শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
আকাশে পাখি ফিরিছে গাহি, মরণ নাহি, মরণ নাহি। এই ধ্রুবপদ মাথার ভিতরে বিনবিন করে ঘুরে বেড়াচ্ছে। খুব ধীরে ধীরে ছড়িয়ে যাচ্ছে সর্বাঙ্গে। খুব মৃদু, শীতল, গুনগুন সুর। জুড়িয়ে যাচ্ছে শরীর, জুড়িয়ে যাচ্ছে মন। এ যেন গান নয়, মায়ের আঙুল। জ্বরে তপ্ত কপালে ঠান্ডা হাত। বড় ভরসা, বড় আশা, বড় সান্ত্বনা। মরণ নাহি, মরণ নাহি।
পাখি ডাকছে। তাদের প্রবল ডাকাডাকি আর ডানার চঞ্চল শব্দে কেঁপে কেঁপে যাচ্ছে বাতাস। আলো ফুটছে ক্রমে। ঘরে পাঁশুটে একটু ময়লা রং। তার মধ্যেই হঠাৎ জানালার ফাঁক দিয়ে তপ্ত লোহার রডের মতো লাল একটা রেখা এসে পড়ল মশারির গায়ে।
লেপের ওমের ভিতর থেকে মুখ বের করে এইসব নৈমিত্তিক দৃশ্য ও শব্দ ঘুমচোখেই সে লক্ষ করে ফের চোখ বোজে। মনে হয়, বহুকাল পরে একটা সুপ্রভাত এল বুঝি। এত সুন্দর ভোর বহুকাল দেখেনি সে।
এ-ঘরে চড়াই পাখির বাসা হয়েছে। বন্ধ ঘরে তাদের পুরীষ ও গায়ের বোঁটকা গন্ধ। জানালার সামান্য ফাঁক দিয়ে তাদের প্রবল যাতায়াতের শব্দ ও পরস্পরের ডাকাডাকিতে একটুও বিরক্ত হচ্ছিল না সে। কত জীবন, কত রকমের জীবন চারদিকে! পোকামাকড়, কীটপতঙ্গ, জীবজন্তু, সরীসৃপ। আকাশে পাখি ফিরিছে গাহি, মরণ নাহি, মরণ নাহি…
কোথায় কবে শুনেছিল এই লাইন? মনেও ছিল না তো! হঠাৎ কোন গভীর অবচেতনা থেকে উঠে এসে ঘুরে বেড়াচ্ছে তার দেহ-প্রকোষ্ঠে! মরণ নাহি, মরণ নাহি। এ কি মধুর মিথ্যা! নাকি সত্যিই এ জীবন মৃত্যুহীন?
মৃত্যুহীন কি জীবন হয়? কখনও নয়, কখনও নয়।
আধোঘুমে সে অনুভব করে মাথার নীচে অচেনা বালিশ। নিচু, চ্যাপটা, শক্ত। বালিশের ওপরে শস্তা খসখসে টার্কিস তোয়ালে থেকে তিলতেলের মৃদু গন্ধ আসছে। পাতলা তোশকের জন্য পিঠে ফুটছে তক্তপোশের তক্তা। লেপটার তেমন ওম নেই। পুরনো তুলো জায়গায় জায়গায় দলা পাকিয়ে ফাঁকফোকর তৈরি হয়েছে। তবু এই বিছানায় মধ্যরাত থেকে অঘোরে ঘুমিয়েছে সে। বাচ্চা ছেলের মতো। স্বপ্নও দেখেছে। একটাও দুঃস্বপ্ন নয়। অথচ দুঃস্বপ্ন ছাড়া খুব কম রাতই কাটে তার। ঘুমের মধ্যে মাঝে মাঝে ভয়ে, আতঙ্কে উঠে বসে সে। বুক ধড়ফড় করে, জিব শুকিয়ে যায়। মৃত্যুর স্বপ্ন যেন বিজবিজ করে তার অস্বস্তিকর ঘুমের মধ্যে।
অনেক দিন বাদে এই অচেনা বিছানায় শুয়ে একটা-দুটো ভাল স্বপ্ন দেখেছে সে।
দেখল, খুব ভোরবেলা সে একটা সাঁকোর ওপর রেলিং-এ ভর দিয়ে ঝুঁকে দাঁড়িয়ে আছে। নীচে কুয়াশায় আবছা এক নদী। একখানা নৌকো খুব ধীর দোলে চলে যাচ্ছে। নৌকোয় একখানা হলুদ লণ্ঠন জ্বলছে। লণ্ঠন ঘিরে মুড়িসুড়ি দেওয়া কয়েকজন মানুষ। ধীরে ধীরে নৌকোটা কুয়াশার আবছায়ায় মিলিয়ে যাচ্ছে। সবটাই যেন একখানা ওয়াশ-এর ছবি। বাস্তব পরাবাস্তবে মেশামেশি। খুব রোমান্টিক।
তার পাশে দাঁড়ানো একটি মেয়ে। ঘোমটায় ঢাকা মুখ। কিশোরীর ফিনফিনে চিকন গলায় নরম স্বরে সে বলে, তুমি খুব ভোরে ওঠো বুঝি?
না তো! ভোর কাকে বলে আমি তা জানিই না।
ভোরবেলার মতো এত সুন্দর সময় আর নেই। এ সময়ে ভগবানের সব জানালা দরজা খোলা থাকে। তুমি কেন ভোরে ওঠো না?
আজকাল ঘুম সহজে আসতে চায় না। কখনও মদ খেয়ে বা ওষুধ খেয়ে ঘুমোই। সেই ঘুম খুব বিচ্ছিরি। শরীরটা তখন আমার থাকে না। জড়বস্তুব মতো হয়ে যায়।
কিশোরী মেয়েটি জলে প্রায় স্থির ছবির মতো নৌকোটার দিকে চেয়ে রইল। বলল, তুমি যাবে?
কোথায় যাবো?
ওদের সঙ্গে?
ওরা কোথায় যাচ্ছে?
বড় গাঙে মাছ ধরতে।
যাবো।
পর মুহূর্তেই সে দেখল সেই আশ্চর্য নৌকায় সে লণ্ঠনের ধারে বসে আছে। বাবা আছে, দাদা আছে, কিশোরী মেয়েটিও বসে আছে ঠিক তার উলটো দিকে। আর নিতাই জেলে ছইয়ের ওপর থেকে জলে জাল ফেলতে গিয়েও দোনোমোনো করছে।
বাবা হাঁক দিল, ওরে নিতাই, জাল ফেলছিস না কেন?
জলে বড্ড বেশি মাছ বাবু। বিজবিজ করছে মাছ। রুই-কাতলা-মৃগেল কালবোশ। জাল টেনে তুলতে পারব কি?
দুর বোকা! মাছ ধরতেই তো আসা।
না বাবু। এত মাছ তুললে নৌকো ডুবে যাবে।
মেয়েটি জলের দিকে চেয়ে ছিল। হঠাৎ মুখ তুলে তার দিকে ফিরে বলল, জলে মাছ আছে, ক্ষেতে ধান আছে, চারদিকে কোথাও কোনও অভাব নেই।
অমলের মনটা বড্ড ভাল হয়ে গেল চারদিককার সম্পন্নতার কথা শুনে।
হঠাৎ বাবা বলল, এঃ চারটে টেক্কাই তোর হাতে। কল দে।
অমল দেখল তার হাতে তাস। তারা চারজন লণ্ঠনের আলোয় ব্রিজ খেলছে। নিজের হাতের তাস ভাল দেখতে পাচ্ছিল না সে। কেমন যেন হিজিবিজি তাস। দুটো জোকারের মুখও দেখতে পাচ্ছে সে। কোথায় চারটে টেক্কা?
এতক্ষণ দেখতে পায়নি। ছইয়ের ভিতরে মা রান্না করছিল। ডাক দিয়ে বলল, খোকা, কাঁকড়ার ঝোল হয়ে গেছে। খাবি আয়। ভাত বাড়ছি।
আমার কি খিদে পেয়েছে মা?
হ্যাঁ পেয়েছে। ছেলের খিদে মা ঠিক টের পায়।
তারপর আরও কী কী হল যেন। কী হল তা আর মনে নেই। স্বপ্নটা যেন জঙ্গলের মধ্যে কাঠুরেদের পায়ে-হাঁটা পথের মতো হঠাৎ হারিয়ে গেল।
দ্বিতীয় স্বপ্নটাও কিছু খারাপ নয়। রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ একটা পার্টি দিচ্ছেন। বিশাল বড় একটা জায়গা—অনেকটা রোমান কলোশিয়ামের মতো। সেখানে হাজার হাজার মোম জ্বলছে আর অনেক লোক বাজনার তালে তালে হাততালি দিচ্ছে। রানি আসবেন বলে অপেক্ষা করছে সবাই। অনেক সাহেব মেমের সঙ্গে বিস্তর বাঙালিকেও দেখতে পাচ্ছে সে। অনেকে ধুতি পাঞ্জাবি পরা।
পাশে দাঁড়ানো এক সাহেব হঠাৎ তাকে পরিষ্কার বাংলায় বলল, আমার নাম স্টিফেন স্নাইডার। আমি একজন কমোডর। আপনি কে বলুন তো?
আমি অমল রায়। একজন ইঞ্জিনিয়ার।
আরে! আপনিই তো আজ রানির কাছ থেকে নাইটহুড পাবেন। আপনি তো বিখ্যাত লোক!
লোকটার মাথায় টাক, বেশ লম্বা, মুখে অমায়িক হাসি।
অমলের একবার মনে হল, ঠিক এরকম পার্টিতে কাউকে নাইটহুড দেওয়া হয় না। আবার মনে হল, কী জানি বাবা, হতেও পারে। নিয়মকানুন হয়তো বদলে গেছে।
অমল বলল, আচ্ছা, নাইটহুড নেওয়ার সময় কি হাঁটু গেড়ে বসতে হয়?
না না, ওসব নিয়ম আর নেই। তবে রানির গালে চুমু খেতে কোনও বাধা নেই।
নিয়মগুলো আমার ভাল জানা নেই।
লোকটা দুঃখ করে বলল, পুরনো আদবকায়দা উঠে যাচ্ছে। ওসব নিয়ে কেউ মাথা ঘামায় না। নাইটহুড পেলে আপনার খুব বড় একটা প্রোমোশন হবে।
অমল খুশি হলে বলল, ধন্যবাদ।
এ আর এমন কী! আপনি তো এর পর নোবেল প্রাইজও পাবেন!
সে কী?
হ্যাঁ। আমার কাছে গোপন খবর আছে। শর্ট লিস্টে নাম উঠেছে।
অমল খুবই খুশি হল। নিজের সম্পর্কে তার ধারণা কখনও এতটা উঁচু ছিল না।
সমবেত তীব্র করতালির শব্দে অমল চমকে উঠে দেখল, একটা চমৎকার সাদা সিঁড়ি দিয়ে রানি নেমে আসছেন।
ওইখানেই স্বপ্নটা পাশ ফিরল। হারিয়ে গেল। যেমন হাটেবাজারে বাবার হাত-ছুট হয়ে বাচ্চা ছেলে মাঝে মাঝে হারিয়ে যায়। ছেলে ফেরত পাওয়া যায় বটে, কিন্তু হারানো স্বপ্নকে ফের ধরা খুব মুশকিল। সে যেন ঝিলের ওপর দিয়ে উড়ে-যাওয়া কাটা ঘুড়ি। তাকে কি ধরা যায়! কতবার ঝিলের ধারে দাঁড়িয়ে হতাশ চোখে বেহাত ঘুড়ির দিকে চেয়ে থেকেছে অমল।
বাবার বিছানায় পাতলা তোশক, ওমহীন লেপের মধ্যে শুয়েও আজ বেলা পর্যন্ত খুব ঘুমোল সে।
তুমি কি এখনও ঘুমোচ্ছ?
চোখ চেয়ে অমল দেখে, বাইরে রোদের ঝাঁঝ বেড়েছে। ঘর আলোয় আলোময়। বউদি সামনে দাঁড়ানো। হাতে চায়ের কাপ।
এবার ওঠো। বেলা হয়েছে। চা এনেছি।
এই বউদির সঙ্গে তার এক সময়ে খুব খুনসুটির সম্পর্ক ছিল। ঠাট্টা, রঙ্গ রসিকতা খুব হত। আজকাল সবাই নিরাপদ দূরে সরে গেছে। তার অনেক বিদ্যে, অনেক বড় চাকরি, গাম্ভীর্য এইসব কিছুকে সবাই ভয় পায়।
অমল উঠে বসে এক গাল হেসে বলল, ঠাকরোন যে!
বাব্বাঃ! কত কাল পরে ঠাকরোন বলে ডাকলে বলো তো! ডাকটা মনে ছিল তা হলে!
খুব ছিল। বোসো, ওই চেয়ারটায় গ্যাঁট হয়ে বোসো, কথা কই।
চায়ের কাপটা তার হাতে দিয়ে দ্রুত দক্ষ হাতে মশারিটা চালি করে তুলে দিয়ে বউদি বলে, দু দণ্ড যে বসব তার কি উপায় আছে! কিন্তু কী ব্যাপার বলো তো ঠাকুরপো, তুমি বাবার বিছানায় এসে শুয়ে আছ যে!
অমল চায়ে চুমুক দিয়ে একটু লাজুক হেসে বলে, সে একটা কাণ্ড!
কী কাণ্ড?
কাল রাতে আমাকে বোধহয় ভূতে পেয়েছিল।
বড় বড় চোখ করে বউদি বলে, ওমা! বলো কী গো! কোন ভূতটা ধরেছিল তোমাকে?
এখানে কটা ভূত আছে বলো তো!
তা আছে বাপু। সুধীর ঘোষ, ফটিক কাঞ্জিলাল, ইলাবতী, সোমেশ্বর আরও কতজনা।
বাপ রে! এত ভূত! গাঁয়ে তো তা হলে ভূতের মচ্ছব পড়ে গেছে।
ঠাট্টা কোরো না তো, ভাল লাগে না। ভূত-প্রেত নিয়ে ইয়ার্কি নয়।
খুব হাসল অমল। তারপর বলল, বাইরের ভূত নয় গো ঠাকরোন, এ ভূত আমার মাথার মধ্যে ভর করেছে।
হ্যাঁ ঠাকুরপো, তুমি নাকি রাত-বিরেতে বেরিয়ে যাও!
হ্যাঁ তো। ঘুম না এলে বেরিয়ে পড়ি।
ধন্যি তোমার সাহস!
গাঁ-দেশে কি রাত-বিরেতে লোকে বেরোয় না?
তা বেরোয়। ঠাকুর-দেবতার নাম করতে করতে বেরোয়। তুমি তো বাপু আবার নাস্তিক। নাস্তিক হওয়া মোটেই ভাল নয়, জানো?
নাস্তিক হলে কী হয় ঠাকরোন?
নাস্তিকরা যেন কেমনধারা হয় বাপু!
কেমনধারা হয় ঠাকবোন?
বড্ড রুখো-শুখো, কাট কাট কথা কয়, কাউকে মান্যিগন্যি করে না।
আমিও কি ওরকম ঠাকরোন?
বলতে ভয় পাই, তুমিও আছ একটু ওরকম।
একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে গেল। ছেলেবেলায় ভগবানে ভারী ভক্তি ছিল তার, ভয়ও ছিল। সরস্বতী পুজোয় অঞ্জলি দিত কত নিষ্ঠার সঙ্গে। পরে দেখল, যারা সরস্বতীর নামও জানে না সেইসব সাহেবরা বিদ্যাবত্তায় অনেক এগিয়ে আছে। তখন সরস্বতীর ওপর ভরসা উবে গেল।
আমি ঠিক নাস্তিক নই ঠাকরোন। ভগবানকে বিশ্বাস করার চেষ্টা কিছু কম করিনি। কিন্তু দুনিয়ার কোথাও ভগবানের টিকির ডগাটিরও চিহ্ন খুঁজে পাই না যে! তবু নাস্তিকও হতে পারিনি পুরোপুরি। মনে অনেক সংস্কার গেড়ে বসে আছে।
বউদি বড় বড় চোখ করে শুনছিল। গাঁয়ের মেয়ে, গাঁয়ের বউ। লেখাপড়া তেমন নয়। একটু ভালমানুষ গোছেরই ছিল একসময়ে। এখন সংসারের জাঁতাকলে পড়ে কেমন হয়েছে কে জানে! বলল, হ্যাঁ ঠাকুরপো, সোহাগও কিন্তু বড্ড ডাকাবুকো। একদিন মাঝরাতে বেরিয়ে গিয়েছিল, ঠিক তোমার মতো।
চমকে অমল বলে, কোথায় গিয়েছিল?
তা কী জানি! যখন ফিরল তখনও ভোর হয়নি। আমি তো ভয়ে সারা। ভাবলুম, হাওয়া-বাতাস লেগেছে বুঝি!
অমল মাথা নেড়ে বলে, হ্যাঁ, ও একটু খেয়ালি।
বেশি খেয়ালখুশি ভাল নয় বাপু। দিনকাল খারাপ পড়েছে। এ-গাঁয়ে আগে কোনও উৎপাত ছিল না। আজকাল ফচকে ছোঁড়াদের আড্ডা হয়েছে শুনতে পাই।
অমল নির্বিকারভাবে বলে, হ্যাঁ, তা জানি।
সোহাগের ওপর ওদের নজর পড়েছে। চাটুজ্যেবাড়ির বিজু রুখে না দাঁড়ালে একটা ভালমন্দ কিছু হয়ে যেতে পারত।
অমল খানিকটা শুনেছে। গা করেনি। এরকম তো হতেই পারে। দুনিয়ায় মেয়েরা যত এগোবে ততই পুরুষের প্রতিরোধ বাড়বে, আর তা নানা বিকৃত পথ ধরে প্রকাশ পাবে। এ রকমই হওয়ার কথা।
অমল বলল, শুনেছি।
মেয়েকে একটু সামলে রেখো ঠাকুরপো, অত আলগা দিও না। কখন কোন সর্বনাশ ঘটে তার ঠিক কি!
অত ভয় পাও কেন ঠাকরোন? এখনকার মেয়েরা তোমাদের মতো নয়। তারা ঘর ছেড়ে বেরোতে শুরু করেছে সবে। একটু আধটু ওরকম ঘটনা এখন ঘটবেই। তারপর সব স্বাভাবিক হয়ে যাবে। আমার মেয়েকে আমি স্বাধীনতা দিয়েই দিয়েছি। দুনিয়াটার ওপর ওর কতখানি অধিকার তা ও নিজেই বুঝে নেবে।
বড় বড় চোখে কথাগুলো শুনল বউদি। তারপর বলল, তোমাদের বড্ড সাহস ভাই। আমি কিন্তু পারতাম না।
না ঠাকরোন, তুমি পারোনি, পারবেও না। তোমার সময় কেটে গেছে। কিন্তু ভয় নিয়ে বেঁচে থাকাটা একটা অভিশাপ। তোমাদের জীবনটা নানা ভয়-ভীতি নিয়েই কেটে যাবে। কিন্তু পরের জেনারেশনের মেয়েরা ভয় নিয়ে বাঁচতে চাইছে না যে!
কী জানি বাপু, অত কথা তো বুঝতে পারি না। মেয়েদেরই যে বিপদ বেশি।
বিপদে না পড়লে কি বিপদ কাটে?
বউদি কথাটা মানল না বোধহয়। তবে তর্কও করল না। বলল, এখন চা খেয়ে ওপরে যাও। মোনা তোমার খোঁজ করছিল।
আমি যে এ ঘরে আছি তা কি জানে?
জানে। বাবা বলেছে। শুনে মোটেই খুশি হয়নি।
অমল একটু হেসে বলল, আমার বউ সহজে খুশি হয় না।
আচ্ছা ঠাকুরপো, তুমি আলাদা ঘরে শোও কেন? বর-বউ এক বিছানায় শোও না কেন?
সেটা কি নিয়ম?
ও মা! বলে কী রে! সেটা নিয়ম নয়?
না শুলে ক্ষতি কী?
শোনো কথা! বর-বউ এক বিছানায় না শুলে কি ভাব-ভালবাসা গাঢ় হয়?
অমল হেসে ফেলে, এক বিছানা ছাড়া ভাব-ভালবাসা হয় না নাকি?
কী জানি বাপু, তোমাদের সব অদ্ভুত কথা! বলি বিছানাটাও তো একটা কাছে-থাকা, তা নয়?
অমল ম্লান হেসে বলল, আমাদের তো সেরকম মনে হয়নি। অনেক সময়ে আমার কাজ থেকে ফিরতে দেরি হত। কখনও কখনও মধ্যরাতে ফিরেছি। তখন কারও ঘুম ভাঙিয়ে ভাব-ভালবাসা করতে গেলে উলটো ফল হতে পারত। তাই আলাদা বিছানায় শোওয়ার অভ্যাস হয়ে গেছে। ব্যাপারটা খুব একটা হাইজিনিকও নয় কিন্তু।
কেন, হাইজিনিক নয় কেন?
পরস্পরের শ্বাস দেওয়া নেওয়া কি ভাল। তা ছাড়া কারও কোনও কন্টেজিয়াস ডিজিজ বা খারাপ অভ্যাস থাকতে পারে।
সে আবার কী?
ধরো কেউ ঘুমের মধ্যে হাত-পা ছোড়ে, কারও হয়তো নাক ডাকে, কিংবা মুখে দুর্গন্ধ বা দাঁত কড়মড় করে…
থাক থাক, আর ফাঁড়া কাটতে হবে না বাপু। কত কথাই যে জানো! বর-বউয়ের মধ্যে আবার ওসব অসুবিধে কোনও বাধা হয় নাকি! তোমার দাদার তো ভীষণ নাক ডাকে, তাতে তো আমার একটুও অসুবিধা হয় না। বরং একদিন নাকের ডাক না শুনলেই দুশ্চিন্তা হয়।
তুমি নমস্যা ঠাকরোন।
ইয়ার্কি হচ্ছে, না?
বহুকাল পর তোমার সঙ্গে এমনভাবে কথা বলছি। বড় ভাল লাগছে। আর একটু বোসো। আজকাল তো তোমার সঙ্গে কথাই হয় না।
কী করব ভাই, তোমাদের গোমড়া মুখ দেখে ইদানীং বড্ড ভয় হত। সাহেব মেমদের দেশ থেকে এসেছ, পেটে কত বিদ্যে, আমরা তো কোন অন্ধকারে পড়ে থাকা জীব। তাই সমানে সমানে কথা কওয়ার চেষ্টা করিনি।
ঠাকরোন, আজ আর বিদ্যে-বুদ্ধি-চাকরি আমার কোনও গয়না নয়। মনে হয় ওসব দিয়ে কিছু হয় না।
বল কী গো! কিছু হয় না মানে! তোমার কি কিছু হয়নি! কত নামডাক, কত দায়িত্বের কাজ, যখন তখন বিলেত আমেরিকা চলে যাচ্ছ! তবু বলছ কিছু হয় না? আর কী হবে?
সেটাই তো ভাবছি।
তোমার সব বিদঘুটে কথা! তোমার দাদাও সেদিন বলছিল, অমলটার কী হয়েছে কে জানে, মুখে কখনও হাসি নেই। তুমি আজকাল সত্যিই হাসো না, কেন বল তো!
আজ তো বেশ হাসিখুশিই আছি ঠাকরোন, তাই না?
তা বাপু, সত্যি কথা, বহুকাল পর আজ তোমাকে একটু হাসিখুশি দেখছি। শ্বশুরমশাইয়ের বিছানার তাহলে গুণ আছে।
অমল আস্তে আস্তে গম্ভীর হয়ে গেল। বলল, কথাটা খুব ভুল বলনি তুমি। কাল নিশি-পাওয়ার মতো মাঝরাতে বেরিয়ে পাগলের মতো কোথায় কোথায় ঘুরেছি কে জানে! ফিরে এসে হঠাৎ বাবার কাশির আওয়াজ শুনে জানলাটার কাছে এসে দাড়ালাম। বাবার সঙ্গে বহুকাল সম্পর্কই তো নেই। জন্মদাতা বাপ, তার যে আর কোনও প্রয়োজন আছে জীবনে তাই তো ভুলে গিয়েছিলাম। কিন্তু কাল রাতে হঠাৎ ইচ্ছে হল, আচ্ছা, বাবা কী করছে একটু দেখি।
কেন হঠাৎ ইচ্ছেটা হল?
কোনও কারণ নেই। এমনই হঠাৎ ইচ্ছে হল। বাবা জেগেই ছিল। আমাকে ঘরে ডেকে এনে বসাল। কীসব কথাবার্তা হল তা ভাল মানে নেই। তারপর বাবা নিজেই বলল, আমার বিছানায় শুয়ে থাক। আর সেই কথাটা শুনেই আমার এমন লোভ হল যে আপত্তি না করে সোজা এসে শুয়ে পড়লাম। কী বলব তোমাকে, শুতে না শুতেই ঘুম। বহুকাল এমন নিশ্চিন্তে বাচ্চাছেলের মতো ঘুমোইনি৷
বউদি একটু হেসে বলল, হ্যাঁ, খুব ঘুমিয়েছ বাপু। তিন-চারবার ডাকতে হয়েছে ঘুম থেকে তুলতে।
বিছানাটা মোটেই ভাল নয়। তোশক পাতলা, লেপটাও পুরনো বলে ওম নেই, শক্ত বালিশ, তবু আশ্চর্য ঘুম হয়েছে কিন্তু। বিছানার গুণই হবে, কী বল!
শোনো বাপু, তোমাদের স্বামী-স্ত্রীর ওই আলাদা শশাওয়াটা মোটেই ভাল দেখাচ্ছে না। আজ থেকে দুজনে একসঙ্গে শোও।
তাতেই সমস্যার সমাধান হবে?
সমস্যা আবার কীসের? স্বামী-স্ত্রীর মন কষাকষি হয়ই, আবার মিটেও যায়। শুয়েই দেখো না। অনেক সময়ে শরীর কাছাকাছি হলে মনও কাছাকাছি হয়।
তোমাকে আজ বিছানায় পেয়েছে দেখছি। কিন্তু মোনার আর আমার মধ্যে সমস্যাটার সমাধান শুধু বিছানা দিয়ে যে হওয়ার নয় ঠাকরোন। মাঝখান দিয়ে নদী বইছে।
শুধু হেঁয়ালি কথা!
একটু হেঁয়ালি যে থেকেই যাচ্ছে।
হ্যাঁ গো ঠাকুরপো, চাটুজ্যে বাড়ির মেয়েটার কথা কি তুমি এখনও ভুলতে পারনি?
অমল একটু চুপ করে থেকে বলল, মোনারও ধারণা আমি মনে মনে পারুলের কথাই ভাবি। কিন্তু পারুল কোনও বাধা নয়, পারুল কোনও কারণ নয়।
তোমার আর মোনার মধ্যে তো ঝগড়াও হয় না কখনও। শুধু মিলমিশের একটু অভাব।
ঝগড়া হলে তো বুঝতাম ভাবও আছে। কিন্তু ওই যে বললাম, মাঝখানে নদী বইছে।
আবার হেঁয়ালি! এখন ওঠো, ঘরে যাও। মোনা হয়তো রাগ করে আছে।
ও সবসময়ই রাগ করে থাকে।
আর এক কাপ চা খাবে?
দেবে?
কেন দেব না? ওপরে যাও, পাঠিয়ে দিচ্ছি।
অমল উঠল। হাই তুলল, আড়মোড়া ভাঙল।
ধীরে ধীরে দোতলায় উঠে এল অমল। সামনেই প্রথম ঘরটা মোনার। দরজায় মোটা পর্দা ঝুলছে। সন্তর্পণে ঘরটা পেরিয়ে পাশের ঘরে ঢুকল অমল।
ঢুকেই থমকে গেল। ঘরে মোনা দাঁড়িয়ে।
তুমি কি বাড়ির লোকের কাছে এটাই প্রমাণ করতে চাও যে, তোমার আর আমার সম্পর্ক ভাল নয়?
অমল অবাক হয়ে বলে, সেটা কীসে প্রমাণ হল?
শুনলাম তুমি মাঝরাতে শ্বশুরমশাইয়ের ঘরে গিয়ে তাঁকে তুলে দিয়ে তাঁর বিছানায় শুয়েছিলে?
হ্যাঁ। অনেকটা তাই।
তোমার কি কাল রাতে খুব নেশা হয়েছিল?
খুব বেশি নয়। কেন, কী হয়েছে?
লোকে কী ভাবল সেটা ভেবে দেখেছ?
কথাটা ম্যান্তামারা না ম্যাদামারা? যা-ই হোক, কথাটার মানে আগে বুঝতে পারত না অমল। আজকাল একটু একটু পারে। ম্যান্তামারা মানে বোধ হয় ঠান্ডা মেরে যাওয়া ফ্রিজ বা ফ্রিজিড হয়ে যাওয়া মানুষ, যার কোনও ব্যাপারেই তেমন কোনও তীব্র বা মৃদু প্রতিক্রিয়াও হয় না। যেমন গাছ বা ইট-কাঠ। সকালের তেরছা তীব্র রোদের মস্ত চৌখুপি বিছানা জুড়ে এবং বিছানা ছাড়িয়ে ঘরের মেঝে অবধি এসে পড়েছে। ঝলমল করছে ঘর। তার আলোয় মধ্যবয়সি, প্রায় যুবতী এবং অসম্ভব ফর্সা মোনালিসাকে খুব তীব্র দেখাচ্ছে। কাটা কাটা মুখ-চোখের মোনাকে সুন্দরীই বলতে হবে। যদিও লাবণ্য জিনিসটার অভাব আছে। সে যাই হোক, মোনা এক তীব্র রূপের নারী এবং এখন তার চোখে অপমান এবং তজ্জনিত রাগ ঝলসাচ্ছে। অমলের এক ব্রিটিশ বন্ধু ভ্যান তাকে প্রায়ই বলত “কিস হার, এ কিস সলভ্স এভরিথিং।’ মুষ্টিযোগটা বহুবার প্রয়োগ করে দেখেছে অমল। কখনও কাজ হয়েছে, কখনও হয়নি। প্রেমহীন চুম্বনের বোধহয় কোনও বার্তা নেই।
এখন অবশ্য চুমু খাওয়ার প্রশ্ন ওঠে না। নিজের ভিতরে ভিজে, স্যাঁতা ম্যাস্তামারা ভাবটা এমন পাথর হয়ে আছে যে মনে হয়, এত উদ্যোগ নেওয়ার কোনও মানেই হয় না। চুম্বনও যেন শ্রম। কঠোর শ্রম।
উনি আমাকে জিজ্ঞেস করছিলেন তোমার সঙ্গে আমার ঝগড়া হয়েছে কিনা।
কে জিজ্ঞেস করছিল?
শ্বশুরমশাই। কী লজ্জার কথা বলো তো!
লজ্জা! লজ্জার কী আছে? তুমি কি ওদের পরোয়া কর?
করি না। কিন্তু তুমি ওঁর ঘরে গিয়ে শেলটার নিলে কেন?
ব্যাপারটা ওরকম নয়।
কীরকম?
আমার ভাষার জোর কম, এক্সপ্রেশনও হয় না। ভাবছি তোমাকে বোঝাতে পারব কিনা। এসব অদ্ভুত কথা বুঝতে গেলে তোমাকেও অনেকটা এগিয়ে আসতে হবে। তার চেয়ে থাক। ধরে নাও আমাকে একটা পাগলামিতে পেয়ে বসেছিল।
পাগলামি তোমাকে যে পেয়ে বসছে তা বুঝতে পারছি। মাঝরাতে তুমি কোথায় গিয়েছিলে? টু এনি গার্ল ফ্রেন্ড? পারুল নয় তো! শুনেছি ওর হাজব্যান্ড চলে গেছে।
ভারী অবাক হয়ে চেয়ে থাকে অমল। পারুল! মোন কি এখনও পারুলের সঙ্গে তাকে সন্দেহ করে? তার ধারণা ছিল পারুল সম্পর্কে মোনার কোনও সন্দেহ নেই। পারুল যে একজন দেবী তা মোনা বুঝতে পেরেছে। কিন্তু আজ সকালে এ কী শুনছে সে?
ব্যথাতুর মুখে অমল বলল, তাই কি হয়! ওরকম ভাবতে নেই।
বাধ্য হয়ে ভাবছি। তুমিই ভাবিয়ে তুলছ।
মাথা নেড়ে ম্যান্তামারা অমল শুধু দিশাহারার মতো বলল, ভাবতে নেই, ওরকম ভাবতে নেই।
তাহলে কী ভাবব তা তুমিই বলে দাও।
বেরিয়ে পড়েছিলাম। অনেকটা হাঁটলাম। ফিরে এলাম। বাবা ডেকে বলল, আমার বিছানায় শুয়ে থাক। আমিও বাচ্চা ছেলের মতো গিয়ে শুয়ে পড়লাম। ঠিক এইরকম ঘটেছিল।
আমার আর এখানে থাকতে ইচ্ছে করছে না। আজই কলকাতায় যেতে চাই।
আজই? এখনও কয়েকদিন ছুটি আছে।
ছুটি থাকলেই কি এখানে পড়ে থাকতে হবে নাকি? আমার আর এখানে ভাল লাগছে না। আমি যাব।
কলকাতায় গেলেই কি সব সমাধান হয়ে যাবে!
না, তা হবে না। তোমার সঙ্গে আমার আর রি-কনসিলিয়েশন হওয়ার নয়, জানি। কিন্তু আমার আর এ জায়গাটা ভাল লাগছে না। সোহাগকে নিয়েও প্রবলেম হচ্ছে।
ঠিক আছে।
আমি গোছগাছ করছি কিন্তু।
করো।
মোনা চলে যাওয়ার পর রোদে ভরা বিছানাটায় চুপ করে বসে রইল অমল। না, গ্রাম ছেড়ে কলকাতায় যেতে হচ্ছে বলে তার কোনও প্রতিক্রিয়া হচ্ছে না। ম্যান্তামারা অমলের এখন আর তেমন কোনও পছন্দ-অপছন্দ নেই। সবই সমান বলে মনে হয়।
জানালা দিয়ে রোদ আসছে, ঠান্ডা হাড়-কাঁপানো হাওয়াও আসছে। শরীর কেঁপে যাচ্ছে শীতে। তবু গায়ে কোনও চাপা দিল না সে। জানালা দিয়ে বাবার ঘরের পিছন দিককার বাগানটার দিকে চেয়ে রইল সে। বাগানে হলুদের বন্যা বইছে, গাঁদা ফুল ফুটে আছে মেলা। একটা বারোমেসে শিউলি গাছও রয়েছে বেড়ার কাছ ঘেঁষে। শরতে গাছ ভরে ফুল ফুটত, অন্য সময়ে কম হলেও সারা বছরই দু-চারটে করে ফুল হত। পুরনো গাছটা মরে গেছে। তার বীজ বা কলম করে আবার গাছ বানানো হয়েছে। খুব মন দিয়ে গাছটাকে দেখছিল সে। ফুলে ফুলে ছেয়ে আছে গাছ, তলায় বিছিয়ে আছে সাদা কার্পেটের মতো।
বাবা!
উঃ! বলে গভীর অন্যমনস্ক চোখ ফেরাল অমল।
মা বলছে আমরা নাকি আজ কলকাতায় যাচ্ছি।
সোহাগকে যেন কতদিন পর দেখল অমল। মেয়েটা যেন একটু রোগা আর লম্বা হয়ে গেছে। রুখু চুল, পরনে একটা ধূসর নাইটি।
হ্যাঁ।
ডিসিশনটা কার?
তোমার মায়ের।
আমরা কেন যাচ্ছি?
তা তো জানি না। তোমার মা যেতে চাইছেন।
সেখানে তো আমাদের এখন কোনও কাজ নেই। তোমারও তো ছুটি।
হ্যাঁ।
তাহলে?
তুই কি এখানে থাকতে চাস?
আমার তো এখানটাই ভাল লাগছে।
ওঃ। তাহলে সেটা তোর মাকে বলে দেখ।
মা খুব অ্যাডামেন্ট।
অমল জলে-পড়া মুখ করে অসহায়ের মতো বলে, তাহলে?
আমি তাহলে এখানে একাই থাকব। পারমিশন দেবে?
খুব অবাক হয়ে— যেন পারমিশন কথাটা জীবনে এই প্রথম শুনছে—এমন মুখ করে অমল বলে, পারমিশন!
হ্যাঁ। তোমাদের যদি আপত্তি না থাকে তাহলে আমি আরও কয়েকদিন এখানে থাকতে চাই।
ও! তাতে অসুবিধে কী?
তা তো বুঝতে পারছি না। মা আমাকে নিয়ে যেতে চাইছে।
তাহলে?
তুমি মাকে বলো।
মেয়ের মুখের দিকে খুব নিবিষ্টভাবে চেয়ে থেকে অমল বলে, তোর কি এ-জায়গাটা ভাল লাগছে?
হ্যাঁ। খুব ভাল লাগছে।
তোর মা বলছিল তোর নাকি কীসব প্রবলেম হচ্ছে এখানে।
কোনও প্রবলেম হচ্ছে না তো!
হচ্ছে না?
না।
অ্যান্টিসোশ্যাল ছেলেরা কি ডিস্টার্ব করছিল?
হ্যাঁ। কিন্তু তারা এখন আমার বন্ধু হয়ে গেছে।
বন্ধু?
হ্যাঁ। দাদু, পিসি, জেঠিমা সকলের সঙ্গেই আমার বেশ ভাব। আমার কোনও প্রবলেম হচ্ছে না।
ও। বলে অমল ফের অসহায়ের মতো চেয়ে থাকে। ঘটনার লাগাম তার হাতে নেই। সোহাগ কি তা জানে না? তবু শিখণ্ডীর মতোই তাকে ব্যবহার করতে চাইছে।
তুমি, মা, বুডঢা তোমরা চলে যাও। আমি এখানে বেশ থাকতে পারব কয়েক দিন।
একা থাকবি?
একা! একা কোথায়! বাড়ি ভর্তি এত লোক!
হ্যাঁ, তা তো ঠিকই। কিন্তু ওদের সঙ্গে তো আমাদের ঠিক অ্যাডজাস্টমেন্ট ছিল না।
মার সঙ্গে এখনও নেই। কিন্তু আমার সঙ্গে হয়ে গেছে।
সামান্য কৌতুহল বোধ করে অমল প্রশ্ন করে, তুই কি সকলের সঙ্গে কথা বলিস?
কেন বলব না?
ঘরে-টরে যাস!
হ্যাঁ তো। সকলের ঘরে যাই। কত গল্প হয়।
অমল অবাক হয়ে বলে, খুব আশ্চর্যের কথা।
কেন, অবাক হওয়ার কী আছে?
না, আমি ভেবেছিলাম আমার লোকজনের সঙ্গে চলতে তোদের খুব অসুবিধে হবে।
আমার অসুবিধে হচ্ছে না। তুমি মাকে একটু বুঝিয়ে বলবে?
বলব। তবে হয়তো আমার কথাটার গুরুত্ব হবে না। আমি কাউকে কিছু বুঝিয়ে বলতে পারি না। কেউ বুঝতে চায়ও না।
মা যদি ফোর্স করে তাহলে কিন্তু আমিও ফোর্স করব।
ঝগড়া করবি?
যদি করতে হয়, করব।
অমল একটু তটস্থ হল। ঝগড়া তার পরিবারে মাঝে মাঝে হয়, তবে বেশি দূর গড়ায় না। ঝগড়ার চেয়েও ভয়াবহ হল শীতল নীরবতা! দিনের পর দিন কেউ কারও সঙ্গে কথা কয় না। খুব সামান্য প্রয়োজনীয় দু-একটা কথা বলেই ঝাঁপ ফেলে দিয়ে যে যার নিজের মনের মধ্যে ঢুকে যায়। কোনও আবেগ, উচ্ছলতা নেই তাদের। অবসরে বসে কথাবার্তা করে সময়যাপনও করে না তারা।
একটা শ্বাস ফেলে অমল বলল, দেখা যাক।
মা কেন চলে যেতে চাইছে জানো?
কেন?
আজ পারুল মার সঙ্গে দেখা করতে আসবে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন