শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
পাঁউরুটি জিনিসটা হল অনেকটা ব্লটিং পেপারের মতো। যাতেই ডোবাও সুট করে রসটা টেনে নিয়ে একেবারে ভোঁট হয়ে যায়। চায়ে ডোবালে পাঁউরুটির রন্ধ্রে রন্ধ্রে অন্ধিসন্ধিতে ঢুকে যায় চায়ের রস। কী ভালই যে লাগে তখন খেতে। চায়ে টুসটুসে পাঁউরুটি যে না খেয়েছে তার জন্মই বৃথা। রসগোল্লার রসে ডুবিয়ে খাও, যেন অমৃত। পাঁউরুটি নিজেই যেন তখন ছ্যাদড়ানো রসগোল্লা। রসে-পাঁউরুটিতে সে যেন দাঙ্গা-হাঙ্গামা। এ বলে আমাকে দ্যাখ, ও বলে আমাকে। আর দুধে যদি ডোবাও, তা হলে তো কথাই নেই। গরম দুধে পাঁউরুটি ছেড়ে একটুক্ষণ বসে থাকো। দুধে-পাঁউরুটিতে ভাব-ভালবাসা হওয়ার জন্য একটু সময় দিতে হয়। তারপর দেখবে দুটিতে মিলেজুলে থকথকে মতো হয়ে গেছে। তখন চামচে করে মুখে দাও। পায়েস কে পায়েস, রসমালাই কে রসমালাই, কিংবা রাবড়ি কে রাবড়ি। চোখটি বুজে যা ভেবে মুখে দাও না কেন তেমনটিই মনে হবে। জিভ থেকে পেট অবধি সোয়াদ ছড়াতে ছড়াতে যাবে।
এ-বাড়িতে দুধের রোজ নেই। গত বছর গাইটা বিক্রি করে দিতে হল বড় বউমার প্রসবের সময়। বড় ছেলে নয়ন সাট্টায় অনেক নাকি টাকা লাগিয়েছিল, পথে বসেছে। খুব দুর্ভোগ গেছে তখন। গাই গোরু, এক বিঘে জমি, খোরাকির ধানও গেল কিছু। সেই থেকে দুধের জোগাড় নেই। তিনটে দুধের শিশু আছে বটে, শটিফুডের সঙ্গে একটু গুঁড়ো দুধ মিশিয়ে তাদের খাওয়ানো হয়। শটিফুডই বাঁচিয়ে রেখেছে। বেঁচে থাক শটিফুড। আর বাচ্চারা দুনিয়ার অনিয়ম অবিচার তেমন বোঝেও না বলে রক্ষে।
কিন্তু ধীরেনের এখন এই বয়সে নানান ইচ্ছে চাগাড় দিয়ে ওঠে। গত তিন রাত্তির সে স্বপ্ন দেখেছে দুধ-পাঁউরুটি খাচ্ছে। ঘুমের মধ্যেই জিভে আর টাগরায় এমন টকাস টকাস শব্দ করেছিল যে তার বউ বিরক্ত হয়ে তাকে নাড়া দিয়ে তুলে দেয়। শেষ রাতের স্বপ্ন বলে কথা। পাঁউরুটির জোগাড় হয়, কিন্তু দুধটাই কঠিন। জোগাড় হলেই যে মুখে তুলতে পারবে তাও তো সহজ নয়। তিনটে দুধ-উপোসি শিশু মুখের দিকে চেয়ে থাকবে না কি? আর তার বউ কি বলবে না, কোন আক্কেলে বুড়ো মানুষ তুমি এতগুলো চোখের সামনে দুধ নিয়ে বসতে পারলে? গলা দিয়ে নামবে? পাষণ্ড আছ বাপু!
কিন্তু তিন দিন স্বপ্ন দেখার পর ধীরেনকে এখন দুধ-পাউরুটি নিশিতে পাওয়ার মতো পেয়েছে। যখন নিশিতে পায় তখন আর কাণ্ডজ্ঞান বলে কিছু থাকে না। নাতি-পুতি বউ-বাচ্চা তখন বিস্মরণ হয়ে যায়।
জামার আড়ালে পিতলের ঘটিটি নিয়ে সকালবেলাতেই বেরিয়ে পড়ল ধীরেন। মুখ বারবার রসস্থ হয়ে পড়ছে। সামনের গোটা চারেক দাঁত নেই বলে মাঝে মাঝে সুট করে মুখের ঝোল টেনে নিতে হয়। বয়স হলে নান অসুবিধে।
বাঙালের বাড়িই ভরসা। তিনটে দুধেল গাই কামধেনুর মতো অনবরত দুধ দিয়ে যাচ্ছে। দুধের সমুদ্র একেবারে। তবে মুশকিল হল বাসি নগদ ছাড়া দুধ দেয় না বড় একটা। এমনিতে নরম-সরম মেয়েই ছিল। ছেলেবেলা থেকে দেখে আসছে। ফ্রক পরে গোবর কুড়িয়ে বেড়াত, কাঠকুটো জোগাড় করত, পুকুরে ডাঁই কাপড় কাচত খার দিয়ে, আবার কদমতলায় এক্কাদোক্কাও খেলত। কথা কইলে কাঁচুমাচু হয়ে যেত। কিন্তু সেই দিন তো আর নেই।
বাঙালের বউ হয়ে ইস্তক বাসি ধিঙ্গির মা সিঙ্গি হয়েছে। জমিজমা, মুনিশ, ঝি-চাকর, গোরু-ছাগল, হাঁস-মুরগি নিয়ে ফলাও সংসার। চারদিকে যেন মা লক্ষ্মী ঢেউ তুলে দিয়েছেন। রোগা, শ্যামলা মেয়েটাকে আর চেনার জো নেই। গায়ে গত্তি লেগেছে, মেজাজও হয়েছে একটু।
বাবা-বাছা বলে যদি একটু আদায় হয় সেই ভরসাতেই বেরিয়েছে ধীরেন। তবে সে বুঝতে পারে, আজকাল মায়া-দয়া জিনিসটা বড্ড কম পড়ে যাচ্ছে চারধারে। কোথাও যেন আর জিনিসটা তেমন পাওয়া যাচ্ছে না। আগে এ-গাঁয়েই দুধের গাহেক খুঁজলে পাওয়া যেত না। বাড়তি দুধ চাইলে ফেরাত না কেউ।
রসিক বাঙালের বাড়িতে ঢুকবার আগে একটু দাঁড়াল ধীরেন। আহা, কী বাড়িই করেছে বাঙাল। ডানধারে বিশাল প্রাসাদের মতো দোতলা দালান। দক্ষিণে উঠোনের দিকে টানা লম্বা বারান্দা। এক এক তলায় পাঁচ ছয়খানা করে ঘর। তাও এখনও দালানের গায়ে পলেস্তারা পড়েনি। পড়লে আরও দেখনসই হবে। পুবে একখানা একতলা দালান, তাতেও তিন চারখানা ঘর আছে। পাকা গোয়ালঘর, গোলাঘর, চেঁকিশাল, কী নেই বাঙালের। দু আড়াই বিঘে জুড়ে ফলাও বাগান। মেলা সুপুরি আর নারকোলের গাছ। সবজিও ফলছে দোহাত্তা।
ধীরেন মেটে পথটায় তাকিয়ে লক্ষ্মীর পদচিহ্ন দেখতে পায় যেন। লক্ষ্মী ঢুকেছেন, সহজে বেরোবেন না।
এই সব দেখার মধ্যে আনন্দ আছে। অনেকে বাঙালকে হিংসে করে বটে, কিন্তু ধীরেনের হিংসে হয় না। কারও বোলবোলাও হয়েছে জানলে ধীরেন তাকে দেখতে যায়। বাড়ি দেখে, ঘর দেখে, মানুষটার মুখে আহ্লাদ আর খুশির আভা দেখে। তখন তার মনটা খুব হে-হে করতে থাকে। ভারী একটা সুড়সুড়ে সুখ হতে থাকে তারও। কেন হয় কে জানে।
ধীরেন দেখতে বড় ভালবাসে। চোখে ছানি পড়ায় দৃষ্টি একটু ঝাপসা বটে, কিন্তু তাই দিয়েই সে অনেক কিছু দেখে। ছানি কাটাবে বলে বর্ধমানের লায়নস ক্লাবে একটা দরখাস্তও দিয়ে এসেছে সে। পঞ্চায়েতের সার্টিফিকেটও জুড়ে দিয়েছে তাতে। এখনও জবাব আসেনি। নির্যস গরিব বলে প্রমাণ হলে বিনা পয়সায় ছানি কাটিয়ে দেবে। দেখার নেশা আছে বলেই ছানিটা কাটানো বড় দরকার।
ফটকের বাইরে মুগ্ধ চোখে বাড়িটার দিকে চেয়ে দাঁড়িয়েছিল ধীরেন।
জ্যাঠামশাই, কাকে খুঁজছেন?
ধীরেন তাকিয়ে মরণকে দেখে এক গাল হাসল, এই দেখছি তোদের বাড়িটা। তা তোদের কী খবর-টবর রে? বাঙাল আসে-টাসে?
হ্যাঁ। পরশু এসেছিল, আজ সকালে চলে গেছে।
ধীরেন আগল ঠেলে ভিতরে ঢুকতে ঢুকতে বলে, বাসি নেই?
আছে। ডেকে দেব?
তাড়া নেই। কাজ-টাজ করছে হয়তো। বসি একটু দাওয়ায়।
বসুন না। বারান্দায় উঠে চেয়ারে বসুন।
ধুতির খুঁটে দাওয়ার মেঝেটা একটু ঝেড়ে বসে পড়ল ধীরেন। বলল, এই ভাল।
সকালের মিঠে রোদ নিকোনো উঠোনে রুপপার থালা হয়ে পড়ে আছে। বাঃ বাঃ। যার ভাল তার সবই ভাল। এ-বাড়ির রোদটাও যেন ধীরেনের বাড়ির রোদের চেয়ে অনেক বেশি সরেস, অনেক বেশি জমকালো। এরকমই সব হয়, ললাকে বিশ্বাস করে না বটে, কিন্তু হয়।
দোতলা থেকে বাসি রেলিং-এ ঝুঁকে বলল, ও ধীরেনখুড়ো, কিছু বলবেন?
এই মা, তেমন কিছু নয়। তত্ত্বতালাশ করতেই আসা। তা খবর-টবর সব ভাল তো!
আছি খুড়ো একরকম। ঝামেলা ঝঞ্ঝাট তো কম নয়।
তা তো হবেই রে বাসি। কত বড় বিষয় সম্পত্তি, কত লোকলস্কর খাটছে, কত দিক সামাল দেওয়া। হওয়ারই কথা কি না।
বেরিয়েছেন কোথা?
এই ঘুরে-টুরে দেখছি। ঘরে আর কাজটা কী বল!
তা তো বটেই। বড় ছেলে কী করছে এখন?
কে জানে মা। সাট্টার পেনসিলার না কী যেন শুনি। বর্ধমানে যায় রোজ।
সে কি ভাল কাজ খুড়ো?
কে জানে মা? ভাল কাজ করার মতো বিদ্যে কি আছে?
যখন ইস্কুলে যেতুম তখন রোজ পিছু নিত আমার। ভারী অসভ্য ছেলে।
ধীরেন ছেলের অপরাধে কাঁচুমাচু হয়ে বলল, ওই সবই তো করত। মায়ের আসকারায় শাসনও করা যায়নি কি না।
একলা দোতলায় কথা চালাচালির অসুবিধে। চেঁচিয়ে তো আর দুধের কথাটা বলা যায় না।
বাসন্তী বলল, একটু বসুন খুড়ো, আসছি।
তা বসে ধীরেন। ওদের কাজের মেয়েটা পুকুর থেকে কাচা কাপড়-চোপড় এনে উঠোনের তারে মেলছে। দৃশ্যটা খুব মন দিয়ে দেখে ধীরেন। কমলা সবুজ নীল রঙের নানা শাড়িতে উঠোনটা যেন ভারী রঙিন হয়ে গেল। বাতাসে দুলে দুলে যেন হাসছে শাড়িগুলো। যেন বলছে, দেখেছো, কেমন চান করে ফর্সা হয়ে এলুম!
দুনিয়ায় দেখার জিনিসের কোনও শেষ নেই। এইটুকু এক রত্তি একটু গাঁয়ের চৌহদ্দির মধ্যেই ঘোরাফেরা তার। কিন্তু এইটুকুর মধ্যেই যেন অফুরান সব দৃশ্য, কুলিয়ে ওঠা যায় না।
জ্যাঠামশাই, মা জিজ্ঞেস করল চা খাবেন?
এক গাল হাসল ধীরেন, দিবি? তোদের কষ্ট হবে না তো!
না না।
তবে দে একটু। চিনি আর দুধটা একটু যেন বেশি দেয় দেখিস।
আচ্ছা জ্যাঠা।
হ্যাঁ রে মরণ, বলি দুধে ভিজিয়ে পাঁউরুটি খেয়েছিস কখনও?
মরণ মুখটা বিকৃত করে বলে, এঃ বাবা! দুধে পাঁউরুটি! ওয়াক।
পাষণ্ড আর কাকে বলে। এ ছেলে দুধ-পাঁউরুটির মর্মই বোঝে না। ধীরেন তটস্থ হয়ে বলে, তা বাবা, খাসনি বুঝি কখনও?
নাঃ। ও তো পিটুলিগোলার মতো খেতে!
দুর! তুই জানিস না। একটু দানা চিনি ছড়িয়ে খেতে—
বাসি নেমে এল নীচে। বেশ চেহারাটা হয়েছে এখন। সেই রুখু শরীরে এখন একটু তেল চুকচুকে ভাব। ফর্সা একটা মেজেন্টা রঙের শাড়ি পরা, কপালে মস্ত সিঁদুরের টিপ, সিঁথি ভর্তি সিঁদুর থেকে খানিক নাকের ডগায় ঝরে পড়েছে। স্বামী-সোহাগের লক্ষণ। না, বেশ আছে মেয়েটা। সময়মতো বাঙালের চোখে পড়ে গেল, তাই বেঁচে গেছে। চোখে পড়াটাই হল আসল কথা। ওই হল ভাগ্য, ওই হল গ্রহানুকূল্য। ভাল চোখ যদি পড়ে তবে তরে গেলে। আর মন্দ চোখ যদি পড়ে তবে হেঁচড়ে হেঁচড়ে জীবন যাবে।
কিছু বলবেন খুড়ো?
হ্যাঁ মা, তা তোদের গোরুগুলো দুধ-টুধ কেমন দেয়?
আর বলবেন না। কালো গাইটা দুধ বন্ধ করেছে সেই কবে। দুটো দিচ্ছে এখনও, তবে কমে এসেছে। আমার বড় ছেলে এসেছে কলকাতা থেকে, তাকে কোথায় একটু পিঠে পায়েস করে খাওয়াবো, তাই হচ্ছে না ভাল করে। মাসিক বন্দোবস্তের গাহেকও তো আছে।
ঘটিটা জামার তলা থেকে আর বের করল না ধীরেন। না, হবে না।
কাজের মেয়েটা কাপে চা নিয়ে এল, প্লেটে দুটো থিন এরারুট বিস্কুট। চলকানো চায়ে বিস্কুট দুটো নেতিয়ে গেছে। তা যাক। এটুকুই বা মন্দ কী?
খুব যত্ন করে চাটুকু খেল ধীরেন। চায়ে ভেজানো বিস্কুটেরও একটা স্বাদ আছে।
উঠছেন খুড়ো? আবার আসবেন।
আসব বইকী! এই ঘুরে ঘুরেই সময় কাটাই। যোগাযোগটাও রাখা হয়, সময়ও কাটে।
মরণ পোশাক পরে ইস্কুলে বেরোচ্ছে। তার পিছু পিছুই বেরিয়ে পড়ল ধীরেন। ফাঁকা ঘটিটা জামার নীচে ধরা আছে এখনও। ছোট ঘটি, বাইরে থেকে টের পাওয়া যায় না।
বেগুনক্ষেতটা পার হওয়ার সময় ধীরেন দাঁড়াল। গাছে ফুল এসে গেছে। দু-একটা গাছে কচি বেগুনের শিশুর মত নিস্পাপ মুখ উঁকি মারছে। কী সুন্দর দেখতে। শীতের বেগুন, তার স্বাদই আলাদা। বেগুন বড্ড তেল টানে বলে তার মা চাকা-বেগুনে আগে একটু চিনি মাখিয়ে রাখত। তাতে নাকি তেল কম লাগে। তা হবে হয়তো। আজকাল আর বেগুন ভাজা হয় না। মাঝে মধ্যে একটু পোড়া-টোড়া হয় বড় জোর।
খুব ধীর পায়েই এগোয় ধীরেন। সকালটা এখনও আছে। শীত শীত ভাবটাও ক্রমে বাড়ছে বাতাসে। নাকি বয়স হচ্ছে বলেই শীতভাব হয় তার?
রায়বাড়ির উঠোনে ইজিচেয়ারে মহিমাই বসে বোধহয়। ঠিক ঠাহর হয় না। সজনের ছায়ায় ঝিরঝিরে বাতাসে এই অলস বসে থাকাটা ভালই লাগে ধীরেন কাষ্ঠর।
উঠোনে চাটাই বিছিয়ে নানা জিনিস রোদে দিচ্ছে সন্ধ্যা। আমলকী, আমসি, সারি সারি আচার আর কাসুন্দির বোতল।
একটু কাছে গিয়ে ভুল বুঝতে পারে ধীরেন। মহিমদা নয়, বসে আছে অমল।
ভারী খুশি হয়ে ওঠে ধীরেন।
উরে বাপ রে! অমল নাকি?
অমল মানে হচ্ছে এক চোখ-ধাঁধানো ছেলে, গ্রামের গৌরব। বিলেত আমেরিকা ঘুরে এসেছে। এক এক মাসে যা বেতন পায় তা দিয়ে হাতি কিনে ফেলা যায়। গরিবগুর্বোর সম্বৎসরের খরচ।
অমল একটা বই পড়ছিল। ইংরিজি বই-ই হবে। তাকিয়ে কিছুক্ষণ ভারী আনমনা চোখে চেয়ে রইল। চিনতে পারল না। তারপর সোজা হয়ে বসল। একটু হেসে বলল, ধীরেনকাকা না?
হ্যাঁ বাবা।
ইস, একদম বুড়ো হয়ে গেছেন যে! চিনতেই পারিনি।
অমল তাকে চিনতে পারায় ভারী আপ্যায়িত হয়ে ধীরেন বলে, তা বয়সও হল। আমাদের তো আর কিছু হয় না, শুধু বয়সটাই হয়।
বসুন কাকা। বাবাকে ডেকে দিচ্ছি। ঘরেই আছে।
তোমার সঙ্গে কতকাল পরে দেখা! দেশের গৌরব তুমি।
অমল কথাটা শুনে খুব খুশির ভাব দেখাল না। মুখটা শুকনো। ধীরেনের চোখ যদি খুব ভুল না হয়, তা হলে মুখে একটু দুঃখের ছাপও যেন আছে। হওয়ার কথা নয় এরকম। লম্বা বেতন, হোমরা-চোমরা চাকরি, পেটে গিজগিজ করছে বিদ্যে, এরকম মানুষের মুখে তো আহ্লাদ ফেটে পড়ার কথা!
আপনি কেমন আছেন ধীরেনকাকা?
এই আছি বাবা। টিঁকে আছি।
ছেলেরা সব দাঁড়িয়েছে তো?
এই একরকম। টুকটাক করে আর কী। তোমার তো ভালই চলছে বাবা! আমাদের কথা বাদ দাও। পাপীতাপী লোক আমরা।
চারদিকে জল, জল আর জল। ডাঙাজমির দেখাই নেই। তার ভিতর দিয়ে জল ভেঙে ছুটতে ছুটতে হাঁফ ধরে যাচ্ছিল ধীরেনের। কতবার যে খানা ডোবায় পড়ল, কতবার পা হড়কাল তার হিসেব নেই। কতটা সময় লেগেছিল তাও ভেবে পায়নি কখনও ধীরেন। যখন ডাঙাজমিতে উঠল এসে তখন তার সর্বাঙ্গ জলে কাদায় মাখামাখি। চোখ উদভ্রান্ত, মনে বিভীষিকা, পাপবোধ, পাগলের মতো অবস্থা।
যখন বাড়ি ফিরল তখন সে প্রায় উন্মাদ। আপনমনে বিড় বিড় করছে, কখনও চিৎকার করে কেঁদে উঠছে, কখনও নিজের চুল ছিড়ছে দু হাতে মুঠো করে। ওর মধ্যেই তার বাবা ঠ্যাঙা নিয়ে মারতে এসেছিল তাকে। মা এসে ঠেকাল, দেখছ না কী অবস্থা! নিশ্চয়ই কিছু হয়েছে। আগে ঠান্ডা হতে দাও।
মা-ই তার গলায় তারের ফাঁসটা আবিষ্কার করেছিল। বলল, এটা তোর গলায় কী রে? কে তোকে তুক করেছে? অ্যাঁ!
কিছু বলতে পারেনি ধীরেন। দিন দুই লেগেছিল সেই বিকারের ঘোর কাটতে। তারপর পুলিশের ভয়ে সে কালনায় তার মাসির বাড়িতে পালিয়ে গেল। মাসখানেক বাদে যখন ফিরল তখনও পুলিশ তাকে খোঁজেনি। খোঁজার কথাও নয়। বৃষ্টি বাদলা কেটে গিয়ে জোড়া লাশ যখন পাওয়া গিয়েছিল তখন দিন পাঁচেক কেটে গেছে। মড়া পচে ঢোল। পুলিশ একটা তদন্ত করেছিল বটে, কিন্তু তখন গ্রামদেশে এসব নিয়ে তেমন একটা মাথা ঘামানোর রেওয়াজ ছিল না। যেটা রটেছিল তা হল, বরুণ মিদ্দার তার বউকে মেরে ডোবায় ফেলতে গিয়ে নিজেও ডুবে মরেছে।
ধীরেন খুনের দায় থেকে বেঁচে গেল। ধীরে ধীরে স্মৃতি আবছা হল, সময়ের পলিমাটি পড়তে লাগল, কিন্তু আচমকা কখনও-সখনও মনে পড়ত দৃশ্যটা। শিউরে উঠত।
ইদানীং ধীরে ধীরে স্মৃতিটা ফের কেন যেন জ্বলজ্বলে হয়ে ওঠে। আর তাকে একা পেলেই কেন যে বরুণ মিদ্দার কাছেপিঠে চলে আসতে চায়! সে আজকাল অন্ধকার ভয় পায়, একা ঘরে ভয় পায়, নিরিবিলি মাঠ পেরোতে ভয় পায়। বাতাসে যেন একটা ফিসফাস শুনতে পায় সে। বরুণ মিদ্দারের গলা বলেই কেন যেন মনে হয় তার।
ইদানীং জ্ঞানগম্যিওলা মানুষদের কাছেপিঠে গিয়ে বসার একটু ঝোঁক হয়েছে ধীরেনের। যারা অনেক জানে-টানে তাদের কাছে গেলে অনেক ধাঁধা কেটে যায়।
এ-অঞ্চলে অবশ্য জ্ঞানী লোক বেশি নেই। গৌরহরিদা ছিলেন, মহিম রায় এখনও আছে।
তা হরিদার কাছে ব্যাপারটা একবার বলে ফেলেছিল সে৷ বেশি বলতে চায়নি, শুধু একটা “পাপ” কথা বলে ভণিতা করেছিল মাত্র। কিন্তু গৌরহরি দুঁদে উকিল। জেরা করে করে সবই পেট থেকে বের করে নিল। তারপর বলল, তা কি প্রাশ্চিত্তির করতে চাস নাকি?
এর কী প্রশ্চিত্তির আছে হরিদা?
কিছু নেই রে, কিছু নেই। বরাতজোরে খুনের দায় থেকে বেঁচে গেছিস, এসব কথা পাঁচকান না করাই ভাল।
কাউকে বলিনি, নিজের বউকে অবধি নয়।
বউকে আরও বলবি না। মেয়েমানুষের পেটে কথা থাকে না।
বলি না। কিন্তু আজকাল বড় মনে পড়ে যায়। ওই আদিগন্ত জল, ওই সাংঘাতিক বর্ষা, বরুণ মিদ্দার, বাতাসী সব যেন মাঝে মাঝে এসে ঘিরে ফেলে। বিশেষ করে মিদ্দার।
কেন যে অমলের মুখোমুখি বসে কথাটা আজ মনে পড়ল কে জানে। মাঝে মাঝে বড্ড মনস্তাপ হয়। জীবনটা ভণ্ডুল হয়ে গেছে বলে মনে হয় যেন। পাপটা কি সইবে তার?
বসুন কাকা, বাবাকে ডেকে দিচ্ছি।
ঘটিটা মোড়ার পাশে নামিয়ে রাখল ধীরেন। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। হঠাৎ হঠাৎ মিদ্দার আজকাল মনের মধ্যে হানা দেয়। হানা দেয় বাতাসীও।
সন্ধ্যা বলল, ঘটিতে কী নিয়ে যাচ্ছেন ধীরেনকাকা?
কিছু নয় মা। বাঙালের বাড়িতে একটু দুধের খোঁজে গিয়েছিলাম। তা পাওয়া গেল না।
ওঃ দুধের যা টানাটানি চলছে আমাদেরও! মেজদারা সব এসেছে তো! দুটো মোটে গোরু। বাবার বরাদ্দই কমিয়ে দিতে হয়েছে।
ধীরেন চেয়ে চেয়ে দেখছিল।
উরেব্বাস, কত রকমের আচার করেছিস রে সন্ধ্যা! অ্যাঁ!
হ্যাঁ কাকা, মাথা থেকে সব বের করতে হয়।
তাই বুঝি? আমাদের তো ভাতপাতে একটু তেঁতুল হলেই হয়।
সে দিন আর নেই কাকা। এখন লোকে সব কিছুরই আচার চায়। শুনেছি নাকি বিলেত-টিলেতে মাংসেরও আচার হয়।
বাপ রে! বটে!
হ্যাঁ। এই যে দেখুন না, কেউ কখনও গাজরের আচার খায় শুনেছেন? এক খদ্দের চেয়েছে বলে তাও করে দিচ্ছি।
অমল উঠে গেছে। আরাম-কেদারার ওপর বইটা পড়ে আছে উপুড় হয়ে। ডানামেলা পাখির মতো দু মলাট দুদিকে ছড়ানো। বইটার নাম একটু ঝুঁকে দেখল ধীরেন। ইংরিজি পড়ার অভ্যাস নেই। সেই কবে একটু শিখেছিল। শুধু নামের শেষটুকু পড়তে পারল, গ্লোরি।
সন্ধ্যা বলল, খাবেন একটু আচার? দেব প্লেটে করে?
ধীরেন হাসল। বলল, দে একটু। চেখে দেখি।
একটা প্লেটে দুরকম আচার নিয়ে এল সন্ধ্যা, দেখুন তো খেয়ে কেমন টেস্ট হয়েছে!
ভাল বলার জন্য মুখিয়েই আছে ধীরেন। খেতে খেতে মাথা নাড়া দিতে দিতে বলল, বাঃ বাঃ, এ তো ফার্স্ট ক্লাস জিনিস দেখছি।
সন্ধ্যার মুখে যে হাসিটা ফুটল তা অহংকারের।
ভাল?
খুব ভাল রে মা। তাই তোর জিনিস এত চলে।
চলে তো কাকা। কিন্তু টাকা থাকলে ব্যবসাটা আরও বড় করতে পারতাম। একটা কারখানাই করে ফেলতাম।
দুধটা এখানেও হল না। আচার খেয়ে ধীরেন উঠে পড়ল। মহিমা এল না। দরকারও নেই। খানিক গল্প করা যেত।
উঠলেন কাকা?
উঠি।
বাবা বোধহয় বাগানে ঢুকেছে। ডাকব?
না মা। আবার আসবখন।
টুক টুক করে ধীরেন হাটে। আচারগন্ধী একটা সুবাসিত ঢেঁকুর উঠল। বেশ ভালই লাগল ঢেঁকুরটা তুলে। ঢেঁকুরও যে একটা উপভোগ্য জিনিস সেটাও কি সবাই বোঝে? যদি জিজ্ঞেস করে কাউকে, ওহে, ঢেঁকুর তুলে যদি মাংসের বা পায়েসের গন্ধ পাও তা হলে কেমন লাগে? তা হলে হয়তো চটেই উঠবে লোকটা। ধীরেন কাউকে জিজ্ঞেস করে না বটে, কিন্তু কথাগুলো মনে মনে খুব ভুড়ভুড়ি কাটে।
ওই গৌরহরিদার বাড়ি। এই গাঁয়ের টাটা-বিড়লা যা-ই বললা তা ছিল ওই গৌরহরি চাটুজ্যে।
দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ বাড়িটা নিরীক্ষণ করে ধীরেন কাষ্ঠ। দুই ভাইয়ের অংশ কিনে নিয়েছিলেন হরিদা দুনো দামে। যা করার ইচ্ছে তা করবেনই। জান কবুল। ওরকম মানুষকে রোজ সকালে উঠে পেন্নাম করতে হয়। বড় বড় থাম, মজবুত খিলানের ওপর বাড়ি। তিন তিনটে দোতলা দালান, কত যে ঘর তার হিসেব নেই। হরিদা কি জানতেন না শেষ অবধি কেউ গাঁয়ের মাটি কামড়ে পড়ে থাকবে না? ছেলেরা যাবে, মেয়েরা যাবে, পড়ে থাকবে বুড়োবুড়ি? জানতেন। জেনেও ভাইয়েদের অংশ কিনে নিয়েছিলেন। রাজা-জমিদারের মতো মেজাজটা ছিল খুব।
সসংকোচে বাগানের লোহার ফটক পেরিয়ে বাড়িতে ঢুকল ধীরেন। ভিতর থেকে অনেক লোকের গলা পাওয়া যাচ্ছে। ছেলেরা এসেছে বোধহয়।
উঠোনের মুখে একটা ছেলের সঙ্গে দেখা। বিজু, নরহরির ছেলে। ভারী ফর্সা, সুন্দর চেহারা। কী যেন খেলে-টেলে। ফুটবল বা ক্রিকেট যাই হোক। লেখাপড়াতেও চৌখশ।
বীরেনখুড়ো নাকি?
ধীরেন সরে সাইকেল যাওয়ার রাস্তা দিয়ে বলল, হ্যাঁ বাবা।
কিছু মনে করবেন না খুড়ো, পানুকে যে মেরেছিলাম সে এমনি নয়। পাতা খায় বলেই মেরেছি। যারা ওসব নেশা করে তাদের দোষ কী জানেন? তারা আর পাঁচজনকে জুটিয়ে নিতে চেষ্টা করে। পুরো গাঁয়ের আবহাওয়াই নষ্ট করে দেবে। একটু খেয়াল রাখবেন।
ধীরেন হাঁ করে চেয়ে থাকে। পানু তার ছোট ছেলে। সে যে বিজুর কাছে মার খেয়েছে এ-খবরটাই জানা নেই ধীরেনের। তবে পাতা-র কথাটা সে আবছা শুনেছে। খুব খারাপ নেশা নাকি, কিন্তু ধীরেনের কীই বা করার আছে! ছেলেরা এখন দূরের মাস্তুল, দরিয়ায় অনেক তফাতে চলে গেছে। পড়লে, মরলে শোক হবে বটে, কিন্তু নোঙর নেই যে!
সসংকোচে ধীরেন বলে, ঠিকই তো, ঠিকই করেছ বাবা মেরেছ।
একটু সামলে রাখবেন। নইলে ঘটিবাটি চাঁটি করে দেবে। এ নেশা যে করে তার কাণ্ডজ্ঞান থাকে না।
ধীরেন মাথা নাড়ে। বুঝেছে, আবার বোঝেওনি সে। বিড়ি-আসটা খায়, ঠিক আছে। ধেনো-টেনো খেলেও না হয় একরকম। দুনিয়া যত এগোচ্ছে নেশাও তত এগোলে বড় কঠিন পরিস্থিতি।
যান ধীরেন খুড়ো, ভিতরে যান।
ভিতরে এক আনন্দের হাট। স্বর্গের ছবি যেন। দুটো বিশাল বারান্দার সিঁড়ির বিভিন্ন ধাপে নানা বিভঙ্গে বসে আছে সুন্দর সুন্দর সব নারী ও পুরুষ। খুব হাসছে, হল্লা করে কথা বলছে।
ধীরেন হঠাৎ শিহরিত হয়ে মাথা নেড়ে আপনমনে বলে উঠল, না, না, উচিত হচ্ছে না। এখানে আমার ঢোকাটা উচিত হচ্ছে না।
সে তাড়াতাড়ি এই সুন্দর দৃশ্যটি থেকে নিজেকে সরিয়ে নেওয়ার জন্য পিছু হটে চলে আসছিল। একটি মেয়ে তাড়াতাড়ি উঠে এসে সামনে দাঁড়াল, এ কী খুড়া, চলে যাচ্ছেন যে।
পারুল, বরাবরই জগদ্ধাত্রীর মতো দেখতে ছিল। এখন যেন আরও জমকালো হয়েছে।
ধীরেন ভারী অপ্রস্তুত হয়ে বলে, না মা, তেমন কোনও কাজ ছিল না। এমনিই দেখা করতে আসা। ঘুরে ঘুরে খোঁজখবর নিই আর কী।
আসুন না ভিতরে, মার সঙ্গে দেখা করবেন না?
আজ থাক।
থাকবে কেন খুড়ো? আমরা যখন থাকি না তখন তো আপনারাই যা তোক খোঁজখবর নেন। আপনাদের ভরসাতেই তো মা আছে এখানে। আসুন।
কী সহবত! তার মতো নকড়াছকড়া লোককেও কী আপ্যায়ন। গৌরদা তার ছেলেমেয়েকে কী শিক্ষাটাই দিয়ে গেছে! বুক ভরে যায়।
হাতে ওটা কী খুড়ো? ঘটি নাকি?
সসংকোচে ঘটিটা ফের আড়াল করতে করতে ধীরেন হে হে করে একটু হাসে, ও কিছু নয় মা। গাঁয়ের মানুষ তো, এক কাজে বেরিয়ে অন্য কাজও সেরে নিই। একটু দুধের খোঁজে বেরিয়েছিলুম, তাই।
পেলেন না?
সে হবে খন।
উঠোনে নিমের ছায়ায় পাতা একখানা কাঠের চেয়ারে সাদা থান পরা বউঠান বসা। গায়ের রং আগে দুধে-আলতায় ছিল, এখন শ্বেতপাথরের মতো। একটু ফিরে তাঁকে পাশচোখে দেখছেন।
ধীরেন ঠাকুরপো বুঝি! এই দেখুন আমার বাচ্চারা সব এসেছে। সবাইকে তো চিনবেনও না।
ধীরেন খুব হাসি হাসি মুখ করে কয়েক পা এগোল। বড্ড লজ্জা হচ্ছে তার। এমন সুন্দর দৃশ্য— যেন মা দুর্গা আর কার্তিক গণেশ আর লক্ষ্মী সরস্বতীরা সব জড়ো হয়েছে। তার মধ্যে সে এক মহিষাসুর যেন ঢুকল এসে।
বলাকা তার দিকে চেয়ে বলে, অনেকদিন দেখিনি আপনাকে। চেহারাটা খারাপ হয়ে গেছে কেন?
ধীরেন বড় বেকায়দায় পড়েছে, জোড়া জোড়া চোখ তার দিকে।
অসুখ-বিসুখ করেনি তো ঠাকুরপো?
না বউঠান, বুড়ো হচ্ছি তো!
বলাকা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, তা তো সবাই হচ্ছি।
আজ যাই বউঠান, আপনারা গল্প-টল্প করুন। অসময়ে এসে পড়েছি।
কোনও কথা ছিল নাকি?
না না, এই খবরটবর নিতেই আসা। আসি তাহলে?
আসবেন মাঝে মাঝে।
ঘাড় কাত করে সম্মতি জানিয়ে বেরিয়ে আসছিল ধীরেন। শুনতে পেল, পেছনে একটা মেয়ে বলে উঠল, জানো, জ্যাঠামশাইয়ের কাজের দিন ধীরেন জ্যাঠা আমার ঘরের পাশে সাপ দেখে কাপড়ে পেচ্ছাপ করে ফেলেছিল!
একটু হাসির ঢেউ উঠল। বড় যন্ত্রণা হয় ধীরেনের। যা ঘটে তার কোনওটাই সে আর আটকাতে পারে না। ছেলে পাতা খায়, অন্য ছেলে সাট্টা খেলে, সে আটকাতে পারে না। এই যে পেচ্ছাপ বেরিয়ে পড়ে তাও কি পারে আটকাতে? এবারে চলে যাওয়ারই সময় হল বুঝি! তবে বানের জলে মিদ্দারকে ডুবিয়ে মেরেছিল তার পাপই কি অর্শাচ্ছে?
একটা শিউলি গাছের কাছে পারুল। ডিং মেরে পাতায় পাতায় আটকে থাকা ঝরা শিউলি তুলছে।
খুড়ো চললেন?
হ্যাঁ মা।
এত তাড়াতাড়ি? মায়ের সঙ্গে দেখা হল?
হ্যাঁ। এই একটু দেখে গেলুম। ঘুরে ঘুরে সবার খোঁজখবর নিই আর কী। আজ মহিমার মেজো ছেলে অমলের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। কত কাল পর, চিনতেই পারছিল না।
একটু ভ্রূ কোঁচকাল পারুল, কে বললেন?
সেই যে মাধ্যমিকে স্ট্যান্ড করেছিল মনে নেই? এখন কেষ্টবিষ্ট হয়ে উঠেছে। বড় ভাল লাগল দেখে।
পারুল ফুল তুলতে তুলতেই বলল, অমলদা এসেছে বুঝি?
হ্যাঁ।
আর কথা নেই। ধীরেনের কথা বড্ড তাড়াতাড়ি ফুরিয়ে যায়। ধীরে হেঁটে সে রাস্তার দিকে যাচ্ছিল।
ধীরেনখুড়ো!
ধীরেন থমকে দাঁড়ায়, কী মা?
আপনি কি এখন দুধ জোগাড় করতে যাচ্ছেন?
ধীরেন ক্লিষ্ট একটু হেসে বলে, দেখি যদি পাই।
দিন তো, ঘটিটা আমাকে দিন।
অ্যাঁ!
পারুল ঘটিটা তার অবশ হাত থেকে নিয়ে লঘু পায়ে ভিতরবাড়িতে চলে গেল। ধীরেন একটু আশাভরসায় বুক বেঁধে দাঁড়িয়ে রইল। নিজেকে একটু কাঙাল ভিখিরির মতোই লাগছে বটে, কিন্তু সে তো তাই। সমাজের নীচের তলাতেই বাস ছিল তার। হয়তো আরও কয়েক ধাপ নেমে গেছে। কে জানে! তবে কী এসে যায় তাতে? এইসব বড় বড়, উঁচু উঁচু মানুষের দয়াধর্মের ওপরেই তো বেঁচে থাকা, ছোট ছোট ইচ্ছাপূরণ!
দেবী যেমন বর দেন তেমনই ছোট ঘটিটা দুধে ভরে নিয়ে এসে তার হাতে দিল পারুল। মুখটা কচুপাতায় ঢেকে দিয়েছে। কী বুদ্ধি মেয়েটার।
সাবধানে নিয়ে যাবেন খুড়ো।
কৃতজ্ঞতায় গলে যেতে ইচ্ছে করে ধীরেনের। চোখে জল আসতে চায়। একটু উথলানো গলায় বলে, দিলে মা! দিলে!
বেশি তো নয়। ছোট্ট ঘটি আপনার।
যথেষ্ট মা, এই যথেষ্ট।
আর খুড়ো!
হ্যাঁ মা।
অমলদার সঙ্গে যদি দেখা হয় তাহলে একবার আমাদের বাড়িতে আসতে বলবেন। বলবেন আমি বলেছি।
ধীরেন মাথা হেলিয়ে বলে, আচ্ছা মা। এখনই বলে আসব?
পারুল একটু হেসে বলল, আমি কয়েকদিন এখানে থাকব। যখন হয় বলবেন, আপনার সময়মতো।
হ্যাঁ মা।
দুধ! শেষ অবধি ঘটি ভর্তি দুধ! আনন্দে ধীরেনের বুকটা একটু তোলপাড় হল। এবার একটু পাঁউরুটি জোগাড় হলেই হয়। ঘটিটা দু হাতে মণিরত্নের মতো ধরে ধীরেন সাবধানে হাঁটে। হোঁচট-টোচট খেলে দুধ চলকে যাবে বাবা। আর হঠাৎ যদি এখন তার পেচ্ছাপ পেয়ে বসে তাহলেও বিপদ। পাজি পেচ্ছাপটা যে কখন পেয়ে বসে তার কিছু ঠিক নেই। শালা ঠিক মিদ্দারের ভূতের মতো। যখন-তখন এসে হানা দেয়। কাণ্ডজ্ঞান থাকে না তখন।
পাঁউরুটি কিনতে বাসরাস্তায় এসে ধীরেন চায়ের দোকানে বসল একটু। অনেক কিছু ভাবার আছে। এই দুধ নিয়ে বাড়ি গেলে কি তার ভোগে লাগবে? চারদিকে লোভী চোখ। ঘটিটা সাবধানে টেবিলের ওপর রেখে এক হাতে যখের মতো ধরে থাকল ধীরেন। তারপর অনেকক্ষণ ভাবল। ভেবে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে এক কাপ চা আর কোয়ার্টার রুটি নিল ধীরেন। চায়ে ডুবিয়ে পাঁউরুটি কিছু খারাপ নয়। চায়ের মধ্যেও তো একটু দুধ থাকে রে বাপু। চোখ বুজে মনে মনে ভেবে নিলেই হয় যে, দুধে ভিজিয়েই খাচ্ছি।
কাঙাল গরিবদের ভগবান কল্পনাশক্তিটাও খুব দেন বটে। ওইটুকু আছে বলেই তারা পান্তাকে পোলাও মনে করে খেয়ে নিতে পারে। না না, পোলাও-টোলাও গরিবেরা ভালবাসে না। তাদের জিভে পোলাও বা লুচির কোনও স্বাদ নেই। তারা ভালবাসে মিঠে ভাত, লঙ্কার ঝাল বা তেঁতুলের টক। তাই দিয়েই ভরপেট উঠে যায়।
চায়ে ভিজে গেলাসের মধ্যে পাঁউরুটিটা টইটম্বুর হয়ে উঠল। দৃশ্যটা মুগ্ধ চোখে দেখল ধীরেন। তারপর একটু একটু চুমুক দিয়ে আর দু-তিন আঙুলে চায়ে ভেজা পাঁউরুটির দলা মুখে দিয়ে খেতে লাগল সে। খুব ধীরে ধীরে। অন্য হাত দুধের ঘটির ওপর সতর্ক পাহারা দিচ্ছে।
অনেকক্ষণ সময় নিল ধীরেন। সব জিনিস রয়ে-সয়ে করতে হয়। জিভ, টাকরা কণ্ঠনালি বেয়ে পেট অবধি স্বাদের আলো ছড়িয়ে নেমে যাচ্ছে চায়ে ভেজানো পাঁউরুটি। পুরো এই ব্যাপারটা খুব মন দিয়ে উপভোগ করছে সে। প্রতিটি বিন্দু।
দুধটুকু থাক। এটুকু বাড়িতেই নিয়ে যাবে সে। দুধ-উপোসি শিশুরা আজ দুধ দেখে ভারী খুশি হবে। না, ধীরেনের বরাতে জুটবে না। তা না জুটুক। আজ তার একটু মহৎ হতে বড্ড ইচ্ছে করছে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন