শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
এবার তোর ছেলে হবে।
যাঃ, কী করে বুঝলে?
বুঝব না! সে কী রে! আমিই তো আসছি!
তুমি?
হ্যাঁ রে। জন্মাতে বড্ড ইচ্ছে যায় যে! নিরালম্ব ঘুরে বেড়াই, এ কি ভাল লাগে বল!
সত্যি বলছ?
সত্যি বলছি।
তিন সত্যি করে বললো। আমার গা ছুঁয়ে বলো।
দুর পাগল! এতে অবিশ্বাসের কী আছে? তোর ছেলে হয়ে আসতে বরাবর ইচ্ছে ছিল আমার।
আমার গর্ভ কি শুদ্ধ, পবিত্র বাবা?
কেন বল তো!
তোমার মতো মানুষ কি অপবিত্র শরীরে জন্ম নিতে পারে?
তুই অপবিত্র কেন মা?
তুমি তো জানো না বাবা, যখন আমার সতেরো বছর বয়স তখন যে আমি অপবিত্র হয়ে যাই।
জানি রে মা, জানি। পাপ-পুণ্যের হিসেব তো অত সহজ সরল নয়। দেহ ভ্রষ্ট হয়েছিল বটে, মন ভ্রষ্ট হয়নি যে! দেহ নয় মা, পাপ হল মনের। শরীর কি পাপ করে? মন তাকে যেমন করতে বলে সে তেমন করে।
তবু কেমন খুঁতখুঁত করে মনটা, ভাবি, কী দরকার ছিল ওরকম হওয়ার? কেন হল? না হলে কি পারত না?
দুনিয়ায় সব ঘটনা কি আমাদের পছন্দমতো ঘটে? দুর পাগল, তাহলে দুনিয়ায় কোনও মজা থাকত না।
কেন আমাকে নিয়েই মজা হল বলো! আমি তো কত শুদ্ধ ছিলাম, মনটাও কত সহজ সরল ছিল, লোককে টপ করে বিশ্বাস করতাম। কাউকে খারাপ বলে মনে হত না। অথচ আমার কপালেই কেন ওরকম বিচ্ছিরি কাণ্ড হল? আকাশ থেকে যেন মাটিতে আছড়ে পড়লাম। তখন আমার কী মনে হয়েছিল জানো? মনে হয়েছিল ভগবান বলেও কিছু নেই। থাকলে কেন এরকম হবে? সেই যে ঘেন্না এল লোকটার ওপর, আর ওর ছায়াটাও সহ্য হত না। এখন দেখলে মায়া হয়।
হ্যাঁ মা, একটা ভুল থেকে কত ভুলে জড়িয়ে পড়ল অমল। ওকে একটু মায়া করিস, সে ভাল। যখন ছোট্টটি ছিলি তখন থেকেই তোর বড় মায়া। আর কাউকে নয়, কিন্তু তোকেই আমি বরাবর আসকারা দিয়েছি।
হ্যাঁ বাবা, তুমি খুব আসকারা দিয়েছ আমায়। সবাই ভয় পেত তোমাকে, আমার একটুও ভয় ছিল না।
যখন হামা দিতি তখন আমি মোকদ্দমার কাগজ দেখতুম, আর তুই টেবিলের নীচে পায়ের কাছটিতে বসে খেলা করতিস। একটু যখন বড় হয়েছিস তখন কী করতিস মনে আছে? রান্নাঘরে গিয়ে যা-কিছু রান্না হত তার খানিকটা বাটি করে নিয়ে এসে আমাকে খাওয়াতিস। অসময়ে আমি কখনও কিছু খেতাম না, কিন্তু তোর পাল্লায় পড়ে খেতে হত। আরও শুনবি? বাড়ির অন্যেরা খেতে বসলে তোর ভয় হত সবাই বুঝি তোর বাবার ভাগেরটা খেয়ে ফেলবে। তাই খুব চেঁচামেচি করতি তুই, তোমরা সব খাচ্ছ যে! আমার বাবা কী খাবে তবে? তারপর কান্না জুড়তিস।
হ্যাঁ, একটু একটু মনে আছে।
তোর ছেলেই তো ছিলাম আমি। তাই ফের তোর ছেলে হয়েই আসছি।
উঃ, আনন্দে আমার বুকটা কেমন ধক্ করছে? হ্যাঁ বাবা, সত্যি তো?
সত্যি রে, খুব সত্যি।
তুমি খুব দস্যি হবে বাবা?
হয়তো হব। তা বলে মারধর করিসনি যেন!
পাগল! খুব আদর দেব তোমায়, যেমন তুমি দিয়েছ। শিগগির এসো। আমার যে তর সইছে না।
গর্ভ পূর্ণ হোক মা। অপেক্ষা করো।
এসো বাবা, এসো…
ওই এসো শব্দটা জেগে উঠে শুনতে পেল পারুল। তার নিজের গলায়। পা থেকে লেপ সরে গেছে বলে শীত করছে খুব। গায়ে কাঁটা দিচ্ছে, ধড়মড় করে উঠে বসল সে। স্বপ্ন! এ কি স্বপ্ন! কটা বাজে এখন? ডিমলাইটের আলোয় সে মস্ত দেয়ালঘড়িতে দেখল, পৌনে পাঁচ। এ ভোররাতের স্বপ্ন, এই স্বপ্ন সত্যি হয় বলে সে শুনেছে। সমস্ত শরীর জুড়ে আনন্দ যেন সেতারের মতো ঝংকার দিচ্ছে। বাবা আসবে! তার গর্ভে বাবা আসবে! এ কি সত্যি? বিশ্বাস হয় না যে!
উত্তেজনায় উঠে পড়ল পারুল। বেসিনে গিয়ে ঠান্ডা জলের ঝাপটা দিল চোখেমুখে। না, আর ঘুমোবে না সে। ঠাকুরঘরে গিয়ে ঠান্ডা মেঝের ওপর উপুড় হয়ে প্রণাম করে বলল, তাই যেন হয় ঠাকুর, তাই যেন হয়।
চোখে জল আসছে আনন্দে, আবেগে। বুকে উথলে উঠছে এক পরিপূর্ণতা। তার কি এত ভাগ্য হবে!
আর আধঘণ্টা বাদে খোলা বারান্দায় তাকে আবিষ্কার করে বলাকা অবাক।
ও মা! ও কী রে? এই চাষাড়ে শীতে বারান্দায় বসে আছিস যে বড়!
স্বপ্নাচ্ছন্ন, ঘোরলাগা দুটি অপরূপ চোখ মায়ের দিকে ফেরাল পারুল।
একটা কথা বলবে মা।
কথা পরে হবে। আগে ঘরে আয় তো শিগগির। শরীরের এই অবস্থায় ঠান্ডা লাগাতে আছে? নতুন তো মা হোসনি, তবু খেয়াল রাখিস না কেন? এ বাবা, গা তো বরফ হয়ে আছে তোর! আয় শিগগির ঘরে।
ঘরে এনে তাকে বিছানায় বসিয়ে ঢাকাচাপা দিল বলাকা।
শরীর খারাপ লাগছে নাকি?
পারুল সুন্দর করে হাসল, একটুও খারাপ নয় মা, আজ আমার শরীর ভাল, মন ভাল, আজ আমার সব ভাল।
ভাল হলেই ভাল বাছা। এ অবস্থায় শরীরের খেয়াল রাখতে হয়। মায়ের শরীর খারাপ হলে পেটের কুঁচোটারও যে ভোগান্তি হয়!
শোনো মা, খুব মন দিয়ে একটা কথা শুনে জবাব দাও।
কী কথা?
ভোরের স্বপ্ন কি সত্যি হয়?
কী স্বপ্ন দেখলি?
আগে বলো।
শুনি তো সত্যি হয়। কিন্তু জোর দিয়ে বলি কী করে? লোকে তো কত কথাই বলে, তার কতক ফলে, কতক ফলেও না। স্বপ্ন দেখেছিস বুঝি? ভাল স্বপ্ন তো?
ভাল না হলে বলছি! আজ আমার আকাশে উড়তে ইচ্ছে করছে।
ভাল হলে কাউকে বলিস না, বললে নাকি ফলে না।
ও বাবা, এ এত ভাল স্বপ্ন যে না বললে আমার বুক ফেটে যাবে।
তাই নাকি? তাহলে টাপটোপে বল। খুলে বলিসনি।
মায়ের কাছে নাকি সব বলা যায়! মাকে বললে দোষ হয় না, জানো না?
তাহলে দাঁড়া ঠাকুরঘরের বাসি কাজ সেরে নিই আগে। নইলে দেরি হয়ে যাবে।
তুমি বড্ড বেরসিক। শোননা, আমার খুব খিদেও পেয়েছে। তাড়াতাড়ি পুজো সেরে আমাকে খেতে দাও তো!
ও মা গো! আজ কোন দিক দিয়ে সুয্যি উঠবে কে জানে? খিদের কথা শুনে তো বিশ্বাস হয় না।
খাব মা, দেখো খুব খাব আজ।
তাহলে দুখুরিটাকে তুলে দিই। একটু ময়দা মাখুক। খেয়ে আবার উগরে দিও না কিন্তু।
মিষ্টি হেসে পারুল বলে, আজ কিচ্ছু হবে না, দেখো। আজ আমার কিচ্ছু হবে না।
তাই যেন হয়। মহিম ঠাকুরপো যে হোমিওপ্যাথি ওষুধ দিয়ে গেছে তার চারটে বড়ি মুখে ফেলে বসে থাক না।
আজ আমার ওষুধ লাগবে না মা। আমি আজ খুব ভাল আছি।
কী জানি মা, ভয় করে। পেটে কুটো গাছটিও থাকছে না বলে দুশ্চিন্তায় আমার ঘুম হয় না।
আর ভয় নেই মা। আমার পেটে কে আসছে জানো?
বলাকা অবাক হয়ে বলে, পেটে কে আসছে মানে? হিটলার নাকি?
পারুল মিষ্টি হেসে বলে, তাকে অনেকে হিটলারও বলত মা। বলো তো কে?
কী জানি বাবা, সকালে উঠে হেঁয়ালি করতে লেগেছিস।
তার টকটকে ফর্সা রং, ইয়া তাগড়াই চেহারা, চোমড়ানো গোঁফ, পুরুষ সিংহের মতো বুকের পাটা। কে বলো তো? চিনতে পারছ না?
বলাকা বিহুল চোখে মেয়ের দিকে চেয়ে রইল কিছুক্ষণ। তারপর মৃদু গলায় বলল, কার কথা বলছিস? তোর বাবা?
দুহাতে মাকে জাপটে ধরে বুকে মাথা ঘষতে ঘষতে পারুল বলল, বাবা গো, বাবা!
তাকেই স্বপ্নে দেখেছিস?
স্বপ্ন কী গো! এই যেমন তোমাকে দেখছি ঠিক সেরকম স্পষ্ট, জীবন্ত, ইজিচেয়ারটায় বসে আছে, আমি পায়ের কাছটিতে।
আমি কেন দেখি না রে! কী বলল তোকে?
পরিষ্কার বলল, আমি তোর গর্ভে আসছি, ছেলে হয়ে।
যাঃ! সত্যি?
এই দেখ, গায়ে কাঁটা দিচ্ছে।
বলাকা পারুলের মুখটা বুকে চেপে ধরে মাথায় হাত বুলিয়ে বলল, তা আসবে না কেন? তুই ছিলি মানুষটার প্রাণ, তা বলে একচোখে ছিল না মোটেই। সব কটা ছেলেমেয়েকেই ভারী ভালবাসত। কিন্তু আসকারা দিত তোকে।
কত কথা হল বাবার সঙ্গে! কত পুরনো কথা!
বলাকার চোখে জল এসেছিল। ধরা গলায় বলল, কত ভাগ্যি তোর!
হ্যাঁ মা, আজ মনে হচ্ছে আমার বড় ভাগ্য।
আমারই পোড়া কপাল। রোজ ঘুমোনোর আগে তাকে বলি, ওগো, চোখের আড়ালে গেছ, আজ একবার স্বপ্নে দেখা দিও। কিন্তু একদিনও দেখি না তাকে। কত কথা জমে আছে বুকের মধ্যে। ইচ্ছে যায় মুখোমুখি বসে দুটো কথা কই, তা যাই হোক, তুই তো দেখলি! কেমন দেখলি তাকে? রোগা হয়ে যায়নি তো! মুখখানা তেমনি ঢলঢলে আছে? গায়ে রংটা তেমনি আছে?
সব ঠিক আছে মা।
মনে মনে আমারও কতবার ইচ্ছে হয়েছে মানুষটা কোনও না কোনওভাবে ফের ফিরে আসুক, তোদের কারও ঘরে। তারপর ভেবেছি, তোরা সব বড় হয়ে গেছিস, এ বয়সে আর কি কারও ছেলেপুলে হওয়ার কথা! মনটা ভেঙে যেত। আজ বুকটা খুব হালকা লাগছে। এখন আর মরতেও ইচ্ছে করছে না। ঠাকুরকে গিয়ে বলি, যতদিন না ছেলেটা হয় ততদিন আমাকে বাঁচিয়ে রেখো ঠাকুর।
মরার কথা বোলো না তো! এমন একটা সুন্দর সকালে এসব বলতে নেই।
না মা, মরার কথা নয়, বাঁচার কথাই তো বলছি। বাঁচতে কি ইচ্ছে যায় না, বল তো। কিন্তু বাঁচতে হলে এমন একজনকে চাই যার জন্য বেঁচে থাকার একটা মানে হয়। তোর বাবা গিয়ে অবধি সেইটেই হারিয়ে গিয়েছিল।
আমার ভীষণ খিদে পেয়েছে মা। শিগগির গিয়ে পুজো সেরে লুচি-টুচি ভাজতে বলে দাও। আর নতুন আলু দিয়ে পাঁচ ফোড়নের একটা চচ্চড়ি।
বলাকা চলে যাওয়ার পর গায়ে আলোয়ান জড়িয়ে ফের বারান্দার কোণে এসে দাঁড়ায় পারুল। পুব দিকটা এখান থেকে দেখা যায়। সামনে বাঁশঝাড় আর একটা দোতলা বাড়ির ফাঁক দিয়ে সূর্য ওঠে। এখানে দাঁড়িয়েই তার বাবা রোজ সকালে সূর্য প্রণাম করত। আজ পারুলও করল। তারপর হঠাৎ আপনমনেই হেসে ফেলল।
সে একজন বেশ লেখাপড়া জানা মেয়ে, এম এ পাস। সে কম্পিউটার-শিক্ষিত। সে একটা কারখানা চালানোর প্রায় সব কলাকৌশলই জানে। আধুনিক পৃথিবীর মোটামুটি সব খবরই সে রাখে। মুক্ত নারী, তার কোনও কুসংস্কার বা অন্ধ বিশ্বাস থাকার কথা নয়। তার মনের একটা সত্তা এই স্বপ্ন-দেখার ভিতরে কোনও সত্যকে স্বীকার করে না। আবার দ্বিতীয় আর একটা সত্তা দুহাতে আঁকড়ে ধরতে চাইছে ওই অন্ধ বিশ্বাসকে। বাবা আসছে, আমার গর্ভে বাবা আসছে। বাবাই যে আসছে তার কোনও যুক্তিসংগত প্রমাণ কখনও পাওয়া যাবে না, জানে পারুল। অন্ধ বিশ্বাসই হবে একমাত্র সম্বল। এই নিষ্ঠুর সত্যকেও সে এড়াতে পারে না। আর এই দোলাচল নিয়েই রচিত হয় মানুষের অদ্ভুত মনোভূমি।
না, আজ সে অবিশ্বাস করবে না। আজ সে একজন গ্রাম্য অশিক্ষিত কুসংস্কারাচ্ছন্ন চাষি বউয়ের মতো বিশ্বাসটা করবে ভোরের ওই স্বপ্নকে। ওই অন্ধ বিশ্বাসই আজ তার বড় দরকার। সে তাই আজ সূর্যের কাছে প্রার্থনা করল, ভুলিয়ে দাও, যা শিখেছি, যা বুঝেছি তা ভুলিয়ে দাও, বিশ্বাস করতে দাও আমার ভোরের স্বপ্নকে….।
ওই বাঙালি এসে বসেছে পশ্চিমের দাওয়ায়। পাশে দিশি বিস্কুটের টিন। রোদে ডগোমগো উঠোনে বসে আছে নেড়ি কুকুর আর তিনিটে কুশি কুশি ছানা। বাঙালি খইনি টিপছে মন দিয়ে। তার কোনও তাড়া নেই। দুখুরির মাস-মাইনেটা হাত পেতে নিয়ে যায় প্রতি মাসকাবারে।
আজ বলাকা বলল, হ্যাঁ রে বাঙালি, তুই যে ফি মাসে এসে দুখুরির মাইনে নিয়ে যাস তারপর তা পেটায় নমঃ করিস, তা মেয়েটার তো আখের দেখতে হবে। আমি ভাবি ওর নামে পোস্ট অফিসে কিছু কিছু করে রাখলে তো ওরও সুবিধে, তোরও সুবিধে। ওর বিয়ের সময়ে তাহলে আর তোকে হাত পাততে হবে না, ধারকর্জও করতে হবে না।
বাঙালি শশব্যস্তে বলে, উও বাত তো ঠিক আছে মাতাজি। এখুন কিছু মুসিবাত হচ্ছে, দু-চার মাহিনাকে বাদ আপনি ডাকঘরে রেখে দিবেন।
কেন রে, তোকে যে দোকান করার টাকা দিলুম তার কী করলি? দোকানটা নিসনি?
হ্যাঁ, হ্যাঁ জরুর, দুকান তো লিয়েছি মাতাজি!
তা তোর কি দোকানে লোকসান যাচ্ছে?
নুকসান তো যাবেই মা। ভুজিয়ার দুকান তো এখানে ভাল চলে না। বর্ধমান হলে চলত।
নাঃ। তোকে দিয়ে কিছু হবে না দেখছি। মেয়েটাকে পথে বসাবি।
আর দু-চার মাহিনা বাদ সব ঠিক হয়ে যাবে মা।
দুর মুখপোড়া! সেই কবে থেকে শুনছি দু-চার মাস বাদে সব ঠিক হয়ে যাবে। তোর নতুন বউটার পিছনে ঢালছিস বুঝি সব কিছু? তা মা-মরা মেয়েটার কথাও তো ভাববি! ভালমানুষের মতো মুখ করে ওর মাইনের টাকাটা নিয়ে যাচ্ছিস, ওর তো কিছু জমছে না। এবার এসেছিস, টাকা নিয়ে যা। এর পরের মাস থেকে কিন্তু আর পুরো টাকা দেব না। পোস্ট অফিসে জমা করব। বুঝলি?
বাঙালি ভারী লাজুক ভঙ্গিতে বসে মাথা চুলকায়। মুখে একটু ক্যাবলা হাসি।
বলাকা রাগ করে বলে, তুই তো জন্ম দিয়েই খালাস, নামে মাত্র বাপ৷ মেয়েটাকে তো কোলেপিঠেও করিসনি বোধ হয়। বউ মরতেই আর একটা বিয়ে করে এনেছিস। ধন্যি বাপ তুই! মেয়েটা তো বাপকে দেখলে যেন ভূত দেখে।
বাঙালি লজ্জা পেয়ে বলে, আমার মুচ আছে তো মা, দুখারি মুচকে খুব ডরায়, উসি লিয়ে উ আমার পাশ আসে না।
আহা, বাপের গোঁফ থাকলে মেয়ে ভয় পায় জন্মে শুনিনি বাবা। হ্যাঁ রে পারুল, তোর বাপেরও তো গোঁফ ছিল, তার জন্য কি তোরা ভয় পেতি? মুখপোড়ার কথা শোন।
পারুল উঠোনে বলাকার পাশে রোদে বসেছিল। আজ ভারী আনমনা সে। কথাবার্তা কিছুই কানে যাচ্ছিল না তার। ভারী বিভোর হয়ে আছে নিজের মধ্যে। ডাক শুনে গভীর অন্যমনস্কতা থেকে বলল, উঁ!
বলাকা ফের বাঙালির সঙ্গে কথা ফেঁদে বসে। পারুল ফিরে যায় তার অন্যমনস্কতায়। তার পেটের ভিতরে এক দিব্য পুরুষ। এই পৃথিবীর কিছুই আজ তাকে স্পর্শ করছে না।
হ্যাঁ রে, জ্যোতিপ্রকাশ কখন আসবে?
ফের যেন গভীর অতল থেকে বাস্তবে উঠে আসতে হয় পারুলকে। বড় কষ্ট হয়।
কী বলছ মা?
বলি জামাই আসবে কখন?
টাটা থেকে সকালে রওনা হবে। পৌছতে দুপুর গড়িয়ে যাবে মনে হয়।
কালকেই তো রওনা হয়ে যাবি! বাড়িটা ফাঁকা হয়ে যাবে।
পারুল একটু হাসল, তোমার কি ফাঁকা লাগে মা? তুমি যেদিকে তাকাও সেদিকেই তো বাবাকে দেখতে পাও, তাই না?
তা পাই। তা বলে কি তোরা আমার কিছু নয় নাকি?
মাঝে মাঝে আমার মনে হয়, আমরা সত্যিই তোমার কাছে কিছু নয়। বাবাই তোমার সব।
তোদের মধ্যেও তো তোর বাবাই জন্ম নিয়েছে। নইলে জায়া বলেছে কেন? বাপ তার ছেলেপুলের ভিতরে দিয়ে ফের জন্মায় বলেই না তার ছেলেপুলের মা হল তার জায়া।
তবু স্বীকার করবে না যে তুমি বাবাকে আমাদের চেয়ে বেশি ভালবাসতে?
বলাকা হাসে, ভালবাসার কমবেশি কি বোঝা যায় রে, নাকি মাপা যায়? কাকে ফেলে কাকে রাখি বল তো! তোরা যে কে কার চেয়ে কম তা কি ঠিক বুঝতে পারি? সকলের জন্যই বুক টনটন করে।
দেখলে তো মা, আজ আমার বমি হল না।
রোসো বাছা, সবে খেয়েছ। এখনও সময় যায়নি। বেশি বাহাদুরি করতে হবে না। আগে খাবারটা তল হোক তারপর বোঝা যাবে।
আর হবে না মা। দেখো, সব ঠিক হয়ে যাবে।
বলাকা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
আজ আমাকে একটু বাবার কথা বলো তো মা। খুব শুনতে ইচ্ছে করছে।
ওরে, ঝাঁপি খুলে বসলে কথায় কথায় বেলা হয়ে যাবে। কত শুনবি?
তা হোক, একটু বলো।
তোরা বলিস আমি নাকি একচোখো, শুধু ওই মানুষটার ওপরেই নাকি আমার যত টান। কিন্তু আমরা তো এখনকার মতো ঢলাঢলি করিনি কখনও। দুজনে যেন কুলি আর কামিন। সংসার গড়ে তুলতে দুজনেই মনেপ্রাণে খেটে গেছি। তখন শ্বশুর শাশুড়ি ছিল, দেওর ননদরা ছিল। মস্ত সংসার। দিনমানে তো স্বামী-স্ত্রীর দেখাই হত না। সংসারের নানা কাজে জড়িয়েমড়িয়ে থাকতুম। কিন্তু সবসময়ে মনটা সজাগ থাকত ওই মানুষটার জন্য।
ওরকম হ্যান্ডসাম পুরুষ তুমি আর দেখেছ?
দুর বোকা! হ্যান্ডসাম বলেই কি আর ভালবাসতুম? দেখতে কুৎসিত হলেও অন্যরকম হত না। তার রূপটা চোখ টানে ঠিকই, কিন্তু মেয়েরা যাকে পায় তাকে ঘিরেই লতিয়ে উঠতে চায়। ওইটেই তো মেয়েদের স্বভাব। সেই স্বভাবকে এখনকার মেয়েরা জলে ভাসিয়ে দিয়ে অন্যরকম হতে চায় বলেই তো এত অশান্তি।
বাবা তোমার জন্য কেমন অস্থির হত বলো।
না বাপু, তার আদিখ্যেতা ছিল না। যখন দশ বছরেরটি এসেছিলুম, তখন তো সে ছিল বাপ- দাদার মতো একজন। বয়স্ক, গম্ভীর, সবসময়ে আগলে রাখত। যখন বড় হয়েছি তখন হল অন্যরকম। আমার ওপর খুব নির্ভর করত। যা বেঁধে দিতুম তাই খেত, টু শব্দটি করত না। কাজকর্মে ভুল হলে মাথায় হাত বুলিয়ে নরমভাবে বুঝিয়ে দিত। তার মুখ থেকে যে কথা বেরোত তাই আমার মনে হত বেদবাক্য।
কখনও ঝগড়া হয়নি তোমাদের, না?
না বাপু, ঝগড়া কাকে বলে তা জানতুম না। মতের অমিল হলে দুজনে বসে কথা কয়ে কয়ে সব ঠিক করে নিতুম। যারা বলে সে অত্যাচারী পুরুষ ছিল তাদের মুখে আগুন। তারা তার হাঁকডাকটা দেখত। তার বুকের ভিতরটা তো আর দেখতে পেত না।
কথায় বাধা পড়ে গেল। দুখুরি এসে বলল, ও মা, তুমি বসে আছ যে! বামুন ঠাকুর বলে পাঠাল, কী রান্না হবে তার জোগাড়যন্তর হয়নি এখনও।
বলাকা বলে, তাড়া কীসের? যাচ্ছি বল গে। হ্যাঁ রে দুখুরি, তোর বাপটা কখন থেকে এসে বসে আছে, একবার সামনে আসিস না কেন? ওরও তো মেয়েকে একটু চোখের দেখা দেখতে ইচ্ছে করে।
ইল্লি! আমার জন্য মোটেই আসে না, টাকার জন্য আসে।
ছিঃ, ওরকম বলতে নেই। ও গরিব মানুষ, টাকা তো লাগবেই। তা বলে ওরকম তুচ্ছতাচ্ছিল্য করবি? তুই কী রে?
চাপা গলায় দুখুরি বলে, গায়ে ঘামের গন্ধ যে! খইনি খায়, এ মা! ঝাঁটার মতো গোঁফ।
ও মাঃ তাতে কী হল! তবু তো বাপ! যা না একটু কাছে গিয়ে দাঁড়া, খুশি হবে খন।
ইল্লি। ও আমি পারব না।
ছিঃ মা। ওরকম করতে নেই। লোকটা দুঃখ পাবে। যা একটু কাছে।
গিয়ে কী করব?
একটা পেন্নাম কর।
দুখুরি ভারী লজ্জা-লজ্জা ভাব করে বলে, পেন্নাম করিনি তো কখনও।
আজ কর। বাবাকে পেন্নাম করতে হয়। যা।
দুখুরি একটু গুম হয়ে থেকে তারপর খুব অনিচ্ছের সঙ্গে গিয়ে বাপের সামনে দাঁড়াল।
বাঙালির মুখখানায় ভারী বোকা একটা হাসি ফুটে উঠল হঠাৎ।
দুখুরি, তু তো বড় হয়ে গেছিস!
দুখুরি খপ করে নিচু হয়ে পায়ের ধুলো নিতেই বাঙালি দুহাতে আঁকড়ে ধরল তাকে। তারপর হঠাৎ হাউমাউ করে কেঁদে ফেলল।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন