শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
গুরু বললেন, ওহে শিষ্য।
শিষ্য বলল, আজ্ঞা করুন গুরুদেব।
বলি, তোমাকে যে চারিপাদ ব্রহ্মজ্ঞান দিলাম তা কি হৃদয়ঙ্গম হয়েছে?
আজ্ঞে গুরুদেব, হয়েছে।
হয়ে থাকলে তোমার মুখমণ্ডলে ব্ৰহ্মজ্ঞানের দীপ্তি প্রকাশ পাচ্ছে না কেন? বলো তো কী বুঝেছ, ব্ৰহ্ম ব্যাপারটা কী?
আজ্ঞে গুরুদেব, ব্ৰহ্ম হচ্ছে হাওয়ার নাড়ু।
বৎস, সেটা কী বস্তু।
হাওয়া দিয়ে নাড়ু পাকালে যা হয় আর কী। পুরোটাই ফক্কিকারি।
বৎস, তুমি যে ব্রহ্মকে একেবারে বোঝোনি তা নয়। ব্রহ্ম অনেকটা ওরকমই বটে। কিন্তু আগে কহো আর।
যদি অভয় দেন তো বলি।
ভীত হওয়ার কিছু নেই বৎস। নির্ভয়ে বলো।
আজ্ঞে ব্ৰহ্ম-ট্ৰক্ষ কিছু নেই। ব্রহ্মের আকার নেই, প্রকার নেই, গুণ নেই, বাক্য বা মন দিয়ে তার হদিশ মেলে না। সুতরাং ও বস্তুর থাকাও যা, না-থাকাও তাই। ব্ৰহ্ম হচ্ছে কিছু মানুষের অলীক কল্পনা। ব্রহ্ম আমাদের কোনও কাজে লাগে না, ব্রহ্ম ব্যবহারযোগ্য নয়, সুতরাং তার জ্ঞানেও আমাদের কোনও প্রয়োজন নেই।
বৎস, তা হলে গত পাঁচ বছর ধরে তুমি আমার সন্নিধানে কায়ক্লেশে অবস্থান এবং সাধনাদি করলে কেন? তোমার উদ্দেশ্য কী?
ব্রহ্মসাধনই আমার উদ্দেশ্য ছিল বটে, কিন্তু হে আচার্য, সাধনা করতে গিয়েই ধীরে ধীরে এই সাধনার নিরর্থকতাও আমি হৃদয়ঙ্গম করেছি। ব্রহ্ম আছেন এটাও যেমন জ্ঞান, ব্ৰহ্ম নেই এটাও তেমনই জ্ঞান। সাধনা করে আমি বুঝতে পেরেছি ব্ৰহ্ম-ট্রহ্ম কিছু নেই। এই নেতিবাচক জ্ঞানটির জন্যই সাধনার প্রয়োজন ছিল।
বৎস, আমার ধারণা হচ্ছে তুমি ঠিক মতো ব্রহ্মচর্য পালন করোনি, যথাবিহিত সংযম অবলম্বন করোনি এবং যথার্থ নিষ্ঠাও তোমার ছিল না।
হে ঋষি, আপনি অযথা আমাকে ভর্ৎসনা করছেন। তপোধন, এই সুবিশাল নৈমিষারণ্যে বহু ঋষিই নানা প্রকার তপস্যায় নিয়োজিত রয়েছেন, তাঁরা সকলেই ব্ৰহ্মজ্ঞানী, তবু মাঝে মাঝেই তাঁরা চরিত্রভ্রষ্ট হয়ে পড়েন বলে শোনা যায়। অথচ ব্রহ্মজ্ঞানী ব্রহ্মই হয়ে যান বলে কথিত আছে, তাই ব্ৰহ্মজ্ঞানীর পতন সম্ভব নয় বলেই আমরা শুনে আসছি। অথচ তাদের মধ্যে অনেকেই কোপন স্বভাববিশিষ্ট, ব্যভিচারী, লোভী, পরশ্রীকাতর, সংকীর্ণমনা, কুসংস্কারাচ্ছন্ন এবং অহংকারী। তা হলে ব্ৰহ্মজ্ঞান আমাদের কেন অভীষ্ট সিদ্ধ করে তা আজ্ঞা করুন।
বৎস, তোমার অনাবিল দৃষ্টি এবং সরল অভিব্যক্তির জন্য তোমাকে সাধুবাদ জানাচ্ছি। অপিচ তোমাকে ইহজীবনের কিছু সারসত্যকেও উপলব্ধি করতে হবে। ঋষিরা কেউ সামান্য মানুষ নন। যাঁরা ব্রহ্মজ্ঞানী তাঁরা সাধারণ হবেন কী করে? তুমি তাদের মধ্যে যে সব অবগুণ প্রত্যক্ষ করেছ তাও ভ্রান্তি। প্রয়োজনে প্রত্যেকেই নির্মোক ধারণ করেন মাত্র। বহিরঙ্গের আচরণে তাঁদের বিচার না করাই ভাল। অন্তরে এঁরা সকলেই নির্বিকার, অচঞ্চল, স্থিতধী, মহাজ্ঞানী মানুষ। একমাত্র পরম শ্রদ্ধার সঙ্গে অনুগমন করলেই এঁদের স্বরূপ বুঝতে পারা যায়। আবার স্বভাবনিন্দুকদের অপপ্রচারও আছে। রটনার বশীভূত হয়ে এঁদের বিচার না করাই ভাল।
তপোধন, আপনি আমার পূজনীয় গুরু। দীর্ঘ পাঁচ বছর আমি আপনার গোধনের পরিচর্যা করেছি, গৃহকর্মে যথাসাধ্য সাহায্য করেছি, সমিধ ও ফলমূল আহরণ করেছি, নিজহাতে আপনার অঙ্গ সংবাহন করেছি, গোধূমাদি চূর্ণ করেছি। আমার সেবায় কোনও ফাঁকি ছিল না। আমার পরিচর্যায় সন্তুষ্ট হয়েই আপনি আমাকে ব্রহ্মজ্ঞান প্রদান করেছিলেন।
বৎস, একথা অতি সত্য। তোমার সেবা ও সৎকর্মে সন্তুষ্ট হয়েই আমি তোমাকে ব্রহ্মজ্ঞানের উপযুক্ত পাত্র বলে স্থিরনিশ্চয় হয়েছিলাম। তোমার অধ্যয়ন ও পঠনপাঠনও সন্তোষজনক ছিল। আমার সিদ্ধান্তে কোনও ভুল ছিল বলে মনে হয় না।
তপোধন, ব্রহ্মজ্ঞানী যেহেতু ত্রিকালদর্শী হয়ে থাকেন তাই তাঁদের সিদ্ধান্ত নির্ভুল হতে বাধ্য বলে শাস্ত্রের নির্দেশ আছে। তথাপি যদি আপনার ভুল হয়ে থাকে তা হলে ব্রহ্মজ্ঞানকেই সন্দেহ করতে হবে।
বৎস, তুমি আমাকে যে ধিক্কার দিচ্ছ তা প্রতিহত করা আমার উদ্দেশ্য নয়। ব্রহ্মজ্ঞানও সন্দেহাতীতভাবে সত্য। আমি তোমার মুখ থেকে শুনতে চাই, ব্রহ্মজ্ঞান তোমার অন্তরকে আলোকিত করল না কেন? পুত্র, তুমি আনুপূর্বিক বলো, কিছু গোপন করো না। আমি যোগযুক্ত হয়ে বসছি।
মহাভাগ, আমি এক সামান্য রাজকর্মচারীর পুত্র। আমার পিতা রাজকীয় কোষাগারের রক্ষক। চিরকাল পরধন প্রহরার কাজে নিযুক্ত। প্রত্যহই তিনি শতসহস্র স্বর্ণ ও রৌপ্যমুদ্রা প্রত্যক্ষ করেন। মাসান্তে সামান্য বেতন নিয়ে গৃহে প্রত্যাবর্তন করেন। আমাদের কায়ক্লেশে দিনাতিপাত করতে হয়। পিতা আমাকে উপযুক্ত শিক্ষা প্রদান করতে বদ্ধপরিকর ছিলেন, যাতে আমি বিদ্যাশিক্ষা করে অধ্যাপক বা আরও কোনও সৎকর্মে নিযুক্ত হতে পারি। পিতার উদ্দেশ্য পূরণার্থে আমার চেষ্টার অবধি ছিল না। আমি সাতিশয় মেধাবী এবং প্রখর স্মৃতিশক্তির অধিকারী হওয়ায় আমার অধ্যাপক স্বল্পকাল শিক্ষাদানের পরই বললেন, বৎস, তোমাকে আমার আর কিছুই শেখানোর নেই। তুমি সভাপণ্ডিতের শরণাপন্ন হও। সভাপণ্ডিত আমার মেধার পরিচয় পেয়ে চমৎকৃত হয়ে বললেন, শাস্ত্রাদি, ব্যাকরণ ও কাব্য সবই তোমার কণ্ঠস্থ দেখছি। তোমাকে আমি আর কী শেখাব? তুমি কোনও সর্বজ্ঞ পুরুষের সন্ধান করো। নানা পণ্ডিতদের নানা বিধান শুনে শুনে আমি অবশেষে আপনার কাছে উপনীত হই। কিন্তু পিতা, মেধার বড় জ্বালা, মেধা যে সর্বদাই স্বস্তিদায়ক তা নয়। শাস্ত্রাদি আমার কণ্ঠস্থ বটে, কিন্তু হৃদয়স্থ নয়। উপরন্তু জন্মসূত্রে আমি রূপবান ও সুগঠন। মদনবাণে আমি প্রায়শই জর্জরিত হই। নগরের যুবতী নারী, কুলবধূ, কুমারী, বরাঙ্গনা ও বারাঙ্গনা সকলেই আমার প্রতি সহজেই আকর্ষিতা হয়। আমি কৈশোরকাল থেকেই রমণীগমনে অভ্যস্ত হয়ে পড়ি। অবৈধ প্রণয়, ব্যাভিচার, বলাৎকার কোনওটাতেই আমি অপটু নই। আসঙ্গপিপাসা ও তৃপ্তি ব্রহ্মস্বাদসহোদর বলেই শুনেছি। প্রভো, নারীসঙ্গ আমাকে যে আনন্দ দিয়েছে, ব্রহ্মের জ্ঞান যদি তাদৃশও দিত তা হলেও আমার বলার কিছু ছিল না। এখন আপনি বলুন পিতা, আমার দোষ কী!
পুত্র, অন্যান্য অনেক ঋষি যেমন বিবাহাদি করে থাকেন আমি তেমন নই। চিরকাল ব্রহ্মচর্যই অবলম্বন করে আছি। নারীসঙ্গ আমি কখনও লাভ করিনি। আসঙ্গপিপাসাও বোধ করি না। সুতরাং তোমার অভিজ্ঞতা কীরকম তা আমি অবগত নই।
হে মহর্ষি, নারীদেহে অবগাহন এক আশ্চর্য আনন্দ, রাজা থেকে ভিক্ষাজীবী সকলেই নারীদেহের বশ। নারীর প্রণয়ও এক বিরল অভিজ্ঞতা। আপনি নারীসঙ্গসুখ কখনও উপভোগ করেননি বলে জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় আপনার অগোচর রয়ে গেছে। প্রভু, আপনি মৃদু হাস্য করলেন কেন?
পুত্র, রমণীগমনের অভিজ্ঞতা বিষয়ে তোমাকে বিশেষ আগ্রহী দেখছি। সত্য বটে আমার সেই অভিজ্ঞতা নেই। কিন্তু নারী বিষয়ে আমি অজ্ঞ নই। বিধাতার সৃষ্টি কিছুই উপেক্ষার বস্তু নয়। তাঁর সৃষ্টি সবকিছুই বিশেষ অর্থ বহন করে। নারী বিনা কোনও মহান অবতার পুরুষেরও মানবজন্ম সম্ভব নয়। বৎস, সৃষ্টিতত্ত্বের অনেক নিগূঢ় কথাই আমি তোমাকে বলেছি। তুমি যে-সম্ভোগের কথা বলছ তার পিছনেও সৃষ্টিরই অনুপ্রেরণা বিদ্যমান। নর ও নারীর বিহিত মিলন শ্রদ্ধারই ব্যাপার।
ভগবান, আপনি কখনও মাধ্বী বা দ্রাক্ষাসব পান করেননি।
না বৎস।
আপনি কখনও গীত শ্রবণ বা নৃত্য পরিদর্শন করেননি।
না পুত্র।
আপনি কখনও দূতক্রীড়া বা বাজিতে অংশগ্রহণ করেননি।
না ধীমান।
আমি সবই আস্বাদ করেছি। অজ্ঞান, ব্রহ্মজ্ঞানহীন, প্রাকৃতজনেরা এই সকল উৎস থেকেই আনন্দ আহরণ করে। ক্ষণিকের তীব্র সুখানিভৃতি তাদের গ্লানি, শ্রম, ক্লান্তি, বিষাদ, উদ্দীপনার অভাব অপনোদন করে। আয়ুষ্কাল পদ্মপত্রে নীরবিন্দু মাত্র। সাধারণ মানুষও এইসব সুখানুভূতির ভিতর ব্রহ্মস্বাদই পেয়ে থাকে। জীবনযাপন সহনীয় হয়।
তোমার এই বাক্য আমাকে বিস্মিত করছে বৎস।
মহাভাগ, বিস্ময় উৎপন্নের হেতু আপনার অনাস্বাদ। আপনি এইসব সুখানুভূতির শরিক নন। শরিক হলে বুঝতেন এও ব্রহ্মেরই আস্বাদ।
বটে!
আজ্ঞা ঋষিশ্রেষ্ঠ।
বৎস, তোমার কথা শুনে ওইসব ক্ষুদ্র ব্রহ্মবিশ্বকে অনুধাবন করার ইচ্ছা হচ্ছে।
অতি উত্তম প্রস্তাব মহর্ষি।
ক্ষণকাল অপেক্ষা করো, আমি প্রস্তুত হয়ে আসছি।
গুরুদেব তাঁর গৃহমধ্যে অন্তর্হিত হলেন এবং কয়েক দণ্ড পর যখন নিক্রান্ত হলেন তখন শিষ্য বিস্ফারিত লোচনে স্থানুবৎ বসে রইল। কোথায় সেই শ্মশ্রুগুস্ফমণ্ডিত প্রবৃদ্ধ অশীতিপর ঋষি। ইনি যে এক সতেজ, সটান, উজ্জ্বলকান্তি অতীব সুদর্শন এক যুবা পুরুষ।
আপনি কে?
বৎস, আমিই তোমার গুরু। বিস্মিত হয়ো না। আমি সামান্য পরিচর্যা করেছি মাত্র।
সেই লোলচর্মবিশিষ্ট, পলিতকেশ অশীতিপর বৃদ্ধই কি আপনি?
হ্যাঁ পুত্র, বৃথা কালক্ষেপে কাজ কী? সন্ধ্যা ঘনায়মান, এই তো প্রমোদের কাল। চলো।
কিছুকাল পরে গুরু ও শিষ্য একত্রে নগরের দুর্ধর্ষ নটী রাজবিননাদিনীর আলয়ে প্রবেশ করলেন। সেখানে নগরের শ্রেষ্ঠ ধনী, রাজন্যবর্গ, সেনাধ্যক্ষ, উচ্চপদস্থ রাজকর্মচারীবৃন্দ উপস্থিত। প্রত্যেকেরই অঙ্গে মহার্ঘ পোশাক, স্বর্ণালঙ্কার, পেটিকায় প্রভূত স্বর্ণমুদ্রা ও মূল্যবান উপহারসামগ্রী। প্রত্যেকেই রাজবিনোদিনীর আসঙ্গলিন্সু ও স্তুতি-উন্মুখ। প্রমোদশালা গন্ধে, পুষ্পে, রত্নখচিত বস্ত্রসম্ভার ও বর্ণাঢ্য গালিচায় শোভাময়। রাজবিনোদিনী সভাস্থলে অচিরেই প্রবেশ করবেন। সুন্দরী দাসীরা অতিথিবৃন্দকে উত্তম আসব ও নানাপ্রকার খাদ্যদ্রব্য বিতরণে নিরন্তর পরিচর্যা করে চলেছেন। পরিচারকেরা বড় বড় সুদৃশ্য পাখায় ব্যজন করছেন। শিষ্য সমভিব্যাহারে ঋষি প্রবেশ করামাত্র সভাস্থল যেন হঠাৎ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। অতিথিরা সকলেই হতচকিত, বিস্মিত। তাঁরা এরকম দিব্যকান্তি পুরুষ আর দেখেননি। ঋষির পরনে নিতান্তই দুটি বস্ত্রখণ্ড। কিন্তু সেই সামান্য বেশবাসেই তাকে বড় অপরূপ দেখাচ্ছে। সকলেরই বিস্মিত দৃষ্টি তাঁর উপর নিবদ্ধ। যেসব যন্ত্রানুসঙ্গী নানা বাদ্যযন্ত্রে মধুর শব্দলহরী সৃষ্টি করছিল তারাও আচমকা থেমে গেল।
দেবর্ষি, আপনার আগমনে এখানে কিছু রসভঙ্গ হয়েছে।
কিন্তু বৎস, আমি তো রসভঙ্গ ঘটাতে আসিনি। গীতবাদ্য যেমন চলছে চলুক। তুমি সকলকে আশ্বস্ত করো। আমি আজ রসগ্রহণ করতেই এসেছি।
গীতবাদ্য ফের শুরু হল বটে, কিন্তু বেসুর বাজছিল।
উপস্থিত শ্ৰেষ্ঠীদের মধ্যে একজন উঠে পড়লেন। ঘর থেকে নিষ্ক্রান্ত হওয়ার আগে কী ভেবে হঠাৎ এগিয়ে এসে নতজানু হয়ে ঋষিকে প্রণাম করে বিনা বাক্যব্যয়ে চলে গেলেন।
ক্ষণকাল পরে রাজন্যবর্গের একজন অনুরূপভাবেই উঠে পড়লেন। তিনিও বিদায় নেওয়ার আগে ঋষিকে অভিবাদন করে গেলেন।
ক্ষণকাল পরে আরও একজন এবং তার পরে আরও একজন। এমনি করে প্রমোদালয় ধীরে ধীরে শূন্য হতে লাগল।
শিষ্য উদ্বিগ্ন হয়ে বলল, প্রভো, এঁরা রণে ভঙ্গ দিচ্ছেন কেন তা বুঝতে পারছি না। এঁরা কি আপনাকে অসম প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করছেন? রাজবিনোদিনীর অনুগ্রহপ্রার্থীরা সহজে হার মানার মানুষ নন।
গুরু মৃদু হাস্য করলেন মাত্র।
প্রমোদগৃহ শূন্য হয়ে গেল। শেষ অতিথি রাজ্যের সহসেনাপতি বিদায় নিয়ে যাওয়ার আগে যথাবিহিত প্রণাম করলেন ঋষিকে। তাঁর চোখের দিকে তাকিয়ে কিছু একটা বলতে গিয়েও বললেন না। মাথা নত করে বিদায় নিলেন।
গীতবাদ্যকাররা নীরবে বসে রইল। তাদের কণ্ঠে সুর আসছে না। বাদ্যযন্ত্রে আঙুল স্থির হয়ে আছে। এমন বিস্ফোরক অবস্থায় নিরানন্দ প্রমোদগৃহে প্রতিহারী অতি নির্বাপিত কণ্ঠে রাজবিনোদিনীর আগমনবার্তা ঘোষণা করল।
আগমন তো নয়, যেন আবির্ভাব। রাজবিনোদিনী সর্বাঙ্গসুন্দরী। কেশদাম থেকে পাদনখ পর্যন্ত যেন কোনও চতুর শিল্পীর কারুকার্য। স্বর্ণ, হীরকখণ্ডের আবরণে যেন বিদ্যুৎ খেলা করছে। অতি মূল্যবান রেশমি বসনের কুশলী বিন্যাস দেহঘষ্ঠিকে আরও প্রকট করেছে। আয়ত দুই চোখে অপ্সরাসদৃশ কটাক্ষ্য। লীলায়িত দুখানি হাত যেন সর্বদাই নানা নৃত্যের মুদ্রায় আন্দোলিত। রাজবিনোদিনীর চলনেও ছন্দ, নৃত্যবিভঙ্গ প্রকাশ পাচ্ছে। অপরিমেয় এই সৌন্দর্য যে-কারও ধ্যান ভঙ্গ করতে সক্ষম।
রাজবিনোদিনী প্রমোদকক্ষে পা দিয়েই থমকে দাঁড়াল।
এ কী! আজ আমার প্রমোদগৃহ শূন্য! এ যে অবিশ্বাস্য। আমার কি যৌবন অতিক্রান্ত হয়েছে? কেশপাশে কি দেখা দিয়েছে বার্ধক্যের শ্বেতাভাস! আমার নৃত্য কি আকর্ষণ হারিয়েছে? ছলাকলা কি বিস্মৃত হয়েছি? নাকি অতিথিবৃন্দকে যথেষ্ট পরিচর্যা করা হয়নি? নাকি তাঁরা অপমানিত বোধ করে আমার গৃহ ত্যাগ করেছেন?
প্রমোদগৃহের এক কোণ থেকে শিষ্য উঠে দাঁড়িয়ে বিনয় সহকারে বলল, না ভদ্রে, প্রমোদগৃহ একেবারে শূন্য নয়। আমরা তোমরা দর্শনাভিলাষী হয়ে অপেক্ষা করছি।
অপরূপ নারী এবার তাঁদের দিকে দৃষ্টিক্ষেপ করল। চোখে বিরক্তি। মুহূর্তকাল মাত্র। তার পরেই রাজবিনোদিনীর দুটি আয়ত চোখ বিস্ফারিত হয়ে গেল। প্রমোদগৃহের এক কোণে দীপশিখার আলো তেমন উজ্জ্বল নয়। অথচ সেখানে যেন একটি দীপদণ্ড দাউ দাউ করে জ্বলছে। না, দাউ দাউ করে জ্বলছে না। অগ্নিরেখার মতো স্থির ও দীপ্ত হয়ে আছে। এ কে? কোনও প্রণয়প্রার্থী? প্রমোদপ্রিয়? সংগীতরসজ্ঞ?
বিভ্রান্ত রাজবিনোদিনী চঞ্চল হল। পদক্ষেপে স্বর্ণমঞ্জরীর নিক্কণ তুলে কয়েক পা এগিয়ে গেল অতিথিদ্বয়ের দিকে। তারপর বজ্রাহতের মতো দাঁড়িয়ে পড়ল। তার সর্বাঙ্গ প্রকম্পিত হচ্ছিল এক অজ্ঞাত ভয়ে। বুকের মধ্যে এক সুগভীর দুন্দুভি বেজে উঠল যেন। আর বিস্ফারিত লোচন হঠাৎ সিক্ত হল অকারণ অশ্রুতে। স্থাণুবৎ কিছুক্ষণ দণ্ডায়মান থেকে আচমকা প্রবল বাত্যায় উৎপাটিত বৃক্ষের মতো ভূপাতিত হল রাজবিনোদিনী। সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করার পর অতি ধীরে নিজেকে উত্তোলন করে দুই পদ্মপত্রের মতো চোখে তাকিয়ে রইল ঋষির দিকে। মুখে বাক্যস্ফূর্তি হল না।
শিষ্য সবিস্ময়ে বলে উঠল, মহাতপ, এ কী! এই প্রমোদগৃহকে যে আপনি বিষাদগৃহে পরিণত করেছেন।
গুরু শুধু মৃদু হাস্য করলেন।
রাজবিনোদিনী তার স্খলিত অঞ্চল তুলে নিয়ে নীরবে নতমস্তকে প্রমোগৃহ থেকে নিষ্ক্রান্ত হলে গুরুদেব গাত্রোত্থান করে বললেন, চলো বৎস, আমাদের নৈমিষারণ্যের তপোবনে ফিরে যাওয়ার সময় হয়েছে। আর কালক্ষেপ বৃথা।
শিষ্য স্তম্ভিত মুখে গুরুদেবের অনুসরণ করতে লাগল।
নিশাকালে জনবিরল শব্দহীন তপোবনে গুরুদেবের পদপ্রান্তে বসে শিষ্য প্রশ্ন করল, গুরুদেব ব্ৰহ্মজ্ঞান আসলে কী বস্তু তা আজ্ঞা করুন।
গুরুদেব সহাস্যে বললেন, বৎস, ব্রহ্মজ্ঞান কোনও অলীক কল্পনা নয়, ধরাছোঁয়ার বাইরের ব্যাপারেও নয়, তোমার হাওয়ার নাড়ুও নয়। ব্রহ্মজ্ঞান হল কাণ্ডজ্ঞান বা বাস্তব চৈতন্য।
মহাশয়, আপনি বিস্তারিত বলুন। আমার কোথায় ভুল হয়েছিল?
বৎস, মানুষ যৌবনের অনিত্যতার কথা জানে, প্রমোদের ক্লান্তির কথাও জানে, সৌন্দর্যের অবসানের কথাও জানে। জীবনের শেষে যে মৃত্যু অপেক্ষমাণ তার কথাও কি মানুষ জানে না? তবু নিজেকে সে ভুলিয়ে রাখতে চায়। যে-জ্ঞান সব ধাঁধাকে ধ্বংস করে বস্তুর মর্মে পৌছয় তাই ব্ৰহ্মজ্ঞান। তুমি আবার সাধনায় ব্যাপৃত হও।
যথা আজ্ঞা গুরুদেব।
শীতের প্রকোপ কমে আসছে। মাঝে মাঝে দক্ষিণের হাওয়া বয়ে যায় আজকাল। গাঁয়ে বসন্তকালের দেখাসাক্ষাৎ পাওয়া যায় এখনও। ভারী আরামদায়ক একটি আবহাওয়ায় সকালে নিজের ঘরে বসে আপনমনে লিখছিল অমল। আজকাল তার মন ভাল আছে। রাতে ঘুম হয়। আবার প্রশ্নও জাগে, ভোঁতা হয়ে যাচ্ছি নাকি? বুড়ো হয়ে গেলাম না তো! কিংবা কে জানে, আর পাঁচজন এলেবেলে মানুষের মতো আমিও হয়ে যাচ্ছি নিরীহ গৃহপালিত একটি প্রাণী! মেধাবী অমলের এ কি অধঃপতন? প্রশ্ন কমছে, জীবনের রহস্যময়তা হ্রাস পাচ্ছে, গণ্ডিবদ্ধ সংসারে দিব্যি খাপে খাপে বসে যাচ্ছে সে। মোনার সঙ্গে যে আকচা-আকচিটা ছিল সেটাও আর নেই। এখন সে খুবই ভদ্রভাবে অনুগত স্বামীর মতো বেশির ভাগ কথাতেই সায় দিয়ে চলে। ভিতরের সব অঙ্গার খাক হয়ে গেল নাকি তার? মাঝে মাঝে এই খাতাকলম নিয়ে বসা। এটাই তার একমাত্র অ্যাডভেঞ্চার। এইসব খণ্ডচিত্র কোনও নাটক-নভেল নয়, উপন্যাস বা গল্পও নয়, শুরু-মধ্য-শেষ বলে কিছু নেই। এগুলোর নেই কোনও ভবিষ্যৎও। তবু এই একমাত্র তার আবরণহীন হওয়ার ক্ষেত্র।
গতকাল শুক্রবার গেছে। অফিসের পর গাড়ি নিয়ে সন্ধের মুখেই তারা বেরিয়ে পড়েছিল উইকএন্ডে। একটু রাতের দিকেই পৌঁছেছে গাঁয়ে। এটা আজকাল তাদের প্রিয় অভ্যাস। এক সময়ে নাকি মোনার খুব গাছপালার শখ ছিল। বিদেশবিভূঁইয়ে আর সেসব শখ বজায় রাখা যায়নি। কলকাতার ফ্ল্যাটে টবে কিছু গাছপালা পালনের চেষ্টা হয়েছিল, সুবিধে হয়নি। মোনাকে তার শ্বশুরমশাই একটা ফাঁকা জমি ঘিরে দিয়ে বলেছে, তোমার এত গাছপালার শখ, আমি তোক ডেকে লাঙল দিয়ে দিচ্ছি। তুমি ইচ্ছেমতো গাছ লাগাও! সারা সপ্তাহ জল-টল আমরা দিয়ে দেবখন।
মোনা কলকাতার নার্সারি থেকে ইচ্ছেমতো ফুলের গাছ কিনে এনে লাগাচ্ছে তিন সপ্তাহ হল। তার চোখমুখে নতুন খেলনা পাওয়ার উত্তেজনা। সকাল থেকেই বাগানে পড়ে আছে। অন্য কোনও দিকে খেয়ালই নেই।
থাক, একটা কিছু নিয়ে থাক। যারা একটা কিছু নিয়ে মেতে থাকে তাদের মাথায় শয়তানের বাসা হয় কমই। মোনা আজকাল অশান্তি কমই করে।
বাবা।
অমল তার অন্যমনস্ক চোখ ফিরিয়ে মেয়েকে দেখল, কী রে?
একটু ঘুরে আসছি। আজ চাক ভাঙা মধু খাব।
অমল হাসল। সব মধুই তো চাক ভাঙা।
হ্যাঁ। কিন্তু ভাঙা চাক থেকে টপ টপ করে মুখে গরম মধু পড়ার মতো তো নয়। খাবে? তা হলে তোমার জন্য নিয়ে আসব ক্যারিব্যাগে করে।
আনিস।
ওই রকম করে খেতে হবে কিন্তু। স্কুইজ এ লিটল, ড্রিংক এ ড্রপ অর টু।
তাই করব। কার বাড়িতে চাক ভাঙছে রে?
পান্নাদের জামগাছে। ইয়া বড় চাক।
এখানে এলেই সোহাগের মুখে একটা উজ্জ্বলতা দেখা যায়। ভিতরকার আনন্দ যেন ফেটে বেরোতে চায়। শহর ওর ভাল লাগে না, অমল জানে। শরীরও ভাল থাকে না কলকাতায়। মেয়েটা ভারী মানিয়ে নিয়েছে সকলের সঙ্গে।
অমল একটা তৃপ্তির শ্বাস ফেলল। হঠাৎ তার জীবনে সবকিছুই ভারী অনুকূল মনে হচ্ছে। গ্রহনক্ষত্রের খেলা নাকি? কে জানে বাবা! এত ভাল কি সত্যিই ভাল? ভালর আবার গুনোগার দিতে হবে না তো!
গাছের তলায় রাজ্যের ছোবড়া, ঘুঁটে আর কাঠকুটো দিয়ে আগুন জ্বালিয়ে ধোঁয়া তৈরি হয়েছে। নিথর বাতাসে ধোঁয়া উঠছে কুণ্ডলী পাকিয়ে। কোনও পতঙ্গই ধোঁয়া সহ্য করতে পারে না।
সোহাগের হাতে একটা নতুন গামছা দিয়ে পান্না বলল, এটা দিয়ে মাথা মুখ ঢেকে নাও।
ওমা! কেন?
কী জানি বাবা, মৌমাছিদের ঘর ভাঙা হচ্ছে, ওরা যদি রাগ করে ছুটে এসে কামড়ায়!
যাঃ, কিচ্ছু হবে না।
বিজুর পরনে ফুলপ্যান্ট, গায়ে টি শার্ট, কোমরে বাঁধা একটা গামছা, তাতে একটা চকচকে দা গোঁজা। সে খুব সন্তর্পণে টারজানের মতো জামগাছটা বেয়ে উঠে যাচ্ছিল। পিছু পিছু উঠছিল মরণ।
জানো তো, বিজুদা হল গাছ বাওয়ার ওস্তাদ। আর মরণ। কেউ ওদের মতো পারে না।
ঊর্ধ্বমুখে সোহাগ দেখছিল বিজুকে। ছিপছিপে দীঘল সুপুরুষ এই যুবকটিকে সে আজকাল কেন যেন খুব খুঁটিয়ে লক্ষ করে। একটু প্রাচীনপন্থী, ডু গুডার, একটু কুসংস্কারাচ্ছন্নও বোধহয়। কিন্তু লোকটা মন্দ নয়। মেয়েদের সামনে একটু আপসেট হয়ে পড়ে।
বিজু চাকটার কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। মরণ ওপর থেকে চেঁচিয়ে বলল, পান্নাদি চাদরটা দুজনে শক্ত করে ধরবে কিন্তু। মস্ত বড় চাক। অনেক মধু।
বিজু বলল, দুজনে পারবি তো! না হলে সুদর্শনকে বরং ডেকে আন।
মৌমাছিদের পাখার শব্দে চারদিকে ঝালা বেজে যাচ্ছে। অনেক মৌমাছি উড়ে উড়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে ধোঁয়ার পরিধির বাইরে। খুব দূরে যায়নি এখনও। বাসার বড্ড মায়া। কত যত্নে কতদিন ধরে তৈরি করেছে এই চাক।
দাঁড়াও সোহাগ, সুদর্শনদাকে বরং ডেকেই আনি। মস্ত বড় চাক। আমরা পারব না।
পান্না সুদর্শনকে ডাকতে গেল। সোহাগ চেয়ে রইল ওপর দিকে। হঠাৎ যেন মধুর মতোই এক সুস্বাদ সে অনুভব করছিল তার সর্বাঙ্গে। কেন কে জানে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন