পঞ্চম অধ্যায়

শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

পাঁচ

হরিহরপাড়ার কাঁচা রাস্তা পেরিয়ে, গাছগাছালির আড়াল-আবডালে ঢাকা পড়তে পড়তে এবং ফের প্রকাশ পেতে পেতে যেন একটা চিরুনির ভিতর দিয়ে ওই আসছে রসিক বাঙাল। পরনে কালচে পাতলুন, তাতে হলদে জামাটা গোঁজা, হাতে অ্যাটাচি কেস।

চৌধুরীদের পুকুরে আজ টিকিট কেটে মাছ-ধরার কম্পিটিশন। কাতারে লোক হুইল ছিপ নিয়ে বসে গেছে। মেলা লোক জুটেছে মাছ-ধরা দেখতে। ভিড়ে ভিড়াক্কার। সকাল থেকেই জায়গাটায় থানা গেড়ে ছিল মরণ। খানিকক্ষণ মাছ-ধরা দেখে সঙ্গীসাথীদের সঙ্গে একটু বল খেলল। খিদে চাগাড় দেওয়াতে বাড়ি-মুখোই ফিরছিল সে। তখনই দূর থেকে দেখল রসিক বাঙাল আসছে। আজ বুধবার, বাঙালের আজ আসার কথা নয়। তার মানে কলকাতায় ঝগড়া হয়েছে। ঝগড়া করে এলে রসিক বাঙালের মেজাজ বড় তিড়িক্কি থাকে।

সুতরাং মরণ ছুট লাগাল। বাড়িতে গিয়ে মাকে আগাম জানান দেওয়া দরকার। আর জিজিবুড়িকেও তাড়াতে হবে। বেরোবার সময়ে দেখে এসেছে, জিজিবুড়ি উঠোনে বসে হাপড়হাটি বকে মরছে। জিজিবুড়ির হল অভাবের সাতকাহন। সব সময়ে এটা চাই, সেটা চাই। রসিক বাঙাল জিজিবুড়িকে দু চোখে দেখতে পারে না।

মরণ অঙ্কে চল্লিশের বেশি পায় না বটে, কিন্তু দৌড়ে বরাবর ফার্স্ট হয়। ক্লাবঘরের খেলার মাঠ পেরিয়ে সে চোখের পলকে চাটুজ্যে বাড়ির উঠোন দিয়ে শর্টকাট মেরে নিজেদের বাড়ির উঠোনে ঢুকেই চেঁচাল, বাঙাল আসছে! বাঙাল আসছে!

জিজিবুড়ি পানের বাটা কোলে নিয়ে রোদে বসে ছিল। মুখে দোক্তা দেওয়ার পর জিজিবুড়ির চোখে যেন আরামের তন্দ্রা চলে আসে। চেঁচানি শুনে জিজিবুড়ি চমকে উঠে বলে, আ মোলো! আজ আবার বাঙাল এল কেন?

পালাও জিজিবুড়ি, এসে পড়ল বলে।

তড়িঘড়ি উঠতে গিয়ে কোলের পানের বাটা ঠনাৎ করে পড়ে গেল উঠোনে। খোলা কৌটো থেকে সুপুরির টুকরো ছড়িয়ে পড়ল চারদিকে, চুন লেপটাল, দোক্তা ছিটিয়ে গেল।

দ্যাখ দিকিনি কাণ্ড! অমন চেঁচাতে আছে! এখন এসব তোলে কে?

তুলতে হবে না জিজিবুড়ি, পালাও শিগগির।

যাচ্ছি বাপু, যাচ্ছি। দোক্তাগুলো একটু কুড়িয়ে দিবি ভাই? যতীনকে কত বলে বলে তবে আনাতে হয়। দামও কি কম? এই দোক্তাটুকুর জন্যই বেঁচে আছি, প্রাণটা এখনও ওই জন্যই ধুকপুক করে।

তুমি বড্ড বকো জিজিবুড়ি। বাড়ি যাও না, মুক্তাদি কুড়িয়ে তোমাকে দিয়ে আসবেখন।

মাজায় ব্যথা, জিজিবুড়ি তাই একটু বাঁকা হয়ে উঠোনের পিছনভাগে এগোতে এগোতে বলে, দিস কিন্তু পাঠিয়ে ভাই।

দোতলার বারান্দায় এসে মা বলল, কী হল রে? কে আসছে বললি?

বাঙাল আসছে।

মায়ের মুখ শুকোল। বলল, তবে বড়গিন্নির সঙ্গে অশান্তি হয়েছে ঠিক। যা যা পড়তে বস গে৷ আলায়-বালায় ঘুরিস, টের পেলে আস্ত রাখবে না।

সেটা খুব জানে মরণ। জিজিবুড়িকে রওনা করে দিয়ে সে এক লাফে ঘরে ঢুকে পড়তে বসে গেল। অসময়ে, অ-দিনে বাঙাল আসা মানেই গণ্ডগোল। বই খুলে কান খাড়া করেই বসে রইল সে৷ পরবর্তী দৃশ্য ও ঘটনাগুলি তার খুব জানা। বাঙাল আসবে, এসে ওপাশের একতলার কোণের ঘরে ঢুকে সোজা গিয়ে বিছানায় উপুড় হয়ে শুয়ে পড়বে। কারও সঙ্গে একটিও কথা কইবে না। একদম পাথরের মতো চুপ। ওই সময়ে কেউ কাছে যাওয়ার সাহস পায় না। অন্তত আধঘণ্টা মা পর্যন্ত চৌকাঠ ডিঙোয় না। আধঘণ্টা বাদে মা এক কাপ গরম চা নিয়ে গিয়ে টেবিলে রাখবে। তারপর খুব মোলায়েম গলায় বলবে, চা এনেছি।

তার পরেও কিছুক্ষণ শুয়ে থাকবে বাঙাল। মা খুব সন্তর্পণে বিছানার এক পাশে বসে পায়ের ওপর একটু হাত বোলাবে। বাঙাল তখন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলবে। তারপর ‘হু-উ-উম’ করে একটা অদ্ভুত শব্দ করবে। তারপর উঠে বসবে। তখনও কোনও কথা নেই। বসে বসে কিছুক্ষণ সুড়ৎ সুড়ৎ করে চা খাবে। গরম চা যত পেটে যাবে তত মেজাজ শীতল হয়ে আসবে।

মরণের একটা হামা-দেওয়া বোন আছে। সেটা একেবারে নরম তুলতুলে, গোবরের নাদা। মরণ তাকে কোলে-টোলে নিতে পারে না কখনও। সেই বোনটাকে নিয়ে এসে মুক্তা এর পর বাঙালের কোলে ফেলে দেবে। বাঙাল তখন হুঁ-হুঁ-হুঁ-হুঁ করে অদ্ভুত শব্দ করতে করতে মেয়েটাকে খুব আদর করবে। মরণের বোনটাও কে জানে কেন বাঙালের ভীষণ ভক্ত। সে তখন বাঙালের নাক কামড়ে দেবে, কান ধরে টানাটানি করবে। মরণ যখন ছোট্টোটি ছিল তখনও নাকি বাঙালের মেজাজ বিগড়ালে তাকে এনে বাঙালের কোলে ফেলে দেওয়া হত আর বাঙাল ঠিক ওইরকম করে আদর করত তাকে। আর মেজাজ আরও শীতল হয়ে যেত।

সবাই বলে বাঙালের মেজাজটা একটু টং বটে, কিন্তু সে লোক ভাল। কিন্তু মরণ জানে বাবারা কখনও ভাল লোক হয় না। এই যে বাঙাল ফি শনিবার আগেভাগে তার পোস্তার দোকান বন্ধ করে এখানে বিকেল-বিকেল এসে পৌঁছোয় তখন মরণকে তৈরি থাকতে হয়। বাড়িতে পা দিয়েই বাঙাল তার খোঁজ করবে, বান্দরটা গেল কই?

সে ভয়ে ভয়ে সামনে গিয়ে দাঁড়ালেই বাঙাল তার আপাদমস্তক দেখে নিয়ে হঠাৎ বলবে, এইটার মাথাডা যে কাউয়ার বাসা হইয়া আছে দ্যাখে না কেউ? এই হারামজাদা, মাথা খাউজ্যায় না তর? খাউজ্যায়? এঃ উকুনও হইছে মনে হয়। কাইলকাই নাইপত্যা ডাকাইয়া মাথাটা লাউড়া কইরা দিতে হইব।

রসিক বাঙালের এসব কথা জলের মতো বুঝতে পারে মরণ। যদিও এ তাদের ভাষা নয়, কিন্তু জ্ঞান হওয়া অবধি শুনে শুনে সে বুঝতেও পারে, বলতেও পারে অনেকটাই। রসিক বাঙালের পাল্লায় পড়ে তাকে বার দুই ন্যাড়াও হতে হয়েছে। বাঙালের গোঁ, যে-ই কথা সে-ই কাজ।

কখনও বা হাতের নখ দেখে বলে, এঃ, এইটার তো দেখি, পিচাশের মতো নখ হইছে। ইস রে, নখের মইধ্যে কালা কালা মাটি।

নেল কাটার দিয়ে রসিক বাঙাল ডাব্বিয়ে তার নখ কেটে দেয়। এমন মুড়িয়ে কাটে যে কয়েকদিন তার আঙুলের ডগা টনটন করে।

আর সবচেয়ে দুঃখের কথা, শনি রবি দুদিনই তাকে দুবেলা রীতিমতো পড়তে হয়। টো-টো করে ঘুরে বেড়ানো বন্ধ। শ্বাসটাও ফেলতে হয় হিসেব করে। আর বাঙালের সঙ্গে বাগানের কাজে সাহায্য করতে হয়, ফাই-ফরমাশ খাটতে হয়।

আর সবচেয়ে যেটা লজ্জার কথা, এই বছর দশ-এগারো বয়সে সে তো বেশ বড়টিই হয়েছে, তবু রসিক বাঙাল মাঝে মাঝেই তাকে কলতলায় নিয়ে গিয়ে ন্যাংটো করে সাবান মাখিয়ে ছোবড়া দিয়ে ঘসে ঘসে চান করিয়ে দেয়। একে ন্যাংটো হওয়ার লজ্জা, তার ওপর ছোবড়ার ঘষটানিতে গায়ের জ্বালা। কিন্তু বাঙালের সঙ্গে এ নিয়ে কথা কইবে কে? না, রসিক বাঙালকে তার মোটেই পছন্দ হয় না। সোমবার সকালে ভাতে ভাত খেয়ে বাঙাল কলকাতার বড়বাজারে তার দোকান খুলতে রওনা হয়ে গেলে হাঁফ ছেড়ে বাঁচে মরণ। মনে হয়, এক সপ্তাহ ছুটি।

রসিক বাঙালকে নিয়ে ঠাট্টা-রসিকতারও প্রচলন আছে। তারাপদদা তাকে ইংরিজি পড়ায়। মাঝে মাঝে বলে, ও হল তোর উইক এন্ড ড্যাডি। আর বন্ধুরা বলে, রসিক বাঙাল হল তার ফিফটি পারসেন্ট বাবা।

কথাগুলো আজকাল বোঝে মরণ। একটু লজ্জা করে, রাগও হয়।

জানালা দিয়ে সাবধানে পাশ-চোখে মরণ দেখল, বাঙাল আগড় ঠেলে উঠোনে ঢুকছে। মাথার লম্বা চুল হাওয়ায় উড়োখুড়ো, মুখখানা চোয়াড়ে বটে, তবে গম্ভীর নয় যেন। হাড়ে মাসে কেঠো চেহারা। এইরকম পাকানো চেহারার লোকগুলোই রাগী হয়।

না, আজ বাঙাল রাগ করে আসেনি। উঠোনে ঢুকেই উঁচু গলায় হাঁক মারল, কই গো, কই গেলা?

মা ওপরে দম বন্ধ করে ছিল বোধহয় এতক্ষণ। বাঙালের হাঁক শুনে বলল, এই যে যাচ্ছি!

হাসিমুখে নেমে এসে বলল, আজ এলে যে!

বাঙাল বারান্দায় বসে পাশে অ্যাটাচি কেসটা রেখে বলে, আর কইও না, সুধীর মণ্ডল খবর পাঠাইছে খালপাড়ের জমিটা বেচব। তাই আর দেরি করলাম না। আইজই রেজিস্টারি।

যাক বাবা, ওই জমিটার ওপর তোমার কত কালের শখ।

অখনই বাইর হইতে হইবো, কখন ফিরুম ঠিক নাই। আইজ আর কইলকাতায় ফিরন যাইব না।

এখনই বেরোবে কি? না খেয়ে বুঝি? চান-টান করো, আমি ভাত বেড়ে দিচ্ছি।

বাঙাল তেমন আপত্তি করল না। বলল, তা হইলে লুঙ্গি গামছা দেও। গরম লাগত্যাছে।

মবণ প্রমাদ গুনল। বাঙালি তাহলে আজ থাকছে। দিনটাই মাটি। ডানধারের জানালা দিয়ে জিজিবুড়ির ভাঙাচোরা মুখ উকি মারল, ও ভাই মরণ, দোত্তাগুলো তুলেছিস?

সময় পেলুম কোথায়? বাঙাল এসে পড়ল যে।

ও আমার কপাল, না তুললে যে কে কখন মাড়িয়ে দেবে, কাক এসে মুখ দেবে।

হি হি করে হেসে মরণ বলে, কাক বুঝি দোক্তা খায়?

না খেলেও ছিষ্টি ছড়াবে ভাই, গু-মুত-খাওয়া ঠোঁটে ঠোকরাবে—সে বড় নিঘিন্নে ব্যাপার।

বাঙাল বারান্দায় বসে আছে যে!

চোখ কপালে তুলে জিজিবুড়ি বলে, বসে আছে বুঝি! গোঁসাঘরে যায়নি এখনও?

না গো জিজিবুড়ি, বাঙাল আজ ঝগড়া করে আসেনি।

তবে কী মতলবে?

কী যেন জমিজমা কেনার কথা শুনছি।

বাঙাল ওই করেই শেষ হবে। জমি-জমি করে এমন পাগল আর কাউকে দেখিনি। থাকবে নাকি আজ?

তাই তো শুনছি।

তাহলে গেল আমার অতগুলো দোক্তা।

তুমি এখন যাও জিজিবুড়ি, মুক্তাদি তোমার দোক্তা কুড়িয়ে দিয়ে আসবেখন।

আর দিয়েছে। ও আমার ভূতভুজ্যিতেই গেল। বাঙাল কার জমি কিনছে কিছু শুনলি?

সুধীর মণ্ডলের।

জমি কিনেই শেষ হবে বাঙালটা।

তুমি এখন যাও জিজিবুড়ি, বাঙাল দেখতে পেলে কুরুক্ষেত্র করবে।

যাচ্ছি বাবা যাচ্ছি। তা বলি বাঙালের নয় মাথার দোষ, পাগলের মতো জমি কিনছে, কিন্তু আমার মেয়েটাই বা অমন মেনিমুখো কেন? দুটো উচিত কথা মুখের ওপর কি বলতে নেই। কী দিয়ে যে বশ করে রেখেছে কে জানে বাবা। স্বামী তো নয়, যেন গুরুঠাকুরটি এলেন। সব সময় হ্যাঁ-হুজুর জো-হুজুর করে যাচ্ছে। জন্মে এমন দেখিনি বাবা। কই, বড় বউ কি ছেড়ে কথা কয় বাঙালকে? দিচ্ছে তো গুষ্টির পিণ্ডি চটকে থোঁতা মুখ ভোঁতা করে। তখন তো ল্যাজ গুটিয়ে এখানে এসে গোঁসাঘরে টান টান হয়ে শুয়ে থাকে, পারে কিছু বলতে গিয়ে তাকে? আমার মেয়েটাই হল গে মেনিমুখো।

কথাটা ঠিক নয়। তার মায়ের সঙ্গে রসিক বাঙালের কখনও-সখনও ঝগড়া হয়। তবে সেটা বেশি দূর গড়ায় না। মা পায়ে-টায়ে ধরে মিটিয়ে ফেলে। মরণের আগে মনে হত, মা রসিক বাঙালকে খুব ভয় পায়। আর শুধু ভয়ই পায়। আজকাল বুঝতে পারে, মা বাঙালকে ভালও বাসে খুব। এইটে মাঝে মাঝে মরণের তেমন পছন্দ হয় না।

বাঙাল উঠোনে দাঁড়িয়েই লুঙ্গি গলিয়ে প্যান্ট, জাঙ্গিয়া ছাড়ল, জামা গেঞ্জি খুলে ফেলল। মা সেগুলো নিয়ে উঠোনের তারে মেলে দিল ঘাম শুকোনোর জন্য। বাঙাল গেল টিউবওয়েলে চান করতে।

বাঙালদের জমির নেশা থাকে বলে শুনেছে মরণ। সেই নেশাতেই একদিন জ্ঞাতিভাই মাখন দত্তের সূত্রে এখানে এসে জমিজিরেত কিনেছিল বাঙাল। ইচ্ছে ছিল এখানেই থাকবে, ডেলি প্যাসেঞ্জারি করে কলকাতার ব্যবসা বজায় রাখবে। কিন্তু বাঙালের বউ শেষ অবধি গাঁয়ে এসে টিকতে পারেনি। রসিক তখন ফাঁপড়ে। কে এই জমিজমা, বাড়িঘর দেখে! ভাড়া করা লোক দিয়ে তো আর সম্পত্তির রক্ষণাবেক্ষণ হয় না। বেচে দিয়ে চলে যাওয়ার পরামর্শই লোকে দিয়েছিল, কিন্তু বাঙালের গোঁ যাবে কোথায়! সে বলল, বেচুম ক্যান? জমির লগ্নির মাইর নাই।

বাঙালের সেইসব গল্প আজও লোকের মুখে মুখে ফেরে। নিজের মায়ের কাছে খানিক, আর খামচা খামচা নানা জনের মুখে শুনেছে মরণ। সম্পত্তি রক্ষণাবেক্ষণের জন্য সবচেয়ে বিশ্বস্ত লোক হল বউ। তাই বাঙাল একদিন ঠিক করে ফেলল, এখানে আর একটা বিয়ে করবে। খুঁজে খুঁজে স্বজাতি স্বঘর গরিবের একটা মেয়েকে পছন্দও করে ফেলল সে। আর তখনই গাঁয়ে বিরাট শশারগোল উঠল। বাঙাল দেশ থেকে এসে একটা লোক গাঁয়ে নষ্টামি করছে। বাঙালকে মারধর করারও চেষ্টা হল। পুলিশ ডাকা হল। সে অনেক ঘটনা।

বাঙাল তখন গিয়ে ধরে পড়ল গৌরহরি চাটুজ্যেকে। মস্ত উকিল, মান্যগণ্য বিচক্ষণ মানুষ। গৌরহরি চাটুজ্যে তলচক্ষুতে খানিকক্ষণ বাঙালকে দেখে নিয়ে নাকি বলেছিল, বুকের পাটা আছে হে!

বুকের পাটা আর টাকা এ দুটো যার থাকে তাকে জব্দ করা কঠিন। গৌরহরি চাটুজ্যে একদিন মিটিং ডেকে সবাইকে বলল, রসিক সাহা একটা মেয়েকে বিয়ে করতে চাইছে বলে তোমরা আপত্তি করছ শুনলাম। আপত্তি ওঠারই কথা। তবে বাপু, রসিক বিয়ে না করে যদি চারটে মেয়েমানুষ রাখত তাহলে তোমরা কী করতে? বড় জোর আড়ালে-আবডালে ফিসফাস গুজগুজ বা নিন্দেমন্দ। তার বেশি কিছু নয়। আমি বলি কী, এ লোক তো বুকের পাটা আছে বলেই বিয়ে করছে। বাইগ্যামির চার্জে যদি ওর বউ ওকে জেলে পাঠায় তো পাঠাবে। সে দায় ওর। তবে বাসন্তী যাতে ফাঁকে না পড়ে তার জন্য রসিক সাহা বাসন্তীর নামে সম্পত্তি লিখে দিতে রাজি আছে। সে ভার আমিই নিচ্ছি।

একজন মাতব্বর বলেছিল, দাদা, আপনি জেনেশুনে এই বে-আইনি কাজকে প্রশ্রয় দিচ্ছেন?

গৌরহরি বললেন, মানুষের প্রয়োজন বুঝেই বরাবর আইন তৈরি হয়েছে, সেরকমই হওয়া উচিত। মানুষের প্রয়োজনে কাজে না এলে আইন বোঁদা জিনিস। রসিক ফুর্তি করার জন্য তো আর একটা বিয়ে করছে না। তার সম্পত্তি দেখাশোনার জন্যই দ্বিতীয় স্ত্রীর প্রয়োজন। প্রাচীন কালে সামাজিক প্রয়োজনেই মানুষকে এরকম বিয়ে করতে হয়েছে। উদ্দেশ্য খারাপ না হলে আমি অন্তত দোষ দেখছি না।

অনেক গণ্ডগোলের ভিতর দিয়ে বিয়েটা অবশ্য হয়ে গেল। কিন্তু খবরটা কলকাতায় রসিক বাঙালের বাড়িতে পৌঁছোনোর পর হয়েছিল আরও সাংঘাতিক কাণ্ড। বাঙালের বউ দুবার গলায় দড়ি দিতে গেল, থানা-পুলিশ হল, বাঙালকে ধরে নিয়ে গিয়ে ফাটকেও পুরল পুলিশ।

কিন্তু তারপর ধীরে ধীরে কালের নিয়মে উত্তেজনা প্রশমিত হল, রাগের পারদ নেমে গেল। বাঙাল তার দুই সংসারের মধ্যে ভাগ হয়ে দিব্যি চলতে শিখল।

কলকাতার মা বা বড়মা কেমন তা অবশ্য জানে না মরণ। তার একটা দাদা আর একটা দিদিও আছে। তাদের কখনও দেখেনি সে। কিন্তু সে মাঝে মাঝে খুব ঝুম হয়ে বসে তাদের কথা ভাবতে চেষ্টা করে। দেখা হলে তারা কি মরণকে দুর-দুর ছাই-ছাই করবে? করবে বোধহয়। কিন্তু মরণের মনে হয়, তারা বোধহয় তার খুব পর-মানুষ নয়। বাঙাল কাঠখোট্টা লোক, কলকাতার বাড়ির কথা বিশেষ তার মুখে শোনা যায় না। তবে মাঝে মাঝে যে ও-বাড়িতে খুব ঝগড়া হয় তা টের পায় তারা, যখন বাঙাল মুখ গোমড়া করে অসময়ে এসে হাজির হয়।

মায়ের ওপর রাগ করে মরণ কখনও কখনও বলে, আমি একদিন বড়মার কাছে, দাদা দিদির কাছে চলে যাব।

মা বলে, যা না, তা-ই যা, গিয়ে বুঝবি কত ধানে কত চাল। গালভরে আবার বড়মা বলা হচ্ছে। গিয়ে বুঝবি পেটে ধরা মা আর ডাকের মায়ের তফাত কী।

তফাত বোঝার মতো বয়স হয়নি মরণের। কিন্তু কলকাতার বাড়ি, বড়মা, দাদা বা দিদি সম্পর্কে তার একটা রূপকথার মতো কুহক আছে। তারা হয়তো খুব সুন্দর মানুষ, বাড়িটা হয়তো রাজপ্রাসাদের মতো। তারা হয়তো দুর-ছাই করবে না তাকে।

বাঙাল বারান্দায় বসে ভাত খেল। তারপর জামা-প্যান্ট পরে রওনা হওয়ার সময় বলল, তা হইলে আসি গিয়া।

এসো। তাড়াতাড়ি ফিরবে কিন্তু?

হ। দুর্গা দুর্গা।

দুর্গা দুর্গা।

বাঙাল চলে গেল। মরণ ঘর থেকে বেরিয়ে লাফ দিয়ে উঠোনে নেমে হোঃ হোঃ করে দু হাত ওপরে তুলে দু চক্কর নেচে নিল।

মা ভ্রূ কুঁচকে বলে, ও মা! অমন করছিস কেন?

মায়ের সামনে বাবাকে বাঙাল বললে মা রাগ করে। তাই সে ভয়ে ভয়ে বলে, এমনি।

মা শুধু বলল, ওরকম করতে নেই।

নিকোনো উঠোন থেকে জিজিবুড়ির পড়ে যাওয়া দোক্তা বাঁ হাতের তেলোতে তুলে জড়ো করতে করতে মরণ বলল, বাবা আসছে শুনে জিজিবুড়ি এমন ভয় পেল যে দোক্তা ফেলে পালিয়েছে।

মা বাঙালের ভেজা লুঙ্গি তারে মেলতে মেলতে বলল, মায়ের যেমন কাণ্ড! ভয় পাওয়ার আর দোষ কী? কম লেগেছিল লোকটার পিছনে? এখন মুখোমুখি হলে লজ্জায় মাথা কাটা যায়।

ঘটনাটা জানে মরণ। মায়ের সঙ্গে বাঙালের বিয়ে দিতে গিয়ে এককাঁড়ি টাকা আদায় করেছিল জিজিবুড়ি। বিয়ের পরেও নানা অভাবের কথা বলে টাকা নিত। নিজের দুই পাষণ্ড ছেলে কানাই আর বলাইকে লাগিয়েছিল বাঙালের চাষ আবাদে। তারা ধান-চালের হরির লুট ফেলে দিয়েছিল। বাঙালের গোলায় ফসল আর উঠতই না। মতলব ছিল বাঙালকে তাড়িয়ে সম্পত্তি দখল করার। কারণ সম্পত্তি সবটাই প্রায় মেয়ের নামে। তা সেটা প্রায় ঘটেও গিয়েছিল। কলকাতার সংসারে যখন অশান্তি লাগে তখন বাঙালের যাতায়াত গিয়েছিল কমে। সেই ডামাডোলে বাঙাল যখন প্রায় ‘নেই’ হয়ে গেছে সেসময় দুই ভাই এসে বোনকে নানা কানমন্তর দিত। বাঙাল যে খারাপ লোক, সে যে ঘুরে ঘুরে বিয়ে করে বেড়ায় এবং তার যে আরও নানা দোষ আছে সেসব কথা। সেই দুর্দিনে মায়েরও খুব মনের কষ্ট গেছে। পেটে তখন মরণের বড় বোনটা, যেটা বাঁচেনি। বাঁচার কথাও নয়। সেই সময়ে মন খারাপের চোটে মূৰ্ছা রোগ হয়েছিল। কয়েকবার মাথা ঘুরে পড়ে গিয়ে মেয়েটা পেটের মধ্যে মরে গেল।

বাঙাল যখন ফিরে এল বিষয়ী মানুষের চোখে তখন পরিস্থিতি বুঝে নিতে দেরি হয়নি। দুই শালাকে তাড়িয়ে নিজের বউকে আগলে যখন সে রুখে দাঁড়াল তখনই জিজিবুড়ি আর তার ছেলেদের সঙ্গে সম্পর্কটা বিষ হয়ে গেল। মারাত্মক ঘটনাটা ঘটল তার পরেই। কানাই আর বলাই দুটো গুণ্ডা ভাড়া করে লাগাল বাঙালকে নিকেশ করতে। সেটা হলে বোনের সম্পত্তির দখল নিতে আর বাধা হত না। দুটো গুণ্ডা বাঙালকে কুপিয়েও দিয়েছিল বাসরাস্তার কাছে বাঁশবনে। কিন্তু বাঙাল একটাকে পেড়ে ফেলেছিল। ধরা পড়ে দুজনেই কবুল করেছিল তারা কানাই বলাইয়ের টাকা খেয়ে এ কাজ করেছে।

মোকদ্দমা হতে দেয়নি বাসন্তী। বাঙালের হাতেপায়ে ধরে ভাইদের বাঁচিয়ে দিয়েছিল। কেলেঙ্কারির ভয়ে বাঙালও বেশি কিছু করেনি। কিন্তু সেই থেকে বাঙাল এলে ও-বাড়ির কেউ ভয়ে আর এ-বাড়িতে আসে না। কিন্তু বাঙাল না থাকলে তারা এখনও এসে টাকাটা সিকেটা ধানটা চালটা মেগে-পেতে নিয়ে যায়।

এসব ঘটনার পর মরণ হয়েছিল। ওপরের বোন মারা যাওয়ায় তার নাম রাখা হয়েছিল মরণকুমার। যমকে খুশি করতেই রাখা।

জিজিবুড়ি বলছিল, জমি কিনে কিনেই বাঙাল একদিন শেষ হয়ে যাবে।

জমি কিনে শেষ হবে কেন? জমি রাখতে জানলে জমির মতো জিনিস নেই। আর শোনো, তুমি এখন বড় হয়েছ, এখন আর বাবাকে তাঁর আড়ালেও বাঙাল বলবে না।

সবাই বলে যে, তাই মুখে এসে যায়।

অন্যের কাছে উনি যা, তোমার কাছেও কি তাই? একটা মান্যিগন্যি নেই?

আছে বাবা, খুব আছে। মরণ তার বাপকে যমের মতো ভয় খায়। আর ভয় খায় বলেই আড়ালে ‘বাঙাল’ ডেকে সেই ভয়টার সঙ্গে লড়াই করে।

বাঙালের লুঙ্গিটা টান টান করে খুব যত্নের সঙ্গে মেলে দিয়ে ক্লিপ আটকাচ্ছে মা, অনেক সময় নিয়ে। এমন আদুরে ভাব, যেন লুঙ্গিটাই বাঙাল। তেমনি যত্ন করে গামছাটা মেলতে মেলতে মা আপনমনে বলল, তোমার বাবা ভাল লোক।

জিজিবুড়ি ঠিক উলটো কথা বলে, ও হল বাঙাল দেশের লোক, ওদের জাতজন্মের ঠিক নেই। তেলি সাউ না শুঁড়ি সাউ কে জানে বাবা, ভোল পালটে সব আসে। আর কথারই বা কী ছিরি। উর্দু বলছে না পার্সি বলছে বোঝার জো নেই। মুড়িকে বলে হালুম, কাদাকে বলে প্যাক। ছিছিক্কার যাই বাবা। তার ওপর ঊর্ধ্ববায়ু, রগচটা মুষল। ওরা কি সব ভাল লোক? ভাল লোকেরা কি লুকোছাপা বিয়ে করে বাপ? আরও কটা করে বসে আছে তার খোঁজ নেয় কে? কপালটাই আমার অমন, লোভ দেখিয়ে মেয়েটার সব্বোনাশ করল।

তাই যদি হবে তাহলে বাঙাল এলে মায়ের চেহারায় একটা ভেজা ভেজা স্নিগ্ধ ভাব কেন ফুটে ওঠে? চোখ দুখানা কেন অমন নরম হয়ে যায়? বাঙালের লুঙ্গি আর গামছাখানা কেমন টান টান করে মেলে দিল মা, আর কারও জামাকাপড় অত যত্ন করে মেলে না তো! হাঁ করে দেখছিল মরণ। বাঙাল ভাল লোক না খারাপ লোক এই অঙ্কটা তার মিলতে চায় না কিছুতেই।

জিজিবুড়ি পিছনের দিকের খিড়কি দরজায় কচুপাতার আড়াল থেকে উদয় হয়ে সাবধানে মুখ বাড়িয়ে বলল, বাঙালটা বিদেয় হয়েছে?

কথাটা শুনে মায়ের ভ্রূ কোঁচকাল।

জিজিবুড়ি উঠোনে ঢুকতে ঢুকতে বলল, দিন নেই ক্ষণ নেই এসে উদয় হলেই হল। এমন আঁতকে উঠলুম যে পানের বাটাখানা পড়ে সব ছয়ছত্রখান৷ পিলে চমকানো লোক বাপু। দিলি ভাই তুলে দোক্তাটুকু? সুপুরিও পড়ে আছে দেখ কয়েক কুচি।

বাসন্তী একটু ঝাঁঝের গলায় বলে, সবসময় অমন ঠেস মেরে বাঙাল-বাঙাল বলল কেন বললা তো! শুনে শুনে বাচ্চারাও শিখছে। তোমার যে কবে আক্কেল হবে।

ও মা! বাঙালকে বাঙাল বলব না তো কী? নবদ্বীপের গোসাঁই তো নয় রে বাপু। ওসব মনিষ্যি আমাদের মতো তো আর নয়।

ওসব কী কথা মা! এতকাল বলে এসেছ, শুনেছি। কিন্তু এখন একটু মুখটা সামলাবে তো৷ ছেলেপুলেরা বড় হচ্ছে না? ভক্তিছেদ্দা শিখবে কিছু ওসব শুনলে?

ও মা! বাঙাল লোকদের আবার ভক্তিছেদ্দা কীসের রে? ওসব ডাকাত লুঠেরা লোক। দেখলি না গাঁয়ে এসেই কেমন রসালো জমিগুলো গাপ করে নিল। যারা দুটো-চারটে করে বিয়ে বসে তারা আবার ভাল লোক! রাঁঢ় পুষলেও না হয় কথা ছিল, বিয়ে বসে কোন আক্কেলে রে?

তুমি দোক্তা কুড়িয়ে নিয়ে বিদেয় হও তো! বেশি কথা কয়ো না। আমার বাঙাল বরই ভাল। জন্মে জন্মে যেন আমার অমন বাঙাল বরই হয়।

বলিস কী লো মুখপুড়ি? এ যে নিজে কুড়িয়ে অভিসম্পাত নিলি! মাথাটা তোর খেয়েছে দেখছি।

যখন দশটি হাজার টাকা নিয়ে নিজের মেয়েকে ওই বাঙালের কাছে বেচে দিয়েছিলে তখন এত শাস্ত্রজ্ঞান কোথায় ছিল? তখন তো বাঙাল বলে ঠোঁট বাঁকাওনি, হাতও গুটিয়ে নাওনি!

ও মা! তখন কি বুঝেছিলুম রে বাপু! এমন সোনাহারা মুখ করে এসে দাঁড়িয়েছিল যেন ভাজা মাছটি উলটে খেতে জানে না। ওরা সব কামিথ্যের ডাকিনী বিদ্যে জানে, এক এক সময়ে এক এক রূপ ধরে। বুঝতে পারলে কি আর গুখেকোর মতো কাজ করি! একটা বাঙাল মরলে দুটো গোখরো সাপ জন্মায়।

খুব হয়েছে মা, তোমার আর বেশি বুঝে কাজ নেই। এতই যদি সে খারাপ তবে তার বাড়িতে এসে রাজ থানা গেড়ে বসে থাকো কেন, তার চাল ডাল টাকা হাত পেতে নিয়ে যাও কোন লজ্জায়?

বাঙালের জিনিস হলে নিতুম নাকি রে পোড়ারমুখি? তোর জিনিস বলে নিই। না দিস তো না-ই দিবি, অত কথা কীসের? তবে এও বলি বাপু, বাঙাল তোকে ওষুধ করে রেখেছে। ঘোর কাটলে টের পাবি।

এ যেন একটা টেপ রেকর্ডারে একই ক্যাসেট ঘুরে ফিরে বাজছে। জ্ঞান হয়ে অবধি মা আর জিজিবুড়ির এইসব চাপানউতোর শুনে আসছে মরণ। দুজনে লাগলেই মরণ মনে মনে নারদ মুনিকে ডাকতে লাগে। মা যত রাগবে সেদিন ততই মায়ের হাতের রান্না খোলতাই হবে। এর কখনও নড়চড় হয়নি। রেগে গেলে মায়ের হাত যেন অন্নপূর্ণার হাত। আজ আবার বাঙাল এসেছে, দু-চারটে ভালমন্দ হবে।

তোমরা কত ভাল তা জানা আছে। মানুষটাকে খুন অববি করতে চেয়েছিল তোমার হিরের টুকরো ছেলেরা। আজও লোকটার কাঁধে আর পিঠে ভোজালির দাগ দগদগে হয়ে আছে।

ওসব বাজে কথা। বাঙাল রটাল আর তুইও বিশ্বাস করলি। কার সঙ্গে কোথায় গণ্ডগোল করে রেখেছিল তারা খুনোখুনি করতে লোক লাগায়। সত্যিই যদি হবে তাহলে বাঙাল মামলা করল না কেন শুনি!

সে আমি হাতেপায়ে ধরেছিলুম বলে। সবাই জানে মা, আর গুণধর ছেলেদের সারতে চেয়ো না। খুব তো ছেলেদের হয়ে টানছ, তা সেই গুণধর ছেলেরা এখন দেখছে তোমায়? লাথি ঝাঁটা মুখনাড়া খেয়ে তো পড়ে আছ, আর রোজ এসে এ-বাড়িতে একখানা ঘর দেওয়ার জন্য ঘ্যান ঘ্যান করছ।

ছেলেদের দোষ কী? বউগুলো খচ্চড়।

তোমার হাতের পাতের টাকাকড়িগুলো তো আর বউরা কেড়ে নেয়নি, গয়নাগুলোও তারা গাপ করেনি। করেছে তোমার অকালকুষ্মাও ছেলেরা। আর কত মিছে কথা কইবে মা!

জিজিবুড়ি একটু দম ধরে বসে রইল উঠোনে। তারপর হঠাৎ গলাটা মিহিন করে বলল, তা বাঙালের মেজাজটা ঠান্ডা হলে একবার কথাটা তুলিস। বেশি কিছু তো নয়, ওই পশ্চিমের দালানের নীচেরতলায় কোণের ঘরটা যদি দেয়। আর দুবেলা দুমুটো ভাত। এটুকু কি আর তার গায়ে লাগবে? দোহাত্তা তো কামাচ্ছে বাবা।

ওসব মতলব ছাড়ো মা। সে রাজি থাকলেও আমি রাজি নই। কিছুতেই সেরকম বন্দোবস্ত হবে না।

পেটের শত্তুরের মতো শত্রুর নেই, বুঝলি?

গজর গজর করতে করতে জিজিবুড়ি পাছদুয়ার দিয়ে বিদেয় হল।

মা কিছুক্ষণ বারান্দার সিঁড়িতে চুপ করে বসে রইল ঝুম হয়ে। দুটো চোখ ধীরে ধীরে টস টস করতে লাগল জলে। চোখে আঁচল চাপা দিয়ে নীরবে কাঁদছে মা। কেন কাঁদে মরণ তা বুঝতে পারে। এখন সে বড় হয়েছে। মা বাঙালের কথা ভেবে কাঁদে। মা বাঙালকে বড্ড ভালবাসে। বাঙালকে কেন যে মরণ অত ভালবাসতে পারল না কে জানে।

সে কাছে গিয়ে ডাকল, মা!

হাত বাড়িয়ে মা তাকে ধরে পাশে বসিয়ে ধরা গলায় বলল, চুপটি করে বসে থাক। কথা বলিস না। আমার মনটা ভাল নেই।

একটু উশখুশ লাগছিল বটে, তবু মরণ চুপ করেই বসে রইল। মা আঁচল সরিয়ে কিছুক্ষণ উদাস চোখে সামনের দিকে চেয়ে রইল। সামনে ফর্সা উঠোন, চাটাইয়ে সর্ষে শুকোচ্ছে আর পুরনো তেঁতুল। একটা দুটো কাক ঘুরে ঘুরে উঠোনে নেমে আসছে। মা কাকগুলোকে হুড়ো অবধি দিল না। মায়ের মন আজ সত্যিই খারাপ।

বেশ কিছুক্ষণ বাদে মা হঠাৎ বলল, বড্ড ভয় করছে বাবা, শুনছি নাকি সুমন আসবে।

সুমন! সে কে মা?

বড়গিন্নির ছেলে।

ধম করে উঠল মরণের বুক। উত্তেজিত গলায় বলল, দাদা?

হ্যাঁ বাবা। তোর বাবা আজ খেতে বসে বলছিল, ছেলের নাকি খুব ইচ্ছে হয়েছে গাঁয়ের বাড়ি দেখে যেতে।

তাতে ভয় কী মা?

ভয় বলে ভয়। কী মনে করে আসছে তা তো জানি না। আমি তো তাদের শওুর।

কেন মা?

সংসার ভাঙিনি আমি? একটা সংসার দু টুকরো হল তো আমার জন্যই। ছেলে কি ভাল মন নিয়ে আসবে?

কথাটা ভাববার মতো। মরণেরও ভয় হচ্ছে একটু, আনন্দ হচ্ছে খুব। শহরের দাদা বা দিদির কথা সে কত ভাবে কত স্বপ্ন দেখে তাদের নিয়ে। বড়মার কথাও খুব ভাববার চেষ্টা করে সে।

সত্যিই আসবে মা?

তোর বাবা তো বলল।

কবে?

তার কোনও ঠিক নেই। হয়তো আসছে সপ্তাহে, বা তার পরে কোনওদিন। বড়গিন্নি তো তাদের কানে বিষ ঢালতে ছাড়েনি। তাই বড় ভয় হচ্ছে। কী জানি বিষয়সম্পত্তি নিয়ে দাবি তুলবে কিনা।

তাহলে কী হবে মা?

কে জানে কী হবে। সম্পত্তি তো তোর বাবার, আমার নামে দলিলটুকুই যা। তাই ভয় হচ্ছে।

মরণ চুপ করে বসে রইল। ভিতরে যে আনন্দের আলোটা জ্বলে উঠেছিল সেটা ফের নিবে গেল। মরণ ভাবছে। মরণ বড় হচ্ছে।

সকল অধ্যায়
১.
প্রথম অধ্যায়
২.
দ্বিতীয় অধ্যায়
৩.
তৃতীয় অধ্যায়
৪.
চতুর্থ অধ্যায়
৫.
পঞ্চম অধ্যায়
৬.
ষষ্ঠ অধ্যায়
৭.
সপ্তম অধ্যায়
৮.
অষ্টম অধ্যায়
৯.
নবম অধ্যায়
১০.
দশম অধ্যায়
১১.
একাদশ অধ্যায়
১২.
দ্বাদশ অধ্যায়
১৩.
ত্রয়োদশ অধ্যায়
১৪.
চতুর্দশ অধ্যায়
১৫.
পঞ্চদশ অধ্যায়
১৬.
ষোড়শ অধ্যায়
১৭.
সপ্তদশ অধ্যায়
১৮.
অষ্টাদশ অধ্যায়
১৯.
ঊনবিংশ অধ্যায়
২০.
বিংশ অধ্যায়
২১.
একবিংশ অধ্যায়
২২.
দ্বাবিংশ অধ্যায়
২৩.
ত্রয়োবিংশ অধ্যায়
২৪.
চতুর্বিংশ অধ্যায়
২৫.
পঞ্চবিংশ অধ্যায়
২৬.
ষড়বিংশ অধ্যায়
২৭.
সপ্তবিংশ অধ্যায়
২৮.
অষ্টাবিংশ অধ্যায়
২৯.
ঊনত্রিংশ অধ্যায়
৩০.
ত্রিংশ অধ্যায়
৩১.
একত্রিংশ অধ্যায়
৩২.
দ্বাত্রিংশ অধ্যায়
৩৩.
ত্রয়োত্রিংশ অধ্যায়
৩৪.
চতুর্ত্রিংশ অধ্যায়
৩৫.
পঞ্চত্রিংশ অধ্যায়
৩৬.
ষট্ত্রিংশ অধ্যায়
৩৭.
সপ্তত্রিংশ অধ্যায়
৩৮.
অষ্টত্রিংশ অধ্যায়
৩৯.
ঊনচল্লিশ অধ্যায়
৪০.
চল্লিশ অধ্যায়
৪১.
একচল্লিশ অধ্যায়
৪২.
দ্বিচল্লিশ অধ্যায়
৪৩.
ত্রিচল্লিশ অধ্যায়
৪৪.
চতুর্চল্লিশ অধ্যায়
৪৫.
পঞ্চচল্লিশ অধ্যায়
৪৬.
ষট্চল্লিশ অধ্যায়
৪৭.
সপ্তচল্লিশ অধ্যায়
৪৮.
অষ্টচল্লিশ অধ্যায়
৪৯.
ঊনপঞ্চাশ অধ্যায়
৫০.
পঞ্চাশ অধ্যায়
৫১.
একান্ন অধ্যায়
৫২.
বায়ান্ন অধ্যায়
৫৩.
তিপ্পান্ন অধ্যায়
৫৪.
চুয়ান্ন অধ্যায়
৫৫.
পঞ্চান্ন অধ্যায়
৫৬.
ছাপ্পান্ন অধ্যায়
৫৭.
সাতান্ন অধ্যায়
৫৮.
আটান্ন অধ্যায়
৫৯.
ঊনষাট অধ্যায়
৬০.
ষাট অধ্যায়
৬১.
একষট্টি অধ্যায়
৬২.
বাষট্টি অধ্যায়
৬৩.
তেষট্টি অধ্যায়
৬৪.
চৌষট্টি অধ্যায়
৬৫.
পঁয়সট্টি অধ্যায়
৬৬.
ছেষট্টি অধ্যায়
৬৭.
সাতষট্টি অধ্যায়
৬৮.
আটষট্টি অধ্যায়
৬৯.
ঊনসত্তর অধ্যায়
৭০.
সত্তর অধ্যায়
৭১.
একাত্তর অধ্যায়
৭২.
বাহাত্তর অধ্যায়
৭৩.
তিয়াত্তর অধ্যায়
৭৪.
চুয়াত্তর অধ্যায়
৭৫.
পঁচাত্তর অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%