শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
একজন অন্ধ মানুষ নিশ্চিন্দিপুর যাবে বলে বেরিয়েছে, সঙ্গে একটা বাচ্চা ছেলে। তারা হাঁটছে আর হাঁটছে।
ও দাদু, আর কতদূর গো? বেলা যে মজে এল!
ওরে, দূর বইকী! সোজা দূর! অনেক দূর চলে গিয়েছিলুম যে নিশ্চিন্দিপুর থেকে।
ওই যে একটু আগে চাষি লোকটা বলল, আর একটুকুন পথ! তা সেই একটুকুন পথ তো কখন ফুরিয়ে গেছে! তুমি তা হলে ছাড়িয়ে এসেছ নিশ্চিন্দিপুর। চোখে তো দেখতে পাও না, তাই বুঝতে পারোনি।
পাগল! তাই কখনও হয়! নিশ্চিন্দিপুর এলে আমি ঠিক বুঝতে পারব।
কী করে পারবে? নিশ্চিন্দিপুরের হাওয়াবাতাস কি অন্যরকম, নাকি তার কোনও আলাদা গন্ধ আছে? তুমি টের পাওনি।
তাই কি হয় রে! আমি নিশ্চিন্দিপুরে পা দিলেই পুরনো সব গাছপালা ফিস ফিস করে বলে উঠবে, ওই আমাদের অপু। নিশ্চিন্দিপুরের মাটি ঠিক বলে উঠবে, অপু এলি বাবা? বাতাসে মায়ের গায়ের গন্ধ পাবো ঠিক। বাবার কাশির শব্দ, দিদির কান্না সব এখনও নিশ্চিন্দিপুরের বাতাসে ঘুরে বেড়ায়। তুই বুঝতেও পারবি না সেসব। আমি কিন্তু ঠিক শুনতে পাবো।
ওরকম হয় নাকি! গাঁ কি কাউকে মনে রাখে! তোমার নিশ্চিন্দিপুর নিশ্চয়ই হেজেমজে গেছে। কেউ নেই সেখানে। আমাদের পটাশপুরে সেবার কলেরা হয়ে সবাই মরে গেল। গাঁ উজাড় হয়ে গেল। তারপর আগাছা হল, জঙ্গল হল, সাপ-খোপের বাসা হল।
বুড়ো লোকটা মাথা নেড়ে বলল, না, নিশ্চিন্দিপুর কখনও মরে না। ওটা এক আশ্চর্য জায়গা। যত দিন আমি আছি, ততদিন মরবে না। কোল পেতে বসে থাকবে আমার জন্য।
আমার যে খিদে পাচ্ছে দাদু, পা ব্যথা করছে।
খিদে! খিদের কথা বললি নাকি?
বললুম তো।
সেই খিদের গল্পই তো আমাদের সবার গল্প। সারা নিশ্চিন্দিপুর কেবল এক-পেট খিদে নিয়ে বসে থাকত। সকলের খিদে পেত, কেবল খিদে পেত। খিদে কিছুতেই মিটত না। আর ওই খিদে থেকেই তৈরি হত আমাদের গল্প। কত কত গল্প রে! বাঁচার গল্প, মরার গল্প। প্রেম ভালবাসার গল্প। সব কিছুর গোড়ায় ওই এক বাটি খিদে।
এক বাটি খিদে কী গো! খিদের কি বাটি থাকে?
থাকে রে থাকে। নিশ্চিন্দিপুরের যিনি ভগবান তিনিই গাঁয়ের মাঝ মধ্যিখানে কোথায় যেন খিদের বাটিটা লুকিয়ে রেখে দিয়েছিলেন। আর আমরা সারাদিন ধরে সেই বাটিটা খুঁজে বেড়াতাম। আজও তার সন্ধান মেলেনি। কিন্তু বাটি একটা ঠিকই আছে কোথাও।
হ্যাঁ দাদু, নিশ্চিন্দিপুরের ভগবানও কি আলাদা?
তা বইকী! সব জায়গারই আলাদা আলাদা ভগবান। যে যার নিজের ভগবান খুঁজে নেয়। ও তুই বুঝবি না।
ও দাদু, রোদে মাথা গরম হয়ে ভুল বকছ না তো!
ভুল! সেও কি আর বকি না! যত ভুল বকি, ভুল করি, ভুল পথে চলে যাই, চারদিকে কত ভুল কথা, ভুল কাজ, ভুল পথ। ভুল তো হতেই পারে। হ্যাঁ রে, গোরুর গলার একটা ঘন্টি শুনলুম না।
হ্যাঁ তো।
ওটা আসলে কী যাচ্ছে রে! আমি একটা ছিলছিলে শব্দ শুনতে পাচ্ছি রে।
ও বাবা, মস্ত একটা সাপ যে গো! দাঁড়াশ সাপ।
অন্ধ মানুষটি আনন্দে চিৎকার করে উঠল, ওই! ওই তো এসেছে আমাকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যেতে। চল চল, ওর পিছু ছাড়িস না। ওই নিয়ে যাবে নিশ্চিন্দিপুর।
খানিকক্ষণ তারা পড়ি কি মরি করে হাঁটল।
ধুস, সাপটা যে গর্তে ঢুকে গেল গো দাদু!
ঢুকে গেল! তা হলে দাঁড়া। এইখানেই!
এইখানে কী?
এটাই নিশ্চিন্দিপুর। কী দেখছিস বল তো!
এ তো একটা মাঠ, আগাছার জঙ্গল! আর কিছু নেই।
দূর বোকা! ভাল করে দ্যাখ। ওই বাঁদিকে তাকালে শিবমন্দির। সামনে ওই একটা দোতলা বাড়ি দেখছিস না, ওরাই নিশ্চিন্দিপুরের সবচেয়ে বড় মানুষ। আর ওই আশ-শ্যাওড়ার জঙ্গলটা দেখছিস, ওটা পেরোলেই মজা পুকুর। তার ডান পারে আমাদের বাড়ি। দেখ না ভাল করে।
ধুস! কোথায় কী গো!
ওই শুনছিস, কে যেন বলে উঠল, অপু এলি? শুনলি না।
না দাদু। আমার একটু ভয়-ভয় করছে।
বোকা ছেলে, ভয়ের কী? এবার বাতাসে কান পাত। গাছের পাতায় ফিসফিস শব্দ হচ্ছে, ওই আমাদের অপু!
তোমার মাথা ঠিক গরম হয়েছে দাদু।
না রে, না। আমি এসেছি বলে নিশ্চিন্দিপুরের আকাশে বাতাসে জলে স্থলে যে সাড়া পড়ে গেছে। সবাই কেমন খুশি, ডগমগ করছে টের পাচ্ছিস না?
আমি শুধু কাকের ডাক শুনতে পাচ্ছি গো।
ভাল করে দেখ, সব আছে। সব ঠিক সেই আগের মতোই আছে। ভাল করে ঠাহর করে দেখ তো, একজন বুড়ো মানুষকে কোথাও দেখা যাচ্ছে কি না! অল্প অল্প খোঁচা খোঁচা দাড়ি, রোগা, চোখটা একটু ঘোলাটে, গাঁয়ে ছেঁড়া গেঞ্জি, পরনে হেঁটো ধুতি। দ্যাখ কোথাও গাছতলায় বসে আছে কি না, নয়তো কাঠকুটো কুড়িয়ে বেড়াচ্ছে, কিংবা মাঠের ধারে দাঁড়িয়ে আকাশ পানে চেয়ে আছে।
কেউ কোথাও নেই।
তোর একদম চোখ নেই!
ওই বুড়োমানুষটা কে গো দাদু? কার কথা বলছ?
ওই হল নিশ্চিন্দিপুরের ভগবান। আমাদের গরিব গাঁ তো, তাই আমাদের ভগবানও বড্ড গরিব। ছেলেবেলায় কতবার তাকে দেখেছি।
কথা বলেছ?
না। কথা বলতে গেলেই একটু হেসে পালিয়ে যেত। তার ভয় ছিল আমরা পাছে নালিশ করি।
কী নালিশ ছিল তোমার?
কত নালিশ! খিদের কথা, অভাবের কথা, আকালের কথা, রোগভোগের কথা, নির্যাতনের কথা। ভাল কথাও ছিল অনেক বলবার মতো। কী সুন্দর জংলা ফুল ফুটত, গাছে ফল হত, শরৎকালে কী সুন্দর আলো হত!
না গো, তোমার বুড়ো ভগবানকে কোথাও দেখা যাচ্ছে না। তোমার ভয়ে সে তা হলে পালিয়ে গেছে।
না রে। সে পালাবে কোথায়? নিশ্চিন্দিপুর ছেড়ে সবাই চলে গেলেও তার যে পালানোর উপায় নেই। সে যে ঘুরে ঘুরে নিশ্চিন্দিপুরের ঘরে ঘরে কখনও দুঃখ, কখনও আনন্দ ছড়িয়ে দিয়ে আসে। সে কত কী চুরি করে নিয়ে চলে যায়, আবার কত কী পূরণও করে দিয়ে যায়।
এই খাড়া দুপুরে মাঠের মধ্যে আর কতক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকবে গো দাদু? ফিরে চলো।
ফিরে যাবো? কী যে বলিস, তুই এখানে একটু দাঁড়া। আমি সবার সঙ্গে দেখা করে আসছি।
কার সঙ্গে দেখা করবে! এ যে পতিত একটা জায়গা। কেউ কোথাও নেই।
ওই চোখ দিয়ে কি দেখা যায়? আমার চোখ হলে দেখতে পেতি।
তুমি কী করে দেখছ দাদু? তুমি যে অন্ধ!
কে বলল আমি অন্ধ! আমি যে সব স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি আজ। নিশ্চিন্দিপুরের ভগবান আজ আমাকে দৃষ্টি ফিরিয়ে দিয়েছে যে। বাতাসে বলে পাঠিয়েছে আজ তুই দেখতে পাবি। দাঁড়া না, একটু দাঁড়া। আমি দৌড়ে যাব, আসব।
বেশি দেরি কোরো না কিন্তু। দেরি দেখলে আমি ঠিক পালিয়ে যাবো।
তাই যাস। নিশ্চিন্দিপুর যদি আমাকে তার বুকের মধ্যে রেখে দেয় তা হলে তুই একা ফিরে যাস।
অন্ধ মানুষটি এগিয়ে গেল। বড় আনন্দ, বড় চঞ্চলতা।
ছেলেটা দাঁড়িয়ে রইল। অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল। দাদু ফিরল না। আর ফিরল না। কোনওদিনই আর ফিরল না।
শোনো! একটা কথা বলছি।
অমল তার আচ্ছন্ন চোখ তুলে মোনার দিকে চাইল।
কিছু বলছ?
হ্যাঁ। কিছু যদি মনে না করে তা হলে একটা কথা বলব?
অমল আজকাল তার বউয়ের সঙ্গে বাক্য ব্যবহারে সতর্ক হয়েছে। মাইন পাতা জমির ওপর দিয়ে যেমন পা টিপে টিপে হিসেব করে হাঁটতে হয় ঠিক তেমনভাবে। এই সতর্কতার সুফলও সে পায় আজকাল, ঠিক কথা, তাদের মধ্যে নতুন করে প্রেম জন্মায়নি, মানসিক দূরত্বও দুস্তর। কিন্তু আজকাল তারা মিলেমিশে থাকছে। এ ব্যাপারে মোনাও কি তারই মতো সতর্ক নয়? হ্যাঁ, হয়তো মোনাও দাম্পত্যটাকে অক্সিজেন দেওয়ার চেষ্টা করছে।
অমল অমায়িক হেসে বলল, কী ব্যাপার?
আমাদের তো উইক এন্ড শেষ করে আগামীকাল কলকাতায় ফেরার কথা।
হ্যাঁ।
কিন্তু আমার একদম মনে ছিল না, আগামীকাল সকাল নটায় পার্ক স্ট্রিটে আমার একটা অ্যাপয়েন্টমেন্ট আছে। ডাক্তার বিমল সেনের সঙ্গে।
অবাক হয়ে অমল বলে, ডাক্তার! ডাক্তারের সঙ্গে অ্যাপয়েন্টমেন্ট কেন! কী হয়েছে তোমার?
মোনা ম্লান একটু হেসে বলল, কাছে থেকেও তো আমার খোঁজ রাখো না। হয়েছে একটা কিছু। মেয়েলি ব্যাপার। বিমল সেন ভারী ব্যস্ত ডাক্তার। কালই বিদেশে চলে যাবে। অ্যাপয়েন্টমেন্টটা মিস করা চলবে না।
অমল মোনার দুটো বাহু দুই হাতে ধরে বলল, খুব গুরুতর কিছু নয় তো মোনা? সিরিয়াস কিছু নয় তো!
মোনা হেসেই বলল, তা কী করে বলব? তবে প্রবলেম একটা হচ্ছে।
অমলের মুখ শুকিয়ে গেল। ভালবাসা থাক বা না-থাক, সে কোনও জনকে হারাতে চায় না। মোনা ডিভোর্স করবে বলে হুমকি দেওয়াতেও তার ভুবন শূন্য হয়ে গিয়েছিল। বড্ড অসহায় লেগেছিল তখন। এখন আবার কী বিপত্তি হল কে জানে।
মোনা মায়াভরে একটু হেসে বলল, টেনশনের মতো কিছু হয়নি এখনও। ডাক্তার দেখালে ব্যাপারটা পরিষ্কার বোঝা যাবে।
তা হলে আমাদের তো আজই কলকাতায় ফেরা উচিত।
হ্যাঁ। তবে তাড়াহুড়ো নেই। সন্ধেবেলা রওনা হলেই হবে। গাড়িতে তো মোটে আড়াই ঘণ্টার রাস্তা। এখন তো সবে সকাল।
তা হলে বাসুদেবকে একটা ফোন করে দাও।
ফোন করে লাভ নেই। আমাদের লাইনে কেবল ফল্্ট হয়েছে। সাত দিনের ধাক্কা ধরে রাখো। ঠিক আছে।
তোমার মন খারাপ হল না তো! উইকএন্ডটা এখানে এসে থাকতে তোমার ভাল লাগে।
না মোনা। মন খারাপ হবে কেন? একটা তো মোটে রাত। বরং তোমার কথা শুনে মনটা একটু আপসেট লাগছে।
মেয়ে একটু আপসেট হবে। সে তো এখানে এসে পিসি, পান্না, বড়মা এদের নিয়ে মজে থাকে। সি এনজয়েস হিয়ার ভেরি ম্যাচ।
প্রতি উইক-এই তো আসছি আমরা। ওটা কোনও ব্যাপার নয়। বুঝিয়ে বললেই বুঝবে। ওকে বলেছ তোমার অসুখের কথা?
না। কী জানি কেন, দেখেছি অসুখ শুনলেই সোহাগ কেমন নার্ভাস হয়ে যায়। বিশেষ করে আমার।
শি লাভস ইউ।
এমনিতে তো আমি ওর চোখের বিষ। লোককে বলে, আমি এবং আমরা কেউ নাকি ওকে পছন্দ করি না, ঘেন্না করি।
সেটা ওর বুঝবার ভুল!
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মোনা বলল, ভুল বোঝার তো শেষ নেই। তবে আমাকে একটুও পছন্দ করে বলে মনে হয় না। কিন্তু অসুখ-বিসুখ করলে খুব ঘাবড়ে যায় দেখেছি। রীতিমতো আপসেট। তাই মনে হয় একটু মায়া হয়তো আছে।
অমল একটু হাসল মাত্র। বেশি ব্যাখ্যায় গেল না। সে দেখেছে বেশি ব্যাখা-ট্যাখ্যা করতে গেলেই নানা রকম অনভিপ্রেত কথার সৃষ্টি হয় এবং তর্ক ঝগড়া ঘুলিয়ে ওঠে।
অমল শুধু বলল, ঠিক আছে। বিকেল পাঁচটা ছটা নাগাদ বেরোলেই হবে। ফেরার পথে পার্ক স্ট্রিট বা কোথাও ডিনার সেরে নিয়ে বাড়ি ফিরব। কী বলো?
সেটাই ভাল। ওরাও চাইনিজ-টাইনিজ খেতেই ভালবাসে।
অপু তার নিশ্চিন্দিপুর খুঁজতে বেরিয়ে পড়ল। মোনাকে বলল, একটু ঘুরে আসছি।
অপু তার নিশ্চিন্দিপুরকে কখনওই আর খুঁজে পাবে না, অমল তা জানে। একমাত্র অন্ধই খুঁজে পায়। সে তার মনের মধ্যে সব গড়ে নিতে পারে।
বিকেলে রওনা হল তারা। আসার সময় ড্রাইভার ছিল। কিন্তু সে থাকেনি। ছুটি নিয়েছে দুদিনের। তাতে অসুবিধে নেই। অমল ভালই চালায়। তবে অভ্যাস কম।
সোহাগ বলল, বাবা, পারবে তো!
খুব পারব।
বুডঢা বলল, দুর্গাপুর এক্সপ্রেসওয়েতে কিন্তু আমি চালাব বাবা।
সেটা কি ঠিক হবে? তোর লাইসেন্স নেই।
তাতে কি? ওখানে পুলিশ-টুলিশ থাকে না। আর আমি তো ভালই চালাই।
ঠিক আছে। চালাস কিছুক্ষণ।
শুধু এ ব্যাপারে নিস্পৃহ রইল সোহাগ। সে যন্ত্রপাতি পছন্দ করে না তেমন। গাড়ি চালানোর আগ্রহ তার কখনওই হয়নি।
সে বলল, আজ আমরা কোথায় খাব বাবা?
তোরাই ঠিক কর না।
বুডঢা বলল, তোমরা যাই বলল, আমার ফ্যানটাস্টিক লাগে ধাবা। ধাবার রান্না খেলে অন্য কিছু মুখে লাগে না।
সোহাগ বলল, তোর ধাবা ভাল লাগবে না কেন, তুই তো একটা ছোটোলোক।
তুই খাসনি, তাই বলছিস।
যত তাড়াতাড়ি ফেরা যাবে ভেবেছিল তারা তত তাড়াতাড়ি হল না। ট্রাকের একটা লম্বা জ্যাম পেরোতে গিয়ে ঘণ্টা খানেক মার খেয়ে গেল। তাও নটার মধ্যে পার্ক স্ট্রিটে ঢুকে গেল তারা।
নিজের পরিবারটিকে এতকাল অনুভবই করত না অমল। কত ছাড়া ছাড়া ছিল তারা, কত আলগা ছিল সম্পর্ক। এখন ততটা নয়। কোনও না কোনও সূত্রে তারা একটু কাছাকাছি হচ্ছে। পরস্পরের সঙ্গে তাদের বাক্য বিনিময় একসময়ে এত কম ছিল যে, বোবার বাড়ি মনে হত। এখন ততটা হয় না। পরস্পরের মধ্যে একটা আনন্দিত হাই-হ্যালো সম্পর্ক তৈরি হচ্ছে। ঠিক বেঁধে ওঠেনি এখনও। তবু হচ্ছে। প্রগ্রেস ভালই।
বাবা, তুমি কি ড্রিংক করবে?
কেন রে? করলে আপত্তি আছে?
না। তবে গাড়ি চালিয়ে বাকি পথটা ফিরতে হবে তো!
মেয়ের দিকে চেয়ে হাসল অমল। তারপর হঠাৎ বলল, ঠিক আছে, আজ শুধু খাবারটাই খাই। দেখি হজম করতে পারি কিনা।
মোনা সামান্য আপত্তি করে বলল, তোমার পুরনো অভ্যাস। একদম ড্রিংক না করলে কি পারবে?
চেষ্টা করা যাক। বলে হাসল অমল।
বুডঢা মন দিয়ে মেনু পড়ছিল। বলল, আমি কিন্তু একটা চিংড়ি খাবোই। আর চাওমিন, তোমরা?
সোহাগ বলল, আমার টেস্ট বাড চেঞ্জ করে গেছে। আজ বড়মা কচুর শাক রেঁধেছিল। সেটা খেয়ে এত মুগ্ধ হয়ে গেছি যে এসব আমার ভাল লাগবে না। জীবনে খাইনি ওরকম জিনিস।
মোনা অমলকে বলল, তোমার মেয়ে কিন্তু আস্তে আস্তে গেঁয়ো হয়ে যাচ্ছে।
তা যাচ্ছি। উচ্ছে চচ্চড়ি, চাপর ঘন্ট, খেজুর গুড় চালতা আর নারকোল দিয়ে অম্বল, পাটিসাপটা— ইট ওয়াজ এ রিয়েল ট্রিট।
অমল স্নিগ্ধ চোখে তার পরিবারটিকে দেখছিল।
হ্যাঁ গো, তুমি সত্যিই ড্রিংক করবে না?
না, আজ থাক। তেমন অসুবিধে বুঝলে বাড়িতে ফিরে শোওয়ার আগে একটু খেয়ে নেওয়া যাবে।
খেয়ে-দেয়ে বিল মিটিয়ে উঠতে রাত এগারোটার কাছাকাছি হল। বাড়ি ফিরতে সোয়া এগারোটা।
লিফটে ওপরে উঠে তার হ্যান্ডব্যাগ খুলে দরজার চাবি বের করল মোনা। বলল, হ্যাসবোল্ট দিয়ে না থাকলে বেচারাকে আর জাগানোর দরকার নেই।
হ্যাসবোল্ট দেওয়া ছিল না। চাবি ঘোরাতেই নিঃশব্দে দরজা খুলে গেল। বাঁদিকে পর পর দুখানা শোওয়ার ঘর দুই ভাইবোনের। ডানদিকে অমলের স্টাডি, হলঘরে মৃদু একটা বাল্ব জ্বলছে, আর পুরো ফ্ল্যাটটা অন্ধকার। বুডঢা আর সোহাগ তাদের ঘরে গিয়ে ঢুকল।
মোনা শোওয়ার ঘরের দরজায় চাবি দিয়ে খুলতে গিয়ে একটু থমকাল।
অমলের দিকে চেয়ে ঠোঁটে আঙুল দিয়ে চুপ থাকতে ইশারা করে দরজায় কান পেতে কিছু শুনল।
তারপর ফিসফিস করে বলল, ভিতরে কারা আছে বলো তো!
অমল অবাক হয়ে বলল, কে থাকবে!
মেয়ের গলা শুনতে পাচ্ছি।
মাই গড!
দেখ তো, প্যাসেজের ঘরে বাসুদেব আছে কিনা।
অমল গিয়ে দেখল, বিছানা ফাঁকা।
স্কাউড্রেলটা কি বান্ধবী নিয়ে তাদের ঘরে ফুর্তি করছে! সেটা কি সম্ভব? গত দু বছর ধরে আছে, বিশ্বাসী ভাল লোক বলেই তো বিশ্বাস ছিল তাদের!
মোনা তার হাতে চাবিটা দিয়ে বলল, দুজন আছে। ডুয়িং সামথিং… দরজাটা তুমিই খোলো।
বুডঢা তার ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছে।
এনিথিং রং ড্যাড?
কিছু সন্দেহ করে সোহাগও বেরিয়ে এল, কী হয়েছে মা? আমি দেখছি।
অমল চাপা গলায় বলল, তোরা ঘরে যা। বি অন দি সেফ সাইড। আমি দেখছি।
বুডঢা অবশ্য এগিয়ে এসে বলল, ইনট্রিউডার?
তাই মনে হচ্ছে।
অমল দরজাটা খুলল না। নক করল।
ভিতরে কথাবার্তা থেমে গেল। একদম চুপ।
অমল ফের নক করে বলল, দরজা খোলো।
কোনও কাজ হল না কথায়। অগত্যা অমল চাবি ঘুরিয়ে দরজাটা খুলে ফেলল।
ভিতরে আবছা আলোয় দুই নগ্ন নরনারী তাড়াতাড়ি তাদের পোশাক পরে নেওয়ার নিস্ফল চেষ্টা করছিল। অমল আলোটা জ্বেলে দিল।
দুটি নগ্ন নরনারী তাদের নগ্নতা ঢাকার ব্যর্থ চেষ্টা করতে গিয়ে অপ্রস্তুত হয়ে দাঁড়াল।
অমল দরজাটা ভেজিয়ে দিয়ে বাইরে থেকে বলল, আপনারা পোশাক পরে বেরিয়ে আসুন।
মোনা বলল, কারা?
অমল একটা মাথা নাড়া দিয়ে বলল, ছেলেটাকে চিনি না। মহিলা ওপরের তলার সুহাস মজুমদারের বউ।
কে! পিউ?
হ্যাঁ।
সর্বনাশ! পিউ কী করছিল আমার ঘরে?
ওকেই জিজ্ঞেস করো।
ছিঃ ছিঃ। সেই জন্যেই আমার শোওয়ার ঘরে মাঝে মাঝে কন্ডোম পাওয়া যায়! ছেলেটা কে?
কী করে বলব? তবে ভদ্রলোকের মতোই তো চেহারা।
সে ছেলেমেয়ের দিকে চেয়ে বলল, তোদের দেখলে লজ্জা পাবে। তোরা বরং একটু আড়ালে যা।
সোহাগ তেতো মুখে বলল, আমাদের ফ্ল্যাটে এসব কী হচ্ছে বলো তো! কেন এরকম হবে?
অমল দাঁতে দাঁত চেপে বলল, বাসুদেব স্কাউড্রেলটাকে আজ রাতেই বিদেয় করে দেব বুঝলে?
মোনা বলল, বিদায় করব মানে? ওকে পুলিশে দেব। বুডঢা থানায় ফোন কর তো!
অমল বলল, প্লিজ! অতটা কোরো না। পুলিশ এলে বিচ্ছিরি লজ্জার ব্যাপার হবে।
হোক। তা বলে ছেড়ে দেব? কোথায় গেল বলো তো! নীচে গিয়ে কোথাও আড্ডা মারছে হয়তো
ধীরে দরজা খুলে মাথা নিচু করে দুজন বেরিয়ে এল। ছেলেটি লম্বা, ফর্সা এবং সুপুরুষ। মেয়েটিকে তারা সবাই চেনে, ওপরের তলার পিউ। চমৎকার ফিগারের জন্য তার প্রশংসা হয়ে থাকে।
কোথাও কিছু না, হঠাৎ বুডটা একটু খাপ্পা হয়ে এগিয়ে এসে লোকটাকে ঠাস করে একটা চড় মারল।
লোকটা পালাল না। দাঁড়িয়ে একটু অবাঙালি টানে বাংলাতেই বলল, মারছেন কেন? আমি কী করেছি?
কিছু করনি!
অন্যায় কিছু করিনি। এ বাড়ির কেয়ারটেকারকে নগদ একশো টাকা দিয়ে তবেই ঢুকেছি। এতে অন্যায়ের কী আছে?
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন