ষষ্ঠ অধ্যায়

শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

ছয়

বিকেল যখন ঘনিয়ে আসে তখন মাঠের ওধারে জড়ামরি গাছপালার ফাঁকে যে কী তুলকালাম একটা কাণ্ড ঘটে যায় রোজ তা কেউ তাকিয়েই দেখে না ভাল করে। আকাশ থেকে আলোর চাকাটা তখন নামতে থাকে আর সেই সময়ে কোথাও কিছু না হঠাৎ একটা ভুতুড়ে মেঘ এসে তিন-চার খণ্ড হয়ে ভাসতে থাকে। আর গাছপালার কালচে রঙের ছায়া থেকে অশরীরীর মতো ভেসে উঠতে থাকে ঘোর ঘোর কুয়াশার মতো, ধোঁয়ার মতো, প্রেতের মতো সব জিনিস। পশ্চিমের আকাশে তখন লাল সাদা কালো মেঘের তুলির টান। দিগন্ত দ্রুত তার আলোর গালিচা গুটিয়ে নিতে থাকে। প্রথমে দীর্ঘ ছায়া দীর্ঘতর হতে থাকে, আর অন্ধকার বুনে চলে কালো এক মাকড়সা। প্রতিদিন এইভাবে দিন যায়, দিন আসে। কেউ ঘটনাটা গ্রাহ্যও করে না তেমন। বাসরাস্তায় ব্যস্ত দোকানপাট অন্ধকার নামতেই দিল না কখনও। পটাপট জ্বলে উঠল আলো। ঝাঁই ঝাঁই করে বেজে যায় কালীপদর ক্যাসেটের দোকানের গান। অষ্টধাতুর আংটি বিক্রি করতে বসা লোকটা একঘেয়ে গলায় তার আংটির গুণের কথা বলে, বিফলে মূল্য ফেরতের ভরসা দিয়ে যাচ্ছে। সেই কবে থেকে। তেলেভাজার গন্ধ ছড়িয়ে দেয় হরিপদ দাস। মাঠের ওধারে নানা দৃশ্য অবতারণার পর আলোর চাকা ডুবে গেল হায় হায় করে। কেউ দেখল না। টেরই পেল না ভাল করে। ধুলো উড়িয়ে দুখানা বাস গেল পরপর। লোক নেমেছে মেলা। বাস-আড্ডায় এখন মেলা লোক, বিস্তর বিকিকিনি। এ সময়টায় তার যে খিদেটা পায় সেটা হল বিস্কুটের খিদে।

মানুষের বুদ্ধিরও বলিহারি যেতে হয়। মাথা খাটিয়ে যে কোন জিনিসে কী প্যাঁচ বের করে তার ঠিকঠিকানা পাওয়া মুশকিল। এই যে নিতাইয়ের দোকানের নিমকি বিস্কুট—শুনতে সোজা হলে কী হয়, বিস্কুটখানা বিস্তর প্যাঁচালো। সে গুণে দেখেছে বিস্কুটখানায় অন্তত আটখানা থাক। পরতে পরতে জুড়ে কী করে যে বানিয়েছে মাথা খাটিয়ে, কে জানে বাবা! যেমন মুচমুচে তেমনই গালভরা স্বাদ। জিব যেন জুড়িয়ে যায়। মাঝে মাঝে এক-আধটা কালোজিরে দাঁতে পড়লে ভারী চমৎকার লাগে। গোটাগুটি কামড়ে খায় না সে। খবরের কাগজের ঠোঙায় বিস্কুটখানা নিয়ে প্রথম কিছুক্ষণ চুপ করে অনুভব করে। ছোঁয়ার মধ্যেও একটা উপভোগ হয় না কি? তার তো হয়। তারপর বিস্কুটখানা হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ দেখে। এই দেখাটাও খাওয়ারই একটা অঙ্গ। গানের আগে যেমন হারমোনিয়মের প্যাঁ পোঁ আর তবলা বাঁধার ঠুকঠাক। খুব সাবধানে বিস্কুটের ওপরের পরতটা দু আঙুলে ধরে ছাড়িয়ে নেয় সে। পাতলা ফিনফিনে চমৎকার লম্বাটে জিনিসটি টুক করে দাঁতে কামড়ে একটুখানি মুখে নেয় সে। অনেকক্ষণ ধরে চিবোয়। সঙ্গে সুড়ুত করে এক চুমুক চা। কী যে ভাল লাগে তখন! একটা পরত শেষ হলে আর একটা পরত, তারপর আর একটা। মোট আটখানা খেতে খেতে চা কখন শেষ হয়ে যায়। শেষ পরতখানা খাওয়ার সময় মনটা খারাপ লাগে। শেষ হলেই তো শেষ। আরও একখানা যে খাওয়া যায় না তা নয়, তবে সেটা বড্ড বাড়াবাড়ি হয়ে যাবে। এক একখানা বিস্কুট এক এক টাকা।

খাওয়া শেষ হওয়ার পর খাওয়ার রেশটা অনেকক্ষণ মুখের মধ্যে থেকে যায়। তখন চুপটি করে বসে সেটা উপভোগ করতে হয়। গোরু যেমন জাবর কাটে অনেকটা তেমনই। খাওয়াটা ফুরিয়ে গিয়েও যেন ফুরোয় না, তার স্বাদ জিবকে জড়িয়ে ধরে থাকে অনেকক্ষণ। বিস্কুট আর চায়ের স্মৃতি তাকে কিছুক্ষণ আচ্ছন্ন করে রাখে।

মাথাটা কিছু ভুলভুম্বুল হয়েছে আজকাল। কাছেপিঠের কথাই ভুল হয় বেশি। এই যদি হঠাৎ করে আদিগন্ত সব কথাই আচমকা ভুল পড়ে যায় তা হলেও খারাপ কিছু তো নয়। বাড়িঘর, ঠিকানা, বউ, ছেলেপুলে সব ভুলে স্তূপাকার হয়ে এই বাস-আড্ডার বেঞ্চে বসে হাঁ করে চেয়ে থাকা সেও কি খারাপ রে বাপু! বেশ জায়গা এটা। আলো-টালো আছে, গান বাজছে, বিকিকিনি হচ্ছে, বাস আসছে যাচ্ছে, মানুষের সঙ্গে বসে মানুষ সুখদুঃখের দুটো কথা কইছে, লোকের গ্যাঞ্জাম। এখানে বসেই কত কী দেখে দেখে সময় কেটে যায়। উত্তর দিকে কখন থেকে একটা মাল-বোঝাই ট্রাক খারাপ হয়ে পড়ে আছে। এখন হ্যাজাক জ্বেলে একটা খালাসি জ্যাক লাগিয়ে হ্যান্ডেল মেরে মেরে সেটা তুলছে। দেখার মতোই দৃশ্য। মানুষের বুদ্ধির কোনও কূলকিনারাই করে ওঠা মুশকিল। কী বুদ্ধি! কী বুদ্ধি! একরত্তি একটা যন্ত্র লাগিয়ে একটা মাত্র রোগভোগা খালাসি ওই গন্ধমাদন ট্রাকটাকে কেমন তুলে ফেলছে দেখ! ট্রাকটা উঠছে একটু কেতরে। কুকুরে যেমন পিছনের ঠ্যাং তুলে পেচ্ছাপ করে ঠিক তেমনই। যত দেখে তত মুগ্ধ হয় সে। মুগ্ধ হয়, আর ভাবে। ভেবে ভেবে কূলকিনারা পায় না। বুদ্ধি খাটিয়ে খাটিয়ে মানুষ কত কী বানিয়েছে! রেলগাড়ি, হাওড়ার পোল, মনুমেন্ট। এইসব বসে বসে ভাবে সে। আর খুশি হয়। আর ফিচিক ফিচিক হাসে আপনমনে। তার মেজো ছেলের বউ কুসুম সেদিন তার শাশুড়িকে বলছিল বটে, বাবার একটু মাথার দোষ হয়েছে মনে হয়, একলা একলা বসে কেমন বিড়বিড় করে কথা কইছে আর হাসছে গো। দরমার বেড়ার ওপাশ থেকে কথাটা কানে এসেছিল। মাথার দোষ একটু হয়েও থাকতে পারে তার। ভুলভুম্বুল ভাবটা যেন একটু বেড়েই পড়েছে। গোটাগুটি সব ভুলে মেরে দিলে মন্দ হবে না তখন।

কিছু চাষিবাসি লোক ক্ষেতের কাজ সেরে ঘরমুখো ফেরার পথে এইখানে চায়ের দোকানে বসেছে বেঞ্চ জুড়ে। তাদের হাতে চায়ের গেলাস আর কোয়ার্টার পাঁউরুটি। তাদের মধ্যে সবচেয়ে জ্ঞানী লোকটি বলছিল, সেবার জাজপুরে যাত্রার আসর বসেছিল, বুঝলি। হই হই রই রই কাণ্ড। রামের বনবাস পালা হচ্ছে। খোদ লালমুখো সাহেব ম্যাজিস্ট্রেট যাত্রা দেখতে এসেছে। আসরের পাশেই চেয়ারে বসা। তা পালা তো শুরু হল। কিন্তু রামের বনবাসে যাওয়া নিয়ে ঘ্যানঘ্যানানি, প্যানপ্যানানি, কান্নাকাটি সাহেবের তেমন পছন্দ হচ্ছিল না। ঠোঁট বেঁকিয়ে হাসছে মাঝে মাঝে ভেড়ুয়াদের কান্নাকাটি দেখে। এমন সময় আসরে নামল বীর হনুমান। হনুমান দেখে সাহেব ভারী খুশি। হ্যাঁ, এতক্ষণে একটা জম্পেস ব্যাপার হল। সাহেব সঙ্গে সঙ্গে হনুমানের গায়ে একখানা দশ টাকার নোট ছুড়ে দিয়ে বলে উঠল, মোর হনু। মানে বুঝলি? মানে হল, আরও হনুমান চাই। অধিকারী তো তাড়াতাড়ি ছুটে গিয়ে আর একজনকে হনুমান সাজিয়ে আসরে নামিয়ে দিল। উপায় তো নেই, সাহেবের মর্জি, সাহেব ফের দশ টাকা বখশিস দিয়ে হেঁকে উঠল, মোর হনুমান। অধিকারীমশাই ফের ছুটে গিয়ে আর একজনকে হনুমান সাজিয়ে নামিয়ে দিল। ফের দশ টাকা। সঙ্গে সঙ্গে হুকুম, মোর হনু। সে আমলের দশ টাকা তো কম নয়। টাকার ছড়াছড়ি দেখে তখন রাম সীতা লক্ষ্মণ সবাই গিয়ে হনুমান সেজে এসে আসরে নেমে পড়ল। রামের বনবাস চুলোয় গেল, আসর জুড়ে শুধু হনুমানদের হুপহাপ ধুপধাপ। তা আমাদের অবস্থাও হয়েছে তাই। যার রামচন্দ্র হওয়ার কথা ছিল, যার সতীলক্ষী সীতা হওয়ার কথা ছিল, যার ভ্ৰাতৃভক্ত লক্ষ্মণ হওয়ার কথা ছিল সবাই নিজের নিজের পাঠ শিকেয় তুলে হনুমান হয়ে নেমে পড়েছে। দেশ জুড়ে এখন শুধু হনুমানদের দাপাদাপি। তাই বলছিলুম, গান্ধীবাবা আর সুভাষ বোস মিলে যে সাহেবদের তাড়াল তাতে লাভটা কী হল বল তো! এক পয়সার পাঁউরুটি দেড় টাকায় ঠেলে উঠেছে।

বিড়ি ধরানোর গন্ধটা বড্ড ভাল লাগল তার। গন্ধেরও কত রকমারি আছে। মিষ্টি ঝাঁঝাঁলো গন্ধে মনটা চনমনে হয়ে যায়। জ্ঞানী লোকটা বিড়ি ধরিয়ে নিয়ে বলল, বুড়োশিবতলার জলায় এক সাহেবের মোটরগাড়ি কাদায় বসে গিয়ে হাঁসফাঁস অবস্থা। কিছুতেই তোলা যায় না। তখন কাশীনাথ আর শিবনাথ দুই ভাই ক্ষেতের কাজ সেরে ফিরছিল। কাঁধে হাল, হাতে বলদের দড়ি। অবস্থা দেখে দু ভাই নেমে পড়ল কাদায়। দড়ি বেঁধে বলদ দিয়ে টেনে গাড়ি তুলে দিল। তারপর ঠেলে নিয়ে পৌঁছে দিল দু মাইল দূরের ডাকবাংলোয়। সাহেব খুশি হয়ে দুই ভাইকে একশো টাকা করে বখশিস দিলেন। তখনকার একশো টাকা বাবা! তার অনেক দাম। দুই ভাই টাকা পেয়ে জমিজিরেত কিনে ফেলল। চাষবাস করে অবস্থা ফিরিয়ে ফেলল লহমায়। গাঁয়ে পুকুর কেটে দিল, শিবমন্দির গড়ে দিল। গায়ে সেন্ট মেখে জুতো মসমসিয়ে যখন রাঁড়ের বাড়ি যেত তখন রাস্তার দুধার থেকে লোকে সেলাম ঠুকত। তাই বলছিলুম, গান্ধীবাবা আর সুভাষ বোস মিলে সাহেব তাড়িয়ে কাজটা ভাল করেননি মোটে। সাহেবরা মাথার ওপর ছিল, সে একরকম। এখন যে কে কখন মাথায় চড়ে বসছে নগেনের পোষা বাঁদরটার মতো কে জানে বাবা! যিনি যখন চড়েন তখন তিনিই আমাদের জো-হুজুর।

ট্রাকটা তেমনই কেতরে কুকুরের মতো ঠ্যাং তুলে আছে। খালাসিটা একখানা চাকা খুলে ফেলে আর একখানা লাগাচ্ছে। তার ওপাশে ঝুপসি গাছগাছালির ফাঁক দিয়ে আলোর চৌহদ্দির বাইরে থেকে ঠেলে উঠছে চাপ-বাঁধা অন্ধকার। ফিনফিনে কুয়াশার সঙ্গে মিশে যাচ্ছে চায়ের উনুনের ধোঁয়া আর বাসের চাকায় ওড়া ধুলো। উত্তরে বাতাসে শীতের চোরা টান টের পাওয়া যায়।

মানুষের একটা ফেরা থাকে। কোথা থেকে যে আসে, কোথায় যে ফিরে যায় তার মীমাংসা আজও হল না। দিনশেষে সে বাড়ি ফেরে বটে, কিন্তু এটা ঠিক ফেরা নয়। আর একটা আসল ফেরা আছে তার। সেইটে একটু একটু ভাবিয়ে তোলে তাকে আজকাল।

ধীরেন কাষ্ঠ উঠে পড়ল। পেচ্ছাপের বেগটা আর সামলানো যাচ্ছে না। চাপতে গেলে আজকাল হয়ে পড়ে।

শিশুগাছের তলায় বসে বেগটা ছেড়ে দিয়ে ধীরেন কাষ্ঠ একটা ভারী আরাম পেল। এইসব ছোটোখাটো প্রাকৃতিক কাজের মধ্যেও মাঝে মাঝে একটা ভারী আনন্দ হয় তার। পেচ্ছাপ করার আরামটা কি সবাই টের পায়? কে জানে বাবা! ধীরেন কাষ্ঠ পায়।

ব্যাপারটা যাচাই করার জন্যই সে ভালমানুষের মতো গিরীশ মুহুরিকে জিজ্ঞেস করেছিল, মুতে কেমন আরাম পাও হে গিরীশ?

গিরীশ তখন মাচা থেকে কচি লাউডগা কাটছিল। সুতোয় বেঁধে ভাতে দিয়ে সর্ষের তেল মেখে খেতে চমৎকার। প্রথমে কথাটা বুঝতে পারেনি। তারপর বুঝতে পেরে ভারী চটে উঠে বলল, ও তোমার কেমন কথা ধীরেনদা! মাথাটাই গেছে দেখছি! বলি সব ছেড়ে মুতের খতেন নিতে লেগেছ কেন?

কথাটা আরও দু-চারজনের কাছে যাচাই করার ইচ্ছে ছিল ধীরেনের। কিন্তু আর সাহস পায়নি। আজকাল লোকে বড় খপ করে চটে যায়। অথচ কত কী যে জানতে ইচ্ছে করে, জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে করে লোককে।

ফ্যান্সি স্টোর্সের সামনে দাঁড়িয়ে শো-কেসে সাজানো জিনিসপত্র ভারী অবাক চোখে দেখছিল ধীরেন। যত দিন যাচ্ছে কত কী নতুন নতুন জিনিস আসছে। মানুষের যে কত কী লাগে আজকাল! ধীরেনের লাগে না বটে, কিন্তু জিনিসগুলি সম্পর্কে তার অপার কৌতূহল। এই যেমন শ্যাম্পু বা কর্নফ্লেক বা বোতলের কড়াইশুঁটি কি দাড়ি কামানোর ফোম—যত দেখে তত ভাল লাগে তার।

দোকানি স্বপন একটু ঝুঁকে বলল, টর্চ নেবেন বলেছিলেন, নিলেন না তো জ্যাঠা!

ধীরেন একটু তটস্থ হয়ে বলে, নেব বাবা। বড্ড দাম।

চল্লিশ-পঞ্চাশের নীচে ভাল জিনিস নেই যে। দশ-পনেরো টাকার মালে গ্যারান্টি নেই, আলোও হয় না তেমন।

দেখি। আর দু-চারদিন যাক।

আগে টর্চ লাগত না, আজকাল মনে হয় একটা হলে হত। অন্ধকারে সাপ-খোপের ভয় আছে ঠিকই, কিন্তু তার চেয়েও বেশি আজকাল কেমন যেন গা ছমছম করে। দিন দিন গা ছমছমে ভাবটা বাড়ছে আর বরুণ মিদ্দার যেন আজকাল কাছেপিঠেই ঘোরাঘুরি করে, তক্কে তক্কে থাকে। ধীরেন আজকাল এসব টের পায় খুব। গত পঁয়তাল্লিশ বছর বরুণ মিদ্দারের চিহ্নও ছিল না, এখন কেন যে ঘাড়ে নিশ্বাস ফেলছে কে জানে বাবা।

কথাটা পাঁচকান করার মতো নয়। পঁয়তাল্লিশ বছর আগে ধীরেন কাষ্ঠ নামে বাইশ-তেইশ বছরের যে তরতাজা জোয়ান দাপিয়ে বেড়াত তার সঙ্গে এখনকার এই ধীরেন কাষ্ঠর সম্পর্কটাই বুঝতে কষ্ট হয়। কালোর মধ্যেও ভারী নাকি সুন্দর চেহারা ছিল সেই ধীরেন কাষ্ঠর। আর ছিল নানা দিকে মন। ম্যাট্রিক পাসটা করেছিল কোনওক্রমে, তারপর আর পড়া হল না। তবে হাতের কাজে ঝোঁক ছিল খুব। ভাল লাটাই তৈরি করতে পারত, পুতুল গড়ত, মূর্তি তৈরি করতে পারত, কাঠের কাজেও ছিল ভাল হাত। কিন্তু পাঁচ রকম জিনিসে মন দিতে গেলে কোনওটাই তেমন হয়ে ওঠে না। বাবা চরণ কাষ্ঠ তাড়না করত খুব। টাকা আয় না করলে ঘরছাড়া করার হুমকি দিত।

সেই সময়ে পাশের গাঁ শূলপুরে বরুণ মিদ্দারের কাছে গিয়ে জুটল সে। গুণী মানুষ, ঘরে বসে মৃদঙ্গ, খোল, দোতারা এইসব তৈরি করত। বিক্রিবাটা কিছু খারাপ হত না। তবে হাঁফি রুগি বলে সারা বছর কাজ তুলতে পারত না। ধীরেনকে পেয়ে তার সুবিধে হল। ধীরেন চিৎপুর থেকে কাঁচা মাল কিনে আনত, খদ্দের ধরে আনত আর বাকি সময়টা কাজ শিখত।

কিন্তু জীবনটা তো সবসময় সোজা পথে চলে না। হঠাৎ হঠাৎ বাঁক ফেরে। আর তখনই ভাঙন লাগে।

মিদ্দারের ঘরে ছিল কালনাগিনী। যেমন তার লকলকে চেহারা, তেমনই তার ঠাটঠমক। চোখের ভিতর থেকে যেন ইলেকট্রিক ঠিকরে আসত। বাপ রে! প্রথম প্রথম দেখে তো ভয়ই খেয়ে যেত ধীরেন। এই ফুটন্ত যুবতী বউকে সামলায় কী করে রোগাভোগা বরুণ মিদ্দার!

কারণে অকারণে তাদের কাজের ঘরে এসে উদয় হত বাতাসী। দু হাত তুলে খোঁপা ঠিক করত—তাতে বুকখান ঠেলে উঁচু হয়ে উঠত বেশ, অকাজের কথা বলে বলে ভাব করত ধীরেনের সঙ্গে। বরুণ মিদ্দার কিছু বলত না। তবে মুখ দেখে মনে হত বউ নিয়ে তার স্বস্তি নেই।

কিছুদিনের মধ্যেই ইশারা ইঙ্গিত শুরু করে দিল বাতাসী। সুরেলা গলায় উঠোন থেকে হয়তো একটু রসের গান গেয়ে উঠল, বা ছাগলছানাটাকে কোলে নিয়ে এমন সব কথা বলে আদর করত যা ছাগলছানাকে বলার কথা নয়।

সেই বয়সে তখনও ধীরেনের মেয়েমানুষের বউনি হয়নি। বাধো-বাধো ভাব তো ছিলই, ভয়ও ছিল বেশ। কীসে পাপ লেগে যায় কে জানে বাবা! কিন্তু ওই দামাল বয়সে বাঁধ রাখাও কঠিন কাজ।

মুশকিল হল বরুণ মিদ্দার ঘর থেকে বেরোত না মোটে। রোগাভোগা মানুষ বলেও বটে আর তার কাজটাও ঘরে-বসা কাজ বলেও বটে। ফলে বাতাসীর বিশেষ সুবিধে হচ্ছিল না। ধীরেনও নিজেকে খুব সংযত রাখত। ইশারা ইঙ্গিত পেয়েও চোখ তুলে তাকাত না।

কিন্তু সুযোগসন্ধানীদের কখনও সুযোগের অভাব হয়নি। ভগবানই কি পাপীদের জন্য নানা ফাঁকফোকর তৈরি করে দেন? তাই যদি না হবে তবে হঠাৎ সেদিন সন্ধেবেলা ঘটকবাড়ি থেকে বরুণ মিদ্দারের ডাক আসবে কেন? ঘটকরা বড় মানুষ, ডাকলে না গিয়ে উপায় নেই। মেয়ের স্কেল চেঞ্জার হারমোনিয়ম খারাপ হয়েছে, ফলে তাকে পাত্রপক্ষ দেখতে আসবে, আজই গিয়ে হারমোনিয়ম সারিয়ে দিয়ে আসতে হবে।

বরুণ মিদ্দার যখন শশব্যস্তে যন্ত্রপাতির ব্যাগ নিয়ে রওনা হচ্ছিল তখন ভালমানুষের মতো ধীরেন বলেছিল, চলুন আমিও সঙ্গে যাই। কাজটা শেখাও হবে।

কথাটা শুনে ঘাড়ও কাত করেছিল মিদ্দার। তারপরই দোনোমোনোতে পড়ে গেল। নিয়তি কেন বাধ্যতে। যে খোলটার কাজ চলছিল সেটা সত্যকিশোর দাসের। মস্ত কীর্তনীয়া। কাজটাও জরুরি। কাল সকালেই সত্যকিশোরের লোক আসবে খোল নিতে। নগদ টাকার কারবার। তাই মিদ্দার একটু ভেবে বলল, হারমোনিয়ম সারাতে সময় লাগবে। তুই বরং খোলটা এগিয়ে রাখ, আমি এসে বাকিটুকু করব।

নিয়তি! নিয়তি ছাড়া আর কী? মিদ্দার কুকুরের মুখের কাছে রসালো মাংসের টুকরো রেখে চলে গেল। আহাম্মক আর কাকে বলে!

বোধহয় পাশের শোওয়ার ঘরে দম বন্ধ করে অপেক্ষায় ছিল বাতাসী। তাকেই কি দোষ দিতে পারে ধীরেন? না, আজও দোষ দিয়ে উঠতে পারে না। উপোসি শরীর, তীব্র অতৃপ্ত কাম কামনা, মনের জ্বালা মানুষের মাথা ঠিক রাখতে দেয় নাকি?

মিদ্দার বাড়ির চৌহদ্দি ডিঙোতে না ডিঙোতেই বাতাসী যেন বাজপাখির মতো উড়ে এল।

অ্যাই!

ধীরেন ধুকপুক করা বুকে নিচু মাথা উপরে তুলেই দেখল দুটো চোখ জ্বল জ্বল করে জ্বলছে। শরীরের ছিলা টান টান।

ধীরেন ভালমানুষের মতো বলল, কী?

যেন ভারী অবাক হয়ে বড় বড় চোখ করে বাতাসী বলল, কী? কী?

তারপরই ছুটে এসে তার ঝাঁকড়া চুল দু হাতে খামচে ধরে ঝাঁকানি দিতে দিতে পাগলের মতো বলতে লাগল, কী? কী? তুমি জানো না কী? তুমি জানো না? ন্যাকা কোথাকার…

গায়ে কী জোর রে বাবা! ধীরেনের মতো জোয়ান লোককে টানতে টানতে নিয়ে গিয়ে ফেলল পাশের ঘরের বিছানায়। উন্মাদিনীর মতো তাকে খাবলাচ্ছে, খিমচোচ্ছে আর বলছে, জানো না কী? জানো না? বদমাশ! শয়তান! জানো না?

ধীরেনের বাঁধ ভেঙেছিল আগেই। এবার ভেসে গেল।

কতটা পাপ হল তা ধীরেন জানে না। কিন্তু কোনওদিন যদি ভগবান তাকে এ নিয়ে জিজ্ঞেস করেন তা হলে ধীরেনও সপাটে বলবে, আমি কি ইচ্ছে করে করেছি কিছু? আপনিই তো ঠাকুর, ঘটকবাড়ির হারমোনিয়ম খারাপ করে রেখেছিলেন। তাও ভর সন্ধেবেলা। তার ওপর আবার পরদিন ঘটকবাড়ির মেয়েকে পাত্রপক্ষ দেখতে আসছে বলে তাদের তর সয় না। এই এতগুলো যোগাযোগ এই ত্র্যহস্পর্শ ঠাকুর, আপনি ছাড়া আর কে ঘটাতে পারে? আমি তো সঙ্গেই যেতুম, কিন্তু সত্যকিশোরের খোল বাদ সাধল যে!

পাপবোধটা বড্ড খোঁচা দিচ্ছিল, যখন একটু বেশি রাতের দিকে বরুণ ফিরে এল। তখন ধীরেন নতুন খোল ছাওয়ার কাজটা অনেক এগিয়ে রেখেছে। বরুণ তার মুখখানা ভাল করে দেখল। তারপর মুখটা একটু তেতো করে বলল, রাত হয়েছে বাড়ি যা।

মিদ্দার বোকা লোক নয় যে, টের পাবে না। এসব বাতাসেই টের পাওয়া যায়, টের পেতে চাইলে। খুব দুশ্চিন্তা নিয়ে, দুরুদুরু বুকেই অত রাতে দু মাইল পথ হেঁটে বাড়ি ফিরেছিল ধীরেন। দুশ্চিন্তায় আর ভয়ে রাতে ভাল ঘুম হয়নি। তন্দ্রার মধ্যেও মনস্তাপে বারবার চমকে ঘুম ভেঙে গেছে।

পরদিন অপরাধী মুখ নিয়ে সে যখন গিয়ে মিদ্দারের বাড়িতে হাজির হল তখন কোনও বৈলক্ষণ চোখে পড়ল না। মিদ্দার তার কাজের ঘরে বসে কাজ করছে, বাতাসী ঘরকন্নার কাজ করছে। তাকে দেখে একটু হাসল। খুব মিষ্টি আর মানেওয়ালা হাসি।

একবার হলে পাপ আবার হতে চায়। একবার পর্দাটা সরে গেলে আর ঢাকা-চাপা দেওয়া যায় না কি না।

কিন্তু বরুণ মিদ্দার তো আর নিত্যি নিত্যি সন্ধেবেলা ঘটকবাড়ি হারমোনিয়ম সারাতে যায় না। সুতরাং বাতাসী অন্য পন্থা নিল। রান্নায় মিশিয়ে কী যেন একটা খাইয়ে দিল মিদ্দারকে। সেই খেয়ে মিদ্দারের ছুটল হাগা। একে রোগাভোগা মানুষ, চার-পাঁচবার দস্তি করেই নির্জীব হয়ে নেতিয়ে পড়ল বিছানায়। গাঁয়েগঞ্জে ডাক্তারের ব্যবস্থা নেই। গ্যাঁদাল থানকুনি ছেঁচে বাতাসীই খাওয়াল তাকে। দুর্বল মানুষটা যখন ঘুমিয়ে পড়ল তখন ফের ব্যাপারটা হল। কী শরীর! কী শরীর বাতাসীর!

তবে ষড়যন্ত্রটা মোটেই ভাল লাগল না ধীরেনের। সে বলল, তুমি খুব পাষণ্ড আছ বাপু। মিদ্দারকে ওষুধ খাওয়ালে, মরে-টরে যেত যদি?

যেত তো যেত। মরলে বাঁচি। সারাজীবন ওই নপুংসককে গলায় ঝুলিয়ে বেঁচে থাকব নাকি?

কাজটা ভাল করোনি। এরকম করলে আমি কিন্তু আর আসব না।

ইস্! না এসে পারবে?

পারবে না, সে ধীরেনও জানে। তার তখন নেশা ধরেছে।

বাতাসী একদিন প্রস্তাব দিল, আমাকে নিয়ে পালাবে?

এ প্রস্তাবে আকাশ থেকে পড়ল ধীরেন। বিয়ে করার মতো অবস্থাই তার নয়। বাপ এমনিতেই রোজ চাকরি-বাকরি করার জন্য হুড়ো লাগাচ্ছে। মাও মুখনাড়া দিয়ে তবে দুটি ভাত দেয়। তার ওপর অন্যের বউ ফুসলিয়ে বাড়ি নিয়ে তুললে তো চিত্তির। বাড়িতে কাকচিল বসতে পারবে না। তার ওপর বাতাসীর মতো মেয়েছেলে। এ তো দিনকে রাত করতে পারে। একে বিশ্বাস কী?

সে মিন মিন করে বলল, কাজটা ঠিক হবে না।

কেন হবে না শুনি? তোমার আপত্তি কীসের?

শত হলেও বরুণদাদা আমার গুরু, তার কাছে কাজ শিখছি। তার সঙ্গে নেমকরাহামি করব কী করে?

আহা, সাধুপুরুষ রে! নিমকহারামি যা করার তো করেই ফেলেছ। আমার পেটে তোমার ছেলে। নিমকহারামির আর বাকি আছে কিছু?

খবরটা শুনে ধীরেন অগাধ জলে পড়ল। ঘটনাটা সত্যি হয়ে থাকলে তো জল অনেক দূর গড়িয়েছে। ভয় খেয়ে ধীরেন বলল, আমার চালচুলো নেই বাতাসী, তোমাকে নিয়ে ঘর বাঁধার মতো অবস্থাও নয়।

বাতাসী বলল, তা হলে মিদ্দারকে সরাও। সরিয়ে দুজনে বেশ এখানেই থাকব।

ধীরেন অবাক হয়ে বলে, সরাব? সরাব কোথায়?

আহা, সরানো মানে বুঝলে না? দুনিয়া থেকে সরাও।

ধীরেনের মাথায় বজ্রাঘাত। মেয়েটা বলে কী? এ যে মিদ্দারকে খুন করাতে চাইছে! ভীষণ ভয় খেয়ে সে বলল, ছিঃ, ওসব বোলো না। বলতে নেই। শুনলেও পাপ হয়।

মশা মাছি মারলে যা পাপ হয় ভগবানের দুনিয়ায় মানুষ মারলে তার বেশি হয় না। বুঝলে? যদি পাপের ভয়ে পিছিয়ে যাও তা হলে তুমি বোকা। ভগবানের কাছে মশা, মাছি, পোকা, মানুষ সব সমান।

ধীরেন মাথা নেড়ে বলল, ওসব মরে গেলেও আমি পারব না।

তা হলে কাজটা আমিই করব। তুমি সাহায্য কোরো, তাহলেই হবে।

ধীরেন এ কথায় এত ভয় পেয়েছিল যে বলার নয়।

যে সময়ে তাদের কথা হচ্ছিল সে সময়ে মিদ্দার হাটে গিয়েছিল। ফিরে এসে উঠোনে দাঁড়িয়ে তাদের কথা বলতে দেখে গম্ভীর মুখ করে নিজের কাজের ঘরে গিয়ে ঢুকল। ভারী অপরাধবোধ হচ্ছিল ধীরেনের। একটু আগেই দুপুরবেলা মিদ্দারের বিছানাতেই জড়ামড়ি করে শুয়ে থেকেছে সে আর বাতাসী। দুপুর তুফানের মতো উড়ে গেছে। এখন বড় অবসাদ, বড় পাপবোধ। মিদ্দার বোধহয় সবই টের পায়, তবে কেন ফুঁসে ওঠে না? কেন তাড়িয়ে দেয় না ধীরেনকে? কেন ঝাঁটাপেটা করে না বাতাসীকে?

ধীরেন বড় টানাপোড়েনের মধ্যে পড়ে গেল। কী যে অবস্থা গেছে কদিন তা বলার নয়। কিন্তু আশ্চর্যের কথা এসব কাণ্ড যখন চলছে তখনও কিন্তু বরুণ মিদ্দার শান্ত, চুপচাপ। আপনমনে নিজের কাজ করে যায়। তার ঘর থেকে নানা বাদ্যযন্ত্র পরীক্ষার নানা সুরেলা শব্দ ওঠে। আর কোনওদিকেই যেন মন নেই মিদ্দারের।

তখন ঘোর বর্ষাকাল। এক তুমুল বৃষ্টির রাতে বরুণ মিদ্দার বলল, আজ কি আর যেতে পারবি?

ধীরেন বলল, পারব। বর্ষাবাদলায় আমার অসুবিধে হয় না।

বরুণ মিদ্দার বলল, কাজ কী ফিরে? চাট্টি ভাত খেয়ে এখানেই শুয়ে থাক।

ধীরেন আপত্তি করল না। রাতে বাতাসী খিচুড়ি রেঁধেছিল। তাই খেয়ে বাদ্যযন্ত্রের ঘরে মাদুরে শুয়ে রইল ধীরেন। তুমুল বৃষ্টি আর প্রলয়-বাতাসে ঘরদোর ভেঙে পড়ার অবস্থা। পাশের ঘরে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে কী হচ্ছে তা ভাবতে ভাবতে একটু ভয়-ভয় ভাব নিয়েই ধীরেন ঘুমিয়ে পড়েছিল।

অচেনা যে-ভয়টা তার মনের মধ্যে ছিল সেই ভয়টা যে কেন তা হঠাৎ করে তার কাছে পরিষ্কার হয়ে গেল যখন নিশুত রাতে হঠাৎ একটা উন্মাদিনী মেয়েমানুষের শরীর তাকে সাপের মতো আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরল।

ধীরেন সেই আলিঙ্গন ছাড়াতে ছাড়াতে চাপা গলায় বলল, করো কী? বরুণদা টের পাবে যে!

ভয় নেই, ওকে ঘুমের ওষুধ দিয়েছি।

কী ওষুধ?

ও তুমি বুঝবে না।

বিষ দাওনি তো?

না গো না, ঘুমের ওষুধ। ভয় পেও না।

মনে একটা ধন্দ থেকেই গিয়েছিল তবু ধীরেনের। এ পাগলি কী করে এল মিদ্দারকে ফাঁকি দিয়ে কে জানে! বাতাসীকে প্রত্যাখ্যান করা সম্ভব ছিল না। সে তার পাওনাগণ্ডা আদায় করে যেমন এসেছিল তেমনই চলে গেল হঠাৎ। বৃষ্টির তেজ আরও বাড়ল। হাওয়ায় তখন ঝড়ের গর্জন। ধীরেন অশান্ত মনে খানিকক্ষণ এপাশ ওপাশ করে ঘুমিয়ে পড়ল।

ম্যাদাটে আলোয় ভোরবেলা উঠে ধীরেন দেখল, ঝোড়ো বাতাস থামলেও বৃষ্টি পড়েই চলেছে। উঠোনে এক হাঁটু জল। ঘরের ভিটে ডুবে যেতে আর খুব বাকি নেই। কেঁচো, কেন্নো, উইচিংড়েরা বারান্দা ভরে ফেলেছে। আর উঠোন, বাগান, সব জলে একাকার। কোথাও ডাঙাজমি দেখা যাচ্ছে না। ঘটির জলে চোখমুখ ধুয়ে সে কিছুক্ষণ চারদিকের অবস্থা দেখল দাঁড়িয়ে। এই অবস্থায় বাড়ি ফেরা শক্ত হবে। কিন্তু ফেরাটাও দরকার। কাল রাতে যা হল তাতে তার আর এ-বাড়িতে থাকতে সাহস হচ্ছে না। বরুণ মিদ্দার কিছু টের পেয়ে থাকলে বড় লজ্জার কথা।

ও-ঘর থেকে অবশ্য কোনও সাড়াশব্দ আসছিল না। আকাশের আলো দেখে ধীরেন অনুমান করল, সকাল ছটা-সাড়ে ছটা হবে। এত বেলা অবধি ওদের ঘুমোনোর কথা নয়।

ধীরেন ঘরে এসে মাদুরে চুপচাপ বসে রইল। মনে বড় দুশ্চিন্তা।

আরও কিছুক্ষণ বাদে দরজা খোলার শব্দ হল। ও-ঘর থেকে বরুণ মিদ্দার এসে মাদুরে বসল। তাকে দেখে খুশিই হল ধীরেন। যাক, বাতাসী তাহলে লোকটাকে বিষ-টিষ দেয়নি। কিন্তু মিদ্দারের অবস্থা ভাল নয়। বর্ষার ঠান্ডা আর জোলো বাতাসে তার হাঁফের টান উঠেছে, গলায় শ্লেষ্মার শব্দ হচ্ছে, চোখ দুটো লাল আর টসটসে। গলা আর মাথায় কস্ফর্টার জড়ানো। গায়ে চাদর।

এঃ, শরীরটা যে খারাপ দেখছি বরুণদাদা?

বরুণ মিদ্দার কথাই কইতে পারল না। কিছুক্ষণ হাঁফাল, বারান্দায় গিয়ে অনেকটা শ্লেষ্মা ফেলে এসে ফের কিছুক্ষণ কাহিল শরীরে বসে হাঁফ ছাড়ার জন্য হাঁসফাঁস করল। আবার গিয়ে শ্লেষ্মা ফেলল।

বার কয়েক শ্লেষ্মা উগড়ে একটু ধাতস্থ হয়ে বরুণ মিদ্দার হঠাৎ তাকে বলল, তোর তো গায়ে বেশ জোর-টোর আছে। একটা ভারী জিনিস তুলতে পারবি?

ধীরেন অবাক হয়ে বলল, কী তুলতে হবে বরুণদাদা?

একটা লাশ। মেয়েমানুষের লাশ।

ধীরেন এত স্তম্ভিত হয়ে গেল যে, মুখ দিয়ে বাক্য সরল না। বড় বড় চোখে চেয়ে রইল।

পারবি না?

ধীরেন স্খলিত কণ্ঠে শুধু বলল, অ্যাঁ!

বরুণ মিদ্দার হঠাৎ একটা হাত বাড়িয়ে তার ডান হাতের কবজিটা শক্ত করে ধরে ঘড়ঘড়ে গলায় বলল, আয়।

ধীরেনের আজও মনে আছে, সে যেন একটা ঘোরের মধ্যে মিদ্দারের সঙ্গে সঙ্গে পাশের ঘরে গিয়ে ঢুকল। শরীরে একরত্তি শক্তি নেই, পা দুটো ভেঙে আসছে ভয়ে, মাথাটা বড্ড ধোঁয়াটে।

দরজা জানালা বন্ধ বলে ঘরটা এখনও অন্ধকার। আবছা দেখা যাচ্ছিল, বাতাসী বিছানায় আড়াআড়িভাবে উপুড় হয়ে শুয়ে আছে। দুটো পা বেরিয়ে আছে চৌকির বাইরে।

ধীরেন হাঁ করে চেয়ে রইল।

বরুণ মিদ্দার বলল, এতকাল লুকিয়ে-চুরিয়ে নষ্টামি করছিল, টের পেয়েও কিছু বলিনি। আমি কি বুঝি না যে, ওরও একটা পুরুষমানুষ দরকার! টের পেয়েও না-পাওয়ার ভান করতুম। কিন্তু কাল রাতে যা করল তা কি সহ্য করা যায় বল তো! হাঁফানির টান বেড়েছে বলে ঘুমোতে পারছি না। এপাশ ওপাশ করছি। জেগে আছি জেনেও দিব্যি উঠে চলে এল এ-ঘরে। আমি গলাখাঁকারি দিয়ে জানান দিলুম যে জেগে আছি। তবু গ্রাহ্য করল না। যেন আমি কেউ না, কিছু না। চলে এল, আর আমি তখন বসে বসে ভাবলুম যা করার আজই করতে হবে। এ জিনিস আর সহ্য করা যায় না।

ধীরেন তখনও হাঁ করে পলকহীন চোখে চেয়ে আছে মিদ্দারের দিকে। বরুণ মিদ্দার তার চাদরের তলা থেকে তার হাতটা বের করল। হাতে একটা তারের কাঁস। বাদ্যযন্ত্রের সরু স্টিলের শক্ত তার দিয়ে তৈরি। একপ্রান্তে কাঠের হাতল লাগিয়ে নিয়েছে, যাতে টান মারতে সুবিধে হয়। এ অস্ত্র যে ভয়ংকর তা ধীরেন জানে, একটা হ্যাঁচকা টান মারলেই গলার মাংস কেটে বসে যাবে। আধখানা গলা নেমে যাবে লহমায়। দড়ির ফাঁসের চেয়ে বহুগুণ ভয়ংকর।

বরুণ মিদ্দার বলল, একটা শব্দ করারও সময় পায়নি। হাসি-হাসি মুখ করে তোর ঘর থেকে এসে দিব্যি আমার পাশে শুয়ে পড়ল। এমনকী আমি জেগে আছি জেনেও নির্লজ্জের মতো বলল, একটু সরে শোও তো, গরম লাগছে। যেন কিছুই হয়নি। গায়ে জ্বালা করে না, বল তো! কিন্তু আমি হড়বড় পছন্দ করি না। ঠান্ডা মাথায় কাজ করতে পছন্দ করি। চমকে দেওয়ার জন্য বললুম, হ্যারিকেনটা একটু উসকে দেখ তো, ঘবে বোধহয় সাপ ঢুকেছে। সাপ শুনে টক করে উঠে বসে বলল, কোথায় সাপ? ব্যস, ওইটাই শেষ কথা। তৈরিই ছিলুম, ও উঠে বসতেই গলায় ফাঁসটা গলিয়ে টেনে দিলুম।

ধীরেন ভয়ে থরথর করে কাঁপছিল। শুধু ভাঙা গলায় বলল, সর্বনাশ!

একটু হাত লাগাতে হবে যে রে। লাশটা ইট বেঁধে পিছনের ডোবায় ফেলতে হবে।

ধীরেন আতঙ্কিত গলায় বলল, আমি পারব না।

বরুণ মিদ্দার হাসল, পারব না বললে কি হয়! ফুর্তি টবে আর দায় সারবে না তাই কি হয়?

পায়ে ধরছি বরুণদা, ও আমি পারব না।

পারত না ধীরেন। তার হাত-পা ভয়ে অবশ। দৌড়ে পালাবে ভেবেছিল, কিন্তু শরীরে তখন একরত্তি

ক্ষমতা নেই।

আচমকাই বরুণ মিদ্দার হাতের ফাঁসটা তার গলায় গলিয়ে হালকা একটা টানে সেঁটে দিয়েছিল ফাঁস। ওই একটু টানেই ধারালো তার বসে গেল গলায়, দম আটকে এল তার। টপটপ করে গরম রক্ত ঝরে পড়ছিল গলা থেকে বুকে।

ফাঁসটা আলগা করে বরুণ মিদ্দার বলল, এই। ওকে কাঁধে নে। গড়বড় করলে কিন্তু বাঁচবি না।

ধীরেনের বাঁচার কথাই ছিল না সেদিন। বরুণ মিদ্দার রোগাভোগা মানুষ হলেও রাগে আর প্রতিহিংসায় সেদিন তার শরীর লোহার মতো শক্ত। আর ধীরেন সেদিন ভয়ে আতঙ্কে কেঁচো। গলায় তারের ফাঁস, তার হাতলটা মিদ্দারের শক্ত মুঠোয় ধরা। সেই অবস্থাতেই বাতাসীর ঠান্ডা শক্ত শরীরটা যে কীভাবে কাঁধে তুলেছিল ধীরেন তা আজও রহস্য। প্রাণের ভয়ে মানুষ কী না পারে! বাতাসীর গলা অর্ধেক নেমে গিয়েছিল, রক্তে ভেসে যাচ্ছিল বিছানা। বরুণ মিদ্দার ফাঁসের হাতল ধরে থেকেই দরজা খুলল, বলল, নাম।

উঠোনে হাঁটু জল, এঁটেল পিছল মাটি, কাঁধে বাতাসী। সে যে কী অবস্থা তার! সে যদি হঠাৎ পা পিছলে পড়ে যায় তাহলে মিদ্দারের হাতে ধরা ফাঁস ঘ্যাঁস করে গলায় বসে যাবে। আর মিদ্দার যদি পা পিছলে পড়ে তাহলেও একই পরিণতি। ধীরেনের তখন দু চোখে জলের ধারা। এরকম বিপদে সে কখনও পড়েনি। মুষলধারে বৃষ্টি পড়ছিল। চারদিক অন্ধকার। লোকজনের চিহ্ন নেই। উঠোন পেরোনোই হয়ে দাঁড়িয়েছিল শক্ত কাজ। পা টিপে টিপে সেটা পেরোনোর পর পিছনে ডোবার ঢাল। ঢালু দিয়ে এই লাশ কাঁধে নিয়ে নামা তো সোজা নয়। একটু এদিক ওদিক হলেই তার গলায় ফাঁস বসে যাবে।

সজনেগাছের তলায় কিছু ভাঙা ইটের স্তূপ ছিল। সেখানে এসে মিদ্দার বলল, ওকে নামিয়ে ওর পেট-কোঁচড়ে ইটের টুকরোগুলো ভাল করে বাঁধ। তাড়াতাড়ি কর, সময় নেই।

সেই জলের মধ্যে বাতাসীকে নামাতে হল। তারপর ইটের টুকরো জড়ো করে আঁচলে বেঁধে তা কোমরে জড়িয়ে গিট দেওয়া—ওই প্রবল বৃষ্টির মধ্যে কাজটা তো সোজা নয়। তার ওপর ধীরেনের হাত-পা তখন বশে নেই। তবু সে অসম্ভবকে সম্ভব করার জন্য প্রাণের তাড়নায় জন্তুর মতো—মিদ্দার যেমন বলছিল—করে যাচ্ছিল। কাজটা যে খুব সুষ্ঠু হল তাও নয়। আঁচল কোমরে জড়িয়ে বাঁধতে গিয়ে বারবার বাতাসীর মুখের দিকে চাইতে হচ্ছিল তাকে আর চোখ বুজে ফেলছিল সে।

এবার সাবধানে ডোবার ঘাটে নাম।

নাবব? পড়ে যাব যে! আর পড়লেই—

বৃষ্টিতে ভিজে এখন বরুণ মিদ্দারের অবস্থাও ভাল নয়। হাঁফের টান চৌগুণে উঠেছে। তবু গর্জন করল, নাম বলছি। মরলে দুজনেই মরব। মরতে ভয় কী রে শালা? ফুর্তি লোটার সময় মনে ছিল না?

ডোবার নাবালে ওই লাশ নিয়ে নামতে গিয়েই ধীরেন বুঝল, আজ মৃত্যু নির্ঘাৎ। এত পেছল মাটি যে দাঁড়ানোই যাচ্ছে না। এক ধাপের পর দ্বিতীয় ধাপেই হঠাৎ পা হড়কে চিত হয়ে পড়ে গেল ধীরেন। বাতাসীর লাশ পড়ল তার ওপর। চোখের পলকে তার গলায় ফাঁসটা টাইট হয়ে গিয়েছিল বটে, কিন্তু হঠাৎ সেটা ফের আলগাও হয়ে গেল।

হাঁচোড়-পাঁচোড় করে মাথা তুলেই ধীরেন দেখল, বরুণ মিদ্দারও পড়ে গেছে জলে। হাতে ফাঁসের হাতলটা নেই। সাদা মুখ, বড় বড় চোখ, হাঁ করে শ্বাস টানতে টানতে উঠতে চেষ্টা করছে। ধীরেন দেখল, এই সুযোগ। এক মুহূর্ত দেরি না করে সে বরুণ মিদ্দারের মাথাটা ধরে চেপে দিল জলের তলায়। হাত পা ছুড়েছিল বটে মিদ্দার। আঁকুপাঁকু করেছিল। কিন্তু এক মিনিটও নয়। জলের তলায় স্থির হয়ে গিয়েছিল সে। গলার ফাঁসটা খুলতে ভুলে গিয়েই ধীরেন জল ভেঙে ছুটতে শুরু করেছিল।

সকল অধ্যায়
১.
প্রথম অধ্যায়
২.
দ্বিতীয় অধ্যায়
৩.
তৃতীয় অধ্যায়
৪.
চতুর্থ অধ্যায়
৫.
পঞ্চম অধ্যায়
৬.
ষষ্ঠ অধ্যায়
৭.
সপ্তম অধ্যায়
৮.
অষ্টম অধ্যায়
৯.
নবম অধ্যায়
১০.
দশম অধ্যায়
১১.
একাদশ অধ্যায়
১২.
দ্বাদশ অধ্যায়
১৩.
ত্রয়োদশ অধ্যায়
১৪.
চতুর্দশ অধ্যায়
১৫.
পঞ্চদশ অধ্যায়
১৬.
ষোড়শ অধ্যায়
১৭.
সপ্তদশ অধ্যায়
১৮.
অষ্টাদশ অধ্যায়
১৯.
ঊনবিংশ অধ্যায়
২০.
বিংশ অধ্যায়
২১.
একবিংশ অধ্যায়
২২.
দ্বাবিংশ অধ্যায়
২৩.
ত্রয়োবিংশ অধ্যায়
২৪.
চতুর্বিংশ অধ্যায়
২৫.
পঞ্চবিংশ অধ্যায়
২৬.
ষড়বিংশ অধ্যায়
২৭.
সপ্তবিংশ অধ্যায়
২৮.
অষ্টাবিংশ অধ্যায়
২৯.
ঊনত্রিংশ অধ্যায়
৩০.
ত্রিংশ অধ্যায়
৩১.
একত্রিংশ অধ্যায়
৩২.
দ্বাত্রিংশ অধ্যায়
৩৩.
ত্রয়োত্রিংশ অধ্যায়
৩৪.
চতুর্ত্রিংশ অধ্যায়
৩৫.
পঞ্চত্রিংশ অধ্যায়
৩৬.
ষট্ত্রিংশ অধ্যায়
৩৭.
সপ্তত্রিংশ অধ্যায়
৩৮.
অষ্টত্রিংশ অধ্যায়
৩৯.
ঊনচল্লিশ অধ্যায়
৪০.
চল্লিশ অধ্যায়
৪১.
একচল্লিশ অধ্যায়
৪২.
দ্বিচল্লিশ অধ্যায়
৪৩.
ত্রিচল্লিশ অধ্যায়
৪৪.
চতুর্চল্লিশ অধ্যায়
৪৫.
পঞ্চচল্লিশ অধ্যায়
৪৬.
ষট্চল্লিশ অধ্যায়
৪৭.
সপ্তচল্লিশ অধ্যায়
৪৮.
অষ্টচল্লিশ অধ্যায়
৪৯.
ঊনপঞ্চাশ অধ্যায়
৫০.
পঞ্চাশ অধ্যায়
৫১.
একান্ন অধ্যায়
৫২.
বায়ান্ন অধ্যায়
৫৩.
তিপ্পান্ন অধ্যায়
৫৪.
চুয়ান্ন অধ্যায়
৫৫.
পঞ্চান্ন অধ্যায়
৫৬.
ছাপ্পান্ন অধ্যায়
৫৭.
সাতান্ন অধ্যায়
৫৮.
আটান্ন অধ্যায়
৫৯.
ঊনষাট অধ্যায়
৬০.
ষাট অধ্যায়
৬১.
একষট্টি অধ্যায়
৬২.
বাষট্টি অধ্যায়
৬৩.
তেষট্টি অধ্যায়
৬৪.
চৌষট্টি অধ্যায়
৬৫.
পঁয়সট্টি অধ্যায়
৬৬.
ছেষট্টি অধ্যায়
৬৭.
সাতষট্টি অধ্যায়
৬৮.
আটষট্টি অধ্যায়
৬৯.
ঊনসত্তর অধ্যায়
৭০.
সত্তর অধ্যায়
৭১.
একাত্তর অধ্যায়
৭২.
বাহাত্তর অধ্যায়
৭৩.
তিয়াত্তর অধ্যায়
৭৪.
চুয়াত্তর অধ্যায়
৭৫.
পঁচাত্তর অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%