শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
রাবণরাজা নাকি রামচন্দ্রকে শত্রুভাবে ভজনা করত। শত্রু ভাবলে কি ভজনা হয়? তবে আশ্চর্য ব্যাপার হল, যাকে ঘেন্না করা হয়, যার ওপর প্রবল আক্রোশ, তার কথা কিন্তু ক্ষণে ক্ষণে মনে পড়ে। ভালবাসার মানুষকে যত না মনে পড়ে তার চেয়ে ঢের বেশি মনে পড়ে ঘেন্না আর আক্রোশের লোকটাকে। ঘেন্না, আক্রোশ, রাগও কি তাহলে একরকম আকর্ষণ? কেউ কেউ বলে ঘেন্না আর ভালবাসা টাকার এ পিঠ ও পিঠ। কিন্তু তাই কি হয়! রাবণরাজা রামচন্দ্রকে হয়তো সারাক্ষণ ভাবত, কী ভাবে তার সর্বনাশ করবে বলে। সেটা কি ভজনা রে বাপু?
তৃতীয় ফ্রন্ট হল শীতল উদাসীনতা। ওই কুয়োয় নেমে গেলে মানুষ আর উঠে আসতে পারে কমই। ভালবাসলে মনে পড়ে, ঘেন্না বা রাগ থেকেও মনে পড়ে, কিন্তু উদাসীনতা ভেজা ন্যাতার মতো মনের সেলেটখানা মুছে ফেলে। তখন সেখানে আর কোনও আঁকিবুঁকি নেই, কিচ্ছু নেই। কালো সেলেট হাঁ করে চেয়ে থাকে শুধু।
পাশের ঘরে মোনা, সোহাগ আর বুডঢা। আর মা—বাবার পরিত্যক্ত ঘরখানায় একা অমল। গত চার পাঁচ দিন সে দাড়ি কামায়নি। শেষ কবে কামিয়েছিল তা ভাল মনেও নেই। গাল গলা কুট কুট করে দাড়িতে। চুলে চিরুনি দিতে মনে থাকে না, ইচ্ছেও হয় না। কোঁকড়া চুল বলে না আঁচড়ালেও চলে।
এ-ঘরে সাবেক মস্ত খাট। তাতে নানা গেঁয়ো কারুকার্য। কাঠ আর স্টিলের গোটা তিনেক আলমারি। গোল মতো টেবিল, ভারী কাঠের চেয়ার, ট্রাঙ্ক বাক্স মিলিয়ে ঘরে গুদোমঘরের মতো অবস্থা। ইঁদুরের উৎপাত আছে, আরশোলা ঘুরছে সারাক্ষণ। জানালা কপাট খুলে রাখলেও বন্ধ বাতাসের গন্ধ যেতে চায় না। অমল টের পায়, কিন্তু গ্রাহ্য করে না।
ওই ঘরে তার পরিবার, তার দুই সন্তান, অনাত্মীয়া স্ত্রী, মাঝখানে এক ঠান্ডা অন্ধকার সমুদ্র। ওই সমুদ্র অতিক্রম করা বোধহয় আর সম্ভব নয়। সেই চেষ্টা আর করে না অমল। পণ্ডশ্রম। দু ঘরের মাঝখানের দরজাটাও খোলা হয়নি। প্রয়োজন বোধ করেনি কেউ।
পারুলের প্রতি কি খুব অন্যায় করেছিল অমল? খুব? অনেক ভেবে দেখেছে সে, অন্যায় হলেও সেটা ক্ষমার অযোগ্য ছিল না, বিশেষ করে বিয়ে যখন ঠিক হয়েই ছিল। তার একটা অন্যায়ের প্রতিশোধ অনেক বেশি হয়ে গেল নাকি?
এখন মধ্যরাতে উঠে বসে আছে অমল। গ্রামে শীত পড়ে গেছে। হালকা, মনোরম শীত। মায়ের পুরনো একটা কাঁথা চাপা দিয়ে ভারী আরামে ঘুমিয়ে পড়েছিল সে। কিন্তু মধ্যরাতে চটকা ভেঙে গেল। প্রায়ই যায়। ঘুম একবার ভেঙে গেলে সে জেগে শুয়ে থাকতে পারে না। উঠে বসে সে শুনতে পেল, দূরে লাউডস্পিকারে কোনও যাত্রাপালার সংলাপ। সবুজ সংঘ নবমী পুজোয় কলকাতার একটা নামী দলকে আনিয়েছে। বাড়ি সুদ্ধু লোক গেছে যাত্রা দেখতে। এমন কী মহিমও। শুধু অমলের পরিবারের কেউ যায়নি।
রাত কত হল জানার জন্য ঘড়ির দিকে চাইলেই হয়। কিন্তু সেই ইচ্ছেটাও হল না অমলের। কী হবে জেনে? উঠে সে চুপচাপ ভূতগ্রস্তের মতো চেয়ে থাকে। ঘর অন্ধকার, তবে দূরের প্যান্ডেল থেকে গাছপালার ফাঁক দিয়ে একটু আলো এসে লেগে আছে মশারিতে। এইসব নির্জন, নিঃসঙ্গ সময়ে পারুলের কথা ভাবতে চেষ্টা করে সে। আগে খুব মনে পড়ত পারুলকে। আবেগ উথলে উঠতে চাইত। স্ত্রীর সঙ্গে মিলনের সময়ে পারুলের মুখশ্রী আরোপ করে নিত মমানার মুখে। বেশ কিছুকাল মোনা আর পারুলের এক সংমিশ্রণ ঘটিয়ে নিতে পারত সে। সে এক আশ্চর্য রসায়ন। প্রবল কল্পনাশক্তি বাস্তবের অনেক ঘাটতি পূরণ করে নেয়।
এখন কেন যে পারুলের মুখ আর তেমন স্পষ্ট মনে পড়ে না কে জানে! পারুলের মুখের ওপর আরও নানা মুখের আদল এসে পড়ে। তখন ভীষণ কষ্ট হয় তার। পারুল কি হারিয়ে যাচ্ছে তার স্মৃতি থেকে। অ্যালবাম খুলে সে কতবার মুখটা ফের স্মৃতিতে গেঁথে নেওয়ার চেষ্টা করেছে। কিন্তু তবু তার স্মৃতিতে বিন্দু বিন্দু অন্ধকার চলে আসে কেন? হাজার মুখের টুকরো এসে কেন যে ভেসে বেড়ায় মনশ্চক্ষে।
একটা শীতল ভয়ও আজকাল ছুরির মতো ঢুকে যায় বুকে। যদি মোনার বদলে পারুল তার বউ হত তা হলেই কি সুখী হত সে? নিজেকে সে বিরহী ভেবে, বঞ্চিত হতাশ প্রেমিক ভেবে একরকম সান্ত্বনা পেয়ে যায়। কিন্তু যদি এরকম হত, পারুলকে বিয়ে করত সে এবং তারপর ধীরে ধীরে প্রেম অবসিত হয়ে ঘৃণা আর আক্রোশ ঘুলিয়ে উঠত দুজনের মধ্যে, তারপর আসত শীতল উদাসীনতা—তা হলে কী হত? না পাওয়া পারুলকে দেবীর আসনে বসানো সোজা, কিন্তু পাওয়া পারুলকে কি পারত সে? পারুলের অপমৃত্যু ঘটে যেত কবেই। এবং আজ এই মধ্যরাতে ও-ঘর আর এ-ঘরের মধ্যে যে অথৈ সমুদ্দুরের ব্যবধান সেই সমুদ্দুর চলে আসত তার আর পারুলের মাঝখানেও।
শ্বাসকষ্টের মতো একটা কষ্ট হচ্ছিল অমলের। শারীরিক নয়, কষ্টটা অন্যরকম। মাথাটা বড্ড গরম। সে কৃতী ছাত্র, সফল মানুষ। কিন্তু এখন যেন তার সব সফলতা ছাড়া জামাকাপড়ের মতো পড়ে আছে কোথায়। অন্ধকারে বড় বিবসন মন হয় নিজেকে। বড় গৌরবহীন!
অমল উঠল। মশারি তুলে বেরিয়ে একটু জল খেল গেলাস থেকে। চেয়ারের ওপর স্তূপাকার হয়ে পড়ে থাকা আলোয়ানটা গায়ে জড়িয়ে নিল সে। ঘুম অসম্ভব। ঘরের মধ্যে সে হাঁফিয়ে উঠছে।
দরজা খুলে বারান্দায় বেরিয়ে এল সে। জ্যোৎস্না রাত্রি। ঘরের দরজাটা ভেজিয়ে রেখে সে সিঁড়ি দিয়ে নেমে এল উঠোনে। ভুলু কুকুরটা দু বার ভুক ভুক শব্দ করে দৌড়ে এসে ন্যাজ নাড়তে লাগল। একবার মনে হল, দরজায় তালাটা লাগিয়ে আসে। অ্যাটাচি কেসে কয়েক হাজার টাকা আছে। জরুরি কাগজপত্র, দামি কলম, ক্যালকুলেটর, পারসোন্যাল অর্গানাইজার। চোরের আনাগোনা আছে এখানে। দোনোমোনো করেও ভাবল, থাক গে, গেলে যাবে।
বাইরের ঠান্ডায় এসে বেশ ভাল লাগছিল তার। ঘাসে শিশির জমে আছে। হিম পড়ছে। সামান্য কুয়াশায় জড়ানো ভারী ভুতুড়ে রাত। সে হাঁটতে লাগল। গত কয়েকদিন একা একা ঘাটে আঘাটায় অনেক ঘুরে বেড়িয়েছে সে। মনটা সেই থেকে জড়বস্তুর মতো হয়ে আছে। কোনও উত্তেজনা নেই, আবেগ নেই, রাগ নেই, ঘেন্না নেই, শুধু নিথরতা আছে।
খানিকক্ষণ হাঁটার পর তার মনে হল, এও পণ্ডশ্রম। হাঁটতে হাঁটতে ক্লান্তি আসবে মাত্র।
ছেলেবেলায় গাঁয়ে যাত্রা এলে যেন বারুদে আগুন লাগত। বাবা-মাকে ফাঁকি দিয়ে চুরি করে পালিয়ে গিয়ে কত যাত্রা দেখেছে। সিরাজদ্দৌল্লা, কেদার রাজা, শাজাহান, কঙ্কাবতীর ঘাট, কর্ণার্জুন। সব মনে আছে।
একটু ইচ্ছে, একটু অনিচ্ছের দোটানায় পড়ে খানিকটা সময় গেল। তারপর সে যাত্রার আসরের দিকেই এগোতে লাগল। পকেটে পয়সা নেই। টিকিট কাটতে হলে পারবে না।
না, টিকিট কেটে নয়। খোলা আসরেই যাত্রার আয়োজন হয়েছে। কয়েক হাজার লোকের জমজমাট ভিড়। আশেপাশে বাদাম, তেলেভাজা, ঝালমুড়ির দোকানও বসেছে অনেক। রই—রই কাণ্ড।
এত কাল পরে যাত্রা দেখতে কেমন লাগবে কে জানে। ভিড় ঠেলে এগোনোও কঠিন। অমল একটু ঘুরে ফিরে একটু ফাঁকামতো জায়গায় দাঁড়াল। বড্ড দূরে স্টেজ। কুশীলবকে খুব ভাল করে ঠাহর করা যাচ্ছে না। তবে মাইকের দৌলতে সংলাপ শোনা যাচ্ছে।
জনৈকা কুলসুমের সঙ্গে জনৈক ফিরোজের প্রেমের ডায়ালগ হচ্ছে। ফিরোজ বলছে সে গরিব, পিতৃমাতৃহীন অনাথ, আবদাল্লা নামক জনৈক সওদাগরের অধীনে কাজ করে আর কুলসুম ধনীকন্যা, সুন্দরী, সুতরাং সে বামন হয়ে চাঁদে হাত বাড়াতে চায় না। আর কুলসুম বলছে, তার বুকে যে চিরন্তন প্রেমের শিখা জ্বলে উঠেছে তা দিয়ে তারা সব বাধা অতিক্রম করবে।
অমল একটা হাই তুলল। কানের ভিতর দিয়ে বাতাস বেরিয়ে গেল।
কোথা থেকে বুকে ভলান্টিয়ারের ব্যাজ আঁটা একটা ছেলে ছুটে এসে বলল, আরে অমলদা! আপনি এখানে দাঁড়িয়ে কেন? আসুন আমার সঙ্গে।
অমল সংকুচিত হয়ে বলল, না না, এই তো বেশ আছি।
পাগল! বাইরে দাঁড়ালে ঠান্ডা লেগে যাবে। আসুন, স্টেজের ওপাশে ভি আই পি-দের এনক্লোজারে চেয়ারের ব্যবস্থা আছে।
আমি তো ভাই বেশিক্ষণ দেখব না। চলে যাবো।
তা হোক না। যতক্ষণ খুশি দেখবেন। বিজুদা আমাকে পাঠাল। চলুন।
অনিচ্ছুক পায়ে এগোতে হল অমলকে। ভিড়ের পিছন দিয়ে ছেলেটা পথ দেখিয়ে নিয়ে গেল। গ্রিনরুমের পাশেই স্টেজ ঘেঁষে একটা বাঁশ দিয়ে ঘেরা জায়গায় সারি সারি চেয়ার পাতা। গাঁয়ের মান্যগণ্য এবং আমন্ত্রিত অতিথিরা বসে আছে। সামনে জায়গা ছিল না। ছেলেটা কোথা থেকে একটা চেয়ার এনে তাকে সামনের সারির পাশেই বসিয়ে দিয়ে বলল, আমরা আপনাকে ইনভাইট করতে গিয়েছিলাম। চিঠি পাননি?
অমল অস্বস্তি বোধ করে বলল, না তো!
বউদির হাতে কার্ড দিয়ে এসেছিলাম।
ও। তা হবে।
ছেলেটা চলে যাওয়ার পর অমল একবার চারদিকে চেয়ে দেখল। বহু মুখ, বহু মানুষ। সকলেরই স্টেজের দিকে চোখ। নায়িকা স্টেজের ওপর পড়ে ফিরোজ, ফিরোজ চিৎকার করে কাঁদছে। ফিরোজ চলে গেছে। ঝ্যাঁকর ঝ্যাঁকর করে বাদ্যি বাজনা বেজে উঠল। নায়িকা উঠে বসল। তারপর ধীরে ধীরে দাঁড়াল। তারপর দিগন্তের দিকে হাত বাড়িয়ে বিরহের গান ধরল। গানের অর্থ অনেকটা এরকম, কত দূরে যাবে তুমি? আমি যে তোমার হৃদয়ের পিঞ্জরে বসে নিরন্তর তোমার নাম ধরে ডাকব…ইত্যাদি।
ঘুম পাচ্ছিল। ফের একটা হাই তুলল সে। ফের কানের ভিতর দিয়ে বাতাস বেরিয়ে গেল। রাত্রে পায়েস খেয়েছিল একবাটি, অম্বলে গলা জ্বলছে। পায়েসে বড় মিষ্টি দেওয়ার ধাত বউদির।
দুটি অপরূপ চোখ ভিড়ের থেকে এক ঝলক তাকে দেখে টপ করে আড়াল হল৷
কে?
একটু সচকিত হল অমল। কার চোখে হঠাৎ চোখ পড়ল তার? বারবার লক্ষ করেও বুঝতে পারল না কিছুতেই। অস্বস্তি হচ্ছে। বড্ড অস্বস্তি হচ্ছে।
বাঁদিক থেকে মেয়ে-পুরুষের একটি দল উঠে চলে যাচ্ছে। রাত হয়েছে। শেষ অবধি অনেকেই থাকে না। হয়তো দূরে যাবে। নিস্পৃহ চোখে তাকিয়ে দলটাকে একটু দেখল অমল।
নায়িকা কুলসুম শাশ্বত প্রেমের জয় ঘোষণা করে যে গান গাইছিল তাতে বাধা পড়ল। কর্কশ এক পুরুষের গলা গর্জন করে উঠল, গান থামাও কুলসুম, তুমি কি আত্মপরিচয় বিস্মৃত হয়েছ? ভুলে গেছ তোমার বংশমর্যাদা?
কয়েকটি মেয়ে এসে কুলসুমকে ধরে নিয়ে গেল। কুলসুমের ঝলমলে পোশাক-পরা বাবা স্টেজ জুড়ে দাপাদাপি করে নিজের বংশপরিচয় দিয়ে যেতে লাগল…
এসব ভাল লাগার জন্য যতখানি মস্তিষ্কহীন হওয়া দরকার ততটা এখনও হতে পারেনি অমল। যখন ভাল লাগত তখন ছিল ভাল লাগারই বয়স। পারিপার্শ্বিকে যাই ঘটুক বুভুক্ষুর মতো গিলে খেত সে। রাজরাজড়াদের গল্প, পৌরাণিক কাহিনী, চাঁদ সদাগর, মনসা মাহাত্ম্য কিছুই খারাপ লাগত না।
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে উঠতে যাচ্ছিল অমল।
একটা লম্বা ছিপছিপে ছেলে কাছে এসে বলল, উঠছেন?
হ্যাঁ।
মণ্ডপের পিছনে পারুলদি অপেক্ষা করছেন। একটু দেখা করে যাবেন।
হাঁ করে ছেলেটার দিকে তাকিয়ে রইল অমল। বুকটায় ধকধক হচ্ছে।
আমি বিজু। চিনতে পারছেন না?
অমল হাসল, হ্যাঁ হ্যাঁ। কত বড় হয়ে গেছ!
সেদিনও তো দেখা হল আপনার সঙ্গে!
অমল অপ্রতিভ হয়ে বলে, কিছু মনে থাকে না আজকাল। তুমি কেমন আছ বিজু? কী করছ?
এখনও কিছু করছি না। পাস-টাস করে বসে আছি।
ভিতরে তাড়াহুড়ো অনুভব করছে অমল। বিজু কী পাস করেছে তা আর জানার ইচ্ছে হল না তার। বলল, আচ্ছা আচ্ছা, বেশ ভাল।
আলোয়ানের এক প্রান্ত খসে পড়েছিল মাটিতে। টানতে গিয়ে চেয়ারের সঙ্গে আটকে গিয়ে চেয়ারটাই পড়ে যাচ্ছিল কাত হয়ে। বিজু চেয়ারটা ধরে ফেলে আলোয়ানটা ছাড়িয়ে কাঁধে তুলে দিয়ে বলল, সাবধানে যাবেন।
একটু দিগভ্রান্ত অমল আসর থেকে বেরিয়ে মণ্ডপটা কোনদিকে তা বুঝতে পারছিল না। এত ভিড় চারদিকে। ঠাহর করতে একটু সময় লাগল তার। তাড়াহুড়োয় পড়লে মানুষের কতরকম ঠিক ভুল যে হতে থাকে।
অমলদা!
অন্ধকারে মুখটা প্রথমে দেখাই গেল না। ফিকে অন্ধকারে পারুল দাঁড়িয়ে।
পারুল!
চেহারাটা কী করেছ বলো তো!
কেন, খারাপ দেখছ?
রোগামোটার কথা বলছি না। অমন উলোঝুলো কেন? দাড়ি কামাওনি, চুল আঁচড়াওনি, দোমড়ানো পাজামা, বিচ্ছিরি আলোয়ান—এ কী রকম ভাব তোমার!
অমল হাসল, আসলে ঘুম আসছিল না বলে হঠাৎ ঘর থেকে বেরিয়ে পড়লাম। হাঁটতে হাঁটতে যাত্রা হচ্ছে দেখে ঢুকে পড়েছি।
কতকাল পরে দেখা, কিন্তু এমন পোশাকে আর চেহারা দেখে চমকে গিয়েছিলাম। কই, বাড়িতে এলে না তো! খবর পাঠিয়েছিলাম ধীরেন খুড়োকে দিয়ে, বলেনি?
বলেছে।
তবে?
অমল শ্বাসকষ্ট টের পাচ্ছে। শরীর কাঁপছে এখনও। মৃদু স্বরে বলল, কোন মুখে আসব বলো! খুব লজ্জা হচ্ছিল।
পুরনো কথা ভাবো বুঝি খুব?
ভাবব না?
আমি তো ভেবেছিলাম, তুমি এখন মস্ত মানুষ হয়েছ, বিরাট চাকরি, অনেক দায়িত্ব, ঘন ঘন দেশ বিদেশ যেতে হয়, তুমি নিশ্চয়ই পুরনো কথা মনে রাখোনি।
অমল একটু চুপ করে থেকে বুকের থরথরানিটা সামলানোর চেষ্টা করতে লাগল। তারপর বলল, সেরকমই তো হওয়ার কথা। কিন্তু আমার আজকাল কী যেন হয়েছে।
কী হয়েছে?
আত্মবিশ্বাস কমে যাচ্ছে। ইন্ট্রোভার্ট হয়ে যাচ্ছি।
আত্মবিশ্বাস কমছে কেন?
পারুলকে এবার চারদিকের আলোর আভায় স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিল অমল। বলল, সামথিং ইজ রং। কিন্তু এসব কথা থাক। তোমার কথা বলো।
আমি! আমার আর কী কথা বলো। আর পাঁচজন মেয়ের মতোই ঘরসংসার করছি। নতুন কিছু নয়।
ভাল আছ তো পারুল? সব দিক দিয়ে ভাল?
তাই কি হয়? সব দিক দিয়ে কেউ কি ভাল থাকে?
তোমাকে বেশ ভাল দেখাচ্ছে। এখনও বয়সের ছাপ পড়েনি। দেখে মনে হয়, তুমি সুখী হয়েছ। তাই না?
নিজের কথা নিজে কি বলতে পারি? কিন্তু তোমাকে দেখে আমার একটুও ভাল লাগছে না।
অমল মাথা নেড়ে বলে, আমি ভাল নেই। কিংবা আমি যে কেমন আছি তা বুঝতে পারছি না।
কোনও অসুখ-টসুখ করেনি তো!
না, তেমন কিছু অসুখ আছে বলে জানি না। আর থাকলেই বা কী! ওসব নিয়ে ভাববার কিছু নেই।
বউয়ের সঙ্গে সম্পর্ক কেমন?
ভালই।
জিজ্ঞেস করলাম বলে কিছু মনে করলে না তো! এ প্রশ্নটা আমি তোমাকে করতেই পারি, তাই না?
হ্যাঁ, পারোই তো! মোনাও তোমার কথা জানে।
পারুল একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, শুধু মোনা নয়, তোমার মেয়ে সোহাগও জানে। আর সেইটেই দুঃখের কথা। তুমি ওদের কাছে সব বলে দিয়েছ। কাজটা ভাল করোনি অমলদা।
অমল অপ্রতিভ হয়ে বলে, কী থেকে যে কী হয়ে যায় তা বলা মুশকিল। আমি আজকাল নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলি। কিন্তু ভারী আশ্চর্যের কথা, ওরা যেমনই হোক, তোমাকে কেউ অপছন্দ করে না। কী করে যে এটা সম্ভব হয় বুঝতে পারি না।
পারুল একটু হাসল, সোহাগ আমাকে গডেস বলে মনে করে। সেটা আবার আমার পক্ষে অস্বস্তিকর। তোমার বউ কী মনে করে তা অবশ্য জানি না।
অমল মাথা নেড়ে বলে, বললে তুমি বিশ্বাস করবে না।
কেন করব না?
অবিশ্বাস্য। সে তোমার সম্পর্কে কখনও একটিও খারাপ কথা বলে না। একবারের জন্যও না। বরং একবার অ্যালবামে তোমার ছবিটা দেখছিলাম, দেখে বলেছিল, দেখ দেখ, তোমার বিবেক জাগ্রত হোক।
হেসে ফেলল পারুল, যাঃ।
বলোম তো, তোমার বিশ্বাস হবে না।
অ্যালবামে আমার ছবি রাখার কী দরকার ছিল?
আমি তো রাখিনি। ছবিটা আমার পারসোনাল ফোল্ডারে ছিল। সেটা অ্যালবামে রেখেছে মোনা। তোমার বোধহয় একটা হিপনোটিজম আছে পারুল।
ওসব বাজে কথা। আমি খুব সাধারণ একটা মেয়ে। সোহাগ আমাকে কেন গডেস ভাবে বলো তো! আইডিয়াটা কি তুমিই ওর মাথায় ঢুকিয়েছ?
না পারুল। আমি ওদের মাথায় কখনও কোনও আইডিয়া ঢোকাতে পারিনি। ছেলেমেয়েকে সময়ও দিতে পারলাম কই? দিনরাত ভূতের মতো খেটেছি। ওরা তাই ওদের মতোই হয়েছে। কিছু শিখিয়েছে ওদের মা। আর বাকিটা নিজেরাই শিখে নিয়েছে। তুমি কবে, কী ভাবে সোহাগের জীবনে ঢুকে গেছ তা আমি জানি না।
পারুল একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে স্বগতোক্তির মতো বলল, পাগল।
হ্যাঁ পারুল, সোহাগ প্রবলেম চাইল্ড। স্বাভাবিক নয়। ওর একটা অদ্ভুত মনোজগৎ আছে, যেটাকে আমি বুঝতে পারি না। ও আমাদের বাধ্য নয়। ও আমাকে অনেকবার বলেছে, তোমার ছবিটা দেখলে নাকি ওর মন ভাল হয়ে যায়।
এসব শুনে আমার একটু ভয়-ভয় করছে। এরকম কেন হবে?
শুধু সোহাগ নয়, আমার ছেলে বুডঢার মুখেও শুনেছি। মোনা মুখে অতটা বলেনি বটে, কিন্তু অসম্ভব নয় যে, মোনাও তোমার একজন ভক্ত।
পারুল প্রায় কাঁদো কাঁদো হয়ে বলে, কী যে সব কাও তোমাদের কিছু বুঝতে পারি না বাবা! এখন তো ওদের সঙ্গে দেখা করতেই আমার ভীষণ লজ্জা করবে। ভেবে রেখেছিলাম মহিমকাকাকে বিজয়ার প্রণাম করতে গিয়ে ওদের সঙ্গে পরিচয় করে আসব। দেখছি তা আর হবে না।
পালাবে পারুল? তাতেই কি সব উলটে যাবে?
আমার আড়ালে আমাকে নিয়ে যা খুশি হোক, আমাকে তো আর সাক্ষী থাকতে হবে না। না বাপু, এসব মোটেই ভাল কথা নয়।
অমল বিষণ্ণ গলায় খুব ধীরে ধীরে বলল, আমাকে তুমি তোমার জীবন থেকে ছুড়ে ফেলে দিয়েছিলে পারুল। আমার কোনও চিহ্নই রাখোনি। কিন্তু আমরা তোমাকে বুকে তুলে নিয়েছি। যত অদ্ভুতভাবেই হোক, তোমাকে এক ধরনের অ্যাকসেপটেন্স দিয়েছে আমার পরিবার। ব্যাপারটা আমার ভালই লাগে।
কিন্তু আমার ভয় করে, লজ্জা হয়।
দুজনেই কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। জায়গাটা খুব একটা নির্জন বা শব্দহীন নয়। অদূরে ঝোপঝাড়ে অনেকে এসে পেচ্ছাপ করে যাচ্ছে। যাতায়াত করছে অনেক মানুষ। মাইক বাজছে, কোলাহল শোনা যাচ্ছে।
এবার আমি যাই অমলদা?
যাবে! চলো, একটু এগিয়ে দিই।
তার দরকার নেই। ওই তো বাড়ি দেখা যাচ্ছে। তুমি বরং একবার বাড়িতে এসো। আমার কর্তার সঙ্গে পরিচয় করে যেও।
ম্লান মুখে অমল বলে, কতবার যাব বলে তোমাদের বাড়ির ফটক অবধি গেছি। কেন যে শেষ অবধি ঢুকতে পারিনি তা জানি না। ফটক থেকেই ফিরে এসেছি।
এত লাজুক তো তুমি ছিলে না।
না পারুল, এটা লাজুক বলে নয়। আত্মবিশ্বাস কমে যাচ্ছে। কেন যেন মনে হয় আমি ভুলভাল কথা বলে ফেলব, অদ্ভুত কিছু করে ফেলব।
ওমা! ওরকম কেন মনে হয় তোমার?
সেইটেই বুঝতে পারি না। আমার আজকাল এমনও মনে হয় যে, লোকে আমাকে নিয়ে আড়ালে হাসাহাসি করে।
উদ্বিগ্ন পারুল বলে, অমলদা, তুমি কি ভুলে গেছ যে, তুমি একজন ব্রিলিয়ান্ট ছাত্র ছিলে! তোমার কত ডিগ্রি, কত বড় চাকরি, কত সম্মান!
আমার মেধা, ডিগ্রি বা সম্মানকে কি আজ তুমি মূল্য দাও পারুল? একদিন কিন্তু সব মাড়িয়ে দিয়ে তুমি আমার জীবন থেকে সরে গিয়েছিলে।
সেটা অন্য প্রসঙ্গ অমলদা। অন্য ঘটনা। তোমার গুণের দাম কি তা বলে কমে গেছে।
অমল মাথা নেড়ে বলে, ওসব দিয়ে কিছু হয় না পারুল। ডিগ্রি হল, চাকরি হল, টাকা হল, তবু মনে হয় কী করে জীবনযাপন করতে হয় সেটাই তো এখনও জানা হল না।
এত ফ্রাস্ট্রেশন কেন তোমার? আমার জন্যই কি?
তোমার জন্যই কিছুটা। কিন্তু সবটুকু বোধহয় তুমি নও। ধরো যদি তোমাকে বিয়ে করতে পারতাম তা হলে কি তুমি আমার কাছে ক্রমে পুরনো এক অভ্যাসের মতো হয়ে যেতে না? বরং বিয়ে হয়নি বলেই আজও অ্যালবাম খুলে তোমার ছবি দেখি। বিয়ে করা বউয়ের ছবির দিকে কেউ কি মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকে? না পারুল, তোমাকে অন্যভাবে তো পেয়েছিই। আরও ভালভাবে।
বেশ বললে! শুনে কান জুড়িয়ে গেল। কিন্তু তোমার এই হতশ্রী দশা তবে কেন হল বলো তো!
বুঝতে পারি না পারুল। যত দিন যাচ্ছে তত মনে হচ্ছে, ছাইভস্ম অনেক শিখলুম, কিন্তু তা দিয়ে কিছু হয় না।
একটা কথা সত্যি করে বলবে?
বলব না কেন? তোমাকে তো সবই বলা যায়। যায় না পারুল?
না যায় না। সব আমাকে কেন বলবে অমলদা? বোলো না। আমি শুধু জানতে চাই নিজের বউয়ের সঙ্গে তোমার সম্পর্ক কেমন?
মাথা নেড়ে অমল বলে, ভাল নয়। একটুও ভাল নয়। প্রথম প্রথম একরকম ছিল। বিয়ের পরেই ও তোমার কথা জানতে পারে, কিছু অশান্তিও হয়। আবার একটা আপসরফাও হয়ে গিয়েছিল। তারপর কেমন করে যেন একটা ঘেন্নার সম্পর্ক তৈরি হল। সামান্য ছুতোনাতায় পরস্পরকে অপছন্দের মাত্রা বাড়তে লাগল। আক্রোশে হাত কামড়াতে ইচ্ছে করত। কিন্তু তবু সে একরকম ছিল, আক্রোশ-ঘেন্নাও একটা সম্পর্ক বজায় রাখে। কিন্তু ভয়াবহ হল ঠান্ডা উদাসীনতা। কী বলব তোমাকে, এখন ওকে সামনে দেখেও ওর কথা মনে পড়ে না।
তুমি সাইকিয়াট্রিস্ট দেখিয়েছ?
অমল একটু মলিন হেসে বলে, সাইকিয়াট্রিস্টরাই এখন সবচেয়ে বেশি ব্যস্ত ডাক্তার। সাইকিয়াট্রিস্ট, ম্যারেজ কাউন্সেলর কিছু বাকি নেই।
তা হলে তোমার প্রবলেম তো খুব অ্যাকিউট।
হ্যাঁ। কিন্তু ওসব নিয়ে ভেবো না পারুল। আমার কথা বাদ দিয়ে এবার তোমার কথা বলল।
আমার তো কথা কিছু নেই।
শুনেছি জ্যোতিপ্রকাশ গাঙ্গুলি একজন ভাল মানুষ।
সে তার মতো ভাল।
কথাটার মানে কী পারুল?
তোমার মতো অত কোয়ালিফিকেশন তার নেই। অনেক কষ্ট করে, নিজের চেষ্টায় যা হওয়ার হয়েছে।
অমল একটু হেসে বলে, আমাকে কি একটু খোঁচা দিলে নাকি পারুল? দাও। খোঁচাটা আমার ভালই লাগল।
মোটেই খোঁচা দিইনি। জানতে চাইলে বলে বলোম।
বুঝলে, আগে খুব অহংকার ছিল আমার। ব্রিলিয়ান্ট বা কাজের লোক দেখলে হিংসে হত। মনে হত আমার চেয়ে শ্রেষ্ঠ বুঝি কেউ নেই। এখন হয়েছে তার উলটো। একটা ন্যালাক্ষ্যাপা লোককেও মনে হয় আমার চেয়ে বড় মানুষ বুঝিবা। অহংকারটা যে কোথায় গেল কে জানে।
অহংকার কি ভাল অমলদা?
অহংকারকে সাধকরা জয় করেন, সে অন্য ব্যাপার। অনেক মহৎ কাজ। আমার তো তা নয়। আমার হল ইনফিরিয়ারিটি কমপ্লেক্স।
ইনফিরিয়ারিটি কমপ্লেক্স বলে কিছু হয় না তা জানো?
মনোবিজ্ঞানে না থাক, কথাটা তো চালু আছে পারুল। যা বোঝার বুঝে নাও।
আজ অনেক দুঃখের কথা বলেছ। আর নয়। রাত দেড়টা বাজে। এবার বাড়ি যাও। ঘাড়ে গলায় জল দিও, চোখে ভাল করে জলের ঝাপটা দিও, জয়েন্টগুলো ভিজিয়ে নিও। তারপর ঘুমোও।
নির্বোধের ঘুমের অভাব হয় না। আমার ঘুম খুব গাঢ়। ইদানীং হঠাৎ হঠাৎ মাঝরাতে ঘুম ভেঙে যাচ্ছে। ঘুম ভেঙেছিল বলেই হাঁটতে হাঁটতে যাত্রা দেখতে চলে এলাম। ভাগ্য ভাল, তোমার সঙ্গে দেখা হয়ে গেল।
ভাগ্য ভাল না খারাপ তা কে বলবে? আমার মনটা আজ তুমি খারাপ করে দিয়েছ।
আচ্ছা আমি কি একটু বেশি কথা বলছি বলে তোমার মনে হয়?
না তো! বেশি বলোনি, তবে যা বলেছ সবই নেগেটিভ কথা।
আমার মনে হয়, আজকাল বোধহয় আমি একা একাও কথা বলি।
ওরকম ভেবো না অমলদা। নিজেকে নিয়ে বেশি ভাবলে শেষে তুমি ক্ষ্যাপাটে হয়ে যাবে।
ক্ষ্যাপাটে কি এখনই নই পারুল?
বলে মৃদু মৃদু হাসতে থাকে অমল।
মায়াভরা চোখে তার দিকে চেয়ে থেকে পারুল বলে, একটু ক্ষ্যাপাটে হওয়া পুরুষমানুষদের পক্ষে মন্দ নয়। হিসেবি, কৃপণ, উচ্চাকাঙ্ক্ষীর চেয়ে বরং একটু ক্ষ্যাপাটে হওয়া ভাল।
একটা কথা জিজ্ঞেস করব? খুব সংকোচ হচ্ছে।
সংকোচের কী? বলো।
আমাদের সম্পর্কের কথাটা কি জ্যোতিপ্রকাশবাবুকে বলেছ?
বলেছি।
সেই ঘটনাটার কথাও?
পারুল ঠোঁট কামড়াল, চাপা গলায় বলল, হ্যাঁ।
উনি কিছু মনে করেননি!
মনের কথা জানি না। তবে আমাকে গ্রহণ করেছেন।
একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে অমল বলে, উনি তাহলে শক্তিমান পুরুষ। তুমি ঠিক মানুষকেই পেয়েছ পারুল।
হিসেবটা অত সহজ নয়। সুন্দরীদের কিছু প্লাস পয়েন্ট থাকে। তাদের অনেক দোষঘাট রূপের তলায় চাপা পড়ে যায়। পরস্পরের মনের কথা ইহজীবনে কি সবটা বোঝা যায়?
উদাস মুখে অমল বলে, তাই হবে। অত জানার দরকারই বা কী?
একটা কথা বলি। অ্যালবাম থেকে আমার ফটোটা সরিয়ে নষ্ট করে দিও।
অবাক হয়ে অমল বলে, নষ্ট করব? নষ্ট করলে আমি কী নিয়ে থাকব পারুল? আমরা কী নিয়ে থাকব?
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন