও না। আঁচলের তলায় কী দেখাও আগে।

তোর বাপের মাথা।

ঘুম ভেঙে ঝুম হয়ে বসে রইল বাসন্তী।

মুক্তার সঙ্গে মায়ের লেগেছে। দুজনে প্রায়ই লাগে। ছেলেরা আর ছেলেদের বউরা মিলে মাকে তাড়িয়েছে বটে, কিন্তু মা হল দু কান কাটা। এখনও ওই বাড়ির জন্যই তার যত টান। এ-সংসার থেকে যা পারে কুড়িয়ে বাড়িয়ে বা চুরি করে এখনও ও-বাড়িতে পাচার করা চাই। আড়ালে-আবডালে নাতি- নাতনিরা এসে দাঁড়ায়। কখনও কচুবনের আড়ালে, কখনও ঘাটে। ইশারায় কথা হয়ে যায়। মশলাপাতি, আনাজ, গম কি চাল, এক শিশি তেল, কলাটা মুলোটা যা পারে চুপি চুপি দিয়ে আসে।

মাঝে মাঝে বাসন্তী বলে, হ্যাঁ মা, শুধু তাদের ভালটা দেখলে, তোমার জামাইয়ের ভালটা দেখলে না? তারা যখন মারধর করে হিঁচড়ে পথে বের করে দিয়েছিল তখন তোমার জামাই-ই তো তোমাকে তুলে এনে রেখেছে। তবু এ-সংসারের দিকে তোমার টান নেই কেন? এত অবিচার কি ধর্মে সইবে?

বুড়ি তটস্থ হয় বটে, তবে হার মানে না। বলে, না খেয়ে মরছে দু চোখে দেখে থাকি কী করে বল? তোর তো ভাসাভাসি, না হয় দিলামই একটু খুদ কুঁড়ো।

তা দিতে হলে বলেই তো নিতে পারো। চুরি করে দাও কেন?

আহা, চুরি হতে যাবে কেন, আমার কি হক নেই! তুই পেটের মেয়ে নোস?

বিয়ে হলে মেয়ে পর হয়ে যায়, এ তুমি জানো না? খেয়ে পরে আছ, সেই ঢের। বেশি বায়নাক্কা দেখলে কিন্তু অন্য ব্যবস্থা করতে হবে।

শুনে মরে যাই, বলি মানুষের মতো কি রেখেছিস? গুদোমঘরটায় ইঁদুর বেড়ালের মতো পড়ে আছি, ও কি থাকা হল? ওদিকে দালানকোটার ঘরগুলো তো হাঁ-হাঁ করছে, দরদ থাকলে না হয় দিতি একখানা ভাল ঘর। পাঁচজনে দেখে যে মুখে থু-থু দিচ্ছে তোর। বড় মুখ করে আবার বলতে এয়েছে, খাওয়া-পরা দিচ্ছে। কুকুর-বেড়ালকেও লোকে দেয়, বুঝলি? অত বড়াই করতে হবে না, তোরটাই কি থাকবে ভেবেছিস? উড়ে পুড়ে আংড়া হবে একদিন, দেখিস, মেগে-পেতে খাবি।

শুনে বড় ভয় পেয়ে যায় বাসন্তী। মা তো নয়, ডাইনি, কোনও কথা মুখে আটকায় না। শাপশাপান্তকে বড্ড ভয় তার। যদি ফলে যায়! তাই আর কথা বাড়ায় না সে।

কিন্তু মুক্তার ওসব ভয়-টয় নেই। সে প্রায়ই ঝেড়ে কাপড় পরায় মাকে। এখনও তার ঝনঝনে গলা আসছিল উঠোন থেকে। তুমুল হচ্ছে দুজনে।

মায়ের জন্য রসিক ভাল ব্যবস্থাই করতে চেয়েছিল। মরণের পড়ার ঘরের পাশের ঘরখানা। দিব্যি বড়-সড় আলো-হাওয়ার ঘর। কিন্তু বাসন্তীই রাজি হয়নি। বলেছিল, ভাল ঘরদোর পেলে পেয়ে বসবে, আর কখনও ফিরে যেতে চাইবে না। আর মায়ের মন তো জানি, চোরাপথে ছেলেদেরও আনাগোনা শুরু হবে। জেনেশুনে ঘরে খাল কেটে কুমির আনতে পারব না। আতান্তরে পড়েছে, দুদিন ওই লাকড়ির ঘরেই থাক। নইলে পেয়ে বসবে।

কথাটা খুব মিথ্যেও বলেনি বাসন্তী। সে জানে তার দাদারা ওত পেতেই আছে। সুযোগ পেলেই ঝাঁপিয়ে পড়বে।

অশান্তি আর ভাল লাগে না বাসন্তীর। একে সে মরছে নিজের মনের হাজারো জ্বালায়।

সে বারান্দায় এসে দেখল, মা উঠোনের অন্য প্রান্তে দাঁড়িয়ে। আঁচলের আবডালে একটা ছোট ধামা গোছের কিছু। আর এদিকে মুক্তা, তার হাতে উঠোন পরিষ্কার করার ঝাঁটাখানা, সেইটে আস্ফালন করেই সে বলছিল, আর কত এ-বাড়ির সর্বনাশ করবে ঠাকরোন? তোমার চেয়ে কালসাপও ভাল।

মা ঊর্ধ্বমুখ হয়ে তার দিকে চেয়ে বলল, শুনলি লা আস্পদ্দার কথা!

বাসন্তী মুক্তাকে একটা ধমক দিল, চুপ কর তো মুক্তা। আর চেঁচামেচি ভাল লাগছে না।

মুক্তা ওপর দিকে চেয়ে বলল, যদি দানছত্তর খুলে থাকো তাহলে বলার কিছু নেই, এ-বাড়ির ভালমন্দের সঙ্গে জুড়ে আছি বলে বলি, নইলে আমার কী? গতকালও আড়াই কেজি গম গেছে ও- বাড়িতে। এই দেখ, আবার কী যায়। পটলি ছুঁড়িটাকে তো দেখলুম ওই হোথা কচুবনের মধ্যে গা ঢাকা দিয়ে আছে শেয়ালের মতো। নিত্যি আসে। বলি, বাবুর ভিটেতে কি ঘুঘু চড়াবে শেষ অবধি? দুধ-কলা দিয়ে কালসাপ পোষা বই তো নয়।

বড় হতাশ লাগে বাসন্তীর। কথা না বাড়িয়ে সে ঘরে চলে এল, যা হচ্ছে হোক, সে আর ওসবের মধ্যে থাকবে না।

আবার মনে হয়, সে কী কথা! কত বিশ্বাস করে, কত নির্ভরতায় নিজের রক্ত জল করা বিষয় সম্পত্তি তার হাতে দিয়ে বসে আছে লোকটা। বাসন্তীর কি দায় নেই? সে কি পারে সব উড়িয়ে-পুড়িয়ে দিতে? এসব রক্ষে করার জন্যই না সে বহাল আছে এখানে!

বিকেলে সে গিয়ে শান্তভাবেই মাকে বলল, অনেকদিন তো হল মা, এবার বরং বাড়ি যাও।

তাড়িয়ে দিচ্ছিস নাকি লা?

মেয়ের বাড়িতে থাকা কি ভাল? খারাপ দেখাচ্ছে না?

সে আগেকার দিনে বড় বড় বাড়িতে ওসব মানত। আমাদের মতো হাঘরেদের আবার নিয়ম কী লা? কেন, জামাই কিছু বলেছে?

সে বলার মতো লোক নয়, তুমিও তা জানো। মিথ্যে কথা বলব কেন মা, আমারই ব্যাপারটা ভাল লাগছে না।

হ্যাঁরে, আমি তোর সৎমা?

তাই কি বললুম! বরং তোমাকে মাসে মাসে কিছু থোক দেবোখন, যদিও তোমার ছেলেরা টের পেলে কেড়ে নেবে। তবু বলি আলগা থাকাই ভাল।

বুঝেছি বাপু, বুঝেছি। তোর সুখের সংসারে আমার শ্বাসটুকুও তোর সহ্য হয় না, কী চোখেই যে দেখলি আমাকে কে জানে! তা তোর আর দোষ কী? তুই কি আর সেই বাসন্তী আছিস? মন্তর করে তোর মাথাটাই খেয়ে রেখেছে বাঙাল। নইলে নিজের গর্ভধারিণী মাকে এমন অচ্ছেদ্দা কেউ করে?

বলে মা কাঁদতে বসল, বাসন্তী জানে, কান্নাটা ও-মানুষের মধ্যেই আছে। চোখে জল এনে ফেলতে দেরি হয় না।

খুব ক্লান্ত গলায় বাসন্তী বলল, সে তুমি যা ভাল বোঝো ভেবে নিও, কিন্তু বাড়ি ফিরে যাও। শত হলেও সেটা তোমার স্বামীর ভিটে। জামাইয়ের বাড়িতে থাকলে লোকে দুয়ো দেবে।

বাসন্তী চলে এল নিজের ঘরে। মন ভাল নেই। সংসারের এইসব তুচ্ছ, সংকীর্ণ ব্যাপার তার আর ভাল লাগে না। মনটা বড় ক্ষ্যাপা হয়ে আছে।

আজ শুক্রবার। শনিবার তার মন ভাল হয়। তার বর আসে। দুটো দিন তার মন ভরে থাকে।

এবার এলে সে বরের কাছে সব বলবে। সব মনের কথা, ভয়ের কথা, মন খারাপের কথা। বলে বলবে, আমার কী হবে বলে দাও। আমি কি সত্যিই তোমার কেউ হই?

কই গেলা গো?

ভীষণ চমকে গেল বাসন্তী। কার গলা! আজ তো তার আসার কথা নয়।

দৌড়ে বারান্দায় গিয়ে ঝুঁকে দেখল, রসিক দুটো মস্ত ব্যাগ বারান্দায় নামিয়ে রাখছে। দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে নেমে আসছিল বাসন্তী। রসিক কাণ্ড দেখে চেঁচিয়ে উঠল, আরে কর কি পোয়াতি মানুষ? পিছলাইয়া পড়বা নাকি?

সকল অধ্যায়
১.
প্রথম অধ্যায়
২.
দ্বিতীয় অধ্যায়
৩.
তৃতীয় অধ্যায়
৪.
চতুর্থ অধ্যায়
৫.
পঞ্চম অধ্যায়
৬.
ষষ্ঠ অধ্যায়
৭.
সপ্তম অধ্যায়
৮.
অষ্টম অধ্যায়
৯.
নবম অধ্যায়
১০.
দশম অধ্যায়
১১.
একাদশ অধ্যায়
১২.
দ্বাদশ অধ্যায়
১৩.
ত্রয়োদশ অধ্যায়
১৪.
চতুর্দশ অধ্যায়
১৫.
পঞ্চদশ অধ্যায়
১৬.
ষোড়শ অধ্যায়
১৭.
সপ্তদশ অধ্যায়
১৮.
অষ্টাদশ অধ্যায়
১৯.
ঊনবিংশ অধ্যায়
২০.
বিংশ অধ্যায়
২১.
একবিংশ অধ্যায়
২২.
দ্বাবিংশ অধ্যায়
২৩.
ত্রয়োবিংশ অধ্যায়
২৪.
চতুর্বিংশ অধ্যায়
২৫.
পঞ্চবিংশ অধ্যায়
২৬.
ষড়বিংশ অধ্যায়
২৭.
সপ্তবিংশ অধ্যায়
২৮.
অষ্টাবিংশ অধ্যায়
২৯.
ঊনত্রিংশ অধ্যায়
৩০.
ত্রিংশ অধ্যায়
৩১.
একত্রিংশ অধ্যায়
৩২.
দ্বাত্রিংশ অধ্যায়
৩৩.
ত্রয়োত্রিংশ অধ্যায়
৩৪.
চতুর্ত্রিংশ অধ্যায়
৩৫.
পঞ্চত্রিংশ অধ্যায়
৩৬.
ষট্ত্রিংশ অধ্যায়
৩৭.
সপ্তত্রিংশ অধ্যায়
৩৮.
অষ্টত্রিংশ অধ্যায়
৩৯.
ঊনচল্লিশ অধ্যায়
৪০.
চল্লিশ অধ্যায়
৪১.
একচল্লিশ অধ্যায়
৪২.
দ্বিচল্লিশ অধ্যায়
৪৩.
ত্রিচল্লিশ অধ্যায়
৪৪.
চতুর্চল্লিশ অধ্যায়
৪৫.
পঞ্চচল্লিশ অধ্যায়
৪৬.
ষট্চল্লিশ অধ্যায়
৪৭.
সপ্তচল্লিশ অধ্যায়
৪৮.
অষ্টচল্লিশ অধ্যায়
৪৯.
ঊনপঞ্চাশ অধ্যায়
৫০.
পঞ্চাশ অধ্যায়
৫১.
একান্ন অধ্যায়
৫২.
বায়ান্ন অধ্যায়
৫৩.
তিপ্পান্ন অধ্যায়
৫৪.
চুয়ান্ন অধ্যায়
৫৫.
পঞ্চান্ন অধ্যায়
৫৬.
ছাপ্পান্ন অধ্যায়
৫৭.
সাতান্ন অধ্যায়
৫৮.
আটান্ন অধ্যায়
৫৯.
ঊনষাট অধ্যায়
৬০.
ষাট অধ্যায়
৬১.
একষট্টি অধ্যায়
৬২.
বাষট্টি অধ্যায়
৬৩.
তেষট্টি অধ্যায়
৬৪.
চৌষট্টি অধ্যায়
৬৫.
পঁয়সট্টি অধ্যায়
৬৬.
ছেষট্টি অধ্যায়
৬৭.
সাতষট্টি অধ্যায়
৬৮.
আটষট্টি অধ্যায়
৬৯.
ঊনসত্তর অধ্যায়
৭০.
সত্তর অধ্যায়
৭১.
একাত্তর অধ্যায়
৭২.
বাহাত্তর অধ্যায়
৭৩.
তিয়াত্তর অধ্যায়
৭৪.
চুয়াত্তর অধ্যায়
৭৫.
পঁচাত্তর অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%