শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
প্রস্ফুটিত কমলের মতো তোমার আশ্চর্য আনন। মনে হয় এখনই মধুকর গুনগুন করে উড়ে এসে ভুল করে ফুল ভেবে বসবে ওই আননে। এইভাবে পুরুষের স্তাবকতা শুরু হল, শেষ হল না আজও। কত ভূর্জপত্র, তালপাতার পুঁথি, কত কাগজ আর কলমের কালি খরচ হয়ে গেল, রচনা হল কত কাব্য, মহাকাব্য, নাটক, উপন্যাস। উপমায় উপমায় চাঁদ, ফুল, শ্রাবস্তীর কারুকার্য গেল ফুরিয়ে। পুরুষ দমেনি এখনও।
দেখন-সুন্দরী না হলেও হয়। হয়তো মুখে জুতসই একটা তিল বা আঁচিল, ঠোঁটের একটু অভিমানী ভাঁজ, মুখের ডৌল, চোখ বা চাহনি, হয়তো বা গজদন্ত, গালের টোল কিছু একটা হলেই হল। বোকা পুরুষ তাই নিয়েই মাতল, মজল, পাগল হল। ডোবাল জাহাজ, ছারখার করে দিল দেশ, লাগাল ধুন্ধুমার যুদ্ধ। না পারলে হয়তো মদ খেয়ে হল দেবদাস বা কবি, আত্মহত্যা করে বসল, পাগল বা সাধু হয়ে গেল।
হ্যাঁ গা, শুধু রূপটুকু চাই? কুরূপার বুঝি প্রেম নেই?
ওই যে বারান্দার উত্তর কোণে এসে বসে আছে রাইকিশোরী। সামনে মুড়ির বস্তা, বেতের দাড়িপাল্লা নামিয়ে রেখে আঁচলে মুখের ঘাম মুছছে। ওর একটুও শ্রী নেই। খর্বুটে পুরুষালি গড়ন, দাঁত উঁচু, মুখে অনেক খানাখন্দ। কোনও পুরুষ বিরলে বসে একবারটিও ভাববে না ওর কথা। এক লাইন কবিতাও কোথাও লেখা হবে না ওর জন্য। তবু হয়তো ওরও একদিন বিয়ে হয়ে যাবে। প্রকৃতির নিয়মে ছেলেপুলে হবে, সংসার করবে। কিন্তু প্রেম হবে না।
আজ সে জানালা দিয়ে চেয়ে মুড়িউলি রাইকিশোরীকে দুপুরের আলোয় দেখছে আর রূপের কথা আর বেহদ্দ পুরুষের কথা ভাবছে।
আজ জানালা দিয়ে কে তার বিছানায় একখানা ভাঁজ করা প্রেমপত্র ফেলে দিয়ে গেছে। ভাল কাগজও জোটেনি। শস্তা এক্সারসাইজ বুকের একখানা ফ্যাঁস করে ছেঁড়া পাতা। হাতের লেখাটা অবশ্য তত খারাপ নয়।
আজকাল আবৃত্তিকারদের কল্যাণে জীবনানন্দ ঘরে ঘরে। চিঠির মধ্যেও সেই বিদিশার নেশা, পাখির নীড়ের মতো চোখ, হালভাঙা নাবিক এইসব আছে। ভাল করে পড়লও না পান্না। তার সতেরোখানা প্রেমপত্রের সঙ্গে আঠেরো নম্বরটাও রেখে দিল চন্দনকাঠের বাক্সে। নীচে যার নাম সই সেই মণীশকে সে চেনেও না। হয়তো কারও বাড়িতে এসেছে। কারও আত্মীয়স্বজন হবে।
প্রেমপত্র পেলে পান্না খুশি হয় না। আবার রেগেও যায় না। আসলে তেমন কোনও প্রতিক্রিয়াই হয় না তার। এসব ছ্যাবলাদের সঙ্গে নিজেকে ভাবতে তার ইচ্ছেই হয় না কখনও।
তবু ট্রফি হিসেবে থাকে। প্রেমপত্র একধরনের সার্টিফিকেটও তো বটে।
দুপুরবেলাটা গড়িমসি। আলিস্যিতে ভরা তার শরীর। তবু উঠতে হল। আজ বড়মার বাড়িতে তার নেমন্তন্ন। নেমন্তন্ন প্রায়ই থাকে। একা ফাঁকা বাড়িতে বড়মা একা বসে খায় বলে তাকে প্রায়ই ডেকে পাঠায়। কিন্তু বড়মার বাড়িতে সে কিছুতেই মাছটা খেতে পারে না।
বড়মা অবশ্য জোর করে, কেন মাছ খাবি না? খা, একটু তফাতে বসে খেলেই হবে।
না বড়মা, নিরামিষই ভাল।
তোর যে তাহলে পেট ভরবে না?
কেন বড়মা? গোবিন্দভোগ চালের ভাত, সরবাটা ঘি, আলুভাজা, পোস্ত, আলুর দম, টক—এতেও ভরবে না?
তাহলেও তোর কষ্ট তো হবে।
একটুও না। মাছে আমার আজকাল আঁশটে গন্ধ লাগে।
আজ অবশ্য তা নয়। আজ নেমন্তন্ন করেছে পারুলদি, কী সব চাইনিজ আর ইটালিয়ান রান্না করবে বলে নানারকম জিনিস আনিয়েছে কলকাতা থেকে। কাল রাতে বলল, তোর জামাইবাবু একটু আনইউজুয়াল ডিশ পছন্দ করে। তুইও খাবি। দুবেলাই নেমন্তন্ন। মনে থাকে যেন।
আর কাকে বলবে?
কাউকে না। বাইরের লোক ডাকলে বাপু ঘরোয়া আড্ডার মেজাজটা থাকে না। নিজেরা বেশ গল্প-টল্প করব। অনেকদিন বাদে নিজের হাতে রান্না করব, কীরকম হবে কে জানে বাবা। নুন-টুন কমবেশি হতে পারে।
কেন, তুমি রান্না করো না?
দুর! সময় পাই কোথায়? এক মিশিরজি আছে, সেই রাঁধে। আমাকে তো তোর জামাইবাবুর অফিস সামলাতে হয়।
তাই তো! পাস-টাস করলে আমাকে তোমার অফিসে একটা চাকরি দেবে?
কেন রে মুখপুড়ি, চাকরি করবি কেন?
খারাপ কী বল! চাকরি, না হয় বিয়ে করে ঘরসংসার—এই তো! আর কোনও অলটারনেটিভ আছে?
পারুলদি একথায় হাসল না, ভাবল। বলল, অলটারনেটিভ অনেক হয়তো আছে। কিন্তু আমরা তা ভাবি না। তবে তোকে বলি, বিয়ে না করে চাকরি করলেই কিন্তু কিছু সুখ হয় না, ওটা ভুল ধারণা। বিয়ে যদি দাসত্ব হয় তবে চাকরি আরও দাসত্ব। ওসব চাকরির চিন্তা মাথা থেকে তাড়া।
ধর, চাকরি না করে যদি বুটিকের দোকান করি বা ফ্যাশন সেন্টার বা বিউটি পার্লার!
ব্যস, ফুরিয়ে গেল তো! আজকাল সব মেয়েই কেবল ওসব লাইনে ভাবে। প্রফেশনাল হয়ে যে কিছু লাভ হয় না তা বুঝতে চায় না। ভাবে গাদা গাদা টাকা রোজগার করলেই বুঝি খুব সুখ।
কী করব তাহলে বল তো! ঘরসংসার? সেও তো ফুরিয়ে যাওয়া। কী সুখ আছে বল!
পারুলদি একটা গভীর শ্বাস ফেলে বলে, সত্যি বলতে কী, আমার কেবল মনে হয়, আমরা একটা ভুল জীবন কাটিয়ে যাচ্ছি। আমার কথাই ধর না। তোর জামাইবাবু তো ভীষণ ভাল একটা লোক। আমার কোনও অভাব নেই। কাজকর্ম, সংসার নিয়ে দিব্যি সময় কেটে যায়। তবু মাঝে মাঝেই কেমন যেন হাঁফ-ধরা লাগে।
চোখ গোল গোল করে পান্না বলল, তোমারও হাঁফ ধরে যায়। তাহলে আমাদের কী হবে?
তাই তো বলছি, অলটারনেটিভ খুঁজে কিছু লাভ নেই। স্বামীর দাসত্ব করবি না, ঠিক আছে। কিন্তু আর যা করতে যাবি কোনওটাই বেটার অলটারনেটিভ নয়। বেশি টাকা রোজগার করারও একটা একঘেয়েমি আছে। মনে হবে, দুর ছাই, এত টাকা দিয়ে কী হবে?
যাঃ, আমার তা কখনও মনে হবে না।
এ বয়সে বুঝবি না। টাকা জিনিসটাকে কিছুতেই ভালবাসা যায় না।
কেন?
টাকা হচ্ছে বায়িং পাওয়ার। কেনা-বেচার মিডিয়াম। তাই যদি হয় তাহলে শুধু বেচা-কেনার জন্যই তো টাকা। ওটার তো আর কোনও মূল্য নেই। কনভার্টিবিলিটি ছাড়া টাকার আর কোন গুণ আছে বল।
ও বাবা, ওসব শক্ত কথা বুঝতে পারি নাকি?
তোকে অত বুঝতে হবেও না। কিন্তু যত দিন যাচ্ছে তত আমার কাছে টাকা জিনিসটা অসাড় হয়ে যাচ্ছে।
তোমার অনেক টাকা আছে বলেই ওরকম মনে হয়।
মাথা নেড়ে পারুলদি বলল, না রে, তা নয়। মানুষ তো ভোগ করবে বলেই রোজগার করে। কিন্তু বুঝতে পারে না তার ভোগ করার ক্ষমতা খুব বেশি নয়। ধর আমি যদি পাঁচশোটা বেনারসি কি বমকাই কিনি, হাজার ভরি গয়না গড়াই, দশটা গাড়ি এনে গ্যারেজে ভরি বা দশটা বাড়ি তৈরি করি—কিছু লাভ হবে তাতে? ক্লান্তি লাগবে না?
ইস্, আগে তোক তো!
পারুলদি হেসে ফেলল, আচ্ছা যা, এখন ওসব বোঝার বয়স হয়নি তোর। পরে বুঝবি।
না পারুলদি, এসব বয়স হলেই বোঝা যায় না। এসব বোঝার জন্য অন্যরকম মন চাই। তুমি হলে বড়মার মতো। দেখ না, বড়মা কেমন যেন হয়ে গেছে। শাড়িগুলো বিলিয়ে দিল সবাইকে। গয়নাগুলো দিয়ে দিল। জ্যাঠামশাই চলে যাওয়ার পর থেকে বড়মা একদম পালটি খেয়ে গেছে। আমাকে তিনটে পিওর সিল্ক আর একটা আংটি দিয়েছে, জানো? হীরাকে দিয়েছে দুটো ঢাকাই, একটা বেনারসি আর ঝুমকো দুল।
পারুলদির চোখ দুটো ছলছল করে উঠল। একটু চুপ করে থেকে বলল, ঠিকই বলেছিস হয়তো, মায়ের মনটাই হয়তো পেয়েছি। মা যেন বেঁচেই ছিল শুধু বাবার জন্য। বাবাই ছিল মায়ের ধ্যানজ্ঞান। এখন মা যেন ঠিক বেঁচেও নেই। মাঝে মাঝে ভয় হয় মা বোধহয় মনে মনে সহমরণেই চলে গেছে। চলে ফিরে বেড়াচ্ছে, কথা কইছে, মজার কথা শুনে হাসছে, কিন্তু মা যেন মা নেই।
উঃ পারুলদি, ওভাবে বোলো না। শুনে এখন আমার কেমন ভয়-ভয় করছে। সহমরণ কেন হবে? বড়মার মনটা খুব খারাপ, তা তো হতেই পারে।
পারুলদি অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে বলে, সারাদিন আমি কেবল মাকে ঘুরে ঘুরে দেখি, স্টাডি করি, বুঝবার চেষ্টা করি। বড্ড ভয় হয়, এত শোক সইতে না পেরে মাও যদি চলে যায়?
না না, বড়মা কেন মরবে? শোক কত কেটে গেছে দেখ না? এখন বড়মা অনেক সামলে গেছে।
মাকে দেখে রাখিস। মা তো কিছুতেই আমাদের কারও কাছে গিয়ে থাকবে না। তোরাই ভরসা।
একটা কথা জিজ্ঞেস করব পারুলদি?
বল না।
সোহাগ খুব তোমার সঙ্গে দেখা করতে চায়। তোমাদের বাড়িতে অনেক লোকজন আছে বলে আসতে চায় না।
কেন রে, আমার কাছে আসতে চায় কেন?
কী জানি। তোমাকে ওর খুব পছন্দ।
তোর সঙ্গে ভাব হয়েছে বুঝি?
হ্যাঁ।
তোকে বলেছিলাম না ওর সঙ্গে বেশি মিশিস না।
কী করব বলল, বেচারার বন্ধু নেই। আমার কাছে আসে গল্প করতে।
এঁচোড়ে পাকা মেয়ে, না?
না পারুলদি, একটু পাগলি, কিন্তু ভারী ভাল মেয়ে।
মাও বলছিল, ওর নাকি আমাকে গডেস বলে মনে হয়।
হ্যাঁ। ও তো কতবার সে কথা বলে।
আর কী বলে?
তোমার প্রতি ওর ভীষণ সফটনেস!
বাজে কথা কিছু বলে না তো?
কী বাজে কথা?
খারাপ কিছু?
তোমার সম্পর্কে? না তো!
আমার গা ছুঁয়ে বল।
পান্না অবাক হয়ে পারুলের হাত ধরে বলল, গা ছুঁয়ে বলছি।
ফিক করে একটু হেসে পারুল বলে, তা হলে আনিস একদিন। সবাই চলে যাওয়ার পর।
ওরা বোধহয় খুব বেশিদিন থাকবে না। পুজোর পর কলকাতা চলে যাবে।
তা হলে পরে কখনও হবে।
একটু আনিই না একদিন পারুলদি?
পারুল একটু গম্ভীর হয়ে বলল, এখন বড় হয়েছিস, কাজেই তোকে বলা যায়। অমলদার সঙ্গে আমার একটা রিলেশন ছিল। সবাই জানে। ওর মেয়ে এলে সকলের সামনে আমার একটু অস্বস্তি হয়।
দুর! তুমি ভীষণ পিউরিটান। তাতে কী হয়? সেসব তো কবে চুকেবুকে গেছে।
পারুল হাসল, সে অবশ্য ঠিক। কিন্তু মেয়েটাকে কেন যেন আমার পছন্দ হয় না।
কেন হয় না বলো তো!
কী জানি। ভিতর থেকে একটা অপছন্দের ভাব আসে।
সোহাগ কিন্তু হেলপলেস মেয়ে।
কেন, হেলপলেস কেন?
ওর মা-বাবার সঙ্গে রিলেশন খুব খারাপ। ওর মা বাবার ধারণা ওর মধ্যে কেউ ইভিল স্পিরিট ঢুকিয়ে দিয়েছে।
যাঃ!
হ্যাঁ গো। আমেরিকায় থাকতে নাকি একটা বাজে গ্রুপ ওকে চুরি করে নিয়ে গিয়েছিল। তারপর নাকি ব্রেনওয়াশ করে ফেরত দেয়।
ধ্যেত! গাঁজাখুরি গল্প বলেছে।
গল্পটা ও বলেনি।
তাহলে?
বলেছে ওর মা।
ওর মাকে তুই চিনিস নাকি?
হ্যাঁ, সোহাগ নিয়ে গিয়ে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে।
মহিলা কেমন?
খারাপ নয় তো!
ওটা একটা কথা হল? খারাপ না হোক, একটা রকম আছে তো!
আমার তো ভালই লাগে। কাছে গেলে গল্প-টল্প করে।
কীসের গল্প?
বিদেশের গল্প।
আমার কথা কখনও জিজ্ঞেস করেনি তো!
না। কিন্তু ভদ্রমহিলা ভীষণ ডিপ্রেশনে ভোগেন।
কেন?
তা জানি না।
রাইকিশোরী নামটা শুনলেই একটা কবিতার মতো কিশোরী মেয়ের ছবি চোখের সামনে ভেসে উঠবেই উঠবে। সরু কোমর, সদ্য ফুটে-ওঠা বুক, অবাক মুখ, আর চোখে মুগ্ধ চেয়ে থাকা। হায়, এই রাইকিশোরী কিছুতেই মেলে না ছবিটার সঙ্গে।
বস্তা তুলে বড় টিনে সাবধানে এক অবিশ্বাস্য দক্ষতায় মুড়ি ঢেলে দিচ্ছে সে। এ—বাড়িতে মুড়ির খুব টান। চারটে মুনিশ ওই পুবের বারান্দায় বসে বড় বড় অ্যালুমিনিয়ামের কানা উঁচু থালায় মুড়ির পাহাড় নিয়ে বসবে। একটা তরকারি আর ডাল ঢেলে দিতে হয় মুড়ির মাথায়। তার ওপর জল ছিটকে ছিটকে মুড়িটা মেখে নিয়ে বড় বড় সূর্যমুখী লঙ্কা কামড়ে খেয়ে নেবে চোখের পলকে। দুদিন বাদে বাদেই রাইকিশোরীকে আসতে হয়।
সামান্য একটু সেজে নিতে নিতে দৃশ্যটা জানালা দিয়ে দেখছিল পান্না। কোনও মণীশ ওকে চিঠি দেবে কি কখনও? মুড়ি ফেরি করে করে যৌবন যায় রাইকিশোরীর। রূপহীনার তো প্রেম নেই।
আয়নায় নিজেকে একটু মন দিয়ে দেখে পান্না। না, নিজের চোখ দিয়ে নয়। অজানা এক মণীশের চোখ দিয়ে।
হাই।
পান্না হেসে বলে, হাই।
কোথাও বেরোচ্ছ?
সে একটু পরে গেলেও হবে। বোসো না।
আমি কি তোমাকে ডিস্টার্ব করলাম?
না তো! বাসো।
বসব না। আমার আজ চারদিকটা খুব ভাল লাগছে। শরৎকালটা এখানে ভীষণ ভাল, না?
ভীষণ।
চলো একটু হেঁটে আসি।
চলো।
আমার একটা মুশকিল হয়েছে।
কী মুশকিল?
চলো, হাঁটতে হাঁটতে বলব।
উঠোন পেরিয়ে সরু পথটা ধরে হাঁটতে হাঁটতে ভারী উদাস গলায় সোহাগ বলে, বাস্তুসাপ কাকে বলে জানো?
হ্যাঁ। কেন জানব না? এখানে অনেকের বাড়িতে আছে।
আমাদের বাড়িতেও আছে। সাপের একটা হিপনোটিক পাওয়ার আছে, তাই না?
ও বাবা! ওসব জানি না। সাপ শুনলেই আমার গা সিরসির করে।
আমি রোজ আমাদের খড়ের মাচানটার কাছে গিয়ে উবু হয়ে বসে সাপগুলোর জন্য অপেক্ষা করি।
তুমি একটা ক্ষ্যাপা মেয়ে। ওরকম করতে আছে?
আমার ভীষণ দেখতে ইচ্ছে করে। কিন্তু একদিনও আমার সামনে বেরোয় না।
আচ্ছা, সাপ দেখে তোমার কী লাভ হবে বলো তো!
আমার ভীষণ একটা অ্যাট্রাকশন। সাপ তো ইভিল, যেমন, ডেভিল। সাপই ইভকে জ্ঞানবৃক্ষের ফল খাইয়েছিল। তাই না?
তাতে কী হল?
সাপ ভীষণ মিস্টিরিয়াস একটা প্রাণী। আমার অনেকদিন ধরে একটা সাপ পুষতে খুব ইচ্ছে করে। সাপটা আমার গায়ে বেয়ে বেড়াবে, গলায় পেঁচিয়ে থাকবে, মাথার ওপর উঠে ফণা তুলে থাকবে। অনেকটা শিবের মতো।
ও মা! মাথাটা তো গেছে দেখছি! কী বিটকেল ইচ্ছে রে বাবা।
সবাই তাই বলে।
সাপ-খোপের চিন্তা মাথা থেকে তাড়াও তো৷
আজ একটা কাণ্ড করে ফেলেছি।
কী করেছ?
আজ সকালে একটা সাপুড়ে যাচ্ছিল। আমি তাকে ডেকে একটা সাপ কিনতে চাইলাম। তাতে সে খুব অবাক হয়ে গেল। বলল, সাপ নিয়ে কী করবেন? বললাম, পুষব। লোকটা মাথা নেড়ে বলল, সাপ পোষা বিপদের কাজ। বিদ্যে না জানলে নাকি ওসব করতে নেই।
ঠিকই তো বলেছে।
তখন আমি তাকে কিছু টাকা বখশিস দিয়ে বললাম, তাহলে আমাকে সাপ ধরা শিখিয়ে দাও। খড়ের মাচার নীচে তিনটে গোখরো সাপ আছে, সেগুলো যদি সে ধরে তাহলে আমি কায়দাটা শিখে নেব। টাকার লোভে সে রাজি হয়ে গেল।
বাস্তুসাপ ধরতে বললে? কী সর্বনাশ! তারপর?
তখন বাড়িতে তেমন কেউ ছিল না। পিসি বর্ধমানে গেছে, জেঠিমা পাড়ায় বেরিয়েছে। শুধু বাচ্চারা কয়েকজন ছিল। সাপুড়েটা কী সব মন্ত্র বলে একটা শেকড়ের টুকরো মাচার নীচে ছুড়ে ছুড়ে দিতে লাগল। আর ভেঁপুতে কুক কুক করে অদ্ভুত শব্দ করতে লাগল।
মা গো! তুমি তখন কোথায় দাঁড়িয়েছিলে?
আমি ওর সঙ্গে সঙ্গেই ছিলাম।
তোমার দুর্জয় সাহস ভাই! তারপর কী হল?
হঠাৎ ফোঁস ফোঁস শব্দ করতে করতে ইয়া বড় একটা সাপ খুব তেড়ে বেরিয়ে আসছিল। কী সাংঘাতিক স্পিড! লোকটা চেঁচিয়ে আমাকে বলল, দিদি সরে যান। কিন্তু জানো, সাপটা যখন বেরিয়ে এল আমি তখন তার দুটো পুঁতির মতো চোখের দিকে চেয়ে একদম হিপনোটাইজড হয়ে গেলাম। একটুও নড়তে পারিনি।
ও বাবা!
লোকটা আমাকে একটা ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে না দিলে ইট কুড বি ফ্যাটাল। সাপটা আমার খুব কাছে চলে এসেছিল দুম করে।
ইস্, কী যে হত আজ!
লোকটা কিন্তু খুব এক্সপার্ট। সাপটা বেরিয়ে আসতেই চট করে একধারে সরে গিয়ে এক ঝটকায় সাপটার লেজ ধরে তুলে ফেলে একটা ঝাঁকুনি দিল শুধু। তারপর ঝুড়িতে ভরে ফেলল। বলল, আমার আর ঝাঁপি নেই দিদি, আজ এই একটাই ধরলাম। অন্যগুলো এখন গর্তে নেইও, ওরা এই সময়ে নাকি খেতে বেরিয়ে যায়।
ব্যাপারটা বাড়ির লোক জানে?
হ্যাঁ। জানতে পেরেই তো আজ খুব চেঁচামেচি হল। জেঠিমা ফিরতেই বাচ্চারা তাকে সাপ ধরার কথা বলে দেয়। জেঠিমা ভীষণ ভয় পেয়ে চেঁচাতে থাকে, সর্বনাশ হয়ে যাবে! বংশ থাকবে না। ভিটেমাটি উচ্ছেদ হবে…আরও কত কী! খবর পেয়ে জ্যাঠামশাই এল, বাবা কোথায় গিয়েছিল, চলে এল। তারপর রতনদাকে ডাকিয়ে আনা হল। বাবা আমাকে ভীষণ বল আজ। তারপর রতনদার মোটরবাইকে চেপে বাবা আর রতনদা বেরোল সাপুড়েকে খুঁজে বের করতে।
পাওয়া গেল তাকে?
হ্যাঁ। বাসরাস্তায় গুমটিতে বসেছিল। তাকে ধরে নিয়ে আসা হল। সে যেসব ওষুধ ছড়িয়েছিল সেগুলো কুড়িয়ে নিয়ে সাপটাকে ছেড়ে দিয়ে গেল ফের। আমি এখন বাড়িতে খুব আনপপুলার।
তুমি হাসছ! কাজটা মোটেই ভাল কয়নি। বাস্তুসাপ ধরাও ভাল নয় শুনেছি।
আমি জাস্ট শিখতে চেয়েছিলাম। আর কিছু নয়।
ওসব শিখতে অনেক সময় লাগে, গুরুর কাছে শিখতে হয়।
সোহাগ ঠোঁট উলটে বলে, তা হবে, কিন্তু আমার মনে হয় ব্যাপারটা কিছু কঠিন নয়। আসলে দরকার স্পিড, আর ঠিক জায়গায় ধরে ফেলা, আর ভয় না পাওয়া।
তার মানে! তুমি কি সাপ ধরার চেষ্টা করবে নাকি?
মনে হচ্ছে চেষ্টা করলে পারব।
খবর্দার সোহাগ ও—কাজও করতে যেও না।
একটু দূর থেকে নিউ স্পোর্টিং ক্লাবের বারান্দায় কয়েকটা ছেলেকে বসে থাকতে দেখতে পেয়েছিল পান্না। চেনা ছেলেই সব।
ক্লাবঘরটা পেরিয়ে যাওয়ার সময় হঠাৎ একটা ছেলে বেশ উঁচু গলায় বলে উঠল, এখানে বেশি রংবাজি মারাতে এলে মুখের জিওগ্রাফি চেঞ্জ করে দেব। গাঁয়ে ফুটানি মারতে এসেছে…
পান্না অবাক হয়ে ফিরে দাঁড়িয়ে ছেলেগুলোর দিকে চেয়ে বলে, কাকে বলছেন?
একটা ছেলে বলল, তোমাকে নয়। যাকে বলেছি সে বুঝতে পেরেছে।
কাকে বললেন?
বললাম তো তোমাকে নয়।
সোহাগ অন্য দিকে চেয়ে চুপ করে দাঁড়িয়েছিল। পান্নার হাতটা টেনে বলল, চলে এসো। দে আর কাওয়ার্ডস।
হাঁটতে হাঁটতে পান্না বলে, কাকে বলছিল বলো তো!
আমাকে।
তোমাকে! কেন বলছিল?
তা জানি না, আমি রাস্তায় বেরোলেই আজকাল কয়েকটা ছেলে আওয়াজ দেয়।
তুমি রুখে দাঁড়াওনি?
না, ঝগড়া করতে আমার ভাল লাগে না। তিন-চার দিন আগে যখন প্রথম ব্যাপারটা হয় তখন আমি একটা ছেলেকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, কথাটা কি আমাকে বললেন? সে জবাব না দিয়ে চলে গেল।
খুব সাহস হয়েছে তো এদের! দাঁড়াও বিজুদাকে বলে ঠান্ডা করে দেব।
বিজুদা কে?
আমার জ্যেঠতুতো দাদা, স্পোর্টসম্যান, বিজুদাকে সবাই ভয় পায়।
তার মানে একজন পুরুষের সাহায্য চাইবে?
তাতে কী?
মাথা নেড়ে সোহাগ বলে, তাতে আমার আত্মসম্মানে লাগবে। পুরুষের অ্যাটাক থেকে বাঁচার জন্য পুরুষেরই সাহায্য নেওয়াটা কি ভাল?
এটা পুরুষ-মেয়ের ব্যাপার তো নয়, এরা বাজে ছেলে, এদের টিট করা দরকার।
না পান্না। বিজুদাকে বলার দরকার নেই। সব জায়গায় তো আর আমি এক একজন করে প্রোটেক্টর খুঁজে পাব না। পৃথিবীর সব জায়গাতেই অল্পবিস্তর এসব হয়। সেসব আমাকে একাই তো হ্যান্ডেল করতে হবে।
ওদের তোমার ওপর এত রাগ কেন বলো তো!
আমি তো ওদের পাত্তা দিই না, তাই বোধহয়। দিন সাতেক আগে একটা ছেলে নির্জন রাস্তায় আমার সঙ্গে একটু ঘনিষ্ঠ হওয়ায় চেষ্টা করে। আমি মাঝে মাঝে খুব ঘোরের মধ্যে থাকি, জানো তো! সেদিনও ছিলাম। ছেলেটা কী বলছিল আমাকে, শুনতে পাইনি। ছেলেটা আমার হাতে একটা কাগজ গুঁজে দিয়ে চলে যায়। তাতে ভুল ইংরিজিতে বিচ্ছিরি বিচ্ছিরি কথা লেখা ছিল।
এ মা! কী লেখা ছিল তাতে?
ফোর লেটার ওয়ার্ডও ছিল।
কে ছেলেটা বলো তো!
তাকে আবার দেখলেও চিনতে পারব না। বললাম না, আমি তখন একটা ঘোরের মধ্যে ছিলাম।
এসব আগে এখানে কখনও হত না, আজকাল হচ্ছে।
প্লিজ তোমার বিজুদাকে বোলো না।
যে ছেলেটা চেঁচাল তাকে আমি চিনি। শিবেন্দ্র, কামার পাড়ার দিকে থাকে। দাঁড়াও খোঁজ নিতে হবে।
কিন্তু আমাকে নিয়ে কোনও হইচই হোক আমি চাই না। আমরা তো কিছুদিন পরেই চলে যাব।
শোনো সোহাগ, আমাদের গ্রাম সম্পর্কে তুমি যদি খারাপ ইমপ্রেশন নিয়ে যাও তাহলে তুমি হয়তো আর আসতে চাইবে না, একটা খারাপ ধারণা নিয়ে বসে থাকবে।
উদাস মুখে সোহাগ বলল, একমাত্র গভীর অরণ্য ছাড়া সব জায়গাই তো খারাপ, কলকাতা ভাল নয়, মিউনিক ভাল নয়, লন্ডন ভাল নয়, নিউ ইয়র্ক ভাল নয়। না পান্না, আমার কোনও রাগ বা অভিমান হচ্ছে না।
তুমি খুব অদ্ভুত!
সবাই তাই বলে।
জানো, আজ একটা ছেলে আমাকে প্রেমপত্র দিয়ে গেছে!
সোহাগ হাসে, তাই বুঝি?
হ্যাঁ। সেটা অবশ্য লাভ লেটার, অসভ্য কথা নেই।
পরনে ধুতি, গায়ে হাতাওয়ালা একটা গেঞ্জি, আর ধুতির খুঁটটা তার ওপর জড়াননা, এই পোশাকে অমল গাঁয়ের রাস্তায় ঘুরতে বেরিয়েছিল, ভারী অন্যমনস্ক, এসে অবধি সে গাঁয়ের কারও সঙ্গে দেখাসাক্ষাতের চেষ্টা করেনি, পুরনো বন্ধুদের খোঁজখবর নেয়নি, কারও বাড়িতে গিয়ে বসেনি, শৈশবের স্মৃতিচারণাও তার ভাল লাগে না।
কয়েকদিন ছুটি আছে তার। ঘরে বসে বই পড়ে আর একা একা ঘুরে ঘুরে ছুটিটা কাটিয়ে দেবে সে, বাবা, ভাই, বোন, বউ, ছেলেমেয়ে কারও সঙ্গেই সে আজকাল স্বচ্ছন্দ বোধ করে না। শুধু একা থাকতে ভাল লাগে। হৃদয় খুঁড়লেই ব্যথা-বেদনার উৎসমুখ খুলে যায়।
জনহীন জায়গাগুলো তার জানা, সন্ধের পর খেলার মাঠ, পতিত জমি, জংলা জায়গা, শুধু রতনের সঙ্গে তার কিছু কথাবার্তা হয়। ছেলেটার সংসারী বুদ্ধি নেই। মোটরবাইক হল তার নেশা। সারা দিন ঝাড়ে, মোছে, যত্ন করে, টুকটাক সারাইও করে নেয়। মোটরবাইকই তার ধ্যানজ্ঞান। অন্য খেয়াল নেই, সে অমলকে প্রায়ই দুর্গাপুর বা কালনা নিয়ে যেতে চায় তার বাইকে। বর্ধমান ঘুরিয়ে আনল কাল, বেশ চালায়।
ঘুরে ঘুরে তেষ্টা পেল অমলের। একটু চা পেলে হত। কোনও অসুবিধে নেই। যে কোনও বাড়িতে ঢুকে পড়লেই হল। আদর করে বসিয়ে চা খাওয়াবে। চা পর্যন্ত ঠিক আছে। কিন্তু আজকাল কথা বলা বা শোনা তার কাছে অসহ্য ঠেকে।
বাড়িতে ফিরে ধীর পায়ে দোতলায় উঠতেই মোনালিসা দরজা খুলে দিয়ে বলল, এসো দেবদাস। তোমার পারু তোমাকে দেখা করতে বলে পাঠিয়েছে।
থতমত অমল বলে, কে?
পারু গো পারু। ভুলে গেলে নাকি?
অমল গোরুর মতো নিস্পৃহ চোখে চেয়ে থাকে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন