শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
যিশু এসে দাঁড়ালেন কদমগাছের তলায়। সন্ধিক্ষণ সমাগত। একটি আর্তনাদ শোনার জন্য অপেক্ষা করছে পৃথিবী। সেই আর্তনাদকে কোলাহলে ডুবিয়ে দেওয়ার জন্য ঢাক বাজছে। ঢাকি নাচছে।
ঈশ্বরপুত্র কখনও সুখী ছিলেন না। তিনি কখনও সুখী হবেনও না। সুখী হতে নেই তাঁর। বুকে দুহাজার বছরের পুরনো দীর্ঘশ্বাস নিয়ে তিনি কদমগাছের গায়ে হাতের ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। ছাগশিশুটি ঘাসপাতা খেতে খেতে মাঝে মাঝে মুখ তুলে তাঁকে দেখছে।
“মণিরাম… মণিরাম, তুমি যেখানেই থাকো মূল মণ্ডপের সামনে চলে এসো, তোমার পিসিমা তোমার জন্য অপেক্ষা করছেন। মণিরাম… আজ রাত নয় ঘটিকার পর সবুজ সংঘ আয়োজিত নাট্যাভিনয় নটীর পূজা— নটীর পূজা… যাঁরা অঞ্জলি দেবেন তাঁরা দয়া করে লাইন দিয়ে আসুন…”
যিশু চেয়ে আছেন। ছাগশিশুটি চেয়ে আছে। চোখে চোখ।
আমার অনন্ত ক্ষুধা প্রভু। ক্ষমা করুন।
ক্ষুধার কথা আমার মতো আর কে জানে বাছা। ক্ষুধা অনন্ত, তার কোনও নিবৃত্তি হল না আজও।
ক্ষুধা, ভয়, বংশবিস্তার ছাড়া আমাদের আর কী আছে প্রভু? বড় সামান্য এ জীবন।
জীবন সামান্য নয়। একটি জীবাণুরও জীবন এক আশ্চর্য ঘটনা, কত বিচিত্র অণু-পরমাণুর সমাহারে ওই শরীর রচিত হয় আর তার প্রকোষ্ঠে দীপাধারের মতো রহস্যময় প্রাণের শিখা। না বাছা, জীবন সামান্য নয়।
আপনার দীর্ঘশ্বাসে মথিত হচ্ছে বাতাস। সন্ধিক্ষণ সমাগত। শিয়রে শমন। আমি আমার শেষ আহার গ্রহণ করছি, যূপকাষ্ঠে একটি আঘাত আমার সব আলো নির্বাপিত করে দেবে। প্রভু, আপনার চোখের জলটুকুই আমার এ সামান্য জীবনকে অসামান্য করে তুলেছে। আপনি আমার জন্য কাঁদছেন ইহজীবনে এর চেয়ে সুন্দর আর কিছু ঘটেনি কখনও।
আমার চোখের জল কখনও শুকোয় না বৎস। কান্না ছাড়া আমি তোমাকে আর কী-ই বা দিতে পারি।
“মাইক টেস্টিং… হ্যালো, হ্যালো… ওয়ান, টু, থ্রি, ফোর… ইলেকট্রিশিয়ান কালু, ইলেট্রিশিয়ান কালু, মণ্ডপের বাঁদিকে স্টিক লাইটটা খুলে গেছে, এখনই ঠিক করে দাও, নইলে অ্যাকসিডেন্ট হতে পারে… আজ রাত নয় ঘটিকার পর নাট্যাভিনয় নটীর পূজা… নটীর পূজা… সবুজ সংঘের নটীর পূজা… পরিচালনা করবেন পারুল গাঙ্গুলি… মুখ্য ভূমিকায় পান্না চ্যাটার্জি, অনামিকা রায়… ভলন্টিয়াররা দেখো, অঞ্জলি দেওয়ার জায়গায় বড্ড ভিড় জমে গেছে…”
প্রভু, আপনার ক্ষতচিহ্ন এখনও রক্তমুখ। আপনার মুখ বেদনায় নীল, আপনার ব্যথার অবসান নেই প্রভু?
পৃথিবীর সব আঘাতই আমাকে আহত করে, না বাছা, ঈশ্বরপুত্রের ব্যথার অবসান নেই। কতকাল এই ক্ষতচিহ্ন বহন করেছি। নির্ঝরের মতো আজও রক্ত বয়ে যায়। আজও তোমার সঙ্গে খড়্গাঘাত ভাগ করে নেব বলে অপেক্ষা করছি।
খাঁড়াটা ওপরে উঠে ঝক্ করে নেমে গেল। একটা শেষ ডাক শুধু শোনা গিয়েছিল, মা!
সুমনের হাতের ভিতরে তার হাতটা শক্ত হয়ে গিয়েছিল। আঁকড়ে ধরেছিল আঁকশির মতো।
ভয় পেলি?
মরণ মুখ তুলে চেয়ে একটু হাসার চেষ্টা করল। কাহিল হাসি।
আমারও এসব দেখলে মনটা বড্ড খারাপ হয়ে যায়। না দেখলেই হত।
ওই ‘মা’ ডাকটা কানে লেগে রইল মরণের, সে সাপ-খোপ অনেক মেরেছে। কিন্তু মা জানতে পারলে খুব রেগে যায়, মা মনসার জীবকে মারিস! পাষণ্ড নাকি তুই? খবরদার আর যেন না শুনি।
মায়ের সুবাদে তাদের বাড়িতে দু-দুটো বাস্তুসাপ এখনও বেঁচেবর্তে আছে। সাপ, বিছে, বোলতা, ছারপোকা, মশা বা ক্ষতিকারক জীবাণু কি পৃথিবীর কোনও উপকারে লাগে? কে জানে কী! এক সময়ে সে ফড়িং-টড়িং ধরত, মেরেও ফেলত। আজকাল, যত বড় হচ্ছে, তত কমে যাচ্ছে ওসব।
সুমনের সঙ্গে একটু খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে বেরিয়ে এল সে৷ পায়ে নতুন জুতো টাইট মারছে। সে যে বড় হচ্ছে, পায়ের মাপ বেড়ে যাচ্ছে, এটা বাবা রসিক বাঙালের খেয়াল থাকে না। কলকাতার চিনেবাজার থেকে পুরনো মাপের জুতো এনে দিয়েছে এবারও। দরকার ছিল না। বর্ধমানেই কেনা যেত। কিন্তু রসিক বাঙালকে সে কথা বোঝাবে কে?
তার মাও কেনাকাটার কিছুই বোঝে না। তবু ঝোলাঝুলি করে জিনসের ফুলপ্যান্ট আদায় করেছে মরণ। এই প্রথম ফুলপ্যান্ট হল তার এবং জিনস। লম্বায় একটু বড় হয়, কিন্তু গুটিয়ে পরা যায় বলে ম্যানেজ হয়েছে। কোমরটাও ঢলঢলে ছিল, সেটা বেল্ট দিয়ে সামলানো গেছে। সবচেয়ে মজা হয়েছিল সুমনের জন্য পাঞ্জাবি আর পাজামা কিনতে গিয়ে। বড়সড় একটা ঝিনচাক দোকানে ঢুকেই তার মা দোকানিদের বলল, খুব দামি ভীষণ ভাল পাঞ্জাবি চাই। খুব ভাল হওয়া চাই কিন্তু…
দোকানদার বিনীতভাবেই বলল, মাপ কত?
মাপ! বলে মা ভীষণ ভাবনায় পড়ে গেল। মরণের দিকে চেয়ে বলল, হ্যাঁ রে, তোর দাদার মাপ কত বল তো!
মরণ বলল, তা কি আমি জানি?
দোকানের সেলসম্যান হেসে বলে, কত লম্বা বলুন, মাপ আমি ঠিক করে নিচ্ছি।
মা নিজের মাথার ওপর হাত তুলে ‘এই এত বড় হবে’ বলে যে মাপটা দেখাল তা বিরাট লম্বা কোনও লোকের।
দোকানদার বলল, ও বাবা, তাহলে তো মিনিমাম চুয়াল্লিশ লাগবে। অত বড় মাপে ভ্যারাইটি হবে না।
মরণ ফিক ফিক করে হাসচ্ছিল।
মা রেগে গিয়ে বলে, হাসচ্ছিস কেন বোকার মতো?
হাসব না? দাদা বুঝি অত লম্বা?
লম্বা নয়? বেশ লম্বা।
মোটেই না। বাবার চেয়ে দাদা একটু বেঁটে।
না না, লম্বা নেওয়াই ভাল। শেষে যদি ছোট হয়?
তাদের কথাবার্তা থেকে দোকানদার যা বোঝার বুঝে নিয়ে মাঝারি সাইজের পাঞ্জাবি বের করে দেখাতে লাগল। দারুণ দারুণ সব কাজ করা তসর, সিল্ক, র সিল্ক, গরদ।
কিন্তু মা কেবলই বলে, আরও দামি নেই? আরও ভাল?
দেখাচ্ছি বউদি। তবে এগুলোও কিন্তু খুব ভাল, লেটেস্ট ডিজাইন। ভাল করে দেখুন।
সে দোকানের স্টক ফুরিয়ে গেল, মার পছন্দই হল না। মোট চারটে দোকান ঘুরে অবশেষে প্রায় ছশো টাকা দিয়ে যে-পাঞ্জাবিটা কিনল মা সেটা এখন সুমনের গায়ে।
পাঞ্জাবি দেখে সুমন একটু অবাক হয়ে বলেছিল, ইস, এত দাম দিয়ে কিনতে গেলেন কেন? আমি তো এত ডেকোরেটেড জামা পরি না।
তা হোক বাবা, এই তো প্রথম দিচ্ছি। বয়স কম, এ বয়সেই তো একটু জমকালো জিনিস পরতে হয়।
মরণ এটা বুঝতে পারে, দাদাকে নিয়ে মার একটু আদেখলেপনা আছে। আড়ালে বলে, বড্ড ভয় পাই বাবা, আমি তো আর আসল মা নই, সৎ মা। কী চোখে দেখে কে জানে!
সুমনের ভাব দেখে কিছু বোঝা যায় না। দিন দশেক ধরে টানা আছে এ-বাড়িতে। একটু আপন মনে থাকে, বই পড়ে। রাত জেগে পড়ে বলে সকালে উঠতে দেরি করে। কথা কম বলে। যা একটু ভাব তা মরণের সঙ্গেই।
একদিন মরণকে বলেছিল, আমি একটু ইনট্রোভার্ট।
কথাটার মানে মরণের জানা ছিল না। পরে পান্নাদির কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করে জেনেছে, ইনট্রোভার্ট হল অন্তর্মুখী।
দশদিন ধরে সুমন এ-বাড়িতে আছে, কিন্তু মার সঙ্গে সম্পর্কটা একটুও এগোয়নি৷ সেই জন্য মা খুব ভাবে।
একদিন মা তাকে বলল, হ্যাঁ রে, সুমন কি আমাকে ঘেন্না করে?
কেন মা? দাদা তো সেরকম নয়। খুব ভাল তো।
কী জানি বাবা, এতদিন এসেছে তেমন কথা-টথা কিছু তো বলে না। বড্ড ভয়-ভয় করে। গেঁয়ো মানুষ আমরা, আদরযত্ন বোধহয় তেমন হচ্ছে না।
আদরযত্ন বলতে ভাল খাওয়া-দাওয়া যদি ধরা যায় তা হলে সেটা খারাপ হচ্ছে না কিছু। ভাল মাছ, মাংস, মুরগি, পায়েস, ক্ষীর এক একদিন মা তো ভোজবাড়ির আয়োজন করে ফেলে। জিজিবুড়ির রান্নার সুখ্যাতি ছিল। সেই জিজিবুড়িও এসে চিংড়ি, মুড়িঘন্ট, চাপড়ঘণ্ট রান্নার কায়দা শিখিয়ে দেয় মাকে। আর বলে, এসে তো গেড়ে বসেছে দেখছি। মতলব তো ভাল মনে হচ্ছে না। বড়গিন্নিই সাঁট করে পাঠিয়েছে পেটের খবর বার করতে। সাবধানে থাকিস না।
ও কী কথা মা! ও কি তেমন ছেলে? ভাবের ঘোরে থাকে, কোনও দিকে চেয়েই দেখে না।
ও লো ও হচ্ছে ভড়ং। নজর ঠিকই রাখছে। ওপর-ওপরসা অমন ভাব দেখাচ্ছে। যেমন মা তেমনই তো ছা হবে।
বড়গিন্নি কেমন লোক তা জানি না মা, তাকে চোখেও দেখিনি আজ অবধি। কিন্তু ছেলের নিন্দে করতে পারব না।
তোর বুদ্ধিনাশ হয়েছে, বুঝলি! ছেলে-ছেলে করে হ্যাদাচ্ছিস, বলি কোন পেটে ধরেছিস ওই ধেড়ে ছেলেকে? গাণ্ডেপিণ্ডে গেলাচ্ছিস, গুরুঠাকুর বানিয়ে পারলে পুজো করিস, বলি আজ অবধি পাপমুখে একবারও মা ডাক বেরিয়েছে?
কথাটা ঠিক। মাকে আজও মা বলে ডাকেনি দাদা। এটা একটা কাঁটা হয়ে আছে মরণের মনের মধ্যে।
এত আয়োজন, তবু সুমন তেমন খায় না। খেতে বসে কেবল থাক থাক আর দেবেন না, বলে বাধা দিতে থাকে।
রান্না কি ভাল হয়নি বাবা?
রান্না? না রান্না তো বেশ ভালই। আমি বেশি খেতে পারি না।
এ কথাতেও মা আড়ালে দুশ্চিন্তা করে। মার কেবল ভয়, আদরযত্ন হচ্ছে না। কথাটা মরণও খুব ভাবে। তার এই প্রায়-অচেনা দাদাকে খুশি রাখতে তাদের আর কী কী করা উচিত সেটা বের করার চেষ্টা করে সে। আজও সে দাদাকে ‘আপনি’ থেকে ‘তুমি’ বলতে পারেনি।
তার ছোট বোনটার নাম দেওয়া হয়েছে হাম্মি। তার খুব হামা দেওয়ার নেশা। সকালে ঘুম থেকে উঠেই খাট থেকে নেমে পড়ার জন্য হুড়োহুড়ি। সাতসকালে সারা ঘর হামা দিয়ে বেড়ায় সে। দোতলা থেকে পাছে সিঁড়ি দিয়ে গড়িয়ে পড়ে সেইজন্য দোতলার সিঁড়ির মুখে কাঠের আগল লাগানো হয়েছে। হাম্মিকে যে একবারও কোলে নেয়নি বা একটুও আদর করেনি সুমন, এটাও লক্ষ করেছে তারা। হয়তো মায়ের ভয়টা মিথ্যে নয়। বাইরে ভদ্রতা বজায় রাখলেও ভিতরে ভিতরে সুমন হয়তো তাদের পছন্দ করে না।
সুমন আসার চার-পাঁচদিনের মাথায় একদিন সকালে হাম্মি হামা দিতে দিতে লম্বা বারান্দা পেরিয়ে সোজা গিয়ে সুমনের ঘরে ঢুকে পড়েছিল। তারপর কী হয়েছিল কেউ জানে না। হঠাৎ দেখা গেল বারান্দার কোণে সুমন দাঁড়িয়ে আছে, তার কোলে হাম্মি এবং সুমন তাকে কী যেন আঙুল তুলে দেখাচ্ছে আর কথা কইছে আর হাম্মি খুব অবাক হয়ে চেয়ে আছে।
উঠোন থেকে তার মা আর্তনাদ করে উঠল, ও বাবা হারু, তোমার ঘরে গিয়ে ঢুকেছিল বুঝি! পেচ্ছাপ-টেচ্ছাপ করে দেবে বাবা, ওকে নামিয়ে দাও।
হারু অর্থাৎ সুমন একটু হেসে বলল, তাতে কী? বাচ্চারা তো ওসব করেই। থাক আমার কাছে একটু।
থাকল হাম্মি। সম্পর্কের শীতলতা সে-ই ভাঙল প্রথম। আর তারপর থেকে সে রোজই নিয়মিত সুমনের ঘরে হানা দেয় এবং কোলে-টোলেও উঠে দিব্যি বসে থাকে।
যষ্ঠীর দিন বিকেলে হইহই করে এসে পড়ল বাঙাল। সঙ্গে মুটে এবং মুটের মাথায় বোঝা। পুজোর জামাকাপড়, রাবড়ি, গলদা চিংড়ি, নতুন ফুলকপি, সোনামুগের ডাল আরও নানা জিনিসপত্র। উঠোনেই জামা খুলে বারান্দায় বসে হাওয়া খেতে খেতে উঁচু গলায় বলল, পূজা কাটাইল্যা দিনে কইলকাতায় পইড়া থাকে কেডা?
মা ঘোমটা দিয়ে চা করে নিয়ে এসে হাসি-হাসি মুখ করে বলে, অত কী এনেছ গো? পয়সা তোমাকে কামড়ায়?
চা খেতে খেতে বাঙাল নিমীলিত নয়নে চেয়ে বলে, তোমার লিগ্যা কিছু আনি নাই। তোমারে দেওনও যা, ভস্মে ঘি ঢালনও তা। বছর বছর যে শাড়িগুলি কিন্যা দেই হেইগুলি কি পাতিলের মইধ্যে গুইজ্যা রাখ নাকি? পরতে পার না?
মা ভারী লজ্জা পেয়ে বলে, আচ্ছা মানুষ যা হোক, অত দামি শাড়ি পরে কোথায় যাব বলো তো! আমি কি ঘর থেকে বেরোই? সংসার সামলাতে হয় না আমাকে?
বেনারসিখান কই?
সে তোলা আছে। বিয়েবাড়ি-টাড়ি নেমন্তন্ন হলে পরে যাব।
আর পরছ! তোমার পরনে তো হাউল্যা-জাউল্যা কাপড় ছাড়া আর কিছু দ্যাখলাম না!
এক ছড়া সোনার হার বের করে মার হাতে দিয়ে বাঙাল বলল, হেই লিগ্যা এইবার আর কাপড় আনি নাই। এইটা আনছি।
মার চোখ কপালে উঠল, ও মা গো! তাই বলে সোনার হার!কী কাণ্ড বাবা! এত খরচ করার কোনও দরকার ছিল বুঝি! সোনা-দানাই কি আমাকে পরতে দেখ?
রসিক বাঙাল একটু করুণ মুখে চেয়ে থেকে বলল, আইচ্ছা, তুমি কেমন মাইয়ালোক কও দেখি! কাপড় চাও না, সোনা-দানা চাও না, শ্যাষে কি বৈরাগী হইয়া যাইবা নাকি? তাহইলে তো সাড়ে সব্বনাশ! এই যৌবনে যোগিনীরে লইয়া আমি করুম কী?
মা হেসে ফেলল, আচ্ছা বাবা, পরবখন হার। তবে বাপু, বেশি দিও না আমাকে, আমি অত সামলাতে পারি না।
কথাটা শুনে রসিক বাঙালের মুখে একটা তৃপ্তির হাসি ফুটল। বলল, বুড়া বয়স লইয়া মাইনষের চিন্তা থাকে। কোনখানে পড়ব, কোনখানে মরব, কারে ভোগাইব, গু-মুতে নান্দিভাস্যি করব কিনা। তা বোঝলা, আমি বুড়া বয়সে আইয়া তোমার কাছেই মরুম।
ছিঃ, ষষ্ঠীর দিনটায় ওসব কী কথা! ওসব মুখে আনতে আছে?
রসিক বাঙাল মিটিমিটি হেসে বলে, আ গো, এইটা আহ্লাদের কথাই। তোমার মাথায় তো বুদ্ধি নাই, বলদা মাইয়ালোক, তুমি বোঝলা না।
পড়ার ঘর থেকে দৃশ্যটা দেখতে পেয়েছিল মরণ। দুজন দুজনের দিকে অপলক চেয়েছিল কিছুক্ষণ। চা জুড়িয়ে যাচ্ছিল।
পৃথিবীর কোনও কোনও প্রাণী সহজেই পোষ মেনে যায়, আবার কোনও কোনও প্রাণী সহজে মানতে চায় না। যেমন কুকুর সহজেই বশংবদ হয়ে যায়, বেজি হতে চায় না।
বিজু কোথা থেকে একটা বাঁদর নিয়ে এসেছে। ছোট বাচ্চা। সরু শেকল পরিয়ে কাঁধে নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে খুব। আজ অষ্টমী পুজোর সকালে সেটাকে কাঁধে নিয়ে এসে হাজির।
দেখো বড়মা, কেমন কিউট দেখতে। ভাল না?
বলাকার মোটেই পছন্দ হচ্ছিল না ব্যাপারটা। বললেন, তুই তো নিজেই বাঁদর, আবার একটা বাঁদরের দরকার কী?
আমার অনেক দিনের শখ বড়মা। বাজারে একটা লোক নিয়ে এসেছিল, পঞ্চাশ টাকা দিয়ে কিনে ফেললাম।
ছিষ্টি অনাছিষ্টি করবে বাবা। কাঁধে নিয়ে ঘুরছিস, হেগেমুতে দিলে কী হবে?
সে তো মানুষের বাচ্চারাও করে ফেলে। তাতে কী? ট্রেনিং দিয়ে নিলে সব ঠিক হয়ে যাবে।
না বাবা, ওসব আমার পছন্দ নয়।
হ্যাঁ বড়মা, তুমি কি শুচিবায়ুগ্রস্ত হয়ে গেলে নাকি? আগে তো এরকম ছিলে না। শুদ্ধাচার ভাল, শুচিবায়ু ভাল নয়।
কী জানি বাপু, আজকাল আমার যেন ঘেন্নাপিত্তি বড্ড বেড়ে গেছে। মনটা খুঁতখুঁত করে সবসময়ে। তোর জ্যাঠা চলে যাওয়ার পর থেকেই এরকম।
একটু কোলে নিয়ে দেখো না।
ও মা গো!
বিজু হি হি করে হাসে। বলে, পারলে না তো বড়মা। শুদ্ধাচারে নিজেকে গুটিয়ে রাখলে!
বলাকা মৃদু হাসলেন, বড্ড খিতখিত করে বাবা, ও আমি পারব না। তবে বাঁদরটা দেখতে কিন্তু বেশ। কেমন পিটপিট করে তাকাচ্ছে দেখ।
এদের এক প্রজাতিই তো আমাদের পূর্বপুরুষ ছিল। তাই কাঁধে নিয়ে বেড়াই।
আর একবারও তো একটা বেজি পুষেছিলি। সেটা পালিয়ে গেল জঙ্গলে।
হ্যাঁ। বেজি জাতটা একটু নেমকহারাম আছে।
এটাও না পালায়।
পালালে পালাবে। আমি ঠিক করে রেখেছি, একটু বড়-টড় করে ছেড়ে দেব। ইচ্ছে হলে থাকবে, না হয় চলে যাবে। দুনিয়াতে পার্মানেন্ট বলে তো কিছু নেই।
কত কথাই শিখেছিস। তা হ্যাঁরে বিজু, তুই কি শেষ অবধি ষণ্ডাগুণ্ডা হলি?
কেন বড়মা, হঠাৎ ওকথা কেন?
শুনতে পাই তুই নাকি মারপিট করিস?
ধুর! মারপিট করব কেন? কখনও-সখনও বেয়াদব লোকদের একটু-আধটু শাসন করতে হয়।
সোহাগ বলছিল। কয়েকটা পাজি ছেলে ওর পিছনে লেগেছিল বলে তুই নাকি মেরেছিস ওদের।
সোহাগটা কে? অমলদার মেয়ে নাকি?
হ্যাঁ।
বেশ বাহারি নাম তো!
একটু পাগলিমততা আছে, তবে মেয়েটা ভাল। ওসব আর করতে যাসনি। ছেলেগুলো গিয়ে ক্ষমা চাওয়ায় মেয়েটা লজ্জায় পড়েছে।
ফচকে ছেলেরা টিটকিরি দেয়, সেটা কি ও এনজয় করে নাকি?
কী জানি বাবা! বলছিল, কেউ ওকে প্রোটেকশন দেয় সেটা ওর পছন্দ নয়।
ওকে প্রোটেকশন দেওয়াটা তো বড় কথা নয়। গ্রামেরও তো একটা সমাজ আছে। বাইরে থেকে আসা একটা মেয়েকে টিটকিরি দেবে কেন? গ্রামের বদনাম হয় না!
এটা নারীবাদের যুগ বাপু, মেয়েরা বোধহয় পুরুষের সাহায্য নিতে পছন্দ করে না।
নারীবাদ কি তাই বড়মা যে, মেয়েরা নিজেদের সব সমস্যার সমাধান নিজেরাই করবে? পুরুষের সাহায্য লাগবে না? আমার তো মনে হয় নারীবাদের জন্য পুরুষের সাহায্য বেশিই লাগবে।
বলাকা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, আমিও তো তাই জানি। তোর জ্যাঠার সঙ্গে এতকাল ঘর করে কখনও তো মনে হয়নি যে আমার আরও একটু পাখা মেলার দরকার। বাইরে থেকে তাকে অনেকে অত্যাচারী পুরুষ বলে ভাবত। খামখেয়ালি তো ছিলই একটু, কিন্তু অমন ভালবাসা যে বাসতে পারে তার সঙ্গে কি বিবাদ হয়? সে ঘিরে রেখেছিল বলে কখনও আঁচটুকুও গায়ে লাগেনি। পুরুষমানুষ মেয়েদের প্রোটেকশন দেবে না তো কে দেবে?
সোহাগকে বোলো, আমি ওকে বাঁচাতে কিছু করিনি, যা করেছি তা গ্রামের প্রেস্টিজ বাঁচাতে।
সে বলবখন, তুই আর ওর মধ্যে থাকিস না।
আচ্ছা বড়মা।
মনটা খারাপ হয়ে গেল বিজুর। এই গ্রামটাকে সে বুকের পাঁজরের মতো ভালবাসে। ইদানীং নেশাভাং, চুল্লুর ঠেক, সাট্টা, জুয়া, মদ আর বদমাইশি ঢুকে গেছে প্রচুর। সে তার মতো এই বেনোজল ঠেকাতে চেষ্টা করে।
আজ অনেক ভেবেচিন্তে একটা শাড়িই পরল সোহাগ।
কাল থেকে পিসি টিকির-টিকির করে যাচ্ছে, ও সোহাগ, কাল অষ্টমী পুজো, কাল একটা শাড়ি পরিস।
আমি যে শাড়ি পরতেই জানি না।
আমি পরিয়ে দেবখন।
শাড়ি পরে কী হবে বলো তো?
তোকে কেমন দেখায় একটু দেখব।
শাড়ি তো সবাই পরে, কী আর নতুন জিনিস হবে?
তুই তো পরিস না, তোকে নতুন রকমই দেখাবে। আমার কাছে আসিস চুল আঁচড়ে বিনুনি করে দেব। আমার সঙ্গে অঞ্জলি দিতে যাবি।
সোহাগ সাজতে ভালবাসে না। উলোঝালো থাকতেই তার ভাল লাগে। মায়ের সঙ্গে এই নিয়ে তার কম যুদ্ধ হয়নি।
ভেবেচিন্তে সে আজ সকালে উঠে চান করেছে। পিসির ঘরে গিয়ে বলল, এবার কী করতে হবে বলো তো?
সন্ধ্যা এক গাল হেসে বলল, আয় তোর চুলটা আগে বাঁধি।
পিসি যত্ন করে চুল বেঁধে মুখটা ভোয়ালে দিয়ে মুছে বলল, শাড়ি আছে?
আছে।
নিয়ে আয়।
সোহাগ তার মায়ের একখানা নীল সিল্কের শাড়ি নিয়ে এল।
এটা কেমন?
চমৎকার। ফর্সাদের সব রঙেই মানায়।
শাড়ি পরিয়ে কুঁচি ঠিক করতে করতে সন্ধ্যা বলল, কিছু খাসনি তো?
না।
তাহলে চল অঞ্জলি দিয়ে আসি। আজ অষ্টমীতে খুব ভিড় হবে।
স্টিলের আলমারির গায়ে লাগানো আয়নায় নিজেকে আপদমস্তক দেখে সোহাগ বলল, ওঃ পিসি! আই লুক ঘ্যাস্টলি?
কী বলছিস?
আমাকে যে ভীষণ বিচ্ছিরি দেখাচ্ছে।
সন্ধ্যা হেসে বলল, তোকে খুব সুন্দর দেখাচ্ছে। একদম অন্যরকম।
অন্যরকম কেন হব আমি? আমি তো আমার মতো হতে চাই।
তাই তো আছিস। শুধু বাইরেটাই যা অন্যরকম দেখাচ্ছে, তা বলে কি আর তুই সোহাগ নোস নাকি?
অন্যরকম হতে আমার ভাল লাগে না।
সে জানি। তুমি একটি জিদ্দি মেয়ে। কত খোশামোদ করে শাড়ি পরালাম, দয়া করে এখনই ছেড়ে ফেলো না। অঞ্জলিটা আগে দিয়ে আসি চল।
সোহাগ কাঁধে একটা ঝাঁকুনি দিয়ে বলে, আমাকে আজ আমার মাও বোধহয় চিনতে পারবে না।
মণ্ডপে এসে ব্যাপারটা খুব ভাল লাগছিল না সোহাগের। ভিড়, গরম, গণ্ডগোল আর অসহ্য ঢাকের বাজনা। কলকাতায় তারা পুজো দেখে বটে, কিন্তু সেটা সন্ধের পর এবং সেটা শুধু মজা দেখা মাত্র। এখানে সে অঞ্জলিও দেবে, যার কোনও মানে নেই।
ওমা! তুমি এসেছ! কী কাণ্ড! আমি তো তোমাকে চিনতেই পারিনি! এ যে একদম মেটামরফসিস!
এই বলে পান্না তাকে জড়িয়ে ধরল।
সোহাগ হেসে বলে, এ যেন ফ্যান্সি ড্রেস বলের পোশাক হয়ে গেল, না?
এ মা, তা কেন? তোমাকে ভীষণ সুন্দর দেখাচ্ছে। মণ্ডপে যতগুলো মেয়ে আছে তার মধ্যে সেরা।
দিরি-দিরি-দিরি-দিরি করে ঢাকে একটা অদ্ভুত বাজনা শুরু হল।
পান্না বলল, এই রে! এবার বলি হবে। আমি ওসব দেখতে পারি না। চলো, একটু ওধারে যাই।
যেতে গিয়েই হঠাৎ সোহাগ এক অদ্ভুত দৃশ্য দেখতে পেল। শূন্যে উত্তোলিত খঙ্গ, আর তার ওপাশে এক দীর্ঘ সুঠাম পুরুষ দাঁড়িয়ে। তার কাঁধে একটা বাঁদর। কয়েক পলক স্থির চেয়ে রইল সোহাগ।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন