শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
জলের পাম্পটা খারাপ হয়েছে কাল থেকে। ছাদের ট্যাংকে জল উঠছে না। বাসন্তীর আজকাল অল্পেই ভারী উদ্বেগ হয়। পাম্প খারাপ হওয়া মানে সুমনের বাথরুমে জল আসবে না। তাহলে কী হবে?
জিজিবুড়ি রোজকার মতোই সকালে তার বরাদ্দ চা খেতে এসে রান্নাঘরে ঘাপটি মেরে বসা, বলল, মরণ! পাম্প খারাপ হয়েছে তো কী হয়েছে রে বাপু? গাঁ-গঞ্জের কটা লোকের ঘরে আবার পাম্পের জল ওঠে লা? ওই ধেড়ে ছেলে নীচে নেমে তো টিপকলেই কাজ সারতে পারে। গতরে তো আর শুঁয়োপোকা ধরেনি বাছা। তুই হেদিয়ে মরছিস কেন?
আহা, ওদের শহরে থেকে অভ্যেস। কিছু যদি মনে করে?
তাহলে আর কী, গলবস্ত্র হয়ে গিয়ে পায়ে পড়। যা আদিখ্যেতা করলি অ্যাদ্দিন সতীন পোকে নিয়ে! বলি কারো পাকা ধানে মই তো দিসনি, অমন চোর-চোর হয়ে থাকিস কেন? সতীন পো তো গতরখানাও নাড়ে না। দিন-রাত ফুলবাবুটি হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। আর কত বসিয়ে বসিয়ে খাওয়াবি? পুজোর ছুটি শেষ হয়ে এল, এখনও নড়ার নাম নেই। বলি মতলবখানা কী ওর?
আচ্ছা মা, তোমার মনে এত বিষ কেন বলো তো! এসে আছে দুদিন আমার কাছে, তোমার সহ্য হচ্ছে না কেন? এখানটায় ভাল লাগছে বলেই তো আছে! নাকি! যত্নআত্তি করি যাতে বড়গিন্নির কাছে গিয়ে কুচ্ছো না গায়। একেই তো আমি চক্ষুশূল, সৎ, অযত্ন করলে রক্ষে আছে?
ওরে ভালমানুষের ঝি, তোর বুদ্ধির বলিহারি যাই। গ্যাঁট হয়ে বসে আছে কি এমনি? হিসেব-নিকেশ কষছে, বুঝলি? বাঙাল কত টাকা ঢালছে এখানে, সম্পত্তি কত, জমিজমা কত, সব গিয়ে লাগাবে। আমি তোর জায়গায় হলে তেরাত্তির কাটবার আগেই ঝেঁটিয়ে বিদেয় করতুম। রোখাচোখা না হলে বিষয়সম্পত্তি কেউ রাখতে পারে? বাঙালেরও সাঁট আছে এই বলে দিলুম। একটা ষড়যন্ত্র পাকিয়ে তুলছে।
বাসন্তী রাগ করে বলল, তোমার অত কু গাইতে হবে না মা। সুমন কাল বাদে পরশুই চলে যাবে। আজ ওর বাবা আসবে। মাঝখানে শুধু কালকের দিনটা। কটা দিন ছিল, বড্ড মায়া পড়ে গেছে। কাল যাবে বলে মনটা খারাপও লাগছে। আর তুমি এসে সকালবেলাটায় আমার কানে বিষ ঢালছ। দুনিয়ায় কি ভাল জিনিস কিছু তোমার চোখেও পড়ে না!
ভাল হলে ঠিকই চোখে পড়ত। যাক বাবা, বিদেয় হচ্ছে তাহলে? বাঁচলুম।
কিন্তু বাসন্তীর মনটা খচ খচ করছে। শেষে দুটো দিন পাম্পটা খারাপ না হলেই তো পারত। বর্ধমান থেকে মিস্তিরি আনিয়ে পাম্প সারাতে এখনও তিন-চার দিন লাগবে। মুনিশ দিয়ে ওপরের বাথরুমে জল দেওয়ানো হচ্ছে বটে, কিন্তু তাতে বাসন্তী খুশি হচ্ছে না। পাম্পটা যে কেন খারাপ হল!
সুড়ুক সুড়ুক চা খেতে খেতে জিজিবুড়ি যেন তার মনের কথা টের পেয়ে বলল, তা পাম্প সারানো এমনকী হাতিঘোড়া কাজ। ওই শকুনটা তো রোজ এসে চা বিস্কুট খেয়ে যায়। ওকে বলিস না কেন!
কোন শকুনটা! কার কথা বলছ?
কেন, ধীরেন কাষ্ঠ।
ধীরেন খুড়ো! সে কী করবে?
ওই তো একসময়ে কলকবজা সব সারাত। গাঁয়ে কারও কিছু খারাপ হলে সবাই তো ওকেই ডাকত। সেলাই মেশিন রে, টিপকল রে, সাইকেল রে, ধীরেন না সারাত কী? ওকে বল, ঠিক সারিয়ে দেবে। রোজ এসে গুচ্ছের গিলে যাচ্ছে। ঘাড়ে ধরে কাজ করিয়ে নে। তাতে যদি কিছু শোধবোধ হয়।
বাসন্তী অবাক হয়ে বলে, তাই তো? ছেলেবেলায় ধীরেন খুড়োকে যন্ত্রপাতির থলে নিয়ে ঘুরে বেড়াতে দেখতুম বটে! কিন্তু তুমি সেদিন এমন গালমন্দ করলে যে ধীরেন খুড়ো সেই থেকে আর আসে না। লজ্জা পেয়েছে বোধহয়।
আহা, দু-কান-কাটার আবার লজ্জা! ওর যেদিন লজ্জা হবে সেদিন কাকেরও কোরণ্ড হবে, ধুলায় লুটায়ে যাবে।
কী যে সব বলো না মা।
মরণটাকে পাঠা না ওর কাছে, ধরে নিয়ে আসুক। ছুঁকছুঁকুনি স্বভাব বটে, কিন্তু ধীরেন মিস্তিরি ভাল।
বেলা আটটার মধ্যেই চলে এল ধীরেন কাষ্ঠ।
একগাল হেসে বলল, ডেকে পাঠিয়েছ মা?
বাসন্তী বলল, হ্যাঁ খুড়ো। বড্ড বিপদে পড়েছি। আমাদের পাম্প মেশিনটা খারাপ হয়ে গেছে। দোতলায় জল না উঠলে কী বিপদ বলুন। আজ আবার মরণের বাবাও আসবে।
ধীরেন কাষ্ঠ হাসিটা ধরে রেখেই বলল, পার্টস পুড়ে বা ভেঙে গিয়ে থাকলে নতুন পার্টস লাগবে মা। আর তা না হয়ে থাকলে সারানো কঠিন হবে না।
আপনি বসুন। আগে দুখানা গরম রুটি খেয়ে নিন, তারপর মেশিন দেখবেন।
ধীরেন শশব্যস্তে বলে, তার দরকার নেই মা। সকালে চাট্টি চালভাজা খেয়েছি।
আহা, ভারী তো চালভাজা! রোদে মোড়া পেতে বসুন একটু। ওরে ও মরণ, দাদুকে মোড়াটা পেতে দে বাবা।
আজ রুটিতে বেশ জবজবে ঘি পড়েছে, ঘি গড়াচ্ছে একেবারে। আর মুখে দুখানা বললেও আদতে পাঁচখানা রুটি বেড়ে দিয়েছে বাসন্তী। সঙ্গে ধোঁয়া-ওঠা ফুলকপি আর আলুর তরকারি এক বাটি। কয়েকটা ডুমো ডুমো আলু ভাজা আর কাঁচা লঙ্কা।
একটু ডাল দিই খুড়ো? ফুটন্ত ডাল?
লজ্জা পেয়ে ধীরেন বলে, আবার ডালও দিবি? তা দে একটু। এ যে বেশ গুরুভোজন হয়ে যাচ্ছে রে মা।
খান খুড়ো, আপনাকে খাওয়ালে পুণ্যি হয়। পেট ভরে খান।
তোর মনটা মা, বাঙালের মতোই। বাঙালটাও বড় দিলদরিয়া মানুষ। তোদের দুটিতে মিলেছিস বড় ভাল, তা দে মা, ডালও একটু দে, ডালে ভিজলে রুটি নরম হয়।
ডালও নিয়ে এল বাসন্তী। ঘন সোনা মুগের ডাল। বাটিখানা বেশ বড়ই। ডালেও ঘি ভাসছে।
আরও রুটি লাগলে চাইবেন। লজ্জা করবেন না যেন। আর খুড়ো।
হ্যাঁ মা।
আমার মায়ের কথায় কিছু মনে করবেন না যেন। বুড়ো বয়সে ভীমরতি ধরেছে। তার ওপর আফিং খেয়ে খেয়ে মাথাটাই গেছে একেবারে।
ধীরেন একটু করুণ হেসে বলে, কী জানিস মা, তোর মায়ের মতো অমন লক্ষ্মীমন্ত বউ তখন এ-গাঁয়ে আর একজনও ছিল না। কী চুলের ঢল, প্রতিমার মতো মুখ, কী হাত পায়ের গড়ন! গেলে যত্নআত্তিও করতেন খুব। সেসব দিন কোথায় চলে গেল বল তো! না মা, তোর মায়ের কথায় কিছু মনে করিনি।
আপনি যেমন রোজ আসতেন তেমন আসবেন। বাড়িতে অতিথি-বিথিতি না এলে কি সে বাড়ির লক্ষ্মীশ্রী থাকে? মরণের বাবাও আপনাকে ভারী পছন্দ করে।
সে আর জানি না! আচ্ছা মা, আসব।
আপনার কথা তো মা-ই বলল আমাকে। বলল, ধীরেন ঠাকুরপোকে খবর দে। ঠাকুরপো সব রকম কল-টল সারাতে পারে।
ধীরেন ভারী আপ্যায়িত হয়ে বলে, তা পারতুম মা, এককালে। বাদ্যযন্ত্র থেকে শুরু করে সব রকম কাজই শিখেছিলুম। চর্চার অভাবে এখন ভুলেও গেছি অনেক। তখন তো আর কেউ পয়সা দিত না, বেগার খেটে খেটে মরতে হত।
না খুড়ো, আমি কিন্তু আপনাকে মজুরি দেব। যা লাগবে বলবেন।
মজুরি? তোর কাছ থেকে কি নিতে পারি মা? কত যত্নআত্তি করিস! ও তোকে ভাবতে হবে না।
ধীরেন যত্ন করে খেল। কাঁচালঙ্কাটা বড্ড ঝাল। খেয়ে হেঁচকি উঠে গেল। তবু সেটাও শেষ করল ধীরেন। কিছু ফেলল না।
দেখা গেল, এই বুড়ো বয়সেও ধীরেন কাষ্ঠ কাজ জানে বটে। মাত্র আধঘণ্টা কী যেন খুটখাট করল পাম্পঘরে বসে। পাশে বসে খাপ পেতে দেখছিল মরণ। আধঘণ্টা বাদে সুইচ দিতেই পাম্প চলতে শুরু করল।
হাঁফ ছেড়ে বাঁচল বাসন্তী। পাম্প নিয়ে যে কী উদ্বেগ হচ্ছিল তার বলার নয়।
কুড়িটা টাকা ধীরেন কাষ্ঠর হাতে দিয়ে বলল, এটা রাখুন খুড়ো। আপনার তো হাতখরচও লাগে।
না, না, তোর কাজ করে কি টাকা নিতে পারি মা? ও তুই রেখে দে।
না খুড়ো, পরিশ্রমের দাম দিতে হয়। নইলে ভগবান খুশি হন না। এটা আপনি রাখুন। আমার দরকার পড়লে তো আপনাকেই ডাকতে হবে।
খুব কুণ্ঠার সঙ্গে টাকাটা নিল ধীরেন। বলল, আমার এক গুরু ছিল। তার নাম অনন্ত হালদার। তার কাছে ট্র্যাক্টর মেশিনের কাজ শিখতুম। সে আমাকে বলত, তুই সব রকম কাজ শিখতে চাস বলে তোর কিছু হয় না। একটা কাজ যদি মন দিয়ে শিখতিস তাহলে কিছু করতে পারতিস। আজ ভাবি, হালদারের পো কিছু খারাপ কথা বলেনি। সব কাজের কাজী হতে গিয়ে আমার সবই ফসকে গেল। তা হ্যাঁ মা, পাম্পসেটটা কিন্তু এবার একটু ওভারহলিং করিয়ে নিস। সার্ভিসিং না হলে মেশিন বসে যাবে। আপাতত চলছে বটে, কিন্তু ভাল করে মাজাঘষা দরকার। বেল্টটাও ঢিলে হয়ে গেছে।
আপনিই করে দিন না খুড়ো! অন্য লোক ডাকব কেন?
বুড়ো শরীরে অতটা কি পারব মা? পরিশ্রমের কাজ।
না খুড়ো, আপনিই করবেন, যা টাকা লাগে দেব।
পার্টস লাগবে কয়েকটা, বাঙাল এলে বর্ধমান থেকে পার্টসও যেন আনিয়ে নিস।
আপনিই করবেন তো!
দেবোখন করে, তুই যখন ছাড়বিই না।
আমি চাই, আমাদের কাজটাও হোক, আপনারও দুটো পয়সা হোক। বাইরের লোক এসে পয়সা নিয়ে যাবে কেন বলুন।
ধীরেন কাষ্ঠ বিদেয় নেওয়ার পর মরণ দোতলায় উঠে দুটো ঘরেই উঁকি দিল। তাদের ঘরে খাটের ওপর ছোট্ট ফোল্ডিং মশারির নীচে বোনটা ঘুমোচ্ছ। বেচারা খুব ঘুমোয়। বাচ্চাদের নাকি ওই স্বভাব, বোনটা আজকাল তাকে দেখলে হাসে। কোলে আসার জন্য হাতও বাড়ায়। কিন্তু কোলে নিতে ভরসা হয় না মরণের। বড্ড নরম-সরম শরীর। ভয় হয় হাত ফসকে পড়ে যাবে। তবে বোনটিকে ইদানীং বেশ ভালবাসে মরণ। ঘরের মেঝেয় বসে বোনকে পাহারা দিতে দিতে চাল বাচছে মুক্তাদি। আজ রাতে পোলাও হবে বলে শুনেছে মরণ। পোলাও তার খুবই প্রিয় জিনিস।
দ্বিতীয় ঘরটার খোলা জানালা দিয়ে উকি মেরে মরণ দেখল, দাদা এখনও ঘুমোচ্ছ। গায়ে লেপ, মশারি ফেলা। সুমন একটু দেরি করে ওঠে বটে, কিন্তু এত দেরি করে নয় তা বলে, এখন নটা বাজে।
চুপি চুপি চলে আসছিল মরণ, হঠাৎ শুনতে পেল, সুমন খুব কাতর গলায় বলে উঠল, উঃ মা গো!
মরণ ফিরে গেল জানালার কাছে।
দাদা, ও দাদা, তোমার কী হয়েছে?
সুমন ফের একটা অস্ফুট যন্ত্রণার শব্দ করল।
ও দাদা!
উঃ।
তোমার কী হয়েছে?
লেপের ভিতর থেকে মুখটা বের করে সুমন বলল, ভীষণ শীত করছে। আর বড্ড মাথার যন্ত্রণা।
মাকে ডাকব?
না না, তার দরকার নেই। ঠিক হয়ে যাবে।
দরজাটা খুলতে পারবে?
হ্যাঁ, দাঁড়া উঠছি।
বেশ কষ্ট করেই উঠল সুমন, বোঝা যাচ্ছিল, সে টলছে। কোনওক্রমে এসে দরজাটা খুলে দিয়ে বলল, আমি একটু শুয়ে থাকি।
তোমার গা দেখি।
কপালে হাত রাখতেই মরণের হাতে যেন ছ্যাঁকা লাগল, এত গরম।
তোমার তো খুব জ্বর।
আমারও তাই মনে হচ্ছে। শেষ রাত থেকে শীত, মাথা ধরা আর আড়মোড়া হচ্ছিল। বাড়িতে প্যারাসিটামল আছে, জানিস?
কী বললে?
প্যারাসিটামল, জ্বর কমানোর ওষুধ।
দাঁড়াও, মাকে জিজ্ঞেস করে আসছি।
এক দৌড়ে নেমে এসে সোজা মায়ের কাছে গিয়ে মরণ বলল, মা, দাদার ভীষণ জ্বর, গা পুড়ে যাচ্ছে।
ও মা! সে কী! বাসন্তী তাড়াতাড়ি উনুন থেকে ফোড়নের কড়াই নামিয়ে রেখে একটা গরম জলের হাঁড়ি চাপিয়ে দিয়ে বলল, চল তো দেখি!
কপালে হাত দিয়েই মুখ শুকোল বাসন্তীর।
ও বাবা! তোমার তো ভীষণ জ্বর বাবা।
হ্যাঁ। ভাববেন না, বোধহয় ঠান্ডা লেগে হয়েছে। গতকাল মরণের সঙ্গে পুকুরে স্নান করেছিলাম তো৷
দাঁড়াও, থার্মোমিটার নিয়ে আসি।
জ্বরের কোনও ওষুধ নেই বাড়িতে?
তোমার বাবা কিছু ওষুধপত্র সবসময়েই কিনে রেখে যায় বাড়িতে। কোনটা কীসের তা তো জানি না।, বাক্সটা এনে দিচ্ছি, দেখ। কিন্তু আমার মনে হয় ডাক্তার দেখিয়েই ওষুধ খাওয়া ভাল।
ডাক্তার লাগবে না, ঠান্ডা লেগে জ্বর দু-চার দিন ভোগায়।
বাসন্তী মশারিটা খুলে নিল। পুবের জানালা খুলে দিতেই রোদ এল ঘরে।
থার্মোমিটারে জ্বর উঠল একশো চারের কাছাকাছি।
দাঁড়াও বাবা, তোমার মাথা ধোয়াতে হবে। আমি ব্যবস্থা করছি।
আরে না না, অত ঝামেলা করতে হবে না, প্যারাসিটামল খেলাম তো, জ্বর নেমে যাবে।
ওই ওষুধে জ্বর নামবে, কিন্তু আবার তেড়ে উঠবে। ও মরণ, যা তো, ফার্মাসিতে খবর দিয়ে আয়। ডাক্তার অনল বাগচী এলেই যেন আমাদের বাড়িতে আসে। তোর বাবার নাম লিখিয়ে দিয়ে আসিস। তাহলে গরজ হবে।
মরণ সঙ্গে সঙ্গে ছুটল।
সুমন একটু হেসে বলল, ডাক্তার ডাকার কোনও দরকার ছিল না। সামান্য জ্বর, ঠিক হয়ে যেত।
না বাবা, আজকাল বড্ড তেড়াবাঁকা অসুখ হয়। আগে থেকে সাবধান হওয়া ভাল।
এখানকার ডাক্তার কী রকম? গাঁয়ে তো ভাল ডাক্তার পাওয়া যায় না শুনেছি।
আগে তাই ছিল বাবা। হাতুড়েরা চিকিৎসা করত। আজকাল বর্ধমান থেকে ডাক্তাররা আসে। অনল বাগচী শুনেছি ভাল ডাক্তার। বর্ধমান মেডিক্যাল কলেজে পড়ায়। বিলেত ফেরত।
ওঃ, তাহলে তো ভালই হবে।
হ্যাঁ বাবা। ডাক্তারের খুব নাম। এবার মাথাটা একটু ধুইয়ে দিই? তোমার কোনও কষ্ট হবে না, টেরও পাবে না।
আগে আমি একটু বাথরুম থেকে ঘুরে আসি। তারপর দেখা যাবে।
যাও বাবা। ততক্ষণে বিছানাটা ঝেড়ে দিই।
আপনি কেন করবেন? মুক্তা বা পুটু কাউকে বলুন না।
আমরা ছেলেবেলা থেকে দেখেছি, বাড়িতে কারও অসুখ করলে সেই ঘরে বাড়ির কাজের লোককে ঢুকতে দেওয়া হয় না। একে তো ওরা অত পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকে না। তার ওপর যদি ছোঁয়া লেগে ওদেরও অসুখ করে তবে হয়তো মনে মনে শাপশাপান্ত করবে।
কিন্তু আপনারও তো ইনফেকশন হতে পারে।
আমি তো মা। মায়েদের কিছু হয় না।
কী জানি কেন কথাটা শুনে সুমনের মুখটায় একটা ভারী স্নিগ্ধ হাসি ফুটল। আর কিছু না বলে সে ধীরে ধীরে উঠল। বাথরুমে গেল।
বাসন্তী বিছানা ঝেড়ে, ঘর ঝাঁটপাট দিয়ে, চোখের পলকে সব ফিটফাট করে ফেলল। এক বালতি জলে জোরালো ফিনাইল ফেলে ঘরটা মুছেও দিল তাড়াতাড়ি। গরিব ঘরের মেয়ে বলেই সে এসব কাজ যে কোনও কাজের লোকের চেয়ে অনেক বেশি পাকা।
বাথরুম থেকে অনেকক্ষণ বাদে যখন বেরোল সুমন তখন সে টলছে, হাঁফাচ্ছে। চোখ দুটোও লাল। বাসন্তী তাড়াতাড়ি গিয়ে তাকে ধরে নিয়ে এসে শুইয়ে দিল। গায়ে লেপ চাপা দিয়ে বলল, দাঁড়াও, হট ওয়াটার ব্যাগ এনে দিচ্ছি।
না না, অত কিছু লাগবে না।
ঠান্ডা জলে মাথা ধোয়ানোর সময় তোমার শীত করবে। তখন হট ওয়াটার ব্যাগটা থাকলে আরাম লাগবে। কোনও ঝামেলা হবে না বাবা, জল আমি উনুনে চাপিয়েই এসেছি।
তার কপালে একটা অডিকোলোন মাখানো জলপট্টি লাগিয়ে বাসন্তী নীচে গেল।
সুমন চেয়ে দেখল খুব কৌশল করে উত্তরের জানালা বন্ধ রেখে পুবের জানালা খুলে দিয়েছে মরণের মা। ঘরটা ঝলমল করছে আলোয়।
প্যারাসিটামল তার ক্রিয়া শুরু করেছে। টের পেল সুমন। শরীরটা গরম হচ্ছে। জ্বরের ঘোর ভাবটা পাতলা হচ্ছে।
বাসন্তী এক কাপ চা নিয়ে এল। বলল, শোনো বাবা, এখন ওষুধ খেয়ে তোমার জ্বর নামছে। এখন তোমার মাথাটা তাহলে ধোয়াব না। দুপুরে ফের যখন জ্বর আসবে তখন আর ওষুধটা খেও না। ওই ওষুধ নাকি বেশি খেতে নেই। দুপুরে মাথা ধুইয়ে গা স্পঞ্জ করে দেব।
আপনাকে ভীষণ মুশকিলে ফেললাম।
ছিঃ বাবা। ওরকম কথা বলতে নেই। আমি তোমাকে কখনও দূরের মানুষ ভাবিনি। তুমি কেন ভাববে?
না, আসলে, হঠাৎ কেন জ্বরটা যে হল!
জ্বর হয়েছে তো কী হয়েছে? এটা তোমার নিজেরই বাড়ি।
চা-টা মুখে দিয়ে দেখল সুমন। বিটনুন লেবু চিনি দিয়ে করা। চমৎকার স্বাদ। সবটুকু নিঃশেষে খেয়ে নিল।
গরম রুটি আর তরকারি নিয়ে আসছি।
আমার কিছু খেতে ইচ্ছে করছে না যে!
বেশি খেও না। একটা বা দুটো, আমার রান্না তোমার পছন্দ হয় তো।
সুমন হেসে ঘাড় কাত করল, হ্যাঁ খুব ভাল।
শুনেছি তুমি ধনেপাতা ভালবাসো। আজ ফুলকপিতে ধনেপাতা আর কড়াইশুটি দিয়েছি। কলকাতায় সারা বছর সব কিছু পাওয়া যায়। গাঁয়ে তো তা নয়। ধনেপাতা এখন বাজারে ওঠে না। তোমার বাবা ভালবাসেন বলে আমি বাগানে ধনেপাতা লাগাই।
আমার কলকাতায় যাওয়ার খুব দরকার।
যাবে, জ্বরটা কমলেই যাবে।
হাঁফাতে হাঁফাতে মরণ এসে বলল, খবর দিয়ে এসেছি মা। ডাক্তার আজ তাড়াতাড়ি আসবে। এলেই পাঠিয়ে দেবে পানুকাকু।
আচ্ছা, এখন দাদার কাছে বসে থাক। বেশি বকবক করবি না। জলপট্টিটা মাঝে মাঝে পালটে দিস। বাটিতে অডিকোলন মেশানো জল আছে। আমার উনুন জ্বলে খাক হয়ে যাচ্ছে।
হ্যাঁ, আপনি আসুন।
এখন তোমার কেমন লাগছে দাদা?
একটু ভাল, প্যারাসিটামল খেয়েছি তো, জ্বর কমে যাচ্ছে। এফেক্ট কেটে গেলে আবার জ্বর আসবে।
সুমনের বালিশের নীচে একটা চিঠি আছে। কালকেই কেউ চিঠিটা তার বিছানায় ফেলে গেছে। যে চিঠি দিয়েছে তাকে চেনে না সুমন। নাম শুভশ্রী। আজকাল গাঁয়ের মেয়েদেরও বেশ সুন্দর সুন্দর নাম রাখার রেওয়াজ হয়েছে। চিঠিটা সংক্ষেপে এরকম : আপনাকে আমার ভীষণ ভাল লাগে। খুব আলাপ করতে ইচ্ছে হয়, আবার ভয়ও করে। যদি কিছু মনে করেন। আমার বয়স সতেরো। মাধ্যমিক পাস করেছি। একটু গাইতেও পারি। আমার সঙ্গে ভাব করতে রাজি? যদি রাজি থাকেন তাহলে আপনার পুব দিকের জানালায় একটা সাদা রুমাল বেঁধে রাখবেন কাল বিকেলে। প্লিজ, বাঁধবেন কিন্তু।
হ্যাঁ বে, শুভশ্রী বলে কোনও মেয়েকে চিনিস?
শুভশ্রী?
হ্যাঁ।
না তো! মনে পড়ছে না।
ভাল করে ভেবে দেখ।
মরণ ভাবল। মাথা নেড়ে বলল, নামটা শুনিনি তো, কেন দাদা?
এমনিই।
পদবি কী বলো তো!
জানি না।
তাহলে বলতে পারছি না। কেমন দেখতে?
তা কে জানে! শাকচুন্নির মতোই হবে হয় তো।
যাঃ! বলে হেসে ফেলে মরণ, শাকচুন্নি কি দেখতে খারাপ?
না হলে শাকচুন্নি বলবে কেন?
হ্যাঁ দাদা, শাকচুন্নি কাদের বলে? যারা শাক তোলে তাদের?
তাও হতে পারে। এ গাঁয়ের তুই সবাইকে চিনিস?
বাঃ, চিনব না?
এই তো শুভশ্রীকে চিনতে পারলি না!
হয়তো ভাল নামটা জানি না, ডাকনামে ঠিক চিনব।
হুঁ, সেটা একটা কথা বটে।
মাকে জিজ্ঞেস করে আসব?
ভ্যাট। ওসব জিজ্ঞেস করার দরকার নেই।
আচ্ছা।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন