শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
পুরনো কৌটো-বাউটো ডাঁই হয়ে জমে আছে খাটের তলায়, তাকে, রান্না আর ভাঁড়ারঘরে। মায়াবশে কিছুই ফেলা হয়নি তেমন। কত কৌটো বহুকাল খোলাই হয়নি। কী আছে তার মধ্যে কে জানে বাবা। আমসি, শুকনো কুল, ত্রিফলা কি গোলমরিচ। কৌটোগুলো বিদেয় না করলেই নয়। খাটের নীচে মশার আড্ডা হয়েছে, পোকামাকড় বেড়েছে, ইঁদুরের খুটখাট বাড়ছে, বাড়ির বেড়ালটা এই নিয়ে তিনবার প্রসব করল বলাকার খাটের তলায়।
দুপুরে খাওয়া-দাওয়ার পাট চুকলে বলাকা কৌটো নিয়ে পড়লেন। তা শ’ দেড় দুই তো হবেই। নানা মাপ, নানা আকৃতির সব কৌটো, দু-চারটে সেই ইংরেজ আমলের জিনিসও আছে।
পুরনো, ভুলে-যাওয়া কৌটো খোলার মধ্যে একটি রহস্যরোমাঞ্চ আছে। কোন কৌটো থেকে কী বেরিয়ে পড়ে তা কে জানে! একবার একটা ওভালটিনের পুরনো কৌটোর মধ্যে হঠাৎ একছড়া সোনার হার পেয়েছিলেন বলাকা। বোধহয় কোনও কাজের মেয়ে চুরি করে লুকিয়ে রেখেছিল, কিন্তু নেওয়ার সময় পায়নি। সেই হারছড়া ছিল তাঁর মেজো জায়ের। পেয়ে সে কী আনন্দ!
দুখুরি কৌটো টেনে আনছে আর বলাকা একটা চ্যাপটা চাবির মুখ দিয়ে ভুটভাট শব্দে কৌটো খুলছেন। বেরোচ্ছেও জিনিস অনেক। একটা হালকা কৌটো না খুলেই বাতিল করতে গিয়ে কী ভেবে খুলে দেখলেন তার মধ্যে ঠাসা তেজপাতা। কবেকার কে জানে! আর একটা হালকা কৌটো থেকে তিনটে বঁধুলের ছোবড়া বেরোল। শ্বশুর-শাশুড়ি আর তিন ভাইয়ের যৌথ সংসারেই জমেছিল এসব। কিছু জায়েরা নিয়ে গেছে, কিছু পড়ে আছে।
ভাগাভাগির ব্যাপারটা কখনও ভাল চোখে দেখেননি বলাকা। গৌরহরি যখন তাঁর দুই ভাইয়ের অংশ বিপুল দামে কিনে নিয়েছিলেন তখন বলাকা রাগ না করে খুব আদুরে গলাতেই বলেছিলেন, ওগো, এত বড় বাড়ি দিয়ে আমরা কী করব? শ্বশুরমশাই তিন ছেলের জন্য তিনটে দালান করে গেছেন, আমাদের তো অকুলান হচ্ছিল না!
ভাইয়ে ভাইয়ে একটু তফাত থাকলে সম্পর্কটা ভাল থাকে।
সম্পর্ক কি খারাপ হচ্ছিল? কিছু তো বুঝতে পারিনি। বেশ তো ভাবসাবই ছিল সকলের।
তা ঠিক বলাই। বাইরের সম্পর্ক ভালই ছিল। কিন্তু হঠাৎ আমার রোজগারপাতি বেড়ে যেতে লাগল। তখন মনে হচ্ছিল শিবে আর রেমো কেমন যেন মুখ গোমড়া করে থাকছে। হয়তো হিংসে হতে লেগেছে। কাছাকাছি থাকলে ক্রমে ক্রমে ওটা বেড়ে যেত। তাই গোড়া মেরে রাখলুম।
কিন্তু মেয়েদের বিয়ে হয়ে গেছে, ছেলেরা বাইরে থাকে, এত বড় বাড়িটা খাঁ-খাঁ করে যে গো!
অভ্যেস হয়ে যাবে বলাই, ধৈর্য ধরো।
খেয়ালি পুরুষটির সব সিদ্ধান্তের উচিত-অনুচিত আজও বুঝতে পারেন না বলাকা। মন মানতে চায়নি তবু গৌরহরি যা বলেছেন তা বরাবরই মেনে নিয়েছেন বলাকা। মানুষটা তাঁর চেয়ে পনেরো বছরের বড়, ইয়ারবন্ধু তো নয়। বরং যেন খানিকটা বাবার মতোই এক অভিভাবক।
পুরনো কৌটোর অন্ধকারে সেকেলে বাতাস জমে আছে আজও। মুখ খুললেই ভ্যাপসামতো গন্ধ। বলাকার বেশ লাগে। কত বছরের সঞ্চিত বাতাস তার মুখে এসে লাগে। গা সিরসির করে।
কৌটোয় কী খুঁজছ মা? পয়সা?
বলাকা হেসে ফেলেন, হ্যাঁ, পয়সাই খুঁজছি। পেলে তোকে দেব।
আমি সারা বাড়িতে কত পয়সা কুড়িয়ে পাই জান? সব একটা কৌটোয় জমিয়ে রেখেছি। ঝাঁট দিতে গেলেই পয়সা পাই।
স্মিতমুখে বলাকা বলেন, পয়সা জমিয়ে কী করবি?
তোমাকে একটা জিনিস কিনে দেব।
ওমা! আমাকে আবার কী জিনিস দিবি রে?
পয়সা জমিয়ে তোমাকে একটা মহাভারত কিনে দেব। সেদিন যে বলছিলে তোমার মহাভারতখানা কে যেন নিয়ে গিয়ে আর ফেরত দেয়নি!
ও বাবা! তাও মনে রেখেছিস! দিতে যে চেয়েছিস সেই ঢের। ওতেই তোর দেওয়া হয়েছে।
একটা কৌটোর মধ্যে কিছু খুচরো পয়সা পেলেন বলাকা। কেউ বোধহয় জমাতে শুরু করেছিল, বেশি পারেনি। মোট পাঁচ টাকা চল্লিশ পয়সা। বলাকা পয়সাটা দুখুরির হাতে দিয়ে বললেন, তোর কৌটোয় জমিয়ে রাখিস।
নীচের উঠোনে নিত্যানন্দ বসে আছে। সঙ্গে দুই ছেলে আর পাঁচখানা বস্তা।
দুখুরি বারান্দায় গিয়ে ডাক দিল, এসো গো, কৌটো নেবে যে!
নিত্যানন্দ ওপরে উঠে এল।
বলাকা বললেন, এই নে বাবা, কতগুলো জমেছে দেখ।
নিত্যানন্দ কাঁচুমাচু হয়ে বলে, ওসব পুরনো কৌটো মা, দশ-বিশ পয়সাতেও বিকোবে না।
দুর মুখপোড়া! তোর কাছে পয়সা কে চেয়েছে। এগুলো বিদেয় কর আগে। পয়সা লাগবে না।
নিত্যানন্দ একগাল হাসল। তারপর ছেলেদের ডেকে নিয়ে টপাটপ বস্তায় কৌটো ভরতে লাগল।
কৌটোগুলো বিদেয় হওয়ায় খাটের তলায় এখন হাওয়াবাতাস খেলছে, ঘরটাও হালকা দেখাচ্ছে।
বলাকা ঘরের আলমারি আর আসবাবগুলো দেখছিলেন। তাঁর এত লাগে না। ধীরে ধীরে বাহুল্য জিনিসগুলো বিদেয় করে দেবেন। জিনিস বিক্রি করা খুব অপছন্দ করতেন গৌরহরি। বলাকা বিক্রি করবেন না। বিলিয়ে দেবেন। তবে তার আগে ছেলেমেয়েদের মতামত নিতে হবে। ওরা যদি চায় তো ভাল, নইলে নেওয়ার লোক মেলা পাওয়া যাবে।
তুমি কি বাঁধন কাটতে চাইছ মা?
বলাকা হেসে বললেন, আমাকে নিয়ে তোর এত ভয় কেন বল তো পারুল?
পারুল মাকে জড়িয়ে ধরে বলে, তোমার হাবভাব আমার মোটেই ভাল লাগে না। এবার তোমাকে আমি জামশেদপুর নিয়ে যাবই। চোখের আড়ালে তুমি কী করে বসবে তার ঠিক নেই।
ও কথা বলছিস কেন? আমি তো বেশ আছি।
তুমি যেন কেমন উদাসী হয়ে গেছ।
দুর পাগল! উদাসী হওয়ার কি জো আছে? তোর বাবা চলে যাওয়ার পর দুনিয়াটা কেমন পানসে হয়ে গিয়েছিল ঠিকই, মনে হত বেশিদিন বাঁচব না।
তুমি বাবার সঙ্গে সহমরণে যেতে চেয়েছিলে মা। আমার সব মনে আছে।
বলাকা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, সে আর তোরা যেতে দিলি কই? গেলেই যে বাঁচতুম। তাকে ছাড়া যে বেঁচে থাকা কী কঠিন তোরা বুঝবি না।
খুব বুঝি মা। আর বুঝি বলেই ভয় পাই। সংসার থেকে তুমি যেন তোমার মন গুটিয়ে নিচ্ছ।
পারুলের মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে বলাকা বলেন, তা যদি পারতুম তাহলে তো ভালই হত। মন তুলে নিই সাধ্যি কি? ওই যে দুখুরি— ওটার জন্য নতুন করে মায়ার বাঁধনে পড়লুম, গোরু, কুকুর, বেড়াল, এই বাড়ি, কাজের লোকেরা কার জন্য মায়া না করে পারি বল? মন তুলে নেওয়া কি সোজা কথা? আর তোর বাবার আক্কেল দেখ, এত বড় একখানা বাড়ি আমার ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়ে গেছে। তাও দেওররা, জায়েরা থাকলে একটু জনমনিয্যি থাকত। সারাদিন এই বিশাল বাড়িটায় থাকা কি সোজা?
তাই তো বলি আমার কাছে চলো।
এ-জায়গা ছেড়ে দুনিয়ার আর কোথাও গিয়ে থাকতে মন চায় না। শীতকালে গিয়ে দু-চারদিন থেকে আসবখন।
বলাকাকে নিয়ে যেতে চায় সবাই। তারা ভাবে, এখানে একা পড়ে থাকা মায়ের পক্ষে কষ্টকর। কিন্তু সেটা ওদের দিক থেকে ভাবা। বলাকার দিক থেকে ভাবনা অন্যরকম।
এই যে দুধের মতো সাদা গোরু আলো। দুখানা মায়াবি চোখ দিয়ে যখন চেয়ে থাকে বুকটা উথলে ওঠে। গৌরহরির প্রিয় এই গোরুটা এমন ভালবাসত তাকে যে গৌরহরি এসে গায়ে হাত দিয়ে না দাঁড়ালে দুধ ছাড়তে চাইত না। গৌরহরি চলে যাওয়ার পর কী বুঝল কে জানে, খুব ডাকত সারা দিন। দুখানা চোখ যেন টলটল করত। অবোলা জীবের সেই শোক যেন বলাকাকেও আচ্ছন্ন করেছিল। বলাকা গিয়ে রোজ আলোর গলায় মাথায় হাত বোলাতেন। মানুষের ভাষায় কত কথা বলতেন। গোরুর তা বুঝতে পারার কথা নয়। কিন্তু যেন বলাকার মনে হত আলো সব বুঝতে পারছে। ধীরে ধীরে যেন আলোর শোক কমে গেল। বলাকা নতুন মায়ার বন্ধনে পড়লেন। আসলে নতুন নয়, গৌরহরির প্রিয় যা-কিছু সেগুলিকে ভালবেসে যেন গৌরহরির অস্তিত্বই ফের খুঁজে পান বলাকা। আজকাল তাঁর মনে হয়, না, মানুষ অত সহজে মরে না। মরার পরও তার কত কী থেকে যায়। অস্তিত্ব কি শুধু দেহটাতে? তার সত্তাও যে ছড়িয়ে থাকে কত কিছুর মধ্যে!
এসব গূঢ় সত্য সবাই কি বুঝতে পারে? ছেলে-মেয়েরা ভাবে মা বড় একা। ওটা একপেশে দেখা। গৌরহরি যেদিন চলে গেলেন সেদিন তাঁর সঙ্গে বলাকারও চলে যেতে ইচ্ছে হয়েছিল ঠিকই। কিন্তু তার পর ধীরে ধীরে তিনি ফের নানা অনুষঙ্গে ফিরে পাচ্ছেন গৌরহরিকে। এখন তাঁর একাকিত্ব তত তীব্র নয়।
ওই যে স্টিলের আলমারিটা, ওটা নিবি পারুল? তোর বাবা বোম্বে থেকে অর্ডার দিয়ে আনিয়েছিল। সিকিম জিনিস, এত দিনেও একটুও রং চটেনি।
পারুল হেসে বলে, থাক না মা এসব তোমার কাছে। যেখানে যা আছে সব একইরকম থাক। তাহলে বাড়িতে এসে অচেনা ঠেকবে না কিন্তু, ছেলেবেলাটা ফিরে আসবে। না মা, তুমি সব বিলিয়ে দেওয়ার মতলব ছাড়।
কী ভাবি জানিস? আমি পট করে মরে গেলে—
নরম হাতে বলাকার মুখ চাপা দিয়ে পারুল বলে, জানি তুমি মরার জন্য পা বাড়িয়েই আছ। ওসব চিন্তা কর বলেই সারাক্ষণ তোমার জন্য আমার ভাবনা হয়। মরতে চাও কেন মা? বাবা নেই বলে? আর এই যে আমরা আছি আমরা কি বাবার অংশ নই? পিতা তো জায়ার ভিতর দিয়েই ফের জন্মায় সন্তান হয়ে। জান?
মরতে চাই কে বলল? তা নয় মা, আসলে আট-দশটা আলমারি, বাক্স- প্যাঁটরা সবই প্রায় ফাঁকা হয়ে গেছে। এগুলো পড়ে থেকে—
থাক মা, পড়েই থাক।
বলাকা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, নিলে তোদের ভোগে লাগত।
এখনও ভোগেই লাগছে। এই যে বাড়িতে এলে বাক্স-প্যাঁটরা, আলমারি, খাট-পালঙ্ক দেখতে পাই তাতেই মনটা আনন্দে ভরে ওঠে। সেটা কি উপভোগ নয়? ভোগ মানে কি আলমারিটাতে ঠেসে জিনিসপত্র ভরে রাখা?
বলাকা হার মানলেন।
সারা বাড়িতে এখন আনন্দের হাট। মেয়ে-জামাই, ছেলে-বউমা, নাতি-নাতনি মিলে সারাদিন আড্ডা হচ্ছে, বেড়াতে যাওয়া হচ্ছে, পিকনিকেরও তোড়জোড় চলছে। বলাকা দূর থেকে এসব খুব উপভোগ করেন। বড় একটা ওদের মধ্যে গিয়ে পড়েন না। তাতে বোধহয় তাল কেটে যায়। ওদের একটা বয়সের বন্ধুত্ব আছে, সেখানে গুরুজনদের গিয়ে হুট করে ঢুকতে নেই। ডাকলে আলাদা কথা।
আজ সকালে দুটো ভাড়া করা গাড়িতে বোঝাই হয়ে ওরা কাটোয়ার দিকে কোথায় যেন পিকনিকে গেল। বলাকাকেও টানাটানি করেছিল, বলাকা যাননি। তবে দুখুরিটাকে পাঠিয়েছেন। বেচারা সারাদিন তো তাঁর কাছেই পড়ে থাকে, যাক আজ একটু আনন্দ করে আসুক।
দুপুরবেলা চুপিসাড়ে মেয়েটা এল। ঠিক চোরের মতো। মুখে একটু ভয় মেশানো হাসি। পরনে সেই ঝ্যালঝ্যাল পোশাক। সাজগোজের বালাই নেই।
বলাকা দুপুরে ঘুমোন না। সারা বাড়ি ঘুরে ঘুরে টুকটাক কাজ করেন। কাজ না পেলে শুধুই ঘুরে বেড়ান বা বই পড়েন। একা থাকা তাঁর অভ্যাস হয়ে যাচ্ছে।
দুপুরে আজ বলাকা উঠোনে চাটাই পেতে শীতের লেপ—কম্বল রোদে দিয়েছেন। কাক-টাক যাতে এসে বসতে না পারে তার জন্য হাতে গৌরহরির হাতির দাঁতের হাতলওয়ালা লাঠিটা নিয়ে বসে আছেন। কাক-শালিক এসে কাছাকাছি হুটোপাটি করলেই বলছেন, হুশ্।
এ-বাড়ির কাক-শালিকগুলোও তাঁর চেনা। রোজই ঘুরে ফিরে আসে। বলাকার হাতে লাঠি হলেও চোখ জুড়ে মায়া। ওরাও তো জন। নিঃসঙ্গে সাথী।
আমি একটু আসতে পারি?
উঠোনে ঢোকার আগলটার বাইরে মেয়েটা দাঁড়িয়ে।
ও মাঃ! এসো ভাই, এসো!
মেয়েটা সসংকোচে ঢুকল।
ওই মোড়াটা টেনে এনে আমার কাছে বোসো।
লক্ষ্মী মেয়ের মতো মেয়েটা বসল।
আজ এলে! আজ যে বাড়ি ফাঁকা! তোমার বান্ধবী পান্নাও গেছে ওদের সঙ্গে পিকনিক করতে।
জানি। আমি তো আপনার কাছে এসেছি, আর কারও কাছে নয়।
কী ভাগ্যি আমার! তোমার বয়সি মেয়েরা আজকাল আর আমার মতো বুড়ির কাছে আসতে চায় না। জেনারেশন গ্যাপ না কী বলে যেন ছাই।
সোহাগ একটু হাসল। তারপর বলল, আপনারা খুব হ্যাপি ফ্যামিলি, তাই না?
বলাকা ভ্রূ কুঁচকে একটু ভাবলেন। তারপর বললেন, এটা একটা আশ্চর্য কথা বললে! আমি তেমন করে ভেবে দেখিনি কখনও। কিন্তু সত্যিই বোধহয় আমাদের হ্যাপি ফ্যামিলি। তেমন কোনও সমস্যা নেই। ঝগড়াঝাটি নেই। বউমারা খারাপ নয়, জামাইরাও ভাল। আমার দুঃখ নেই।
মেয়েটা তাঁকে খুব অবাক করে দিয়ে বলল, কিন্তু হ্যাপিনেস কি সবসময়ে ভাল?
ওমা! বলে কী গো মেয়েটা! হ্যাপিনেস ভাল নয় বুঝি?
সোহাগ মলিন মুখ করে বলে, আমি তো একটু পাগল, তাই আমার মাথায় খুব অদ্ভুত অদ্ভুত কথা আসে।
কী কথা?
কেন যেন মনে হয়, খুব হ্যাপি হওয়া ভাল নয়।
কে বল তো!
তাতে মানুষের সার্চ কমে যায়, সে অলস হয়ে পড়ে, তার মন ঘুমিয়ে পড়ে।
বলাকা একটু অবাক হয়ে মেয়েটার দিকে চেয়ে থাকেন। তারপর মৃদু স্বরে বলেন, মানুষ তো সুখী হতেই চায়, আর সেটা চায় বলেই তো সে কত পরিশ্রম করে, কষ্ট করে। তাই না? তোমার কি মনে হয় আমার মন ঘুমিয়ে পড়েছে?
মেয়েটা খুব লজ্জার হাসি হাসল, কিন্তু জবাব দিল না।
বলাকা বললেন, সুখ তো এমনিতে আসেনি। অনেক কষ্ট করতে হয়েছে তার জন্য। সব সময়ে তো আর সুখে থাকিনি।
মেয়েটা কিছু বলল না, সামনের দিকে চেয়ে বসে রইল।
তুমি কী বল? অসুখী হওয়াই ভাল?
মেয়েটা মাথা নেড়ে বলে, জানি না। আমরা তো ভাল নেই। আমরা খুব আনহ্যাপি।
তাই বুঝি?
হ্যাঁ। আমাদের পরিবারের মধ্যে সবাই সবার অ্যান্টি।
সে কী! তা কেন?
জানি না। ওইরকমই হয়ে গেছে।
এরকম হওয়া তো উচিত নয় ভাই।
আমার খুব মনে হয়, আমি অন্য কোনও ফ্যামিলিতে জন্মালে খুব ভাল হত।
তুমি তোমার মা-বাবাকে ভালবাস না?
কী জানি! ভালবাসা ব্যাপারটাই তো বুঝতে পারি না। শব্দটা আমার কাছে অদ্ভুত লাগে।
মা বাবাকে ছেড়ে থাকতে কষ্ট হয় না?
না। একটুও না। আমার তো সব সময়ে কোনও নির্জন জায়গায় পালিয়ে যেতে ইচ্ছে করে।
বলাকা একটু ভেবে সন্তর্পণে বললেন, অমল কত ভাল চাকরি করে। তোমার মাও তো অনেক পাস— টাস শুনেছি। অমল ছেলেও তো খুব ভাল। তাহলে তোমার এরকম মনে হয় কেন?
বোধহয় আমিই স্বাভাবিক নই।
আমার তো কখনও তা মনে হয়নি! তোমাকে আমার বেশ লাগে। সাজগোজ নেই, নিজের প্রতি বিশেষ নজর নেই, চুলটা অবধি ভাল করে আঁচড়াও না কখনও। বেশ তো সরলসোজা মেয়ে তুমি।
সাজতে আমার ভাল লাগে না। কী হবে সেজে?
এ তো বুড়ো বয়সের প্রশ্ন। তোমার বয়সে কি এরকম কেউ ভাবে?
আমি বোধহয় মনে মনে বুড়োই হয়ে গেছি।
দুর পাগল!
আমি একটা কথা বলতে এসেছি।
কী কথা?
এই গ্রামে কতগুলো ছেলে মাঝে মাঝে আমাকে টিজ করে।
তাই নাকি?
সব জায়গাতেই এসব একটু-আধটু হয়। আমি মাইন্ড করি না। আমি কাউকে ভয়ও পাই না৷
কিন্তু টিজ করবে কেন? দাঁড়াও, আমি বিজুকে বলে দেবোখন।
আমি সে কথাটাই বলতে এসেছি।
বিজুকে বলার কথা তো!
না, বিজুকে বারণ করার কথা।
ওমা! কেন?
সেদিন পান্নার সঙ্গে বেরিয়েছিলাম, তখন ওর সামনেই কতগুলো ছেলে আমাকে টিজ করেছিল। পান্না বলেছিল, ওর দাদা বিজুকে বলে ওদের ঢিট করে দেবে। আমি বারণ করেছিলাম। কিন্তু পান্না শোনেনি। ও ওর বিজুদাকে বলে দিয়েছিল।
তাই নাকি?
হ্যাঁ। আর তার ফলে সেই ছেলেগুলোকে একটা ক্লাবের ছেলেরা এসে খুব মারে। মার দিয়েই হয়নি, ওদের নিয়ে এসে আবার আমার কাছে ক্ষমাও চাইয়েছে। আমার খুব খারাপ লেগেছে।
কেন, এ তো ভালই হয়েছে। ছেলেগুলো আর তোমার পিছনে লাগবে না।
এই ছেলেগুলো হয়তো আর লাগবে না। কিন্তু সেটা তো সলিউশন নয়। আমাকে তো সব জায়গায় কেউ প্রোটেকশন দেবে না। আর প্রোটেকশন আমি তো চাইও না। আমার খুব অপমান লেগেছে।
বলাকা হাসলেন, তুমি আজকালকার মেয়ে তো, তাই পুরুষদের প্রোটেকশন নিতে চাও না বোধহয়। কিন্তু ভাই, চিরকাল যে তাই হয়ে এসেছে।
আপনার কি মনে হয় না, এখন কিছু অন্যরকম হওয়া উচিত?
আমি পুরনো আমলের মানুষ, চিরকাল পুরুষের ছায়ায় বড় হয়েছি, আমি কি আর তোমাদের মতো করে ভাবতে শিখেছি?
সেই জন্যই কি আপনি এত হ্যাপি?
কী বলছ বুঝিয়ে বলল।
চিরকাল পুরুষের প্রোটেকশনে ছিলেন বলেই আপনার গায়ে কোনও আঁচ লাগেনি। এই প্রোটেকশন নেওয়াটাকে আপনার অপমান বলে মনে হয় না?
বলাকা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, পাগলি, প্রোটেকশন কি পুরুষেরও দরকার হয় না? না হলে এত পুলিশ, মিলিটারি, এত আইনকানুনের তো প্রয়োজনই থাকত না। প্রোটেকশন যে একটা ভীষণ দরকারি জিনিস। না বাপু, পুরুষমানুষের সাহায্য নিতে আমার তো কখনও অপমান লাগেনি।
কিন্তু প্রোটেকশন নেওয়ার অভ্যাস হয়ে গেলে কি মানুষ খুব নাবালক থেকে যায় না? বিপদ হলে একজন এসে বাঁচাবে এরকম ধারণা থাকলে মানুষের ডেভেলপমেন্ট কি ভাল হয়?
ও বাবা! ওসব যে শক্ত শক্ত কথা! তা ভাই, তোমার মতো করে আমি তো ভাবতে শিখিনি। কিন্তু স্বীকার করি, তোমার মতো করে ভাবাও বোধহয় খারাপ নয়। আজকাল তো পুরনো ধ্যানধারণা পালটে যাচ্ছে।
হঠাৎ ফিক করে হেসে ফেলল সোহাগ, বলল, হ্যাপিনেস মানেই কিন্তু সেন্স অফ. সিকিউরিটি। আমার কখনও বিপদ হবে না, কখনও অভাব হবে না, আমার সব কিছু ঠিকঠাক থাকবে, আমাকে বাঁচানোর জন্য কিছু লোক সবসময়ে প্রস্তুত থাকবে, কেউ আমার নিন্দে করবে না! তাই না?
বলাকা ভারী অবাক হলেন। বললেন, তোমার বয়স কত?
আমি খুব পাকা, না? আমি সতেরো প্লাস।
না ভাই, তুমি মোটেই এঁচোড়ে পাকা নও। তোমার বেশ মাথা আছে।
তা কিন্তু নয়। পড়াশুনোয় আমি ডাব্বা। তবে আবোলতাবোল ভাবতে খুব ভালবাসি।
কিন্তু কথাগুলো তো খারাপ বললে না! সুখ ওটাকেই বলে বটে। হ্যাঁ গো মেয়ে, সুখী মানুষকে তোমার ঘেন্না হয় না তো?
জোরে মাথা নাড়া দিয়ে সোহাগ বলে, না তো! আমার তো আপনাকে ভীষণ ভাল লাগে।
বলাকা হেসে ফেললেন, আমাকে আবার সুখী মানুষের সর্দার ভেবো না। অত কি সুখ আমার! গাঁয়ে পড়ে আছি, শোকাতাপা মানুষ, নিঃসঙ্গ জীবন। যত সুখী ভাবছ ততটা নই। তবে দুঃখও তেমন কিছু খুঁজে পাই না। আসল কথা কী জান, সুখদুঃখের বোধটাই বোধহয় ভোঁতা হয়ে গেছে। সেও একরকম ভালই।
আমি আপনাকে হ্যাপি বলিনি। আমি বলেছি আপনাদের ফ্যামিলিটা খুব হ্যাপি। সবাই কেমন হাসিখুশি ডগোমগো। আপনি তো তা নন।
বলাকা একটু হাসলেন।
সোহাগ বলল, পান্নার কাছে শুনেছি আপনার হাজব্যান্ড মারা যাওয়ায় আপনি খুব ভেঙে পড়েছিলেন। সবাই ধরে নিয়েছিল আপনিও বেশিদিন বাঁচবেন না।
বলাকা স্মিতমুখে বললেন, অনেকে এখনও মনে করে আমি বেশিদিন বাঁচব না।
আপনি আপনার হাজব্যান্ডকে খুব ভালবাসতেন, না?
কী জানি ভাই, তোমার মতোই ভালবাসার তত্ত্ব আমারও জানা নেই। শুধু টের পেতুম, ও মানুষটা আমার শ্বাসবায়ুর মতো, বুকে ধুকপুকুনির মতো। সে ছাড়া নিজেকে ভাবতেই পারতাম না।
সেটা কী করে সম্ভব? ইগো নেই? স্বাধীন মতামত নেই? ব্যক্তিত্ব থাকবে না?
তাই তো! সেসব বোধহয় আমার ছিল না। আমি বোধহয় খুব বোকা ছিলাম। আর তার জন্যেই এতগুলো বছর তো দিব্যি হাসিমুখে কাটিয়ে দিতে পেরেছি। তোমরা কি পারবে?
মাথা নেড়ে সোহাগ বলে, না। আমি কখনও আপনার মতো হতে পারব না। আমি চিরকাল একজন আনহ্যাপি মেয়ে হয়ে থাকব।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন