শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
আচ্ছা এই স্ট্রোক জিনিসটা ঠিক কেমন হয় বলতে পারেন? লোকের মুখে শুনি কিন্তু ঠিক আন্দাজে আসে না।
হঠাৎ স্ট্রোক নিয়ে ভাবতে লেগেছিস কেন?
না এই কদিন ধরেই ভাবছি। বয়সও তো হচ্ছে। এক সময়ে তো চৌকাঠ ডিঙোতেই হবে। তাই ভাবছিলাম একটু আন্দাজ যদি করা যায়। মরার সময় কীসে মরছি, শরীরে কেমনধারা হচ্ছে সেটা বেশ বুঝতে বুঝতে মরা যাবে।
তোর যেমন বুদ্ধি। মরার সময় কি অত শরীরবোধ, অত টনটনে জ্ঞান থাকবে রে? আর আগাম ভেবেই বা কী হবে? থাকবি তো চিৎপাত হয়ে শুয়ে। যা ইচ্ছে হোক না। আগে থেকে ভেবে মরবি কেন?
তা অবিশ্যি ঠিক। তবে কী জানেন দাদা, মরতে তেমন ভয়-টয় নেই আমার। ভাবি কী জানেন, বাঁচাটার মতো মরাটাও বেশ উপভোগ করারই জিনিস। মনে হয়, শরীরের মধ্যে ঠিক যেন ইস্টিশন গার্ডবাবু হুইসল দিল, ঝান্ডা নাড়ল, ড্রাইভারসাহেব ভেঁপু বাজাল, তারপর প্ল্যাটফর্ম ছেড়ে কু ঝিকঝিক করে ট্রেন চলে গেল। ফাঁকা ইস্টিশন এই দেহখানা রইল পড়ে। পুরো ব্যাপারটাই বেশ একটা ঘটনা।
ঘটনা তো বটেই রে, তবে যে মরে সে কি আর অত বুঝতে পারে? গৌরদাকে তো দেখলি, দুদিন তো জ্ঞানই ছিল না।
সেও তো স্ট্রোক!
সেরিব্রাল। যাওয়া নিয়ে কথা, উপলক্ষ যা-ই হোক।
আগে কিন্তু মরাটা ভারী সোজাসরল ছিল। ডাক্তারবদ্যি ছিল না, এত রক্ত পরীক্ষা, ইসিজি, এক্স-রে, স্ক্যানেরও বালাই ছিল না। যমে আর মানুষে টানাহ্যাঁচড়া হত কম। কলেরা হল কি সান্নিপাতিক, জ্বরবিকার বা সন্ন্যাস পটাপট মরে যেত লোকে। এমনকী আমাশয়ে ভুগেও কি কম মরেছে? আজকাল কিন্তু ডাক্তারবদ্যি এসে নতুন নতুন ওষুধ দিয়ে মরণটাকে খুব আটকেছে।
হ্যাঁ। আজকাল মরছে কম। তা আজ বেহানবেলাটায় কু-ডাক ডাকছিস কেন?
কী যে বলেন দাদা, কু-ডাক ডাকব কেন? এসব তো জ্ঞানেরই কথা কিনা। আগে থেকে ভেবে রাখা ভাল। দেহখানা যাবে সে তো জানাই আছে। কিন্তু কোন কায়দায় যাবে সেইটেই ভাবি। আপনার কি যোগেন রায়ের কথা মনে আছে? শিবশূলের যোগেন রায়!
তা মনে থাকবে না কেন? সাহেবের সঙ্গে মারপিট করে জেল খেটেছিল বলে তাকে নিয়ে বর্ধমানে সভা হয়।
হ্যাঁ সে-ই। সুভাষ বোস ডেকে পাঠিয়েছিল কলকাতার কংগ্রেস অফিসে। পিঠ চাপড়ে দিয়েছিল। মনে আছে দাদা?
খুব। যোগেন তো মহেন্দ্র জমিদারের বাড়িতে নিয়ম করে ব্রিজ খেলতে আসত। খেলতও ভাল।
হ্যাঁ। তা সেই যোগেন রায় মরল আমার চোখের সামনে। তখন প্রায়ই গিয়ে বসে থাকতুম তো। আমাদের যৌবনের হিরো বলে কথা। একদিন বিকেলে গিয়ে বসেছি। যোগেন রায় বাগানে ইজিচেয়ার পেতে বসা। ক্ষিতীশ ঘোষ, নবেন্দু চৌধুরী, গণেশ হালদার সব বসে আছে। যোগেন রায় চা খেতে খেতে কী একটা হাসির কথা বলছিল। বলতে বলতে সামনের বেতের টেবিলটায় চায়ের কাপটা রেখে হঠাৎ একটু পিছনে হেলে গেল। মাথাটা চেয়ারের কানায় রেখে ঊর্ধ্বমুখে আকাশের দিকে চেয়ে রইল। চেয়ে রইল তো চেয়েই রইল। চোখের পাতা আর পড়ে না। ঝাড়া আধঘণ্টা সামনে বসে থেকেও আমরা বুঝতে পারিনি যে মারা গেছে। মুখে তখনও হাসিটা লেগে আছে।
মহিম রায় একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, ভাগ্যবান লোক, বুঝলি? অমন মরা মরতে পারলে আর চাই কী?
তা যা বলেছেন। তবে কিনা সাহেব পেটানোয় কত দূর পুণ্যি হয় তা আমি জানি না, কিন্তু সেটা বাদ দিলে যোগেন রায়ের আর পুণ্যিটা কোথায় বলুন তো! চেহারাখানা ছিল বটে দেখনসই, লোকে বলত শিবশূলের নেতাজি। কিন্তু কোনও দেখনসই মেয়ে চোখে পড়লে পার পেত না। বউ হোক ঝি হোক যোগেন রায়ের এঁটো হয়নি এমন মেয়ে পাবেন না। তার ওপর বন্ধকী কারবার ছিল। লোকে বলে বন্ধকী কারবার করলে নরকের পথে আর খানাখন্দও থাকে না। তা এত সব করেও অমন ইচ্ছামৃত্যুর মতো ব্যাপার হয় কী করে? প্রাণটা যেন গুড়ুলের মতো বেরিয়ে গেল। তাই বলছিলুম, ওসব কর্মফল-টল সব বাজে কথা, পাপপুণ্যির ব্যাপার-ট্যাপারগুলোতেও গোলমাল আছে, আর ভগবান বলেও কিছু তো ঠাহর হচ্ছে না। কী বলেন?
মহিম একটু হেসে বলল, তা ওরক হিসেব করলে তাই দাঁড়ায় বটে। কিন্তু তুই কি শেষে বুড়ো বয়সে নাস্তিক হলি?
আস্তিকই বা কবে ছিলুম বলুন! সাধনভজন তো আর করিনি কিছু। ওই বাড়িতে ষষ্ঠী বা বারের পুজো হলে বউ নড়া ধরে টেনে নিয়ে গিয়ে গড় করায়। তা সেও বলে, তুমি হলে পাষণ্ড, মুষল। পচেগলে মরবে। ঠাকুর-দেবতায় যার অত অচ্ছেদ্দা তার রাক্ষসের ঔরসে জন্ম।
এসব বলে?
খুব বলে। জিবে তার ভীষণ ধার। তবে মিছে কথাও তো বলছে না। বিচার করে দেখেছি, ঠাকুর-দেবতা মানামানির ইচ্ছেটাই হয়নি কখনও আমার। ভাবি যা সব অকাজ-কুকাজ করেছি তার জন্য নাকিকান্না কেঁদে লাভ নেই। ভগবান বলে যদি কেউ থেকেও থাকেন তিনি নাকিকান্নায় ভোলার লোক নন।
অনেক এগিয়ে বুঝেছিস রে ধীরেন৷
না দাদা, বুঝেছি বলা যায় না। বুঝতে হলে পেটে বিদ্যে চাই। তা সে বস্তু তো আর নেই। আমার বুঝ হল চাষাভুষোর মতো।
দুর বোকা! চাষাভুষোরা নাস্তিক হয়, দেখেছিস? ভয়ভীতি নিয়ে যাদের বেঁচে থাকতে হয় তাদের মধ্যে নাস্তিক খুঁজে পাওয়া ভার। যে যেমন জীবন যাপন করে তার ভগবানের বোধ তেমনতর। এই তো শুনলাম, সেদিন কে যেন বলছিল, কোরিয়া না কোথায় যেন লোকে ভগবানের ভাবটাই লোপাট করে দিয়েছে। মঠ মসজিদ গির্জার বালাই নেই, থাকলেও সেখানে কেউ তেমন যায় না। তারা খাটেপেটে, দেশ গড়ে, ভাল-মন্দ নিয়ে বেঁচে থাকে, খামোখা ভগবান আমদানি করে জীবনে জটিলতা বাড়ায় না, ও তাদের দরকারও হয় না। ভগবান ছাড়াই যখন চলে যাচ্ছে তখন খামোখা ডাকবে কেন বল!
আমারও তো সেই কথা। ডেকে হবেটা কী? আমার উদ্ধার নেই তা আমি জানি। মিদ্দারের পো এখনও আড়ে আড়ে ঘুরে বেড়ায়, ঘাড় মটকায় না বটে, কিন্তু ভুলতেও দেয় না।
ভগবান মানিস না, ভাল কথা। তবে ভূতই বা মানবি কেন রে?
ভূতের কথা বললুম নাকি? না দাদা, সে ভূত নয়।
তবে কী? এই যে বললি মিদ্দারের পো আড়ে আড়ে ঘুরে বেড়ায়।
তা ঘোরে। তবে সে ভূত নয়। মানুষ মরলেও তার ব্যথা বেদনা জ্বালা কি আর সহজে মরে! সেগুলোই যেন ঘুরে ঘুরে খুঁজে বেড়ায়।
তোর মাথা। কবে কী একটা ঘটনা ঘটেছিল তাই নিয়ে ঘষটে মরছিস। মানুষ কত কী ভুলে থাকে।
নিষ্কর্মারা ভুলতে পারে না। কাজকর্ম নিয়ে মেতে থাকলে হয়তো হত। ভেবে দেখতে গেলে মিদ্দারের পো কিন্তু খারাপ মরেনি। হেঁপো রুগি, শরীরে তো কিছু ছিল না। শুধু রোখের বশে বউটাকে তারের ফাঁস দিয়ে মেরেছিল। ওই রোখের জোরেই আমাকেও পেড়ে ফেলেছিল প্রায়। আমি তখন সা-জোয়ান। শেষরক্ষা হয়নি অবশ্য। জলে চেপে ধরেছিলাম, মিনিটখানেক ভুড়ভুড়ি কেটে মরে গেল। এই দেখুন, এখনও রোঁয়া দাঁড়িয়ে যায় ভাবলে।
তোর শ্রীমন্তকে মনে আছে?
তা থাকবে না? দিনেদুপুরে পাঁচকড়িকে রামদা দিয়ে কাটল বটতলায়, এক হাট লোকের সামনে। সে কী হুড়োহুড়ি করে লোকে পালিয়েছিল বাপ।
তুই তো একটা দেখিছিস। শ্ৰীমন্ত কত খুন করেছিল তার হিসেব নিজেও রাখত না। বুড়ো হয়ে যখন বয়সের কাছে জব্দ হল তখন মাঝে মাঝে খাল পেরিয়ে ওর ঘরে গিয়ে বসতাম। খুব খাতির করত। মাঝে মাঝে জিজ্ঞেস করতাম, খুন করতে কেমন লাগে? কী বলত জানিস?
কী বলত?
বলত, কেমন যেন একটা ঝাঁকুনি লাগে। কেমনতরো ঝাঁকুনি, কীসের ঝাঁকুনি তা অত ব্যাখ্যা করে বলতে পারত না। আমি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে জিজ্ঞেস করতাম, খুনের পর অনুতাপ হয় কিনা। কেমন ভ্যাবলার মতো চেয়ে থাকত। অনেক ভেবেচিন্তে বলত, না, তবে পরে কেমন ফাঁকা ফাঁকা লাগে। মায়াদয়া তো ছিল না। বুকখানা পাথর হয়ে গিয়েছিল। ওই যে ফাঁকা ফাঁকা লাগত ওইটেই ওর অনুতাপ বলে ধরে নিতে হবে। তা অত খুন করেও তো বুড়ো বয়স অবধি বেশ বেঁচেবর্তেই ছিল। ডাকাতির পয়সা দিয়ে পাকা বাড়ি, ধানী জমি সবই করেছিল। কিছু তো আটকায়নি। তুই তবে দগ্ধে মরছিস কেন? ওটা মোটে খুনই নয়। প্রাণ বাঁচাতে যা করিছিস তাতে আইনেও তো আটকায় না।
আইনে তো অনেক কথাই আছে দাদা। তা দিয়ে কি আর মনের আগুন নেভে? আজকাল কেবল ভাবি, বরং নিজে মরলেই ভাল হত। এই এতদিন বেঁচে থেকে দুনিয়ার কী উপকারটা করলুম বলুন। আর বেঁচে থাকাটাও কি মানুষের মতো হচ্ছে? গোরুছাগলের অধিক নিজেকে ভাবতেই পারি না। বড্ড গ্লানি হয়।
তা আর কী করবি! লাখো লাখো লোক তো ওরকমভাবেই বেঁচে আছে। কটা লোক আর মানুষের মতো বেঁচে আছে বল।
ওই জন্যই তো ভগবানে বিশ্বাস হতে চায় না। ভগবান বলে কিছু থাকলে কি এরকম ধারা হতে পারত, বলুন?
আজ তোকে ফিলজফিতে পেয়েছে দেখছি। কফি খাবি?
এক গাল হাসল ধীরেন কাষ্ঠ। খুশিয়াল গলায় বলল, এই একটা জব্বর কথা বলেছেন। জিনিসখানাও একেবারে মনের মতো। আগেও দু-চারবার খেয়েছি বটে, কেমন পোড়া-পোড়া গন্ধ লাগত। আপনার এখানে খেয়েই প্রথম বুঝলাম, এর সঙ্গে কেউ লাগে না।
আমারও বুড়ো বয়সের নেশা। এই শীতে শরীরটা বেশ গরম হয়।
মহিম কফি করে নিয়ে এল।
বিস্কুট খাবি সঙ্গে? দাঁড়া, দিই।
তা বিস্কুটও হল। দিব্যি মুড়মুড়ে ফুরফুরে দুখানা বিস্কুট!
এই বিস্কুটও নাতনি কলকাতা থেকে এনে দিয়েছে। ওতে নাকি চিজ আছে। তা সে বস্তু বিশেষ চেখে দেখা হয়নি। দুধের স্বাদ ঘোলে মেটাচ্ছি।
চিজের কথা খুব জানি। শুনেছি, দুধ পচিয়ে নাকি হয়। আজকাল বাঙালিরাও খুব খাচ্ছে। বাসস্ট্যান্ডের মহেশ বলছিল দোকানে নাকি পিজ্জা বানাবে। তাতে মেলা চিজ দিতে হয়।
গাঁ তো শহর হয়ে উঠল রে।
তা তো হওয়ারই কথা।
পিজ্জা খাবি নাকি? সোহাগ বলে গেছে আসছে শনিবার সব নিয়ে এসে এখানে বানিয়ে আমাকে খাওয়াবে। রোববার চলে আসিস এক ফাঁকে। তোর জন্য খানিকটা রেখে দেবোখন। নতুন খাবার, সহ্য হবে কিনা জানি না। চেখে দেখিস একটু।
আমার তো সবই ভাল লাগে। আমার বউ বলে, তোমার জিব হল লম্পট।
তা তোর একটু নোলা আছে বটে। এই সেদিন দেখলাম, হরিপদর মেয়ের বিয়েতে চারখানা রাধাবল্লভি বসান দিলি, তারপর এক কাঁড়ি পোলোয়া, খাঁসির মাংস, সাত টুকরো মাছ, দই-মিষ্টি, ওরে বাবা, এই বয়সে অত খেতে আছে গবগব করে? এখন একটু বেছে গুছে বুঝে খাবি তো!
তাই বলে বটে সবাই। কিন্তু আমার তো সবই তল হয়ে যায়। খেয়েই যদি মরি তাহলেই বা কী বলুন। স্ট্রোক হয়ে মরলেও যা পেট ফেটে মরলেও তাই। চৌকাঠ ডিঙোনো নিয়ে কথা, তা খেয়েই মরা ভাল।
মরার জন্য বড্ড ব্যস্ত দেখছি যে আজকাল। বলি তোর হলটা কী? এতকাল তো এসব বলতিস না।
আজকাল মবা নিয়ে একটু ভাবছি। মরতে যে ইচ্ছে যায় তা নয়। কত কী দেখার রয়ে গেল, বোঝার রয়ে গেল, আয়ুর অর্থটাই ঠাহর হল না, মনে একটা খিচ তো আছেই। তবে লজ্জার মাথা খেয়ে আর কতকালই বা বাঁচব বলুন। এই তো সেদিন ছোট নাতিটাও বলছিল, ও দাদু, বিশুর দাদু মরে গেল তো, তুমি মবছ না কেন?
বলল?
তা বলবে নাই বা কেন। ঠাকুমার কাছে শুনে শুনেই শিখেছে।
নাতি বলল বলেই সবার কথা ভাবছিস?
না দাদা, তা নয়। এই ভাবছি আর কী। কত কী ভাবি।
তোর চেয়ে আমিই তো বোধহয় বছর তিনেকের বড়।
তা হবে।
কফি শেষ করে উঠে পড়ল ধীরেন কাষ্ঠ। ফেরার সময় টের পেল, রাত হয়েছে। আন্দাজ নটা সোয়া নটা হবে। একে গাঁ, তায় শীতকাল। সন্ধ্যারাতেই ভারী নিঃঝুম হয়ে যায় চারদিক। রাস্তায় ভুতুড়ে কুয়াশা আর নির্জনতা। তবু বাসস্ট্যান্ডের দিকটায় এখনও লোকজন দেখা যায়, দোকানপাটও খোলা থাকে। কিন্তু গাঁয়ের ভিতরটা বড্ড সুনসান।
একটা ভাল চোখ আর একটা আবছা চোখে বুঁঝকো অন্ধকারে কুয়াশামাখা এক অলৌকিককে প্রত্যক্ষ করে ধীরেন। দিনের বেলাটা যেমন দগদগে বাস্তবতা এখন সেটাই যেন সাঁঝের পর সেজেগুজে মোহিনীবেশে চোখ ভোলাতে এসে দাঁড়িয়েছে সামনে। কুয়াশায় একটা বাড়ির ছাদটুকু শুধু ভেসে আছে, বাকিটা লোপাট, মনে হচ্ছে যেন, ভেসে থাকা বাড়ি। কালিপড়া লণ্ঠনের মতো ভাঙা একটু চাঁদ আছে আকাশে, তাকে ঠিক ঠাহর হচ্ছে না বটে, কিন্তু এই আলোটুকুই কুহক ছড়িয়ে রেখেছে চারধারে।
ধীরেন হ-হ-হ করে আপনমনে একটু হাসল। বিড়বিড় করে বলল, খুব ম্যাজিক দেখাচ্ছ বাবা! অশৈলী কাণ্ড সব।
কথাটা ঠিক যে, আজকাল সে মরা নিয়ে ভাবছে। মরার পর আত্মা বেরিয়ে আর এক দফা বেঁচে থাকে বলে কারও কারও বিশ্বাস। যদি মরার পর ফের বেঁচে থাকাই বরাতে থাকে তাহলে সেটাই বা কেমন হবে! দেহ মরলে একরকম শান্তি। কিন্তু ফের যদি আত্মা হয়ে বেঁচে থাকতে হয় তাহলে তো আবার ভজঘট্ট পাকাল। তখন আবার কেমন সব বিলিব্যবস্থা হবে, তাও ভাববার কথা। ধীরেনের সেটা খুব পছন্দ হচ্ছে না। সর্বক্ষণ সঙ্গে সঙ্গে লেগে থাকলে তো মুশকিল।
ভাবতে ভাবতে বটতলায় এসে পড়ল ধরেন। এ ভারী অপয়া জায়গা। খুব নির্জন। বটগাছটা বোধহয় দেড়শো বছরের পুরনো। চারদিকে ঝুরি নেমেছে মেলা। তলাটা বাঁধানো, শিবের থানও আছে। কিন্তু বড্ড ছমছমে জায়গা। অনেকেই এখানে ভয়-টয় পায়।
চারপাশটা তাকিয়ে দেখল ধীরেন। জায়গাটা যেন একেবারে জমাট বেঁধে নিথর হয়ে আছে। গাছের পাতাটাও নড়ছে না। আর কী ঝিঁঝির ডাক বাবা।
“ধীরেন!” বলে কেউ ডাকল নাকি? গা শিউরে উঠল হঠাৎ। হ্যাঁ, মিদ্দার ডাকে বটে। কাছাকাছি চলেও আসে। না, ভূত-টুত নয়। ধীরেন কাষ্ঠ জানে, এ হল তার নিজেরই ভিতরকার অনুতাপ। সে-ই মিদ্দার হয়ে কথা কয়। তবু গা ছম-ছম করে খুব।
ও ধীরেন, মনে পড়ে?
পড়বে না! খুব মনে পড়ে।
বিশ্বাসঘাতক, নিমকহারাম, কত বড় সর্বনাশ করেছিলি আমার! তবু দিব্যি বেঁচেবর্তে আছিস!
আমার দোষটা কোথায় বল। তোমার বউ যদি ওরকমধারা করে আমার কী দোষ? আমার তখন কাঁচা বয়স, বুদ্ধি পাকেনি, সেও এসে হামলে পড়ল। আমার কী করা উচিত ছিল বলো!
সাধু সাজছিস হারামজাদা!
তোমাকেও বলি দাদা, ওই জরাজীর্ণ শরীর, হেঁপো রুগি হয়ে অমন ডবকা মেয়েছেলেকে বিয়ে করা তোমার ঠিক হয়নি। মেয়েমানুষ তো আর ঝাপির সাপ নয় যে বন্ধ করে রাখবে।
আমি তোর গুরুর সমান। আমার বউ তোর মায়ের মতো। ঠিক কিনা!
ওসব সেকেলে সম্পর্কের কথা ছাড়ো। ওসব কি আর কেউ মানে! আর গুরু বললেই তো হবে না! হাতের কাজ শিখতে তোমার কাছে ঘুরঘুর করতুম। চাকরের অধিক খাটিয়ে মারতে, মনে আছে?
তোর যদি লজ্জা থাকত তাহলে গলায় দড়ি দিতি।
মরতে বলছ! তা বেঁচেই বা আছি কোথায়? গলায় ফাঁস দিলে তো অনেক জ্বালা জুড়িয়ে যেত গো! বেঁচে থাকার মানে কী বলল তো! শুধু দেহখানার বেঁচে থাকাটাই কি সব? বেঁচে থাকার মানে হল উপভোগ। দিনরাত কেঁদে ককিয়ে, উঞ্ছবৃত্তি করে, লাঠিঝাঁটা খেয়ে এই যে থাকা, এ বেঁচে থাকা হয় কী করে? মরেই আছি বলে ধরে নাও না কেন?
বিড়বিড় করতে করতে জায়গাটা পেরিয়ে এল ধীরেন। সামনে পান্নাদের বাড়ির আলো দেখা যাচ্ছে। আর একটু এগোলে গৌরদাদার বাড়ি। চেনা ছক, চেনা রাস্তা। তবু ভারী অচিন লাগে ধীরেনের। একটা স্পষ্ট চোখ, আর একটা আবছা চোখে কত বিভ্রম তৈরি হয়। পাপে জর্জরিত মন কত ভূতপ্রেত সৃষ্টি করে যায়। অনাবিল সত্য বলে তো কিছু নেই।
তিন দিন বাদে এক দুপুরে কাঙালি ভোজন করাচ্ছিল রসিক বাঙাল। বাসন্তীর পঞ্চামৃত আছে আজ। উপলক্ষ্য সেটাই। মহাবীর তেওয়ারিকে বর্ধমান থেকে ভাড়া করে এনেছে রসিক। খিচুড়ি, লাবড়ার তরকারি, বোঁদে আর পায়েস। ভোজের খবর পেয়ে লোক জুটেছে মেলাই। হিসেব করলে শ’ দুই তো হবেই। উঠোনের রোদে সারি সারি শালপাতার থালা নিয়ে বসে গেছে। চিল্লামিল্লি হচ্ছে খুব। এখনও পাতে খিচুড়ি পড়েনি, পড়বে পড়বে ভাব।
বারান্দায় দুখানা চেয়ারে বাঙালের পাশাপাশি ধীরেন।
রসিক বলল, ঠাইরেন আইজকাইল এই বাড়িতেই বহাল হইছে, বুঝলেননি খুড়া?
ধীরেন জানে, এ গাঁয়ে কোনও গাছের পাতা খসলেও তা রটে যেতে দেরি হয় না। নিষ্কর্মার তো অভাব নেই।
একটু হেসে ধীরেন বলল, ভালই তো। বাসন্তীর দেখাশোনা হবে।
কচু হইব। ঠাইরেনরে তো বিলাই পার করছে। আইয়া অখন খাদিমা হইয়া তো বইছে আর গজরাইতাছে।
গজরাচ্ছে কেন?
গজরাইব না! এই যে খরচাপাতি হইতাছে, অপোগণ্ডোরা আমার পয়সায় খাইয়া যাইতাছে, ঠাইরেনের তাতে গায়ে বড় জ্বালা। বোঝালেন? ঠাইবেন চায় সব পোটলা কইরা রাখতে। এই যে গরিবগুলা প্যাট ভইরা খাইব, কালা কালা শুকনা মুখগুলায় একটু ঝিলিক দেখা যাইব ঠাইরেনের বড় অপছন্দ।
খিচুড়ির গন্ধটা ছেড়েছে খুবই ভাল। বাতাস শুঁকেই ধীরেন বলে দিতে পারে খিচুড়িতে ভালরকম গাওয়া ঘি, ফুলকপি, মায় গরমমশলা অবধি পড়েছে। কাঙালিভোজনের খিচুড়িতে এত তরিবত থাকার কথা নয়। তবে বাঙালের ব্যাপারই আলাদা। সে যা করে মোক্ষম করে। গরিব বলে যারা খেতে এসেছে তারা যে সবাই একেবারে কাঙাল-ফকির তা নয়। বাদামগাছের নীচে একটু ছায়ায় ময়লা হলদে রঙের শাড়িতে ঘোমটা টেনে যে বউটা বসে আছে সে কার্তিকের বউ। বছরটাক আগেও তাদের অবস্থা খারাপ ছিল না। কার্তিক শয্যাশায়ী হল ওই স্ট্রোকে না কী যেন বলে তাইতে। অবস্থা একেবারে তরতর করে পড়তে লাগল। এখন হাঁড়ির হাল। দুটো বাচ্চা নিয়ে লজ্জার মাথা খেয়ে ওই এসে বসেছে গাছতলায়। ঘোমটায় কি আর সব ঢাকা যায়? শীতল ভট্টাচার্য যেমন, তারও কি কাঙালিভোজনে আসবার কথা! বছর ত্রিশেক আগে এই শীতল ভট্চাযই তো নেমন্তন্ন বাড়িতে গিয়ে ছাঁদা নিয়ে কত তড়পেছে। এখন ছেলের বউরা নোড়া দিয়ে বিষাদাঁত ভেঙেছে ভালরকম। বামনাই এখন খিদের আগুনে ঝলসে গেছে। ওই সেও এসে একটু ফাঁক রেখে বসে গেছে পঙ্ক্তিভোজনে। দেখলে কষ্টও হয়, ঘেন্নাও হয়।
ধীরেন বলল, বাঙাল, ওই বাদামতলার বউটা আর শীতল ভট্চায ওদের একটু ভাল করে দিতে বলে দিও। অবস্থা বিপাকে এই দশা বইতো নয়।
নিশ্চিন্ত থাকেন খুড়া, আমার বাড়িতে কারও আধাপেটা হইবো না। ঠাইস্যা খাইব সকলে।
যা আয়োজন আমারই বসে যেতে ইচ্ছে করছে।
রসিক বাঙাল দুঃখ করে বলল, আরও কিছু করার ইচ্ছা আছিল, বুঝলেন! ভাবছিলাম খাসির মাংস খাওয়ামু। কিন্তু ঠাইরেনের যা চক্ষুটাটানি তাতে আর আউগাইলাম না। বাসন্তী কইল, বেশি আয়োজন কইরো না, মায়ের অভিসম্পাত লাগব। এমনিতেই নাকি জ্বইলা পুইড়া মরতাছে।
ও মানুষ এরকম ছিল না হে বাঙাল। বড় রসের মানুষ ছিল। একসময়ে ও-বাড়িতে কত গুলতানি করেছি। বাসন্তীর বাবা ছিল বৈঠকী মানুষ, দরাজ দিল। বউঠানও ছিল ভারী মিঠে স্বভাবের। পয়সার অভাবই মানুষকে বড্ড শুষে নেয়, বুঝেছ?
মানতে পারলাম না খুড়া। লোকে কয় বটে অভাবে স্বভাব নষ্ট, কিন্তু আমি কই নষ্টের বীজ ভিতরে না থাকলে অভাব তারে টলাইতে পারে না।
খিচুড়ির কড়াই চলে এল। একটা জয়ধ্বনির মতো কোলাহল উঠল চারধারে। খিদের মুখে খাবারের চেয়ে মোক্ষম জিনিস আর কীই বা হতে পারে? পাতে ঘপাত ঘপাত খিচুড়ি পড়ছে, খিচুড়ির পাশেই বড় হাতায় এক খাবলা লাবড়া। দেওয়ার হাতটা লক্ষ করল ধীরেন। নাঃ, বড় মাপেই দিচ্ছে। বাচ্চাগুলো কি খেতে পারবে অত? নষ্ট হবে পাতে।
মোহময় গন্ধ ছড়াচ্ছে চারদিকে। মহাবীরের রান্না এ-তল্লাটে বিখ্যাত। পাঁচ-সাতশো টাকার নীচে কাজ করে না। লাবড়ার গন্ধটাও এবার পাচ্ছে ধীরেন। মনে হচ্ছে ডালের বড়ি আর ধনেপাতাও দেওয়া হয়েছে!
লাবড়ায় বড়ি পড়েছে নাকি হে বাঙাল?
তবে? বড়ি না দিলে জমবো কেমনে?
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন