শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
আমি ভেবেছিলুম তুই আর আমার মুখদর্শন করবি না, সম্পর্কও রাখবি না।
তা কেন পিসি?
তোর মায়ের সঙ্গে ঝগড়া করলুম যে। মাথা গরম হয়ে গেলে আজকাল আমার লঘু-গুরু জ্ঞান থাকে মুখ দিয়ে ছোটলোকী বচন বেরিয়ে যায়। কী যে সব বলে ফেললুম!
মাও তো তোমাকে কম বলেনি।
সে বলুক গে। আমি কি আর তেমন ভারিক্কী লোক! আমার মান-অপমান বলে তো কিছু নেই। হয়েও গেছি ছোটলোক। গতর খাটিয়ে খাই। তোর মা তো তা নয়। মুখ আমার বড় শত্তুর।
তুমি কেঁদো না পিসি। ব্যাপারটা ঠান্ডা হতে দাও। সব ঠিক হয়ে যাবে।
সে তো হবে। কিন্তু মনটা খারাপ থাকবে। তুইও তো দুঃখ পেলি। পেলি না?
না তো। আমার মা ডিজার্ভস ইট।
মেজদা সম্পর্কে ও কথাটা কেন যে বলল বউদি!
মা তো ওরকমই। যা মুখে আসে বলে।
দ্যাখ, আমাদের বংশের গৌরব হল তোর বাবা। অমল রায়কে এক ডাকে গাঁয়ের সবাই চেনে, সম্মান করে। আজ অবধি ওরকম রত্ন ছেলে এ-গাঁয়ে আর কেউ হয়নি। তার সম্পর্কে আজে-বাজে কথা বলতে আছে? আমরা না হয় খারাপ—
তুমি খারাপ নও পিসি।
হ্যাঁ রে, আমি কি তোকে কানমন্তর দিই, বল না?
কানমন্তর কাকে বলে?
কানমন্তর কাকে বলে জানিস না?
না তো!
কানমন্তর হল—দুর ছাই, ও আমি তোকে বোঝাতে পারব না। মানেটা বোধহয় খারাপ সব পরামর্শ দেওয়া।
তুমি তো শুধু আমার সঙ্গে গল্প করো।
তোর মাকে সে কথা কে বোঝাবে বল। তার ধারণা আমার সঙ্গে মিশে তুই খারাপ হয়ে যাচ্ছিস। লেখাপড়া জানি না বটে, কিন্তু আপন পিসিটা তো! আমি কি তোর খারাপ করতে পারি?
সোহাগ একটু হাসল, আমিই তো খারাপ।
যাঃ, তুই কেন খারাপ হতে যাবি?
আমিই খারাপ পিসি। আমার অনেক দোষ আছে।
দোষঘাট সকলেরই একটু-আধটু থাকে। মানুষ তো আর ভগবান নয়।
আচ্ছা, তুমি তো একজন ওয়ার্কিং উওম্যান, তোমার এত সেন্টিমেন্ট থাকবে কেন?
কথাটা ইংরিজি হলেও বুঝতে পারল সন্ধ্যা। মুখখানা ভার করে বলল, সে তুই বুঝবি না। আমার ভিতরটা তো পুড়ে আংরা।
তার মানে কী?
দুর মুখপুড়ি, তুই যে কেন সব কথা বুঝতে পারিস না!
দুজনেই হেসে ফেলে। তারপর সন্ধ্যা একটু থমথমে গলায় বলে, কত কষ্টে তোদের সঙ্গে অল্পস্বল্প ভাব হচ্ছিল। হঠাৎ কোথা থেকে যে কী হয়ে গেল সেদিন! আমার মোটেই ঝগড়া করার ইচ্ছে ছিল না। তবু হয়ে গেল। সেদিন থেকে কেবল ভয় হয়েছে, তুই বুঝি আর আমার ঘরে আসবি না, আড়িই করে দিবি বুঝি!
আড়ি মানে বয়কট না?
হ্যাঁ। তার ওপর দুদিন তুই এলি না, কথাও বললি না। তখন ভীষণ মনটা খারাপ লাগতে লাগল। ভাবলুম, সোহাগ বোধহয় আমার ওপর রাগ করেছে। করবেই তো। নিজের মায়ের অপমান কার সহ্য হয় বল। যত ভাবতুম তত কান্না পেত।
একটা চাপা দুষ্টু হাসি হাসছিল সোহাগ। ভারী ভাল দেখায় ওকে ওই হাসিটাতে। বলল, কী করব বলো। দুদিন আমাকে একটু শাসনে রাখা হয়েছিল।
শাসন! হ্যাঁ রে, তোর মা কি তোকে মারধর করেছে নাকি?
সে তো আছেই। প্রায়ই আমাকে মায়ের হাতে মার খেতে হয়।
বলিস কী? সোমত্ত মেয়েকে মারতে আছে?
শি ইজ এ বিচ।
তার মানে কী?
ওটা তোমার জানার দরকার নেই। বাংলায় অনেক কথা খুব খারাপ শোনায়, ইংরিজিতে ততটা নয়।
তবে থাক। ওই জন্যই ইংরিজির ওপর আমার রাগ।
হি হি করে বাচ্চা মেয়ের মতো হাসল সোহাগ।
খুব মেরেছে?
ওসব আমি গায়ে মাখি না। মারুক না; কত আর মারবে?
আমিও মায়ের হাতে অনেক মার খেয়েছি। বোকাহাবা ছিলুম তো, মা তাই খুব মারত। কিন্তু ডাগর হওয়ার পর আর গায়ে হাত তুলত না।
বোকা হাবা ছিলে কেন?
ছিলুম কী রে, এখনও তাই আছি। বোকা বলেই তো গতি হল না। আমার মাথায় একটুও বুদ্ধি নেই। তাই তো গতরে খেটে পুষিয়ে নিতে হয়।
তুমি কি নিজেকে খুব বোকা ভাব?
বোকাই তো। সবাই তাই ভাবে।
ওটা কিন্তু অটো সাজেশন।
তার মানে কী রে?
মানুষ নিজেকে খারাপ ভাবতে ভাবতে ওরকমই হয়ে যায়। কনফিডেন্স থাকে না।
একটা শ্বাস ফেলে সন্ধ্যা বলল, কী করব বল। ছেলেবেলা থেকেই সকলের মুখে শুনে আসছি, আমি নাকি মাথা-মোটা। গবেট, বোকা, কুচ্ছিত। শুনতে শুনতে সেটাই বিশ্বাস হয়ে গেল। ওই জন্যই বোধহয় কপালে সংসারও টিকল না।
তুমি বোকা নও পিসি।
এখন আর নিজেকে নিয়ে ভাবিই না। সব ভাবনাচিন্তা হামানদিস্তায় ফেলে গুঁড়ো করে দিই। দিলুম তো জীবনটা একরকম কাটিয়ে।
তোমার প্রবলেমগুলো কিন্তু খুব ছোটখাটো।
এক গাল হেসে সন্ধ্যা বলে, সেটাও খুব ভাবি। দুনিয়ায় কত কী হয়ে যাচ্ছে বলে শুনি মাঝে মাঝে। সেসব নিয়ে এক মিনিটও ভাবনা হয় না। আমার সব ভাবনাচিন্তা আচার, কাসুন্দি, মশলাপাতি, পাওনাগণ্ডা, হিসেবনিকেশ নিয়ে। ছোট মাপের মানুষদের সমস্যাও ছোটখাটোই তো হবে।
তা নয় পিসি!
তবে কী?
তুমি যে মনের দরজা বন্ধ করে রাখো। দুনিয়াকে ঢুকতেই দাও না তোমার ভিতরে।
কী সুন্দর যে বলিস তুই! বেশ বলিস তো! একরত্তি মেয়ে হলে কী হবে, তোর খুব বুদ্ধি!
ছাই! বলে খুব হিহি করে হাসে সোহাগ, এ কথাটা তোমার কাছে শিখেছি। আজকাল কথায় কথায় বলি, ছাই!
আহা, কী ভাল কথাই না শিখলেন আমার কাছে থেকে! তবে শেখাবোই বা কী! আমি কি ভাল কথা জানি কিছু! হ্যাঁ রে, বুডঢারও কি তোর মতোই খুব বুদ্ধি?
বুডঢা! বুডঢা মেরিটোরিয়াস। ক্লাসে ভাল গ্রেড পায়। আর পড়াশুনোয় খুব সিরিয়াস। আমার চেয়ে ওর বুদ্ধি অনেক বেশি।
ওর সঙ্গে আলাপই হল না ভাল করে। হয়তো মনে মনে ঘেন্না পায় আমাকে।
না, বুডঢা ইজ নট দ্যাট টাইপ। ও হল গুড়ি গুডি বয়। আমার মায়ের সঙ্গে একমাত্র বুডঢারই যা একটু ভাব।
মায়ের তো ছেলের ওপর টান থাকবেই। আমার মারও দেখেছি, মেয়েদের চেয়ে ছেলেদের ওপর টান অনেক বেশি। অনেক, অনেক বেশি।
ওটা মায়েদের একটা কমপ্লেক্স। তুমি বুডঢার সঙ্গে আলাপ করতে চাও? তা হলে ডেকে আনতে পারি কিন্তু।
না বাবা থাক, যা গম্ভীর।
মোটেই তা নয় কিন্তু। আসলে খুব ফাজিল। খুব হাসাতে পারে। মুখটা গম্ভীর করে রাখে বটে, কিন্তু সেটা ওর মুখোশ।
না বাবা, ডেকে আনতে হবে না। বড্ড সাজানো ব্যাপার হবে তা হলে। আমার লজ্জা কি জানিস? ঝগড়ার সময় ছেলেটা সামনেই ছিল। সব শুনেছে। কী মনে করল কে জানে। সেই থেকে ওর চোখের দিকে চাইতেই পারি না আমি।
দেয়ার ইজ এ পয়েন্ট। মায়ের ওপর বুডঢার সফটনেস আছে। জানো তো, আমাদের ফ্যামিলিতে কেউ কাউকে পছন্দ করে না। সবাই সবাইকে ঘেন্না করে। শুধু মা আর বুডঢার মধ্যেই যা একটু ভাল সম্পর্ক।
তোর বাবা কিন্তু তোকে খুব ভালবাসে।
ছাই বাসে। বাবা কাউকেই ভালবাসে না। হি হেটস আস অল।
তুই বুঝিস না রে।
সোহাগ সামান্য হেসে বলে, আমিই যদি না বুঝতে পারি তা হলে আর কেউ বুঝলে লাভ কী বলো। আমাদের ফ্যামিলিকে তুমি ঠিক বুঝতে পারবে না।
কেন রে, তোর ওরকম মনে হয় কেন?
ইট অল স্টার্টেড উইথ পারুল।
পারুলদি?
হ্যাঁ।
সে তো কবেকার কথা।
তা জানি। বাট দি গডেস ইজ দি রুট অব অল মিসচিভস।
আবার ইংরিজি বলছিস?
ভুলে গিয়েছিলাম। সরি।
আমি কিন্তু এই ইংরিজিটা বুঝতে পেরেছি। কিন্তু তুই বারবার পারুলদিকে গডেস বলিস কেন? ওতে দেবদেবীর অপমান হয়। একটা জলজ্যান্ত মেয়ে আবার গডেস কী রে?
পারুল গডেস নয়, সে তো ঠিক কথা। কিন্তু খুব কম বয়সে ওর ছবিটা দেখে কেন যে গডেস মনে হত কে জানে।
সুন্দরী বলে বলছিস?
হ্যাঁ তো। গড আর গডেসরা তো সুন্দরীই হয়। কিন্তু তাদের একটা অরাও থাকে।
কী থাকে বললি?
অরা। অরাটা তোমাকে কী করে বোঝাব বলো তো!
তুই নিয়ম করে রোজ আমাকে একটু একটু ইংরিজি শেখা। তা হলে তোর কথা টক করে বুঝতে পারব।
অরা মানে ধরো একটা-একটা—কী বলে ওটাকে বলো তো—
সন্ধ্যা হেসে খুন হয়ে বলে, থাক বাবা, থাক। আর তোকে বোঝাতে হবে না। খুব বুঝেছি।
কী বুঝেছ বলো তো!
ঠাকুর-দেবতাদের গা থেকে জ্যোতি বেরোয় তো! সেটাকেই বোধহয় অরা না কী ছাঁইপাশ বললি, তাই বলে—
মাই গড! তবু তুমি বলবে যে তুমি বোকা?
বোকা নই?
তুমি জলের মতো বুঝতে পেরে গেলে। হ্যাঁ তো, ওই জ্যোতি কথাটা আমার কিছুতেই মনে পড়ছিল না।
কিন্তু পারুলদির মোটেই জ্যোতি-ট্যোতি নেই। গায়ের রংটা অবশ্য ফর্সা। কিন্তু তাকে তো আর জ্যোতি বলে না। তোর মা তো আরও ফর্সা।
ধ্যাত। ফর্সা বলে নয়। সামথিং মোর দ্যান ফর্সা।
আমিও তো তাই বললুম। ফর্সা ছাড়া পারুলদির আর কী আছে বল তো।
মুশকিল কী জানো?
কী বল তো!
ছেলেবেলায় সেই যে মনে হয়েছিল ছবিটা একজন গডেসের সেই হিপনোটিজমটা আজও যায়নি।
আচ্ছা, পারুলদিকে সামনাসামনি দেখেও তোর ভুল ভাঙেনি?
একটু ভেঙেছে বোধহয়। কিন্তু ভাঙুক, তা আমি চাইনি। আমার তো কোনও গডেস নেই, ওই একজন ছাড়া।
কী অদ্ভুত কথা বলিস তুই? এই যে দুর্গামূর্তি দেখলি সেদিন, সে-ই তো গডেস।
ধ্যুত, তুমি যে একটা কী না। দুর্গা হল আইডলাইজড ইমাজিনেশন। ও তো ভীষণ কৃত্রিম।
আহা, দেবদেবীরা সব আমাদের মতো হ্যাতান্যাতা কি না।
তা বলে দুর্গার মূর্তিটা কিন্তু গডেস নয়। বিয়ন্ড মূর্তি গডেস কেউ থাকতেও পারে। কিন্তু মূর্তি দেখলে গডেসের ইমেজ আসে না আমার।
আচ্ছা, তা হলে পারুলদির ছবি দেখেই বা এল কেন বল।
তা জানি না যে!
তা হলে তুই আমার মতোই হাঁদারাম।
সন্ধ্যা আর সোহাগ দুজনেই খুব হাসল।
তুমি খুব ভুল বলোনি পিসি। আমি একটু বোধহয় তোমার মতোই বোকা।
তা হলে আমাকে বোকা বলে স্বীকার করলি?
এখনও করিনি। তবে আমার একটা হ্যাবিট আছে, মাঝে মাঝে কিছু একটা দেখে খুব ইমপ্রেস্ড হয়ে যাই। তুমি হও?
হই না? এই যে তোকে দেখে আমি মুগ্ধ!
আমাকে দেখে? যাঃ! আমি তো একটা বাজে মেয়ে।
ও আবার কী কথা! বাজে মেয়ে কেন হবি।
আমাকে দেখে মুগ্ধ হওয়ার কিছু নেই পিসি।
একটু পাগলি সেজে থাকিস বটে, কিন্তু আমি টের পাই, তোর ভিতরটা বড্ড ভাল।
আচ্ছা, আজ কি আমরা দুজন দুজনেই একটু অয়লিং করছি?
সন্ধ্যা হেসে ফেলে বলে, তা নয়। তবে তুই আমার ভারী লক্ষ্মী মেয়ে। কী করে বুঝলুম জানিস?
কী করে?
যেদিন তুই আমার ঘরে প্রথম এলি, মনে আছে?
হ্যাঁ তো!
সেদিন থেকেই আমার ব্যবসা খুব বেড়ে গেছে।
যাঃ!
সত্যি! কত অর্ডার আসছে ভাবতে পারবি না।
ওই তো তোমাদের রোগ। যাকে তাকে ভগবান বানিয়ে ফেল।
ঠিক তোর মতো, না? পারুলদি যদি ভগবান হতে পারে তো তুই কী দোষ করলি বল তো?
ইউ আর এ গুড ডিবেটার।
এটা কিন্তু বুঝলুম না। বুঝিয়ে দে।
থাক, তোমার বুঝে কাজ নেই। এটা একটা কমপ্লিমেন্ট।
এটা বুঝেছি।
একটু একটু বুঝলেই তোমার চলবে।
তবু আমাকে ইংরেজিটা একটু শেখাস। ইংরেজি জানলে অনেক কাজ হয়।
কী কাজ হবে?
একটা লোন অ্যাপলিকেশন করেছিলুম বাংলায়। দিলই না। কে যেন বলছিল, অফিসারটা সাউথ ইন্ডিয়ান। ইংরেজিতে করলে দিত।
আমি তোমার অ্যাপলিকেশন লিখে দেব।
দিবি? খুব ভাল হয় তাহলে।
এখানে তো কম্পিউটার নেই। তাহলে তোমাকে কম্পিউটারে টাইপ করে দিতাম।
এখানে কিছুই নেই রে। পোড়া জায়গা।
কিন্তু পিওর আলো-বাতাস আছে। গাছপালা আছে। সন্ধের পর আকাশে কত তারা দেখা যায়।
দুর! ওসব দিয়ে কী হয়! আলো-বাতাস তো জন্ম থেকেই পাচ্ছি, কী হয়েছে বল। বরং ভাবি যদি ইংরেজিতে হড়বড় করে কথা কইতে পারতুম, যদি তুখোড় বুদ্ধি থাকত তাহলে হয়তো সেই লোকটা অমন তাড়িয়ে দিতে সাহস পেত না।
কে লোকটা বলো তো! তোমার হাজব্যান্ড?
তার কথাই বলছি।
আর ইউ স্টিল ইন লাভ উইথ হিম?
তা নয় রে! আসলে কী জানিস, কেন যে আমাকে তার পছন্দ হল না তা আজ অবধি ভেবেই পেলাম না। তাই ভাবি কয়েকটা বাড়তি গুণ থাকলে হয়তো ভাল হত।
তুমি এবার একটা বিয়ে করো পিসি। ইট ইজ হাই টাইম।
দুর বোকা! ওসব শুনলে খারাপ লাগে। একবার বাতিল হয়েছি তো, সেই ঘা-ই শুকোয়নি।
ইউ আর ম্যাড উওম্যান। আর সেইজনাই তোমাকে ভাল লাগে। আই লাভ এভরিথিং ম্যাড।
দুর পাগল! তোর যে কী সব অলক্ষুণে কথা! হ্যাঁ রে, তোর মায়ের সঙ্গে আমার ভাব করিয়ে দিবি?
অবাক হয়ে কিছুক্ষণ চেয়ে থেকে সোহাগ বলে, ইউ আর ইমপসিবল। কেন ভাব করতে চাও বলো তো!
ইচ্ছে করছে। ঝগড়া হওয়ার পর থেকে মনটা ভাল নেই।
মাথা নেড়ে সোহাগ বলে, নো ডাইস।
মানে কী রে?
মানে চান্স নেই। আমার মা একজন স্টাবোর্ন উওম্যান। বাবার সঙ্গে বা আমার সঙ্গে যখন ঝগড়া হয় তখন দিনের পর দিন আমাদের ভাব হয় না। এখন তো মায়ের সঙ্গে কখনওই আমার ভাব নেই। সব সময়েই আমাদের সম্পর্ক খারাপ।
তবে থাক, ভাবের দরকার নেই।
দরকার নেই পিসি।
তুই তোর মাকে পছন্দ করিস না?
আমরা কেউ কাউকে পছন্দ করি না।
তা হলে কী করে থাকিস?
অভ্যাস হয়ে গেছে। তবে আমি তো থাকব না।
কোথায় যাবি?
পালাব।
চোখ বড় বড় করে সন্ধ্যা বলে কোথায় যাবি?
তা জানি না। শুধু জানি পালাব।
ওরে বাবা, ওসব ভাবতে নেই। মেয়েরা পালালে ভীষণ বদনাম।
হোক না বদনাম!
কোনও ছেলের সঙ্গে?
কোনও পুরুষের সঙ্গে পালানোটা ভীষণ ভ্যাতভ্যাতে ব্যাপার। কাওয়ার্ড মেয়েরাই ওরকম পালায়। না, আমি একাই পালাব।
পালিয়ে কোথায় যাবি?
তা কিছু ঠিক করিনি। একটা জায়গায় তো যাব না, সন্ন্যাসিনী হয়ে একা একা ঘুরে বেড়াব।
যাঃ, এই বয়সে সন্ন্যাসিনী হবি কী রে?
সন্ন্যাসিনীর ব্যাপারটা ক্যামোফ্লেজ। ক্যামোফ্লেজ বোঝো?
না।
ছদ্মবেশ।
ছদ্মবেশ মানে তো ভেক ধরা।
ভেক? তার মানে?
ছদ্মবেশ।
দুজনেই হাসে।
ভেক ধরবি কেন?
কোনও দেশেই একা যুবতী মেয়ে তো নিরাপদ নয়। তাই সন্ন্যাসিনী সাজলে খানিকটা হয়তো সেফ।
ছাই সেফ। কত সন্ন্যাসিনীও রেপ হয়।
ওসব ভাবলে কি হয় পিসি? দুনিয়াটা নিজের চোখে দেখতে হবে না?
দুনিয়াটা তো তুই অনেক দেখেছিস, আর কী দেখার আছে?
আরও কত কী দেখার আছে, জানার আছে। একা একা ঘুরে বেড়ানোর থ্রিলই আলাদা।
তোর বাপু বড় দুর্জয় সাহস!
হ্যাঁ, আমার ভয়-টয় করে না।
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সন্ধ্যা বলে, আমার কখনও পালানোর ইচ্ছে হয় না। কিন্তু আমারই বোধহয় পালানো উচিত। তাই না?
পালালে না কেন পিসি?
ভয় করে যে! তোর মতো সাহস তো আমার নেই। ছেলেবেলা থেকেই জেনে এসেছি, আমি অবলা মেয়েমানুষ। আর মেয়েদের দুনিয়াটা হল ভয়ভীতিতে ভরা। তোর মতো সাহস থাকলে ঠিক পালাতুম। তুই তবু অনেক কিছু দেখেছিস, আমি তো একটুখানি জায়গায় সারাজীবন কলুর বলদের মতো ঘুরে মরছি।
কলুর বলদ কী?
ওঃ, তোকে আর বোঝাতে পারি না। ঘানিগাছ জানিস?
না তো!
তবে আর তোকে বুঝতে হবে না বাপু। বিয়ে হয়ে দুর্গাপুর গিয়েছিলুম, সেই যা বাইরে যাওয়া। দু-তিনবার কলকাতায় গেছি। আর আমার সর্বতীর্থ সার হল বর্ধমান। মোল্লার দৌড় মসজিদ অবধি। এর বাইরের পৃথিবীটা কেমন তা জানাই হল না।
তুমি আর পারবে না পিসি।
মাথা নেড়ে সন্ধ্যা বলে, না, আর পারব না। বড্ড আটকে পড়েছি। স্বামী নেই, সন্তান নেই, তব পিছুটানও কি কম! নিজেই মায়া সৃষ্টি করে নিজেকে জড়িয়ে নিয়েছি। অথচ সবই তো ফক্কিকারি।
ফক্কিকারি! বাঃ বেশ শব্দটা তো!
মানে জানিস?
আন্দাজ করতে পারি।
কী বল তো!
নাথিংনেস।
ও বাবা, ওটা আবার আমি জানি না।
এখানে এসে আমি অনেক শব্দ শিখে গেছি।
গাঁয়ে কিন্তু লোকে কথায় কথায় অনেক খারাপ খারাপ শব্দ উচ্চারণ করে। সেগুলো শিখিসনি যেন।
হি হি করে হেসে সোহাগ বলে, হ্যাঁ, খুব স্ল্যাং শব্দ। পোঁদের কাপড়, পাছা, মাগী, আরও বলব?
রক্ষে কর বাপু, আর নয়। খবরদার যার-তার সামনে বলিসনি যেন!
আচ্ছা পিসি, চার দিকটা এমন অন্ধকার হয়ে গেল কেন বলো তো!
ও মা! তাই তো! এখন তো মোটে বেলা তিনটে, এত তাড়াতাড়ি তো রোদ মরে যাওয়ার কথা নয়। মেঘ করেছে বোধহয়। দেখ তো জানালার কাছে গিয়ে!
সোহাগ এক ছুটে জানলার কাছে গিয়ে বাইরেটা দেখে বলল, ওঃ পিসি, শিগগির দেখবে এসো।
কী রে?
কী সাংঘাতিক মেঘ!
দুর বোকা! মেঘ আবার সাংঘাতিক কী রে! শীতকালে তো মাঝে মাঝে বৃষ্টি হয়ই।
আমার মনে হচ্ছে ইটস এ টুইস্টার।
সেটা আবার কী?
টর্নেডো। সাংঘাতিক ঝড়।
না না, এটা ঝড়ের সময় নয়।
তুমি টুইস্টার দেখনি?
সেটা কীরকম বলবি তো।
আমরা যখন ফ্লোরিডায় ছিলাম তখন একবার দেখেছি।
কীরকম বল তো?
ঘূর্ণিঝড়, সব উলটেপালটে দেয়, উড়িয়ে নিয়ে যায়। আমি চোখের সামনে একটা টয়োটা গাড়িকে উড়ে যেতে দেখেছি।
এই মেয়েটা, ভীষণ ঠান্ডা বাতাস ছেড়েছে। গরমজামা গায়ে দিয়ে আয়।
দুর! আমার কুটকুট করে যে!
তাহলে ওই লাল পশমি চাদরটা গায়ে দে। আলনায় আছে। কাচা চাদর, ঘেন্নার কিছু নেই।
ঘেন্না নয়, আমি সব সময়ে যে অ্যাটমোসফিয়ারটাকে ফিল করতে চাই।
তোর মাথা। জানলার কাছ থেকে সরে আয়। ইস্ বাতাসে যেন বরফের কুচি মিশে আছে। বুকে ঠান্ডা লাগলে আর দেখতে হবে না।
এক উন্মাদ ক্ষ্যাপা হাওয়া কোথা থেকে ময়লা ছেঁড়া কাগজের মতো মেঘের টুকরো কুড়িয়ে এনে জড়ো করছিল আকাশের এক কোণে, সকাল থেকে। দুপুরের পর থেকে সেই মেঘ জুড়ে জুড়ে কালো স্লেটের গায়ের মতো মেঘের মহাপর্বত তৈরি হল। ওই থমথমে, কালো, ভয়ংকর মেঘখানাকে দোতলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে দেখছিল সে। ঠান্ডা বাতাসের ঝাপটায় তার কান কনকন করছে, চোখে জল আসছে, গাঁটে গাঁটে ব্যথা। গলায় খুশখুশি তুলছে শীতের সরু সরু আঙুল। আর শরীরের ভিতরে যেন হাঁটু মুড়ে বসে আছে একশো বছরের এক থুরথুরে বুড়ি।
এখান থেকে ফটিক কাঞ্জিলালের ফাঁকা বাস্তুজমিটা দেখা যাচ্ছে। সেখানে সামান্য একটা ধুলোর ঘূর্ণি উঠল। নেচে নেচে বেড়াল এদিক সেদিক। পান্না জানে, ওইখানে জ্যোৎস্না রাতে পরিরা নেমে আসে। যে গাছটায় গলায় দড়ি দিয়েছিল লোকটা সেই গাছটার চারপাশে পরিরা খেলা করে আর ফটিক কাঞ্জিলাল দড়িতে ঝুলতে ঝুলতে দেখে আর খুব হাসে।
বিজুদাই গল্পটা বলেছিল। ফাঁসির দড়িটা দিয়ে নাকি কাঞ্জিলাল একটা দোলনা বানিয়ে নিয়েছে। তাইতেই দোল খায় আর পরিদের খেলা দেখে। মা গো! ভাবলেই বুকটা ভয়ে দুরদুর করে। তবে বিজুদা বড্ড বিচ্ছু। তাকে ভয় দেখানোর জন্যই বানিয়ে বলে কিনা কে জানে।
ফটিকের সঙ্গে তার বউ আশালতার ছিল ভীষণ ঝগড়া। আশালতা কতবার মরতে গেছে। আর ফটিক নিরুদ্দেশ হয়ে যাবে বলে শাসাত।
মরার দিন সকাল থেকে ঝগড়া লেগেছিল খুব।
শেষে ফটিক বলল, দেখবে? মজা দেখাব?
দেখাও না! তোমার পাল্লায় পড়ে কত মজাই তো দেখলুম। আর কী দেখাবে?
তখন কিন্তু থই পাবে না।
থই আমার এখনও নেই।
সবাই বলে, কাঞ্জিলাল খুব গুছিয়ে মরেছিল। টাকাপয়সা সব আদায়-উশুল করে বউয়ের নামে গচ্ছিত রেখে, কাজকারবার গুটিয়ে একটু বেশি রাতের দিকে নাইলনের দড়িগাছ নিয়ে নিরিবিলিতে গিয়ে—ম্যাগো!
আশালতাকে মজা দেখিয়েছিল বটে কাঞ্জিলাল। সে কী বুকফাটা কান্না মেয়েটার! বয়সও তত বেশি নয়। বাইশ-টাইশ হবে।
কিন্তু মুশকিল হল, দুনিয়াটা বড় নিষ্ঠুর। দুদিন পরেই সবাই সব কিছু ভুলে যায়। সব আবার স্বাভাবিক হয়ে আসে।
বর-বউয়ের ঝগড়া তার চারদিকে। বর-বউতে যে কেন এত ঝগড়া হয় তা বোঝে না পান্না। সে যদি বিয়ে করে তাহলে সে একদিনও ঝগড়া করবে না তার বরের সঙ্গে। একবারও না।
ওলো পতিসোহাগী লো, দেখা যাবেখন বিয়ের পর। বিয়ের আগে কত কথাই থাকে মেয়েদের। বুঝবি মজা।
ছোট জ্যাঠাইমা বড্ড ঠোঁটকাটা। ভাল কিছু ভাবতেই চায় না।
প্রথমে এক ফোঁটা দু ফোঁটা বৃষ্টি উড়ে এল। তারপর হঠাৎ অ্যাই বড় বড় শিল পড়তে লাগল নষ্টচন্দ্রের ঢিলের মতো। সরে এল পান্না। আর দেখতে পেল একটা মেয়ে ফটিকের জমির পাশ দিয়ে কুঁজো হয়ে দৌড়ে আসছে। গায়ে গরমজামাটা পর্যন্ত নেই। সোহাগ।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন