শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
ভোররাতের নির্জনতায় একটা অ্যালার্ম ঘড়ি বেজে উঠল। কুক-কুক-কুক-কুক।
নিস্তব্ধতার ওপর শব্দের ছুরি বসে যাচ্ছে উপর্যুপরি। সেই শব্দে তন্দ্রা ভেঙে নিরর্থক খানিকক্ষণ প্রথমে ভুক ভুক, তার পর ভৌ ভৌ করে চেঁচাল কেলো নামে কুকুরটা। তার কোনও বীরত্ব নেই, সে জানে। মাঝে মাঝে তবু তাকে নিজের অস্তিত্ব জানান দিতে হয়। মহিম রায়ের বারান্দা থেকে উঠোনে নেমে সে খানিকক্ষণ ঊর্ধ্বমুখ হয়ে ঘড়িটাকে বকাঝকা করল। অ্যালার্ম থামল না। কোয়ার্টজ ঘড়ির অ্যালার্ম সহজে থামেও না। তীক্ষ্ণ শব্দটা বারবার চারদিকের নির্জনতায় ছুরির মতো ঢুকে যাচ্ছে।
কেলোর চিৎকারেই ধড়মড় করে উঠে বসেছিল সন্ধ্যা। চোর এল নাকি? চোরেদের খবর থাকে। কাল রাতেই ছ হাজার সাতশো টাকা পেমেন্ট দিয়ে গেছে রাতুল নস্কর। টাকাটা এখনও তার বালিশের তলায়। কাল রাতে আলমারিতে তুলে রাখার সময় পায়নি। বালিশের নীচে হাত ঢুকিয়ে সে তাড়াতাড়ি বান্ডিলটা দেখল। অনেক কষ্টের রোজগার তার। টাকাও কি সহজে আদায় হয়েছে এতকাল? দোকানদাররা টাকা দিতে কত গড়িমসি করে। কতবার ঘোরায়। বেশি তাগাদা দিলে মাল তুলতে চায় না। আজকাল আদায় উশুল খানিকটা সহজ হয়েছে। টর্চ জ্বেলে চারদিকটা দেখে নিল সন্ধ্যা। না, কেউ ঢোকেনি ঘরে। ওপাশের আর একটা চৌকিতে সীমন্তিনী নামে কাজের মেয়েটা ঘুমোচ্ছে। গাঢ় ঘুম। সারাদিন যা অসুরের মতো খাটুনি যায় তাতে সন্ধ্যারও ঘুম গাঢ় হওয়ার কথা। কিন্তু হয় না। মাঝে মাঝে নিশুতরাতে অকারণে ঘুম ভেঙে যায়। না, ঠিক অকারণে নয়। ঘরে নগদ টাকা থাকে তার। সব সময়ে ব্যাঙ্কে গিয়ে দিয়ে আসার সময় হয় না। চোরছ্যাঁচড়ের ভয়েতেই বোধহয় আজকাল ঘুম খুব সজাগ হয়েছে তার। পঞ্জিকা থেকে চোরের মন্তর শিখে নিয়েছে সে। রোজ সেইসব মন্তর বিড়বিড় করে আওড়ায়। তারপর শোয়। কিন্তু মন্তরের ভরসায় আর কে নিশ্চিন্তে ঘুমোয় বাবা! ঘুম ভাঙার আরও একটা কারণ হল, তার এই জীবনটা। এ যে কোথায় গিয়ে কেমনভাবে শেষ হবে কে জানে! মাঝে মাঝে একজন তাকে বিয়ের প্রস্তাব দেয় বটে, কিন্তু বড় বাধো-বাধো ঠেকে। বাবা বা দাদারা শুননে কী বলবে। বাবা হয়তো শয্যাই নিয়ে নেবে। ওসব ভাবতে কেন যেন সাহস হয় না তার, আবার ইচ্ছেও করে। স্বামীটার কথাও সারা দিনে না হলেও এই নিশুতি রাতে ঠিক মনে পড়বেই। হাড়েবজ্জাত লোকটার ওপর তার রাগ হয় বটে, কিন্তু কেন যেন মায়াও হয়। পুরুষ জাতটা তো ভালবাসতে জানে না। ভালবাসে মেয়েরাই। আর সেই জন্যই মরে।
কেলোর চিৎকার ছাপিয়ে ঘড়ির অ্যালার্মটা হঠাৎ শুনতে পেল সন্ধ্যা। মুরগি যেমন উঠোনে দানা খুঁটতে খুঁটতে আদুরে শব্দ করে ঠিক তেমনই শব্দ। কুক-কুক-কুক-কুক। দোতলা থেকে আসছে। টর্চ জ্বেলে দেয়ালঘড়িটা দেখল সন্ধ্যা। ভোর পৌনে চারটে বাজে। মেমসাহেব এত সকালে তো ওঠে না। বেলা আটটা বাজলে বারান্দায় এসে নাইটি-পরা অবস্থায় ভাসুর-শ্বশুরের চোখের সামনে দোতলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে ব্রাশ দিয়ে দাঁত মাজে। তখন সন্ধ্যার ইচ্ছে করে একটা ঢেলা তুলে ছুড়ে মারতে। কিন্তু মেয়েটা একটু কিম্ভূত আছে। সন্ধ্যা ওঠে ভোর পাঁচটায় বা তারও একটু আগে। উঠে প্রায় সময়েই দেখতে পায়, মেয়েটা ভূতের মতো বারান্দার এক কোণে চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে। কেন ওরকম দাঁড়িয়ে থাকে কে জানে বাপু!
সন্ধ্যার সন্দেহ ক্রমে ঘনীভূত হচ্ছে। ছেলেটা কলকাতায় যাতায়াত করে বটে, কিন্তু মা আর মেয়েতে পনেরো-ষোলোদিন ধরে কেন যে থানা গেড়ে আছে সেটাই সন্দেহের বিষয়। মেজদা কিছুতেই ওদের নিয়ে যাচ্ছে না। শুধু মেয়েটার অ্যালার্জি সারাতেই এখানে রয়েছে, এটা গুয়ে হাত দিয়ে বললেও কেউ বিশ্বাস করবে না। কেলেঙ্কারির গন্ধটা খুব পাচ্ছে সন্ধ্যা, কিন্তু সেটা কতদূর খারাপ সেটাই ধরতে পারছে না। কথা বললে পাছে মুখ ফসকে দু-একটা কথা বেরিয়ে পড়ে সেই ভয়েই বাড়ির কারও সঙ্গে কথাই বলে না ওরা। এমনকী ওদের খাবার পর্যন্ত ঝি সাবিত্রীকে দিয়ে ঘরে পৌঁছে দিতে হয়।
আমলকীটা খুব চলছে। বিটনুন দিয়ে জাবিয়ে রোদে শুকিয়ে প্যাকেট করে ছেড়েছে সন্ধ্যা। খুব চলে। গত শীতে এক কুইন্টাল আমলকী কিনেছিল, তার কয়েক কেজি মাত্র পড়ে আছে। ঘরে রাখলে ছাতা ধরে যায় বলে মাঝে মাঝে রোদে দিতে হয়। পরশু দিন উঠোনে চাটাই পেতে যখন আমলকীগুলোকে রোদ খাওয়াচ্ছিল সে তখন মেয়েটা হঠাৎ দোতলা থেকে নেমে এল। একটু এদিক ওদিক পায়চারি করে কাছাকাছি এসে দাঁড়াল। সন্ধ্যা আড়চোখে দেখে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল। পাত্তা দেয়নি।
মেয়েটাই আচমকা বলল, এগুলো কি আমলকী?
সন্ধ্যা একটু অবাক হল। তার সঙ্গে সরাসরি কথা বলবে, এতটা ভাবেনি। ভদ্রতার খাতিরেই সন্ধ্যা বলেছিল, হ্যাঁ।
তাকে আরও অবাক করে দিয়ে মেয়েটা বলল, একটু টেস্ট করে দেখতে পারি?
ভারী অবাক হল সন্ধ্যা, একটু খুশিও হল কি? একটু কথা বলার ভিতর দিয়ে যে কত মেঘ কেটে যায়। সন্ধ্যা বলল, হ্যাঁ, হ্যাঁ, খাও না, খাও।
সোহাগ নিচু হয়ে দু-তিনটে আমলকী তুলে মুখে দিয়ে তার দিকে চেয়ে ছেলেমানুষের মতো বলল, এগুলো কি চিবিয়ে খেতে হয়?
সন্ধ্যা একটু হেসে বলে, না না। শুকনো আমলকি চিবিয়ে খাওয়া যায় না। গালে রেখে দাও। ভিজে নরম হয়ে গেলে তখন চিবোবে।।
সোহাগ খানিকক্ষণ মুখের আমলকী এ-গাল ও-গাল করে বলল, বেশ লাগে তো খেতে।
সন্ধ্যা খুশি হয়ে বলল, আরও নাও না। নিয়ে গিয়ে ঘরে রেখে দাও। যখন ইচ্ছে হবে খেও।
তার দরকার নেই। খেতে ইচ্ছে হলে আপনার কাছে এসে খেয়ে যাব।
সন্ধ্যা এটুকুতেই যেন গলে গেল। বলল, আমি পিসি হই। আমাকে আপনি-আজ্ঞে করতে নেই।
সোহাগ হঠাৎ উদাস হয়ে গেল যেন। শুধু বলল, আচ্ছা।
তারপর মুখ ফিরিয়ে খানিক আনমনে উঠোনের এদিকে সেদিকে একটু হেঁটে বেড়াল। যখন প্রথম এসেছিল তখন যেমন ঢলঢলে দেখতে ছিল এখন আর তেমন নেই। একটু যেন রোগা হয়েছে, একটু রুক্ষ। সন্ধ্যা লক্ষ করেছে মেয়েটা একদম সাজে না, চুলটা পর্যন্ত আঁচড়ায় না ভাল করে, সন্ধ্যা মনে মনে খুব চাইছিল মেয়েটা তার সঙ্গে আরও একটু কথা বলুক, একটু ভাব করুক।
না, আর কোনও কথা বলেনি সোহাগ। কিছুক্ষণ হাঁটাহাঁটি করে যেমন এসেছিল তেমনই আবার ওপরে চলে গেল। গতকাল কাজকর্মের ফাঁকে ফাঁকে কয়েকবার সোহাগকে বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছে সন্ধ্যা। কিন্তু তার দিকে তাকায়নি সোহাগ। আমলকী খেতেও আসেনি। কিন্তু সন্ধ্যা খুব অপেক্ষা করেছিল। যদি আসে!
সন্ধেবেলা কাসুন্দি আর আচারের শিশি ভর্তি করে লেবেল লাগাতে খুব ব্যস্ত ছিল সন্ধ্যা। তিনটে মেয়ে মেঝেতে বসে মন দিয়ে লেবেল লাগিয়ে যাচ্ছে। মাটির মালসায় আঠা, ডাঁই করা লেবেল, স্তুপাকার ঝুড়িভর্তি শিশি-বোতল। সকালেই মাল নিতে আসবে চার-পাঁচজন। আজ অনেক রাত অবধি জাগতে হবে সন্ধ্যাকে।
ঠিক এমন সময়ে খোলা দরজার ওপাশ থেকে মিষ্টি মিহি গলা পাওয়া গেল, আমি একটু ভিতরে আসতে পারি?
তেমনই অবিন্যস্ত চুল, তেমনই ঝ্যালঝ্যালে একটা মেটে রঙের ঢলঢলে কামিজ আর বিবর্ণ একটা প্যান্ট-পরা সোহাগ চৌকাঠে দাঁড়িয়ে। দেখে এত ব্যস্ততার মধ্যেও সন্ধ্যা হঠাৎ উদ্ভাসিত হয়ে গেল। বলল, এসো এসো।
মেয়েটা ঘরে ঢুকতেই সন্ধ্যা চেয়ারটা ঠেলে দিয়ে বলল, বোসো।
সোহাগ চেয়ারে বসল না, মেঝেতে মেয়েগুলোর পাশেই ঝুপ করে আসন-পিঁড়ি হয়ে বসে পড়ল।
সন্ধ্যা মোলায়েম গলায় বলল, মেঝেতে বসলে ঠান্ডা লাগবে। এখন শীত পড়ছে।
সোহাগের কানে কথাটা গেলই না। সে খুব মন দিয়ে মেয়েদের কাজ দেখল কিছুক্ষণ। তারপর হঠাৎ সন্ধ্যার দিকে চেয়ে বলল, আমি কি কিছু করতে পারি?
সন্ধ্যা অবাক হয়ে বলে, ওমা! তুমি আবার কী করবে? এসব কি তোমার কাজ?
কাজের মেয়েগুলো কাজ থামিয়ে মাঝে মাঝে অবাক হয়ে সোহাগকে দেখছিল। তাদের চোখে বিস্ময় আর কৌতুক।
সন্ধ্যার সব কাজেই খুব যত্ন। পরিষ্কার চকচকে মস্ত মেটে হাঁড়ি থেকে বড় হাতায় কাসুন্দি তুলে ফানেল দিয়ে শিশিতে ভরছিল সে। ছিপি লাগানোর একটা ছোট হাতযন্ত্র কিনেছে সে, দুটো মেয়ে সেই যন্ত্রে পটাপট ছিপি আটকে দিচ্ছে। যাতে কেউ নকল করতে না পারে তার জন্য পিলফার প্রুফ করার ব্যবস্থা। ব্যবস্থাটা অবশ্য খুবই দুর্বল, কিন্তু খদ্দেররা আজকাল এসব চায়।
সোহাগ উঠে এসে সন্ধ্যার কাছে দাঁড়িয়ে কাণ্ডটা দেখছিল। ওর গা থেকে একটা মৃদু সুঘ্রাণ আসছে। বিদেশি সেন্ট।
সন্ধ্যা একটু লাজুক মুখে বলল, এইসব নিয়েই বেঁচে আছি, বুঝলে? আমি তো লেখাপড়া শিখিনি।
সারাদিন তুমি খুব কাজ করো, না?
তাকে শেষ অবধি সোহাগ ‘তুমি’ বলছে দেখে ভারী খুশি হল সন্ধ্যা। বুক থেকে যেন একটা ভার নেমে গেল। গতকাল অবধি মেয়েটাকে কী ঘেন্নাই করত। এখন বড় মায়া হচ্ছে। আর মায়াবশে অন্যমনস্ক ছিল বলে হাতের শিশি ভরে একটু কাসুন্দি উপচে পড়ল। হেসে সন্ধ্যা একটা ন্যাকড়ায় হাত মুছে নিয়ে বলল, হ্যাঁ। গতরে খাটুনির কাজ। আর তো কিছু জানি না।
সোহাগ খুব কৌতূহল নিয়ে ছিপি আটকানোর যন্ত্রটা দেখছিল। বলল, ওই যন্ত্রটা তো খুব মজার।
ওটা দিয়ে ছিপি আটকায়। এসব তো আধুনিক কল নয়, শস্তার জিনিস।
এ-ঘরটায় কেমন সুন্দর একটা গন্ধ!
তোমার ভাল লাগছে বুঝি? এসব হচ্ছে মশলার গন্ধ। বোসো না, গল্প করি। তোমাদের সঙ্গে তো ভাল করে আলাপই হল না। ওই মোড়াটা টেনে বোসো।
সোহাগ লক্ষ্মী মেয়ের মতো বসল।
আমলকী খেতে এলে না তো আজ!
আমলকীর একটা ল্যাটিন নাম আছে বোধহয়। জানো?
সন্ধ্যা হেসে ফেলে, না। এসব ল্যাটিন-ট্যাটিন কি আমি শিখেছি?
আমিও জানি না।
এক প্যাকেট নিয়ে গিয়ে কাছে রেখো। শুনেছি আমলকীর অনেক উপকার।
আমি কি রোজ তোমার কাজে একটু হেলপ করতে পারি?
সন্ধ্যা ফের হাসে, শোনো কথা! এসব মৈষালি কাজ, এসব কি তুমি পারো?
ওই যে তুমি একটা কাঠের জিনিসে মশলা গুঁড়ো করো ওটা আমি পারব।
না গো মেয়ে, ওসব তোমাকে করতে হবে না। তোমার মা রাগ করবে।
মা তো সব ব্যাপারেই রাগ করে। তাতে আমার কিছু যায় আসে না।
তুমি মাঝে মাঝে এসে গল্প কোরো, তাহলেই হবে।
কিন্তু আমার কিছু করতে ইচ্ছে করছে। আই ওয়ান্ট টু কিপ মাইসেলফ বিজি।
সন্ধ্যা মায়াভরে মেয়েটার দিকে একটু চেয়ে থেকে বলল, একটু একঘেয়ে তো লাগবেই। এসব গাঁগঞ্জ জায়গা তো, তাই তোমার বোধহয় ভাল লাগে না।
একটা ঝটকা মেরে মাথা নাড়া দিয়ে মেয়েটা বলে, না না, শহর আমার একদম সহ্য হয় না। আমি তো গ্রামই ভালবাসি। তার চেয়েও ভালবাসি জঙ্গল।
ও হ্যাঁ, শুনেছিলুম শহরে থাকলে তোমার নাকি শরীর খারাপ করে। কীরকম অসুখ হয় তোমার?
ওটা একটা অ্যালার্জি। পলিউশন থেকে হয়।
তা হলে তো মুশকিল। পড়াশুনো করতে তো শহরেই থাকতে হবে।
পড়াশুনো করতে আমার ভাল লাগে না।
ওমা! সে কী? শুনেছি তুমি খুব ভাল ছাত্রী!
না তো! আমি একদম ভাল ছাত্রী নই। আমার ভাল লাগে শুধু হিস্টরি আর ন্যাচারাল সায়েন্স। ক্লাসের পড়া হিসেবে নয়।
সন্ধ্যা কী বলবে ভেবে পেল না। পড়াশুনোর কথা উঠলেই সে জব্দ। তবু সে বলল, তা হলে তুমি কী করবে?
মেয়েটা কাঁধ ঝাঁকিয়ে একটা অসহায় ভঙ্গি করল। তারপর মৃদু স্বরে বলে, আমি যা করতে চাই তা তো আমাকে কেউ করতে দেয় না।
কী করতে চাও তুমি?
মৃদু একটা দুষ্টু হাসি খেলে গেল সোহাগের মুখে। তারপর বলল, বলব?
বলোই না!
আমার ইচ্ছে করে খুব গভীর জঙ্গলে গিয়ে সব পোশাক খুলে ফেলে ঘুরে বেড়াই।
এ কথা শুনে কাজের মেয়েরা খিলখিল করে হেসে উঠল।
সন্ধ্যা একটা ধমক দিল, অ্যাই চুপ। মানুষের তো কতরকম ইচ্ছেই হয়। হাসতে আছে? জানিস আমার ভাইঝি বিলেত আমেরিকা ঘুরে এসেছে?
বাণী নামে একটা মেয়ে বলল, আমারও কিন্তু অমন ইচ্ছে যায়।
তোর আবার কী ইচ্ছে?
ওই যে গো, যেখানে কেউই থাকবে না তেমন জায়গায় গিয়ে সব খুলে ফেলে রোদে হাওয়ায় এলোচুলে বসে থাকি।
সোহাগ রাগ করল না। হাসল। তারপর হঠাৎ মুখটা গম্ভীর হয়ে গেল। খুব মৃদু স্বরে বলল, আমার খুব হারিয়ে যেতে ইচ্ছে করে।
সন্ধ্যা মায়াভরে বলে, ষাট, ষাট, হারিয়ে যাবে কেন? মানুষ হারিয়ে গেলে বড় কষ্ট।
কেন, ও কথা বলছ কেন? ওয়ার্ল্ড ইজ এ বিগ প্লেস।
সন্ধ্যা একটু আনমনা হল। তারপর বলল, হারিয়ে যেতে নেই। কদিনই বা বাঁচে বলল মানুষ, তার মধ্যেই কত শোকতাপ, কত দুঃখদুর্দশা! আমার জীবন থেকেও তো একটা লোক হারিয়ে গেল বলে—
সন্ধ্যা আর বলল না। ভাইঝির কাছে হয়তো বলতে নেই।
তুমি কি তোমার হাজব্যান্ডের কথা বলছ?
সন্ধ্যা চুপ করে থাকে।
সোহাগ বলে, আই নো অ্যাবাউট ইউ। ইউ আর এ কনজুগাল ডিসকার্ড। সো হোয়াট? ইউ স্টিল হ্যাভ ইওর লাইফ।
সন্ধ্যা একটু হেসে বলে, আমি কি অত ইংরিজি বুঝি?
সোহাগ একটু লজ্জা পেয়ে বলে, সরি।
সন্ধ্যা তার এই একটু ছিটিয়াল, একটু সরল ভাইঝির দিকে চেয়ে বলে, তোমার আর কী ইচ্ছে করে?
সোহাগ একটু লজ্জার হাসি হেসে বলে, আমার বয়সের ছেলেমেয়েরা যা করে, মানে পড়াশুনো, ক্যারিয়ার, কম্পিউটার—আমার একদম ভাল লাগে না। তুমিই না বললে কদিনই বা বাঁচে মানুষ! ঠিক তাই। আমাদের লনজিভিটি তো খুব বেশি নয়, এত পড়াশুনো, ক্যারিয়ার নিয়ে ভাবাভাবি, কত সময় চলে যায় বলো! তা হলে বাঁচব কখন? কদিন? আয়ুর নাইনটি পারসেন্টই তো চলে যাবে বাবা!
ওমাঃ ঠিক বলেছ তো! আমারও মাঝে মাঝে মনে হয়, এত খাটাখাটনিতে কত সময় চলে যাচ্ছে, দুনিয়াটাকে টেরই পাচ্ছি না।
সোহাগ স্মিত মুখে বলে, কিন্তু তোমার কাজটা আমার বেশ ভাল লাগছে।
কেন বলো তো? এ-কাজ আবার কীসের ভাল?
ইউ আর উইথ নেচার। ডুয়িং এ জব অফ ইওর ওন।
বাংলা করে বলো। বুঝতে পারি না যে! তোমার সব কথা আমার বুঝতে ইচ্ছে করছে।
মনে হয় তুমি তোমার কাজটাকে প্যাশোনেটলি ভালবাসো। তাই না?
সন্ধ্যা এবার এক গাল হাসে, কথাটা ভুল বললানি। করতে করতে কাজটা এখন খারাপ লাগে না।
ওটাই তো আসল কথা। আমরা যে কাজ করতে ভালবাসি তা আমাদের করতে দেওয়া হয় না। ক্যারিয়ার আমাদের সব নষ্ট করে দেয়। নো লাভ ফর লাইফ, নাথিং।
দোতলা থেকে মোনার গলা পাওয়া যাচ্ছিল, সোহাগ! সোহাগ, আর ইউ হিয়ার সামহোয়ার? প্লিজ কাম আপস্টেয়ার্স। ডিনার ইজ রেডি।
সন্ধ্যা বলল, যাও, তোমার মা ডাকছে।
সোহাগ উঠে পড়ল, যাই পিসি।
সন্ধ্যার কান জুড়িয়ে গেল ‘পিসি’ ডাক শুনে। মনটা হালকা লাগল, খুশির বাতাস লাগল বুকটায়। পিসি বলে ডেকেছে এতদিনে। পিপাসাটা তার বুকের ভিতরে লুকিয়ে ছিল এতদিন।
নীলিমা বলল, তোমার ভাইঝিটা পাগলি আছে দিদি।
সন্ধ্যা মাথা নেড়ে বলে, ও তুই বুঝবি না। কত ভাল কথা বলে গেল। ওইটুকু তো বয়স, এক রত্তি মাথায় কত চিন্তা করেছে দেখলি! বড় ভাল মেয়ে।
কুক কুক করে ঘড়িতে অ্যালার্ম বাজছে। মৃদু কিন্তু খর শব্দ। এ-শব্দ গভীর ঘুমের ভিতর ঠিক ঢুকে যেতে পারে। ঘুম না ভাঙিয়ে ছাড়ে না।
আগে এসব অ্যালার্ম ছিল না। মহিমকে তার বাবা একখানা ঘড়ি কিনে দিয়েছিল, রোজ দম দিতে হত কটর কটর করে চাবি ঘুরিয়ে। তার অ্যালার্ম ছিল ঝনঝনে। সাইকেলের বেলের মতো বেজে থেমে যেত, তাতে ঘুম ভাঙলে ভাল, না ভাঙলে ঘড়ির কিছু করার নেই। আজকাল এসব কোয়ার্টজ ঘড়ির আওয়াজ অন্যরকম। কানে নয়, যেন আঁতে গিয়ে ঢুকে পড়ে।
অ্যালার্মটা বাজছে দোতলায়, মেজো বউমার ঘরে, ভোর পৌনে চারটের গভীর নিস্তব্ধতায় শব্দটা চারদিকে যেন ছুরির ফলার মতো বারবার ঢুকে যাচ্ছে।
মহিমের ঘুম ইদানীং এমনিতেই পাতলা। শেষরাতে ঘুম আরও মিহি হয়ে আসে। চারটে থেকে সাড়ে চারটের মধ্যে উঠে পড়ে সে।
আজ বুডঢা কলকাতা যাবে। বর্ধমান থেকে ভোর ছটায় একটা লোকাল আছে, সেইটে ধরবে। খবরটা মহিমের জানার কথা নয়। যাওয়াআসার স্বাধীনতা ওদের তো আছেই। জিজ্ঞাসাবাদ অনুমতি নেওয়া ইত্যাদির বালাই নেই।
কাল রাত দশটা নাগাদ হঠাৎ মোনা—অর্থাৎ মোনালিসা তার ঘরে এসে হাজির। ‘বাবা’ বলে ডাকে না কখনও। কালও ডাকেনি। তবে বেশ নরম গলায় বলল, বুডঢা আজ কলকাতা থেকে এসেছে। খুব টায়ার্ড। কিন্তু কাল সকালেই ওকে কলকাতা ফিরতে হবে।
মহিম কথাটার প্যাঁচ ধরতে না পেরে তাকিয়ে ছিল। বুডঢা যে কলকাতা থেকে এসেছে, এ খবরটাও তার জানা নেই, যেমন জানা নেই বুডঢা এখান থেকে কলকাতা গিয়েছিল কবে।
মোনা বলল, মুশকিল হয়েছে ট্রেনটা খুব ভোরে। ছটায়। এখান থেকে অত ভোরে বাস বর্ধমান যায় কি না কে জানে। কিন্তু ট্রেনটা ওকে ধরতেই হবে। সকাল সাড়ে নটায় ওর কম্পিউটার ক্লাস।
মহিম তাকিয়ে ছিল। বুঝতে পারছিল, আসল কথাটা এর পর আসবে।
মোনা এবার বলল, কমলদার ছেলে রতনের তো মোটরবাইক আছে। ওকি সকালে একটু বুডঢাকে স্টেশনে পৌঁছে দিতে পারবে?
এ কথাটা মহিমকে জিজ্ঞেস করার মানেই হয় না। যার মোটরবাইক তাকে জিজ্ঞেস করলেই হত। মহিম মৃদু গলায় বলল, বতনের সঙ্গে কি বুডঢার আলাপ পরিচয় নেই?
মোনা একটু অপ্রতিভ হল কি? ফর্সা রংটা যেন একটু রাঙা হয়ে গেল। বলল, আসলে ওরা ভাইবোন তো তেমন মিশুকে নয়।
মিশুকে নয়—এ কথাটা মিথ্যে। ওরা ও-বাড়ির লোকজনকে মেশবার যোগ্য বলেই মনে করে না। কিন্তু কথাটা তো আর বউমাকে বলা যায় না। মহিম বলল, স্টেশনে পৌঁছে দেওয়াটা তো কোনও ব্যাপার নয়। নিশ্চয়ই দেবে। আমি বলে দেবোখন।
মহিম এটুকু বলেই চুপ করে গিয়েছিল।
মোনা একটু দ্বিধাগ্রস্ত ভাবে দাঁড়িয়ে থেকে বলল, কথাটা হয়তো রতনকে আমারই বলা উচিত ছিল। কিন্তু আমাদের মধ্যে তেমন রাপো তৈরি হয়নি বলে বলতে সংকোচ হচ্ছে।
একটু হাসল মহিম। বলল, সংকোচের কোনও কারণই ছিল না। আপনজনই তো৷ বললেই পারতে। ওরা তাতে খুশিই হত।
মোনা বলল, আপনি বললে বলব। তবে রতন তো বাড়িতে থাকেই না, অনেক রাতে ফেরে শুনেছি। কমলদাকে বলতে পারতাম, কিন্তু তিনি আজ কোথায় যেন গেছেন, রাতে ফিরবেন না।
ওঃ, ঠিক আছে, রতনকে আমি বলে দেব।
মোনা চলে যাওয়ার পর মহিম রায় একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। টানা প্রায় পনেরো-ষোলো দিন এখানে আছে, তবু কেন যে পর্দাটা এখনও টেনে রেখেছে, কোথায় বাধছে, কোথায় বাধক হচ্ছে তা বোঝা যাচ্ছে না। মেজো বউমার সঙ্গে ভাসুর কমলের একটু আলাপ আছে বটে, কিন্তু সম্পর্কটা ফাই-ফরমাশের। মহিমের ছেলেদের মধ্যে কমলই একটু ব্যক্তিত্বহীন এবং ভালমানুষ। আত্মসম্মানের বালাইও নেই তেমন। উপযাচক হয়ে সে-ই ওদের খোঁজখবর নেয়, গায়ে পড়ে কাজ করে দেয়। আর কেউ ওদের ছায়াও মাড়ায় না।
মহিম খুব ভোরেই ওঠে। পরশুদিনও উঠে প্রাতঃকৃত্য সেরে ঠাকুরপুজোর ফুল তুলতে বাইরে বেরিয়েছিল। বেশি দূর যেতে হয় না, ঘরের পিছনেই বাগান। সকালে তখনও অন্ধকার ঝুলে আছে চারদিকে, কুয়াশা আছে, ঠান্ডা ভাবও আছে, একটু পাতলা আলোর আভাসও আছে, কাক ডাকছিল, দূরে একটা মোরগও ডেকে উঠল। রোজকার মতোই ভোর। নতুন কিছু নয়।
বাগানে বেশি দূর ঢুকতেও হয় না, সামনেই শিউলি ফুলের ঝুপসি গাছ। নীচে অজস্র ফুল পড়ে থাকে ভোরবেলা। সেগুলো পুজোয় লাগে না। বোটা-খসা ফুল অনেক আটকে থাকে পাতায় আর ডালপালায়। ফুল তুলতে গিয়ে আচমকা তার চোখ গিয়ে পড়ল বাগানের মাঝখানে। কেন যে তার চোখই পড়ল। সাদাটে ঢিলা পোশাক-পরা স্থির মূর্তিটা দেখে আঁতকে ওঠবারই কথা তার। কিন্তু পূর্ব অভিজ্ঞতা ছিল বলে একটু চমকাল মাত্র।
কে ওখানে? সোহাগ নাকি?
না আজ মেয়েটা সেদিনের মতো আচ্ছন্ন নেই। মহিমের সাড়া পেয়ে ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াল।
দাদু!
ভারী অবাক হল মহিম। এর আগে কখনও ‘দাদু’ বলে ডেকেছে কিনা মনে পড়ল না। ডাকটা শুনেই তাই ভাল লাগল।
তুমি ওখানে কী করছ ভাই?
সোহাগ এগিয়ে এল কাছে, তুমি রোজ ভোরে ওঠো বুঝি?
মহিম বলে, হ্যাঁ। ওখানে কী করছিলে?
এমনি দাঁড়িয়েছিলাম। ট্রায়িং টু ফিল দি ওয়ার্ল্ড।
তোমার পায়ে জুতো বা চটি নেই কেন দিদিভাই?
চটি পরলে আই ক্যান্ট ফিল দি আর্থ।
কিন্তু কাঁটা ফুটতে পারে তো!
ফুটলেই বা!
আর শুঁয়োপোকা, সাপ এসবও তো থাকতে পারে।
আমার একটুও ভয় করে না।
মহিম স্নেহভরে বলে, তোমার গাছপালা ভাল লাগে বুঝি?
ভীষণ। মাঝে মাঝে ভাবি, ইস্ আমি যে কেন গাছ হয়ে জন্মালাম না।
ঠান্ডা লাগবে দিদিভাই, গায়ে একটা চাদর জড়িয়ে এসো গিয়ে।
একদিন তো মানুষের কোনও পোশাক ছিল না। তখন কীভাবে থাকত মানুষ?
মহিম একটু থতমত খেয়ে বলে, সেসব তো আদ্যিকালের কথা দিদিভাই। তখন মানুষের ইমিউনিটি ছিল।
এখন নেই?
না, মানুষের অভ্যাস পালটে গেছে।
পোশাক একটা বাধা।
মহিম বড্ড অবাকের পর অবাক হচ্ছে, মেয়েটার কি একটু মাথার দোষ আছে?
দিক-বসন কাকে বলে জানো দাদু?
হ্যাঁ, দিক-বসন মানে আবরণহীন। দিকই যার বসন।
আমি জানি। কথাটা খুব সুন্দর, না?
ওসব ঠাকুর-দেবতার ব্যাপার দিদিভাই। মানুষের ক্ষেত্রে খাটে না।
ইট হ্যাজ এ মেসেজ, এ মেসেজ ফর হিউম্যানিটি।
মহিম প্রমাদ গুনছিল। বিদেশে ন্যুডিস্ট কলোনি আছে বলে শুনেছে সে। মেয়ে-পুরুষ ন্যাংটা হয়ে ঘুরে বেড়ায়। পাগলের কাণ্ড সব। এ মেয়েটা তাদের খপ্পড়ে পড়েনি তো রে বাবা! বিদেশে যে কত কুশিক্ষাই আছে!
মেয়েটা কি তার মনের কথা শুনতে পেল? স্বগতোক্তির মতো করে বলল, তা বলে আমি ন্যুডিস্ট নই, দে আর এ স্যাড অ্যান্ড পারভারটেড লট! আমার শুধু মাঝে মাঝে ইচ্ছে করে চারদিকটাকে সমস্ত শরীর দিয়ে শুষে নিতে।
একটু পাগুলে ব্যাপার আছে মেয়েটার। মহিম বলল, এ নিয়ে তোমার সঙ্গে একদিন কথা বলব। এখন শিশির পড়ে তোমার ঠান্ডা লেগে যাবে।
আমি ইমিউন হওয়ার চেষ্টা করছি।
ওসব কি সইবে তোমার? শুনেছি তোমার একটা অ্যালার্জি আছে।
হ্যাঁ, কিন্তু গাছপালার মধ্যে আমি তো ভাল থাকি।
গাছপালা তো ভালই, কিন্তু বিপদের কথাও খেয়াল রাখতে হয়, এটা ঋতু পরিবর্তনের সময়।
তুমি একজন খুব কারেজিয়াস লোক!
মহিম তটস্থ হয়ে বলে, আমি! কে বলল তোমাকে? না দিদিভাই, আমি একটা ভিতু লোক।
তুমি সেদিন আমাকে কাঁধে করে অনেক দূর থেকে নিয়ে এসেছিলে। অ্যান্ড ইউ আর অ্যান অকটোজেনেরিয়ান।
বিপদে পড়লে মানুষ বাঁচার তাগিদে অনেক কিছু করে। কিন্তু দিদিভাই, তোমার যে বড্ড সাহস! একা একা ওভাবে ঘুরে বেড়াও কেন?
মেয়েটা হাত উলটে বলে, জানি না।
তুমি একটা ঘোরের মধ্যে ছিলে।
মেয়েটা মাথা নেড়ে বলে, সামটাইমস ইট হ্যাপেন।
তুমি কি রোজ এত ভোরে ওঠো?
না, কখনও কখনও আমি বেলা আটটা-নটাতেও উঠি, কিছু ঠিক নেই। মাঝে মাঝে রাতে আমার ঘুম আসে না।
এই বয়সে ঘুম আসে না কেন?
ভাবতে ভাবতে মাথা গরম হয়ে যায়।
কী ভাবো তুমি?
মাই রিলেশন উইথ দিস ভাস্ট ইনফাইনিট ইউনিভার্স। আরও কত কী, ভাবতে ভাবতে আমি উঠে বসে থাকি, তারপর ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়ি।
কিন্তু তাতে যে বিপদ হতে পারে।
হিহি করে একটু হাসল সোহাগ, সেই হাসিতে ওর শৈশব ফুটে উঠল যেন। বলল, কাল রাত দুটো-আড়াইটার সময় আমি উঠে নীচে নেমে আসি। তারপর হেঁটে হেঁটে কোথায় কোথায় যে চলে গেলাম।
সর্বনাশ!
কিন্তু কিছু বিপদ হয়নি তো, আমার সঙ্গে তোমাদের ওই কালো কুকুরটা ছিল।
কতদূর গিয়েছিলে?
অনেক দূর, আমি তো এ-জায়গাটা ভাল চিনি না, জঙ্গল-টঙ্গল মাঠঘাট দিয়ে অনেক হেঁটে তারপর একটা হাইরোডে উঠে দেখলাম, ট্রাক যাচ্ছে, তখন ফিরে আসি।
কী করে ফিরলে?
কুকুরটাই পথ দেখিয়ে নিয়ে এল, যখন এসে কোর্ট ইয়ার্ডে ঢুকছি তখন—ওই যে ওই ঘরে যিনি থাকেন—উনি কে বললা তো! জেঠিমা না?
হ্যাঁ, উনি তোমার জেঠিমা।
উনি হঠাৎ ভয় পেয়ে “চোর, চোর” বলে কাকে যেন ডাকছিলেন। আমি তখন জানালার কাছে গিয়ে বললাম, আমি চোর নই, আমি সোহাগ। উনি খুব অবাক হয়ে গেলেন। তারপর বললেন, মাঝরাতে একা মেয়েছেলে এলোচুলে ঘুরছ যে বড়! হাওয়া-বাতাস লাগবে যে! ঘরে যাও।
উনি ঠিকই বলেছেন।
হাওয়া-বাতাস লাগার কথাটা আমি বুঝতে পারিনি। তুমি জানো?
অস্বস্তিতে পড়ে মহিম বলে, উনি বোধহয় ভূতপ্রেতের কথাই বলতে চেয়েছেন। গাঁয়েগঞ্জে তো অনেক সংস্কার থাকে।
সংস্কার মিনস সুপারস্টিশনস?
হ্যাঁ, এসব জায়গায় মানুষকে মাঝে মাঝে নাকি ভূতে পায়। ওসব বিশ্বাসযোগ্য নয়।
কিন্তু আই বিলিভ ইন গোস্টস।
মহিম একটু হাসল। বলল, কেন বিশ্বাস করো?
আই ফিল দেম। আই ইভন সি দেম।
মহিম অবাক হয়ে বলে, কী দেখেছ তুমি?
আমার মনে হয় লক্ষ লক্ষ বছর ধরে যেসব মানুষ মরে গেছে তাদের প্রত্যেকের একটা করে ইমপ্রেশন রয়ে গেছে অ্যাটমোসফিয়ারে। আই সি দেয়ার শ্যাডোজ, আই ফিল দেয়ার প্রেজেন্স।
সেটা কীরকম দিদিভাই, বুঝিয়ে বলো।
তারা তো আমাদের মতো নয়, তারা কেউ নেইও। কিন্তু তাদের ইমপ্রেশন, তাদের অনেক কথাবার্তা, অনেক সময় তাদের শ্বাসপ্রশ্বাসও টের পাই এবং মাল্টিচুডস অব দেম।
তুমি যে আমাকে চিন্তায় ফেললে দিদি। তোমার এরকম হয় কেন?
আমি তা জানি না। আমার বন্ধুরা কেউ ভূতে বিশ্বাস করে না, তারা শুনলে অবাক হয়। বলে অল বোগাস।
হয়তো তুমি খুব ভাববা বলেই ওসব কল্পনা মাথায় আসে।
মে বি। আই হ্যাভ এ ভেরি স্ট্রং ইমাজিনেশন। কিন্তু আমার মনে হয় আমি ভুল দেখি না। ভূতকে অনেকে ভয় পায়। আমার একটুও ভয় করে না, আমার মনে হয় দে আর মাই ফ্রেন্ডস, মাই বেস্ট ফ্রেন্ডস।
চিন্তিত ও শঙ্কিত মহিম রায় ভোরের আবছা আলোয় তার এই প্রায় অচেনা নাতনিটির মুখের দিকে চেয়ে থেকে বলল, তুমি মাঝে মাঝে আমার কাছে এসো। আমি তোমার কথাগুলো আরও একটু বুঝতে চেষ্টা করব।
কিন্তু বিশ্বাস করবে না তো? আমার কথা কেউ বিশ্বাস করতে চায় না।
মহিম একটু হাসল, পৃথিবীতে কত রহস্যই যে আছে, সব কি উড়িয়ে দেওয়া যায়? না দিদি, আমি তোমার কথাগুলো নিয়ে ভাবব। হয়তো বিশ্বাসও করব, কে জানে! এই বুড়ো বয়সে খুব বিশ্বাস করতে ইচ্ছে হয় যে মানুষ মরে গেলেও একেবারে শেষ হয়ে যায় না। তার কিছু একটু থেকে যায়।
এসব কাল ভোররাতের কথা। আজ এই ভোররাতে বিছানায় মশারির মধ্যে বসে অ্যালার্ম ঘড়ির শব্দ শুনতে শুনতে কত ভাবনাই যে সিনেমার ছবির মতো মাথার ভিতরে ভেসে ভেসে যায়। মাঝে মাঝে যতিচিহ্নের মতো মৃত্যুর কথাও মনে পড়ে।
অচেনা অমল এবং ততোধিক অচেনা অমলের বউ, ছেলে, মেয়ে এদের সঙ্গে তার একটা সেতুবন্ধন হল কি? সেতুটি ওই ছিটিয়াল, বায়ুগ্রস্ত, চঞ্চলমতি সোহাগ। ঠিক বুঝতে পারছেনা মহিম, সেতুবন্ধনটি টিকে থাকবে কিনা।
মশারি তুলে পাকাপাকি উঠে পড়ল মহিম। প্রাতঃকৃত্য, বাসি ছাড়া, ঠাকুরঘর সারা, ফুলতলা, পুজোয় বসা।
তার মাঝখানেই নিস্তব্ধ ভোরে বজ্রাঘাতের মতো রতনের মোটরবাইক গর্জে উঠল। পাঁচটা বাজে। বুডঢাকে অবশেষে স্টেশনে পৌঁছে দিচ্ছে রতন, দুর্গা, দুর্গা।
রতন আর তার মোটরবাইক যেন দুটো জিনিস নয়। একটাই। যেন মোটরবাইকে করেই জন্মেছিল রতন। দিনরাত সে ওটায় চড়ে ঘুরছে, মোটরবাইক ছাড়া রতনকে আজকাল ভাবাই যায় না, মাঝে মাঝে বলে, যখন মোটরবাইকে চড়ে থাকি তখন নিজেকে আমার চে গুয়েভারা, ফিদেল কাস্ত্রো, জোসেফ স্তালিন, মাওসেতুং কত কী মনে হয়, মনে হয় আমি একজন লিডার, একজন পায়োনিয়ার।
কিন্তু ওরা কি মোটরবাইকে চড়তেন?
তা কে জানে। মোটরবাইকে চড়লে আমি ওরকম কেউ হয়ে যাই।
বন্ধুরা বলে ভটভটিয়া রতন। মোটরবাইকই ওর হাত পা মগজ। কাউকে জরুরি খবর দিতে চাও, অসময়ে হঠাৎ কিছু আনতে চাও বাজার থেকে, কাউকে কোথাও পৌঁছে দিতে চাও, রতন সঙ্গে সঙ্গে রাজি, মোটরবাইকে যতই তাকে দৌড় করানো হোক তার ক্লান্তি নেই।
মহিম রায় উঠোনের একধারে পাতা কাঠের চেয়ারে এসে বসল, বাঁ ধারে বাঁশবনের ফাঁকফোঁকর দিয়ে অন্ধকারকে ঝাঁঝরা করে দিয়ে আলো আসছে।
আরও একটা দিন। আরও এক পা এগিয়ে যাওয়া।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন