শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
কিছু বুঝতে না পেরে মোনার মুখের দিকে চেয়ে থেকে অমল বলল, বিছানায় কন্ডোম কী করে এল তা আমি কী করে জানব?
মোনা ফুঁসছিল, চাপা হিংস্র গলায় বলল, তুমি ছাড়া কে জানবে? হোয়েন উই ওয়্যার অ্যাওয়ে, তখন তুমি এই ফ্ল্যাটে একা ছিলে। জবাব তো তোমারই দেওয়ার কথা।
অমল অসহায়ভাবে মাথা নেড়ে বলল, আমি জানি না।
এত নীচে তুমি নামতে পারলে? তোমার যদি মেয়েমানুষের দরকার ছিল তাহলে তুমি তো তাদের কাছেই যেতে পারতে! আমার বেডরুমে, আমাদের বিছানায় বাইরের মেয়ে নিয়ে আসতে তোমার ঘেন্না হল না?
অমলের ঘোলা মাথায় যেন জল ঢুকে আছে। বোধবুদ্ধি কাজ করছে না। সে শুধু অবাক হয়ে বলতে পারল, আমি! আমি! তুমি কি আমাকে সন্দেহ করছ মোনা?
সেটা কি অন্যায়? সবাই জানে তুমি লম্পট, কিন্তু তা বলে বেডরুমের স্যাংটিটিটাও বজায় রাখবে না এটা কীরকম?
লম্পট কথাটা তার মাথার মধ্যে দুম দুম করে দেয়ালে দেয়ালে হাতুড়ি মারছে। চরিত্র নিয়ে তার তো বড়াই করার কিছুই নেই। এই আক্রমণের সামনে বুক ফুলিয়ে দাঁড়াবেই বা কী করে সে? অমল তাই গুটিয়ে যেতে লাগল নিজের মধ্যে। মানুষ পুরোপুরি গুটিপোকা হতে পারে না কখনও। দুর্গ নেই, প্রাকার নেই, পরিখা নেই তার। অনায়াসে আক্রান্ত আর পর্যুদস্ত হওয়া ছাড়া তার কীই বা করার আছে! অমল তবু মাথা নেড়ে মৃদু স্বরে বলে, আমি কিছু করিনি মোনা। আমি কিছুই করিনি…
তা হলে কে ঢুকেছিল বেডরুমে? আর কারও তো অ্যাকসেস নেই। বেডরুমে চাবি দেওয়া থাকত। চাবি ছিল শুধু তোমার কাছে। এই জিনিসটা কি তাহলে উড়ে এল বিছানায়?
বেডরুমের খবর আমার জানা নেই। আমি ও-ঘরে একদিনও ঢুকিনি। চাবিটা খুঁজে পেতাম না। বাইরের ঘরে ডিভানটায় পড়ে থাকতাম।
অ্যান্ড দ্যাটস এ লাই। তোমার চোখ বলছে তুমি মিথ্যে কথা বলছ।
তার জীবনের স্থির ও নির্দিষ্ট মহিলাটির চোখে চোখ রাখতে পারছিল না অমল। আজকাল তার এই একটা রোগ হয়েছে, কারও চোখের দিকেই স্পষ্ট তাকাতে পারে না। অস্বস্তি হয়, ভয়-ভয় করে। চোখ নামিয়ে নিয়ে সে মৃদুস্বরে বলল, তোমার সন্দেহ হলে তুমি বাসুদেবকে জিজ্ঞেস করতে পার।
বাসুদেব বাড়ির চাকর। টাকা দিলেই তাকে ম্যানেজ করা যায় বা একবেলা ছুটি দেওয়া যায়। বুঝেছ? তা ছাড়া ওকে জিজ্ঞেস করাটা বিলো মাই ডিগনিটি।
যুক্তিটা অকাট্য। বাড়ির চাকরকে বাবুর চরিত্র নিয়ে জেরা করা যায় না।
অমল একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। চরিত্র জিনিসটার কোনও মূল্য আছে বলে তার কখনও মনে হয়নি। আজকাল কেউ বড় একটা মূল্য দেয়ও না। তবে লুকোছাপা যখন আছে তখন ধরে নিতে হবে চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন এখনও লোপাট হয়ে যায়নি।
ও-ঘরে সোহাগ কম্পিউটার নিয়ে বসে তার ই-মেল চেক করছে। কম্পিউটারে বসলে তার বাহ্যজ্ঞান থাকে না। দরজাটাও ভেজানো। তবু হয়তো একটা দুটো কথা কানে চলে গেছে। তার চেয়েও ভয়াবহ হল, ঘটনাটা মোনা হয়তো ছেলেমেয়ের কাছে বলেই দেবে। আজকাল তার প্রতিশোধস্পৃহা বেড়েছে।
একটু বাথরুমে যাওয়া দরকার। এক কাপ চা খাওয়ার ইচ্ছে ছিল। দু-একটা টেলিফোন করলে ভাল হয়। অমল এসব মৃদু প্রয়োজনগুলিকে আমল না দিয়ে দরজার দিকে যেতে যেতে অনির্দিষ্টভাবে যেন পঞ্চভূতকে বলল, আমি একটু বেরোচ্ছি।
চাপা গলায় মোনা বলল, হ্যা যাও। আর ওসব ব্যাপার বাইরেই মিটিয়ে এসো।
একটু দাড়িয়ে অমল ফের এগোতে যাচ্ছিল।
মোনা মৃদু স্বরে বলল, মিথ্যেবাদী কোথাকার! বেডরুমে ঢোকেনি। তাহলে জামাপ্যান্ট কোথায় পেলে? ওয়ার্ডরোব তো আমাদের বেডরুমে।
অমল দরজার কাছ থেকে ফিরে বলল, তুমি ভুলে যাচ্ছ, বুডঢার ওয়ার্ডরোবেও আমার কয়েকটা জামাপ্যান্ট রাখা আছে।
তুমি বেডরুমে ঢুকতে না কেন?
চাবিটা কোথায় রাখতাম মনে পড়ত না। মাঝেমধ্যে এমনিতেই তো আমি ডিভানে শুই। আফটার এ ফিট ড্রিংকস।
তুমি মিথ্যেবাদী। ইউ আর লায়িং।
শোওয়ার ঘরে কন্ডোম, এ রহস্যকাহিনীর ভিলেন বানিয়ে এখন তাকে আরও কয়েকদিন ছিবড়ে করে ছাড়বে মোনা। তার কিছুই করার নেই। নানা প্রত্যাশিত ও অপ্রত্যাশিত সময়ে শব্দভেদী বাণে বিদ্ধ হতে হবে তাকে। আজকাল তার অনুভূতি ভোঁতা হয়ে যাচ্ছে, মান অপমানের বোধও কমে গেছে অনেক। তবু মোনা যখন তাকে আক্রমণ করে তখন তার বুকের মধ্যে দমাস দমাস শব্দ হয়। মনে হয়, দুম করে হার্ট অ্যাটাক হয়ে যাবে।
কান মাথা দুটোই এখন ঝাঁ ঝাঁ করছে। গরম আর অস্থির লাগছে ভীষণ। বুকের মধ্যে সেই অদ্ভুত শব্দ। মাথা নিচু করে সে হলঘরে বেরিয়ে এল।
বাইরের হলঘরটা খুব বড়। ইংরেজি এল অক্ষরের মতো। খাঁজের অংশটায় কম্পিউটারের সামনে ঝুঁকে বসে আছে সোহাগ। মগ্ন। এ সময়ে ওর বাহ্যজ্ঞান থাকে না। ইন্টারনেট এক সাংঘাতিক নেশা। হেরোইনের চেয়ে কম মারাত্মক নয়। ওরা ভাইবোন রাতের পর রাত জেগে সার্ফিং আর চ্যাট করে। টেলিফোনের বিল বেড়ে যায়।
অমল নিঃশব্দে গাড়ির চাবিটা নিয়ে বেরোতে যাচ্ছিল, হঠাৎ সোহাগ মুখ ফিরিয়ে বলল, তোমরা কি এতক্ষণ ঝগড়া করছিলে?
থতমত খেয়ে অমল বলে, না তো।
বিরক্তির গলায় সোহাগ বলল, ওখান থেকে ফিরে আমার মনটা এখনও ভাল আছে। দয়া করে আমার মনটা আবার চটকে দিয়ো না। তোমরা যত ঝগড়া পাকাবে তত আমার মনটা বিগড়ে যাবে। আজকাল তোমাদের ঝগড়া আমি সহ্য করতে পারি না।
অমল আত্মপক্ষ সমর্থনের মতো কোনও কথাই খুঁজে পাচ্ছিল না। একবার গলাখাঁকারি দিল। মুখ একবার খুলে ফের বন্ধ করে ফেলল। না, কথা দিয়ে শুধু কথা দিয়ে আজকাল সে কাউকেই কিছু বোঝাতে পারে না। বোঝানোর কিছু নেই তার।
তোমাদের মধ্যে কেন যে এত আকচাআকচি হয় বুঝি না বাবা। বাচ্চাদের মতো ঝগড়া করো কেন? কী হয় তোমাদের? ইগো প্রবলেম?
সোহাগ যদি মোনার কথাগুলো শুনে থাকে তবে ভারী লজ্জার কথা। অমলের ভিতরে একটা হিজিবিজি অনুভূতি পাকিয়ে উঠছে। মাথার ভিতরে অদ্ভুত সব পাগলাটে ভাব আসছে। আজকাল তার সন্দেহ হয়, পাগল হয়ে যাচ্ছে কিনা।
সে আর দাঁড়াল না। বেরিয়ে লিফট ধরে নেমে এল নীচে।
চমৎকার সিলভার গ্রে রঙের দামি গাড়ি তার। গায়ে ধুলোর আস্তরণ পড়ে আছে।
গাড়িতে উঠে স্টিয়ারিং হুইলের সামনে ঝুম হয়ে কিছুক্ষণ বসে থেকে মাথাটা স্বাভাবিক হওয়ার জন্য অপেক্ষা করল সে। মাথার ভিতরে ঘূর্ণিঝড়ে যেন নানা কুটোকাটা, ধুলোবালি, আবর্জনা পাক খাচ্ছে। পূর্বাপর কিছু মনে পড়ছে না তার। কান গরম, মাথা গরম, ঘাড়ে তীব্র ব্যথা। সে কি অজ্ঞান হয়ে যাবে! ভীষণ ঘাম হচ্ছে যে তার!
কোনওরকমে কাঁপা হাতে চাবি ঢুকিয়ে গাড়ি স্টার্ট দিয়ে সে এ-সি মেশিনটা চালু করে দিল। কিন্তু তেলের কাটা নেমে এসেছে প্রায় ‘ই’-এর ঘরে। তার মানে তেল ফুরিয়ে এসেছে। অথচ যাওয়ার আগের দিন সন্ধেবেলা সে দশ লিটার তেল নিয়েছিল গাড়িতে। ভ্রূ কুঁচকে সে চেয়ে রইল ড্যাশবোর্ডের দিকে। এ-সি বন্ধ হয়ে যাবে। তেলের কাঁটা নেমে যাচ্ছে।
স্টার্ট বন্ধ করে জানালার কাচটা নামানোর জন্য হাত বাড়িয়েছিল সে। না, থাক। বাইরের শব্দ আসবে। গায়ের সোয়েটারটা ছেড়ে জামার কয়েকটা বোতাম খুলে দিল এবং এটুকু করতেই যেন ভীষণ পরিশ্রম হল তার। মাথাটা পিছনে হেলিয়ে চোখ বুজে বসে রইল অমল। ঘাম হচ্ছে, বড্ড ঘাম হচ্ছে তার। অল্প অল্প শ্বাসকষ্ট হচ্ছে। ঘাড়ে পিন ফোটার মতো যন্ত্রণা। মাথায় ঘূর্ণিঝড়। বুকে হাতুড়ির ঘা।
মরে যাচ্ছে নাকি? মরে যাওয়ার কথা মনে হতেই সে হাত বাড়িয়ে দরজায় হাতলটা ঘোরানোর চেষ্টা করল। কিন্তু দরজার হাতলটা অবশ হাতে খুঁজেই পেল না। কাচ নামানোর একটা ব্যর্থ চেষ্টা করতে গিয়ে তার অসহায় ভারী হাতটা ঝুলে পড়ে গেল। এভাবেই মরে যায় মানুষ? এত আচমকা! এত তুচ্ছভাবে? একটা অন্ধকার নেমে এল চোখে, চেতনায়। সব মুছে গেল।
ঘরদোর সারতে সারতে অনেক রাত হয়ে গেল মোনার। বাড়িতে না থাকলে যে কত অগোছালো হয়ে যায় সব কিছু! বিছানার চাদর, বেডকভার, বালিশের ওয়াড় সব বদলাতে হল। কী ঘেন্না!কী ঘেন্না! এই বিছানায় রাতে শুতে হবে ভাবতেও তার বমি আসছিল। বাড়িতে গঙ্গাজল নেই। থাকলে তাও একটু ছিটিয়ে দিত মোনা।
কাজকর্ম শেষ করে যখন ঘড়ি দেখল মোনা তখন রাত সাড়ে দশটা বাজে। কম্পিউটারের সামনে এখনও ধ্যানস্থ হয়ে বসে আছে সোহাগ। বুডঢা বেরিয়েছিল, ফিরে এসে তার ঘরে বসে কার সঙ্গে যেন আধঘণ্টা ধরে টেলিফোনে কথা বলে যাচ্ছে। বাসুদেব রান্না শেষ করে ডাইনিং টেবিলে সব সাজিয়ে রাখছে। অমল এখনও ফেরেনি।
ঘড়ির দিকে চেয়ে একটু ভ্ৰূ কোঁচকাল মোনা। অমল এত রাত অবধি বাইরে থাকেনা। পার্টি বা কাজ থাকলে অন্য কথা। কিন্তু স্বাভাবিক নিয়মে নয়। আজ অবশ্য রাগ করে গেছে। রাগ! না, ভুল হল। আজকাল অমল বিশেষ রাগ-টাগ করে না। কেমন নেতিয়ে যায়।
এবার যন্ত্রটা বন্ধ করো সোহাগ। খিদেতেষ্টাও নেই নাকি? বিকেলে তো কিছুই খেলে না।
সোহাগ তার গভীর অন্যমনস্ক মুখটা একবার তার মায়ের দিকে ফিরিয়ে বলল, খাব।
ব্যস! খাব বললেই হবে? হাত মুখ ধোও। আজ আমার একটু বিশ্রাম দরকার। ওঠো।
উঠছি মা। পাঁচ মিনিট।
বুডঢার ঘরে পর্দা সরিয়ে উকি দিল মোনা।
আর কতক্ষণ কথা বলবে? খেতে দিয়েছে। এসো।
হাত তুলে মাকে চুপ করতে বলে টেলিফোনে কথা কইতেই থাকে বুডঢা।
বাথরুমে ঢোকার আগে ফের ঘড়িটার দিকে তাকাল মোনা। পৌনে এগারোটা। সামান্য ভ্রূ কোঁচকাল সে। পৌনে এগারোটা! অমল ফেরেনি এখনও!
বাথরুমে মোনার একটু সময় লাগে। গিজারের গরম জলে ভাল করে স্নান করল আজ। যখন বেরোল তখন ফের ঘড়ির দিকে চোখ গেল তার। সোয়া এগারোটা।
ডাইনিং টেবিলে খেতে বসেছে বুডঢা আর সোহাগ।
বুডঢা বলল, বাবা কোথায় মা?
কী জানি। সন্ধেবেলা তো বেরোল। বুঝতে পারছি না।
এগারোটা তো বেজে গেছে মা।
মোনা একথাটার কোনও জবাব দিল না। সামান্য দুশ্চিন্তা হচ্ছে তার। এত রাত করার কথা তো নয়!
সোহাগ হঠাৎ বলল, এখনই টেনশন করার দরকার নেই। আরও দশ পনেরো মিনিট দেখা যাক।
বুডঢা বলল, তারপরও যদি না ফেরে?
ফিরবে না কেন? নিশ্চয়ই ফিরবে। তোমরা খাও। কথাটা বলল বটে মোনা, কিন্তু গলায় কোনও জোর পেল না।
সোহাগ সামান্য বিরক্ত গলায় বলল, তোমরা কী নিয়ে আজ ঝগড়া করছিলে বলো তো।
মোনা ফুঁসে উঠে বলে, তা দিয়ে তোর কী দরকার?
তোমাদের মধ্যে যে কেন এত ঝগড়া হয় তা বুঝতে পারি না।
তোর বুঝে দরকার নেই। যখন আমার মতো অবস্থায় পড়বি তখন বুঝবি।
শোওয়ার ঘরে এসে মোনা বিছানায় বসে একটু হাঁফ ছাড়ল। উদ্বেগ বাড়ছে। ঘড়ির কাঁটা সাড়ে এগারোটা পেরিয়ে যাচ্ছে। অমল ফিরছে না।
বাসুদেব এসে দরজায় দাঁড়াল, খাবেন না বউদি?
খাব। তোমার বাবু কোথায় গেলেন বলো তো!
আমি তো সাতটায় ফিরেছি। বাবু তো তার আগেই বেরিয়ে গেছেন।
নীচে গাড়ি আছে?
হ্যাঁ। গাড়ি নেননি তো।
আচ্ছা, ঠিক আছে, একবার দরোয়ানদের জিজ্ঞেস করে এসো তো বাবুকে তারা কোন দিকে যেতে দেখেছে।
ঠিক আছে। বলে চলে যাচ্ছিল বাসুদেব।
মোনা তাকে ডেকে বলল, থাক, ওদের জিজ্ঞেস করে লাভ নেই। আমার খাবারটা একটু পরে দিও।
আচ্ছা।
রাত বারোটায় বুডঢা এসে দরজায় দাঁড়াল।
মা।
ডিমলাইটটা জ্বেলে চোখে হাতচাপা দিয়ে একটু শুয়েছিল মোনা। শরীর পরিশ্রান্ত বলে একটু তন্দ্রার মতোও এসে গিয়েছিল।
চমকে উঠে বলল, এসেছে?
না মা, বাবা এখনও আসেনি। উই মাস্ট ডু সামথিং।
কী করা যায়?
কোথায় যেতে পারে বলে মনে হয় বলো তো! টেলিফোন করে দেখতে পারি।
মোনা একটু চিন্তা করে বলল, সেটা একটা বিশ্রী ব্যাপার হবে না? লোকে কী ভাববে? তোর বাবার
তো কলকাতায় তেমন বন্ধু বা আত্মীয়ও কেউ নেই।
চুপ করে তো বসে থাকা যায় না। হাসপাতাল বা লালবাজারে খোজ নেব?
রাত বারোটা বাজে, না?
হ্যাঁ মা।
মোনা উঠে ড্রয়িংরুমে এসে এ-ঘরের ঘড়িটাও দেখল।
সোহাগ এখনও কম্পিউটারের সামনে বসে আছে। তবে কম্পিউটার অন্ধকার।
লেক-এর ধারটা দেখে আসব না?
মোনা অন্যমনস্ক চোখে ছেলের দিকে চেয়ে বলে, লেক! এত রাতে কি আর সে লেক-এর ধারে বসে। থাকবে? এই ঠান্ডায়!
কিছু তো করা উচিত। বারোটা বেজে দশ মিনিট।
ভাবছি কোথাও গিয়ে ড্রিংক করে পড়ে আছে কি না।
বুডঢা মাথা নেড়ে বলে, বাবা তো বাইরে ড্রিংক করে না কখনও!
আজ রাগ করে গেছে।
রাগ করে কেন?
সামান্য একটু রাগারাগি করেছিলাম।
সোহাগ চুপ করে বসেছিল এতক্ষণ। এবার মুখ ফিরিয়ে বলল, তোমার গলা আমি এখান থেকে শুনতে পাচ্ছিলাম। ও-ঘরের দরজা বন্ধ থাকা সত্ত্বেও।
মোনা গম্ভীর হয়ে বলল, রাগ করার যথেষ্ট কারণ ছিল বলেই করেছি। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ওরকম হতেই পারে। আমাকে উপদেশ দিয়ো না।
স্বামী-স্ত্রী হলেই বুঝি ঝগড়া হবে। জেঠিমা আর জেঠুর মধ্যে তো হয় না! এতদিন থেকে এলাম সেখানে একদিনও তো তাদের ঝগড়া শুনিনি।
ওদের সঙ্গে আমার তুলনা করছ? তোমার লজ্জা করে না?
কেন, লজ্জা কীসের? তুলনা করলে কি তোমার প্রেস্টিজে লাগে নাকি?
তোমার জেঠুর ব্যক্তিত্ব বলে কিছু নেই। হি ইজ ডোমিনেটেড বাই হিজ ওয়াইফ। ওদের স্ত্রৈণ বলে।
বাঃ, বেশ কথা তো! ব্যক্তিত্ব থাকা মানেই বুঝি ঝগড়ুটে হওয়া! ব্রাভো!
শোনো সোহাগ, তুমি যদি আর বাড়াবাড়ি করো তাহলে কিন্তু আমি তোমার চুলের মুঠি ধরে গালে চটাস চটাস করে থাপ্পড় মারব। একেই টেনশন হচ্ছে, তার ওপর…
বুডঢা তাড়াতাড়ি এসে মাকে ধরল, হোয়াই সো অ্যাগ্রেসিভ মা? কাম ডাউন!
শুনছিস না কী বলছে!
শুনছি। কিন্তু এটা হেস্টি হওয়ার সময় নয়। ইট ইজ অলরেডি টুয়েন্টি পাস্ট টুয়েলভ। এবার আমাদের কিছু করা উচিত।
কী করবি তোরা ঠিক কর। আমি কিছু ভাবতে পারছি না।
তুমি বরং একটু ঠান্ডা জল বা কোল্ড ড্রিংস খাও। মাথা ঠান্ডা করো।
শোওয়ার ঘরে যেতে যেতে মোনা চাপা গলায় বলছিল, একটা লম্পট, চরিত্রহীন লুম্পেন আমাকে ভাজাভাজা করে খেল। ডিসগাস্টিং!
সোহাগ চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়ল।
কোথায় যাচ্ছিস দিদি?
ছাদে।
এত রাতে ছাদে?
মাথা গরম লাগছে।
তুই ছাদে! মা বেডরুমে! আমি একা কী করব বল তো! বাবার যে কী হল।
পারহ্যাপস হি হ্যাজ কমিটেড সুইসাইড। এবাড়িতে এরকমই একটা কিছু হওয়ার কথা।
যাঃ, কী যা তা বলছিস!
লিভিং টুগেদার ইজ অ্যান আর্ট বুডঢা। আর আমরা সেটাই শিখিনি।
রেগে যাচ্ছিস কেন? লেট আস টক অ্যান্ড সর্ট আউট দি থিংস। বাবা কটার সময় বেরিয়েছে?
ঠিক জানি না। ঘড়ি দেখিনি। পাঁচটার পর।
কিছু বলে যায়নি?
না। হি জাস্ট লেফট।
পোশাক?
যেটা পরনে ছিল। পোশাক ছাড়ার আগেই দে হ্যাড দি ফাইট।
খুব ভায়োলেন্ট কিছু?
দে আর অলওয়েজ ভায়োলেন্ট।
কী নিয়ে ঝগড়া শুনেছিস?
সোহাগ একটু ভেবে মাথা নেড়ে বলল, না। বেডরুম কথাটা কানে এসেছিল। দে পিকাপ এভরিথিং অ্যান্ড এনিথিং ফর এ ফাইট।
বুডঢার বয়স এখনও যোলো পূর্ণ হয়নি। তার মুখশ্রীতে এখনও নাবালকত্বের ছাপ। চোখ দুটো একটু ছলছল করছে। অসহায়ভাবে বলল, ইট ইজ টুয়েলভ থার্টি অলরেডি। কী করব বল তো!
সোহাগ গোঁজ মুখে কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, বাবাকে আমার খুব সিক মনে হয়েছিল।
শোওয়ার ঘরের দরজা খুলে হঠাৎ মোনা বেরিয়ে এসে বলল, ডোরবেলের শব্দ শুনলাম না?
বুডঢা মাথা নাড়ল, না মা। অন্য কোনও ফ্ল্যাটের আওয়াজ।
ডাইনিং টেবিলেই একটা চেয়ার টেনে ক্লান্ত মোনা বসে পড়ল, ফের বর্ধমানে ফিরে যায়নি তো।
বুডঢা বলে, দুর! কী যে বলো! দিদি বলছে বাবাকে সিক দেখাচ্ছিল। আমি ভাবছি রাস্তায় অজ্ঞান-টজ্ঞান হয়ে পড়ে গেল কি না।
কপালটা ডান হাতের দু আঙুলে চেপে ধরে মোনা বলে, আমার মাথা ছিঁড়ে পড়ছে যন্ত্রণায়।
তুমি শুয়ে থাকো না!
তোরা কী করবি?
বাসুদেব টেবিল পরিষ্কার করছিল। বলল, কিছু ভাববেন না বউদি, আমি নীচে নেমে আশেপাশে খোঁজ নিয়ে আসছি।
বুডঢা বলল, আমিও যাচ্ছি। চলো। দিদি, তুই যাবি?
হ্যাঁ।
মোনা বলল, বাসুদেব, থাক এখন থাক। তাড়াতাড়ি যাও।
তিনজন বেরিয়ে যাওয়ার পর মোনা বেডরুমে এল। লকার থেকে কন্ডোমের প্যাকেটটা বের করল। খুবই শস্তা, দিশি ব্র্যান্ড। এ-জিনিস নিশ্চয়ই কোনও অভিজাত বা রুচিশীল মানুষ ব্যবহার করবে না।
প্যাকেটটা হাতে নিয়ে সে ভাবতে লাগল।
বিলিয়ার্ড টেবিলে একটা বলের সঙ্গে আর একটা বলের ধাক্কা লাগল। মৃদু টক করে একটা শব্দ। একটা বল গড়িয়ে গিয়ে আরও দুটো বলকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিল দু ধারে। টক টক। দুটো বল গড়িয়ে গিয়ে ধাক্কা মারল আরও দুটো করে বলে। টক টক টক টক। তারপর বলগুলো ছোটাছুটি করতে লাগল চারধারে। এ ওকে ধাক্কা মারছে। ও তাকে। সে একে। টকাটক শব্দে জ্বালাতন হয়ে গেল অমল। টেবিল জুড়ে বলের বিশৃঙ্খলা আর টক টক শব্দ। পাগল হয়ে যাওয়ার জোগাড়। কান চাপা দিতে হাত তুলেছিল অমল। কিন্তু হাতটা আটকে যাচ্ছে কোথায় যেন তুলতে পারছে না।
কিন্তু হাতটা তুলবার প্রাণপণ চেষ্টা করতে গিয়েই গভীর আচ্ছন্নতা থেকে চোখ মেলে জেগে উঠল অমল। টের পেল, অসাবধানে সে তার ডান হাতের ওপরেই চেপে বসে আছে।
কোথায় বসে আছে তা বুঝতে একটু সময় লাগল তার। না, সে ঠিক বসেও নেই। একটু কাত হয়ে আছে ডানদিকে। সিটের পাশে তার ঘুমন্ত মাথা গড়িয়ে খাজটায় আটকে রয়েছে। আর তার কানের পাশেই জানালার কাচে শব্দ হচ্ছে টক টক।
খুব ক্ষীণ একটা ডাকও শুনতে পেল সে, বাবা! বাবা!
অমল সোজা হয়ে বসল। গাড়ির ভিতরটা ভ্যাপস, দম বন্ধ করা অবস্থা। সে দরজার লকটা খুলে দিল।
এক ঝটকায় বাইরে থেকে দরজাটা খুলে বুডঢা আর্তস্বরে ডাকল, বাবা! কী হয়েছে তোমার?
কী হয়েছে তা অমলের মনে পড়ল না প্রথমে। কিছুই মনে পড়ল না। বাইরের এক ঝলক ঠান্ডা বাতাসে শ্বাস টানল কিছুক্ষণ। তারপর বলল, কিছু হয়নি।
কিছু হয়নি?
না তো। ঘুমিয়ে পড়েছিলাম বোধহয়।
বাইরে বুডঢার পিছনে সোহাগ, বাসুদেব, তিন-চারজন দারোয়ানকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে লজ্জা পেয়ে অমল বলল, কটা বাজে এখন?
বুডঢা বলল, রাত দুটো।
মাই গড!
আর ইউ অলরাইট?
মাথা নেড়ে অমল বলল, হ্যা, আই ফিল ফাইন।
কী করে গাড়ির মধ্যে ঘুমিয়ে পড়লে তুমি?
জানি না। বুঝতে পারছি না। শরীরটা খারাপ লাগছিল খুব। তারপর আর মনে নেই।
নামতে যাচ্ছিল অমল, বুডঢা ডান হাতটা চেপে ধরে বলল, এসো, ধরছি। আর ইউ রিয়েলি ও কে?
না, অমল ও কে নয়। তার হাত পা ঠিক বশে নেই। দুর্বল লাগছে। মাথা ঘুরছে। তবু সে নামতে পারল।
আমাকে ধরতে হবে না। পারব।
অমল ধীরে ধীরে হেঁটে লিফটে এসে উঠল। কী হয়েছিল তা সে খুব আবছা মনে করতে পারছিল মাত্র। এখনও মাথায় পারম্পর্য নেই। নট ইন অর্ডার।
ফ্ল্যাটের দরজা হাট করে খোলা। ভিতরে সব কটা আলো জ্বলছে। দরজায় দাঁড়িয়েই সে মুখোমুখি মোনাকে দেখতে পেল। ডাইনিং টেবিলে বসে আছে। ও কি বাঘিনীর মতো ডিনারের জন্য বসে আছে। ওর ডিনার কি সে নিজে? তাকেই খাবে বলে ওত পেতে আছে নাকি?
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন