শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
সারা রাত কেউ তার শিয়রের কাছে বসে আছে, মাথায় সুগন্ধী জলপট্টি দিচ্ছে এবং ডেকে তুলে ক্যাপসুল খাওয়াচ্ছে ঘড়ি ধরে, এ জিনিস সুমন কখনও ভাবতে পারে না। তার নিজের মা অন্তত করে না। মাকে দোষ দেওয়া যায় না। মা নানা রকম অসুখ-বিসুখে বারো মাস ভোগে। সুমনেরও তেমন অসুখ-বিসুখ করে না কখনও। কয়েক বছর আগে জলবসন্ত হয়েছিল। তখন একজন আয়া রাখা হয়েছিল তার জন্য।
সুমন অস্বস্তি বোধ করে বলল, আপনি কেন এভাবে আমার কাছে বসে আছেন? আমি তো বেশ আছি।
বাসন্তী বলে, একটু আগেও তোমার জ্বর একশো চারের ওপর ছিল, তা জানো বাবা? আগে রুগি ঘুমোলে ওষুধ খাওয়ানো বারণ ছিল। ঘুমন্ত রুগিকে নাকি ডাকতে নেই। কিন্তু এখনকার ডাক্তাররা তো অন্যরকম। অনল বাগচী বলে গেছে ঠিক ছয় ঘণ্টা পর পর ক্যাপসুল খাওয়াতে। একবারও নাকি বাদ দেওয়া যাবে না।
আচ্ছা, সে না হয় আমিই খেয়ে নেব। আমার তো তেমন ঘুম হচ্ছে না। মাঝে মাঝেই জেগে যাচ্ছি।
তা হয় না বাবা। ও-ঘরে গিয়ে বিছানায় শুলেই কি আর আমার ঘুম হবে? দুশ্চিন্তা রয়েছেনা মাথায়! তোমার মা কাছে থাকলে আরও কত করত! আমি কি আর অত পারি?
সুমন হাল ছেড়ে দিল। এই মহিলার সঙ্গে সে পেরে উঠবে না।
রাত আড়াইটের সময় একবার রসিক উঠে এসেছিল।
ক্যামন বুঝত্যাছ? জ্বরটা কি কমের দিকে?
না। জ্বর তো বাড়ছে দেখছি। জলপট্টি দিয়ে দিয়ে একটু যেন কমছে মনে হচ্ছে। মাথাটা একবার ধুইয়ে দিলে হত।
এই শীতের মইধ্যে? কাল ঠান্ডা পড়ছে, মাথা ধোয়াইলে যদি হিতে বিপরীত হয়?
হবে না। মাথা ধোয়ালে জ্বরটা নামবে।
প্রবল আপত্তি তুলেছিল সুমন, না না, এত রাতে মাথা বোয়ানোর দরকার নেই।
বাসন্তী বারণ শুনল না। বরং সুমনকে এই প্রথম একটা ছোট্ট ধমক দিয়ে বলল, এই ছেলে, একদম চুপ করে থাকবে। লক্ষ্মী ছেলের মতো যা বলছি সব শুনতে হবে। বুঝেছ? তোমার ভালমন্দের দায় এখন আমার।
অগত্যা রসিক বালতি করে জল নিয়ে এল। বাসন্তী অনেকক্ষণ ধরে হিম-ঠান্ডা জলে মাথা ধুইয়ে দিতে লাগল তার। আরামে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছিল সুমন খেয়ালই নেই। মাথা বোয়ানোর সময় হাতপাখা দিয়ে হাপুর-হুপুর মাথায় বাতাস করছিল তার বাবা। যে-বাবাকে কখনও সে ছেলেপুলের সেবা-টেবা করতে দেখেনি।
সুমন ক্ষীণ কণ্ঠে বলল, হাতপাখার বাতাস কেন? সিলিং পাখা চালিয়ে নিলেই তো হয়।
বাসন্তী মাথা নেড়ে বলল, হয় না। সিলিং পাখার বাতাস বুকে লাগবে। এ সময়ে শুধু মাথায় বাতাস দেওয়ার নিয়ম। চুপ করে শুয়ে থাকো।
মাথা বোয়ানোর পর শুকনো তোয়ালে দিয়ে মাথা মুখ মুছিয়ে বালিশে শুইয়ে থার্মোমিটার দেখে বাসন্তী বলল, তিন ডিগ্রি নেমে গেছে।
মুর্গির স্টু, শিং-মাগুরের সুরুয়া, ফলের রস কোনও আয়োজনই বাকি রাখেনি বাসন্তী।
রসিক একবার ভয় খেয়ে বলল, আরে, তুমি শুরু করছ কী? এত খাইলে পেট ছাইড়া দিব না?
কিচ্ছু হবে না। ডাক্তার বলে গেছে জোর করে খাওয়াতে। নইলে দুর্বল হয়ে পড়বে। আগেকার দিনে খেতে দিত না বলেই রুগি দুর্বল হয়ে পড়ত।
প্রথমে টাইফয়েড বলে সন্দেহ করলেও ব্লাড রিপোর্ট দেখে ডাক্তার অনল বাগচী বলল, ভয়ের কিছু নেই। ভাইরাল ফিবার।
চার দিনের দিন সকালে জ্বর নেমে গেল।
জ্বর যখন নেমে যাচ্ছিল, তখন সুমন খুব অস্থির বোধ করে ঘুম ভেঙে শিয়রে বাসন্তীকে খুঁজেছিল। সে সময়ে বাসন্তী ছিল না। ভারী অসহায় লেগেছিল সুমনের। জলতেষ্টা পাচ্ছিল, মাথাটা কেমন করছিল আর শরীরে যেন হাজার মাইল দৌড়ের পর নিঝুম ক্লান্তি। তার মনে হচ্ছিল সে অজ্ঞান হয়ে যাবে। চোখ যখন সত্যিই অন্ধকার হয়ে আসছে সে তখন বাচ্চা ছেলের মতো ক্ষীণ কণ্ঠে ডেকে উঠেছিল, মা! মা! কোথায় আপনি?
অত ক্ষীণ কণ্ঠ পাশের ঘর থেকে শোনার কথা নয় বাসন্তীর। তবু শুনতে পেল ঠিকই।
এক ছুটে চলে এল সুমনের কাছে, বাসন্তীর কোলে হাম্মি।
কী হয়েছে বাবা? কী হয়েছে?
শরীর ভীষণ খারাপ লাগছে! আমি অজ্ঞান হয়ে যাব।
বাসন্তী গায়ে হাত দিয়েই বলল, জ্বর নেমে গেছে যে! ইস্, অত হাই টেম্পারেচার এক লাফে নেমে যাওয়ায় এরকম হচ্ছে। দাঁড়াও বাবা, হট ওয়াটার ব্যাগ দিচ্ছি।
আপনি একটু কাছে থাকুন। আমার ভীষণ অস্থির করছে।
হ্যাঁ বাবা, আমি তো কাছেই আছি।
হট ওয়াটার ব্যাগ, পাখার বাতাস আরও কীসব করল বাসন্তী কে জানে। কয়েক মিনিট বাদে অস্থিরতা কমে গেল সুমনের। শরীর এত দুর্বল যে চোখ খুলতে পর্যন্ত পরিশ্রম হচ্ছে। সে শুনেছে খুব বেশি টেম্পারেচার হঠাৎ নেমে এলে রুগি হার্টফেলও করে অনেক সময়ে। অন্তত আগের দিনে করত।
বাসন্তীর দিকে কৃতজ্ঞ চোখে একবার চেয়ে সে গভীর ক্লান্তিতে চোখ বুজে ঘুমিয়ে পড়ল।
সকালে চোখ চেয়ে দেখল, পুবের রোদে ভেসে যাচ্ছে ঘর। চারদিক আলোয় ঝলমল করছে। তার চেয়ে বেশি ঝলমল করছে তার শিয়রে বসে থাকা বাসন্তীর মুখ।
কেমন লাগছে বাবা?
আমার জ্বর বোধহয় রেমিশন হয়ে গেছে, না?
হ্যাঁ বাবা। জ্বর নেই, গা একদম ঠান্ডা।
সুমন লজ্জার হাসি হেসে বলল, আপনাকে খুব জ্বালিয়েছি।
ওটুকু যে দরকার ছিল বাবা। না জ্বালালে কি মাকে চেনা যায়?
সুমন চুপ করে রইল। নিজের মাকে সে ভীষণ ভালবাসে। তেমন সে আর কাউকেই কখনও ভালবাসতে পারবে না। ঠিক কথা। তবু এই অদ্ভুত ভদ্রমহিলা সেই ভালবাসায় অনেকটা ভাগ বসিয়েছেন। একে তার মা বলেই ভাবতে ইচ্ছে করছে। এমনকী তার কলকাতায় ফিরে যাওয়ার কথা ভাবতে একটু যেন কষ্টই হচ্ছে।
আমি একটু রোদে বসব!
বসবে বইকী বাবা, দাঁড়াও, জানালার ধারে ইজিচেয়ার পেতে দিচ্ছি।
না না, ঘরে নয়। উঠোনে গিয়ে বসব।
ওমা! এই দূর্বল শরীরে সিঁড়ি ভাঙতে পারবে নাকি? মাথাটাথা ঘুরে যায় যদি?
পারব। ধরে ধরে নামলেই হবে।
আচ্ছা, তোমার বাবা বরং ধরে ধরে নামিয়ে নেবে।
শরীর যে কতটা দুর্বল তা সিঁড়ি ভেঙে নামবার সময় টের পাচ্ছিল সুমন। তার বাবা শক্তিমান মানুষ। শক্ত কেঠো হাতে ধরে সাবধানে নামাতে নামাতে বলছিল, পাতলা হইয়া গেছস, এক্কেরে পাতলা হইয়া গেছস!
উঠোনে খাটিয়া পেতে, তোশক বালিশ দিয়ে একেবারে রাজশয্যা রচনা করে রেখেছে বাসন্তী। শরীরটা রোদে আর মাথাটা যাতে ছায়ায় থাকে তারও ব্যবস্থা করেছে। সে শুতেই গলা পর্যন্ত একটা পাতলা কম্বলে ঢেকে দিয়ে বাসন্তী বলল, উত্তুরে বাতাস দিচ্ছে, হুট করে দুর্বল শরীরে ঠান্ডা লেগে যেতে পারে। কিছুক্ষণ গায়ে ঢাকাটা থাক। শরীর গরম হলে ঢাকাটা সরিয়ে দিও।
চার দিন পর ঘর থেকে বেরিয়ে মুগ্ধ হয়ে গেল সুমন। উলটো দিকেই উঠোনের এক প্রান্তে একটা প্রকাণ্ড ঝুপসি নিমগাছ। তাতে সকালে রাজ্যের পাখিদের ডাকাডাকি। এখনও ফটকের পাশে শিউলি গাছটায় ঝেঁপে ফুল আসে। তলাকার ঘাসজমিতে সাদা-কমলা ফুলের যেন একখানা কার্পেট বিছানো রয়েছে। গোটা কুড়ি-পঁচিশ নারকোল গাছ উত্তুরে হাওয়ার ঝাপটা লেগে সাঁই সাঁই শব্দ তুলছে। মুনিশরা খাচ্ছে বারান্দায় বসে। পান্তা আর বাসি তরকারি, তেঁতুল আর লঙ্কা দিয়ে। উঠোনে নেচে বেড়াচ্ছে চড়ুই, শালিক। এই সামান্য দৃশ্যই যেন চোখ ভরিয়ে দিল সুমনের।
সোয়েটার আর কানঢাকা টুপিতে ঝুব্বুস হাম্মিকে উঠোনে ছেড়ে দিল মুক্তা। হাম্মি হামা দিয়ে সোজা এসে সুমনের খাটিয়া ধরে দাঁড়িয়ে অবাক হয়ে চেয়ে রইল সুমনের দিকে। তারপর হাত বাড়িয়ে ‘যা যা যা যা’ করে কী যেন বলার চেষ্টা করতে লাগল।
দুহাতে হাম্মির মুখটা ধরে আদর করল সুমন। কদিনেই বোনটা তার ভারী ন্যাওটা হয়েছে। ইদানীং মায়ের কোল থেকেও ঝাঁপ খেয়ে তার কোলে চলে আসে। ওর গায়ে মুখে আশ্চর্য শৈশবের স্বর্গীয় গন্ধ! কী নরম তুলতুলে শরীর। তারা দুই ভাইবোন কাছাকাছি বয়সের বলে বড় হয়ে সুমন চটকানোর মতো কোনও শিশুকে পায়নি। এখন হাম্মির জন্য আর একটা মায়া তৈরি হয়ে রইল এখানে।
মায়া আর একটাও আছে। সে হল পান্না। জ্বরের ঘোরের মধ্যেও পান্নার মুখ বারবার হানা দিয়েছে মনের মধ্যে। এই সকালের বাতাসেও তো তার দেহস্পৰ্শ! ভাবলে গা শিউরে ওঠে।
রান্নাঘরে খদ্দরের চাদরে মুড়িসুড়ি দিয়ে উনুনের ধারে বসে দুধ-চা খাচ্ছিল জিজিবুড়ি।
গজগজ করতে করতে বলল, আদিখ্যেতা দেখালি বটে বাবা! বলি গু মুতও কাচলি নাকি ওই ধেড়ে ছেলের।
বাসন্তীর মনটা বড় ভাল আছে কদিন। কান ভরে সুমনের গালভরা মা ডাক শুনেছে। বুক ঠান্ডা। বলল, দরকার হলে কাচতাম। দরকার পড়েনি তাই।
ওঃ, একেবারে নবদ্বীপের গোঁসাই এয়েছেন যেন। একটু গা গরম হয়েছে কি হয়নি অমনই একেবারে অনল ডাক্তার এসে হাজির। অমন ভালুক জ্বর তো আমাদেরও কতই হয় বাপু, কোথায় ডাক্তার, কোথায় বদ্যি! কাঁথামুড়ি দিয়ে পড়ে থাকলেই হয়।
খর চোখে মায়ের দিকে চেয়ে বাসন্তী বলল, থলিতে বিষ জমেছে, না মা? রোজ এসে এই সকালবেলাটায় তুমি আমার মেজাজ বিগড়ে দিয়ে যাও।
তা বাছা, ভাল কথা বললে বাঁকা করে ধরিস কেন? সংসারের তো একটা রীতি আছে, নাকি? সতীনপো হল সতীনপো, সাপের বাচ্চা, যতই দুধ কলা দিয়ে পুষিস না কেন, ছোবল দিতে ছাড়বে ভেবেছিস?
সে যদি দেয় তো দেবে। কপালে যা আছে তা কি খণ্ডানো যায়? গাল ভরে মা বলে তো ডেকেছে। সে-ই আমার ঢের।
তবে আর কী, পিটুলিগোলা খেয়ে দুধ খেয়েছি বলে নেত্য করগে। বলি দিনরাত অত লোক-দেখানো সেবা দেওয়ার কী দরকারটা ছিল? ঠান্ডা লেগে একটু গা গরম হয়েছে বৈ তো নয়। তোর মতো হ্যাবাকান্ত দেখিনি বাপু। অমন ভালমানুষি করলে দুনিয়ার সবাই তোর মাথায় হাত বুলিয়ে নেবে। এখন থেকে শক্ত হ।
তোমাকে আর হিতোপদেশ দিতে হবে না মা। আমি যা ভাল বুঝেছি করেছি।
গেলাসটা বাড়িয়ে জিজিবুড়ি বলল, দে তো গরম দুধে একটু লিকার ফেলে। যা ঠান্ডা পড়েছে, তেমন জুত হচ্ছে না যেন।
গরম দুধের হাঁড়ি থেকে হাতা দিয়ে গেলাসে দুধ দিতে দিতে বাসন্তী বলে, আফিং-এর মাত্রা বাড়িয়েছ নাকি?
না বাড়িয়ে উপায় আছে? পেটটা ছেড়ে দিচ্ছে যে মাঝে মাঝে। এত আফিমের জোগানই বা আসবে কোত্থেকে।
তোমাকে আফিং ধরিয়েছিল কে?
কে আবার ধরাবে। নন্দ কোবরেজই ধরিয়েছিল। একটা সময়ে পেটের এমন ব্যামো হয়েছিল যে ওষুধে ধরে না। বোতল বোতল পাঁচন খেয়ে নলি-খলি পায়খানা। তা নন্দ কোবরেজ তখন আফিং ঠুসে দিয়ে বলল, এ হল মোক্ষম দাওয়াই। তখন কি আর জানতুম শেষে একটু আফিং-এর জন্য এমন হেদিয়ে মরতে হবে! সে আমলে কি আর চিকিৎসা ছিল মা?
দুধটুকু খেয়ে জিজিবুড়ি উঠল। বলল, ছেলে এসে সব দেখে-টেখে গেল। এবার মেয়ে আসবে। তারপর বড়বউ এসে হাজির হবে। তখন কী করবি ভেবে রেখেছিস?
অবাক হয়ে বাসন্তী বলল, ভাবাভাবির কী আছে? এলে আসবে। তারা তো আর ফ্যালনা নয়।
তারা ফ্যালনা নয় সে জানি। কিন্তু ফ্যালনা যে তুই।
তার মানে?
ভগবান তো তোকে বুদ্ধি-সুদ্ধি দেননি, তাই বোকার মতো বলিস। বলি বড়বউ যদি এসে গেড়ে বসে আর তোকে দাসীবাঁদীর মতো খাটায় তাহলে তোর দশা কী হবে জানিস?
দাসীবাঁদীর মতো খাটাবে!
তুই তো দাসীবাঁদী হওয়ার জন্য মুখিয়ে আছিস। ছেলের জন্য যা করলি তা তো দেখলুম। বড়গিন্নি এলে তো তোর আঁচলে পা মুছবে। এখন থেকে একটু মাথা খাটিয়ে চল। ওরা সব বাঙাল দেশের মানুষ, তুই ডালে ডালে চলিস তো ওরা চলে পাতায় পাতায়। তোর অত আদিখ্যেতার দরকার কী? নিজেরটা নিয়ে থাকবি। পারিস তো জমিজমা কিছু আমার বা ভাইদের নামে বেনামী করে দে। তাহলে আর গাপ করতে পারবে না।
বেনামী করব? কেন বলো তো!
তুই যা বোকা, কোথায় কোন কাগজে সইসাবুদ করিয়ে নেবে তার ঠিক কী? আমাদের নামে থাকলে তোরই থাকল, ওরাও দাঁত বসাতে পারবে না।
বাসন্তী গম্ভীর হয়ে বলল, তাই বুঝি তোমাদের নামে লিখে দিতে হবে! বেশ বললে তো মা, পালিশ করা কথা।
ভাল কথা তো আজকাল তোর সয় না। তোকে যে গুণ করে রেখেছে। যখন সব যাবে তখন এ কথার মর্ম বুঝবি।
মর্ম বুঝে আর কাজ নেই মা। তোমার ছেলেরা যে সাঁট করে তোমাকে পাঠায় সে আমি জানি। বলি আমার ভালটা তোমার কাছে এমন বিষ হয়ে গেল কেন বলো তো! আমাকে কি পেটে ধরোনি, নাকি?
খারাপ বলেছি কিছু? সবটা তো আর দিতে বলিনি। বললুম, অদিনের জন্য কিছু জমিজমা বেনামী করে রাখ, বিষয়ী লোকেরা তো তাই করে।
আমার আর বিযয়ী হয়ে কাজ নেই। তুমি এবার এসো গিয়ে।
যাচ্ছি বাছা যাচ্ছি, তাড়াতে পারলে যেন বাঁচিস। একটু উঁকি মেরে দেখ, বাঙাল আবার এধারে আছে কিনা, দেখলে তো তার আবার কাটা ঘায়ে নুনের ছিটে পড়বে।
সে এখন কাককে রুটি খাওয়াচ্ছে।
জিজিবুড়ি বিদেয় হওয়ার পর বাসন্তী হাঁফ ছাড়ল। রোজ সকালে মা যতক্ষণ থাকে ততক্ষণ যেন একটা ভয় ঘিরে থাকে তাকে। পৃথিবীকে সে যখন নিজের মতো করে বুঝে নিতে চায় তখনই জিজিবুড়ি এসে তাকে উলটো কথা শেখায়।
রান্নাঘরের পাশ দিয়ে এক চিলতে একটা গলি। কচুপাতার আড়াল দিয়ে জিজিবুড়ি বেরিয়ে এসে পিছন দিয়ে মরণের পড়ার ঘরে উঁকি দিল।
মরণ এক রাগী মাস্টারের কাছে পড়ে আজকাল।
ও মরণ।
মরণ অঙ্ক কষতে কষতে মুখ তুলে বলল, কী বলছ?
বলি সব ঠিক আছে তো!
হ্যাঁ।
কখন দিবি দাদা?
তুমি যাও না, আমি ঠিক দিয়ে আসব।
বাঁচালি দাদা। জিনিসটা এসেছে তো!
তা জানি না। খুঁজে দেখবখন।
কেউ যেন টের না পায়।
তুমি যাও না, কেউ টের পাবে না।
জিজিবুড়ি জানালা থেকে অদৃশ্য হল।
বুড়ো-বুড়িদের প্রতি এক ধরনের মায়া আছে মরণের। বুড়ো-বুড়িদের কাছে গল্পের ঝুলি থাকে। কাছে বসলেই কত কথা শোনা যায়। জিজিবুড়িকে সবাই হ্যাক-ছিঃ করে বটে, কিন্তু মানুষটাকে মরণ তেমন অপছন্দ করতে পারে না। তার অসুখ-বিসুখ হলে জিজিবুড়ি হামলে এসে পড়ে। মায়ের সঙ্গে যখন ঝগড়া করে দু-চারদিন আর এমুখো হয় না তখনও মাঠেঘাটে যেখানে তোক জিজিবুড়ি গিয়ে তার খোঁজখবর নেয়।
কয়েকদিন আগে জিজিবুড়ি ভারী কাঁচুমাচু হয়ে এসে তাকে ধরে পড়েছিল। ও দাদা মরণ, আমাকে বাঁচাবি ভাই?
কেন, তোমার আবার কী হল?
আফিং ছাড়া যে আর বাঁচি না দাদা। আর দু-চারদিন হয়তো চলবে। তারপর আফিং না জুটলে যে পেট ছেড়ে দেবে দাদা। আর বাঁচার উপায় নেই।
আফিং! কিন্তু আমি আফিং কোথায় পাব?
সে কথাই তো বলতে আসা। তোর মা তোর বাপকে কলকাতা যাওয়ার সময় একটা ফর্দ ধরিয়ে দেয় ফি হপ্তায়। তাতে একটু লিখে দিবি আফিং-এর কথা?
মাকে বলো না লিখে দিতে।
সে লিখবে না দাদা, আমাকে দু-চক্ষে দেখতে পারে না। তুই একটু চুরি করে লিখে দে।
বাবা টের পেলে পিঠের ছাল তুলে ফেলবে।
তোর মাকে আমি বুঝিয়ে বলে রাখবখন। সে যদি বলে সে-ই লিখেছে তাহলে বাঙাল মোটেই রাগ করবে না। লিখবি ভাই? প্রাণটা তাহলে আমার বাঁচে।
না জিজিবুড়ি, মা ভীষণ বকবে।
বকলে আমাকে বকবে, তোকে তো আর নয়। আমি তোর মাকে বুঝিয়ে বলবখন।
কাজটা খুব কঠিন ছিল না। মা ফর্দ করে টেবিলের ওপর পাউডারের কৌটো চাপা দিয়ে রাখে। ফর্দের শেষে মায়ের হাতের লেখা নকল করে মরণ লিখে দিয়েছিল, আফিং—দুই ভরি।
বাবা ফর্দমতো জিনিসপত্র নিয়ে এসেছে। শোয়ার ঘরে ব্যাগ ভর্তি জিনিস রাখা আছে। কিন্তু সেই গন্ধমাদন হাঁটকানোর সময় বা ইচ্ছে হয়নি মরণের। মা ঠিক বের করে দেবে।
মাস্টারমশাই চলে যাওয়ার পর বইপত্র গুছিয়ে রাখছিল মরণ। বাবা যতক্ষণ বাড়িতে থাকে ততক্ষণ সে লক্ষ্মী ছেলে। নইলে এতক্ষণে দুই লম্ফে কাঁহা কাঁহা মুলুক চলে যেত!
বইপত্র গুছিয়ে দরজার দিকে পা বাড়িয়েই থমকে গেল মরণ। তার বাবা কাককে রুটি খাইয়ে ফিরছে। ঠিক সেই সময়ে দাদাকে ফলের রস দিতে উঠোনে বেরিয়ে এসেছে মা।
বাবা হঠাৎ তার মায়ের দিকে চেয়ে বলল, আগো, আফিং কার লিগ্যা আনতে দিছিলা? ঠাইরেনের লিগ্যা নাকি?
মরণ শিউরে উঠে ঘরের মধ্যে ফের সেঁদিয়ে এল।
বাসন্তী অবাক হয়ে বলে, আফিং! আফিং-এর কথা আবার তোমাকে কখন বললাম?
মনে নাই? তাজ্জব মাইয়ালোক! ফর্দের মইধ্যেই তো লেখা আছিল, আফিং দুই ভরি।
ও মা গো! দেখি ফর্দটা!
ব্যাগের মইধ্যেই আছে। ক্যান, তুমি লেখ নাই?
হঠাৎ বোধহয় বাসন্তীর কাণ্ডজ্ঞান মাথাচাড়া দিল। সুমনের হাতে রসের গেলাসটা দিয়ে বলল, দাঁড়াও ভেবে দেখি। এই ছেলের অসুখ নিয়ে আমার মাথা এত গরম যে কিছু মনে থাকছে না।
তাই কও। আমি তো ভাবলাম ভূতে লেখল নাকি। যাউক গা, আফিং আনছি৷ ঠাইরেনরে পাঠাইয়া দিও।
ঠিক আছে।
মরণ হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। ঠিক সময়ে মা ব্রেক না কষলে তার কপালে বিস্তর দুঃখ ছিল। জিজিবুড়িটা মহা পাজি। মাকে বলে রাখার কথা ছিল, কিন্তু রাখেনি।
মায়ের বকাঝকা বা মারধর তেমন গ্রাহ্য করে না মরণ। মায়ের হাতে মোটেই জোর নেই, মারলে লাগেও না। আর বকুনি তো অহরহ হচ্ছে, নতুন কিছু নয়।
সে গিয়ে চুপ করে দাদার কাছটিতে বসল।
সুমন মুখটা করুণ করে বলল, খুব রোগা হয়ে গেছি, না রে?
না তো! একটু ফর্সা দেখাচ্ছে।
ফর্সা নয়, ফ্যাকাশে। খুব দুর্বল।
আমারও খুব জ্বর হয়। আর পেট ছাড়ে।
বলে হি-হি করে হাসল মরণ।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন