দ্বিতীয় অধ্যায়

শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

দুই

সন্ধেবেলার ঝুঁঝকো আঁধারে হঠাৎ তাকে দেখে খুব অবাক আর খুশি হয়ে সন্ধ্যা বলে উঠল, পারুলদি না কি? ও মা, আয় আয় পারুলদি! কতদিন পর!

যারা কাজ করে, যারা বেঁচে থাকার জন্য ক্রমাগত লড়াই করতে থাকে তাদের সৌন্দর্য বুঝতে পারে পারুল। ভাবালু মানুষ বা কামুক কখনও এই সৌন্দর্য খুঁজে পায় না। তাদের চোখে সন্ধ্যা কালো, বেঁটে, একটু মোটা, ছোটো ছোটো চোখ এবং লাবণ্যহীন মুখ। বয়সও হল সন্ধ্যার। হিসেবমতো তেত্রিশ বা চৌত্রিশ।

সন্ধ্যা যখন আবেগবশে তাকে জড়িয়ে ধরল তখন তার গা থেকে ঘাম আর নানা মশলার একটা ঝাঁঝালো গন্ধ পেয়েছিল পারুল। সেন্ট, পাউডার, রূপটানের কোনও গন্ধ নয়।

এসবই পরশু দিনের কথা। এ-বাড়িতে গত কুড়ি বছর আসেনি পারুল। বাপের বাড়িতে এলেও এ-বাড়িতে কখনও নয়। কিন্তু পরশুদিন নিশিতে পেয়েছিল তাকে, যখন শুনল, অমল রায়ের বউ আর ছেলেমেয়ে গাঁয়ের বাড়িতে এসে কয়েকদিন ধরে রয়েছে। অবাক হওয়ার মতোই খবর। পারুলের বিয়ের এক বছরের মধ্যেই অমল রায় বিয়ে করে। হয়তো পারুলের ওপর ওটা একটা নিষ্ফল প্রতিশোধ। তারপরই জার্মানিতে চলে যায়। বছর পনেরো বাইরে বাইরে কাটিয়ে বছর পাঁচেক হল কলকাতায় ফিরে বড় চাকরি করছে। গাঁয়ে আসবে কখন তারা? সবাই যে ভীষণ ব্যস্ত। আর আসবেই বা কেন? বুড়ো বাপ আজও বেঁচে আছে বলে অমল মাঝে মাঝে আসে। খুব দায় না ঠেকলে ওর বউ ছেলেমেয়েরা কখনও নয়।

আয়, ঘরে আয় পারুলদি। তোকে একটু দেখি।

সন্ধ্যার ঘরের মধ্যেও সেই ঝাঁঝালো মিষ্টি টকচা নানারকম গন্ধের রেণু উড়ছে। সারাদিন ও কাসুন্দি, আচার, ডালের বড়ি, আমসত্ত্ব, আমলকীর মুখশুদ্ধি, জোয়ানের হজমি, পাঁপড় এই সব তৈরি করছে। ঘরে উদুখল থেকে শুরু করে প্রকাণ্ড শিল-নোড়া, মশলা গুঁড়ো করার যন্ত্র আর শিশি বোতলের ছড়াছড়ি। ভোল্টেজ কম থাকে বলে ইলেকট্রিকের বাতিতে ঘর আলো হয় না। তাই একটা কেরোসিনের টেবিল ল্যাম্প জ্বলছে। একটা মোটা মোমবাতির আগুনে দুটো অল্পবয়সি মেয়ে মেঝেতে বসে প্লাস্টিকের প্যাকেটের মুখ জুড়ছে।

ভারী ভাল লাগল পারুলের। একটুও ভাবালুতা নেই সন্ধ্যার। সারাদিন হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে ও জীবনের একটা হারা লড়াই অন্যভাবে জেতার চেষ্টা করছে।

কত কালো কুচ্ছিত মেয়েরও কত ভাল বিয়ে হয়ে যায়, সুখেই ঘরকন্না করে তারা। সন্ধ্যার কপালটা তত ভাল নয়। তার জন্য পাত্র খুঁজে খুঁজে হয়রান মহিমকাকা অবশেষে দুর্গাপুরের এক পাত্র পেয়ে লটারি জেতার মতো মুখ করে ফিরলেন। পারুল শুনেছে, পাত্রপক্ষের খাঁই ছিল। পঁচিশ হাজার নগদ এবং গয়না আর জিনিসপত্রের বহর বড় কম ছিল না। বিয়ের দু মাসের মাথায় সন্ধ্যা ফেরত হল। কী, না এ পাত্রীকে বরের পছন্দ হচ্ছে না। এমনই অপছন্দ যে, পাত্র বিয়ের পর দুবার বিবাগী হয়ে গিয়েছিল। না, সে সন্ধ্যাকে মারধর করেনি, অত্যাচারও নয়। এর টেকনিক ছিল অন্যরকম। সে নাকি কান্নাকাটি করে সন্ধ্যার কাছ থেকে মুক্তি চাইত। এমনকী পায়ে অবধি ধরতে বাকি রাখেনি। এমন নারাজ পুরুষের সঙ্গে থাকেই বা কী করে সন্ধ্যা? তবু সে তার বরকে বলেছিল, আমি কুচ্ছিত হতে পারি, কিন্তু খেটেপিটে সব পুষিয়ে দেবো। তোমার এমন যত্ন করব যা কেউ কখনও করেনি। একদিন দেখবে আমার চেহারাটার কথা তোমার আর মনেই থাকবে না। আমাকে ফিরিয়ে দিও না, তা হলে আমি লজ্জায় মুখ দেখাতে পারব না। গলায় দড়ি দিতে হবে আমাকে। এ কথা শুনে তার বর ভেউ ভেউ করে কেঁদেছিল।

সেটা অভিনয় কিনা বোঝা যায়নি। অত বুদ্ধি সন্ধ্যার নেই। কান্নার জবাবে সেও কেঁদে ফেলেছিল। তার বর অনুনয় বিনয় করে বলেছিল, তুমি মোরো না। মরলে আমার বড় কষ্ট হবে। তুমি মরলে আমাকেও মরতে হবে।

কেউ মরেনি শেষ অবধি। বরের সঙ্গে সন্ধ্যার আইনমাফিক ডিভোর্সও হয়নি। বর বলেছিল, ডিভোর্স করলে অনেক হাঙ্গামা। তুমি ব্যাপারটা মেনে নাও। আমি জানি তুমি ভাল মেয়ে, কিন্তু আমার যে কোনও উপায় নেই।

সন্ধ্যা চলে এল। বর তাকে বর্ধমান স্টেশন পর্যন্ত পৌঁছে দিয়ে বাসেও তুলে দিয়ে গেল। চোখের জল ফেলতে ফেলতেই বিদায় নিল। নিজের বর সম্পর্কে একটা ধাঁধা তাই আজও আছে সন্ধ্যার। ফেরত হওয়ার পরও তার আশা ছিল মানুষটা হয়তো ভালই। একদিন ভুল বুঝতে পেরে তাকে ফের নিয়ে যাবে।

তা অবশ্য হয়নি। লোকটা বছরখানেক বাদেই আর একটা মেয়েকে বিয়ে করে ফেলে। সন্ধ্যা খবরটা পেয়েও মামলা মোকদ্দমা করতে যায়নি। কী হবে হাঙ্গামা করে? গাঁয়ে তাদের পরিবারের একটা সম্মান তো আছে। আশ্চর্যের বিষয় তার দাদাবাও কেউ তার হয়ে লড়তে যায়নি, কোনও ব্যবস্থাও করেনি খোরপোশ আদায়ের। শুধু তার বাবা মহিম রায় গিয়ে জামাইয়ের সঙ্গে দেখা করেন। জামাই তাঁরও পায়ে ধরে হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে “আমাকে জুতো মারুন, আমাকে ফাঁসি দিন” বলে অনেক বিলাপ করে। মহিম রায় অপ্রস্তুত হয়ে ফিরে আসেন।

মনের বিষণ্ণতা এবং ঘটনার আকস্মিকতা কাটতে এবং চোখের জল শুকোতে একটু সময় লাগল সন্ধ্যার। বছর দুয়েক। তার মধ্যেই সে বুঝে গেল সংসারে তার অবস্থান গলগ্রহের মতো। কোনও সম্মান নেই, কেউ গুরুত্ব দেয় না, বাঁকা কথা কানে আসে, পাড়া প্রতিবেশীরাও টিটকিরি দিতে ছাড়ে না।

এই অপমান ভুলতেই একদিন সে কাজে নেমে পড়ল। কাজে তার কখনও কোনও আলস্য ছিল না। বরাবরই তার শরীর খুব মজবুত। প্রথমে আচার নিয়ে পড়ল সন্ধ্যা। তারপর কাসুন্দি। অনভিজ্ঞতার ফলে দাম হয়ে গেল বেশি। নগেন হালদার নামে একটা ফড়ে ধরনের লোক এসে একদিন বলল, ওভাবে কি হয় দিদি? দামের ঘাট বাঁধা আছে। খরচ কমাও, নইলে পরতায় আসবে না। ব্র্যান্ডের মালের চেয়ে কম দামে না দিলে লোকে নেবে কেন? তা নগেন হালদারই তাকে খুব সাহায্য করল। এমনকী তার তৈরি জিনিস শহরের দোকানে দোকানে পৌঁছে দেওয়া অবধি। একটু একটু করে পয়সা আসতে লাগল। গত সাত আট বছর ধরে সন্ধ্যার যে-পরিশ্রম তার ফল আজ সে পায়। ব্যবসা তার বিরাট বড় কিছু নয়, কিন্তু তার জিনিস চলছে শহরে গাঁয়ে, চাহিদা বেড়েছে। এখন মাসে তার কম করেও তিন চার হাজার টাকা রোজগার।

পারুল এ সবই জানে। তিন রকম আলোয় সন্ধ্যার মুখশ্রীতে সে যে সৌন্দর্য আজ দেখতে পেল তা সে আগে দেখেনি।

সন্ধ্যা তাকে একটা চেয়ারে বসিয়ে নিজে একটা টুলে মুখোমুখি বসে দুঃখের গলায় বলল, হরিজ্যাঠা মারা যাওয়ায় এত খারাপ লেগেছিল যে কী বলব। মনে হল আপনজনই কেউ চলে গেল। আপনজনই তো, না কী বল পারুলদি! হরি জ্যাঠা মরে যাওয়াতে বাবাও খুব ভেঙে পড়েছে। কেবল বলছে, এই হরিদা চলে গেল, এবার আমার পালা।

পারুল বলল তা কেন, মহিমকাকা তো বাবার চেয়ে অনেক ছোট।

অনেক নয়। বাবা তো বলে পাঁচ ছয় বছরের তফাত। আজকাল কারও মরার খবর পেলেই বাবা কেমন ধড়ফড় করে।

এই বয়সে হয়।

বাবার ঊনআশি চলছে। আমাদের সকলেরই কেমন বয়স হয়ে যাচ্ছে, না রে পারুলদি?

তোর আবার বয়স হল কোথায়? বেশ তো আছিস। তোকে দেখে আমার বড্ড ভাল লাগছে। বেশ নিজের চেষ্টায় দাঁড়িয়ে গেছিস।

সলজ্জ হেসে সন্ধ্যা বলে, দাঁড়ানো মানে আর কী? আমার তো ছোট ব্যবসা। কষ্টেসৃষ্টে চলে যায়।

পাড়াগাঁয়ে থেকে যা করেছিস ঢের করেছিস। তোর রোখ আছে, আর এইজন্যই তোকে ভাল লাগে।

এইটুকুর জন্যই বেঁচে গেছি পারুলদি। নইলে এ-বাড়িতে ঝি-গিরি করে খেতে হত।

সেই লোকটা আর খোঁজখবর করেনি, না?

না। খোঁজখবর করবেই বা কেন? সুখে সংসার করছে।

তোরা কাজটা ভাল করিসনি সন্ধ্যা। লোকটাকে ছেড়ে দিলি কেন? একটু শিক্ষা দেওয়া উচিত ছিল।

ধরতেই তো পারলুম না, ছেড়ে দেওয়ার কথা বলছিস কেন? ওসব আর ভাবিই না। আমার কপালের দোষ। তোর মতো সুন্দর হয়ে জন্মালে কি আর সে আমাকে ছাড়ত?

পারুলের খুব দুঃখ হল কথাটা শুনে। একটু ভেবে বলল, তুই যে কত সুন্দর তা দেখার মতো চোখ কটা পুরুষের আছে? এই যে দিনরাত হাড়মাস নিংড়ে কাজ করছিস, এই যে স্নো-পাউডার মাখিস না, সাজিস না, এই যে লড়াই করছিস এর জন্যই তো তুই সুন্দর।

সে তো তোর চোখে। পাঁচজনের চোখে তো নয়।

বউ সুন্দর হলেই বা। স্বামীর চোখে সেই সৌন্দর্যের আয়ু কতটুকু? কিছুদিন পর তো আর হাঁ করে তাকিয়ে বউয়ের সুন্দর মুখ দেখে এলিয়ে পড়বে না। তখন অন্য সব পয়েন্ট প্রমিনেন্ট হবে, কাজের মেয়ে কি না, বুদ্ধিমতী কি না, যত্নআত্তি করে কি না।

সে তো ঠিক কথাই পারুলদি। কিন্তু সে কথা ওই মেনিমুখখাকে বোঝাতে পারলুম কই? আমি কাছে গেলেই ওর বোধহয় মনে হত একটা ভালুক আসছে।

পারুল হেসে ফেলল।

সন্ধ্যাও একটু হেসে বলে, তোর ব্যবসার কথা বল পারুলদি। তোর বর নাকি মস্ত ইন্ডাস্ট্রিয়ালিস্ট।

দুর বোকা, বড় ইন্ডাস্ট্রিয়ালিস্ট হওয়া কি সোজা? আদিত্যপুর ইন্ডাস্ট্রিয়াল এস্টেটে আমাদের কারখানা। ছোট ছোট পার্টস তৈরি হয়। তেলের লাইনের জয়েন্ট, আরও সব ছোটখাটো জিনিস। টাটা স্টিল, টাটা অটোমোবাইল, রেল এরাই নেয়। কিন্তু এই একরত্তি একটা জিনিস তৈরি করতেও কতরকম ড্রয়িং, কত মাপজোখ, আর আটটা নটা অপারেশন দরকার হয়। তাই ভাবি বড় বড় কলকারখানায় আরও কত কমপ্লিকেটেড বাপার। ভাবলে মাথা ঘুরে যায়।

তুই আগের চেয়েও সুন্দর হয়েছিস। একটুও মোটা হসনি। পারুলদি, তুই যে কেন মেজদাকে বিয়ে করলি না! তা হলে আজ হাঁফ ছেড়ে বাঁচতুম।

কেন রে? অমলদার বউকে কি তোর পছন্দ নয়?

এতক্ষণ সন্ধ্যার মুখে যে নির্লিপ্ত, হাসিখুশি, আলগা ভাবটা ছিল সেটা তীব্র ভ্রূকুটিতে মুখোশের মতো খসে পড়ে গেল। চাপা গলায় বলল, পছন্দ! ওরকম একটা বিচ্ছিরি স্বভাবের মেয়েমানুষকে আবার পছন্দ!

পারুল অবাক হয়ে বলে, কেন, কী করলেন উনি? ঝগড়া নাকি?

সে করলেও ভাল ছিল। ঝগড়ায় অনেক সময়ে সম্পর্ক পরিষ্কার হয়ে যায়। এ তো সে রকম নয়। মনের ভিতরে চক্কর। এ-বাড়ির কাউকে মানুষ বলেই মনে করে না। কিন্তু খুব মিষ্টি করে হেসে আর হাবেভাবে সেটা বুঝিয়ে দেবে, গলা তুলবে না, চেঁচাবে না।

তাই বুঝি?

এখন খুব মনে হয়, তোর সঙ্গে যদি মেজদার বিয়ে হত কী ভাল হত তবে। হ্যাঁ রে পারুলদি, তুই নাকি ভাল ইংরিজি বলতে পারিস?

পারুল হেসে বলে, পারব না কেন? আমার বরের পাল্লায় পড়ে শিখতে হয়েছে। কত অবাঙালি বা সাহেবসুবোকে নিয়ে ডিল করতে হয়, না শিখে উপায় আছে!

ওদের একটু ইংরিজি শুনিয়ে দিয়ে আয় না!

পারুল অবাক হয়ে বলে, ইংরিজি শোনাব কী রে? কেন?

ওরা বুঝুক গাঁয়ের মেয়েরাও ইংরিজি বলতে পারে।

পারুল হেসে বলে, তাতে কী লাভ হবে বল তো! ওরা খুব ইংরিজি বলে নাকি?

দিনরাত মায়েতে আর ছেলেমেয়েতে কেবল ইংরিজিতে কথা হচ্ছে। আমাদের নিয়ে খারাপ খারাপ কথা বলে। ঠিক বুঝতে পারি না, হাবেভাবে টের পাই। চল না পারুলদি, গিয়ে মুখের ওপর ইংরিজি বলে আসবি।

পারুল স্মিত মুখে বলে, সেটা ঠিক হবে না। ওদের সঙ্গে আমার পরিচয় নেই, পরিচয় করার ইচ্ছেও নেই। আর ইংরিজি বলাটাও কোনও ক্রেডিট নয়। কিন্তু তুই ওদের ওপর রেগে আছিস কেন?

সন্ধ্যার মুখে আবার একটা শান্ত বিষণ্ণতা দেখা দিল। বলল, দেখ পারুলদি, তুই তো আমার কত প্রশংসা করলি। কিন্তু আমি ভিতরে ভিতরে নিজেকে নিয়ে লজ্জায় মরে থাকি। দেখতে কালো-কুচ্ছিত, স্বামী নেয় না, তার ওপর তেমন লেখাপড়াটাও হয়নি। অমল রায়ের মায়ের পেটের বোন বলে কি আমাকে চেনা যায় বল? তার ওপর দিনরাত কামিনের মতো খাটি, তাতেই ওরা বোধহয় আমাকে লেবার ক্লাসের লোক বলে মনে করে। ছেলেমেয়ে দুটো কখনও আমাকে পিসি বলে ডাকে না। দ্যাট উওম্যান বলে কী সব যেন নিজেদের মধ্যে বলে। তাই ভাবি, তুই মেজদাকে বিয়ে করলে কত ভাল হত। কেন হলি না রে পারুলদি? মেজদার কোনও দোষ ছিল?

দোষ কার মধ্যে নেই? ওসব কথা থাক।

তুই মেজদার কথা আর ভাবিস না, না রে?

ও মা! ভাবব না কেন? সকলের কথাই ভাবি।

তোদের মধ্যে কত ভালবাসা ছিল।

পারুল একটু হেসে বলল, আজকাল ভালবাসা কথাটা শুনলেই আমার যে কী বিচ্ছিরি লাগে। টি ভি খুললেই ভালবাসা, বই খুললেই ভালবাসা, সিনেমায় গেলেই ভালবাসা। যত ভালবাসার বাদ্যি বাজছে তত ভালবাসা জিনিসটাই উবে যাচ্ছে।

তা হলে তোদের মধ্যে কী ছিল?

যা ছিল তা ওই সিনেমা টিভি উপন্যাসের মতোই, বিজ্ঞাপনের মতো ব্যাপার। আসলে ছিল কি না পরীক্ষাই হয়নি। আর ও বয়সটাও তো বুঝবার মতো বয়স নয়।

কী জানি বাবা, সেই ছেলেবেলা থেকেই তো জেনে এসেছি তুই আমার মেজো বউদি হবি। কিন্তু শেষ অবধি হল একটা—

পারুল হাসছিল। বলল, থামলি কেন?

একটা খারাপ কথা মুখে আসছিল, সেটা আটকালুম।

ভাল করেছিস। হ্যাঁ রে, অমলদার বউকে আড়াল থেকে একবার দেখিয়ে দিস তো!

আড়াল থেকে কেন? আলাপ করলেই তো হয়।

না, আলাপ করব না।

কেন রে?

আমার কেন যেন ইচ্ছে করছে না। শুধু দেখলেই হবে।

সন্ধ্যা মৃদু হেসে বলে, তোর কিন্তু এখনও একটু হিংসে আছে। ভয় নেই, সে তোর কড়ে আঙুলের নখেরও যুগ্যি নয়। দেখবি? আয় তবে। এখন ওরা নিজেদের ঘরে বসে কথা কইছে। ঝগড়াই হয় বেশির ভাগ।

ঝগড়া?

হ্যাঁ, মা আর মেয়েতে।

কী নিয়ে ঝগড়া?

সে কি আর বুঝতে পারি? ইংরিজিতে ঝগড়া। সন্দেহ হয় মেয়েটা কোনও কেলেঙ্কারি করে এসেছে। নইলে এ সময়ে হঠাৎ গাঁয়ে এসে বসে আছে কেন? পুজোর ছুটিও শুরু হয়নি, স্কুল কলেজ সব খোলা।

মেয়েটার বয়স কত?

ষোলো সতেরো তো হবেই।

পারুল একটু আনমনা হয়ে গেল। তারও তখন সতেরো বছর বয়স। মেয়েদের যৌবন মানেই চার দিকে পুরুষদের মধ্যে গুনগুন করে বার্তা পৌঁছে গেল, মেয়েটা সোমত্ত হল, ডাগর হল হে। কামগন্ধ উড়ল বাতাসে। আপনা মাসে হরিণা বৈরী। এই বয়সেই বাঘে খেয়েছিল তাকে। প্রেমিকের মতো নয়, লুঠেরার মতো তার কুসুম ছিন্ন করেছিল অমল। কিন্তু তাদের আমল আর নেই। এখন যৌবনের কেলেঙ্কারিকে অত কি আমল দেয় মা বাপেরা? যুগ কত পালটে গেছে। তার ওপর এরা বিদেশেও ছিল, যেখানে শরীর হল জলভাত।

যাবি ওপরে পারুলদি?

গিয়ে?

মেজদার বউকে দেখবি বললি যে!

ও হ্যাঁ। কিন্তু আড়াল থেকে।

হ্যাঁ, আমি তো আড়াল থেকেই দেখি। মায়ের ঘরের দরজায় একটা ফাঁক আছে। ঘরের আলো নিবিয়ে—

অমলের বউকে দেখার ইচ্ছেটা হঠাৎ কেন যেন উধাও হল পারুলের। তবু সে উঠল।

সন্ধ্যার মা মারা গেছে বছর দশেক। এ-ঘরে এখন আর কেউ থাকে না। মহিম রায় সিঁড়ি ভাঙতে অপারগ বলে আজকাল একতলায় থাকেন। দু ঘরের মাঝখানে বন্ধ দরজার ফাটলে চোখ রেখে সন্ধ্যা আগে দেখে নিল। তারপর চাপা গলায় বলল, মেয়েটা নেই। মায়ে পোয়ে বসে আছে। দেখ।

পারুল দেখল৷ কোন কোনও মহিলা আছে যাদের রূপ যেন পুরুষের দিকে তেড়ে আসে। সব কিছুই যেন বড় বেশি উগ্র। অমলের বউকে সুন্দরী বলতেই হবে। তবে সেটা বড় উচ্চগ্রামে বাঁধা। অতি ফর্সা, নাক অতি টিকোলো, চোখ অতি টানা, ঠোঁটে নিষ্ঠুর ক্ষীণতা। শরীরটা কাঠ-কাঠ। মেয়েলি ভাব একটু যেন কম। আর বয়সটাও একটু বেশি, অমলের কাছাকাছি।

বেশ সুন্দরীই তো রে।

আহা, ওকে সুন্দর বলে নাকি?

মেমসাহেব-মেমসাহেব দেখতে।

স্বভাবও মেমসাহেবদের মতোই। এঁটোকাঁটা মানে না, বাঁ হাতে জল খায়।

মুখটায় একটু টেনশন আছে।

বলেছি না, দিনরাত ঝগড়া হচ্ছে। মুখে মেচেতা আছে, দেখেছিস?

ছেলেটা এদিকে পিছু ফিরে ছিল। একবার মুখ ঘোরাতেই বোঝা গেল, ছেলের মুখ তার মায়ের মতো।

মেয়েটা কোথায় গেল?

হাঁটাহাঁটি করতে গেছে বোধহয়। দিনরাত তো তিনজনে ঘরবন্দি হয়ে থাকে।

তোদের সঙ্গে কথা বলে না?

না। শুধু বড়দার সঙ্গে। তাও কাজের কথা। এটা ওটা আনতে ফরমাশ করে।

সরু সিঁড়ি দিয়ে নামবার সময় মেয়েটার সঙ্গে মুখোমুখি দেখা। মেয়েটা দু-তিন সিঁড়ি উঠে এসেছিল, তাদের পাশ দেওয়ার জন্য নেমে দাঁড়াল। সিড়ির মাথায় টিমটিমে ডুমের আলোয় মেয়েটাকে দেখল পারুল। ফুটফুটে সুন্দর ডল পুতুলের মতো মেয়ে। মায়ের মতো কাঠ-কাঠ ভাব নেই শরীরে। একেবারেই মেয়েলি মেয়ে। মুখে হয়তো-বা অমলের আদল আছে। তবে অমল সুপুরুষ ছিল না। মুখে বাপের আদল থাকলেও মেয়েটা কিন্তু খুব সুন্দর।

মেয়েটা তাকে দেখছিল। একটু অবাক হয়েই দেখছিল। উঠোনের ওপাশে সন্ধ্যার ঘরের দরজায় উঠে ফিরে দেখল পারুল, মেয়েটা ঘাড় ঘুরিয়ে তাকিয়ে আছে।

সন্ধ্যার ঘরে আরও প্রায় আধঘণ্টা বসে কথা কইল পারুল। সবই পুরনো কথা, ছেলেবেলার কথা।

যে মেয়ে দুটো বসে কাজ করছিল তারা চলে যাওয়ার পর হঠাৎ লাজুক মুখে সন্ধ্যা বলল, দেখ পারুলদি, তোকে একটা কথা বলব?

বল না। কী কথা রে?

একটা ছেলে—হি হি—একটা ছেলে আমাকে বিয়ে করতে চাইছে।

পারুল অবাক হল না। এরকম তো হতেই পারে। বলল, কে রে?

তুমি চিনবে না। যারা আমার জিনিস নিয়ে দোকানে দোকানে সাপ্লাই করে তাদেরই একজন। বামুনের ছেলে।

প্রেমে পড়েছে নাকি? তুই পড়লি, না ও পড়ল?

দুর! সেসব নয়। আসলে আমাদের ওসব করার সময় নেই, প্রেম আবার কীসের? ও বলে বিয়ে করলে ব্যবসাটা বাড়ানো সহজ হবে। দুজনে মিলে একটা পার্টনারশিপের মতো হয় তা হলে।

পারুল একটু ভেবে বলল, খারাপ কী? মহিমকাকাকে বলেছিস?

না। কেউ জানে না। আমরা তো আর ঢলাঢলি করি না। তোমাকেই প্রথম বললুম।

তোর এখন কিছু টাকা হয়েছে সন্ধ্যা, আর সেইটেই ভয়। টাকার লোভে যদি বিয়ে করতে চেয়ে থাকে তা হলে সাবধান হওয়া ভাল।

আমিও অনেক ভাবছি। হিসেব-নিকেশ করছি। বাড়ির লোকেই বা কী ভাববে বল! আমি তাই এখনও মত দিইনি।

খুব ঝোলাঝুলি করছে নাকি?

না না, সেসব নয়। অত আঠা নেই আমাদের। শুধু বলেছে বিয়ে করলে পরস্পরকে বিশ্বাস করতে সুবিধে হবে।

তোকে কিন্তু খুশি-খুশি দেখাচ্ছে।

মা কালীর দিব্যি, খুশি-টুশি নয় রে, বরং ভয়ে বুক শুকিয়ে আছে। নেড়া আবার বেলতলায় যাওয়ার আগে একটু ভয় পাবে না, বল?

ছেলেটা যদি ভাল হয় তবে বিয়ে করে ফেল সন্ধ্যা। নইলে যখন বয়স হবে তখন দেখবি এককাঁড়ি টাকা ছাড়া আর তোর কিছু নেই।

কিন্তু কী জানিস পারুলদি, ওই লোকটার জন্য আমার আজও একটু কেমনধারা মায়া আছে। বাজে লোক, খুব পাজি লোক, তবু কেমন যেন মনে হয়, বিয়ে করলে একটা বুঝি পাপ-টাপ কিছু হবে। এটা বোধহয় কুসংস্কার, না রে?

পারুল মাথা নেড়ে বলে, আমার তা মনে হয় না। কুসংস্কার কেন হবে! লোকটা পাজি হোক, শয়তান হোক, তুই হয়তো তবু ভালবেসেছিলি। তুই তো বোকা। আর বোকারাই অন্ধের মতো ভালবাসতে পারে। চালাকরা পিছল প্রাণী।

তাই ভাবছি।

তা হলে আরও ভাবতে থাক। যা করবি ভেবে করিস।

আমার কথা তুইও একটু ভাবিস পারুলদি। ভেবে একটা বুদ্ধি দিস। আমার একদম বুদ্ধি নেই।

ভাবতে ভাবতে অন্ধকার উঠোনটা পার হচ্ছিল পারুল। অমল রায়ের বউকে দেখার জন্য এত কৌতূহল কেন তার? এতদিন বাদে সে কি নিজের সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে চেয়েছিল ওকে? ওই জায়গাটা তারই বাঁধা ছিল বলে তার কি আজও একটু দুঃখ আছে? না তো! নিজের মনকে সে খুব ভাল চেনে না বটে, কিন্তু এতদিনের বিবাহিত জীবনে অমল রায়ের জন্য তার কোনও দুঃখবোধ ছিল না তো! পড়তি বয়সে তাহলে এসব কী হচ্ছে? কেন হচ্ছে? অমল তো তার নাকচ করা পুরুষ।

এক তুমুল বর্ষার রাতে ভিতরে চেপে রাখা গোপন কথার কীটদংশন সইতে না পেরে সে তার স্বামী জ্যোতিপ্রকাশকে সবই বলে দিয়েছিল। তার মনে হয়েছিল, সব প্রকাশ না করলে জ্যোতিপ্রকাশের সঙ্গে তার জীবনটা সম্পূর্ণ হবে না। খাদ থেকে যাবে। ভারমুক্ত হতে পারবে না সে।

শান্ত মানুষ জ্যোতিপ্রকাশ মন দিয়ে সব শুনল। তারপর বলল, শরীরের তো পাপ নেই, পাপ মনে। মনে যদি শিকড়-বাকড় না থাকে তবে আর ভয় কী?

না, আমার মনে কোনও দুর্বলতা নেই।

তাহলে সব ঠিক আছে পারুল। মেয়েদের মনে একাধিক পুরুষের ছাপ থাকলে তার সন্তান অস্থিরমতি হয়।

কী করে জানলে?

জানি। যে মেয়ের মন একমুখী, কোনও কারণে তার দেহ অশুচি হলেও খুব ক্ষতি হয় না। তার সন্তান ভালই হওয়ার কথা।

তুমি শুধু সন্তানের কথা ভেবে বলছ?

বিয়ের উদ্দেশ্যই তো সন্তান। তার জন্যই শরীর লাগে, মনও লাগে। কোনওটাই তুচ্ছ নয়। সন্তান মানে সমতান। একদিন আমাদের জৈব প্রয়োজন শেষ হয়, আয়ু ফুরোয়, তখন ওই সন্তানের ভিতর দিয়ে আবার আমরাই বেঁচে থাকি।

জ্যোতিপ্রকাশ একটু প্রাচীনপন্থী, একটু গোঁড়াও হয়তো। আর কেন যেন সেই কারণেই লোকটার ওপর নির্ভর করতে ভরসা পায় পারুল।

নিজের রূপ নিয়ে বিয়ের পরও ঝামেলা কিছু কম হয়নি। জান সিং এক মস্ত খদ্দের তাদের। লম্বা-চওড়া আখাম্বা চেহারার রূপবান পুরুষ। কিছু তরলমতি এবং ফুর্তিবাজ। লোকটা জান-কবুল প্রেমে পড়ে গিয়েছিল পারুলের। কাণ্ডজ্ঞানরহিত অবস্থায় সে একদিন অফিসঘরে একলা পেয়ে পারুলের হাত চেপে ধরে বলল, আমার অনেক টাকা আছে। দিল্লি আর হরিয়ানায় আমার অনেক সম্পত্তি। চলো আমার সঙ্গে।

পারুল সেই শক্তিমান পুরুষটির দিকে চেয়ে ফের অমল রায়কেই দেখতে পেয়েছিল। সে খাদ্য, পুরুষেরা খাদক। সে মিষ্টি ও কঠিন করে বলেছিল, আমি আমার স্বামীর সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করি একটা কিছু গড়ে তোলার জন্য। মানুষ সবসময়েই কিছু গড়ে তুলতে চায়। আবহমানকাল ধরে মানুষের সেই চেষ্টা। তুমি সব ভেঙে দিতে চাও? ছক উলটে দেবে? মিসমার হয়ে যাবে সব? তুমি আমাদের মস্ত ক্লায়েন্ট সিং সাহেব, কিন্তু তোমাকে ছাড়াও আমাদের চলে যাবে।

জান সিং বার্তা পেয়ে গেল। কিন্তু হাত ছেড়ে দিয়ে সে বলেছিল, দেয়ার ইজ সামথিং উই কল লাভ। আই অ্যাম ইন লাভ উইথ ইউ। সেই প্রেমটাকে একটা সম্মান তো দেবে?

আমার ভালবাসা শুধু পুরুষমানুষ নিয়ে তো নয়। আমি এবং আমার স্বামী উই শেয়ার বেড, বিজনেস, বিয়ারিংস। আমাদের ভালবাসা হুট করে হয়নি, ধীরে ধীরে তৈরি হয়েছে। হুট করে তা ভেঙেও যাবে না। আমি দমকা প্রেমে বিশ্বাস করি না।

ডু ইউ অ্যাডোর মি?

না সিং সাহেব, আই ডোন্ট অ্যাডোর ইউ। ইউ আর এ বিগ অ্যান্ড উইক ম্যান।

একটা মেয়েই জানে কতরকম লড়াই একটা মেয়েকে গোপনে এবং একা করে যেতে হয়। প্রত্যাখ্যানের পর প্রতিশোধের পালাও শুরু হয় কখনও কখনও। বদনাম ছড়ানো, মুখে অ্যাসিড মারা, খুন অবধি। জান সিং বহু টাকার অর্ডার ক্যানসেল করল, গুণ্ডা লাগিয়ে কারখানায় গোলমাল পাকাল। খুব অশান্তি গিয়েছিল কয়েক দিন।

জান সিং একাই তো নয়। কেউ গভীরভাবে তার প্রেমে পড়েছে, কেউ হালকা ফুর্তি লুটে নিয়ে যেতে চেয়েছে, কেউ নানা সুবিধে করে দেওয়ার টোপ ফেলেছে, কেউ নিজেকে ময়ূরের মতো সাজিয়ে জাহির করেছে। আর ট্রেনে বাসে গায়ে অঙ্গ স্পর্শ করানো তো আছেই। খদ্দের সবাই। প্রায় সবাই। সারি সারি মুখ মনে পড়ে যায় তার। নির্লিপ্ত মানুষও কি নেই? ঢের আছে। তাই সব পুরুষকে সে ঘেন্না করে না, বেছে বেছে করে। মুখচোখ দেখেই তার মেয়েলি অ্যান্টেনায় পুরুষের তরঙ্গ ঠিক ধরা পড়ে।

তবু অমল রায়ের প্রতি তার কেন কৌতূহল? কেন এখনও? নিজেকে এই প্রশ্নের ছোবলে ছোবলে অস্থির করে তুলে সে খুব আনমনে টর্চের আলো ফেলে ফেলে বড় উঠোনটা পার হচ্ছিল।

পিছন থেকে সন্ধ্যা বলল, আবার আসিস পারুলদি।

পারুল কথাটা শুনতেই পেল না। উঠোন পেরিয়ে সরু কাঁচা রাস্তা, দুধারে গাছপালার ডালপাতা গায়ে লাগছিল তার। আচমকাই কামিনী ঝোপটার পাশে টর্চের আলোয় মেয়েটাকে দেখতে পেল সে। পরনে হলুদ রঙের কুর্তা সালোয়ার।

থমকে দাঁড়াল পারুল। মেয়েটা এখানে কী করছে?

পারুল হয়তো কথা না বলেই পাশ কাটিয়ে চলে যেত। কিন্তু মেয়েটাই হঠাৎ পরিষ্কার বাংলায় বলল, আপনি পারুল না?

“পারুল” শুনে ভ্রূ কোঁচকাল পারুল। পিসি বা মাসি বা দিদি নয়, শুধু পারুল! অবশ্য ওরা বিদেশে ছিল, সেখানে এরকমই রেওয়াজ।

পারুল রাগ না করে স্নিগ্ধ গলাতেই বলল, হ্যাঁ। তুমি আমাকে চিনলে কী করে?

আমি সোহাগ, অমল রায়ের মেয়ে। আমাদের অ্যালবামে আপনার একটা ছবি আছে।

আমার ছবি! আশ্চর্য!

নাই ড্যাড অ্যাডোর্স ইউ।

ঝম করে লজ্জার একটা ঝাপটা লাগল তার মুখে। পারুল বলল, তাই নাকি? হতে পারে। আমরা তো এক গাঁয়েরই মানুষ।

আপনার যে ছবিটা আমাদের অ্যালবামে আছে সেটা অনেক কম বয়সের। বোধ হয় সতেরো আঠেরো।

উদাস গলায় পারুল বলে, তা হবে।

ইউ আর এ ভেরি বিউটিফুল উওম্যান।

তুমিও তো সুন্দর।

মে বি। কিন্তু বাবা বলে আপনার মতো নাকি বাবা আর কাউকে দেখেনি।

অমলদা এসব বলেছে বুঝি তোমাদের।

হ্যাঁ। আমাদের মধ্যে খুব ফ্র্যাঙ্ক আর টুথফুল কথা হয়।

তাই বুঝি!

আপনার যে বয়সের ছবিটা আমাদের অ্যালবামে আছে বোধহয় সেই বয়সেই ইউ ওয়্যার ডি-ফ্লাওয়ারড বাই মাই ড্যাড।

পারুলের শরীর সিঁটিয়ে গেল লজ্জায়। বুকের ভিতরটা ঝমঝম করছে রাগে। তারপর ফণা তুলল।

তোমরা বুঝি এতটাই ফ্র্যাঙ্ক?

অ্যান্ড হোয়াই নট?

তোমার বাবা একটা শিক্ষিত গাধা। একে ফ্র্যাঙ্কনেস বলে না, একে বলে ফুলিশনেস।

মেয়েটা সঙ্গে সঙ্গে একমত হয়ে বলে, হি ইজ অফকোর্স অ্যান ইডিয়ট।

রাগে ফুঁসছিল পারুল। মেয়েটাকে একটা থাপ্পড় মারার প্রবল ইচ্ছে যে কী করে সে দমন করল কে জানে।

আর ইউ ক্রস উইথ মি পারুল?

ইয়েস আই অ্যাম ক্রস উইথ ইউ।

হোয়াই কান্ট ইউ টেক এ ট্রুথ অ্যাজ এ ট্রুথ? তা ছাড়া বাবা প্রথম কথাটা আমাদের কাছে বলে ফেলে আফটার এ ফিউ রাউন্ডস অফ হুইস্কি। আমি আর মা বসে অ্যালবামটা দেখছিলাম, তখন। পরে যখন আমরা বাবাকে চেপে ধরি তখন সোবার অবস্থাতে বাবা স্বীকার করেছিল। নো হার্ড ফিলিং পারুল। আই অ্যাম সরি।

পারুল তখনও ফুঁসছিল। কিন্তু সে বোকা বা অবিবেচক নয়। সে হয়তো জানে না, দুনিয়াটা তার অজান্তে কত পালটে যাচ্ছে দ্রুত। বিশাল প্রজন্মের ব্যবধান। এইসব ছেলেমেয়ে হয়তো তাদের কাছে মঙ্গলগ্রহের জীবের মতোই অচেনা। সে মাথা নেড়ে বলে, তুমি আমার আজকের দিনটা খুব তেতো করে দিলে।

মেয়েটা একটু যেন অবাক হয়ে বলে, ইজনট ইট এ ট্রুথ? টেক ইট ইজি ডিয়ার। আমি কিছু ভেবে বলিনি। ওরকম তো কত হয়।

পারুলের মনে পড়ল, কুড়ি বছর আগে অমল রায়ও এই কথাটা বলেছিল। এরকমই নাকি আকছার হয়, এতে মনে করার কিছু নেই, আজকালকার ছেলেমেয়েরা ওসব মাইন্ড করে না। ইত্যাদি।

পারুল টর্চটা নিবিয়ে ফেলেছিল। ফের জ্বেলে বলল, এরকম হওয়া উচিত নয়। ইট ইজ এ শেম।

ফের অবাক সোহাগ বলে, কেন পারুল? হোয়াই ইট ইজ এ শেম?

সেটা তুমি হয়তো এখনই বুঝবে না। হয়তো কোনওদিনই বুঝবে না। তোমার পরিবার তোমাকে অন্যরকম শিখিয়েছে।

ও কে পারুল, আই ডিড সামথিং রং। কিন্তু আমি আপনার সঙ্গে আলাপ করতেই চেয়েছিলাম। আপনার ছবিটা আমাকে পাগল করে দিত। কী সুন্দর। ইউ আর স্টিল ভেরি বিউটিফুল।

কমপ্লিমেন্টটা পারুলের গায়ে ছ্যাঁকা দিচ্ছিল। বিরক্ত হয়ে সে বলল, বারবার ওকথা বলছ কেন? আমি জানি আমি সুন্দর। কিন্তু তাতে এখন আর আমার কিছু এসে যায় না।

মেয়েটা বোধহয় এবার অপমানিত বোধ করল। বলল, আপনি কি একজন নান? এ পিওর উওম্যান?

নিজেকে আমি তাই মনে করি। তুমি একটি অসভ্য মেয়ে।

মেয়েটা কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল, উই হ্যাভ আওয়ার ওন অবসেশনস।

পারুল মেয়েটার পাশ কাটিয়ে খানিকটা চলে এসেছিল।

মেয়েটা হঠাৎ ডাকল, পারুল!

পারুল অনিচ্ছের সঙ্গে দাঁড়াল।

আই হ্যাভ টু টেল ইউ সামথিং।

দৌড়ে এসে হাঁপাচ্ছিল মেয়েটা।

পারুল ঠান্ডা গলায় বলল, আবার কী বলবে?

আমি বলতে চাই, ইন আওয়ার ফ্যামিলি এভরিবডি হেটস এভরিবডি। মাই ড্যাড অ্যান্ড মম হেটস ইচ আদার, আই হেট মাই ড্যাড অ্যান্ড মম অ্যান্ড দে হেটস মি। ইভন মাই ব্রাদার হেটস ড্যাড অ্যান্ড ড্যাড হেটস হিম। কিন্তু তার মধ্যেই দেখতে পাই, আমার বাবা অ্যালবাম খুলে আপনার ছবিটা যখন দেখে তখন তার মুখটা কেমন সফ্ট আর পেনসিভ হয়ে যায়। ছবিটা আমিও মাঝে মাঝে দেখি। দেখতে দেখতে আমারও কেমন যেন হয়। মোনালিজার ছবিতে যেমন ম্যাজিক আছে তেমনই কিছু। বুডঢাও কথাটা আমাকে অনেকবার বলেছে। আমার মন খারাপ লাগলেই আমি ছবিটা দেখি আর মন ভাল হয়ে যায়। ইউ হ্যাভ বিকাম এ কাল্ট ফিগার অ্যান্ড ইভন এ গডেস টু আস। অ্যান্ড ইটস এ ট্রুথ।

এত অবাক হয়েছিল পারুল যে মুখে প্রথমে বাক্যই সরল না। তারপর বলল, এসব তো তোমার কল্পনা। আমি সামান্য মেয়ে, দেবী-টেবী নই।

উই হ্যাভ আওয়ার ইলিউশনস, আই নো। তবু আপনাকে দেখার খুব ইচ্ছে ছিল। মে বি ইউ আর নট এ গডেস, বাট মাস্ট বি সামওয়ান ভেরি স্পেশাল।

তুমি ভুল ভাবছ সোহাগ। ওরকম ভেবো না।

আমি একটু বেশি কথা বলে ফেলেছি আজ, কিছু মনে করবেন না। বাই।

মেয়েটা চলে যাচ্ছিল। পারুল টর্চটা জ্বেলে ওর পথের ওপর আলো ফেলে বলল, শোনো সোহাগ, এটা গ্রামদেশ। অন্ধকারে হুটহাট বেরিয়ে পোড়ো না, সাপ-খোপ আছে কিন্তু।

অন্ধকারে সোহাগের হাসি শোনা গেল, আই লাভ স্নেকস। স্নেকস আর অলওয়েজ ওয়েলকাম।

এসবই পরশুদিনের কথা। আজ তার বাবা গৌরহরি চাটুজ্জের শ্রাদ্ধের দিনে বৃহৎ লোকসমাগম থেকে একটু সরে এসে বাগানের নিরিবিলিতে দাঁড়িয়ে পারুল ভাবছিল মেয়েটা কি একটু পাগল? সাপটা সামনে দিয়ে চলে যাওয়ার পরই মেয়েটার কথা মনে পড়ল তার। সুন্দর, তবে মুখটায় একটু বিষণ্ণতা মাখানো ছিল।

অমল রায় তার ছবির দিকে চেয়ে আজও কি পুরনো ভালবাসার কথা ভাবে? নাকি তার বিশ্বাসঘাতকতার কথা মনে করে মনে মনে তেতো হয়ে যায়?

কে যেন পারুলকে ডাকছে চেঁচিয়ে। পারুল ফিরে আসছিল। উঠোনে পা দিতেই সামনে বুড়ো মানুষটা এসে পড়ল।

হ্যাঁ মা, তা খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা কি ছাদে করা হয়েছে?

হ্যাঁ ধীরেনখুড়ো। আপনি ভাল আছেন তো!

ভাল আর কী, গৌরহরিদা গেলেন, আমরাও সব পা বাড়িয়ে আছি।

একটা পেচ্ছাপের গন্ধ পাচ্ছিল পারুল। এসব গন্ধ সে একদম সইতে পারে না। নাকে আঁচল চাপা দিয়ে বলল, ইস, কী বিচ্ছিরি গন্ধ! কেন যে এরা ব্লিচিং পাউডার বা ফিনাইল ছড়ায় না!

ধীরেন কাষ্ঠ তাড়াতাড়ি দু পা পিছিয়ে গিয়ে বলে, খাওয়া-দাওয়া কি শুরু হয়ে গেছে মা? আমার আবার অনেকটা পথ— এই রোদ্দুরে—

যান না খুড়ো, ওপরে চলে যান। বোধহয় শুরু হয়েছে।

সকল অধ্যায়
১.
প্রথম অধ্যায়
২.
দ্বিতীয় অধ্যায়
৩.
তৃতীয় অধ্যায়
৪.
চতুর্থ অধ্যায়
৫.
পঞ্চম অধ্যায়
৬.
ষষ্ঠ অধ্যায়
৭.
সপ্তম অধ্যায়
৮.
অষ্টম অধ্যায়
৯.
নবম অধ্যায়
১০.
দশম অধ্যায়
১১.
একাদশ অধ্যায়
১২.
দ্বাদশ অধ্যায়
১৩.
ত্রয়োদশ অধ্যায়
১৪.
চতুর্দশ অধ্যায়
১৫.
পঞ্চদশ অধ্যায়
১৬.
ষোড়শ অধ্যায়
১৭.
সপ্তদশ অধ্যায়
১৮.
অষ্টাদশ অধ্যায়
১৯.
ঊনবিংশ অধ্যায়
২০.
বিংশ অধ্যায়
২১.
একবিংশ অধ্যায়
২২.
দ্বাবিংশ অধ্যায়
২৩.
ত্রয়োবিংশ অধ্যায়
২৪.
চতুর্বিংশ অধ্যায়
২৫.
পঞ্চবিংশ অধ্যায়
২৬.
ষড়বিংশ অধ্যায়
২৭.
সপ্তবিংশ অধ্যায়
২৮.
অষ্টাবিংশ অধ্যায়
২৯.
ঊনত্রিংশ অধ্যায়
৩০.
ত্রিংশ অধ্যায়
৩১.
একত্রিংশ অধ্যায়
৩২.
দ্বাত্রিংশ অধ্যায়
৩৩.
ত্রয়োত্রিংশ অধ্যায়
৩৪.
চতুর্ত্রিংশ অধ্যায়
৩৫.
পঞ্চত্রিংশ অধ্যায়
৩৬.
ষট্ত্রিংশ অধ্যায়
৩৭.
সপ্তত্রিংশ অধ্যায়
৩৮.
অষ্টত্রিংশ অধ্যায়
৩৯.
ঊনচল্লিশ অধ্যায়
৪০.
চল্লিশ অধ্যায়
৪১.
একচল্লিশ অধ্যায়
৪২.
দ্বিচল্লিশ অধ্যায়
৪৩.
ত্রিচল্লিশ অধ্যায়
৪৪.
চতুর্চল্লিশ অধ্যায়
৪৫.
পঞ্চচল্লিশ অধ্যায়
৪৬.
ষট্চল্লিশ অধ্যায়
৪৭.
সপ্তচল্লিশ অধ্যায়
৪৮.
অষ্টচল্লিশ অধ্যায়
৪৯.
ঊনপঞ্চাশ অধ্যায়
৫০.
পঞ্চাশ অধ্যায়
৫১.
একান্ন অধ্যায়
৫২.
বায়ান্ন অধ্যায়
৫৩.
তিপ্পান্ন অধ্যায়
৫৪.
চুয়ান্ন অধ্যায়
৫৫.
পঞ্চান্ন অধ্যায়
৫৬.
ছাপ্পান্ন অধ্যায়
৫৭.
সাতান্ন অধ্যায়
৫৮.
আটান্ন অধ্যায়
৫৯.
ঊনষাট অধ্যায়
৬০.
ষাট অধ্যায়
৬১.
একষট্টি অধ্যায়
৬২.
বাষট্টি অধ্যায়
৬৩.
তেষট্টি অধ্যায়
৬৪.
চৌষট্টি অধ্যায়
৬৫.
পঁয়সট্টি অধ্যায়
৬৬.
ছেষট্টি অধ্যায়
৬৭.
সাতষট্টি অধ্যায়
৬৮.
আটষট্টি অধ্যায়
৬৯.
ঊনসত্তর অধ্যায়
৭০.
সত্তর অধ্যায়
৭১.
একাত্তর অধ্যায়
৭২.
বাহাত্তর অধ্যায়
৭৩.
তিয়াত্তর অধ্যায়
৭৪.
চুয়াত্তর অধ্যায়
৭৫.
পঁচাত্তর অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%