শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
কথা বললো, আমার সঙ্গে কথা বলো তুমি। কেউ কি আছ কোথাও? ওই আকাশে, কিংবা শূন্যে, কিংবা পঞ্চভূতে? কেউ যদি কোথাও থেকে থাকো, ঈশ্বর বা সর্বময় কেউ, সর্বশক্তিমান কেউ, একটু চকিত আভাস অন্তত দাও তোমার। তুমি যে আছ, তা বুঝতে দাও। একবার একটিবার মাত্র আমার এই ঘোর আদিগন্ত একাকিত্ব, এই নিঃস্ব মন, এই ক্ষয়িষ্ণু শরীরের, এই অনস্তিত্বময় অস্তিত্বের উৎসকে একবার চিনে নিতে দাও। এতটুকু আভাস যদি পাই তোমার তা হলেই হৃদয় জুড়োবে। বাদবাকি জীবন নিজেকে বহন করা সহজতর হবে।
শীতের গভীর রাত্রি। চারদিকে ঘুমন্ত চরাচর। কুয়াশায় মাখা এক রহস্যময় জ্যোৎস্নার সামান্য ভুতুড়ে আলোয় ছাদে ঊর্ধ্বমুখ হয়ে অমল দাঁড়িয়ে। মাথা গরম। বুকে হাতুড়ির মতো তার হৃৎপিণ্ড আছড়ে পড়ছে ভঙ্গুর পাঁজরে। দাঁতে দাঁতে ঠকঠক শব্দ হচ্ছে। শীত হয়তো আছে, কিন্তু অমলের ভিতরে আজ যেন সব উত্তাপ নিবে গেছে। রক্ত আজ সাপের রক্তের মতো ঠান্ডা। সর্বাঙ্গে বয়ে যাচ্ছে শীতের প্রহারের কম্পন। পৃথিবীতে এত শীতও আছে এতকাল বুঝতেই পারেনি সে। ঘরে লেপের তলায় নিশ্চিন্তে গভীর ঘুমে ঢলে আছে সবাই। তার বউ, ছেলে, মেয়ে। এই শীতের রাতে হঠাৎ এত অনিকেত কেন লাগল নিজেকে কে জানে। লেপের খোলস ছেড়ে সে নিঃশব্দে উঠে এসেছে ছাদে। কেন তাও সে জানে না। শুধু জানে, এই অর্থহীন জগৎ তাকে পাগল করে দিচ্ছে ক্রমে। কেন এই জগৎ? কেন এই চৈতন্য? এর কোনও স্রষ্টা নেই? শেষ নেই? ব্যাখ্যা নেই? অর্থ নেই? কেন এই আশ্চর্য ধাঁধা তার চারদিকে? এ কি অর্থহীন জড়বস্তুর সমাহার? কেন এসব? কী এসব?
না, মোনার সঙ্গে তার কোনও ঝগড়া হয় না আজকাল। বিচ্ছেদ হতে হতেও তারা খাদের কিনারা থেকে কিছুটা সরে এসেছে। খুবই সতর্কতার সঙ্গে নিজের কথা ও আচরণকে নিয়ন্ত্রণ করছে অমল। তার ফলে সমঝোতা চমৎকার দুজনের মধ্যে। দৈহিক সম্পর্কটাও প্রায় নিয়মিত। কিন্তু মানসিক? শুধু অমল জানে, কী শূন্য হৃদয় তার। সেখানে কোনও তরঙ্গই ওঠে না আর। ভাগ্য ভাল মনের ভিতরটাকে আর কেউ দেখতে পায় না।
আজ রাতে এক অলৌকিককে অনুভব করতে চাইছে অমল। তার তো বিশ্বাসের কোনও স্থণ্ডিল নেই। তাকে পৈতে পরিয়েছে বউদি, গায়ত্রী জপ করার পরামর্শ দিয়েছে। তাও কি করেনি অমল? কিন্তু আধখানা মন নিয়ে কি ওসব হয়?
একদিন সে তার বাবাকে জিজ্ঞেস করেছিল, গায়ত্রী জপ করলে কী হয় বাবা? কিছু কি হয়?
প্রশ্ন শুনে মহিম রায় বিস্মিত এবং একটু বিব্রতও। একটু হেসে বলল, কেন রে?
সেই কবে তুমি আমার পৈতে দিয়েছিলে! কিন্তু দণ্ডিঘর ছেড়ে বছরখানেক কিছু করেছিলাম। তারপর সবই ছেড়ে দিয়েছি।
মহিম তার বিদ্বান ছেলেকে কী বলবে তা ভেবে পেল না প্রথমে। অনেকক্ষণ বাদে বলল, মন্ত্র তো মনকে ত্রাণই করে। করার কথা।
আমি তো আজকাল গায়ত্রী জপ করি। কিছু হয় বলে টের পাই না তো!
মহিম ফের একটু বিব্রত। ছেলে সাহেব এবং নাস্তিক হয়ে গেছে বলেই সে জানে। ছেলের সঙ্গে শাস্ত্রালোচনা করতে বোধহয় ভয়ও পায়। তাই খুবই নরম গলায় বলল, সব মন্ত্রেরই একটা সাক্ষাৎকার আছে।
অবাক হয়ে অমল বলে, সেটা কী বাবা?
কথাটা বলেই মহিম আরও বিব্রত এবং অপ্রতিভ। আবার একটু ভেবে বলল, আসলে ওসব একটু ভক্তি-বিশ্বাস নিয়ে করলে ভাল। পরীক্ষা করার মন নিয়ে করতে গেলে তেমন কিছু হয় না।
আমি তো বিশ্বাস করতেই চাই বাবা। কিন্তু জপ করেও তো বিশ্বাস আসছে না। কেন আসছে না বল তো!
বাবার মুখ দেখেই অমল বুঝতে পারছিল, এসব সংগত প্রশ্নের সামনে তার বাবা অসহায় বোধ করছে, থই পাচ্ছে না, কূল-কিনারা পাচ্ছে না। বাবা বিশ্বাস করেই বড় হয়েছে, বিশ্বাস নিয়েই বুড়ো হয়েছে। কখনও তো প্রশ্ন করেনি ব্যাপারটাকে। তার কাছে দুনিয়াটা স্বাভাবিকভাবেই ঈশ্বরসৃষ্ট, এবং তার ঈশ্বর কোথাও আছেন, ঠিকানা না জানা থাকলেও আছেন নিশ্চয়ই। এই বিশ্বাস আমৃত্যু তাকে বন্ধুর মতো সাহচর্য দেবে। এই বিশ্বাস আছে বলেই কোনও লজিক্যাল প্রশ্ন বিষধর সাপের মতো ফণা তুলবে না তার সামনে। কিন্তু অমলের তো তা নয়। তার কাছে এই চারদিকের জগৎসংসার স্বাভাবিক নয়। এ এক ধাঁধা। অর্থহীনভাবে ফলিত হয়ে আছে। এর না আছে উদ্দেশ্য, না আছে অর্থ, না ব্যাখ্যা। ঈশ্বর এক ঠিকানাবিহীন, নামগোত্রহীন নন-এন্টিটি। যদি সে না-ই থাকে তাহলে এই সৃষ্ট জগতের ধাঁধা আরও জটিল ও কঠিন হল। আশ্রয়হীন, সংহতিহীন এক বিশৃঙ্খলা মাত্র। এটা ওটা এখানে সেখানে পড়ে আছে মাত্র, কারও সঙ্গে কারও কোনও প্রয়োজন বা সম্পর্ক নেই। সারা জগংময় ওইসব জড়বস্তুর আয়োজন, যার সমাবেশ থেকে কিছুই বুঝবার উপায় নেই। এসব কেন ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে? কী কাজ করছে এরা? কেন করছে? আর এই জড় জগতে সব কিছু জড়িভৃত থাকার কথা, হঠাৎ তার মধ্যেই কেন চৈতন্যের উন্মেষ? আর তা হলই বা কেন?
ভাবতে ভাবতে পাগলপারা মাথা। মাথার কোষে কোষে জমে ওঠে ধাঁধা, কে এর পিছনে? কী এর কারণ? কোথায় এর শুরু বা শেষ? ছোট ঘরের অবরোধে মধ্যরাতে লেপের মধ্যে ভেপে উঠল তার শরীর। তার চেয়েও বেশি বিকল অচল হল মন, বুদ্ধি, চেতনা। দমফোট অবস্থা।
তার বাবা মহিম রায় বিজ্ঞানের মানুষ নয়। কিন্তু এককালে ইংরিজিতে এম এ পাস করেছিল। গেঁয়ো গন্ধ আজও তার বাবার গা থেকে যায়নি। খুব চোখা চালাক বুদ্ধিমান লোক নয়। মহিম রায় তার মেধাবী ছেলের দিকে চেয়ে বলল, বিশ্বাস জিনিসটা সহজে আসতে চায় না তো। অনেক দ্বিধা আসে, অনেক প্রশ্ন আসে। ওটাই তো লড়াই।
তুমি কবে থেকে ভগবান মানেনা বাবা?
মহিম রায় ভারী অপ্রস্তুত হেসে বলেছিল, সে কি মনে আছে? ছেলেবেলা থেকেই বোধহয়।
কখনও ঈশ্বরকে অবিশ্বাস করতে ইচ্ছে হয়নি?
হয়েছে। কতবার হয়েছে।
এই যে বিশ্বাস থেকে অবিশ্বাস, আর অবিশ্বাস থেকে বিশ্বাস, এই ট্রানজিটারি পিরিয়ডটার কথা আমাকে বলবে?
ছেলের দুর্মর অস্থিরতা টের পাচ্ছিল মহিম। কিন্তু বেশি কথা বলতেও বোধহয় সাহস হল না। সংক্ষেপে বলল, স্বামী বিবেকানন্দেরও তো হয়েছিল শুনেছি। সবারই হয়।
আমার একজন ভগবান দরকার। ভীষণ দরকার।
মহিম এটা হাসির কথা ভেবেই হেসেছিল। গুরুত্বটা বোধহয় বোঝেনি।
তবে কার কাছে যাবে অমল? কে ধরিয়ে দেবে তাকে?
আকাশের দিকে চেয়ে থেকে কোনও লাভ নেই। আকাশ তো কিছু বলে না। এক নিরপেক্ষ বিস্তার মাত্র। যে যা খুশি ব্যাখ্যা করে নাও। এই নীরবতাই বড় অসহনীয় লাগে তার। ভগবান যদি আছ কোথাও, তবে সাড়া দাও না কেন? চোর-চোর খেলার লুকিয়ে থাকা খেলুড়িও তো টু দেয়। সেরকম কিছু? একটা টু শব্দও কি শোনা যাবে না কখনও? এই নির্জন মধ্যরাতে তিনি যদি থেকেই থাকেন— একবারও কি এই তাপিত হৃদয়ের ডাকে দৈবের বাণীর মতো বলে উঠবেন না, আমি আছি?
নাকি নিজের অস্তিত্ব সম্পর্কে তিনি নিজেও নিশ্চিত নন? তাঁরও কি সংশয় হয়, আমি কি আছি, না নেই?
সিঁড়ি ভেঙে কে উঠে আসছে ওপরে?
বিরক্ত হল অমল। এই মধ্যরাতের নির্জনতায় সে তার অস্তিত্বকে খুঁজছে। বড় জরুরি তার প্রয়োজন। এই নিবিড় গভীর ধ্যানমগ্নতায় কেউ এসে হানা দিয়ে শতেক প্রশ্ন করলে সে খানখান হয়ে যাবে। বড় ভঙ্গুর সে, বড়ই পলকা। কোনও অজুহাত নেই তার। কোনও ব্যাখ্যাই নেই তার আচরণের যা লোকে গ্রহণ করবে।
একটা ঝংকার আশা করেছিল অমল। কিন্তু মোনা আজ সেরকমভাবে ঝংকার দিল না। উঠে এসে নিঃশব্দে তার পাশে দাঁড়িয়ে— কে জানে কেন— কাঁধে নরম করে হাত রাখল। তারপর কোনও প্রশ্ন না করে নরম গলায় বলল, ঠান্ডা লাগবে। ঘরে চলো।
খুব অবাক হল অমল। মোনাকে সে বাস্তবিক বাঘের মতো ভয় পায়। কিন্তু ইদানীং মোনার ব্যবহার— হোক কৃত্রিম— খুব বন্ধুর মতো, বুঝদার সাথীর মতো। কোনও প্রশ্নই করল না, কৈফিয়ত চাইল না।
অনিচ্ছুক অমল এই বন্ধুত্বপূর্ণ আহ্বানকে অপমান করল না। ঘাড় নেড়ে বলল, চলো।
ঘরে এসে একটু হাঁফ ধরছিল অমলের। খোলা ছাদে এতক্ষণ প্রচুর অক্সিজেন পেয়েছে সে। বন্ধ ঘরে সেটা নেই।
মোনা দরজাটা বন্ধ করে তার দিকে ফিরে বলল, ঘুম না এলে শোওয়ার দরকার নেই। বসে বসে বরং লেখো।
বিস্মিত অমল বলল, লিখব?
আমি জানি, তুমি লিখতে ভালবাসো। আর যদি ঘুম পেয়ে থাকে তো শোও, আমি তোমার মাথায় একটু হাত বুলিয়ে দিই।
অমল মাথা নেড়ে বলল, না, আমি বরং অন্ধকারে একটু বসে থাকি। চুপচাপ।
তাই থাকো। আর দরকার হলে আমার সঙ্গে কথাও বলতে পার।
এত সহৃদয়তা আশাই করেনি অমল। ঠিক বটে, আজকাল তার সঙ্গে মোনার সমঝোতা চমৎকার। তবু এতটা বন্ধুত্বপূর্ণ হওয়ার কথা নয়। সে বড্ড অবাক হল। তারপর বলল, না, তুমি ঘুমোও। আমারই দোষ হয়েছে মাঝরাতে হঠাৎ ছাদে যাওয়ায়। তুমি হয়তো ভাবছিলে।
দোষ হবে কেন? ঘুম না এলে লোকে তো খোলা জায়গাতেই গিয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু এখন বেশ শীত। এই ঠান্ডায় ছাদে যাওয়াটা বিপজ্জনক।
বুঝেছি। আচ্ছা আমি ঘরেই বসছি বরং।
কফি খাবে?
কফি? এত রাতে কোথায় পাবে?
কোনও অসুবিধে নেই। একটু আগেই বাবা উঠেছেন। ওঁর ঘরে গিয়ে পাঁচ মিনিটেই করে আনব।
অমল অবাক হয়ে বলে, বাবা উঠেছে? চারটে বেজে গেছে নাকি?
কখন। এখন চারটে কুড়ি।
ওঃ, তাহলে তো ভোরই হয়ে গেল।
কফি করে আনি?
আনবে?
বলে একটু দ্বিধা করল অমল। মোনাকে সে পারতপক্ষে কোনও কাজের কথা বলে না।
একটু বোসো। নিয়ে আসছি। বাবাও এ সময়ে কফি খান!
অমল বসে রইল ফাঁকা ঘরে। ছাদ থেকে এসে ঘরে ঢুকতেই সে ঘরের মধ্যে একটা বাসি গন্ধ পেয়েছিল। ভ্যাপস, গা গোলানো গন্ধ। থাকলে পাওয়া যায় না, কিন্তু হঠাৎ বাইরে থেকে এসে বন্ধ ঘরে ঢুকলেই টের পাওয়া যায়, মানুষের শরীরও কিছু দূষণ ছড়ায়।
উঠে সে চোখেমুখে ঠান্ডা জল দিল।
হঠাৎ শুনতে পেল, নীচে মোনা তার শ্বশুরের সঙ্গে কথা কইছে। কী কথা তা বোঝা যাচ্ছে না বটে, কিন্তু মাঝে মাঝে মোনার হাসির শব্দে বোঝা যাচ্ছে দুজনের মধ্যে সম্পর্কটা সৌহার্দ্যপূর্ণ। এসব একটু আজগুবি লাগছে অমলের। কিছুদিন আগেও ছবিটা ঠিক এরকম ছিল না। তাদের বাড়ির লোকজন সম্পর্কে মোনার ধারণা ছিল, এরা একেবারেই আনকালচার্ড, ঝগড়ুটে, নিন্দুক এবং অন্যের ব্যাপারে বড্ড বেশি নাক গলায়। মহিম রায়কে সে একজন ব্যক্তিত্বহীন, অপদার্থ, নির্বোধ লোক বলেই জানত। কথা বলার প্রয়োজনটাও বোধ করত না। ধারণাটা কি পালটে গেল এত তাড়াতাড়ি? নাকি মোনা নিজের ভিতরকার সাপগুলোকে ঝাঁপিতে বন্ধ করে রেখে প্রাণপণে কৃত্রিমভাবে সমঝোতার চেষ্টা করছে? কারণ মানসিকতা এমনিতে তো পালটায় না। তার একটা পদ্ধতি আছে। যাকে প্রসেস বলে। মোনা তেমন কোনও পদ্ধতির ভিতর দিয়ে যায়নি। কিন্তু সে তার বাইরের আচরণ অনেক বদলে ফেলেছে। সেটা কিছু কম কথা নয়। অভিনয় তো অমলও করে যাচ্ছে। সে জানে, এই বয়সে মোনা তাকে ছেড়ে চলে গেলে তার জীবনের ছকটা পালটে যাবে এবং সেটা মোটেই ভাল হবে না। সব সংসারেরই একটা প্যাটার্ন থাকে, প্রেম না থাকলেও। আর সেটাই আসল। সেই ছকটা হঠাৎ হাটকে-মাটকে গেলে যে শূন্যতার সৃষ্টি হয় সেটা সহজে ভরে তোলা যায় না। বন্য, বিশৃঙ্খল জীবন থেকে মানুষ যে সংসার বা পরিবার গড়ে তুলেছিল তা তো এমনি নয়। পরিবারই তাদের রক্ষাকবচ, অনেক মারের হাত থেকে ওই পরিবারই তো রক্ষা করে। প্রেম-প্রেম করে পাগল হওয়ার চেয়ে পরিবারের অবরোধটিকে দৃঢ় করে তোলাই বরং বুদ্ধিমানের কাজ।
একটু বাদে মোনা যখন কফি নিয়ে এল তখন টেবিলে মাথা রেখে অমল ঘুমিয়ে পড়েছে।
মোনা তার মাথায় আলতো হাত রেখে বলল, কফি এনেছি।
চটকা ভেঙে উঠে অমল একটু লজ্জার হাসি হাসল, বলল, হঠাৎ একটু তন্দ্রা এসে গিয়েছিল।
তা তো আসতেই পারে। কফিটা খেয়ে ঘুমোও।
মাথা নেড়ে অমল বলল, না, আর ঘুমোব না।
জপতপ করবে বুঝি?
অমল ফের একটু লাজুক হাসল, করে দেখছি যদি কিছু হয়।
মোনা একটুও বিদ্রূপ না করে বলল, করলে তো ভালই।
অমল হঠাৎ অবাক হয়ে ভাবল, তার বউ মোনা আস্তিক না নাস্তিক তা সে জানে না। এতকাল ঘনিষ্ঠ সাহচর্যের পরও ব্যাপারটা তার জানা হয়নি। কেন হয়নি তাও সে জানেনা। তবে তাদের বাড়িতে কোনও ঠাকুরের আসন-টাসন নেই, ঠাকুর-দেবতার ছবিও নেই। তারা কখনও কোনও ধর্মীয় আচরণ করে না। ওসব নিয়ে কথাও হয় না তাদের। ঈশ্বর প্রসঙ্গই তাদের কাছে বহুকাল যাবৎ অপ্রাসঙ্গিক হয়ে আছে।
সে মোনার দিকে চেয়ে বলল, তুমি বোধহয় এসব মানো না, না?
মোনা করুণ চোখে তার দিকে চেয়ে ছিল। বলল, কী জানি, কখনও তো ভেবে দেখিনি।
তার মানে কি মোনা?
প্রয়োজন না হলে কেউ কি ভগবান নিয়ে ভাবে? আমার বাপের বাড়িতে সবাই খুব নাস্তিক ছিল। মা, বাবা, সবাই। কিন্তু তর্কবিতর্ক ছিল না।
কিন্তু আমাদের বিয়ের সময় তোমাদের বাড়িতে সবই তো মানা হয়েছিল।
হ্যাঁ, তাও হয়েছিল। ওই যে বললাম, কোনও বিতর্ক নেই। প্রয়োজন হলে সব প্রথাই মানা হয়, নইলে নয়। বিয়ের পর দেখলাম তুমিও কিছু মানো না, তাই আমিও কিছু মানিনি আর।
কিন্তু এই যে এখন আমি জপতপ করি, এতে তোমার হাসি পায় না তো!
না। বরং মনে হয়, এটা বোধহয় তোমার দরকার।
দরকার কথাটা ভাল বুঝল না অমল। দরকার মানে কী? বাচ্চাদের যেমন ভুলিয়ে রাখার জন্য খেলনার দরকার হয় এটা কি তেমন? না কি খিদের মুখে যেমন খাদ্যের দরকার তেমন? নাকি বৈজ্ঞানিকের যেমন সত্য বা বস্তুর মূলে যাওয়ার দরকার, তেমন? আসল কথা কী, বস্তুটা নেই, কিন্তু নিজেকে ভুলিয়ে রাখার জন্য ওরকম একটা অলীক কিছু নিয়ে পড়ে থাকা?
এই সংশয় তাকে ছাড়ে না। তাই তো মধ্যরাতে লেপের ওম, ঘরের নিরাপদ আশ্রয় ছেড়ে ছাদে যাওয়া। সে ছাদ অবধিই মাত্র যেতে পেরেছিল। অনেকে আরও দূরে যায়। সন্ন্যাস নিয়ে, বিবাগী বা পাগল হয়ে, গলায় দড়ি দিয়ে। যায়, অনেকেই যায়, মনের ভূত যাদের তিষ্ঠোতে দেয় না।
তার সঙ্গে মোনার একটা লুকোচুরি আছে। বরাবর ছিল, এখন আরও বেশি আছে। তারা আর লড়াই করছে না বটে, কিন্তু সাবধানে পরস্পরকে নজরে রাখছে। কেউ কাউকে বিশ্বাস করছে না। বিদ্রূপও করছে না। আক্রমণ করছে না আর। বরং তারা পরস্পরের সঙ্গে শরীরের সম্পর্কে আসছে, এক বিছানায় শুচ্ছে, অত্যন্ত ভদ্রভাবে কথা কইছে। কিন্তু এসব সৌজন্যের ফলে দূরত্ব কি বেড়ে যাচ্ছে আরও? দেঁতো হাসি, দাঁত নখ লুকিয়ে পরস্পর গাঁ-ঘেষাঘষি, এ কি কাছে আসা, না দূরে যাওয়া?
এসব বুঝতে আজকাল খুব শক্ত লাগে অমলের। তার কাছে ক্রমে এই সম্পর্কের জটিলতা আরও বাড়ছে। সে বিজ্ঞানের ছাত্র, গণিত ভালই জানে। যত শক্ত অঙ্কই হোক, তার একটা সমাধান আছেই আছে। কিন্তু সম্পর্কের গণিত মাঝে মধ্যেই আবছায়া হয়ে যায়, মাথা দিয়ে বোঝা যায় না, হৃদয় দিয়েও নয়। এ যেন পরস্পরের সামনে থেকেও, কাছাকাছি থেকেও কোনও দুরূহ কোণে বা আবডালে লুকিয়ে থাকা।
অসহায় মুখ তুলে অমল বলল, আমার যে জপতপ দরকার এটা তোমার কেন মনে হয় মোনা?
ইউ আর রেস্টলেস। তোমাকে আমি সবসময়ে একটা অস্থিরতায় ভুগতে দেখি। মেন্টাল প্রবলেম তোমার অনেকদিনের। আমি ভাবতাম পারুলের সঙ্গে তোমার লাভ অ্যাফেয়ারের জন্যই বোধহয় ওটা হয়।
এখনও কি তাই ভাবো?
কী ভাবব তা বুঝতে পারি না। তুমি তো কখনও আমাকে সব কথা খুলে বলো না। কিন্তু এটাও তো ঠিক যে, তুমি আর ইয়ংম্যান নও। মাঝবয়সি। এ বয়সে ওসব অতীতের তত প্রভাব থাকার কথা নয়। তবে কিছু বলাও যায় না। শুধু দেখতে পাচ্ছি, তুমি আরও রেস্টলেস হয়ে যাচ্ছ। তোমার বন্ধু হওয়ার চেষ্টা তো আমি করেছি, তাই না? আমি তোমাকে বুঝবার চেষ্টাও করেছি।
অমল বড্ড লজ্জায় পড়ল এ কথায়। মাথা নেড়ে বলল, হ্যাঁ-হ্যাঁ। অ্যান্ড থ্যাংক ইউ ফর দ্যাট। ফর এভরিথিং।
লক্ষ করছি তুমিও আমাকে মেনে নেওয়ার চেষ্টা করছো। হয়তো ভালবাসারও চেষ্টা করছ। কিন্তু একটা ডিসকর্ডও আছে। বেসুরো কিছু। সেটাই বুঝতে পারছি না। সেটা কি পারুল? সে তো এখন তিনটে বাচ্চার মা। তাই না?
অমল সবেগে মাথা নেড়ে বলল, না মোনা, পারুল নয়।
তাহলে?
আমি ঠিক জানি না।
হয়তো জেনেও বলতে চাও না। তোমাকে অস্বস্তিতে ফেলব না বলেই আমি কখনও তোমার কাছে জানতে চাইনি। এখনও চাই না। তবে আমি চাই ইউ কাম আউট অফ দি স্টুপর। তার জন্য মেডিটেশন করতে হলে করো। মেডিটেশন ইজ এ গুড মেডিসিন। আমিও তো করি।
তুমি মেডিটেশন করো, আমি জানি। সেটা কীরকম মেডিটেশন মোনা, গড়লেস?
গড! মেডিটেশনের জন্য গডের কী দরকার?
দরকার নেই?
না তো!
তা হলে?
পৃথিবীসুদ্ধ লোক যে মেডিটেশন করছে তাতে কি ভগবানের দরকার হয় নাকি?
তোমাদের মেডিটেশনটা কেমন একটু বুঝিয়ে দেবে?
ইজি। মন থেকে সব চিন্তা, সব স্মৃতি, সব কথা তাড়িয়ে দিয়ে একদম শূন্য করে ফেলতে হয়। চিন্তাশূন্য, ভাবশূন্য, স্মৃতিশূন্য অবস্থায় সোজা হয়ে বসে থাকা। কমপ্লিট ব্ল্যাংক।
সেটা কি সম্ভব?
প্র্যাকটিস করতে হয়। প্রথমটায় হতে চায় না। ধীরে ধীরে রেগুলার প্র্যাকটিস করতে করতে ইট বিকামস ইজি।
তাতে কী হয়?
ইট ইজ এ ফ্রেশনার। মনটা ঝরঝরে হয়ে যায়, টেনশন থাকে না।
আমাকে শেখাবে?
শেখার কিছু নেই। জটিল বা শক্ত কোনও প্রক্রিয়া তো নয়। জাস্ট কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থাকা। মনকে কিছুক্ষণ রেস্ট দেওয়া। নাথিং এলস।
অমল এই ধ্যানে খুব আকর্ষণ বোধ করল না। তার সমস্যা অত সহজ নয়। তবু সে বলল, ও কে। আই উইল ট্রাই।
তোমার জপতপও হয়তো খানিকটা তাই। মনটাকে বাস্তব জগৎ থেকে অন্য ট্র্যাকে ঘুরিয়ে দেওয়া।
অমল আবার খুব সরলভাবে প্রশ্ন করল, তুমি কি নাস্তিক মোনা?
ভেবেই দেখিনি কখনও। তবে এখনও ভগবানকে আমার দরকার হয়নি। যখন দরকার হবে তখন নাস্তিক থাকব কি না জানি না। আই অ্যাম কিপিং মাই ফিঙ্গারস ক্রসড। কিন্তু আমি নাস্তিক হলেই বা তোমার আস্তিক হতে বাধা কোথায়?
অমল জুলজুল করে চেয়ে ছিল মোনার মুখের দিকে। এই মহিলাকে সে একদম চেনে না। বড়ই অচেনা লাগছে এখন। দুজনের মাঝখান দিয়ে এখন যেন এক নিঃশব্দ অদৃশ্য নদী বয়ে যাচ্ছে। সাঁকোহীন, কূল-কিনারাহীন, অনন্ত।
তোমার কফি ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে কিন্তু।
নিস্তেজ হাতে কফির কাপটা তুলতেও যেন ভার লাগছিল অমলের। গরম কফি খানিকটা চলকে পড়ল তার কোলে। ছ্যাঁকা লাগল।
কফি খেয়ে একটু ঘুমাও, বুঝলে?
ঘুমোব মোনা। তুমি শোও। আই অ্যাম সরি আই ডিসটার্বড ইওর স্লিপ।
তোমারও তো ঘুম হয়নি।
মোনা গিয়ে শুয়ে পড়ল।
কফির কাপ হাতে ভূতের মতো অভিভূত হয়ে বসে রইল অমল। জড়বৎ। কাপটা হাতে ধরা, কিন্তু চুমুক দিতেও মনে রইল না আর।
পিছনে বাগানের দিকে একটা কাশির শব্দ শোনা গেল। বাবা ফুল তুলছে।
কফির কাপটা নামিয়ে রেখে খুব সন্তর্পণে অমল এসে জানালার কাছে দাঁড়াল। বাইরে এখনও অন্ধকার। সাবধানে জানালার একটা পাল্লা খুলে সে বুক ভরে ঠান্ডা বাতাসে দম নিল। শুনতে পেল, খুব মৃদু শব্দে মোনার নাক ডাকছে। ইদানীং একটু মোটা হয়েছে মোনা, সেইজন্যই কি নাক ডাকছে? নাকি কোনও অসুখ!
হঠাৎ চমকে উঠল অমল। মনে পড়ল মোনা একদিন তাকে বলেছিল ওর কী একটা মেয়েলি অসুখ হয়েছে। অসুখের নামটা বলতে চায়নি। একজন বড় ডাক্তারের সঙ্গে অ্যাপয়েন্টমেন্ট করেছিল অমলকে না জানিয়েই। কী অসুখ হয়েছে মোনার? তাকে বলতে চায়নি কেন? সেও তো জানতে চায়নি কখনও। মোনা কি মরে যাবে নাকি?
হঠাৎ ভীষণ অস্থির বোধ করল অমল। ভীষণ।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন