একষট্টি অধ্যায়

শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

একষট্টি

পান্নার পিছনে সোহাগকে দেখে ভারী অবাক হল বিজু। মেয়েটা তাকে পছন্দ করে না। কয়েকবার বিজুকে বেশ অপমানও করেছে। একটু খেপা গোছের আছে। কখন কী রকম রি-অ্যাক্ট করবে তার ঠিক নেই। আনপ্রেডিকটেবল মেয়েটিকে সে একটু ভয় পায়। কিন্তু সেটা তো আর প্রকাশ করা চলে না। সে বলল, আরে, এসো তোমরা।

ঘরে ঢুকে সোহাগ নিঃশব্দে চারদিক খুব কৌতূহলী চোখে চেয়ে দেখছিল। বিজু শৌখিন মানুষ। তার ঘরে খুব আধুনিক মিউজিক সিস্টেম, রঙিন টি ভি ইত্যাদি আছে। খাট, আলমারি, টেবিল, বইয়ের র‍্যাক, ক্যাবিনেট সবই খুব বাছাই ম্যাট ফিনিশ দামি কাঠের তৈরি।

পান্না বলল, সোহাগ আমাকে একটু কম্পিউটার শেখালে তোমার আপত্তি নেই তো৷

না, আপত্তি কীসের?

তুমি কম্পিউটারে কোনও কাজ করছিলে নাকি?

না না, তেমন কিছু নয়। তোরা বোস না। আমি বরং একটু ঘুরে আসছি।

যাঃ, তুমি না থাকলে মজাটাই হবে না।

কেন, তুই তো কম্পিউটার শেখার মাস্টারমশাইকে সঙ্গেই নিয়ে এসেছিস। আমি তো আর কম্পিউটার এক্সপার্ট নই। শুধু আমার কাজটুকু করে নিতে পারি।

সোহাগ কম্পিউটারের সামনে বসে যন্ত্রটার চাবি টিপে স্পেসিফিকেশন দেখে মৃদু স্বরে বলল, মডেলটা আপডেট করা দরকার। বেশ স্লো।

বিজু বলল, জানি। তবে আমার তো বেশি সফিস্টিকেটেড জিনিসের দরকার হয় না। কিছু নথিপত্র লোড করে রাখি। বেশির ভাগ সময়েই এটা ব্যবহার করা হয় টাইপরাইটার হিসেবে। আর ইন্টারনেট, তবে নেটওয়ার্ক সিগন্যাল এখানে খুব উইক।

সোহাগ একটু হাসল। আর কিছু বলল না, কিছুক্ষণ মগ্ন হয়ে নানা চাবি টিপে টিপে অনেক কিছু দেখে নিয়ে পান্নাকে বলল, এতে তোমার শেখার কাজ চলে যাবে। তোমার দাদা বোধহয় ই-মেল চেক করেছিলেন, আমরা এসে ডিস্টার্ব করলাম।

বিজু বলল, আরে দুর দুর। ই-মেল আসে নাকি আমার। বেশির ভাগই জাঙ্ক মেল। দু-চারটে কাজের মেল আসে। চেক করা হয়ে গেছে। তোমরা এখন ব্যবহার করতে পারো।

আপনি বসুন না। আমি এসেছি বলেই যদি আপনি চলে যান তা হলে আমার খুব খারাপ লাগবে।

সন্ধেবেলা কি আমি বাড়িতে বসে থাকি নাকি? ক্লাবে ব্যাডমিন্টন খেলতে যাই। তারপর নাটকের রিহার্সাল আছে।

পান্না বলল, আচ্ছা, আজ না হয় আমাদের অনারে একটু বসলেই বাবা। রোজই তো ওসব আছে।

আরে আজ শনিবার। অনেকে আসবে। যারা কলকাতায় থাকে তারা উইক এন্ডে চলে আসে যে।

একদিন না হয় একটু আমাদের সঙ্গেই আড্ডা মারলে।

আড্ডা মারতে তো আসিসনি। এসেছিস তো কম্পিউটার শিখতে।

কম্পিউটার তো আর পালাচ্ছে না। পালাচ্ছ তুমি। চুপ করে বোসো তো ওই সোফাটায়।

বিজু বসল। তবে অস্বস্তি নিয়ে। সোহাগ মেয়েটাকে সে ঠিক বুঝতে পারে না। এই বেশ মিষ্টি করে কথা বলল, আবার কোন কথায় পালটি খাবে তার ঠিক নেই।

কম্পিউটারে মগ্ন সোহাগ একবার হঠাৎ ঘাড় ঘুরিয়ে তাকে দেখল, তারপর চোখ ঘুরিয়ে নিল। মেয়েদের চোখের ভাষা পড়বার মতো অভিজ্ঞতা বিজুর নেই। তার বান্ধবী-টান্ধবী নেই। প্রেমিকা নেই, নেই বলে দুঃখও নেই কিছু। তবে মেয়েদের ব্যাপারে অভিজ্ঞতা কম থাকায় কখনও-সখনও একটু অসুবিধেয়ে পড়তে হয়। এই যেমন এখন। ওই যে সোহাগ একবার তাকাল এটা অর্থহীন না অর্থপূর্ণ তা অনুমান করা তার অসাধ্য। শুধু মনে হল, আর যাই হোক তাকানোটা অন্তত হোস্টাইল নয়।

দুই বান্ধবী কম্পিউটার নিয়ে খুব মজে গেল কিছুক্ষণের মধ্যেই। খুব নিচু স্বরে পান্নাকে কম্পিউটারের ব্যবহার শেখাচ্ছে সোহাগ। স্বর এত নিচু যে, সামান্য দূরত্বে বসেও কিছুই ভাল বুঝতে পারছে না বিজু। সে নিজে কম্পিউটার খুব ভাল জানে না। শুধু নথিপত্র ফাইলভুক্ত করতে পারে, ইন্টারনেট খানিকটা পারে আর পারে গেমস। কিন্তু কম্পিউটার তো একটা মহাসমুদ্র, শেখার শেষ নেই। সে উকিল মানুষ। ভবিষ্যতে ওকালতিই করবে। তার কম্পিউটার বিশেষজ্ঞ না হলেও চলবে। কিন্তু আজ এখন সোহাগের সহজাত দক্ষতা দেখে তার একটু হিংসে হচ্ছিল। মেয়েটা অনেক জানে। আর একটু আপডেটেড কম্পিউটার হলে আরও ভাল এলেম দেখাতে পারত।

উপযাচক হয়ে বিজু বলল, একটু অসুবিধে হচ্ছে, না?

সোহাগ ভারী সুন্দর একটু হেসে তার দিকে তাকিয়েই চোখ ফিরিয়ে নিল। বলল, আপনার সেটটা এমনিতে তো ভালই। মাদার বোর্ড, প্রসেসর আর হার্ড ডিস্কটা বদলে নিলেই হবে। স্পিকার দুটোও চেঞ্জ করে নেবেন। আজকাল খুব ছোট আর পাওয়ারফুল স্পিকার পাওয়া যায়।

বিজু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সে অডিও বা ভিডিও সিডি কখনও চালায় না কম্পিউটারে। অত সব করার সময় কোথায় তার। ওকালতি আছে, ক্লাব আছে, সমাজসেবা আছে, মোটরবাইকে চড়ে ছোটখাটো অভিযানে বেরিয়ে পড়া আছে। কম্পিউটার সে সামান্যই ব্যবহার করে। তবু বলল, আচ্ছা।

সিঁড়িতে পায়ের শব্দ তুলে মা উঠে এল, পিছু পিছু কাজের মেয়ে ননীবালা। ননীবালার হাতে ট্রে এবং তাতে গরম ফুলকপি আর বাঁধাকপির বড়া, মিষ্টি আর নাড়ু, আর চা।

পান্না চেঁচিয়ে বলল, এ মা, ছোটমা, এসব কী করেছ? তোমাকে না বললাম এক্ষুনি আমাদের একরাশ চাওমিন করে খাইয়ে দিয়েছে। তাও আবার চিংড়িমাছ দিয়ে! এই সোহাগ, বলো না।

সোহাগ হাসছিল। বলল, এখানে এলেই সবাই কেবল খাওয়ায়। কেন বলুন তো? আমাদের বাড়িতেই ভীষণ খাওয়ার জন্য প্রেশার। পিসি খাওয়ায়, বড়মা খাওয়ায়, জ্যাঠা রোজ রাজ্যের খাবার নিয়ে আসে।

বিজুর মা হেসে বলল, এইটুকু তো বয়স, এখনই তো খাবে। ওই যে আমাদের পান্নারানি ওর কথা আর বোলো না। ওর ধারণা হয়েছে মোটা হয়ে যাবে। তাই খাওয়া ধরাকাট করছে। নাও তো, এসব খুব হালকা জিনিস। কাজ করতে করতে খেয়ে নাও। শীতকালে খুব তাড়াতাড়ি সব হজম হয়ে যায়।

সোহাগ বলল, আমি কিন্তু এমনিতেই একটু ফ্যাটি। আমারই সবচেয়ে বেশি ডায়েটিং দরকার।

ও মা! যাব কোথায়। তুমি নাকি ফ্যাটি। তুমি তো বেশ রোগা। পান্নার চেয়েও।

কিন্তু আমার যে মনে হয় আমি বেশ ফ্যাটি!

একদম বাজে কথা। তুমি তো রোগাই। শরীরে আর এক পরত মাংস লাগলে তোমাকে আরও অনেক বেশি সুন্দর লাগবে।

পান্না নাক সিঁটকে বলল, ইস ছছাটমা, তুমিও কেমন যেন আদ্যিকালের বুড়ি হয়ে যাচ্ছ। কেবল মোটা হ, সোটা হ, মোটা-সোটা হলেই বুঝি ভাল?

ওরে, তা বলিনি। মোটা হবি কেন? মানানসই হবি তো। হাড়গিলে হওয়া বুঝি ভাল।

সোহাগ হাসছিল। বলল, আমেরিকায় জাঙ্ক ফুড খেয়ে খেয়ে মা আর আমি একবার বেশ ওয়েট গেন করেছিলাম। তারপর চেক আপ করাতে গিয়ে ডাক্তারের কী বকুনি। মাকে বলল, এক মাসের মধ্যে তোমাকে কুড়ি পাউন্ড ওজন কমাতে হবে। আমাকে বলল দশ পাউন্ড।

কী করলে তখন?

আমি তো তখন আরও ছোট। সকালে উঠে রোজ দৌড়াতাম। আমার এক মাসে পনেরো পাউন্ড কমে গেল। কিন্তু মা পারেনি। জগিং-টগিং তো পারত না, হাঁফিয়ে পড়ত। খাওয়া কন্ট্রোল করে করে একটু কমল।

পান্না বলল, জাঙ্ক ফুড কী বলল তো!

হ্যামবার্গার, হট ডগ, পিৎজা, চকোলেট, আইসক্রিম। যত খাবে তত মোটা হবে। খেতে ভীষণ ভাল ততা ওসব। আমেরিকানরা তো ওসব খেয়ে খেয়েই ওরকম মোটা।

গোরুর মাংস খেতে, না?

মৃদু হেসে সোহাগ বলল, হ্যাঁ। এখানে শুনেই সবাই আঁতকে ওঠে।

বিজুর মা বলল, মা গো! কী করে খেতে? গন্ধ লাগত না?

না তো? গন্ধটা খারাপ ছিল না। এখানে এসে শুনলাম হিন্দুরা নাকি খায় না।

না বাপু, এদেশে ওসব চলে না। আজকাল খাচ্ছে অনেকে শুনি। দিনকাল বদলে যাচ্ছে তো। মানুষ হল আসলে রাক্ষস। সব খায়।

সোহাগ হি হি করে হাসল।

নীরবে দৃশ্যটা দেখছিল বিজু। মেয়েটা কী সুন্দর হাসে! যখন হাসে তখন মনে হয় ওর ভিতর আর বাইরেটা একাকার হয়ে গেল।

এই খাবার রেখে যাচ্ছি, যা পারো খেয়ো। গরম থাকতে থাকতে না খেলে ভাল লাগবে না।

ছোটমা চলে গেলে পান্না বলল, এই বিজুদা, একটু খাও না গো আমাদের সঙ্গে।

ভ্যাট। আমি কোর্ট থেকে ফিরেই রুটি তরকারি খেয়েছি। তোরা খা।

আমরা কি আর পারব? না খেলে ছোটমা ঠিক বকুনি দেবে।

তার আমি কী জানি! দু-চারটে তুলে ঢিল মেরে পিছনের বাগানে ফেলে দে বরং।

ওমা, খাবার জিনিস ফেলে দিলে পাপ হবে না?

অনিচ্ছের সঙ্গে খেলে আরও পাপ হবে।

সোহাগ মাঝে মাঝে তার ঘন চুলে ঝাপটা মেরে বিজুর দিকে ফিরে দেখছে, আপনি বোরড হচ্ছেন, না?

না না, ঠিক আছে।

সোহাগ কম্পিউটারের দিক থেকে তার দিকে একটু ঘুরে বসে বলল, আমি একটু মুডি বলে মাঝে মাঝে অকওয়ার্ডলি বিহেভ করি, তাই না?

বিজু হেসে বলল, সবাই তো এক রকম হয় না। তুমি তোমার মতো হবে, সেটাই তো স্বাভাবিক।

কেউ কেউ বলে আমি নাকি পাগলি।

বলে নিজেই হেসে কুটিপাটি হল সোহাগ।

স্মিত মুখে বিজু বলল, আমরা সবাই একটু একটু পাগল। যে যার নিজের মতো।

পান্না বলল, যাঃ, সোহাগ মোটেই পাগলি নয়। একটু ডেয়ারিং আছে অবশ্য।

সোহাগ আবার কম্পিউটারের দিকে ফিরে বসল। পান্নাকে বলল, আমি সুইচ অফ করে দিচ্ছি। তুমি নিজে নিজে সুইচ অন করো। নিজে অপারেট না করলে হবে না।

আমার বাবা ভয় করে। ইলেকট্রিকের সব জিনিসকেই আমি ভয় পাই।

যাঃ, ভয়ের কী আছে?

যদি শক-টক দেয়। আমি আগে টেপ রেকর্ডার অবধি চালাতে পারতাম না। আরও ছোট যখন ছিলাম তখন ঘরের লাইট ফ্যানের সুইচে অবধি হাত দিতে ভয় করত।

ওমা! কেন?

একবার বর্ষাকালে সুইচে হাত দিতেই যা শক দিয়েছিল। সেই থেকে ভয়।

তোমার দাদা না ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ে!

হ্যাঁ তো। দাদা বাড়ি এলে আমাকে ভীষণ খেপায়। ইলেকট্রিকের তার নিয়ে এসে ভয় দেখায়। বিজু হেসে বলল, তোর সব ভয়ের কথা সোহাগ জানে?

আমি সব বলেছি। ভূতের ভয়, একা থাকার ভয়, অন্ধকারের ভয়, পাগল আর মাতালের ভয়। আর চোর ডাকাতের ভয় তো আছেই। ঠাকুর-দেবতাকেও খুব ভয় পাই বাবা। আমার বাপু ভয়ের জীবন। এত কেন ভয় পাই বলে তো সোহাগ?

তোমার যেমন ভয় বেশি, আমার আবার তেমনি ভয় ভীষণ কম।

সেই জন্যই তো তোমাকে আমার ভীষণ হিংসে হয়।

আবার দুজনে হেসে কুটিপাটি হল। মেয়েদের নিয়ে বিজুর এই এক সমস্যা। এই টিনএজার মেয়েরা নিজেদের মধ্যে সামান্য কথায় এত হাসি যে কেন হাসছে তার তাল রাখাই মুশকিল। বিজুর তাই নিজেকে বড্ড বোকা বোকা আর বহিরাগত আর অনধিকারী এক আগন্তুক বলে মনে হচ্ছে।

অস্বস্তি বোধ করে বিজু বলল, তোরা কাজ কর, আমি একটু ঘুরে আসি।

পান্না চোখ পাকিয়ে বলল, খবরদার না। তুমি চলে গেলে মজাটাই মাটি।

স্মিত হেসে বিজু বলল, আমাকে নিয়ে মজা করতে এসেছিস নাকি?

আহা, ওভাবে বলছ কেন? আজ সোহাগ তোমার সঙ্গে ভাব করতে এসেছে।

বিজু বলল, আড়ি তো ছিল না।

ছিল বইকী। চুপ করে বোসো। নড়বে না।

বিজু ফের বসে পড়ল।

সোহাগ কম্পিউটারে চোখ রেখে বলল, পান্না একটু বাড়াবাড়ি করছে। আসলে আমি বোধহয় আপনার সঙ্গে একটু অভদ্র ব্যবহার করে ফেলেছি। আপনি তো আমার ভাল করতেই চেয়েছিলেন।

আরে সেসব আমি মনে করে রাখিনি। তবে এখানে আগে ছেলেরা কখনও মেয়েদের টিজ করত না আজকাল কিছু ছেলে ইভ টিজিং করে বলে খবর পাই। ওটা আমি একদম সহ্য করতে পারি না। আমি একটু প্রাচীনপন্থী মানুষ। মেয়েদের শ্রদ্ধা করা উচিত বলেই মনে করি।

সোহাগ আর একবার একঝলক তার দিকে তাকিয়ে চোখ সরিয়ে নিয়ে বলল, শ্ৰদ্ধার কথা কেন বলছেন?

কেন বলছি তা জানি না। ওরকমই শিখে এসেছি ছেলেবেলা থেকে।

আমার তো মনে হয় খোলামেলা মেলামেশা হলেই ছেলে আর মেয়েদের সম্পর্ক ভাল হয়।

আমার ঠিক ওরকম ভাল লাগে না। আজকাল মেলামেশা খুব বেশি হয়, কিন্তু সম্পর্ক টিকছে কই? মেয়েদের প্রতি সামাজিক অপরাধ তো বেড়ে যাচ্ছে। আমার সঙ্গে তোমার মত মিলবে না।

মত মিললেই বুঝি ভাল?

কথাটার অর্থ বুঝতে পারল না বিজু। ম্লান মুখে বলল, আমি একটু সেকেলে, না?

একটু আছেন। তাতে কী? নিজের মতো হওয়াই তো ভাল। আমার প্রবলেমটাও তো তাই। কেউ আমাকে নিজের মতো হতে দিতে চায় না, তার মতো হওয়াতে চায়। সেইজন্যই মা-বাবার সঙ্গে আমার ক্ল্যাশ হয়।

তুমি বোধহয় একটু লিবারেল, তাই না?

মিষ্টি হেসে সোহাগ বলে, উইমেনস লিব? এসব নিয়ে ভাবি না কখনও। আমার প্রবলেম আমার নিজেকে নিয়ে।

সকলেরই তো নিজেকে নিয়ে প্রবলেম।

মাত্র কয়েক সেকেন্ড স্মিত মুখে দুজনে দুজনের দিকে চেয়ে রইল। না, কোনও বিদ্যুৎ বাহিত হল না মধ্যবর্তী শূন্যতায়। কিন্তু যেন একটু সুগন্ধী একটা বাতাস বয়ে গেল। মেয়েটাকে নিয়ে একটা অস্বস্তি ছিল বিজুর। একটু ভয়-ভয় ভাব। সেটা উড়ে গেল আজ।

আপনাকে জোর করে বসিয়ে রেখেছে পান্না। আই অ্যাম সরি। আজ যাই। ফিরে গিয়ে দাদুকে কফি করে দেব বলে এসেছি। দাদু ঠিক আমার জন্য বসে থাকবে।

বিজু একটু হেসে বলল, এসো।

বাই।

দুজনে চলে যাওয়ার পর ঘরটা অনেক ফাঁকা লাগল বিজুর। আনমনে উঠে সে চটি পরে ধীর পায়ে বেরোল। সারা সন্ধেটা সে অন্যমনস্ক রইল আজ। ব্যাডমিন্টনে সহজ শট ফসকাল বারবার। আড্ডায় সে-ই বরাবর প্রধান বক্তা। আজ সে প্রায় নির্বাক রইল। আজ তার ভিতরকার বিজু যেন হারিয়ে গেছে। কী হল তার হঠাৎ?

এক বড়লোক মক্কেল গাড়ি হাঁকিয়ে রাতের দিকে এল। তার সঙ্গে একটা গুরুতর মামলা নিয়ে কথা বলতে বলতেও বিজু টের পাচ্ছিল সে খানিকটা রিফ্লেক্সের ওপর কথা বলছে, যন্ত্রের মতো। ভাবছে না মামলা নিয়ে। তার মন সোহাগকে ভাবছে। ঠিক এরকম ব্যাপার তার আগে কখনও হয়নি। এই প্রথম।

কিন্তু এরকম কেন হবে? সুন্দরী মেয়ে সে কি বিস্তর দেখেনি? মেয়েদের সম্পর্কে তার একটা সহজাত বিমুখতাই আছে। সে মেয়েদের সঙ্গে মিশতে ভালবাসে না, প্রেম করার কথা তার মনেও হয় না। নারীচিন্তার সে ঘোর বিরোধী। তাকে বন্ধুবান্ধবদের অনেকেই ব্রহ্মচারী আখ্যা দিয়ে রেখেছে। তবে এসব কী হচ্ছে? কেন হচ্ছে? পচা শামুকে পা কাটলে তো তার চলবে না।

রাত্রিবেলা বিছানায় শুয়ে সে নিজের সঙ্গে লড়াইটা শুরু করল। মন থেকে যেভাবেই হোক ওই মেয়েটার চিন্তাকে তাড়াতেই হবে। তার সেই মানসিক শক্তি আছে। ছ্যাবলা ছেলেদের মতো দুম করে একটা মেয়ের কাছে হাঁটু মুড়ে বসে গেলে তো তার হবে না। এ তার নিজের পক্ষেই অপমানজনক।

লড়াইটা করতে গিয়ে তার ঘুমের বারোটা বাজল। মাথা গরম হয়ে যাওয়ায় সে উঠে ওডহাউসের একটা উপন্যাস পড়ার চেষ্টা করল কিছুক্ষণ। তারপর সেটা রেখে একটা থ্রিলার খুলে বসল। তাতেও মন লাগল না দেখে কম্পিউটারে একটা গেম খেলল কিছুক্ষণ। আর খেলতে খেলতেই হঠাৎ ভারী অবাক হয়ে সে মৃদু— খুব মৃদু একটা সুবাস পেল নাকে।

কোথা থেকে সুন্দর মৃদু গন্ধটা আসছে? সে এদিক ওদিক তাকাল। সন্দেহজনক কিছু দেখা গেল না কোথাও। গন্ধটা এতই মৃদু যে, আছে না নেই তা নিয়েই খানিকটা ধন্দে পড়তে হয়।

হঠাৎ মনে পড়ল ওরা দুই বান্ধবী যখন ঘরে ঢুকেছিল তখনই গন্ধটা পেয়েছিল সে। তখন খেয়াল করেনি। এরকম গন্ধ পান্না মাখে না। এ গন্ধ আটলান্টিকের ওপারের গন্ধ।

এমনিতেই বিজু খুব ভোরে ঘুম থেকে ওঠে। একটু ধ্যান করে। তারপর দৌড়তে বেরোয়। এসব তার অনেক দিনের অভ্যাস। স্বামী বিবেকানন্দ তার এক সময়ে আদর্শ ছিল। আজকাল আর ততটা কঠোরভাবে সব দিক বজায় রাখতে পারে না। তব অভাসটা এখনও আছে।

শেষ রাতে ঘুমিয়েও ঠিক পাঁচটাতেই ঘুম ভাঙল আজও। প্রচণ্ড শীত। বাইরে এখনও অন্ধকার। শরীরটা ম্যাজম্যাজ করছে। তবু উঠে অভ্যাসমতো ধ্যান করতে বসে গেল সে। আর কী আশ্চর্য! ধ্যানের শুরুতেই সোহাগের মুখ দপ করে ভেসে উঠল আজ্ঞাচক্রে। কী গেরো রে বাবা!

ফের লড়াই। এবং সোহাগের প্রস্থান।

গায়ে পুলওভার চাপিয়ে, জার্সি এবং জুতো মোজা পরে দৌড়তে বেরিয়ে পড়ল বিজু। আজ সে পাগলের মতো দৌড়াল। যেন নিজের কাছ থেকে পালানোর চেষ্টা, চেষ্টা যে ফলবতী হচ্ছে, এমনটা তার মনে হল না। গায়ের নির্জন রাস্তায় তাকে তাড়া করছে নারীচিন্তা, যৌবনের জ্বালা, পতনের আহ্বান। সে হাঁপিয়ে পড়ছিল আজ। ঘুমহীনতার ক্লান্তিই হবে বোধহয়।

দৌড়তে দৌড়তে হঠাৎ একটা কথা মনে পড়ায় সে বজ্রাহতের মতো দাঁড়িয়ে পড়ল। আজ রবিবার। রবিবার সকালে যে সে দৌড়োয় না। সপ্তাহে একদিন বিশ্রাম নেয়। কথাটা একদম খেয়াল ছিল না তার। এত অন্যমনস্কতা তো ভাল নয়! কেন এরকম হচ্ছে? কেন হবে?

আজ তার ব্যায়াম করার কথা নয়। তবু ঘরে ফিরে সে রোজকার মতো ব্যায়াম সারল। গা ঘেমে গিয়েছিল শীতের মধ্যেও। তোয়ালে দিয়ে গা মুছে কিছুক্ষণ বিশ্রাম করে স্নান সেরে নিল ঠান্ডা জলে। মনের অস্থির চঞ্চল ভাবটা কিছুতেই যেতে চাইছে না। বড্ড ক্লান্ত করে দিচ্ছে তাকে। সে এরকম নয়। সে এরকম হতে চায়নি কখনও। এর পর থেকে দেখা হলেই সে সোহাগের সঙ্গে ইচ্ছে করেই খারাপ ব্যবহার করবে। পাত্তা দেবে না। তেমন হলে অপমানও করবে। সবচেয়ে ভাল অবশ্য দেখাই না হওয়া। কিন্তু ওরা আজকাল নিয়মিত প্রতি উইক এন্ডে গাঁয়ে আসে। তা হলে বিজু শনি আর রবিবার গাঁ থেকে গায়েব হয়ে যাবে?

কী করা উচিত সে বুঝতে পারছিল না। তবে এই ফেজটা কেটে যাবে বলেই তার মনে হয়। সে শক্ত মনের ছেলে। সে বিবেকানন্দের ভাবশিষ্য। তাকে একটা ন্যাকা খুকি যদি নাকে দড়ি পরিয়ে ঘোরায় তা হলে এই লজ্জা সে রাখবে কোথায়?

রবিবার সকালটায় সে বড়মার কাছে জলখাবার খেতে যায়। এটা প্রায় নিয়মেই দাঁড়িয়ে গেছে। রবিবার বড়মার বাড়িতে কড়াইশুটির কচুরি, না হয় লুচি বা পরোটা কিছু একটা হবেই। বড়মা অপেক্ষাও করে থাকে।

আজ তাকে দেখেই বলাকা বলল, তোর মুখটা অমন শুকনো কেন রে?

আর বোলো না। রাতে ঘুম হয়নি।

ওমা! ঘুম হয়নি কেন?

বায়ু চড়া হয়ে গিয়েছিল।

বলাকা হাসল, তোর জ্যাঠারও হত মাঝে মাঝে। গোলমেলে মামলা নিয়ে পড়লে মাঝে মাঝে রাতে ঘুম হত না। তখন আমাকে ঠেলে জাগিয়ে নিত।

কেন?

গল্প করবে বলে। ও মানুষটা তো ওরকম ধারাই। আমার সঙ্গে যত কথা ছিল তার। সব কথা আমাকেই বলত।

তোমাদের দারুণ প্রেম ছিল বড়মা।

সে কি আর তোদের মতো ফচকে প্রেম রে? ওটা অন্য জিনিস। সে আর আমি ছিলুম যেন একই দেহের সত্তা। কিংবা কে জানে বাবা ভুলভাল বললুম কি না।

যা-ই বললা, বুঝে নিয়েছি।

সকল অধ্যায়
১.
প্রথম অধ্যায়
২.
দ্বিতীয় অধ্যায়
৩.
তৃতীয় অধ্যায়
৪.
চতুর্থ অধ্যায়
৫.
পঞ্চম অধ্যায়
৬.
ষষ্ঠ অধ্যায়
৭.
সপ্তম অধ্যায়
৮.
অষ্টম অধ্যায়
৯.
নবম অধ্যায়
১০.
দশম অধ্যায়
১১.
একাদশ অধ্যায়
১২.
দ্বাদশ অধ্যায়
১৩.
ত্রয়োদশ অধ্যায়
১৪.
চতুর্দশ অধ্যায়
১৫.
পঞ্চদশ অধ্যায়
১৬.
ষোড়শ অধ্যায়
১৭.
সপ্তদশ অধ্যায়
১৮.
অষ্টাদশ অধ্যায়
১৯.
ঊনবিংশ অধ্যায়
২০.
বিংশ অধ্যায়
২১.
একবিংশ অধ্যায়
২২.
দ্বাবিংশ অধ্যায়
২৩.
ত্রয়োবিংশ অধ্যায়
২৪.
চতুর্বিংশ অধ্যায়
২৫.
পঞ্চবিংশ অধ্যায়
২৬.
ষড়বিংশ অধ্যায়
২৭.
সপ্তবিংশ অধ্যায়
২৮.
অষ্টাবিংশ অধ্যায়
২৯.
ঊনত্রিংশ অধ্যায়
৩০.
ত্রিংশ অধ্যায়
৩১.
একত্রিংশ অধ্যায়
৩২.
দ্বাত্রিংশ অধ্যায়
৩৩.
ত্রয়োত্রিংশ অধ্যায়
৩৪.
চতুর্ত্রিংশ অধ্যায়
৩৫.
পঞ্চত্রিংশ অধ্যায়
৩৬.
ষট্ত্রিংশ অধ্যায়
৩৭.
সপ্তত্রিংশ অধ্যায়
৩৮.
অষ্টত্রিংশ অধ্যায়
৩৯.
ঊনচল্লিশ অধ্যায়
৪০.
চল্লিশ অধ্যায়
৪১.
একচল্লিশ অধ্যায়
৪২.
দ্বিচল্লিশ অধ্যায়
৪৩.
ত্রিচল্লিশ অধ্যায়
৪৪.
চতুর্চল্লিশ অধ্যায়
৪৫.
পঞ্চচল্লিশ অধ্যায়
৪৬.
ষট্চল্লিশ অধ্যায়
৪৭.
সপ্তচল্লিশ অধ্যায়
৪৮.
অষ্টচল্লিশ অধ্যায়
৪৯.
ঊনপঞ্চাশ অধ্যায়
৫০.
পঞ্চাশ অধ্যায়
৫১.
একান্ন অধ্যায়
৫২.
বায়ান্ন অধ্যায়
৫৩.
তিপ্পান্ন অধ্যায়
৫৪.
চুয়ান্ন অধ্যায়
৫৫.
পঞ্চান্ন অধ্যায়
৫৬.
ছাপ্পান্ন অধ্যায়
৫৭.
সাতান্ন অধ্যায়
৫৮.
আটান্ন অধ্যায়
৫৯.
ঊনষাট অধ্যায়
৬০.
ষাট অধ্যায়
৬১.
একষট্টি অধ্যায়
৬২.
বাষট্টি অধ্যায়
৬৩.
তেষট্টি অধ্যায়
৬৪.
চৌষট্টি অধ্যায়
৬৫.
পঁয়সট্টি অধ্যায়
৬৬.
ছেষট্টি অধ্যায়
৬৭.
সাতষট্টি অধ্যায়
৬৮.
আটষট্টি অধ্যায়
৬৯.
ঊনসত্তর অধ্যায়
৭০.
সত্তর অধ্যায়
৭১.
একাত্তর অধ্যায়
৭২.
বাহাত্তর অধ্যায়
৭৩.
তিয়াত্তর অধ্যায়
৭৪.
চুয়াত্তর অধ্যায়
৭৫.
পঁচাত্তর অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%