শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
সিগারেট ছেড়ে কি শেষে নস্যি ধরলে নাকি হে বাঙাল?
আর কইয়েন না খুড়া। মাঝখানে কাশের লগে ছিটা ছিটা রক্ত পড়ছিল। ডাক্তার দেইখ্যাই সিগারেট বন্ধ কইরা দিল। ত্রিশ বচ্ছরের নেশা ছাড়ন কি সোজা? ধুয়া বন্ধ হইতেই কেবল ঘুমে ধরে, মাথা কাম করে না।
ওঃ, বিড়ি সিগারেটে নেশা বড় জব্বর। আমাকেও খুব জ্বালিয়েছে। তা নস্যি কেমন জিনিস বলো তো!
সিগারেটের কাছে লাগে না। কিছুদিন খইনিও খাইছিলাম। জুইত হইল না, বোঝলেন! মেলা ডলাডলি করতে হয়।
দাও দেখি এক টিপ, নিয়ে দেখি।
লন, লন। দুই একটা হাইচ্চো মারলে মাথা পরিষ্কার হইয়া যাইবো।
ধীরেন কাষ্ঠ এক টিপ নিল দু আঙুলে চেপে। তার সবই চলে। এই দেহ যে কী চায় সব সময়ে তার দিশা পাওয়া যায় না। সব রকম রসই শরীরকে দিয়ে দেখে ধীরেন। তার সবই সয়। কাটোয়ায় কিছুদিন সাধুসঙ্গ হয়েছিল। তখন গাঁজাও চাপান দিয়েছে। জিনিস খারাপ নয়। শরীর গরম হয়, খিদে বাড়ে, দুনিয়াটাকে ভারী ভাল লাগে। একসময়ে গায়ের বড়লোক ছিল পীতাম্বর। বাপের সুদের কারবার ছিল, দোহাত্তা পয়সা। বাপ লোপাট হওয়ার পর কদিন খুব ফুর্তি লুটেছিল বটে। তখন তার মোসাহেবি করে কয়েকদিন খুব হুইস্কি ব্র্যান্ডি চলেছিল ধীরেনের। কিছু খারাপ লাগত না। সঙ্গে ছোলার চাট থাকত, কাঁচা পেঁয়াজ, মাংসের বড়া। সে একটা দিনই গেছে। তবে বেশি দিন নয়। বছর না-ঘুরতেই পীতাম্বরের বাবার পয়সা উবে গেল, তখন তার হা-ভাত জো-ভাত। ধীরেন দেখল মদ সে খেয়েছে বটে, কিন্তু নেশায় ধরেনি। মদের উৎস বন্ধ হতেই সে আবার যেমন-ধীরেন তেমন-ধীরেন হয়ে গেল।
গোটা চারেক হাঁচি হল ধীরেনের। মাথায় বেশ একটা ঝাকুনি লাগল। আর একেবারে ব্রহ্মরন্ধ পর্যন্ত একটা ঝিলিক তুলে দিয়ে গেল এক টিপ নস্যি।
নাকের জলটা ঝেড়ে নিয়ে ধৱা লগায় ধীরেন বলল, বেশ জিনিস বাপু। কখনও পরখ করা হয়নি বটে। বেশ ঝাঁঝ আছে কিন্তু, ওঃ, এক টিপেই একেবারে নাকের জলে চোখের জলে অবস্থা।
ওই প্রথম প্রথম একটু ঝাঁঝ দেয়। তারপর দেখবেন ম্যান্দামারা জিনিস। ভুসিমাল। তবু লগে লগে রাখি। তামুকপাতা তো, একটু সাইকোলজিক্যাল এফেক্ট হয় বোঝলেন?
ধীরেন বুঝেছে। মাথা নাড়ল। ভিতরের যন্ত্রপাতি একটু ঝাকুনি খেয়েছে। প্রায় আশি বছরের পুরনো কলকবজা, কখন কোনটা বিগড়োয় তার ঠিক কী? মানুষ বেশি বুড়ো হলে প্রাণবায়ু যখন-তখন বেরিয়ে যেতে পারে। এই যে চারটে পেল্লায় হাঁচি হল এর যে-কোনও একটা হাঁচির সঙ্গেও তো বেরিয়ে যেতে পারত। দুঃখকষ্টের জীবন, প্রাণবায়ু বেরিয়ে গেলে একরকম বোধহয় ভালই। তবু কে জানে কেন, ধীরেনের মরতে ইচ্ছে যায় না। জীবনে আর কিছু হওয়ার নেই, জানে। কিছু করার নেই, তাও জানে। কিছু দেখার নেই, উপভোগ করার নেই, সব জানে। তবুমরতে ইচ্ছে যায় না। এ একটা অদ্ভুত ব্যাপারই বটে। আলায়-বালায় অকাজে ঘুরে বেড়ায় সে, কত কী চোখে পড়ে। পোকাটা, মাকড়টা, গাছটা, ফুলটা, পাখিটা, সবই দেখে ধীরেন। বেলা শেষের ঢলানে আলো, কি মাঠের ওপর মেঘের ছায়া, ছেলেদের ফুটবল খেলা সব কিছুই ভারী উপভোগের ব্যাপার তার কাছে। শব্দ-গন্ধ-স্পর্শ কত রকমই তো সবসময়ে তৈরি হচ্ছে চারধারে। এইসব ছোটখাটো ব্যাপারই আজকাল ভারী গুরুতর হয়ে ওঠে তার কাছে। ঘরে কুলুঙ্গির ওপরে চড়াই পাখি বাসা করছে, তাই দেখতে দেখতে চৌপর দিন কেটে যায় তার। পৃথিবীতে নিঃশব্দে যে কত ঘটনা ঘটে যায় মানুষ তা টেরই পায় না।
কই খুড়া, আপনের জোগাইল্যা তো অখনও আইল না?
বর্ধমান থেকে আসবে তো, তাই দেরি হচ্ছে।
কিছু মনে কইরেন না খুড়া, গ্রামের মাইনষের কিন্তু টাইমের ঠিক নাই। ঘটি মাইনষের গায়েগতরে বড় আইলসামি। হেইর লিগ্যাই তো আমি কইলকাতা থিক্যা মিস্তরি আনতে চাইছিলাম। কিন্তু আমার বিদ্যাধরী বউ কয়, না পাম্পের কাম খুড়া করব। আমি কই, খুড়া তো বুড়া হইছে, হায়-হয়রানের কাম কি পারব? কিন্তু হ্যায় শোনে না। তা খুড়া, আপনের বয়স কেমন হইল?
এক গাল হেসে ধীরেন বলে, তা বাপু, বয়সের হিসেব কে আর রাখে! তুবে আশির কাছাকাছি হবে বলে মনে হয়। মহিমদারই বিরাশি চলছে। আমার চেয়ে ধরো তিন চার বছরের বড়।
বাপ রে! আশি তো মেলা বয়স খুড়া! এই বয়সে অসুইরা খাটনি কি পারবেন?
খুব হাসল ধীরেন, ও বাঙাল, আমি কি ফুলবাবুটি নাকি? খেটেপিটে টনকো শরীর। তবে চোখটাই যা ঝাপসা। ছানি কাটানোর তারিখটাও দিচ্ছে না ব্যাটারা। কবে থেকে নাম লিখিয়ে বসে আছি।
অন্যের লেঙ্গুর ধইরা পইড়া থাকলে তো ওই রকমই হয়।
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ধীরেন বলে, যা বলেছ।
আমার বউ কয়, ধীরেন খুড়া কলকবজা খুব ভাল চিনে। খুড়া হাত লাগাইলেই কল কথা কয়। তা হইলে খুড়া, আপনে তো মেলা পয়সা করতে পারতেন!
মাথা নেড়ে ধীরেন বলে, না হে বাপু, গাঁ-দেশে কলকবজার কাজ কোথায়? এই গাঁয়ে তো ওভারহেড ট্যাঙ্কের বালাই ছিল না। পুকুর আর টিউবওয়েল। ইদানীং চার-পাঁচজন করেছে বটে। আমি বোকা লোক তো, তাই যা পারি শিখেছি। কিন্তু কোনওটাই কাজ দেয়নি। কলকবজা বরাবর খুব ভাল লাগত আমার। ইলেকট্রনিক ব্যাপারটা বুঝতে পারি না বটে, কিন্তু সাবেক যন্ত্রপাতি, কলকবজা খানিকটা চিনি। গাঁ-দেশে ও-বিদ্যের কদর নেই।
সকাল সাড়ে আটটা বাজে। পড়ার ঘর থেকে মরণ বারবার উঁকি মেরে দেখছিল মিস্তিরিরা এসেছে কিনা। মিস্তিরিরা এলে তার সুবিধে হয়। সবাই হুড়োহুড়ি করে পাম্পসেট নিয়ে পড়বে। গোলে হরিবোল দিয়ে সেও উঠে পড়তে পারবে। কিন্তু সেটা আর হয়ে উঠছে না। মিস্তিরিরা আসতে যে কেন এত দেরি করছে কে জানে! বাবা আর ধীরেনদাদু কখন থেকে উঠোনে বসে কথা কয়ে যাচ্ছে।
ওই দিদি নামছে সিঁড়ি দিয়ে। চোখে এখনও ঘুম। দাদা আর দিদি দুজনেই বেলা করে ঘুম থেকে ওঠে। কালও অনেক রাত অবধি টিভি দেখেছে সবাই মিলে। শুধু মরণকে বাদ দেওয়া হয়েছিল। মরণের নাকি টিভি দেখতে নেই। মরণের কপালটাই এরকম। বাড়িতে একটা নতুন জিনিস এল, অমনি মরণের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি হয়ে গেল। মরণের অবশ্য দুঃখ নেই। এবাড়ি সে বাড়ি ঘুরে সে ইচ্ছে করলে টিভি দেখতেই পারে। তবে কিনা তার টিভি দেখার বেশি নেশা নেই। তার চেয়ে মাঠঘাট, উধাও আকাশ, পাঁই-পাঁই করে ছুট, তার বেশি ভাল লাগে।
নামতে নামতে দিদি একটা হাই তুলল। ঘুম-চোখে চারদিকটা দেখল। ইস্, এখন যদি দিদির মরণের কথা মনে পড়ে তবে বড্ড ভাল হয়। একবার ডাকলেই সে এক লাফে গিয়ে দিদির সঙ্গে জুটে যেতে পারে। তাহলে বাবা আর কিছু বলবে না। মরণ দেখেছে, তার বাঙাল বাবার দিদির ওপরেই একটু বেশি টান। এই যেমন এ-বাড়িতেও বাবা হাম্মিকেই বেশি ভালবাসে, তাকে দুর-ছাই করে।
কিন্তু দিদিও ডাকল না তাকে। কিছুক্ষণ উঠোনে দাঁড়িয়ে চারদিকে চেয়ে চেয়ে দেখতে লাগল। গায়ে ফুলহাতা সোয়েটার। তার ওপর গরম চাদর। দিদি বলে, ইস্, তোদের এখানে এত ঠান্ডা কেন রে? সবই যেন তোদের বেশি বেশি।
মরণ খুব হি হি করে হাসে। বলে, তোমার বড্ড শীত, না? তাহলে তুমি শীতকাতুরে আছ।
আহা, আর বীরত্ব দেখাতে হবে না। তুই যে চানের সময় রোজ গাঁইগুঁই করিস।
সেটা ঠান্ডা জলের ভয়ে নয় গো। পুকুরে পড়ে কতক্ষণ দাপাই জান না?
তাহলে গাঁইগুঁই করিস কেন?
তোমরা আছো বলে রোজ মা আমাকে সাবান মাখায় যে!
ওমা! আমরা না থাকলে তুই বুঝি সাবান মাখিস না?
না তো! সাবান মাখতে বিচ্ছিরি লাগে।
আর তেল মাখতে লাগে না বুঝি? রোজ তো দেখি চানের আগে কলুর মতো জ্যাবজ্যাবে করে সর্ষের তেল মাখিস! মা গো, সর্ষের তেল যা বিচ্ছিরি জিনিস!
মরণের মুখ শুকিয়ে গেল। সর্ষের তেল কি খারাপ জিনিস দিদি?
খারাপই তো! বিচ্ছিরি গন্ধ। সর্ষের তেল মাখলে রংও কালো হয়ে যায়!
মরণ দুশ্চিন্তায় পড়ে গিয়ে বলে, ঠিক তো! তাই আমি কালো, না দিদি?
পুঁটি টেরছা চোখে তার দিকে একটু চেয়ে বলল, তুই অবশ্য তেমন কালো নোস। সাবান মাখছিস বলে বেঁচে গেছিস। হ্যাঁ রে, তুই তো সাঁতার জানিস!
হ্যাঁ তো।
কী করে শেখে রে?
আমি তো বাবার কাছে শিখেছি। বাবা একদিন ধরে মাঝপুকুরে নিয়ে গিয়ে ছেড়ে দিল। হ্যাঁচোড়-প্যাঁচোড় করে হাত-পা দাপিয়ে কোনওরকমে পাড়ে আসতেই বাবা বলল, এই তো সাঁতার শিখে গেছিস। ব্যস, সেই শিখে গেলাম।
ও বাবা! আমি পারব না। ডুবে যাবো।
গাঁয়ের মেয়েরা কেমন করে শেখে জানো?
কেমন করে?
বুকে কলসি নিয়ে।
দুর! ওটাও আমি পারব না। বুকে কলসি চেপে জলে নামলে লোকে হাসবে।
সব মেয়েই তো তাই করে।
তোদের গায়ের মেয়েগুলো যা বোকা!
কেন, আমাদের পান্নাদি আছে।
পুঁটি হেসে ফেলে বলল, আহা, কথা উঠলেই কেবল পান্নাদি! পান্নাদি তোর মাথাটা খেয়েছে। নিয়ে আসিস, দেখবখন তোর পান্নাদিকে।
পান্নাদি কী সুন্দর নাচে, গায়।
জানি তো কেমন নাচ আর গান! রবীন্দ্রসংগীতের সঙ্গে নাচে তো! ও সবাই পারে। আর নিশ্চয়ই নাকি সুরে প্যানপ্যান করে গায়!
দিদির ভঙ্গি দেখে ফের হি হি করে হাসল মরণ। বলল, তবে দাদা পুজোর ফাংশনে পান্নাদির গান শুনে বলেছিল, পান্নাদি নাকি ভাল গায়।
নাক সিটকে পুঁটি বলে, ও গানের কিছু বোঝে?
বাঃ, দাদা যে গায়! সবাই প্রশংসা করে।
পুঁটি হেসে ফেলে বলে, তবেই হয়েছে। ওই যদি তোদের কাছে ভাল গান হয় তবে পান্নাদি তো এখানকার লতা মঙ্গেশকরই হবে।
হ্যাঁ দিদি, তুমি বুঝি আরও ভাল গাও?
পুঁটি মাথা নেড়ে বলে, না রে, আমি গান জানিই না। তবে শুনতে ভালবাসি। আমার কাছে গাদা-গাদা গানের ক্যাসেট আছে।
গাও না কেন?
আমি পারি না।
নাচ জানো?
না তো! ওসব আমার আসেই না।
দিদিটা যে একটু পাগলি মতো আছে তা আগেই বুঝে গিয়েছিল মরণ। নাচ-গান না জানলেও দিদি দৌড়ঝাঁপে ভারী ভাল। দুদিনে গাছে-টাছে উঠতে শুরু করে দিল। এই কুল পাড়ছে, এই পেয়ারা পাড়ছে, কদবেলের গাছেও উঠে গেল একদিন। মরণ ভয়ে মরে।
ও দিদি, পড়ে যাবে যে!
অত সোজা নয়।
তুমি বেশ ডানপিটে আছ কিন্তু।
সবাই তাই বলে। তুই কি ভাবিস তুই একাই ডানপিটে?
দিদিটাকে তাই মরণের বড্ড ভাল লেগে গেছে। মাত্র দু-তিন দিনেই সে দিদির খুব কাছ-ঘেঁষা হয়ে গেছে।
খানিকক্ষণ দিদি উঠোনে ঘোরাফেরা করল। কয়েকটা কুকুরছানা এ ওর গায়ে উঠে খেলছিল, সেগুলোকে আদর করল খানিক। তারপর বোধহয় হঠাৎ মরণের কথা মনে পড়ল।
জানালার কাছে এসে বলল, অ্যাই!
মরণ একগাল হেসে বলল, কী দিদি?
এতক্ষণ হাঁ করে জানালার দিকে চেয়ে বসেছিলি কেন রে? তোর পড়া নেই?
হয়ে গেছে তো!
পুঁটি হেসে ফেলে বলে, হয়ে গেছে না হাতি! পড়া ধরলেই তো এখন মুখ শুকিয়ে যাবে।
কোন ভোর থেকে পড়ছি যে!
কেমন পড়ছিস খুব জানি। ওই বুড়োটা কে রে? বাবার সঙ্গে বসে গল্প করছে।
ও হচ্ছে কাষ্ঠদাদু।
কাষ্ঠদাদু! সে আবার কী! কাষ্ঠ মানে তো কাঠ।
দাদুর পদবি কাষ্ঠ যে!
যাঃ!
সত্যি!
হি হি করে হেসে পুঁটি বলে, তোদের গ্রামটাই ভারী মজার। জন্মে কখনও কাষ্ঠদাদু শুনিনি বাপু। লোকটা কী করে?
কিছু করে না। ঘুরে বেড়ায়।
বাঃ, বেশ তো! শুধু ঘুরে বেড়ায়?
কাষ্ঠদাদুই তো আজ আমাদের পাম্পসেট সারাবে। কাষ্ঠদাদুর লোকেরা আসবে বলে বসে আছে।
তাই বল, মিস্তিরি।
না, কাষ্ঠদাদু মিস্তিরিও নয়।
তাহলে মেশিন সারাবে কী করে?
কাষ্ঠদাদু সব জানে। কিন্তু কিছু করে না।
পুঁটি হঠাৎ ভ্রূ কুঁচকে বলল, আচ্ছা আমার নাম যদি সুমনা কাষ্ঠ হত তাহলে কেমন হত বল তো৷
বিচ্ছিরি।
সাহার চেয়ে ভালই হত। ইন্টারেস্টিং সারনেম। তুই হতি মরণ কাষ্ঠ।
যাঃ!
অনেক পড়ার ভান হয়েছে। এখন বেরিয়ে আয় তো। চল একটু ঘুরে আসি।
এই ডাকটুকুর অপেক্ষাতেই ছিল মরণ। বইখাতা বন্ধ করে দুটো লাফ মেরে বেরিয়ে এল।
চলো।
কোথায় যাব বল তো! চল আজ তোর পান্নাদিকে দেখে আসি।
চলো তাহলে।
এই যে দিদিটাকে সে এত ভালবাসে, এটা ঠিক হচ্ছে কিনা এ নিয়ে তার একটা ধন্ধ আছে। জিজিবুড়ি মাঝে মাঝে ঘরের পিছন দিয়ে তার জানালায় উঁকি মারে। সেদিন এসে বলল, ওরে মুখপোড়া, অত গাল ভরে ভরে দাদা দিদি বলে যে ডাকিস, ওরা কি সত্যিই তোর কেউ হয়? জন্মে ততাদের মতো আহাম্মক দেখিনি বাপু। বলি ওদের সঙ্গে অমন নেই-আঁকড়েপনা করতে আছে? মতলব তো জানিস না!
অবাক হয়ে মরণ বলেছিল, মতলব! কীসের মতলব?
পেটের কথা সব টেনে বের করতে এয়েচে। তুই তো তোর মায়ের মতোই বোকা। কত বোঝালুম বাসন্তীকে, ওলো, সতীনপো, সতীন-ঝিকে নিয়ে অমন মেতে থাকিস না। একটু রাশ টেনে চল। তা কান দিচ্ছে কথায়? জান চুঁইয়ে ওদের খুশি করতে লেগেছে। বলি দুনিয়ার নিয়ম কি তুই উলটে দিতে পারবি রে আহাম্মক। সতীনের ছায়েরা কখনও আপনা হয়? বরং তোর ভালমানুষি দেখে ঘাড়ে চেপে বসবে।
মৃদু প্রতিবাদ করে মরণ বলল, কী বলছ জিজিবুড়ি! দিদিটা তো ভীষণ ভাল।
ওরে, অমন সেজে থাকে। চোখ দুটো দেখিস, মিটমিটে শয়তানি ঘাপটি মেরে আছে ভিতরে। শুনলুম তো একরাত্তির থেকে চলে যাবে। গেল? আজ তিন দিন গ্যাঁট হয়ে বসে আছে।
মা-ই তো যেতে দেয়নি। বলেছে, এই প্রথম এলে, এখনই যাবে কী? তোমাকে তো ভাল করে দেখলুমই না।
ওই তো, নিজের পায়ে কুড়ুল মেরে বসে রইল। সাধে কি বলি আহাম্মকের গু তিন জায়গায়? ঘটে বুদ্ধি থাকলে প্রথম থেকেই শক্ত হয়ে কোমর বেঁধে রুখে দাঁড়ালে এ-বাড়িতে মৌরসিপাট্টা গেড়ে বসতে পারত না।
দাদা দিদিকে খারাপ বলছ কেন জিজিবুড়ি? ওরা তো কিছু করেনি!
তুই তো আর একটা হাঁদা গঙ্গারাম। বুঝবি কী করে? ওপর ওপর ভালমানুষি দেখাচ্ছে, তলায় তলায় কাজ সারছে। এই যে আসা-যাওয়া শুরু হল, এ কি ভাল হচ্ছে? খাল বেয়ে কুমির আসছে বই তো নয়। এই যে ঢুকল এই কিন্তু ঢুকে পড়ল। আর বেরোবে ভেবেছিস? ছুতোয়নাতায় এসে হাজির হবে। এখন তো ছানাপোনা পাঠাচ্ছে, এর পর রাঘব-বোয়ালটাও এসে ঢুকবে, বুঝলি? তোর আহাম্মক মাকে দিয়ে পা টেপাবে, দাসীগিরি করাবে। আর তোরা হবি সব চাকর-বাকর।
ভয় খেয়ে মরণ বলে, ধ্যাত, কী যে বল না!
দুর মুখপোড়া, ঘটে বুদ্ধি থাকলে ঠিক বুঝতে পারতিস। বাঙালরা সব বশীকরণ বিদ্যে নিয়েই জন্মায়, বুঝলি? ওসব বিদ্যেধর বিদ্যেধরী, এমন ভাবখানা করবে যেন চোখে হারাচ্ছে। দাঁত নখ সব লুকিয়ে রাখছে এখন, বুঝলি? যখন হালুম করে ঘাড়ে এসে পড়বে তখন তোদের আক্কেল হবে।
মরণ কাঁদো-কাঁদো হয়ে বলে, ওরা মোটেই ওরকম নয়। দিদি তো আমাকে কত ভালবাসে।
আহা আবার গাল ভরে দিদি ডাকা হচ্ছে! তা হ্যাঁ রে, তোর কি দিদির অভাব? তা যা না কুসুমদির কাছে, টগরদির কাছে। তারা দেখিস কত ভাল। মামাতো দিদি সব, এক গাঁয়ে মানুষ, মায়ের পেটের দিদির মতোই তো!
এ কথায় মরণ একটু ভয় খায়। তার মামাতো দিদিদের সে খুব চেনে। এমন ঝগড়ুটে যে বলার নয়। লেখাপড়ার বালাই নেই তাদের। দেখা-সাক্ষাৎ হলে বাঁকা বাঁকা কথা শোনায় খুব। তোরা তো বড়লোক। তোর মা তো বাবুর রাখা-মেয়েমানুষ। বাঙালদের পূর্বপুরুষেরা সব রাক্ষস ছিল… এমনি সব কথা।
মরণ টপ করে বলল, না, আমার দিদির দরকার নেই তো!
আহা, ও কি কথা! দরকার আবার কারও হয় নাকি?
কুসুমদি, টগরদির সঙ্গে মিশতে মা বারণ করেছে।
ওই তো ওর দোষ। আপনার জন ছেড়ে শত্তুরের ভজনা করতে লেগেছে। বলি কী, ওই শ্যাওড়াগাছের পেত্নীটাকে একবার ভুলিয়ে ভালিয়ে নিয়ে আয় না মামাবাড়িতে। টগর আর কুসুমের মুখে ফেলে দে। দেখবি বিষ একেবারে ঝেড়ে দেবে। গাঁ ছেড়ে পালানোর পথ পাবে না। তোদের ভালর জন্যই বলছি। নিজেরা না পারিস, আমরা সব আপনজনেরা তো আছি, দে না আমাদের হাতে ছেড়ে।
জিজিবুড়ি, বাবা যদি জানতে পারে, তুমি এসব কথা বলেছ, তাহলে কিন্তু কুরুক্ষেত্র হয়ে যাবে।
ওই দেখ, কী এমন খারাপ কথা বললুম বল তো! তোদের ভালর জন্যই তো বলা, নাকি! বাঙালের কানে কথাটা তুলবি কেন রে বোকা? সেই তো নষ্টের গোড়া। তোদের আর এজন্মে আক্কেল হবে না।
দিদি মোটেই শ্যাওড়াগাছের পেত্নী নয়।
আহা, তবে কি রম্ভা মেনকা নাকি? হাড়গিলে চেহারা, কেলে কুষ্টি, গেছো মেয়েছেলে। এই তো শুনলুম বেলগাছে উঠে নাকি বেল পাড়ছিল। শুনেছিস কখনও মেয়েছেলে বেলগাছে ওঠে? ও হল বামুন গাছ। যে মেয়েছেলে বেলগাছে ওঠে সে হল ডাকিনী-যোগিনী। বুঝলি? কালও তো সন্ধেবেলায় দেখলুম, এলোচুলে ছাদে ঘুরে বেড়াচ্ছে। সন্ধেবেলা এলোচুলে কারা ঘুরে বেড়ায় জানিস? ডাইনিরা। কোন মন্তরে তোকে বশ করেছে কে জানে। এর পর কোনওদিন দেখব, ভেড়া হয়ে পাছু পাছু ঘুরে বেড়াচ্ছিস।
চোখ ফেটে জল আসছিল মরণের। দিদিটাকে সে সত্যিই খুব ভালবাসে। সে বলল, এখন তুমি যাও জিজিবুড়ি।
যাচ্ছি বাবা যাচ্ছি। মেয়েটাকে বাঙালের ঘরে দিয়ে যে কী পাপই করেছি বাবা, দিনরাত বুকটা ধড়াস ধড়াস করে। বিয়ের ভড়ং করে মেয়েটার মাথা চিবিয়ে খেল। বোকা মেয়ে বুঝতেও পারছে না, দোরগোড়ায় সর্বনাশ এসে দাঁড়িয়ে রয়েছে। এখন শক্ত না হলে কি জোতজমি, বিষয়-আশয় কিছু থাকবে? সব ফক্কা হয়ে যাবে একদিন দেখিস। তখন বাবা, আমে-দুধে মিশে যাবে আর তোরা আঁটি চুষবি। আমি হলে কবে কুলোর বাতাস দিয়ে বিদেয় করতুম। হরেন কাপালিককে ধরেছি, এখন দেখি সে কী করে। তার মায়ের বটুয়া থেকে পঁচিশটা টাকা সরিয়ে এনে চুপটি করে আমাকে দিবি ভাই?
টাকা! টাকা দেব কেন?
হরেন চেয়েছে।
শঙ্কিত মরণ জিজ্ঞেস করে, হরেন ঠাকুর কী করবে জিজিবুড়ি?
জিজিবুড়ি ঝেঁঝেঁ উঠে বলল, ওই আঁটকুড়ির ব্যাটার কি আর সাধন-ভজন আছে, নাকি ভক্তি আছে! দিনরাত দিশি মদ চাপান দিয়ে পড়ে থাকে, গাঁজা, চরস, গুলি কোন গুণটা নেই? তার কি আর বাণ-বশীকরণের তেমন ক্ষ্যামতা আছে? তবু জোর ধরে পড়েছি, যদি লেগে যায়। পঁচিশ টাকায় কি আর রাজি হয়! তার খাঁই অনেক। তবু ঘাড় কাত তো করেছে। এখন দেখা যাক। কাজ না হলে আমিও তো সোজা পাত্রী নই, ঝেড়ে কাপড় পরাব। যা দাদা, টক করে নিয়ে আয়।
ও আমি পারব না জিজিবুড়ি।
ওরে তোদের ভালর জন্যই তো করছি।
বাণ মারা বুঝি ভাল?
যেমন কুকুর তার তেমন মুগুর তো চাই রে ভাই। ওরা কি সোজা ত্যাঁদড়?
না, জিজিবুড়ি, আমি টাকা আনতে পারব না।
তোদের কপালে কী লেখা আছে জানিস? তোবড়ানো বাটি হাতে নিয়ে দোরে দোরে ঘুরে ভিক্ষে করবি। নিজের ভাল যে বোঝে না তাকে কে বোঝাবে বাবা?
তুমি যে হরেন ঠাকুরকে বাণ মারতে বলেছ, তা বাবাকে বলে দেব।
দুর হ গু-খেগোর ব্যাটা। ছিঃ দাদা, ওসব কি বলতে আছে? আচ্ছা না হয় থাকগে। বলিসনি যেন।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন