ত্রয়োদশ অধ্যায়

শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

তেরো।

আমি ভারী অবাক হয়ে দেখছি তোকে।

কেন, অবাক হওয়ার মতো কী দেখলেন?

আমার হিসেবমতো তোর বয়স এখন পঁয়ত্রিশ-ছত্রিশ। ঠিক তো!

না মশাই, আপনার শ্যালিকার বয়স এখন আটত্রিশ।

বাজে বকিস না। আচ্ছা, ছত্রিশই ধরছি।

স্নেহের পাত্রী বলে সত্যি কথাটা স্বীকার করতে চান না তো!

তা নয়। হিসেব করেই বলছি।

আচ্ছা, নয় তাই হল, এবার অবাক হওয়ার কথাটা বলুন।

আমি দেখছি তোর শরীরে এক ফোঁটাও চর্বি জমেনি। আশ্চর্য সেটাই।

কেন, এতে আশ্চর্য হওয়ার কী আছে বিশুদা?

কিছু মানুষ থাকে দড়কচা-মারা চেহারা, তাদের কখনও চর্বি হয় না। কিন্তু তোর তো সেরকম সিঁটকোনো চেহারা নয়। তোর চর্বি হওয়ার কথা। এমনকী তোর পেট বা কোমরেও ভাঁজ পড়ে না। হ্যাঁ রে, ডায়েটিং করিস নাকি।

খাটে বসে আপন মনে উল বুনে যাচ্ছিল বকুল। সে পারুলের চেয়ে নয় বছরের বড় দিদি। এতক্ষণ চুপ করে থেকে এবার বলল, চিরকাল ডায়েটিং করাই তো ওর স্বভাব। সেই ছেলেবেলাতেও একটুখানি খেয়েই ওর পেট ভরে যেত।

বিশ্বনাথ মাথা নেড়ে বলে, যতই কম খাক, চর্বি না জমার কথা নয়। ওর দেখো, একটুও নেই। বেশি ডায়েটিং করলে চেহারায় একটা অসুস্থ শীর্ণতার ছাপ পড়ে, ওর তাও হয়নি।

পারুল হাসছিল, এসব ম্যাজিক মশাই, ম্যাজিক।

তুই কি ব্যায়াম করিস?

খুব বেশি কিছু নয়। সকালে বরের সঙ্গে একটু হাঁটি। আর সামান্য কয়েকটা আসন করি।

তোর বয়সটাও এক জায়গায় আটকে আছে। এখনও কলেজের ছাত্রী বলে চালিয়ে দেওয়া যায়।

বকুল বলে, ওগো, ওকে অত নজর দিও না তো! তোমার নজর বাপু খুব খারাপ। জানিস পারুল, ও যখনই আমাকে ভাল দেখে তখনই আমার শরীর খারাপ হয়।

বিশ্বনাথ হাসে, নজরের দোষ কী বল! পারুল যে আমাকে বড় অবাক করে দিয়েছে। দু-তিন বছর বাদে দেখা, একইরকম আছে। একটুও বদলায়নি।

হ্যাঁ রে, আমার বয়সটা বোঝা যায়, না?

তা কেন? তবে তুই একটু মোটা হয়ে গেছিস দিদি।

কী করব বল! জল খেলেও মোটা হই।

বিশ্বনাথ একজন সরকারি আমলা। রিটায়ার করার মুখে। কালোর ওপর চেহারাটা একসময়ে ভালই ছিল। কালো বলে বিয়েতে কিছুতেই রাজি হচ্ছিল না বকুল। আপত্তি ছিল বকুলের মা বলাকারও। এ বংশে সবাই ফর্সা। ছেলেমেয়ে কেউ কালো নয়। তা হলে কালো জামাই কেন পছন্দ করা হচ্ছে?

গৌরহরি তাঁর স্ত্রী বলাকাকে বলেছিলেন, কালো বলে আমারও যে আপত্তি হচ্ছে না তা নয়। বকুল ফর্সা, কালো বরে তারও আপত্তি হওয়ারই কথা। কিন্তু বিশ্বনাথের যে-গুণটার জন্য সম্বন্ধ করছি তা হল ছেলেটি খুব সৎ। যে-ডিপার্টমেন্টে চাকরি করে সেখানে লাখপতি হওয়া কোনও ব্যাপারই নয়। এই ছেলেটি ঘুষ খায় না, মিথ্যে কথা বলে না, নেশা নেই। এর বাবাও সরকারি অফিসার ছিলেন, সেই মানুষটিও সৎ।

বলাকা বললেন, খুঁজলে কি অমন আর পাওয়া যাবে না?

যাবে বলাই, যাবে। খুঁজলে কী না পাওয়া যায়!

তা হলে আর একটু দেখো না। মেয়ে তো সুন্দরী, আর বয়সও বয়ে যাচ্ছে না।

গৌরহরি একটু চিন্তিত হলেন। বললেন, তুমি কখনও আমার মতের বিরুদ্ধে মত দাও না। এবার যখন দিলে তখন ভাবতে হবে। চট করে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত হবে না।

গৌরহরিকে যতই স্বাধিকারপ্রমত্ত এবং খেয়ালি বলে মনে করুক অন্য লোক, পারুল জানে, তার বিবেচনাশক্তি বড় কম ছিল না।

বলাকা বললেন, ওগো, তুমি আবার আমার কথায় কিছু মনে কোরো না। পাত্র ভাল স্বীকার করছি। কিন্তু ওরা আবার বাঙাল দেশের লোক, সেটাও একটু ভেবে দেখো।

গৌরহরি চিন্তিত মুখে বললেন, সবই ভেবেছি। আবার ভাবব। চট করে কিছু করব না। কিন্তু বলাই, একটা জিনিস ভেবে দেখেছ?

কী গো?

এমন পরিবার কি আজকাল খুঁজে পাবে যারা বংশানুক্রমে ছেলের বিয়েতে পণ নেয় না?

সেটা পাওয়া মুশকিল। কিন্তু আমাদের তো টাকার অভাব নেই। পণ দিয়ে যদি ভাল পাত্র পাওয়া যায়, না হয় দিলুম পণ!

গৌরহরি হাসলেন, বেশ বললে বলাই, বেশ বললে। পণ দিলে যদি ভাল পাত্র পাওয়া যায়! কিন্তু ভেবে দেখেছ কি যারা পণ নেয় তাদের কিছুতেই ভাল বলা যায় না?

ওটা যে রেওয়াজ।

মৃদু মৃদু মাথা নেড়ে, সহাস্যে গৌরহরি বলেন, রেওয়াজ নয়, রেওয়াজ নয়। করাপশন-যখন ছড়িয়ে যায় তখন সেটাকে কাস্টম বলে মেনে নেওয়া যে ভয়ংকর রকমের অন্যায়।

বলাকা একটু ভয় পেলেন। দুঁদে উকিলের সঙ্গে পেরে ওঠা তাঁর কর্ম নয় বুঝে বললেন, পণ ছাড়াও কি পাত্র জুটবে না?

জুটবে। চেষ্টা করলে পাওয়া যাবে নিশ্চয়ই। দেখছি চেষ্টা করে।

তুমি রাগ করলে না তো!

না। বলছি, মেয়েটার ভালমন্দ বিবেচনা করার অধিকার তো আমার চেয়ে তোমার কম নেই। এক্ষেত্রে আমার মতামত জোর করে চাপানো ঠিক হবে না।

বিশ্বনাথকে তোমার কি খুব পছন্দ?

সে কথা থাক বলাই। আমি আর তার কতটুকু জানি? সৎ হওয়াটাই বড় কথা নয়, অন্যান্য ব্যাপারও দেখা উচিত। এইজন্যই তো বলে, লাখ কথা ছাড়া বিয়ে হয় না।

বিশ্বনাথ এরকম বাতিলই হয়ে গেল সেদিন।

বুড়ো ঘটক সর্বানন্দ ভট্টাচার্য তখনও বেঁচে। এ সম্বন্ধ তাঁরই করা। তিনি একদিন বলাকার সঙ্গে এসে দেখা করে বললেন, মা, এ সম্বন্ধ তোমার পছন্দ নয় বলে শুনলাম।

বলাকা ঘোমটা দিয়ে আড়াল থেকে বললেন, ছেলে যে কালো।

সর্বানন্দ হাসলেন। সত্তর বছর বয়সেও ঝকঝকে দাঁত। সুঠাম চেহারা। বললেন, তাই তো মা! বামুন কালো হলেই গেরো! তবে কিনা সব ক্ষেত্রেই কিছু ব্যতিক্রম থাকে। তা হলে মা, মুগেবেড়ের ছেলেটার কথা ভেবে দেখো। কুলীন, ফর্সা, যেমনটি চাও তেমন।

কী করে?

পড়তি জমিদার। ছেলে ফেলনা নয়। ডাক্তার।

তবে তো ভালই কাকা।

হ্যাঁ। ভাল। দেখো, কথা কয়ে। আমি গৌরহরিকেও বলেছি। পাত্র অপছন্দের নয়।

পণ দিতে ওঁর তো খুব আপত্তি। এরা কি পণ চায়?

তা এখনও কিছু বলেনি। কথা এগোলে বোঝা যাবে।

মুগবেড়ের পাত্রের নাম সায়ন্তন। চেহারা ভাল, ডাক্তারি পাস, জমিদারের ছেলে। আর কী চাই!

তরতর করে কথাবার্তা পাকা হয়ে গেল। হ্যাঁ, পণের ব্যাপার একটু ছিল তবে ঠিক পণও বলা যায় না। পাত্রের বাবা মেয়ে দেখে পছন্দ করে আর পাঁচটা কথার পর দেনা-পাওনার প্রসঙ্গ উঠতে বললেন, পণ-টন নয়। তবে আমাদের অবস্থা এখন পড়তি। ছেলের বিলেত গিয়ে এম আর সি পি করার প্ল্যান। ফিরে এসে বাড়িতেই নার্সিংহোম করবে। অনেক টাকার পাল্লা। যদি লাখখানেক টাকা ধার হিসেবে দেন তা হলে আমি বাকিটা সামলে নিতে পারব। এ টাকাটা আমরা ধীরে ধীরে শোধ দিয়ে দেব। চাইলে সুদও পাবেন।

গৌরহরি শান্ত গলায় বললেন, সায়ন্তনকে আমার স্ত্রীর খুবই পছন্দ হয়েছে। সে উপযুক্ত পাত্র। এক লাখ টাকা ধার হিসেবে নয়, যৌতুক হিসেবেই দেব। ও নিয়ে চিন্তার কিছু নেই।

ভদ্রলোক একটু ভাবিত হলেন, যৌতুক দেবেন!

দেব।

ভদ্রলোক একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, আমাদের আগের অবস্থা থাকলে এসব কথা উঠত না। অবস্থা বিপাকে পড়েই—ঠিক আছে, আপনার যা ইচ্ছে।

ওঁরা চলে যাওয়ার পর বাড়িটা কিছুক্ষণ থমথম করেছিল, মনে আছে পারুলের। বলাকার মুখে যুদ্ধজয়ের হাসি ছিল না। বকুলেরও মন খারাপ। ব্যাপারটা বড় বাড়াবাড়ি হয়ে গেল যেন।

পরদিন সর্বানন্দ এলেন। বলাকাকে ডেকে বললেন, কেমন মা, সব দিক রক্ষে হয়েছে তো!

বলাকা হতাশার গলায় বললেন, মনটা ভাল নেই কাকা। এত টাকা দিয়ে বিয়ে!

তা মা, ভাল পাত্র চেয়েছিলে পেয়েছ। গৌরহরি টাকা কবুল করেছে, পুরুষের মতোই কাজ করেছে।

কিন্তু কাকা, ওঁরা তো ধার হিসেবেই চেয়েছিলেন। উনিই যৌতুক দিতে চাইলেন।

সর্বানন্দ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, বিয়ের শুরুতেই একটা ধারকর্জের সম্পর্ক কি ভাল লক্ষণ মা? শুভ কাজে ঋণ সুলক্ষণ নয়। তার চেয়ে এই তো ভাল হয়েছে।

আমার খারাপ লাগছে। উনি হয়তো আমার ওপর একটু রাগ করেই কাণ্ডটা করলেন।

সর্বানন্দ মাথা নেড়ে বললেন, তা নয় মা, তা নয়। গৌর তোমার ওপর রাগ করেনি। সেও ধারকর্জের মধ্যে যেতে চাইল না, উকিল মানুষ তো, মানুষ চরিয়ে খায়। মনুষ্য চরিত্র ওরা খুব বোঝে। ধর, ধার দিলে যদি ওঁরা শোধ দিতে না-পারেন বা ইচ্ছে করেই শোধ না-দেন তখন গোলমাল বেধে উঠতে পারে। আত্মীয়—কুটুম মানুষ তাঁরা, মামলা-মোকদ্দমাও করা যাবে না, ঝগড়া বিবাদ করলেও বিপদ। তিক্ততা যাতে না ঘটে তার জন্যই গৌরহরি গোড়া মেরে রাখল। ভালই হল, তোমার মেয়েরও খানিক হক থাকবে। শ্বশুরবাড়িতে মাথা উঁচু করে থাকতে পারবে।

আমার স্বামী কখনও টাকাকে টাকা মনে করেন না। ওইটেই ওঁর দোষ। যেখানে তিন টাকায় হয় সেখানে উনি তিনশো টাকা দিয়ে বসেন।

সর্বানন্দ ফের হাসলেন। বললেন, গৌরহরি কাঁচা মানুষ নয় মা। মেয়ের ভবিষ্যৎ ভেবেই সে টাকাটা দিতে রাজি হয়েছে। পুরনো জমিদারবাড়ি তো! তার রন্ধ্রে রন্ধ্রে অনেক ঝুল ময়লা পোকামাকড় থাকে যে! অনেক প্রথা আছে, সহবত আছে, সেসব মেনে চলার হ্যাপা আছে। তোমার মেয়ে সব সয়ে-বয়ে নিতে যদি না পারে মা? টাকাটা সেই ব্যাপারে কাজ দেবে। মেয়ের দোষঘাট আর তত দেখবে না কেউ। কাজটা গৌরহরি ঠিকই করেছে।

সম্বন্ধটা কি ভাল হল বলে আপনি মনে করেন?

ভাল মানে! খুব ভাল। পাঁচজনকে বুক ফুলিয়ে বলার মতো সম্বন্ধ।

আমারও তাই মনে হচ্ছিল। এখন যেন মনটা কেমন আড় হয়ে আছে।

ওসব নিয়ে ভেবো না। কথা পাকা হয়ে গেছে। বিয়ের তোড়জোড় শুরু করে দাও।

পারুলের মনে আছে বিয়ে পাকা হয়ে যাওয়ার পর তার দিদি বকুল যেন কেমন মনমরা হয়ে গেল। বলতে লাগল, আমার বিয়ে দিয়ে বাবা তো সর্বস্বান্ত হয়ে যাবে। এ বিয়েতে আমার সুখ নেই।

সবাই তাকে বোঝাতে লাগল।

দুই বোন তখন এক খাটে শোয়। এক রাতে বকুল বালিশে মুখ গুঁজে কাঁদছিল।

পারুল বলল, দিদি, কাঁদছিস কেন? এ মা, বিয়ে হবে, এখন কেউ কাঁদে?

আমার ইচ্ছে যাচ্ছে না রে। এ বিয়ে ভাল হবে না।

কেন? জামাইদা দেখতে কেমন সুন্দর, ডাক্তার, বড়লোক—আর কী চাস তুই?

সে আমি জানি না। আমার ভাল লাগছে না।

এক লাখ টাকা নগদ দিয়ে ক্ষান্ত হবেন না বলে গৌরহরি সোনা-দানা, দানসামগ্রীরও বেশ এলাহি আয়োজন করতে লাগলেন।

বলাকাকে বললেন, এক লাখ টাকাটা তো ওরা পাবে। আমার মেয়ে তো পাবে না। তার হাতে কী থাকবে বল! গয়নাগুলোই হবে তার অ্যাসেট।

বড় বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে কিন্তু!

তা যোক বলাই, তা হোক। এই আমার প্রথম মেয়ের বিয়ে। একটু পাগলামি করতে দাও।

পাত্রপক্ষ কি জানে যে, তুমি এতসব দিচ্ছ?

জানবে না কেন? সর্বানন্দ ঘটক রীতিমতো তাদের সব খবর পৌঁছে দিচ্ছে।

তারা কি খুশি?

খুশি না হওয়ার কী আছে?

বলাকা আর কিছু বললেন না। শুকনো মুখে উঠে গেলেন।

বিয়ের বোধহয় সাতদিনও তখন বাকি নেই, হঠাৎ এক মধ্যরাতে পারুলের ঘুম ভেঙে গেল বকুলের ধাক্কায়।

কী রে দিদি?

চুপ। আয় আমার সঙ্গে।

কোথায়?

পাশের ঘরে মা-বাবার কথা হচ্ছে। চল শুনি।

এঃ মা।

আয় না।

পিঠোপিঠি না হলেও তাদের দুই বোনের ভাব ছিল সাংঘাতিক। ভীষণ বন্ধুর মতো। কোনও কথাই গোপন থাকত না তাদের মধ্যে।

চুপি চুপি দুই বোন উঠে পাশের ঘরের দরজায় কান পাতল।

বলাকা বলছিলেন, আমার ঘাট হয়েছে তোমার কথা না-শুনে। বরাবর দেখে আসছি তুমি যা বল, ঠিকই বল। আমিই বারবার ভুল করে ফেলি।

তা কেন বলাই? আমি তোমার ওপর তো নির্ভরই করি। করি না বললা! যদি জানতাম তুমি বিচক্ষণ নও তা হলে কি নির্ভর করতাম। না, তা নয়। আমি তোমার মতো সাংসারিক বুদ্ধি রাখি না। আমি আমার ছেলেমেয়ের মানসিকতারও খোঁজ রাখি না। এসব ভালমন্দ বিচার করার ভার আমি তোমার ওপরেই দিয়ে রেখেছি।

তোমার পায়ে পড়ি, এ বিয়ে ভেঙে দাও।

সে কী বলছ বলাই! এখন বিয়ে ভাঙা কি সম্ভব?

কেন নয়?

এতদূর এগিয়ে কি পিছোনো যায়?

আর কেউ না পারুক, তুমি ঠিক পারবে বুদ্ধি করে বিয়েটা ভেঙে দিতে। ওগো, দশটা গাঁয়ের লোক যে তোমার বুদ্ধি-পরামর্শ নিতে আসে সে কি এমনি?

কিন্তু বিয়ে ভাঙতে চাইছ কেন?

তুমি যখন টাকাটা যৌতুক হিসেবে দিতে চাইলে তখন ভদ্রলোক একবারও আপত্তি করলেন না, মনে পড়ে?

খুব পড়ে।

ওখানেই আমার খটকা। ভদ্রলোক হলে অন্তত একবার আপত্তি করত।

দুনিয়াটা চিনলে না বলাই। শতকরা নিরানব্বই জনই তো ওরকম। কাকে ফেলে কাকে বাছবে।

না বাপু, আমার মন সায় দিচ্ছে না।

তা হলে আর মনমতো পাত্র পাবে কোথায় বললা! পাত্র তো অনেক দেখলাম। সবাই কিছু না কিছু প্রত্যাশা করেই। কারও খাঁই বেশি, কারও কম। কারও চোখের চামড়া নেই, কেউ রয়ে-সয়ে চায়। কিন্তু চায় তো সকলেই। কী করবে বলো!

তোমার সেই বিশ্বনাথের কী হল?

বাঃ বলাই! সে যে কালো বলে বাতিল হয়েছে।

সে তো শুধু কালো, আর তো কিছু নয়।

না। উদ্বাস্তু পরিবার। তবে শিক্ষিত। খেটে খায়। তাদের গুণ ওইটুকুই।

তাকেই দেখো না আবার।

সেখানে তো একরকম অমত জানিয়েই দেওয়া হয়েছে। এখন কী আর—

তোমার চোখ বড় একটা ভুল করে না গো। তুমি যখন তাকে পছন্দ করেছ তখন সে ভালই হবে। দেখো না গো একটু।

ভাল করে ভেবে দেখ বলাই।

ভাল করেই ভেবেছি।

তারা কিন্তু দানসামগ্রীও নেবে না। বিশ্বনাথের বাবা সাফ বলেছে, জিনিসপত্র সোনা-দানা রাখার জায়গা তাদের নেই। এসব তারা নেবে না।

তোমার পায়ে পড়ি।

ঠিক আছে বলাই, তোমার কথা আর কবে ফেলেছি?

কালো, কিন্তু কেষ্টঠাকুরের মতো কমনীয় মুখশ্রীর ভালমানুষ বিশ্বনাথ লাজুক মুখে যেদিন বিয়ে করতে এল সেদিনই তাকে খুব ভালবেসে ফেলল পারুল।

বিশুদা তার এগারো বছর বয়সি শালিটিকে বাসরঘরে একটাই মাত্র ইয়ার্কির কথা বলেছিল, আগের দিনে বিয়ে করলে শালি ফাউ পাওয়া যেত, জানো?

শুনে কী যে রোমাঞ্চ হয়েছিল পারুলের। ওই বয়সটাই অমনি।

তারপর সারাক্ষণ জামাইদার সঙ্গে লেগে লেগে ছিল সে। কী ভাল! কী নরম কথাবার্তা, কী লজ্জাশরম!

সেই বিশুদা এখন প্রবীণ এক মানুষ! চুল পেকেছে কিছু, গোঁফেও পাক। শোনা যায় তিনি বড় চাকরি করলেও তেমন সচ্ছলতা অর্জন করতে পারেননি। এখনও তাঁর বাড়িতে শৌখিন জিনিস দেখা যায় না। বকুলের গায়ে গয়না ওঠেনি, তার আলমারি ভর্তি শাড়ি নেই, যথেচ্ছ খরচ করার মতো টাকাও তারা হাতে পায় না। তাদের দুটি ছেলেই লেখাপড়ায় ভাল, এইটুকুই যা সান্ত্বনা। বড়টি এখন চল্লিশ হাজার টাকা মাইনের চাকরি করে।

না, বিশ্বনাথ জাগতিক অর্থে একজন সফল মানুষ নয়। কিন্তু এই মানুষটাকে শ্রদ্ধা করতে কখনও পারুলের অসুবিধে হয়নি।

বিশুদা, আমি আপনার সঙ্গে আমার বাবার স্বভাবের খুব মিল পাই, তা জানেন?

বিশ্বনাথ একটু হাসল। তারপর বলল, তা একটু আছে বোধহয়।

কী মিল বলুন তো!

সেটা তোরা ভেবে বলবি। আমার কেন যেন গৌরহরি চাটুজ্জেকে খুব পছন্দ হত। বিয়ের আগেই বউয়ের চেয়ে শ্বশুরের প্রতিই আমার আকর্ষণ হয়েছিল বেশি, তাই বিয়ে করতে আপত্তি করিনি।

বকুল বলল, বাবা তোমাকে ভালবাসত খুব। বলত, বিশ্বনাথের মতো ছেলে হয় না। এ মা, ওই দেখ তোমার নাম এনে ফেললাম! কী হবে!

গঙ্গাজল খাও।

তিনজনে একটু হাসাহাসি হল।

পারুল বলল, পতির নামে গতি। অত ভাবছিস কেন?

বিশ্বনাথ স্নিগ্ধ চোখে পারুলের দিকে চেয়ে বলল, হ্যাঁ রে, পারুল, তোকে একটা কথা বলব?

বলুন না।

ভাবছি, তুই আবার টেনশনে না-পড়ে যাস।

কীসের টেনশন?

অমলকে তুই শেষ অবধি কেন বিয়ে করিসনি তা জানি না। তাই জিজ্ঞেস করছি, অমলের কি কিছু দোষ ছিল?

পারুল একটু গম্ভীর হয়ে বলে, দোষ না থাকলে তাকে বাতিল করলাম কেন বিশুদা?

কিন্তু কী জানিস, অমলকে সেদিন রাস্তায় দেখে খুব মায়া হল। কেমন উদাস, উদ্ভ্রান্তের মতো ঘুরে বেড়াচ্ছে, গায়ে ধুতির খুঁট জড়ানো। আমাকে অবশ্য চিনতে পারেনি। কী ব্যাপার কিছু জানিস?

না। তবে ওদের বোধহয় কিছু প্রবলেম আছে।

পরশু দিন সন্ধেবেলায় বেগুনক্ষেতের ওপাশে চুপচাপ দাঁড়িয়ে এ—বাড়ির দিকে চেয়ে ছিল। আমি একটু চিন্তায় পড়লাম। ভাবলাম, সেই পুরনো প্রেম থেকে আবার পাগলামি দেখা দিচ্ছে না তো!

চেয়ে ছিল?

হ্যাঁ।

চেয়ে থাকার তো কিছু নেই। অনায়াসে এ—বাড়িতে আসতেই তো পারে।

সেটাই স্বাভাবিক হত। দূর থেকে চেয়ে থাকাটা ভাল লক্ষণ নয়। তুই একটু সাবধানে থাকিস।

পারুল হেসে ফেলল, কেন বলুন তো! আপনার কি ধারণা অমল রায় এখনও আপনার প্রৌঢ়া শালিটির প্রতি দুর্বল?

ওরে পাগলি, তুই প্রৌঢ়া হলে আমি তো ভবলীলাই সাঙ্গ করেছি। তোর চেয়ে আমি কত বড় জানিস?

জানি। উনিশ বছর।

তবে? যাক গে, তোকে জানিয়ে রাখলাম।

না বিশুদা, অমলদাকে আমিই আমার সঙ্গে দেখা করতে বলে পাঠিয়েছি। কিন্তু বেচারা হয়তো এখন একটু লজ্জা পাচ্ছে। আসতে চেয়েও চক্ষুলজ্জায় আটকাচ্ছে। তাই হয়তো চেয়ে থাকে।

সিরিয়াস কিছু নয় বলছিস?

দুর! ওসব কবে চুকে-বুকে গেছে।

প্রেম-ট্রেমের কিছুই জানি না রে ভাই। আমার সব দৌড় তো ওই যে ওই উলবুনুনির কাছে গিয়ে গিয়ে শেষ হয়।

বকুল ভ্রূ কুঁচকে কী যেন ভাবছিল। হঠাৎ বলল, অমলকে আসতে বলেছিস কেন? ওর এখন না-আসাই ভাল। জ্যোতিপ্রকাশ যদি কিছু ভাবে?

পারুল হেসে বলল, তুই যেন কী দিদি! আমরা কি সেই আগের আমরা আছি না কি? ম্যাচিওরড হইনি? তা ছাড়া আমি তো আমার কর্তার কাছে কিছু গোপন করিনি। সব বলে দিয়েছি। সেও তো বিশুদার মতোই একজন সরল সহজ মানুষ। কিছু মনেই করেনি।

না বাবা, কী থেকে কী হয়ে যায়! তোর বড্ড সাহস পারুল।

ও মা, সাহসের কী?

ওই তো শুনলি, বাইরে থেকে চেয়ে থাকে। চেয়ে থাকা কি ভাল?

অমলদার বয়স কত হল জানো?

পুরুষমানুষ সব বয়সেই খারাপ। বেশি বয়সে আরও খারাপ।

অমল ধরা পড়ে গেল পরদিন সন্ধেবেলায়। নানা আঘাটায় ঘুরে সে বেগুনক্ষেতটার বেড়ার ধারে এসে চুপ করে দাঁড়িয়েছিল। ক্ষেতের ওপাশে গাছপালার ফাঁক দিয়ে দোতলার আলো-জ্বলা ঘরটা দেখা যায়। যেন স্বপ্নের ঘর। রোজই কিছুক্ষণ চেয়ে থাকে অমল। কাউকে দেখা যায় না। দেখতে চায়ও না অমল। কয়েক মিনিট সে তৃষিতের মতো চেয়ে থেকে ফিরে যায়।

আজ সে হয়তো একটু বেশিক্ষণ দাঁড়িয়েছিল। হঠাৎ একটা সাইকেল কোথা থেকে সাঁ করে এসে তার কাছেই ব্রেক কষল।

এই, কে রে ওখানে?

অমল চমকাল না। ধীরে শুধু মুখটা ঘোরাল।

কে? এখানে দাঁড়িয়ে কী হচ্ছে?

অমল জবাব দিল না। ছেলেটা সাইকেল থেকে নেমে কাছে এল।

আরে! অমলদা?

অমল চিনতে পারল। বিজু।

এখানে দাঁড়িয়ে আছেন কেন অমলদা?

এমনি। দেখছি। অনেকদিন বাদে এলাম তো!

আসুন না ভিতরে।

না থাক।

থাকবে কেন? আসুন। বড়মা খুব খুশি হবে।

সকল অধ্যায়
১.
প্রথম অধ্যায়
২.
দ্বিতীয় অধ্যায়
৩.
তৃতীয় অধ্যায়
৪.
চতুর্থ অধ্যায়
৫.
পঞ্চম অধ্যায়
৬.
ষষ্ঠ অধ্যায়
৭.
সপ্তম অধ্যায়
৮.
অষ্টম অধ্যায়
৯.
নবম অধ্যায়
১০.
দশম অধ্যায়
১১.
একাদশ অধ্যায়
১২.
দ্বাদশ অধ্যায়
১৩.
ত্রয়োদশ অধ্যায়
১৪.
চতুর্দশ অধ্যায়
১৫.
পঞ্চদশ অধ্যায়
১৬.
ষোড়শ অধ্যায়
১৭.
সপ্তদশ অধ্যায়
১৮.
অষ্টাদশ অধ্যায়
১৯.
ঊনবিংশ অধ্যায়
২০.
বিংশ অধ্যায়
২১.
একবিংশ অধ্যায়
২২.
দ্বাবিংশ অধ্যায়
২৩.
ত্রয়োবিংশ অধ্যায়
২৪.
চতুর্বিংশ অধ্যায়
২৫.
পঞ্চবিংশ অধ্যায়
২৬.
ষড়বিংশ অধ্যায়
২৭.
সপ্তবিংশ অধ্যায়
২৮.
অষ্টাবিংশ অধ্যায়
২৯.
ঊনত্রিংশ অধ্যায়
৩০.
ত্রিংশ অধ্যায়
৩১.
একত্রিংশ অধ্যায়
৩২.
দ্বাত্রিংশ অধ্যায়
৩৩.
ত্রয়োত্রিংশ অধ্যায়
৩৪.
চতুর্ত্রিংশ অধ্যায়
৩৫.
পঞ্চত্রিংশ অধ্যায়
৩৬.
ষট্ত্রিংশ অধ্যায়
৩৭.
সপ্তত্রিংশ অধ্যায়
৩৮.
অষ্টত্রিংশ অধ্যায়
৩৯.
ঊনচল্লিশ অধ্যায়
৪০.
চল্লিশ অধ্যায়
৪১.
একচল্লিশ অধ্যায়
৪২.
দ্বিচল্লিশ অধ্যায়
৪৩.
ত্রিচল্লিশ অধ্যায়
৪৪.
চতুর্চল্লিশ অধ্যায়
৪৫.
পঞ্চচল্লিশ অধ্যায়
৪৬.
ষট্চল্লিশ অধ্যায়
৪৭.
সপ্তচল্লিশ অধ্যায়
৪৮.
অষ্টচল্লিশ অধ্যায়
৪৯.
ঊনপঞ্চাশ অধ্যায়
৫০.
পঞ্চাশ অধ্যায়
৫১.
একান্ন অধ্যায়
৫২.
বায়ান্ন অধ্যায়
৫৩.
তিপ্পান্ন অধ্যায়
৫৪.
চুয়ান্ন অধ্যায়
৫৫.
পঞ্চান্ন অধ্যায়
৫৬.
ছাপ্পান্ন অধ্যায়
৫৭.
সাতান্ন অধ্যায়
৫৮.
আটান্ন অধ্যায়
৫৯.
ঊনষাট অধ্যায়
৬০.
ষাট অধ্যায়
৬১.
একষট্টি অধ্যায়
৬২.
বাষট্টি অধ্যায়
৬৩.
তেষট্টি অধ্যায়
৬৪.
চৌষট্টি অধ্যায়
৬৫.
পঁয়সট্টি অধ্যায়
৬৬.
ছেষট্টি অধ্যায়
৬৭.
সাতষট্টি অধ্যায়
৬৮.
আটষট্টি অধ্যায়
৬৯.
ঊনসত্তর অধ্যায়
৭০.
সত্তর অধ্যায়
৭১.
একাত্তর অধ্যায়
৭২.
বাহাত্তর অধ্যায়
৭৩.
তিয়াত্তর অধ্যায়
৭৪.
চুয়াত্তর অধ্যায়
৭৫.
পঁচাত্তর অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%