শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
এতদিন তার কোনও স্বদেশ ছিল না। স্বদেশের বোধও ছিল না। থাকার কথাও নয়। ছেলেবেলায় বাবার সঙ্গে এক দেশ থেকে আর এক দেশে ঘুরে বেড়াতে হয়েছে তাকে। কখনও ফরাসি, কখনও জার্মান, কখনও ইংরিজি ভাষা বলতে শিখেছে। দুই ভাই-বোন বুঝতেই পারত না কোনটা তাদের আসল ভাষা। হ্যাঁ, ঠিক বটে, তাদের মা-বাবা নিজেদের মধ্যে অনেক সময়েই বাংলা বলত। বিশেষ করে ঝগড়ার সময়। সেই ভাষা তারা অল্প-অল্প বুঝতে পারত বটে, কিন্তু মা বা বাবা তাদের বাংলা শেখানোর চেষ্টাই করত না কখনও। যখন আমেরিকায় সোহাগ স্কুলে ভর্তি হল তখন আমেরিকান ইংরিজি হল তার মাতৃভাষার মতো। আর তখন আমেরিকাকেই তার স্বদেশ বলে মনে হত। দিস ইজ মাই কান্ট্রি— কতবার একথা মাকে বলেছে সে। সে বুঝতে পারত তার মা-বাবা ঠিকঠাক ইংরিজিটা বলতে পারে না, হোঁচট খায়। বিশেষ করে মা। একদিন সে মাকে বলেছিল, তোমরা এত খারাপ ইংরিজি বলো কেন? মা বলল, আমরা তো তোর মতো আমেরিকান হয়ে যাইনি। আমরা বাপু ভেতো বাঙালিই আছি।
দ্বন্দ্বের শুরু সেখানেও, বুঝতে পারত, সে আমেরিকান হলেও তার মা-বাবা তা নয়। বেশ কিছুদিন এদেশে থাকার পরেও তার মা বা বাবা আমেরিকার অনেক কিছুই বুঝতে পারত না। যেমন জ্যাজ বা রক, যেমন রেয়ার স্টেক বা যৌন ব্যবহার। দুই ভাই-বোনের সঙ্গে মা বাবার একটা ব্যবধান রচিত হচ্ছিল ধীরে ধীরে। যেন তীরের নোঙর ছেড়ে নৌকো চলে যাচ্ছে মাঝদরিয়ার দিকে।
এতদিনে আমেরিকাই দুই ভাই-বোনের দেশ হয়ে যেত পুরোপুরি। হল না। তার কারণ একটা অদ্ভুত ঘটনা। একটি কালো মেয়ে আসত তাদের বাড়িতে মাঝে মাঝে। আগে যে ছিল তার মায়ের ডোমেস্টিক হেলপা সাদা কথায় ঝি। মোনার শরীর খারাপ ছিল বলেই রাখা হয়েছিল তাকে। গাড়ি করে আসত, ঘণ্টা দুয়েক অসুরের মতো খেটে কাজকর্ম করে ঘরদোর পরিষ্কার আর ফিটফাট সাজিয়ে রেখে চলে যেত। একদিন তার মা-বাবা হিসেব করে দেখল মেয়েটার জন্য প্রচুর ডলার বেরিয়ে যাচ্ছে। মোনা বলল, ওকে ছাড়িয়ে দাও। আমি কাজ করতে পারব। ছাড়িয়ে দেওয়ার পরও যে আসত সোহাগের আকর্ষণে, সবাই ভেবেছিল হয়তো মায়া পড়ে গেছে, তাই আসে।
সেই মেয়েটিই একদিন সোহাগকে তুলে নিয়ে যায়। গাড়ি করে সোজা যে জায়গায় তাকে নিয়ে তুলেছিল মেয়েটি সেটা একটা খোলা, আবরণহীন মাঠ। কিছু আগাছার জঙ্গল আছে। সেখানে স্বল্পবাস বা নগ্ন বিশ-পঁচিশজন মেয়ে আর পুরুষ। কয়েকটা বাচ্চাও ছিল। সকলেরই বড় বড় চুল, নখ, পুরুষদের দাড়ি আর গোঁফ। দু-চারজন সামান্য জামাকাপড় পরলেও সেগুলো ছিল ভীষণ নোংরা আর ছেঁড়া। কেউ সাবানটাবান মাখত না। কাছে একটা বড় ঝিল মতো ছিল, সেখানেই চান করত। টয়লেট ছিল না। সকলেই প্রকাশ্যে মলমূত্র ত্যাগ করত। খোলাখুলি যৌন মিলনও হত সেখানে, বাচ্চাদের সামনেই। শুধু নারী-পুরুষ নয়, মেয়েতে মেয়েতে, ছেলেতে ছেলেতে। ভয়ে, লজ্জায়, ঘেন্নায় সোহাগ হাউ হাউ করে কেঁদে ফেলত। ওরা কিছু বলত না তাকে। নির্বিকার। খাবার দিত ভুট্টা সেদ্ধ আর গোরুর মাংস, ফল-টল।
তাকে শেখানো হয়েছিল, একমভাবে থাকাই হল ন্যাচারাল লিভিং। এই থাকার মধ্যে কোনও কৃত্রিমতা নেই। আদিম কালের মানুষ এভাবেই থাকত এবং তখনই ছিল তারা সবচেয়ে সুখী।
বৃষ্টি বা রোদ কোনওটা থেকেই তারা আত্মরক্ষার চেষ্টা করত না। নির্বিকারভাবে থাকত। সোহাগকে ন্যাংটো করে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড় করিয়ে রাখত তারা। বলত, ফিল দি আর্থ, দি উইন্ড, দি অ্যাটমোসফিয়ার। জামা কাপড় জুতো আমাদের সঙ্গে জগতের দূরত্ব সূচনা করে। কিছুদিন এইরকম আদিম জীবনযাপন করলে তুমি প্রকৃতিকে অনেক গভীরভাবে বুঝতে পারবে। ভূমিকম্প হবে কিনা, ঝড়-বৃষ্টি হবে কিনা, বন্যা হবে কিনা তা আদিম মানুষ তাদের অত্যাশ্চর্য অনুভূতি দিয়ে টের পেত, যেমন পায় কাঠবেড়ালি, বানর, টিকটিকি বা পিপড়ে। যন্ত্রসভ্যতার দাস হয়ে মানুষ সেই ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে। পৃথিবীকে অনুভব করার চেষ্টা করো, তোমার সামনে সত্য উদ্ঘাটিত হবে।
কথাগুলো কিছু বুঝতে পারত না সোহাগ। সে হাঁ করে চেয়ে থাকত। কাঁদত, অস্থির হত, ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়ত ঘাসের ওপর। তার শরীরে চুলকুনি হচ্ছিল, দাদের মতো চক্কর দেখা দিচ্ছিল চামড়ায়, চুলে জট, দাঁত মাজতে পারত না বলে মুখে বিচ্ছিরি গন্ধ।
সন্ধের পর ক্যাম্পফায়ার। সবাই বিশাল এক বৃত্ত রচনা করে বসত। মাঝখানে আগুন জ্বলছে। দুর্বোধ্য জঙ্গলের ভাষায় সবাই মিলে কী বলে যাচ্ছে কে জানে। জেনি নামে একটি মেয়ে হঠাৎ উঠে দাঁড়য়ে বিড়বিড় করে মন্ত্রোচ্চারণ করতে করতে ঘুরে ঘুরে শুরু করত নাচ। তার নগ্ন শরীরে আগুনের কাঁপা কাঁপা আলো। বিভোর হয়ে তালহীন ছন্দহীন ঢেউ-ঢেউ একটা নাচে তার শরীর টলতে টলতে ঘুরতে থাকত। ঘুরতে ঘুরতে ঘুরতে হঠাৎ ছিটকে পড়ত ঘাসের ওপর। কেউ দৌড়ে যেত না, ধরে তুলত না। নির্বিকারভাবে তাদের সুরহীন মন্ত্র বলে যেতে থাকত।
জেনি বলত তার ট্রান্স হয়। তার মানে বোঝেনি সোহাগ। জেনি তার দিকে অনেকক্ষণ চেয়ে থেকে একদিন বলল, তোমাকে দেখে মনে হয় তোমারও হবে। মহান প্রেত যার তার ওপর ভর করে না।
জেনিই শেখাল সোহাগকে তার অদ্ভুত মন্ত্র, নাচ। মিথ্যে বলবে না সোহাগ, ওই অদ্ভুত মানুষদের মধ্যে যে কয়দিন ছিল তার মধ্যে ওই একটা জিনিসই ভাল লেগেছিল তার। অর্থহীন অদ্ভুত সব শব্দ বলতে বলতে ঘুরে ঘুরে নাচ। নাচতে নাচতে হঠাৎ মাথা অন্ধকার করে পড়ে যাওয়া। ওরা বলত ট্রান্স। হতে পারে সোহাগ তখন অপুষ্টিজনিত কারণে দুর্বল বলেই তার মাথা অন্ধকার হয়ে যেত। শুধু শরীর কেন, কেঁদে কেঁদে তার মনটাও তো তখন দুর্বল।
কতদিন তাকে ওই জীবনযাপন করতে হবে বুঝতে পারত না সে। শুধু ভয় পেত, সে জংলি হয়ে যাচ্ছে, অসভ্য বর্বর হয়ে যাচ্ছে, ডাইনি হয়ে যাচ্ছে। নিজের গায়ের চিমসে গন্ধে তার নিজেরই বমি পেত। গা চুলকোতে গেলে বড় নখের কোলে উঠে আসত কালো ময়লা। ওই ভূমিখণ্ডের চারপাশে ছিল র্যাটল সাপ আর কাঁকড়াবিছের আস্তানা। প্রায়ই একটা দুটো সাপ দেখা যেত। ঘাসের ওপর চিড়বিড় করে হেঁটে বেড়াত বিছে। ওরা মারত না। কিন্তু ভয়ে রাতে ঘুমোতে পারত না সে। ঘুমোতে পারত না খোলা আকাশের নীচের ঠান্ডায়। বৃষ্টি হলে তো আরও দুর্দশা।
কতদিন কেটেছিল কে জানে। হিসেব নেই। তারপর একদিন সকালে হঠাৎ একটা হেলিকপ্টার এল। চক্কর দিতে লাগল তাদের মাথার ওপরে। দলের আধবুড়ো একটা লোক আকাশের দিকে চেয়ে বলল, দ্যাট চপার ইজ ব্যাড নিউজ, দে আর লুকিং ফর দ্যাট কিড। ওকে ফেরত দিয়ে এসো, নইলে পুলিশ আমাদের ছিঁড়ে খাবে।
যে মেয়েটি নিয়ে গিয়েছিল তাকে সে-ই দুপুরবেলা গাড়ি করে তাকে তার বাড়ির সামনে নামিয়ে দিয়ে উধাও হয়ে গেল।
পুরনো অভ্যস্ত জীবনে ফিরে এল সোহাগ। ফিরল, আবার ঠিক ফিরলও না। তার অস্তিত্বের একটা খণ্ড যেন রয়ে গেল ওই উন্মার্গগামী, আধপাগলা, যাযাবর মানুষগুলোর সঙ্গে, যারা পুলিশ তাড়া করলেই নিজেদের অস্থায়ী আস্তানা ছেড়ে ভাগ ভাগ হয়ে পালিয়ে যায়। ফের সংকেতমতো জড়ো হয়ে যায় কোথাও কোনও লক্ষ্মীছাড়া জায়গায়। হয়তো একটা ভুল জীবনই যাপন করে তারা, কিন্তু অবস্থান করে প্রকৃতির খুব কাছাকাছি। খাওয়ার কষ্ট, শীত-গ্রীষ্মের কষ্ট, পোকামাকড় বা মশার কামড়, রোগ- ভোগ সব সহ্য করেও একটা আনন্দও কি পায়?
সোহাগ ফিরে এল বটে, কিন্তু সেই সোহাগ নয়। মাত্র কয়েকদিনের এই অদ্ভুত জীবন তাকে বয়ঃসন্ধিতেই যেন সাবালিকা করে দিয়েছিল। ছেলেবেলাটাই যেন হারিয়ে গেল তার। একটু গম্ভীর, একটু বিষন্ন, একটু অন্তর্মুখী। ওই বন্ধুর পতিত ঊষর ভূখণ্ডে, আদিম জীবনযাপনের স্মৃতি সুখকর ছিল না মোটেই। তবু ফিরে আসার পর সে কখনও কখনও একটা আকর্ষণও অনুভব করত ওই জীবনের প্রতি। কেন, কে জানে!
পুলিশ তাকে কয়েকদিন ধরে জেরা করেছিল। ওরা মারধর বা ধর্ষণ করেছে কিনা তাকে, সম্মোহিত করেছে কি, কোনও গুপ্তবিদ্যা শিখিয়েছে কিনা, কোনও রাজনৈতিক মতবাদ ঢুকিয়েছে কিনা মাথায়, সন্ত্রাসবাদে দীক্ষা দিয়েছে কিনা, ড্রাগ ধরিয়েছে কিনা ইত্যাদি। সে কিছু গোপন করেনি বটে, কিন্তু মনে মনে চায়নি, ওরা পুলিশের হাতে ধরা পড়ুক। পুলিশ বারবারই বলত, দে আর দি ভুডু পিপল। দে প্র্যাকটিস ব্ল্যাক ম্যাজিক।
ওই ঘটনার পরই তার বাবা আমেরিকা থেকে তল্পিতল্পা গুটোতে লাগল। বলল, আর বিদেশে নয়।
গল্পটা তার মুখে সন্ধ্যা অন্তত দশবার শুনেছে। তবু আবার শোনে, আর চোখ গোল করে অবাক হয়ে চেয়ে থাকে তার মুখের দিকে, ধন্যি তোর সাহস!
না পিসি, সাহসের কাজ তো কিছু করিনি! ওরা তো জোর করে ধরে নিয়ে গিয়েছিল।
না রে মেয়ে, তোর সাহসও আছে। ওরা তোকে এখনও চিঠি দেয় বুঝি?
ই-মেল জিনিসটা কী তা অনেক কষ্টে পিসিকে বুঝিয়েছে সোহাগ। আজকাল ব্যাপারটা অনেকটাই বুঝতে পারে সন্ধ্যা। গাঁয়েগঞ্জেও একটা-দুটো করে কম্পিউটার দেখা দিচ্ছে ইদানীং।
হ্যাঁ তো।
কী লেখে রে?
লেখে, পৃথিবীর যেখানেই তুমি থাকো, তুমি আমাদেরই লোক। চিরকাল তুমি আমাদেরই লোক থাকবে। মনে রেখো আদিম মানুষেরাই ঠিকভাবে বাঁচতে জানত। তারাই টের পেত বেঁচে থাকার গভীর আনন্দ। মানুষদের জড়ো করো, সভ্যতার কৃত্রিমতা থেকে দূরে নিয়ে যাও, বাঁচতে শেখাও এক মুক্ত জীবনে। চারদিকে ছড়িয়ে দাও আমাদের আনন্দের বীজ। তোমাকে আমরা ভুলিনি, তুমিও আমাদের ভুলে যেও না।
হ্যাঁ রে, তোকে ওরা আবারও চুরি করবে না তো! চারদিকে আজকাল নাকি খুব ছেলেধরার উৎপাত। মানুষজনকে হুটহাট তুলে নিয়ে যায়।
না পিসি, ওদের অত ক্ষমতা নেই, তবে কে জানে, আজও আমরা আমেরিকায় থাকলে আমিই হয়তো ওদের খুঁজে বের করতাম!
ওমা! খুঁজে বের করে কী করবি?
সোহাগ সন্ধ্যার করুণ মুখ দেখে হেসে ফেলে। মাথা নেড়ে বলে, মাঝে মাঝে উইকএন্ডে গিয়ে ওদের সঙ্গে একটু অন্য স্বাদের জীবন কাটিয়ে আসতাম।
মাগো! এই যে বলিস ওরা ন্যাংটা হয়ে থাকে, যা-তা খায়।
হ্যাঁ তো। ওইটেই তো মজা!
দুর পাগলি! তুই একটা কী রে? ওসব অসভ্যদের কথা একদম ভাববি না। শুনলে আমারই কেমন গা গুলোয়। হ্যাঁ রে, তোর শহব-টহর একদম ভাল লাগে না, না? গাঁ-গঞ্জ, গাছপালা ভাল লাগে?
ঠিক ভাললাগা নয় পিসি, প্যাশন। গাছপালার মধ্যে আমার কখনও ভয় করে না। আমাকে যদি সুন্দরবনের বাঘের জঙ্গলে নিয়ে গিয়ে ছেড়ে দাও তাহলেও আমার একটুও ভয় করবে না। আমি মনের আনন্দে ঘুরে বেড়াব।
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সন্ধ্যা বলে, তাহলে তোকে ওরা মন্তবই করেছে।
সোহাগ হেসে বলে, করেছেই তো।
তুই সত্যিই মন্ত্র জানিস?
শব্দগুলো জানি। মুখস্থ হয়ে গেছে। কিন্তু অর্থ জানি না।
মন্ত্র পড়লে কী হয়?
শব্দগুলো উচ্চারণ করতে করতে মাথাটা কেমন ধোঁয়াটে হয়ে যায়। তারপর কেমন যেন শরীরে সাড় থাকে না।
জ্বলজ্বলে চোখে সন্ধ্যা চেয়ে থেকে বলে, আমাকে শেখাবি?
কেন শেখাব না? সত্যি শিখবে?
সন্ধ্যা কিছুক্ষণ চুপ করে বসে একটু ভাবল। তারপর মাথা নেড়ে বলল, না বাবা, কী থেকে কী হয়ে যাবে। মাথা গুলিয়ে গেলে আমার ব্যবসা লাটে উঠবে। তখন খাব কী বল? একা মানুষ, কে দেখবে আমাকে! সংসারের তো ভরসা নেই। যতদিন বাবা আছে ততদিনই সংসারের সঙ্গে সম্পর্ক। বাবা চোখ বুজলে ঠিক তাড়িয়ে দেবে।
কেন পিসি, ওভাবে বলছ কেন? বড়মা, জেঠু এরা তো কত ভাল।
সন্ধ্যা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, সে তোদের কাছে ভাল। লোক বুঝে লোকে ভাল হয়, বুঝলি? এখনও তো বড় হোসনি, সংসারের সব প্যাঁচ বাইরে থেকে বুঝতে পারবি না। তার ওপর আমার তো আবার পোড়া কপাল, স্বামীর বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিয়েছে। শ্বশুরবাড়ি ফেরত মেয়েদের কেউ ভাল চোখে দেখে না। সবাই ভাবে, নিশ্চয়ই চরিত্রের দোষ ছিল, না হলে ঝগড়ুটে বজ্জাত, নইলে গোপন রোগ আছে, না হলে বাঁজা, নইলে তাড়াবে কেন! এদেশে যত দোষ তো মেয়েদের ঘাড়েই চাপে কিনা। এসব এখন বুঝবি না, বড় হলে তখন টের পাবি। সাধে কি আর উদয়াস্ত খেটে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছি!
মুখটা করুণ হয়ে গেল সোহাগের। বলল, হ্যাঁ পিসি, তুমি লেখাপড়া করলে না কেন?
সন্ধ্যা হেসে ফেলে বলল, ওরে আমি হলাম অমল রায়ের অপদার্থ বোন। একই মায়ের পেটে জন্মে তোর বাবার কী মাথা! আর আমার মাথায় গোবর। রোজ চেঁচিয়ে পড়া মুখস্থ করেও আকবরের বাবার নাম মনে থাকত না। কী ভাল লাগত জানিস? আজকালকার মেয়েরা শুনলে হাসবে। আমার ভাল লাগত সংসার করতে। মায়ের সঙ্গে ঘুরে ঘুরে সংসারের যাবতীয় কাজ করতাম। খুব ভাল লাগত। মনে হত নিজের সংসার যখন হবে তখন এমন গুছিয়ে কাজ করব যে, বাড়িতে লক্ষ্মীশ্ৰী ফুটে থাকবে। বেশি আশা করেছিলাম তো, তাই সংসারই হল না আমার।
আচ্ছা পিসি, তুমি তো আবার বিয়ে করতে পারো!
মাথা নেড়ে সন্ধ্যা বলল, না রে পারি না। ভাইঝি হলেও তুই তো আমার বন্ধুর মতোই হয়ে গেছিস। তোকে লুকোব কেন? আমার চেহারাটা তো কারও নজরে পড়ার মতো নয়! তার ওপর বয়সও তো বসে নেই। একজন ঘুরঘুর করে আসে, বিয়ের কথাও বলে। সে আমাদের স্বজাতি বামুন নয়। বাবাকে তার কথা বলেছিলাম। বাবা শুনে চুপ করে অনেকক্ষণ ভেবে বলল, দ্যাখ মা, ট্র্যাডিশন যদি ভাঙতে চাস ভাঙবি। তোর জীবনটা তো স্বাভাবিক নয়। কিন্তু কী জানিস, এক ধাপ নেমে যদি বাঁচতে পারিস তবে নামার একটা অর্থ হয়। ভাল করে ভেবে দ্যাখ, বিয়েটা এখন তোর কতটা প্রয়োজন। যদি তেমন প্রয়োজন না বুঝিস তবে খামোখা ঝঞ্জাট ডেকে আনবি কেন?
তুমি কী বললে?
আমি অনেক ভেবে দেখলাম, বাবা ঠিকই বলেছে। আমার বিয়ের আর তেমন প্রয়োজন আছে বলে মনে হয় না। এই যে কাজকর্ম নিয়ে সকাল থেকে রাত অবধি কেটে যায় এতেই বেশ আনন্দে আছি। সঙ্গে আর একটা মানুষ জুটলে তারও তো কিছু বায়ানাক্কা থাকবেই। এখন হয়তো আমার আর সেসব সইবে না।
তুমি তা হলে কুমারীই থেকে যাবে?
দুর বোকা! আমি যে হিন্দুমতে সধবা। বর তো দিব্যি বেঁচেবর্তে আছে। আবছা করে হলেও এখনও রোজ সিঁদুর পরি। বামুনের মেয়ে তো, তাই এখনও ওসব ঘুচিয়ে দিতে পারিনি। যদিও সত্যি বলতে শাঁখা-সিঁদুরের মহিমা কিছু আছে বলে মনেই হয় না আমার। সব ভণ্ডামি।
তুমি কিন্তু বেশ লিবারেটেড উওম্যান। সেইজন্যই তোমাকে আমার এত ভাল লাগে।
দুর মুখপুড়ি! পেটে বিদ্যে নেই, মাথায় বুদ্ধি নেই, গতরে খেটে খাই, আমাকে নিয়ে অত বড় বড় কথা বলতে আছে?
বুদ্ধি না থাকলে কি ব্যবসা করতে পারতে? অ্যান্ড ইউ আর আর্নিং এ লট নাউ।
ওরে চুপ চুপ! জোরে বলিসনি। বেশি রোজগার করি শুনলে চারদিকে চোখ টাটাবে। তবে আমার বুদ্ধি বলতে ওইটুকুই, লোকের পছন্দমতো জিনিস বানাও আর টাকা কামাও। ঠাকুরের দয়ায় টাকা কিছু হয়েছে। তোর বিয়েতে তোকে একটা নেকলেস দেব, দেখিস।
যাঃ, বিয়ে কে করবে?
তবে কি পিসির মতো লক্ষ্মীছাড়া জীবন কাটাবি? ও কথা ভাবা ভাল নয়। বরং অল্প বয়সে একটা সুন্দর ভাল ছেলেকে বিয়ে করে ফেল, সুখে থাকবি।
আমার কারও সঙ্গে বনিবনা হবে না পিসি। আমি একটু অদ্ভুত আছি তো।
কে বলল তুই অদ্ভুত?
সবাই বলে। আমার মা-বাবা অবধি।
তোর যেটুকু অদ্ভুত সেটুকুই ভাল। পাঁচজনের মতো গড়পড়তা হয়ে লাভ কী?
তুমি আমার সব কিছুই ভাল দেখ, না?
সন্ধ্যা ম্লান হাসল। তারপর ধরা গলায় বলল, তোর ওপর আমার কেন যে এত মায়া! কে জানে, আর জন্মে বোধহয় আমার মেয়ে ছিলি।
এই কথাটা অনেকক্ষণ রিনরিন করল সোহাগের কানে। অনেকক্ষণ। পিসির হাহাকার, একাকিত্ব, ব্যর্থতা যেন ওই কথার মধ্যে ঘন হয়ে আছে।
বিকেলে পান্না তাকে বলল, তোমাকে বেশ উজ্জ্বল দেখাচ্ছে।
হাসল সোহাগ, এখানে এলেই আমি ভাল থাকি।
কিন্তু এটা তো একটা ধ্যাধধেড়ে গোবিন্দপুর। ম্যাগো, কী আছে বলো তো এখানে! আমার তো কলকাতায় চলে যেতে ইচ্ছে করে খুব।
আমার ঠিক উলটো। আমার তো কোনও দেশ ছিল না, জানো তো! কোনটা আমার দেশ, দেশ মানে কী তা বুঝতামই না। এক সময়ে আমেরিকা খুব ভাল লাগত। তারপর ফের একটা ভ্যাকুয়াম। মেট্রোপলিটান সিটিগুলো তো কারও দেশ হতে পারে না। তাই কলকাতা কখনও আমার দেশ হয়নি।
আহা, এটা তো তোমার দেশই। কিন্তু আমাদের গ্রামটায় কী আছে বলো!
ওটা একটা ডিসকভারির ব্যাপার। তোমাকে আবিষ্কার করতে হবে।
কীভাবে?
তা জানি না। আমি শুধু জানি, ফিল করি, এটা আমার জায়গা।
বড় বড় চোখে পান্না বলে, করো?
সোহাগ একটু লাজুক হেসে বলে, এখন করি।
না বাবা, এই ভুতুড়ে গাঁ ছেড়ে আমি বরং একটা জমজমাট শহরে চলে যেতে চাই, যেখানে অনেক আলো, অনেক লোকজন, অনেক হইচই।
ভূত যদি থেকেই থাকে তা হলে তাদের মধ্যে তো আমার আনসেস্টররাও থাকবে। তাদের সঙ্গে দেখা হওয়া তো ভীষণ রোমান্টিক।
ওরে বাবা! এখন দাদু এসে সামনে দাঁড়ালে যে আমার হার্টফেল হয়ে যাবে।
দাদু এসে সামনে দাঁড়াল না, পান্নারও হার্টফেল হল না। কিন্তু এই সময়ে দরজায় এসে যে লম্বা ছিপছিপে লোকটি দাঁড়াল তাকে দেখে সোহাগের হঠাৎ বুকের মধ্যে ধক ধক শব্দ হচ্ছিল।
লোকটা গম্ভীর মুখে বলল, ওঃ, সরি।
বলেই ফিরে যাচ্ছিল।
পান্না চেঁচিয়ে উঠল, অ্যাই বিজুদা! কী হচ্ছে? এসো বলছি।
বিজু মুখ ফিরিয়ে বলল, তোরা গল্প করছিস কর। আমি বরং একটু কাকিমার ঘরে যাই।
না না, প্লিজ! একটু এসো। একে তো তুমি চেনো বাবা! অত লজ্জা কীসের?
বিজু বলল, লজ্জা-টজ্জা নয়। তোরা গল্প কর না। টু ইজ কম্পানি, থ্রি ইজ ক্রাউড।
আচ্ছা বাবা, তার অ্যাভয়েড করতে হবে না। প্লিজ এসো।
সোহাগ বিছানায় আধশোয়া হয়েছিল। উঠে বলল, না পান্না, এবার আমি যাব। আপনি আসতে পারেন।
পান্না ধৈর্য হারিয়ে বলে ফেলল, উঃ, তোমাদের দুজনের মধ্যে যে সেই থেকে কী হচ্ছে! আমি আর পারি না তোমাদের নিয়ে। একটা শো-ডাউন করে নাও তো। তারপর ভাব করে ফেল।
বিজু হেসে ফেলল। বলল, শো-ডাউন আবার কীসের? কফি খাওয়াবি? তা হলে পাঁচ মিনিট বসে যেতে পারি। আজ যা শীত পড়েছে।
খাওয়াচ্ছি বাবা, কফির সঙ্গে আর কী খাবে?
আর কিছু না। তোদের ঘরে ঢোকাও এক ঝামেলা, জুতো খুলতে হয়
আর ফাঁড়া কাটতে হবে না। এসো ভিতরে। এই সোহাগ, কফি খাবে তো!
না, আমি এখন যাবো।
প্লিজ একটু বোসো। আমি আসছি।
বলেই পান্না এক লাফে নেমে ছুট দিল রান্নাঘরে।
সোহাগ মাথা নিচু করে ছিল। পুরুষদের সে কখনও লজ্জা পায় না। তার অনাবশ্যক কোনও সংকোচ বা হীনম্মন্যতা নেই। তবু এই মানুষটার চোখে চোখ রাখতে তার একটু সংকোচ হচ্ছিল।
কেমন আছ সোহাগ?
এটা কি একটা প্রশ্ন হল? ভীষণ বোকা-বোকা ওপেনিং। সোহাগ একটু হাসল। তারপর কাঁধ ঝাকিয়ে বলল, বোধহয় ভালই।
বোধহয় কেন?
আমি বুঝতে পারি না কেমন আছি।
ও।
কথা ফুরিয়ে গেল। হয়তো সূক্ষ্ম একটু অপমানও করে ফেলল সোহাগ। তা হোক। অমন বোকা- বোকা প্রশ্ন করে কেন?
বসে বসে পা দোলাচ্ছিল সোহাগ। দেয়ালে একটা টিকটিকি একটা পোকার দিকে এগোচ্ছে। ওই যা! পোকাটা উড়ে দূরে গিয়ে বসল। তার কোনও প্রশ্ন নেই।
প্রশ্ন নেই। কিন্তু হয়তো কথা আছে। কী কথা তা মনে পড়ছে না তার। কথা বলতেই হবে এমন কোনও নিয়মও তো নেই। তাকাতেই হবে, এমনও তো নয়। সোহাগ বসে রইল। বিজু বসে রইল। চুপচাপ।
কিন্তু সোহাগের বুকের ভিতরে ধক ধক শব্দটা হয়েই যাচ্ছে। হৃৎপিণ্ড রক্ত পাম্প করে। সুতরাং শব্দ তো হওয়ারই কথা। তফাত হল, অন্য সময়ে শব্দটা সে শুনতে পায় না। এখন পাচ্ছে। তার খারাপ লাগছে না।
আরও একটা সত্য হল, এই লোকটা এসে কাছাকাছি বসবার পর সোহাগের কেন যে ব্যাপারটা ভাল লাগছে। বেশ ভাল লাগছে। ইচ্ছে হচ্ছে এভাবে বসে থাকতে। এরকম লাগার কথা নয়। অথচ লাগছে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন