শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
এসব কী এনেছ?
ফলমূল বুড়িমা। সন্দেশও আছে।
অ্যাঁ! ফলমূল! আবার সন্দেশ!
হ্যাঁ গো বুড়িমা, এই যে আপেল, কমলালেবু, আঙুর, সবেদা, বেদানা, কলা। আর এই বাক্সে সন্দেশও আছে।
তা ভাল বাছা। দিয়েছ, দাও। কিন্তু দাম চাইবে না তো! আমার কিন্তু বাপু পয়সা-টয়সা নেই।
আরে না বুড়িমা, পয়সা লাগবে না। এমনিই দিচ্ছি, আজ স্বাধীনতা দিবস তো, তাই।
অ, তাই বলো! আজই তাহলে সেই অনামুখো, সৃষ্টিছাড়া দিন!
আহা, ওরকম করে কি বলতে আছে? আজকের দিনটায় আমাদের দেশ যে স্বাধীন হয়েছিল।
অতশত জানি না বাপু। এক দিন দুপুরে যতুর বাপ এসে ধপ করে দাওয়ায় বসে মাথায় হাত দিয়ে কাঁদতে লেগেছিল। অত বড় মানুষটা, জীবনে তার চোখে জল দেখিনি। সেদিন কী হাউ হাউ করে কান্না! তারপর বলল, দেশ স্বাধীন হতে যাচ্ছে গো, এবার পোঁটলা পুঁটলি বাঁধো। দেশ ছাড়তে হবে। ঘরে ঘরে নিশানও তুলেছিল বটে লোকে, বাজি পটকা কম ফাটেনি। কিন্তু আমাদের তাতে কী বলো। স্বাধান-টাধিন তো বুঝিনি বাবা, শুধু বুঝেছি, কিছু একটা হয়েছে। আমাদের এখন পাততাড়ি গোটাতে হবে।
ওসব অতীতের কথা বলে কী লাভ বুড়িমা? কিছু লোকের কষ্ট হয়েছিল একথা সত্যি। দেশ ভাগ হওয়ায় আমরাও কি দুঃখ পাইনি?
দুঃখের কপাল তো ভগবানের কাছ থেকেই নিয়ে এসেছি, সেজন্য কি আর কাঁদুনি গাইছি? শুধু বলছি, এই দিনটায় কারও ছিল পৌষমাস, কারও সব্বোনাশ। জিনিসপত্র বাঁধাছাদা করতে করতেই কিছু লুটপাট হল, কারা যেন এসে চোটপাট করে শাসিয়ে গেল, খবর্দার ভিটে ছাড়বি না, কিন্তু বাপু, আমরা তো কথা-টথা জানি না, আমাদের শুধু প্রাণের ভয়। শুধু প্রাণটুকুরই তো মায়া, কী বলো!
আজকের দিনে ওসব কথা থাক না বুড়িমা।
কেন বাছা, আজকে কি আমাদের মৌনীব্রত? কথা কইতে নেই বুঝি?
না না, তা নয়।
তাহলে একটু বলিই না হয় বাপু। প্রাণটা যে কেমন জিনিস তা কি জানো?
প্রাণের মায়া কার নেই বলো বুড়িমা?
সে বটে। আমাদেরও খুব ছিল। ডাকাতে, গুণ্ডায় ধরলে শুধু হাতে পায়ে ধরে বলেছি, প্রাণে মেরো না বাপু। তা মারেনি বলেই তো বেঁচে আছি। বয়সের মেয়েকে টেনে নিয়ে যায়, জোয়ান ছেলেকে বল্লম দিয়ে খোঁচায়, চোখ রাঙিয়ে কতবার টিপছাপ নিয়ে যায়, আমরা কিছু বলিনি বাপু, রুখেও উঠিনি, শুধু ওই প্রাণের ভয়। শেষে সার বুঝেছি কী জানো?
কী বুড়িমা?
যদ্দুর বাপ যেদিন গলায় দড়ি দিল সেদিন হঠাৎ বুঝলুম যা নেই তার আবার মায়া কীসের বলো! আমাদের মোটে প্রাণই নেই, শুধু দেহটা অভ্যাসের বশে চলে। প্রাণ থাকলে সেটা কি এত সহ্য করতে পারত? নাড়ি ধরে যদি দেখ বাছা, দেখবে নাড়ি আমার চলছে না।
না বুড়িমা, তুমি তো দিব্যি বেঁচে আছ!
কী জানি বাপু, দিনকে দিন, রাতকে রাত বলে চিনতেই পারি না। তা বাপু, এই যে এত সুন্দর সুন্দর সব ফল-টল দিলে এসব কি আসল জিনিস?
আসল নয় তো কি নকল বুড়িমা?
কী জানি বাপু, কেষ্টনগরে নাকি মাটি দিয়ে কী সব বানায়, ঠিক আসলের মতো দেখতে। সে জিনিস নয় তো? এই অনেকটা আমাদের মতোই, মানুষের মতো দেখতে, কিন্তু মানুষ নয়।
আহা বুড়িমা, তোমার মাথাটাই গেছে, একটু খেয়েই দেখো না।
না বাছা থাক, দেখনসই জিনিস, একটু বরং দেখি।
অ বুড়িমা! বলি ঘুমোচ্ছ নাকি?
তা কে জানে বাছা। চোখ বুজলে কখনও মনে হয় ঘুমোচ্ছি, কখনও মনে হয় মরে গেছি। কোনটা তা বলতে পারি না।
ফলগুলো তো খাওনি দেখছি!
যত্ন করে রেখে দিয়েছি। ও কি খাওয়ার জিনিস বাপু?
খাওয়ার জিনিস না তো কী?
জন্মে খাইনি। আপেল, আঙুর ওসব কি খায় বাছা?
খায় তো। খেলে শরীর ভাল হয়।
আমার হবে?
হবে না কেন?
মরা জিব বাছা, খেলে আবার ভিরমি খাই কিনা কে জানে। সকালে এক ডেলা পাউরুটি দিয়েছিল, আর দুধ, তা বেশ খেলুম বাছা, অনেকে দুধ মুখে দিয়ে ওয়াক তুলে বলছিল ও নাকি মোটে দুধই নয়, চকখড়ি গুলে নিয়ে এসেছে। তা বাপু, আমার কিন্তু খারাপ লাগেনি। দুপুরে বেশ ভাত দিয়েছিল অনেকটা। সঙ্গে এক টুকরো মাছ আর ডাল। সেও সবাই ছি ছি করছিল, বলছিল মাছ নাকি পচা, ডাল নাকি হলদে জল, ভাতে নাকি গন্ধ, তা বাছা, আমার তো কিছু খারাপ লাগল না।
তা সেসব খেতে পারলে আর ফলগুলো পড়ে রইল? তুমি কেমন ধারা লোক?
ওই ভয়েই তো খাইনি। ওসব ফল-টল খেলে জিব যদি ফের স্বাদগন্ধ পেতে শুরু করে তখন কি আর হাসপাতালের খাবার খেতে পারব?
নাঃ, তোমাকে নিয়ে আর পারা যায় না।
রাগ কোরো না গো ভালমানুষের ছেলে। তুমি বড় ভাল লোক। আমি আজকাল যাকেই দেখি তাকেই মনে হয় ভাল লোক। পরশুদিন আমার ভাইঝি দেখতে এসে দুটো টাকা দিয়ে গিয়েছিল। বালিশের তলায় রেখেছিলাম যত্ন করে। সকালবেলায় জমাদারটা এসে বালিশের তলায় হাত ঢুকিয়ে বের করে নিয়ে গেল। তা বাপু তাকেও আমার কেন যেন ভাল লোক বলেই মনে হচ্ছিল। সবাই তাকে গালমন্দ করে বটে, সে নাকি ঝাটপাট দেয় না, পায়খানা পরিষ্কার করতে চায় না, তার জন্যই নাকি চারধারে গু-মুত জমে আছে, কিন্তু আমার তাকে দিব্যি ভালমানুষ বলে মনে হল।
এটা সরকারের হাসপাতাল বুড়িমা, সরকার ওদের মাইনে দেয়, ওদের কাজ করা উচিত।
হ্যাঁ বাবা, এই সরকার লোকটা কে বলো তো! সবাই তাকে খুব গালমন্দ করে বটে শুনি, সে-ই নাকি নাটের গুরু, যত নষ্টের গোড়া, তা লোকটা যদি এতই খারাপ তবে তার এত নামডাক কেন বলো তো!
আহা সরকার মানে কি আর একটা লোক? অনেক লোক মিলেই তো সরকার।
ও বাবা! এত সরকার! তা বাবা সরকারেরাই বা খারাপ কেন বলো! গাঁটের কড়ি দিয়ে হাসপাতালখানা তো বানিয়ে দিয়েছে! দিব্যি পাকা ঘর, মেঝেতে পড়ে আছি বটে, কিন্তু বাড়ির চেয়ে তো ঢের ভাল, বাড়ির মাটির মেঝেতে কি এত আরাম হত।
নাঃ, তোমাকে নিয়ে আর পারা যায় না বুড়িমা, হাসপাতালের এইসব অব্যবস্থার জন্যই তো আমরা আন্দোলন করছি।
ওই আর একটা লোক, সবাই আন্দোলনবাবুর কথা খুব বলে। সে নাকি খুব ভাল। সে এলে সব নাকি ফের ঠিকঠাক হয়ে যাবে। তা আন্দোলনবাবু আসে না কেন বলো তো! তাকে বড় দেখতে ইচ্ছে যায়। দেখতে পেলে একটু পায়ের ধুলো নিতাম।
না বুড়িমা, তোমাকে কিছু বোঝানো যাবে না, বুঝে তোমার কাজও নেই। ফলগুলো দয়া করে খেও। কাল থেকে পড়ে আছে। এরপর পচে উঠবে! মাছি তো ভনভন করছে দেখছি।
হ্যাঁ বাবা, মাছিরা খুব ছেঁকে ধরে আমাকে। বড় বড় নীল মাছি, গুয়ের মাছি, তা হোক, মাছিগুলো দেখতে ভারী সুন্দর।
বুড়িমা! ও বুড়িমা! সাড়া দিচ্ছ না কেন? … এই রে! টেঁসে গেল নাকি?
কে বাবা! যমদূত?
না বুড়িমা, আমি যমদূত নই।
তবে কি তুমি সরকার না আন্দোলন?
না বুড়িমা, আমি সরকারি লোক নই, আন্দোলন করতেও আসিনি। শাবলরাম মাড়োয়ারির ছেলের বিয়ে বলে গরিবদের কম্বল দেওয়া হচ্ছে। এই নাও, তোমার জন্যও একখানা এনেছি।
বাঃ বাঃ, এ তো ভারী বাহারি জিনিস গো! বিনি মাগনা দিচ্ছ নাকি?
হ্যাঁ গো বুড়িমা, একদম বিনি মাগনা।
তা ভাল বাছা, কলিকালে এখনও বিনি মাগনা জিনিস মেলে তাহলে গো, কেমন যেন বিশ্বাস হতে চায় না।
কেন বলো তো! বিশ্বাস না হওয়ার কী আছে?
এখেনে যে আমাকে ওষুধপত্তর কিছু দেয় না বাবা, শুনেছিলুম সরকারবাবু হাসপাতালে বিনি পয়সায় ওষুধ দেওয়ার বন্দোবস্ত করেছে। তা এখানকার লোক বলে ওসব বাজে কথা। ওষুধ খেতে হলে পয়সা দিতে হবে। এই যে চারদিকে গু-মুত-বমি-গয়ের-থুথু পড়ে আছে এসবও নাকি পয়সা না দিলে পরিষ্কার করা হবে না। ডাক্তারবাবু বুকে নল লাগালেও পয়সা লাগবে। তা বাবা, সেদিন ভয়ে ভয়ে একজনকে জিজ্ঞেস করলুম, হ্যাঁ গো, এই যে শ্বাস নিচ্ছি এর জন্য পয়সা চাইবে না তো!
এ দেশে গরিবদের দেখার তো কেউ নেই বুড়িমা। সেইজন্যই তো তোমাদের আন্দোলনে নামতে বলি। একবার রুখে দাঁড়াও, দেখবে সব ঠিক হয়ে গেছে।
আন্দোলনবাবুকে আমার পেন্নাম দিও বাবা। সে বড্ড ভাল লোক।
এখানে এত দুর্গন্ধ কেন বলো তো বুড়িমা? তা আর হবে না বাছা, আমার যে পেট ছেড়েছে!
এঃ মাঃ!
পরশুও হামাগুড়ি দিয়ে পায়খানায় যেতে পেরেছি, কাল থেকে হাত-পায়ে যেন সাড়া পাচ্ছি না, বিছানাতেই হয়ে যাচ্ছে।
অ্যাঁঃ তা পরিষ্কার করছে না কেউ?
না বাবা, সেরকম নাকি নিয়ম নেই।
ওষুধপত্রও দিচ্ছে না!
এই তো বললাম, ওষুধপত্র দিলে পয়সা নেবে।
এ তো ভীষণ অন্যায়!
রাগ কোরো না বাবা, আমি কিছু খারাপও তো নেই, সবাই বলছে বুড়িটা গপগপ করে খায় বলে হাগছে। তা তাই হবে বোধহয়, তা এই সময়ে তুমি কম্বল এনেছ দেখে বাঁচলুম। কম্বলটা আমার মাথায় ঠেকিয়ে শিয়রে রেখে দাও। কম্বলেই আমার অসুখ ভাল হয়ে যাবে।
ধ্যেৎ! কী যে বলো!
কম্বলে অসুখ সারবে না বাবা?
তাই কখনও সারে? কম্বল কি পেট খারাপের ওষুধ?
তবে তুমি আনলে যে! আমি তো ভাবছি ওষুধ না হোক কম্বল তো জুটল। ভগবান বোধহয় কম্বল দিয়েই দাস্ত বন্ধ করবেন।
নাঃ, তোমার মাথাটাই গেছে দেখছি। কম্বল কেন দেয় জানো না? ওম-এর জন্য। এই যে ঠান্ডার মধ্যে মেঝেতে পড়ে আছ, তোমার শীত করে না?
ও বাবা, তা আর করে না! খুব করে বাবা, খুব শীত করে। কিন্তু ওম কি আমার সইবে বাবা? বেশি ওম-এ আবার গায়ে ফোসকা না পড়ে যায়, ঠান্ডা থেকে হঠাৎ গরম হলে গোলমাল হবে না তো।
ওঃ, তোমাকে নিয়ে আর পারা যায় না, এই জন্যেই বলে মানুষের ভাল করতে নেই।
এটা কার কথা বাবা? বড় ভাল কথা তো!
ও বুড়ি!
অ্যাঁ! কে রে?
আমি যমদূত।
বটে!
হ্যাঁ রে, এবার শরীরটা ছেড়ে ফেলে দে দিকিনি।
শরীর ছেড়ে ফেলব? কেন বাপু?
তুই যে মরেছিস!
সত্যি?
হ্যাঁ রে।
নিয্যস?
হ্যাঁ, এবার বেরিয়ে আয় ভিতর থেকে।
মরলাম কখন? কই টের পেলাম না তো?
টের পাবি কী করে? মরেছিস কি আজকে? সেই কবে থেকে মরতে শুরু করেছিস। একটু একটু করে মরেছিস বলে হ্যাঁচকাটা লাগেনি, তা সেটা একরকম ভালই।
সে তো বুঝলাম। এখন বেরোই কোথা দিয়ে বলো তো বাবা যমদূত!
কেন, অসুবিধে কী? নাক মুখ কান গুহ্যদ্বার ব্রহ্মতালু যে কোনও একটা ফুটো দিয়ে টুক করে বেরিয়ে আয়।
বড্ড অন্ধকার যে, ফুটোফাটা দেখব কী করে বলো তো বাবা, একটা বাতি-টাতি দেখাতে পারো না?
দুর বুড়ি, তোর বড্ড বায়নাক্কা, চারদিকে ঢুঁ মারতে থাক, রন্ধ্র একটা ঠিক পেয়ে যাবি। শরীরের মধ্যে বাতি কোথা পাবি?
বড্ড ভয় করছে যে বাপু!
ভয়টা কীসের?
অজান জায়গায় কোথায় নিয়ে ফেলবে বাবা?
তা এটাই বা তোর কোন কালের জায়গা ছিল শুনি! এটাও তো অজানা জায়গা।
তা অবিশ্যি বটে। তবু কেন ভয়-ভয় করছে বলো তো!
ও তোর ভয় পাওয়ার অভ্যাস। মেঘ করলেও ভয়, রোদ উঠলেও ভয়, তোদের কি ভয়ের শেষ আছে? চোরে যেমন সিধ কাটে তেমনি সিধ কাটতে থাক।
তা হ্যাঁ বাবা যমদূত, আমার শরীরের মধ্যে এত যন্ত্রপাতি কেন বলো তো? ই রে বাবা, যেদিকে ঢুঁ মারি সেদিকেই যন্ত্রপাতি!
তা আর হবে না! মানুষ বানাতে কি কম মেহনত লাগে আমাদের?
তা আমার ভেতরে এত যন্ত্রপাতি দিয়েছ তোমরা, কই টের পাইনি তো! শুধু পেটের খোঁদলটা খুব টের পেতাম। ই রে বাবা, এ যে কলকারখানা বানিয়ে ফেলেছিলে গো! আমাদের মতো মনিষ্যির কি এত যন্ত্রপাতি লাগে?
তবেই বোঝো, ভগবান মোটেই একচোখো নয়, তোকেও কারও চেয়ে কম দেননি।
কিন্তু বাবা, এখন যে আমার বড্ড মায়া হচ্ছে।
কীসের মায়া রে বুড়ি?
এমন সুন্দর শরীর ছাড়তে ইচ্ছে যাচ্ছে না যে!
মর বুড়ি! এখন মায়ায় পড়লে কি হয়? আর শরীরে তোর আছেটাই বা কী বল! বুড়ো থুথুরে হয়ে গেছিস, শনের নুড়ি চুল, চামড়া ঝুলে গেছে, হাড্ডিসার চেহারা, রাজ্যের অসুখে শরীর ঝাঝরা, ও পচা শরীর দিয়ে কী হবে তোর?
না বাছা, শরীরটা ভেঙে গেছে বটে, কিন্তু তাতে কী? ভেতরে যে ভারী ভাল ভাল বন্দোবস্ত ছিল, এও কি জানতাম? আমার মতো এমন পোড়াকপালির জন্যও এত কিছু করেছ তোমরা।
ভাল করে ভেবে দেখ বুড়ি, শরীর ছাড়বি কিনা।
দুটো চারটে দিন সবুর করো না বাবা, তাড়া কীসের?
তবে শরীর আঁকড়ে পড়ে থাক। আমি চললুম। আমার মেলা কাজ।
কী করছ গো বসে বসে?
অমল একটু তটস্থ হয়ে ম্লান হেসে বলল, কিছু না ঠাকরোন, আগড়ম বাগড়ম নানা কথা মাথায় আসে, সেগুলো লিখি।
ও কি তোমার সায়েন্সের ব্যাপার?
না না।
অনেকক্ষণ সাড়া না পেয়ে ভাবলাম ঘুমোচ্ছ বুঝি। কিন্তু শীতের বেলায় বেশি ঘুমোলে শরীর খারাপ করবে ভেবে বুদ্ধি করে চা নিয়ে এলাম। ভাবলাম চায়ের ছুতো করে জাগিয়ে দিয়ে যাই, তা এসে দেখছি, মন দিয়ে লেখাপড়া করছ।
লেখাপড়া নয় ঠাকরোন, এ একরকম চিকিৎসা।
ও মা! লেখাপড়া আবার কীসের চিকিৎসা?
ও তুমি বুঝবে না, মাথায় এলোমেলো চিন্তা এলে সেগুলো ঠেকানোর জন্য আমি মনে যা আসে লিখতে থাকি। লেখায় একটা প্যাটার্ন চলে আসে। তাতে মনটা একটু স্থির হয়।
হ্যাঁ গো, তোমার মনের অশান্তি কি আর শেষ হবে না?
চায়ের কাপটা হাতে নিতে গিয়ে একটু চলকে গেল। অমল টের পায় আজকাল তার হাত কাঁপে। অকারণেই কাঁপে। কিংবা কোনও গৃঢ় কারণে।
কলকাতায় খবর দিয়েছ তো!
দিয়ে লাভ কী?
দুশ্চিন্তা করবে তো! আজ তিন দিন।
আজ তিন দিন? বলো কী? আমার তো মনে হচ্ছে যেন অনেক দিন হল এসেছি।
চালাকি কোরো না, আজই একটা খবর দাও। তোমার এসব হাবভাব আমার মোটেই ভাল লাগে না। বাপু। অবিশ্যি তোমার দাদাটি বিবেচক লোক। সে হয়তো খবর একটা দিয়েছে।
অমল হেসে বলল, খবর যে দেওয়া হয়ে গেছে তা কি আর আমি জানি না বলে মনে করো? তোমরা সংসারী মানুষ, বেহিসাব তোমাদের কুষ্টিতে নেই।
বেহিসেবি চলন কি ভাল ঠাকুরপো? এবার খোলসা করে বলো তো হুট করে চলে এলে কেন।
শুনে কী করবে?
শুনিই না।
অমল খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, শুনলেও তোমার বিশ্বাস হবে না।
কেন হবে না?
আমি ওদের খুব ভয় পাই।
ও মা! কাদের ভয় পাও?
আমার বউ, ছেলে আর মেয়েকে।
ভয় পাও কেন? ওরা কি তোমাকে কামড়ায় নাকি?
না। এ ভয়টা একটু অদ্ভুত ধরনের।
বউকে একটু আধটু ভয় পাও সে ঠিক আছে। অনেকেই পায় বলে জানি। কিন্তু ছেলেমেয়েকে ভয় কীসের?
আমি ওদের ব্যক্তিত্বের সঙ্গে পেরে উঠি না। সবসময়ে মনে হয় ওরা আমার চেয়ে শ্রেষ্ঠ জীব, অনেক বেশি পাওয়ারফুল।
যত উদ্ভুটে কথা। আর তাও যদি হয় তো ভয়টা কীসের!
আমার ওদের সংস্পর্শ থেকে দূরে থাকতে ইচ্ছে করছিল।
তাই না বলে কয়ে চলে এলে? ওরা তোমার আপনার জন না কি?
অস্বীকার করি কী করে?
তাহলে?
সেইসবও ভাবি, কেন যে আজকাল আমার ভয় হয়।
তুমি তো বামুনের ছেলে!
অমল অবাক হয়ে একটু হেসে বলল, তাতে কী?
বলি বামুনের ছেলে হয়ে জন্মেছ, পৈতেও হয়েছিল জানি, তা গলার যজ্ঞসূত্রটা কোথায় গেল?
দুর! সে কবে হারিয়ে ফেলেছি।
গায়ত্রী মন্ত্র মনে আছে?
ওং ভূর্ভুবঃ সঃ তো? কেন মনে থাকবে না?
কখনও জপ-টপ করো?
দুর দুর, ওসব কবেই চুকেবুকে গেছে।
তোমার মাথা, কিছু চুকেবুকে যায়নি। ফের শুরু করো তো!
কী শুরু করব?
সকাল সন্ধে একটু গায়ত্রী জপ করো, আমি বাবাকে বলব তোমার জন্য একটা পৈতে গ্ৰন্থি দিয়ে দিতে। কাল স্নান করে ভক্তির সঙ্গে পৈতেটা গলায় দিও।
এসব আবার কী জুলুম শুরু করলে? আমি জন্মসূত্রে বামুন হলেও আচার আচরণে চাঁড়াল। আমাকে দিয়ে ওসব হবে না।
দেখো বাপু, আমি সম্পর্কে গুরুজন, তার চেয়েও বড় কথা, আমি তোমার ভাল চাই। যে তোমার ভাল চায় তার একটা কথা শুনতে দোষ কি?
অমল হেসে বলল, তোমার যে সব অদ্ভুত অদ্ভুত নিদান। একবার বললে বউয়ের সঙ্গে এক বিছানায় শুতে হবে। এখন বলছ পৈতে পরে গায়ত্রী জপ করতে হবে।
তাতে তো বাড়তি পরিশ্রম নেই। না হলে করলেই একটু, ওই যে বলছিলে মনটাকে স্থির করার জন্য লেখো, এও একরকম তাই, মন্ত্র ধরা থাকলে মন স্থির হয়।
মাথা নেড়ে অমল একটু হেসে বলে, মন্ত্র জপ করলে মন স্থির হয় না ঠাকরোন, বিশ্বাস করলে মন স্থির হতে পারে। আমার যে সেখানেই ফাঁক।
তুমি বড্ড ঝগড়ুটে লোক বাপু। একটা না একটা ক্যাঁড়া কাটবেই। বলি বিশ্বাস কি মানুষ সঙ্গে করে নিয়ে আসে?
তবে?
করতে করতেই বিশ্বাস আসে।
আগে তো বুঝতে হবে মন্ত্রের সত্যিই কোনও জোর আছে কি না।
করেই দেখো না।
অবশ্য শাস্ত্রে বলে মনকে যা ত্রাণ করে তাই হল মন্ত্র। একটা এক্সপেরিমেন্ট করতে পারি। কিন্তু যদি কাজ না হয়?
না হলে না হবে।
তখন কিন্তু বিশ্বাস একেবারে চলে যাবে। ছায়াটুকুও থাকবে না।
কাজ হবেই, করেই দেখো।
দীপ্ত মুখে বউদি উঠে চলে গেল।
অনেকক্ষণ গুম হয়ে বসে রইল অমল। ধীরে ধীরে বিকেলের আলো মরে আসছে। সন্ধের সময়টা বড় বিষাদের সময়। এই দিন গিয়ে রাত যখন আসে তখন অমলের মনটায় যেন হু হু করে বিষণ্ণতার বাতাস বয়ে যায়। সে ভারী ছটফট করে তখন।
আজও সে তাড়াতাড়ি গায়ে জামাকাপড় চাপিয়ে রোদ মরতে না মরতেই বেরিয়ে পড়ল। উদ্দেশ্যহীন যাওয়া। সে শুধু পথে বিপথে জোর কদমে হেঁটে যায়, কোথাও পৌঁছোয় না।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন