শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
তুমি ভূত নামাতে পারো সুদর্শনদা?
কস্মিনকালেও নয় দিদি।
তবে লোকে যে বলে, তুমি ভূত নামাতে পারো।
লোকের যেমন কথা।
কিন্তু তুমি তো লোককে তাবিজ কবচ দাও শুনেছি। নিলুর দিদিমার নাকি তোমার তাবিজে অর্শ সেরে গেছে!
এই সন্ধেবেলাটায় আজ সুদর্শন এসে একখানা ভাঁজ করা বস্তা পেতে মেঝেতে জড়সড় হয়ে বসেছে পান্নার ঘরে। আজ অমাবস্যা, কুয়াশা, এবং লোডশেডিং-এর এ্যহস্পর্শ। তার ওপর বাড়িতে কেউ নেই। বাবা কোথায় আড্ডা মারছে গিয়ে, মা গেছে বড়মার বাড়িতে। হীরা পরেশ মাস্টারের বাড়ি গেছে পড়তে। ঝপ করে বাতিটা নিবতেই ধক করে উঠেছে পান্নার বুক। এবার কী হবে? সন্ধের পর এমনিতেই ভয়ে তার হাত পা গুটিয়ে আসে। হাতের কাছে আকস্মিক লোডশেডিং-এর জন্য হ্যারিকেন আর দেশলাই থাকে। টর্চ জ্বেলে হ্যারিকেনের সলতে ধরাতে গিয়ে পান্না দেখল তার হাত কাঁপছে। রান্নাঘরে আছে শুধু সুদর্শন। লোকটাকে দেখলেই সে ভূত-ভূত গন্ধ পায়। তাই প্রথমে সুদর্শনকে ডাকেনি সে। কিন্তু এই অলক্ষুণে গাঁয়ে সন্ধের পরেই ঝুপ করে এমন নিশুতি নেমে আসে কেন কে জানে বাবা। আর তার মধ্যেই অন্ধকারে কত রকমের যে বিকট শব্দ হতে থাকে। এই কাক ডাকল, কিংবা প্যাঁচা। গাছে গাছে ভুতুড়ে হাওয়া বয়ে গেল। বাঁশবনে এমন মটমট শব্দ উঠল যেন কেউ বাঁশ ভাঙছে। লোডশেডিংটা এখনই না হলে কি চলত না বাপু?
তবু খানিকক্ষণ লেপ চাপা দিয়ে কান মাথা ঢেকে হ্যারিকেনের আলোয় পড়ার চেষ্টা করছিল পান্না। কিন্তু হঠাৎ পশ্চিমের বন্ধ জানালাটায় এমন শব্দ হল যে বুকের রক্ত হিম হয়ে যায়।
আর না পেরে পান্না উঠে দরজা খুলে চেঁচিয়ে ডাকল, সুদর্শনদা! ও সুদর্শনদা, একটু এসো তো।
সুদর্শন সুকণ্ঠ মানুষ। একটা কালীকীর্তন গাইছিল রাঁধতে রাঁধতে। ডাক শুনে দরজায় এসে দাঁড়াল, কী গো দিদি, ভয় পাচ্ছো নাকি?
সবাই তার ভয়ের কথা জানে। তাই বড্ড রাগ হয়ে যায় পান্নার। বলে, ভয় পাবো না তো কী? একটু এসে বোসা এখানে। আমার পড়া হচ্ছে না।
এই যে যাই। ডালটা নামিয়ে ভাত চাপিয়েই যাচ্ছি।
গ্যাস নিবিয়ে দিয়েই এসো না।
তাই যাচ্ছি দিদি।
সুদর্শন এসে বসে আছে। লোকটা খুব বকাবাজ। কথা কইতে ভালবাসে। তা পান্নার কিছু খারাপ লাগল না। এই গা ছমছমে অন্ধকার সন্ধেবেলায় বরং কথাবার্তাই ভাল।
তাবিজের কথায় লজ্জা পেয়ে সুদর্শন বলল, ও আমার কোনও বাহাদুরি নয় দিদি। পেটের ধান্ধায় নানা জায়গায় ঘুরে বেড়িয়েছি তো, নানা লোকের সঙ্গে মিশতে হয়েছে। এক একজনের কাছ থেকে এক একটা টোটকা শিখেছি। গরিব মানুষদের তো ডাক্তার দেখানো বা ওষুধ কেনার পয়সা থাকে না, টোটকাই ভরসা। তবে ওতে কাজও হয় খুব।
আর কী জানো তুমি?
সুদর্শন মাথা নেড়ে বলে, কিছুই জানি না। পেটে ক্লাস ফাইভের বিদ্যে। তবে টুকটাক অনেক কিছু শিখেছি। পুজোপাঠ জানি, ইলেকট্রিক মিস্ত্রিরির কাজ জানি, খানিক ছুতোরগিরিও করতে পারি। এসব জানলে কি চলে?
ওসব নয়। ভূতপ্রেতের কথা কী জানো?
ওসব তো আজকাল কেউ বিশ্বাসই করতে চায় না মোটে। তোমার বয়সি ছেলেমেয়েরা তো হেসেই উড়িয়ে দেয়।
না বাপু, আমার ওসবে খুব বিশ্বাস। হ্যাঁ সুদর্শনদা, তুমি কখনও দেখেছ?
ওই দেখো, ওসব বললে তো তুমি হাঁ করে গিলবে, তারপর ভয় পাবে, আর তারপর মা ঠাকরুন আমাকে বকবে ভয়ের কথা বলেছি বলে।
আচ্ছা, মাকে বলব না।
কাজ কী তোমার ওসব শুনে? আমাদের মতো তো আর তোমাকে ঘাটে অঘাটে ঘুরতে হবে না। তুমি থাকবে পাকা বাড়িতে, বিজলি বাতির তলায়, ভূতপ্রেত সেখানে সেঁধোয় সাধ্যি কী?
একটা ঘটনা বলোই না বাপু।
ঘটনা কি একটা দিদি? অনেক ঘটনা।
একটা কম ভয়ের গল্প বলো তাহলে। বেশি বিদঘুটে গল্প হলে কিন্তু আমি চেঁচাব।
শুনে সুদর্শন খুব হাসল। বলল, তাহলে শোনো। ভয়-ভয় লাগলে বোলো, থামিয়ে দেবো।
আচ্ছা।
তখন রামপুরহাটে একটা বাড়িতে রান্নার কাজ পেয়েছি। সে খুব বড়লোকের বিরাট বাড়ি। দু-দুটো মহল। অগুন্তি ঘর, কিন্তু লোকজন নেই মোটে। স্বামী-স্ত্রী আর একজন বুড়ো চাকর। ওই বিশাল পুরনো আমলের রাক্ষুসে বাড়িতে আর কেউ থাকে না। কর্তা-গিন্নির বয়স বেশি নয়। চল্লিশের নীচেই। পৈতৃক সম্পত্তি আছে বলে কর্তা চাকরি-বাকরি করেন না। সারাদিন শুয়ে বসেই সময় কাটান। গিন্নিও তাই। পাড়া প্রতিবেশীর সঙ্গে গল্পগাছা করে আর সেজেগুজে বেড়িয়ে-টেড়িয়ে দিব্যি আছেন। সন্ধেরাত্তিরেই খেয়ে-দেয়ে ঘুমিয়ে পড়েন তাঁরা। বুড়ো চাকরটারও একই দশা। তাদের আয়েস আলসেমি দেখে আমার হাসি পেত। কত লোক দু-মুঠো ভাতের জন্য কত হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে, আর এরা তো গায়ে হাওয়া লাগিয়ে আয়ু কাটিয়ে দিচ্ছে। তা যাই হোক, আমি সন্ধেরাত্তিরে ছুটি পেয়ে আমার ঘরটিতে বসে লম্ফ জ্বেলে রামায়ণ মহাভারত এইসব পড়তাম। একটু সুর করে গুনগুন শব্দে কৃত্তিবাসী রামায়ণ পড়েছ কখনও?
না তো!
পড়ে দেখো, ভারী ভাল লাগবে।
এখনও পড়?
হ্যাঁ। আমি আবার তাড়াতাড়ি ঘুমোতে পারি না। রাত জেগে ওসব পড়া আমার অনেক দিনের অভ্যেস।
তারপর বলল।
একদিন বুড়ো চাকরটা আমাকে বলল, ওহে সুদর্শন, এ-বাড়িতে সবাই আগেভাগে শুয়ে পড়ে কেন জানো? আমি বললাম, না তো! সে বলল, এ-বাড়িতে ভূত আছে, রাতের দিকে তারা সব কোনাঘুপচি থেকে বেরিয়ে আসে। সারা বাড়িতে ঘুরে বেড়ায়। তাদের বিরক্ত করা ঠিক হবে না ভেবেই আমরা সবাই ঘুমিয়ে পড়ি। তুমি যে রাতজেগে থাকো এটা কিন্তু ভাল নয়। আমি তার কথা মোটে গায়ে মাখলাম না। বললাম, আমি তো আমার ঘরটিতে বসে বই পড়ি, ভূতেরা তো গোটা বাড়িটাই পাচ্ছে। তা যাই হোক, আমি যেমন রাত জেগে পড়ছিলাম তেমনই পড়তে লাগলাম। দিন কতক পর একদিন রাত জেগে রামায়ণ পড়তে পড়তে হঠাৎ টের পেলাম, আমি ছাড়া ঘরে আরও কে যেন আছে।
ওরে বাবা! সত্যি?
এটা কিন্তু বেশি ভয়ের গল্প নয় দিদি। ভয় পেও না।
আচ্ছা বলো।
টের পেয়ে গা-টা কেমন শিরশির করে উঠল। ঘাড়টা শক্ত হয়ে গেল, হাত পায়ে খিল-ধরা অবস্থা। গলাটাও ফেঁসে গিয়ে কেমন বেসুর ফাঁপা ফাঁপা স্বর বেরোচ্ছে। প্রথম অভিজ্ঞতা তো!
তুমি তবু চেঁচাওনি?
না দিদি। চেঁচিয়ে লাভ কী? বিরাট বাড়ির আর এক প্রান্তে একটেরে একখানা ঘরে ছিলাম, চেঁচালেও কেউ শুনতে পেত না। তা ছাড়া বিপদে মাথা ঠান্ডা না রাখলে ভুলভাল হয়ে যায়। সব কাজেই তাই বুদ্ধিটা ঠিক রাখতে হয়। এটি গেলেই সর্বনাশ।
তুমি কী করলে?
প্রথম টায় মুখ তুলে চারদিকে তাকাতে সাহস হচ্ছিল না। তবে খানিক বাদে ভাবলাম, ভূতপ্রেত বা চোর-ডাকাত যাই হোক, আমার মতো গরিবকে মেরে তার লাভ কী? আর আমি মরলেও দুনিয়ার তো কিছু যাবে আসবে না। আমার মতো মনিষ্যিরা তো পৃথিবীর জঞ্জাল বই নয়। ভিড় বাড়ানো ছাড়া আমরা কোন কাজে লাগি বলো! এইসব ভেবে মুখ তুলে তাকালাম। লম্ফের আলোয় কিছুই প্রথমটায় ঠাহর হল না। তারপর চোখে পড়ল, বাঁদিকে দেয়াল ঘেঁষে কে যেন অন্ধকারে বসে আছে। থান পরা বিধবা বলেই মনে হচ্ছিল।
বাবা গো!
আগেই ভয় পেও না। চোখেরও তো নানা বিভ্রম হয়। বেশির ভাগ ভূত দেখাই তো ভুল দেখা কিনা। তাই চোখ কচলে ভাল করে চেয়ে দেখলাম।
তোমার দুর্জয় সাহস কিন্তু সুদর্শনদা।
না দিদি, সাহস-টাহস নয়। আমরা হলাম মরিয়া মানুষ। আমাদের জলেও বিপদ, ডাঙাতেও বিপদ। ভয়ডর বগলদাবা করেই তো চলতে হয়। ওটা ঠিক সাহস নয়, ও হল “আয় শালা কে কী করবি” ভাব।
সেটা আবার কী?
জানো না বুঝি? মানুষ যখন খুব ভয় খেয়ে যায়, যখন দেখে আর রক্ষা নেই, এবার গেছি, তখন হঠাৎ তার ভিতরে একটা পাগলাটে ক্ষ্যাপা সাহস হয়। সে তখন ফুঁসে তেড়ে “আয় শালা কে কী করবি” বলে ঘুরে দাঁড়ায়। ওটা সাহস বা বীরত্ব নয়, সাময়িক ক্ষ্যাপামি।
আহা, বিধবার কথাটাই তো চাপা পড়ে যাচ্ছে। তুমি বড্ড অন্য কথায় চলে যাও।
সুদর্শন হেসে বলল, না দিদি, পরিস্থিতিটা বলছি আর কী।
তারপর বলল। তুমি সত্যিই দেখলে?
হ্যাঁ। বেশ অন্ধকার, ঝুঁঝকো মতো আবছায়ায় বিধবা মানুষটি আসনপিঁড়ি হয়ে বসা। গায়ে একটা শালও যেন জড়ানো ছিল। খুব স্থির হয়ে বসা। সেই দেখে আমার বুকের মধ্যে ধপধপ করে যেন হাতির পা পড়তে লাগল। গলা শুকিয়ে কাঠ। শিরদাঁড়া বেয়ে বরফজল নেমে যাচ্ছে যেন। আর হাত পায়ের সে কী ঠকঠক কাঁপুনি!
অজ্ঞান হয়ে গেলে না?
না। হয়তো দাঁতকপাটি লাগত, কিন্তু কী হল জানো?
কী?
বিধবা ঠাকরুন হঠাৎ ডান হাতটা দিয়ে রামায়ণ বইটা দেখিয়ে দিলেন।
ওরে বাবা!
বুঝলাম, ঠাকরুন আমাকে রামায়ণ পড়তে বলছেন।
কিন্তু রাম নাম শুনলে নাকি ভূত পালায়।
ওসব লোকের মনগড়া কথা। রামায়ণে তো কোথাও তেমন কথা পাইনে বাপু। রাম তো আর ভূতের ওঝা ছিলেন না।
তারপর কী হল বলো।
ঠাকরুনের হুকুম মনে করে আমি ফের রামায়ণ পড়ার চেষ্টা করতে গেলাম। দেখলাম ভয়ে গলার স্বর বেরোচ্ছে না, চোখেও আবছা দেখছি। কিন্তু তবু কাঁপতে কাঁপতে ফ্যাঁসফ্যাঁসে গলাতেই পড়তে লাগলাম। আশ্চর্যের কথা হল, কিছুক্ষণের মধ্যে গলা বেশ পরিষ্কার হয়ে গেল, হাত পায়ের ঠকঠকানিও রইল না, শীতভাবটা উধাও হল। আড়চোখে দেখলাম, ঠাকরুন স্থির হয়ে বসে আছেন।
আর ভয় করল না?
না গো দিদি। ভগবানের নাম করছিলাম তো, ভয় কি থাকে? ধীরে ধীরে ভয় উবে গেল। মনে হল ঠাকরুন হয়তো অতৃপ্ত আত্মা, ভগবানের নাম শুনলে জুড়োবেন। তাতে আমারও পুণ্যিই হবে। মনে আছে, পড়া শেষ করে বই বন্ধ করতেই ঠাকরুন উঠে আসনখানা কুড়িয়ে নিয়ে নিরেট দেয়ালের মধ্যে মিলিয়ে গেলেন।
তখন তুমি কী করলে?
কী আর করব, বাতি নিবিয়ে শুয়ে পড়লাম।
ভয় করল না?
না, আর ভয়ের কী? একবার ভয় কেটে গেলে ও আর হয় না। বসন্ত রোগের মতো, একবার হলে আর হয় না। দিব্যি ঘুমোলাম। পরদিন সেই বুড়ো চাকর নিতাইদাকে ঘটনাটা বলতেই সে খুব গম্ভীর হয়ে বলল, খুব বেঁচে গেছ। আজ থেকে আর রামায়ণ পড়ার দরকার নেই, বরং আমার ঘরে এসে শুয়ো।
তাই করলে?
পাগল! আমি বললাম, তা কেন, ঠাকরুন যদি রামায়ণ শুনতে চান তাহলে রোজ শোনাব।
শোনাতে বুঝি?
হ্যাঁ দিদি। রোজ রাতে বসে বসে রামায়ণ পড়তাম আর ঠাকরুন এসে শুনতেন। পড়া শেষ হলে রোজ একইভাবে আসন তুলে নিয়ে দেয়ালের মধ্যে মিলিয়ে যেতেন। আমার ভারী তৃপ্তি হত। মনটা ভরা ভরা লাগত।
তোমার দুর্জয় সাহস সুদর্শনদা!
সুদর্শন লাজুক হাসি হেসে বলল, তুমি ভিতু মানুষ বলে সবচেয়ে কম ভয়ের গল্পটা শোনালাম। ভয় পাওনি তো!
পাইনি মানে! আমার গায়ে কাঁটা দিচ্ছে।
আমি কী ভাবি জানো? ভাবি আমরা যেমন ওরাও তো তেমনই। আমরাও আছি, ওনারাও আছেন। ভগবানের দুনিয়ায় কাকে ফেলা যায় বলল। ঘেয়ো কুকুরটাকে যে সৃষ্টি করলেন তিনি, তারও হয়তো দরকার ছিল। ঘুরে ঘুরে এইসব মনে হয়েছে আমার।
তুমি ওই বাড়িতে কতদিন ছিলে?
তা বছরটাক হবে।
চাকরিটা ছাড়লে কেন?
কোনও জায়গায় বেশিদিন আটকে থাকতে যে আমার ভাল লাগে না। আর কী জানো? তারা ভারী অলস লোক। তাদের আলসেমি দেখে দেখে আমারও যেন শরীরে আলিস্যি আসছিল। কিন্তু তা হলে তো আমার চলবে না। আমাকে তো খেটে খেতে হবে। তাই একদিন পুঁটুলি বগলে করে বেরিয়ে পড়লাম।
তার মানে তুমি আমাদের বাড়িতেও বেশি দিন থাকবে না!
সুদর্শন লাজুক হেসে বলল, তা কী বলতে পারি? এখন বয়স হচ্ছে, বেশি ঠাঁইনাড়া হতে আর ইচ্ছে যায় না।
আর একটা গল্প বলবে?
উপর্যুপরি শোনার দরকার কী? আর একদিন শুনো। আমার যে রান্না পড়ে আছে।
লোকে কিন্তু ঠিকই বলে। তুমি ভূতের বন্ধু। ভূতের সঙ্গে কথা বলল।
বাজে কথা বলে। গাঁয়ের লোকের অন্ধ বিশ্বাস তো। তবে একথা বলতে পারি যে আমার শত্রুও কেউ নয়।
কথা ঘুরিয়ো না সুদর্শনদা, তুমি ভূত পোযো কিনা বলো।
বাপ রে, ভূত কি পোষার বস্তু দিদি? বেড়াল কুকুর তো নন। তাঁরা সবাই মান্যিগন্যি মানুষ, শ্রদ্ধার পাত্র।
একটা সত্যি কথা বলবে?
বলব না কেন?
এ-বাড়িতে ভূত দেখেছ?
না দিদি, এ-বাড়িতে ভূত-টুত কিছু দেখিনি।
আমি ভয় পাবো বলে বলছ না। এ বাড়িতে ভূত কিন্তু আছে।
ও তোমার ভয়-ভয় ভাব থেকে মনে হয়। আর থাকলেই বা কী? চোখের আড়ালে তো রোগের জীবাণুও থাকে। ওই যে টিভিতে ছবি দেখো, রেডিওতে গান শোনো ওসবও তো এই হাওয়া বাতাসেই ঘুরে বেড়াচ্ছে। সাদা চোখে দেখতে পাও কি? যেই টিভি বা রেডিও খুললে অমনই সব ভেসে উঠল। এও তো ভৌতিক ব্যাপারই, তাহলে ভয় পাও না কেন?
দুর, ওসব তো সায়েন্স। ভৌতিক হবে কেন?
ভৌতিক ছাড়া কী বলো। ওসব ছবি গান তো পঞ্চভূতেই মিলেমিশে রয়েছে। ভয় না পেলেই হল।
না বাবা, আমার বড্ড ভয়।
বাইরে থেকে একটা মিষ্টি মেয়েলি গলা ডাকল, এই পান্না।
গায়ের লেপটা ফেলে সটান উঠে বসল পান্না। মুখ উদ্ভাসিত। সোহাগ এসেছে!
সুদর্শন উঠে দরজাটা খুলে দিয়ে এক গাল হেসে বলল, এসো দিদিমনি।
হাই পান্না!
হাই সোহাগ! জানো, এতক্ষণ বসে সুদর্শনদার কাছে একটা ফ্যান্টাস্টিক ভূতের গল্প শুনছিলাম। রিয়াল লাইফ স্টোরি।
সত্যি!
হ্যাঁ। সুদর্শনদার ফার্স্ট হ্যান্ড এক্সপেরিয়েন্স।
সুদর্শন বলল, তোমার যত ভয় দিদি, আর সোহাগ দিদিমনিকে দেখো তো, একটুও ভয়-ডর নেই!
তা বলে ভেবো না যে, আমি ভূতে বিশ্বাস করি না। আই ফিল দেম।
হ্যাঁ ভাই, তোমারও ভীষণ সাহস। আমার না ভীষণ কান্না পায়।
ওমা! কেন?
তোমাদের মতো আমার সাহস নেই বলে। ভয় পেয়ে পেয়ে একদিন আমি ঠিক হার্টফেল হয়ে মরে যাব।
যাঃ। হার্টফেল তোমার হবে না। আমার সঙ্গে কয়েকদিন নাইট অ্যাডভেঞ্চার করো, তাহলে তোমারও ভয়ডর কেটে যাবে।
তোমার সঙ্গে! রক্ষে করো। মরেই যাব।
তোমরা বসে গল্প করো, আমি তোমাদের জন্য কফি করে আনছি। বলে সুদর্শন চলে গেল।
এই সোহাগ বিছানায় উঠে লেপচাপা দিয়ে বোসো।
যাঃ, আমি চটি পরে এসেছি, পায়ে ধুলোময়লা আছে না!
এই শীতে চটি পরে ঘুরছ!
তোমার খুব শীত লাগছে বুঝি?
ভীষণ। লেপের বাইরে হাত রাখতে পারছি না।
বাইরে বেরিয়ে দেখো, অত শীত নেই।
তা হবে হয়তো। আমি সেই বিকেল থেকে লেপচাপা হয়ে আছি। কতক্ষণ আগে বাথরুম পেয়েছে, যাইনি।
তুমি ভীষণ কুনো, তাই না!
হ্যাঁ তো।
এই বাংলাটা সবে শিখেছি।
হ্যাঁ, আজকাল তোমার বাংলায় বেশ গাঁইয়া টানও আছে।
তা হবে না। আমি তো বড়মা, পিসি, দাদু এদের কাছ থেকে শিখি। আজকাল ইংরিজি বলি না। শুধু বুডঢার সঙ্গে বলতে হয়। ও বাংলায় তেমন ফুয়েন্ট নয়।
হ্যাঁ সোহাগ, তোমার চেহারাটাও আজকাল বদলে গেছে।
তাই বুঝি?
আগের মতো রাফ-টাফ ভাবটা নেই তো!
আগে কি রাফ-টাফ দেখাত আমাকে?
একটু লাগত যেন।
আমি বিশেষ বদলে গেছি বলে আমি কিন্তু টের পাই না। মনে হয় যা ছিলাম তাই তো আছি। বরং বদলে গেছে আমার মা আর বাবা।
তাই বুঝি?
হ্যাঁ। দে আর নাউ রিকনসাইলড।
সেটা তো ভীষণ ভাল ব্যাপার। আমার মা বাবার মধ্যে ছাড়াছাড়ির অবস্থা হলে আমি তো পাগলই হয়ে যাব।
সেটা আমারও নিশ্চয়ই ভাল লাগত না। কিন্তু যা হল সেটাও কি ভাল?
ভাল নয়! বলো কী?
মাথা নেড়ে সোহাগ বলল, ব্যাপারটা নরম্যাল হলে কথা ছিল না। কিন্তু কী হল জানো! বাবাকে দেখছি, প্রাণপণে মাকে খুশি রাখতে চেষ্টা করে যাচ্ছে। আগে বাবা যেমন একটু খেয়ালি ছিল, আনমনা ছিল, রিসার্চ নিয়ে ডুবে থাকত সেরকমটা আর নেই। ঠিক কথা, বাবার মনে ব্যালান্স ছিল না, কিন্তু তখন বাবার কিছু ক্রিয়েটিভিটি ছিল। একজন পুরুষ যখন কোনও মহিলাকে খুশি করাটাই টারগেট করে নেয় তখন তার চিন্তার জগৎ ধীরে ধীরে ব্যাঙ্করাপ্ট হতে থাকে। আমার বাবার চোখে আগে একটা গ্লিন্ট দেখতে পেতাম। এখন পাই না।
ঝগড়াটা তো মিটেছে সোহাগ।
হ্যাঁ। আর সেটা মেটাতে গিয়ে বাবার ভিতরটা বোধহয় মরে গেছে। অনেক দিন ধরে ডিপ্রেশন চলছিল বাবার। ডিপ্রেশন মানুষকে পাগল করে তোলে ঠিকই, কিন্তু জিনিয়াসদের ওটা হয়। কারণ তারা সব স্বাভাবিক আচরণের সঙ্গে নিজেদের অ্যাডজাস্ট করতে পারে না।
কী যে বলছ মাথামুণ্ডু আমার মগজে একদম ঢুকছে না।
তাহলে থাক। ওসব শুনে তোমার কাজ নেই।
তুমি পালটে গেছ সোহাগ, টের পাও না?
মুখ টিপে একটু হেসে সোহাগ বলল, সাপ তো মাঝে মাঝে খোলস ছাড়ে।
যাঃ! কী একটা উপমা।
সাপ কিন্তু ভারী সুন্দর একটা জীব। তোমার ভাল লাগে না?
মাগো! সাপের কথা ভাবলেই গা শিরশির করে।
কেন বলো তো! সাপের সারা শরীরেই তো লিরিক। যেমন রঙের কম্বিনেশন তেমনই ব্যালেরিনার মতো শরীরের ঢেউ। যখন ফণা তোলে তখনও মনে হয় ম্যাজিক্যাল। তুমি কি জানো যে সাপ একটা স্পিরিচুয়াল প্রাণী?
কী জানি বাবা, শুধু জানি সন্ধের পর নাম নিতে নেই। আস্তিক মুনি, আস্তিক মুনি, আস্তিক মুনি।
ও কে বাবা, লেট আস ড্রপ দি স্নেক বিট। কাল কি তোমাদের পিকনিক হচ্ছে?
হবে না মানে? সব অ্যারেঞ্জমেন্ট হয়ে গেছে। ফ্রম ব্রেকফাস্ট টু আফটার নুন টি।
অতক্ষণ কি ভাল লাগবে, বলো তো! অনেক লোক থাকবে তো!
আরে তাতে কী? আমরা থাকব আমাদের মতো।
সুদর্শন একটা প্লেটে ফুলকপির বড়া আর কফি নিয়ে এল ট্রেতে করে। বলল, খাও তোমরা। গরম আছে, সাবধানে হাত দিও।
ওঃ, ইউ আর অ্যান এঞ্জেল!
শেষ অবধি লোক বেশি হল না। সোহাগ সবাইকে চেনেও না। সে আর পান্না জোট বেঁধে ছিল। কিছুক্ষণ। তারপর এই উদাস প্রান্তরে একমুঠো বনভূমি আর ছোট্ট একটু নদীর একা বয়ে-যাওয়া তাকে ভারী উদাস করে দিল। মানুষের জটলা কি এখানে মানায়? এখানে সবচেয়ে ভাল একা আসা।
পান্না যখন তার সমবয়সি বন্ধুদের সঙ্গে কথায় মেতে আছে সেই সময়ে টুক করে সরে এল সোহাগ। তারপর ছোটো বনভূমিটি পার হয়ে হাঁটতে লাগল।
পিছন ফিরে দেখতে পেল, ওরা আড়ালে পড়েছে।
একটা ছোট্ট ঢিবি পেরিয়ে সোহাগ পরিপূর্ণ নির্জনতা পেয়ে গেল। সামনে ক্ষেত-খামার। বহু দূর পর্যন্ত সবুজ আর হলুদ।
খুঁজে খুঁজে নদীর ধারে ঘাসের ওপর বসল সে। নদী বলতে শুধুই বালি। ক্ষীণ একটু স্রোত কষ্টে বয়ে যাচ্ছে। জলে নামলে হাঁটু অবধিও হবে না।
তার মন ভাল নেই। কেন ভাল নেই তা সে ভাল বুঝতে পারে না। সে কি বদলে যাচ্ছে?
চুপচাপ অনেকক্ষণ শূন্য মনে ঝুম হয়ে বসে রইল সে।
তারপর তার বুকের ভিতরে একটা আশ্চর্য কথোপকথন শুরু হল। এটা আজকাল হয়। হচ্ছে।
একজন অচেনা পুরুষ বলল, কতদিন পালিয়ে থাকবে তুমি? ধরা তো পড়বেই।
পালাচ্ছি কে বলল? পালাব কেন?
টের পাও না?
না। আমি কখনও পালাইনি। আমি তো ভয় পাই না।
পাও। নিজেকে।
নিজেকেই বা কেন ভয় পাব?
পাও নিজের ভিতরকার সত্যের মুখোমুখি হতে চাও না বলে পাও।
বাজে কথা। যাও তুমি।
যাব! যেতে বলছ?
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন