শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
আশি চুটকি, নব্বে তাল তব জানিয়ো খইনিকে হাল। খইনি মজানেনা কি সোজা কথা রে বাপু? দু-চারবার ডলেই ঠোঁটে ফেলে দিলেই হল? ও হল চাষাড়ে জিনিস, ধকের চোটে ব্ৰহ্মরন্ধ্র পর্যন্ত চমকে ওঠে। খইনির গভীরে যে প্রাণরস আছে তাকে টেনে বের করা চাই তো। সেই মোলায়েম নেশা শরীরের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে চনমনে করে তোলে মানুষকে। হ্যাঁ, তবে তার জন্য ধৈর্য চাই। পরিমাণমতো চুনটুকু দিয়ে মলো, মলো, মলো। ফিন তালি লাগাও। চুণা উড়েগা, ধূল উড়েগা। ফিন মলো, মলো, মলো। ফিন তালি লাগাও—হাঁ। আশি চুটকি, নব্বে তাল, তব জানিও খইনিকে হাল…
উত্তরের দাওয়ায় বসে খইনিটাকে মজিয়ে ফেলেছে প্রায় বাঙালি। বাঙালি রাম কাহার। পাশে বিস্কুটের কাচ লাগানো টিন। দাওয়ার নীচে ছাড়া মোটা চামড়ার ধুলিধূসর একজোড়া শস্তা জুতো। বাঙালির পরনে হেঁটো জনতা ধুতি, গায়ে মোটা কাপড়ের পিরান। মাথা ন্যাড়া, মস্ত টিকি, খইনি ডলতে ডলতে তার চোখ এখন ভাবালু।
হাত চারেক তফাতে উঠোনে উবু হয়ে বসে আছে গোকুল আর বাসু। তারা মুখ চোবলাচ্ছে, জিব রসস্থ, ভারী উন্মুখ হয়ে চেয়ে আছে বাঙালির দিকে। ব্যাটা খইনিটা বানায় বড় ভাল। মিহি, মোলায়েম, খুব সোয়াদ। তবে বড্ড সময় নেয়। গোকুলের কাজ বেশির ভাগই গোয়ালঘরে। তিনটে গোরুকে মাঠে খোঁটায় বেঁধে এসে গোয়াল পরিষ্কার করেছে এতক্ষণ। এই একটু হাঁফ ছাড়ার সময়। বাসু বাগান সামলায়। নিড়েন দিতে দিতে উঠে এসেছে বাঙালিকে দেখে। দুজনেই কিছু উশখুশ। কিন্তু বাঙালিকে হুড়ো দিয়ে লাভ নেই। তার মনের মতো না হওয়া ইস্তক সে খইনির ভাগা দেবে না।
রুখু চুলের খোঁপায় আজ একটা কলাবতী ফুল গুঁজেছিল দুখুরি। হাঁসের ঘর থেকে বারোটা ডিম বের করল। আজ তার মনে একটু আনন্দ ছিল সকাল থেকেই। মেলা লোক আসবে আজ। দুই দিদিমনি, দুই দাদাবাবু, তাদের বরেরা, বউয়েরা, ছেলেমেয়েরা। আজ খুব হই-চই লেগে যাবে বাড়িতে। দুখুরি তাই ঘরদোর পরিষ্কার ন্যাকড়া দিয়ে মুছছিল। টেবিল, চেয়ার, তাক, জানালার গরাদ, দরজার পাল্লা। ওই জানালা দিয়েই সে তার বাপকে দেখেছিল একটু আগে। অমনি মনটা খারাপ হয়ে গেল। ওই যে এসেছে তার যম।
গিন্নিমার ঘরে ঢুকেই দুখুরি কাঁদুনে গলায় বলল, ওই আবার এসেছে গো, দ্যাখো গে।
বলাকা চট্টোপাধ্যায়ের বয়স এখন বাহাত্তর চলছে। শরীরে এখনও মেদের সঞ্চার নেই। সাদা থানে গৌরবর্ণা বলাকাকে অনেক সময়ে মানবী বলে মনে হয় না। শোকের একটা গাম্ভীর্য তাকে আরও একটু অবাস্তব দূরত্বে নিয়ে গেছে। ছেলেমেয়েরা কেউ কাছে নেই। একা বাড়ি আগলে তার পড়ে থাকা। এই দুখুরি, রাঁধুনি বামনি, কাজের মেয়েরা, মুনিশ, দু-চারটে কাজের লোক, পাড়া-প্রতিবেশী, জ্ঞাতিরা, কিছু স্মৃতি, কিছু চিহ্ন আর বস্তুপুঞ্জ নিয়ে তার বাস। এই আগলে থাকা ভাল লাগে না বলাকার। একটা মানুষ যতদিন ছিল ততদিন সেই মানুষটার জন্যই এত ফাঁকা লাগত না কখনও। তার স্বামী গৌরহরি চট্টোপাধ্যায় মেজাজি, প্রতাপশালী, খেয়ালি এক মানুষ। তবু সারা জীবন বলাকার কাছে ওই মানুষটাই ছিল যেন সবচেয়ে বেশি। ওই মানুষটাকে ছাড়া যে বেঁচে আছে বলাকা তাতেই সে ভারী অবাক হয়ে যায়। ওকে ছাড়া একটা দিনও কাটবে বলে কখনও ভাবেনি। অথচ অবাক কাণ্ড, এখনও বলাকা বেঁচেই আছে দিব্যি।
ঝন্টু আর মন্টু তাকে নিজেদের কাছে নিয়ে যাওয়ার জন্য টানাটানি করে। বকুল, পারুল, জামাইরা সবাই তাকে নিয়ে যেতে চায়। কিন্তু কোথাও যেতে ইচ্ছেই হয় না তার। মানুষটা নেই, কিন্তু তার শ্বাসপ্রশ্বাসটুকু যেন এখনও আছে।
স্টিলের আলমারি খুলে আজ শাড়ির ডাঁই বের করে মেঝেয় পাতা মাদুরে জড়ো করেছে বলাকা। কমলা আর কালী সাজিয়ে রাখছে থাকে থাকে। কত শাড়ি তার। গৌরহরি কোনও বড় মামলায় জিতলেই একটা শাড়ি বা গয়না আনত। এইভাবে জমেছে মেলা, অনেকগুলো তো পরাই হয়নি আজ অবধি। বলাকা গুণে দেখেছে বেনারসিই আঠারোখানা, পিওর সিল্ক অন্তত পঞ্চাশটা, গরদ কম করেও বারোটা, তাঁত আর সিন্থেটিকের হিসেব নেই।
দুই মেয়ে আর দুই বউমাকে এ সবই আজ ভাগ করে দেবে বলাকা। কোনটা কাকে সেই নিয়েই কথা হচ্ছে। কমলা পুরনো লোক, তার টান বেশি বকুল আর পারুলের ওপর। ভাল শাড়িগুলো সে ওদের ভাগে ফেলতে চাইছিল। বলাকা বলল, তাই কি হয়? বউমারা কী ভাববে তা হলে?
বলাকা আবার একথাও ভাবে, ওদের কারও তো কম নেই। এসব পুরনো শাড়ি-টাড়ি পেয়ে খুশি হবে তো? নাকি মনে মনে নাক সিঁটকোবে?
একখানা ডুরে শাড়ি বেরোল এক ডাঁই শাড়ির তলা থেকে। সাদা খোলের ওপর টানা লাল সবুজ নীল ডুরে। তেমন কোনও বাহারি শাড়িও নয় এবং বহরে একটু খাটো। শাড়িটা এত পুরনো যে সাদা রংটা হলদেটে হয়ে গেছে। তেমন মজবুতও নেই আর, টানাহ্যাঁচড়া করলে ফেঁসে যাবে। শাড়িটা কোলে নিয়ে একটু বসে রইল বলাকা। চোখে জল আসি-আসি করে যে!
দশ সাড়ে দশ বছর বয়সে বিয়ে হল পরিপূর্ণ যুবক গৌরহরির সঙ্গে। বলাকা তখন মেয়েমানুষই হয়ে ওঠেনি ভাল করে। ভয়ে আধমরা। আর বরটি এত ছোট্ট একটা বউ পেয়ে মোটেই খুব স্বস্তিতে ছিল না। নাক সিঁটকে বলত, এ বাবা এর তো এখনও নাক টিপলে দুধ বেরোয়! গৌরহরি তাকে তার বউ বলেই ভাবতে পারত না। স্বামীর বিছানাতেই শুত বটে সে, কিন্তু স্বামী-স্ত্রীর মতো নয়। ঘুমের মধ্যে হাত-পা ছোড়ার অভ্যেস ছিল তার, গৌরহরি তাই খ্যাপাত, ঘুমের ভান করে তো দিব্যি লাথি ঘুঁষি চালাও দেখছি! ভীষণ লজ্জা পেত বলাকা। তেরো বছর বয়স অবধি ওরকমই চলেছিল। প্রাপ্তবয়স্ক এক পুরুষের পাশে একটি নাবালিকাই মাত্র ছিল সে। তেরো বছর বয়সে একবার টাইফয়েড হয়ে বলাকার যায়-যায় অবস্থা। তখন গৌরহরি তাকে বেডপ্যান দিত, জামাকাপড় পালটে দিত। লজ্জায় আজও মরে যায় বলাকা। কিন্তু গৌরহরি তখনও তাকে তো মেয়েমানুষ হিসেবে দেখতেই শুরু করেনি। বিয়ের পর চার বছরের মাথায় একদিন গৌরহরি একটা মামলার কাজে কলকাতা যাচ্ছে। সেই রাতে তার ফেরার কথা নয়। কিন্তু হঠাৎ বলাকা তাকে বলে বসল, আজ ফিরবে কিন্তু, আজ আমাদের বিয়ের তারিখ। গৌরহরি অবাক হয়ে বলল, তাই নাকি?
তখন বৈশাখ মাসের শেষ। দুদিন পরই সংক্রান্তি। সেই দিন সন্ধের পর এক ক্ষ্যাপা মহিষের মতো মেঘ উঠল আকাশে। সেই সঙ্গে এক অতিকায় কালবোশেখী। জীবনে ওরকম ভয়ংকর ঝড় বলাকা আর দেখেনি। চারদিকে যেন মধ্যরাতের অন্ধকার ঘনিয়ে উঠল, আর পাগলা মোষের মতোই ছুটে এল ঝড়। উপড়ে পড়তে লাগল গাছ, উড়ে গেল আশপাশের চালের টিন। গোরু, কুকুর, হাঁসমুরগিদের যে কী প্রাণান্তকর আর্তনাদ! আর সেই সঙ্গে শাঁখের শব্দ, মানুষের চেঁচামেচি। সেই প্রচণ্ড ঝড় আর বৃষ্টিতে রাস্তাঘাট গেল ভেসে, গাছ উপড়ে পড়ে চলাচল বন্ধ।
খুব ভাবছিল বলাকা। জানালায় দাঁড়িয়ে কেঁদেছিল অঝোরে। এই ঝড়ের দিনে সে লোকটাকে ফিরতে বলে দিয়েছে, যদি ফেরে তা হলে কোন অপঘাত ঘটে তার ঠিক কী?
ভয়টা অমূলক ছিল না তার। বউয়ের কথার দাম রাখতে প্রবল ঝড়ের সূচনা দেখেও গৌরহরি হাওড়ায় এসে ট্রেন ধরেছিল। বর্ধমান পৌঁছতে সময় লেগেছিল অনেক। তারপর ওই ডাকাবুকো মানুষটা সেই ঝড়-বৃষ্টি-বজ্রাঘাত মাথায় করে হেঁটে অতিক্রম করেছিল গোটা পথ। চারবার আছাড় খেয়ে, ভিজে, জলকাদা মেখে যখন বাড়ি পৌঁছেছিল তখন ভোর চারটে। ঘুম-কাতুরে বলাকা সেই রাতে ঘুমোতেই পারেনি। দু চোখ সটান মেলে শুয়ে শুয়ে শুধু ঠাকুর-দেবতাকে ডেকেছে। গৌরহরি উঠোনে পা দিতেই কী করে যেন সে-ই টের পেয়েছিল তার মানুষটা এসেছে। কড়া নাড়ার আগেই দরজা খুলে দিয়ে সে ডুকরে কেঁদে উঠেছিল, তুমি এসেছ?
গৌরহরি খুব অবাক। একটু হেসে বলল, কী করে টের পেলে?
অভিমানভরে বলাকা বলেছিল, আমি পাবো না তো কে টের পাবে?
গৌরহরির মুখটা হ্যারিকেনের আলোতেও উদ্ভাসিত দেখাচ্ছিল। পোর্টম্যান্টো খুলে শাড়ির প্যাকেটটা বের করে তার হাতে দিয়ে বলল, ইংরিজি মতে বিয়ের তারিখ পার হয়ে গেছে। কিন্তু দিশি মতে এখনও পেরোয়নি। শাড়িটা পরো।
এই শাড়ির দাম কে দেবে? কে জানবে এ-শাড়ির প্রতিটি সুতোয় কত ভালবাসা জড়িয়ে আছে! সেই প্রথম গৌরহরি তাকে মেয়েমানুষের দাম দিল। হয়তো সেদিনই তাকে প্রথম বউ বলে মনে হল তার।
চোখের জল মুছে শাড়িটা কমলার হাতে দিয়ে বলল, এটা আলমারিতে তুলে রাখ।
কালী বলল, কেন যে তুমি থান পরো তা বুঝি না। আজকাল বিধবারা অত মানে না তোমার মতো। সাদা খোলের শাড়ি পরলেই তো হয়।
বলাকা জবাব দিল না। বড় দেওরের ছেলে বিজুটা বড্ড ফচকে। সেদিন এসে বলল, ও বড়মা, থানটা কি বিধবাদের জার্সি নাকি? তুমি কি জানো যে, থান পরলে তোমাকে পাথরপ্রতিমা বলে মনে হয়?
আজকাল বিধবারা অম্বুবাচী করে না, কেউ কেউ মাছমাংসও খায় এসবও বলছিল বিজু। বলাকা হেসে বলল, আর বলিসনি রে ছেলে। বিধবারা তো বিয়েও করছে। আমরা সেকেলে লোক, আমাদের ছেড়ে দে বাবা, আর একেলে করে তুলবার চেষ্টা করিসনি।
না বড়মা, তোমাকে আর মানুষ করা গেল না। তবে থাকো তুমি দেবী-টেবী হয়ে।
পুরনো শাড়িগুলোর প্রত্যেকটার গায়েই একটা করে গল্প আর ঘটনা জড়িয়ে আছে। আছে দীর্ঘশ্বাসও। কয়েকটা বেছে আলমারিতে তুলে রাখল বলাকা। কোনওদিন পরবে না আর, শুধু মাঝে মাবে নেড়ে-চেড়ে দেখবে।
ও মা! কথা কানে যাচ্ছে না তোমার?
চোখ তুলে দুখুরিকে দেখে বলাকা বলে, কী হয়েছে?
বলছি না, বাবা এসেছে।
তাই নাকি?
হ্যাঁ গো, উঠোনে বসে খইনি ডলছে।
তাতে কী হল?
ফের বিয়ের কথা বলবে যে! আজ খুব বকে দাও তো!
বিয়ের কথা বলবে কী করে বুঝলি?
খুব জানি। আমাকে বেচে দোকান আর মোষ কিনবে।
ব্যাপারটা সবাই জানে। তবু কমলা আর কালী খুব হাসছিল। বলাকা হাসল না, দুখুরির বয়স এখন দশ-এগারো, ঠিক যে বয়সে তার নিজের বিয়ে হয়েছিল। দেহাতে এখনও এই বয়সেই মেয়েদের বিয়ে হয়ে যায়। পরে গাওনা হয়। কিন্তু মুশকিল হল, দুখুরি তার বাপের মতো দেহাতের মানুষ নয়। পাঁচ ছয় বছর বয়সে তার মা মারা যাওয়ার পর বাঙালি রাম কাহার মেয়েটাকে বলাকার কাছে গচ্ছিত করে দিয়ে নিজে আর একটা বিয়ে করে। গত পাঁচ ছয় বছরে দুখুরির গায়ে অন্য হাওয়া লেগেছে। সে এখন লেখাপড়া করে, ইস্কুলে যায়, চারদিকটা দেখে এবং বুঝতেও পারে, দেহাতি নিয়ম চাপালে চলবে কেন?
কিন্তু বাঙালিরও কিছু বক্তব্য আছে। মাত্র হাজার খানেক টাকা হলে সে ননী পালের দোকানঘরটা নিতে পারে। আরও হাজার দুয়েক পেলে একটা বাচ্চা মাদী মোষ কিনবার জো হয় তার। শুধু বেকারির দিশি বিস্কুট বেচে অত বাড়তি টাকা ফেলবার উপায় নেই। কিন্তু দুখুরির বিয়ে দিলে দু-আড়াই হাজার তার হাতে আসে। পাত্রও প্রস্তুত। বর্ধমানের পান-বিড়িওলা লছমন দাসের ছোট ছেলে রণবীর। কথা হয়ে আছে। তাই কিছুকাল যাবৎ ঘুরঘুর করছে বাঙালি। মেয়েকে নিজের অধিকারবলে টেনে নিয়ে যাবে তেমন তাকত নেই তার। চাটুজ্যেদের প্রতিপত্তির কথা সে জানে। সহিষ্ণুতা এবং বিনয়বচন আর কাকুতিমিনতি ছাড়া তার অন্য পথ নেই। দুনিয়া যে অনেক এগিয়ে গেছে, মেয়েদের যে আর ধরে বেঁধে বিয়ের ফাঁস পরানো যায় না এসব খবর সে রাখে না। সে শুধু সাদাসাপটা হিসেবটা বোঝে, মেয়ের বিয়ে দিয়ে দিলে তার দোকানঘর আর একটা মোষ হয়ে যায়। আর এটা হলে তার অনেক দিনের স্বপ্নটাও সার্থক হয়।
বলাকা বলল, অত ভয় পাস কেন? আমি তো আছি। বাঙালিকে তো বলেছি তোর বিয়ে আমি দেবো।
তবে কেন ঘুরে ঘুরে আসে বলো তো! আজ ভাল করে বকে দিও।
তোকে অত ভাবতে হবে না, ভাল করে ঘরদোর ডাস্টিং কর।
দুখুরি চলে গেলে মায়াভরে দরজাটার দিকে চেয়ে থাকে বলাকা। মাঝে মাঝে ইচ্ছে হয়, বাঙালিকে তিন হাজার টাকা দিয়ে দুখুরিকে রেখেই দেয়। কিন্তু একজন দুঁদে উকিলের ঘর করে বলাকার কিছু বাস্তববুদ্ধি হয়েছে। সে জানে টাকা নিয়ে আপাতত মহানন্দে চলে যাবে বটে বাঙালি, কিন্তু কিছুদিন বাদে ফের টাকায় টান পড়লে এসে হাজির হবে। ফের ঘ্যান ঘ্যান করবে। এ এক জ্বালা!
দুখুরি যে খুব কাজের মেয়ে তা নয়, ফাঁক পেলেই খেলতে লাগে। ঘুমোনোর নেশা আছে। কাজের জন্য নয়, দুখুরি বলাকার একটা সম্বল। ফাঁকা বাড়িতে ও সারাদিন কাছেপিঠে থাকে, ডাকলে সাড়া দেয়। কত কথা কয় বসে বসে। বলাকার এখন জনের অভাব।
তা বলে কি বাঙালিকে দুর দুর করে তাড়িয়ে দিতে পারে বলাকা? পারে না, কারণ যত দূরের মানুষ হোক, বাঙালির তো পিতৃত্বের একটা অধিকার আছেই।
খইনিটা মজে এসেছে। শেষ কয়েকটা তালি লাগিয়ে আর একটু ডলে বাসু আর গোকুলকে ভাগা দিয়ে নিজেরটুকু ঠোঁটে ফেলল বাঙালি। হ্যাঁ, জমেছে। মুখে দিতেই মনটা যেন খুশ হয়ে গেল।
গোকুল বলল, ও বাঙালি, উঠোনে থুথু ছিটোস না যেন। মা দেখলে আস্ত রাখবে না।
আরে নেহি বাবা, উঠানমে কৌন থুক ফেলবে?
দোতলা থেকে বলাকাকে নামতে দেখে গোকুল আর বাসু পালাল।
কী রে বাঙালি, কিছু বলবি?
বাঙালি শশব্যস্তে উঠে হাতজোড় করে “রাম রাম” দিয়ে এক গাল হাসল, তবিয়ত ঠিক আছে তো মাতাজি?
আছি একরকম বাবা। তা তোর কী খবর? বিয়ে পাকা করে এলি নাকি?
ভারী লজ্জা পেয়ে মাথা নত করে বাঙালি বলে, ঠিকঠাক তো সব আছে। আমি বলেছি কী, শাদি এখুন হোবে, গাওনা দশ বরষ বাদ।
দশ বছর বাদে দুখুরি যে কলেজে পড়বে সে খেয়াল আছে তোর? পাত্র তো লেখাপড়াই জানে না ভাল করে।
হাঁ হাঁ, কেনো জানবে না, উ ভি ইস্কুলে পড়ছে। পাস ভি দিবে।
ও তোর বানানো কথা। বিয়ে দিবি দেশওয়ালির সঙ্গে, দুখুরি তো দেহাতি ভাষা বলতেই পারে না।
তো কী আছে মাতাজি? বাংলা বলবে। রণবীর ভি বাংলা বলতে পারে।
তোকে তো বলেছি, দুখুরিকে আমায় দিয়ে দে। ওর ভাবনা তোকে ভাবতে হবে না। বিয়েও আমিই দেবো। কথাটা কেন পছন্দ হচ্ছে না তোর?
উ বাত তো ঠিক আছে মাতাজি। লেকিন ননীবাবুর দুকানটা শম্ভুবাবু লিয়ে লিবে। ভৈঁষওয়ালা ভি বলছে আর দেরি হলে মুশকিল।
আঠারো বছর বয়সের আগে মেয়ের বিয়ে দিলে জেল খাটতে হয় তা জানিস?
যেন খুব একটা হাসির কথা হয়েছে, এমনভাবেই হাসল বাঙালি, হাঁ, উ তো বাবুলোগদের জন্য আছে। মুলুকমে উরকম শাদি হরবখত হচ্ছে।
তা জানি বাবা। তোরা আইনকানুন একটুও মানিস না। কিন্তু মেয়ে যদি থানায় যায় তা হলে বিপদে পড়বি। দুখুরির একটুও মত নেই বিয়েতে।
ভারী অবিশ্বাসের সঙ্গে চেয়ে থাকে বাঙালি, থানায় যাবে? থানায় যাবে দুখুরি?
তুই বেশি চাপাচাপি করলে যাবে না তো কী? তোকে দেখলেই মেয়েটা ভয় পায় কেন রে?
বাঙালি উবু হয়ে বসে পড়ল। মাথায় হাত। দুখুরি থানায় যাবে, এতটা ভাবেনি বাঙালি। খইনির থুতু গিলে ফেলায় একটা দুটো হেঁচকি উঠল তার।
বলাকার একটু মায়া হল। বলল, শোন মুখপোড়া, দুখুরি এখন আমার কাছেই থাকবে। বড্ড মায়া পড়ে গেছে আমার। দোকান আর মোষ কেনার টাকা আমি তোকে দেবো। কিন্তু টাকা নিবি লেখাপড়া করে। পরে ফের বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে এলে কিন্তু বিপদে পড়বি। বুঝেছিস?
খুব বুঝেছে বাঙালি। তাড়াতাড়ি হাতজোড় করে বলে, রাম কি কৃপা মাতাজি। দুকানটা আর ভৈঁষটা হলে হামার আর কুছু লাগবে না।
মনে থাকে যেন। কখানা ভাল বিস্কুট রেখে যা। আমার নাতি-নাতনিরা দিশি বিস্কুট খেতে ভালবাসে। খাস্তা দেখে দিস বাবা।
বাঙালি বিস্কুট নিয়ে ভারি ব্যস্ত হয়ে পড়ল।
গৌরহরি চাটুজ্যে দুঁদে উকিল হলেও বিষয়বুদ্ধি তেমন ছিল না। খরচের হাত ছিল বড্ড বেশি। এ নিয়ে বলাকার চাপা ক্ষোভ ছিল। স্বামী-স্ত্রীতে কখনও ঝগড়াঝাঁটি বা মন কষাকষির বালাই ছিল না তাদের। গৌরহরির কথাই সুপ্রিম কোর্ট। তবু এ নিয়ে মাঝে মাঝে মৃদু একটু-আধটু অনুযোগ কখনও তুলেছে বলাকা। গৌরহরি জবাবে বলত, ভার কমাও বলাই, ভার কমাও। নইলে মরার সময় বড্ড কষ্ট হবে যে!
বলাই বলে বলাকাকে ডাকার আর কেউ নেই। ঠাট্টার ওই ডাক আজও যেন কানকে স্নিগ্ধ করে দেয়। আর কী আশ্চর্য, গৌরহরি চলে যাওয়ার পর বলাকারও যেন টাকাপয়সা, বিষয় সম্পত্তির ওপর টান হঠাৎ ছিঁড়ে খুঁড়ে গেল। জেটি থেকে স্টিমার যেন পৃথক হয়ে ভেসে আছে। কোনও বাঁধন নেই। তাই দোনোমোনো করেও টাকাটা বাঙালিকে কবুল করে ফেলল বলাকা। সামান্যই টাকা। তার তো অভাব নেই। গৌরহরি অনেক রেখে গেছে, তার ওপর ছেলেরা পাঠায়, মেয়েরা পাঠায়। টাকা কোন কাজে লাগে তার? চাল ডাল সবজি কিছুই কিনতে হয় না তাকে। বরং ধান, সবজি, দুধ, সর্ষে এসব বিক্রি করেও বেশ টাকা পায় সে। কটা টাকা দিয়ে যদি মা-মরা মেয়েটার মুখে হাসি ফোটানো যায়।
ঘরে এসে ফের আলমারির সামনে বসে বলাকা। চারদিকে ডাঁই করা সব শাড়ি, শায়া, ব্লাউজ।
কমলা গলা নিচু করে বলে, গয়নাগুলোও কি সব দিয়ে দিচ্ছ মা?
কেন বল তো!
নিজের হাতের পাতের কয়েকখানা রেখো।
গয়না দিয়ে করব কী? ওসব আপদ বিদেয় করাই ভাল। শেষে চোরে ডাকাতে নেবে।
তুমি যেন কেমনধারা হয়ে যাচ্ছ। কর্তাবাবা মরল তো তুমি যেন যোগিনী হলে। এমন দেখিনি।
দুর মুখপুড়ি। বুড়ো বয়সে কি গয়না পরে বসে থাকব নাকি?
তাই বললুম বুঝি। বলছি, গয়না তো একটা সম্বল। সোনা-দানা হাতে রাখে না মানুষ?
তা রাখে। দুর্দিনের ভয় পায় বলে রাখে, লোভেও রাখে। আমার সেসব নেই। আমার আসল গয়নাই চলে গেল তো সোনা-দানা দিয়ে কী হবে?
আসল গয়না যে কে তা কমলা জানে, কালী জানে। গাঁয়ের লোকও জানে।
কমলা খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে বলে, একটা মটরদানা হার ছিল না তোমার! সেই যে ডায়মন্ড কাটা মটরদানা গো, কী ঝিকমিকই না করে!
হ্যাঁ। কর্তা দিয়েছিলেন। খয়রাশোলের বড় মামলাটা জিতে খুব আনন্দ হয়েছিল। তাই দিয়েছিলেন।
ওইটে রেখো। তোমাকে বড্ড সুন্দর দেখায়।
দুর! গলায় একটা চেন পরি, এই যথেষ্ট। মেয়েরা, বউমারা খালি গলায় থাকতে দেয় না বলে পরি। আর এই হিরের আংটিটা। এটা ঝন্টু চাকরি পেয়ে দিয়েছিল, তাই খুলিনি। ব্যস, আর কিছু রাখব না।
উঠোনে একটা শোরগোল উঠল। দুজন মুনিশ পুকুরে জাল ফেলেছিল। মস্ত একটা কাতলা তুলে এনে উঠোনে ফেলেছে।
দোতলার বারান্দায় এসে দাঁড়িয়ে মাছটা দেখল বলাকা। পাকা কাতলা, এখনও কানকো নড়ছে। তার কি মাছ দেখে লোভ হয়? একটুও হয় কি?
মুখটা ফিরিয়ে নিল বলাকা। না, তার কোনও লোভ নেই। একটা মানুষের সঙ্গে সঙ্গেই যেন চলে গেল ওসব। এখন আঁশটে গন্ধে তার গা গুলোয়।
এই যে আজ তার ছেলেমেয়েরা আসবে, নাতি-নাতনিরা দামাল পায়ে সারা বাড়ি দাপিয়ে বেড়াবে, হাসিখুশি হইহট্টগোল হবে এসব ভালই লাগবে বলাকার। ভর ভরন্ত সংসার কার না ভাল লাগে? তবু সব থেকেও বুকের একটা পাশ যেন চিরকালের মতো ফাঁকা হয়ে গেছে। ওইখানে অন্ধকার আর হু হু করে বিরহের বাতাস বহে যায় সারাক্ষণ।
ভালবাসা কারে কয়? দশ বছর বয়সের বালিকা কামবোধহীনা বলাকা তা জানতই না। আবার মেয়েদের সহজ সংস্কারবশে জানতও। সে এক জানা না-জানার রহস্যময় আলো-আঁধারিতে তাদের শুভদৃষ্টি। ঘুমকাতুরে বলাকার বিছানায় এক প্রাপ্তবয়স্ক অচেনা পুরুষ—তার তথাকথিত স্বামী। পনেরো বছর বয়সের তফাত। দেহ জাগেনি, মন জাগেনি। রজোদর্শনও হয়নি তখনও। তার শোওয়া খারাপ ছিল বলে লোকটা তাকে সযত্নে পাশ ফিরিয়ে দিত। পাছে চঞ্চলতাবশে ঘুমের ঘোরে খাট থেকে পড়ে যায় সেই জন্য বারবার উঠে পাশবালিশের ব্যারিকেড ঠিকঠাক করে দিত। আর টাইফয়েডের সময় তো কোলে তুলে বাথরুমেও নিয়ে গেছে। টাইফয়েডের যখন বাড়াবাড়ি যাচ্ছে তখন আর বাথরুমে গিয়ে বসবার ক্ষমতাও ছিল না বলে বেডপ্যান দিত ওই লোকটাই। এসবের ভিতর দিয়েই বুনে ওঠে ভালবাসা। তার অত বাহার নেই, রোমান্স নেই, কিন্তু ভিতরে ভিতরে সে এমন বজ্ৰবাঁধন তৈরি করে যে আর জোড় ভাঙে না কখনও, ভালবাসা কি শুধু উথালপাথাল ঝড় জল, নাকি উথলে-পড়া দুধ, নাকি বর্ষায় ফুলে ফুলে ছেয়ে যাওয়া কদম গাছ, নাকি সুফলা বছরে সম্পন্ন গৃহস্থের ধানের গোলা, সে কি সেতারের মির, নাকি আশ্চর্য সুগন্ধ কোনও? না না, ওরকম নয়। ওরকম নয় কিছুতেই। দুটো নারী-পুরুষের সম্পর্কই তো শুধু নয়, তার মধ্যে শ্বশুর-শাশুড়ি, দেওর-ননদ, গোরু-ছাগল, পাখি-পশু, খরা-বন্যা, কাঙাল-ভিখিরি কত কী ঢুকে পড়ে এসে। সহবত, নিয়মকানুন, অভদ্রতা ভদ্রতা—সব মিলিয়ে সম্পর্ক কি সোজা কথা? তারা যেন এক কুলি আর এক কামিন সযত্নে খেটেপিটে রচনা করেছিল এই সংসার। কাজ ভাগ করা ছিল, দায় ছিল, দায়িত্ব ছিল।
দশ বছর বয়সে বিয়ে। একটি সমর্থ পুরুষের ছায়ায় সে ক্রমে ক্রমে বয়ঃসন্ধি পেরোল। তার সংযত পুরুষটি স্ত্রীর যৌবন সমাগমের জন্য অপেক্ষা করেছিল, কখনও নিয়ম ভাঙেনি কোনও। পৌরুষের অন্যায্য জোর খাটায়নি কখনও। তার কাম কখনও ছিল না অন্ধ ও বধির। দীর্ঘকায়, গৌরবর্ণ, অতীব সুপুরুষ এই লোকটি কখনও ছিল বাবার মতো স্নেহশীল ও প্রযত্নপরায়ণ, কখনও ছিল বন্ধুর মতো বিশ্বস্ত দোসর, কখনও নির্জন রাতে গোপনে হ্যারিকেন জ্বেলে ষোবলা গুটি খেলতে খেলতে হয়ে যেত তার সঙ্গী খেলুরি। বলাকা বুঝতেই পারেনি, লোকটি তার কে? শুধু বুঝত, একে ছাড়া তার চলে না।
তারপর ক্রমশ শরীরে বন্যার জল এল তার, কূল ভাসিয়ে। কানায় কানায় ভরে এল সে। এক পাগল বর্ষার রাতে হ্যারিকেনের নিবু নিবু আলোয় মানুষটার মুখের দিকে চেয়ে হঠাৎ যেন চিনতে পেরেছিল তাকে বলাকা। দুটি লীলায়িত হাতে তার কণ্ঠ বেষ্টন করে লজ্জায় মরে গিয়ে খুব আস্তে বলেছিল, এবার…।
সেই রাতের কথা মনে পড়লে আজও এই বাহাত্তর বছরের শরীর ও মনে একটা ঝংকার ওঠে, রক্তে নুপূর বেজে যায়। বিবশ হয়ে যায় মন। সে তো শুধু কাম নয়, সে এক অপার্থিব নিবেদন। একটি চুম্বন গড়ি, দোঁহে লই ভাগ করি, এ বিশ্বে মরি মরি এত আয়োজন। এ হল সেই পৃথিবীর কথা যখন দেবতারা পুষ্পবৃষ্টি করতেন। যখন শরীর জুড়ে শঙ্খধ্বনি আর জোকার শোনা যেত।
বড়মা! ও বড়মা।
দুটি টইটুম্বুর চোখ তুলে দরজাটা বড্ড আবছা দেখল বলাকা। গলার স্বরটা অবশ্য চেনা।
আয়। দুদিন আসিসনি তো! কী হয়েছিল?
পান্নার সঙ্গে ওর বয়সি একটা মেয়ে। চোখের জলটা আঁচলে মুছে ভাল করে দেখল বলাকা। ভারী ফুটফুটে চেহারার মেয়ে। কিন্তু মুখটা বড় দুঃখী।
কাঁদছিলে নাকি বড়মা? জ্যাঠার কথা মনে পড়লে আমারও যে কী ভীষণ কান্না পায়!
কষ্ট করে একটু হাসল বলাকা।
কিন্তু অনেক কেঁদেছ বড়মা। আর কেঁদো না। অজ্ঞান হয়ে জ্যাঠার খাট থেকে পড়ে গিয়েছিলে সেদিন, মাথা কেটে রক্তারক্তি। কী ভয় পেয়েছিল সবাই।
বলাকা একটু হেসে বলল, তবু তো মরিনি। তার আগেই যে কেন গেলাম না সেই দুঃখ কি কম? আয় বোস সামনে। তোকে একটু দেখি।
সঙ্গে কাকে এনেছি বলো তো! চেনো একে?
বলাকা একটু তাকিয়ে থেকে বলল, আমলের মেয়ে না?
ও মাঃ চিনলে কী করে, আগে দেখছ কখনও?
না রে। শুনেছি ওরা গাঁয়ে এসেছে। তা ছাড়া ওর মুখে অমলের মুখের আদল আছে।
মেয়েটা এগিয়ে এসে একটু আড়ষ্টভাবে দাঁড়িয়ে থেকে হঠাৎ বলল, আচ্ছা, আমি কি আপনাকে প্রণাম করব?
না, না, প্রণাম করতে হবে না, একটা মোড়া টেনে নিয়ে বোসো।
মোড়াতে নয়, মেয়েটা ঝুপ করে মেঝেতেই বলাকার মুখোমুখি বসে পড়ল। পাশে পান্না।
কী করছিলে বড়মা? আজ তো তোমার খুব আনন্দ, না? সবাই আসছে।
বলাকা হেসে বলল, আনন্দ তো বটে মা, কিন্তু ফের যখন চলে যাবে সবাই, তখন আমি যে একা সে-ই একা।
ও বড়মা, বাবাকে বলো না, আমি এসে তোমার কাছে থাকি।
থাকবি?
এত বড় বাড়িতে তুমি একা একা থাকো, তোমার ভয় করে না?
বলাকা হেসে বলে, ভয়! ভয়টা কীসের?
আমার যা ভয়! বাব্বাঃ, ভয়ে যেন মরে যাই। মাঝে মাঝে এমন হয়, যেন ভয়ে হার্টফেল হয়ে যাবে।
তোর তো চিরকাল ভয়। সেই ছোট থেকে। আমার কাছে এসে থাকতে চাস সে তো খুব ভাল কথা। কিন্তু এই ফাঁকা বাড়িতে তো তোর আরও ভয় করবে।
ম্নান মুখে পান্না বলে, সেটাই তো প্রবলেম। তোমার কেন ভয় করে না বলো তো!
কাকে ভয় করব? ভূতপ্রেতকে! আমি নিজেই তো ভূতপ্রেতের কাছাকাছি চলে গেছি, আর ভয় করে কী হবে?
তুমি বড় জ্যাঠাকে দেখতে পাও?
না, তবে দেখতে পেলে ভয় পেতাম না। খুশিই হতাম।
তোমার দুর্জয় সাহস বড়মা। আর এই যে দেখছ সোহাগ, এরও খুব সাহস। রাতে একা একা বেরিয়ে পড়ে, জানো? বলে কী, ভূতেরা নাকি ওর বন্ধু! হিঃ হিঃ!
মেয়েটার দিকে তাকাল বলাকা। মুখের বিষণ্ণতাটা ভারী গভীর। পোশাকটাও ভাল নয় তেমন। রংচটা একটা ঢোলা বুলেটে রঙের কামিজ আর একটা কালচে সালোয়ার। গায়ে কোথাও গয়নার চিহ্ন নেই।
বলাকা মৃদু স্বরে বলে, রাতবিরেতে একা একা বেরোনো ভাল নয়। গাঁ-গঞ্জেও পাজি লোক আছে
মেয়েটা বড় বড় চোখ করে বলাকার মুখের দিকে চেয়ে ছিল। খুব এক নজরে। হঠাৎ বলল, আপনাকে দেখলে রিয়েল বলে মনেই হয় না, মনে হয় ম্যানেকুইন বা স্ট্যাচু।
এটা প্রশংসা না নিলে বুঝতে না পেরে বলাকা হেসে ফেলল, বলল, হ্যাঁ, এখন স্ট্যাচুই হয়ে গেছি। বোধবুদ্ধিও বোধহয় আর কাজ করে না।
মেয়েটা মাথা নেড়ে বলে, তা বলছি না, ইউ লুক হেভেনলি। আপনি তো পারুলের মা!
‘পারুলের মা’ শুনে একটু অবাক হল বলাকা। পারুল তো আর ওর সমবয়সি নয়। তবু রাগ হল না। সাহেবি কেতায় ওরকমই সব বলে বোধহয় ওরা। ঠিকঠাক সব হলে আজ তো পারুলেরই ওর মা হওয়ার কথা ছিল।
আজ মনে হয়, বিয়েটা না হয়ে বেঁচেছে পারুল। সবটুকু অবশ্য বাঁচেনি। মায়েরা অনেক কিছু টের পায়। বলাকাও পেয়েছিল। পারুল কিছুই ভেঙে বলেনি তাকে। তবু ঘটনা যে একটা ঘটেছিল এটা খুবই স্পষ্ট টের পেয়েছিল বলাকা। মা আর মেয়ের মধ্যে একটা লুকোচুরি চলছিল বটে, কিন্তু বলাকা নজর রেখেছিল, অঘটনের ফল কতদূর গড়ায়। গড়ায়নি, কিন্তু মর্মে গভীর আঘাত পেয়েছিল বলাকা।
কোনও কথাই সে কখনও স্বামীর কাছে গোপন করেনি। এক রাতে সে গৌরহরিকেও নিজের আশঙ্কার কথা বলে ফেলে। রাগী ও মেজাজি গৌরহরি সটান উঠে বসে বলেছিল, বলো কী? হারামজাদার এত সাহস!
গৌরহরিকে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে ঠান্ডা করতে হয়েছিল। বলাকা বলেছিল, অমলকে শাসন করতে গেলে হিতে বিপরীত হবে যে! চারদিকে রটে যাবে।
গৌরহরি কুঁসছিল রাগে। গরগর করছিল। সেই পুরুষের রাশ ধরা বড় সহজ ছিল না তখন।
মেঘটা কেটে গিয়েছিল কয়েকদিন পর। তারপর পারুলই বেঁকে বসল, অমলকে বিয়ে করবে না। বলাকার মন থেকে ভার নেমে গিয়েছিল।
আজ মেয়েটাকে দেখে সেইসব পুরনো কথা একটা ঝটকা মেরে গেল যেন।
হ্যাঁ, আমি পারুলের মা। পারুলকে চেনো?
হ্যাঁ, চিনি। শি ইজ এ গডেস।
বলাকা হেসে ফেলে, সে কী? পারুল আবার গডেস কীসের?
ওকে আমার ওরকমই লাগে। আই অ্যাডোর হার।
বলাকা খুশিই হল। বলল, বেশ তো, ভালই তো।
সোহাগ আর আমি খুব বন্ধু হয়ে গেছি, জানো বড়মা? ও-ও একটু পাগল, আমিও একটু পাগল। তাই খুব মিল।
তাই বুঝি? তা কী পাগলামি করিস তোরা?
খুব হোঃ হেঃ হিঃ হিঃ করে হাসি, আবোলতাবোল কথা বলি, আচার চুরি করে খাই আর ক্যারিক্যাচার করি।
কিন্তু সোহাগের মুখে তো হাসির চিহ্ন দেখছি না। মুখখানা ভার কেন?
ও খুব চিন্তা করে যে!
কীসের চিন্তা?
সেটাই তো আমি বুঝতে পারি না। সব সময়ে কেবল ভাবে আর ভাবে।
এইটুকু বয়সে অত ভাবো কেন?
সোহাগ মৃদু হেসে মাথাটা নোয়াল।
পুজো অবধি কি থাকবে তোমরা?
সোহাগ উদাস মুখে বলে, কী জানি!
তোমাদের তো কয়েকদিন আগেই চলে যাওয়ার কথা ছিল, শুনেছিলাম।
হ্যাঁ, বাবা হঠাৎ জরুরি কাজে লন্ডন গেছে, তাই আমরা আর যাইনি, কলকাতায় আমার হেলথ হ্যাজার্ড হয়।
সেও যেন শুনেছিলাম। ভালই তো, থাকো। আজ তোমার পছন্দের পারুলও আসবে। সেও পুজো অবধি থাকবে বলেছিল। মাঝে মাঝে এসে গল্প-টল্প করে যেও।
হঠাৎ হি হি করে হেসে পান্না বলে, ও কী বলে জানো বড়মা? বলে, আমি যদি পারুলের মেয়ে হতাম তো খুব ভাল হত।
বলাকার মনটায় একটা ধাক্কা লাগল। হঠাৎ এ কথা বলে কেন মেয়েটা? এরকম ভাবা তো স্বাভাবিক নয়?
আলগা গলায় বলাকা জিজ্ঞেস করে, তাই নাকি সোহাগ?
কথাটার জবাব না দিয়ে সোহাগ হঠাৎ বলল, আপনার নামটা খুব অদ্ভুত, না?
কেন বলো তো!
বেশ আধুনিক নাম।
মোটেই না। রবীন্দ্রনাথ বলাকা লিখেছিলেন সেই কবে। সেই থেকেই তো বাবা আমার নাম রেখেছিল বলাকা। পড়েছ বলাকা?
ঘাড় হেলিয়ে সোহাগ বলে, হ্যাঁ। মেলিতেছে অঙ্কুরের পাখা, লক্ষ লক্ষ বীজের বলাকা। ইট ইজ ফ্যানটাস্টিক।
এ কথায় মুগ্ধ হল বলাকা। না, ততটা সাহেবি চাল নেই তো!
কী খাবে বলো তো!
ফের ঘাড় হেলিয়ে বলল, এনিথিং, এখানে সবাই খুব খাওয়াতে ভালবাসে, না?
বলাকা স্মিত মুখে বলে, খাওয়ানোর মধ্যে একটা আদর থাকে তো!
সোহাগ হাসিমুখেই বলল, আমার মাও আমাকে খুব খাওয়াতে চায়। কিন্তু তার মধ্যে আদরটা থাকে না।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন