শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
পাদরি পাপীদের স্বীকারোক্তি গ্রহণ করছেন। স্বীকারোক্তি করার জন্য পাপীরা লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে। পাদরির কাজটাও সোজা। পাপীর মুখ তাঁকে দেখতে হয় না। পর্দার ওপাশ থেকে শুধু পাপীর কণ্ঠস্বর শোনা যায়। ফাদারের কাজ হল ঈশ্বরের নামে পাপীকে ক্ষমা করে দেওয়া। পাদরি একের পর এক পাপীকে ক্ষমা করে যাচ্ছেন। তার মধ্যেই একজনের স্বীকারোক্তি শুনতে শুনতে পাদরি হঠাৎ চেঁচিয়ে উঠলেন, ইউ ডিড হোয়াট? সেই চিৎকার শুনে লাইন দিয়ে দাঁড়ানো অন্য পাপীরা দুদ্দাড় করে দৌড়ে পালিয়ে গেল। তাদের ভয়, না জানি তাদের পাপও কত ভয়ংকর যা শুনে পাদরিও ভিরমি খায়।
মানুষের সব পাপকে একমাত্র ভগবানই বুঝি ক্ষমা করতে পারেন। তাও ভগবান বলে যদি সত্যিই কেউ থেকে থাকে। ভগবান থাক বা না থাক সব মানুষই একজন ক্ষমাশীলকেই খুঁজে বেড়ায়। পাঁচ বছরের শিশুকে ধর্ষণ করে যে মেরে ফেলেছে তাকে কোন মানুষ ক্ষমা করতে পারে? সেই নরকগামী লোকটা হয়তো একদিন অন্তর্দহনে এক শ্বেতশুভ্র সর্বপাপহারী ক্ষমাশীলকেই খোঁজে। পাক বা না পাক, খোঁজে। পুণ্যবানদের বরং ভগবানকে তেমন প্রয়োজন নেই, পাপীরই প্রয়োজন বেশি।
যে আমারে দেখিবারে পায় অসীম ক্ষমায়, ভালমন্দ মিলায়ে সকলি। এই ভালমন্দ মিলিয়ে আখাম্বা লোকটাকে পক্ষপাতশূন্য চোখে কে দেখতে পারে? ভগবান? ভগবান তা হলে কি ইট, কাঠ, পাথরের মতোই অনুভূতিহীন কেউ? তা হলে তাকে দিয়ে কী লাভ মানুষের?
ভালবাসা না পেলেও চলে যায়, কিন্তু ক্ষমা না পেলে কি মানুষের চলে? এই মধ্যবয়সে আজ সেও এক নাশীলকে খুঁজতে শুরু করেছে বুঝি।
সামনেই রণাঙ্গন। এবং যুদ্ধকে সে ভীষণ ভয় পায়। বরাবরই পেত। কোনও যুদ্ধেই আজ অবধি তার জয় হয়নি। লেখাপড়া বা চাকরি কোনওদিনই তার যুদ্ধ ছিল না। মাথা পরিষ্কার ছিল, স্মৃতি ছিল প্রখর, তাই মশামাছি মারার মতো অনায়াসে সে বেড়াগুলো ডিঙিয়ে গেছে। কিন্তু অন্য দিকে বারবার তাকে যুদ্ধের মুখে ঠেলে দিয়েছে তার জীবন। মোনালিসা, সোহাগ, বুডঢা—তার এইসব আপনজনের সঙ্গে তাকে অবিরল এক অদ্ভুত লড়াই করতে হয়। ধীরে ধীরে সে ওদের ভয় পেতে শুরু করেছে। ধীরে ধীরে মনের ভিতরে সে দূর থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। ক্রমে একা হয়ে যাচ্ছে। স্বামী হিসেবে, বাবা হিসেবে কতভাবে যে হেরে যাচ্ছে সে তা ভাবতেও ইচ্ছে হয় না।
কত সামান্য ব্যাপার। আজ তার কলকাতা যেতে ইচ্ছে হচ্ছে না। মোনা আজই যেতে চায়। এই সামান্য সমস্যা বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে যেন ক্রমশই গুরুভার হয়ে উঠতে লাগল। মোনাকে ব্যাপারটা বুঝিয়ে বলার সাহসটা পর্যন্ত পাচ্ছে না সে। ভয় হচ্ছে, বলতে গেলেই মোনা বিস্ফোরিত হবে। প্রচণ্ড রেগে যাবে। কিংবা হয়তো ঠান্ডা চোখে এমনভাবে তাকাবে যে নিজেকে বে-আব্রু এক আহাম্মক বলে মনে হবে তার।
এইসব দুঃখের মূলে আজও পারুল। পারুলই। প্রজাপতির মতোই ছিল পারুল। নিষ্ঠুর, লোভী অমল একদিন সেই প্রজাপতির দুটি ডানা ছিঁড়ে দিয়েছিল। তখন প্রজাপতির শরীর থেকে জন্ম নিল বিষধর সাপ। একটি প্রত্যাখ্যানের ছোবলে মেরে ফেলল তাকে। ক্ষমা করল না। কিছুতেই আর নিজেকে বাঁচিয়ে তুলতে পারল না অমল। নিজের শরীরকে বহন করা যেন মৃতদেহ বহন করে যাওয়ার মতোই একটি একঘেয়ে কাজ। সামান্য একটু ক্ষমার দরকার ছিল তার। পাওয়া গেল না।
তুমি এখনও বসে আছ যে! গোছগাছ করবে না?
মানুষ যখন রেগে যায় তখন তার চেহারাটা যেন হয়ে ওঠে ক্ষুরধার। এখন যেমন, মোনার ফর্সা রং থেকে যেন হল্কা বেরিয়ে আসছে। তার উত্তাপ দূর থেকেও টের পাচ্ছে অমল। দুটো চোখ যেন চাবুকের মতো শিস টেনে ছুঁয়ে যাচ্ছে তাকে। তীক্ষ্ণ নাকটা যেন বল্লমের মতো উদ্যত। আর সমস্ত শরীর যেন ঝংকার তোলার জন্য সরোদের তারের মতো টানটান।
ভয় আর একটু মুগ্ধতা নিয়ে চেয়ে থাকে অমল। এই তো তার রণাঙ্গন। ধর্মক্ষেত্রে কুরুক্ষেত্রে সমাগত যুযুৎসু। তার স্ত্রী। কিন্তু সে অর্জুনের মতোই যুদ্ধবিমুখ। তার জয়স্পৃহা নেই। ক্ষাত্ৰতেজ নেই। বীরত্ব নেই। দেয়ালে পিঠ দিয়ে দাঁড়ানো সে এক হেরো মানুষ।
খুব বিনয়ের সঙ্গে সে বলে, গোছানোর তো কিছু নেই। একটা মাত্র অ্যাটাচি কেস।
তা হলে দেরি না করে তৈরি হয়ে নাও। দুপুরের আগেই বেরিয়ে পড়তে হবে।
যুদ্ধ না করেই সে বশ্যতা স্বীকার করে নেয়, হ্যাঁ, নিশ্চয়ই। দুপুরের এখনও দেরি আছে।
তোমার মেয়ে কিন্তু গোঁজ হয়ে বসে আছে। উঠছেও না, গোছগাছও করছে না। দয়া করে মেয়েকে একটু শাসন করো। নইলে—
নইলে কী সেটা ভাবতেও ভয় করে অমলের। কিছু না ভেবেই সে শুধু আত্মরক্ষার জন্য বলে, হ্যাঁ, হ্যাঁ, ঠিকই তো। ওর কি যাওয়ার ইচ্ছে নেই?
না, ইচ্ছে নেই। এই ধ্যাধ্ধেরে গোবিন্দপুরে কী মধু পেয়েছে কে জানে। বেশি জেদ করলে কিন্তু আমি চুলের মুঠি ধরে নিয়ে যাব।
শঙ্কিত অমল বলে, থাক, থাক আমি দেখছি।
কিন্তু অমল জানে তার দেখার কিছু নেই। দুই জনের মাঝখানে তার ভূমিকা রেফারিরও নয়। কাউকেই সে কিছু বোঝাতে পারে না। তবু সে উঠল। উঠতে উঠতে মিনমিন করে বলল, কী যেন একটা বলছিল তখন।
কী বলছিল?
বোধহয় শরীর খারাপের কথা।
ওসব ন্যাকামি। আমি আর কিছুতেই এখানে থাকব না।
সে তো ঠিকই। কিন্তু—
কিন্তু আবার কী? কীসের কিন্তু?
ও যেন বলছিল, কয়েকদিন ও এখানে এদের সকলের সঙ্গে থাকতে পারবে। আমি আপত্তি করিনি। যেন অসম্ভব এক প্রস্তাব। শুনে চোখ বড় বড় করে মোনা বলে, একা থাকবে? এখানে?
সেরকমই বলছিল যেন।
তুমিও সে কথা মেনে নিলে?
খুব ভদ্রভাবে বহিরাগত মানুষের মতো সে জিজ্ঞেস করে, সেটা কি উচিত হবে না?
না, হবে না। তোমার মেয়ে এখানে এসে যা-খুশি করছে। পড়াশুনো নেই ওর? যোগ ক্লাস নেই? ড্যান্সিং লেসন নেই? গান নেই? এখানে এসে তো সব চুলোয় গেছে।
কিন্তু ওঁর হাঁপানির ভাবটা নেই, লক্ষ করেছ? ঘন ঘন সর্দিও হচ্ছে না।
সেজন্যই এখানে চিরকাল থাকতে হবে নাকি?
তা বলছি না। ও বলছিল কয়েকটা দিন যদি—
একদিন দুদিন করে প্রায় মাসখানেক হতে চলল। যথেষ্ট হয়েছে। আর নয়। তোমারও আক্কেল নেই দেখছি। এখানে গ্যাঁট হয়ে বসে আছ, অথচ তোমার অফিস খোলা। কী ব্যাপার বলো তো?
আক্রমণটা কোন দিক থেকে আসবে তা আঁচ করে নিজেকে আড়াল করার চেষ্টা করে সে বলল, কয়েকদিন ছুটি নিয়েছি। ছুটি অনেক জমে গেছে। কতকাল ছুটি নিইনি বলো তো!
ছুটি নিয়ে থাকলে আমরা অন্য কোথাও যেতে পারি। এখানে বসে থেকে সময় নষ্ট করার মানেই হয় না।
সঙ্গে সঙ্গে একমত হয়ে অমল বলে, সেও হয়।
তোমার এখানে বসে থাকার মতলবটা যে আমি জানি না তা তো নয়। তোমার পুরনো প্রেম নতুন করে উথলে উঠছে। ইউ হ্যাভ টু লিভ দিস প্লেস।
একটু অবাক হয়ে চেয়ে থাকে অমল। কত দূরে সরে গেছে পারুল। এত দূর এক নক্ষত্র যার আলো এসে পৃথিবীতে পৌঁছয় না। ও কি পারুলকে হিংসে করছে? ও কি সন্দেহ করে এখনও তার আর পারুলের মধ্যে সম্পর্ক হতে পারে? অসম্ভব সব ব্যাপার ঘটছে যে! শীতল, কঠিন মোনার মধ্যে এখনও কি দখলদার জেগে আছে একজন? সেই দখলদার কি তার পুরুষের ওপর সম্পূর্ণ অধিকার চায়? কী করে তা সম্ভব?
অমল শুধু বলল, তা হয় না!
কী হয় না?
ওরকম হয় না মোনা। অঙ্ক মেলে না।
আমি সেসব জানি না। আমি আর এক মুহূর্ত এখানে থাকতে রাজি নই। তুমি ওঠো, তোমার মেয়েকে ঘাড়ে ধরে রাজি করাও। আমরা আজ যাচ্ছি।
মোনার গলা সামান্য উঁচুতে উঠেছিল। দু হাত তুলে অমল বলল, ও কে, ও কে। পিস, পিস।
অমলের মনে হচ্ছিল মোনা যেন টাইগার টাইগার বার্নিং ব্রাইট। গনগন করছে সমস্ত শরীর, মুখ।
মোনা বলল, আমি যাচ্ছি গোছগাছ করতে। সব জিনিস নিয়ে যাওয়া যাবে না। কিছু এখানে থাকবে। পরে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা কোরো।
মোনা চলে গেল।
অমল উঠল। কোনও উপায় তার জানা নেই। সামনে আর এক রণাঙ্গন। কলকাতার ফ্ল্যাটবাড়ি। সেখানে আপাতশান্ত এক পরিবারের বাস। তারা চারজন। প্রায় কোনও সময়েই কারও সঙ্গে কারও সম্পর্ক রচিত হয় না। একটু রাতের দিকে অমল মদের বোতল খুলে বসে এবং হিসেব না করেই খেয়ে যায়। খেতে খেতে যুক্তিসিদ্ধ চিন্তা ও আচরণের চৌকাঠ ডিঙিয়ে যায়। তারপর কী হয় তা সে জানে। না। তবে বুড়ঢা তাকে একদিন বলেছিল, ড্রিংক করলে তুমি খুব প্যাথেটিক হয়ে যাও। আর কিছু বলেনি। প্যাথেটিক বলতে কী বুঝিয়েছিল তাও ভেবে দেখেনি অমল।
মোনার গলা পাওয়া যাচ্ছে, বারান্দায় দাঁড়িয়ে ডাকছে, সোহাগ! সোহাগ! কোথায় গেলে তুমি?
বাগের গলা, চিৎকারের কাছাকাছি।
সোহাগ! সোহাগ!
আমলের গোছানোর মতো কিছু নেই। প্যান্ট শার্ট আর কোটটা পরে নেবে। পাজামা ইত্যাদি সামান্য দু-তিনটে জিনিস গুছিয়ে নিতে পাঁচ-সাত মিনিটের বেশি লাগার কথা নয়।
একটা কথা ভেবে হঠাৎ সে আজ ভারী অবাক হল। এতকালের মধ্যে তার কখনও গ্রামের বাড়িতে এসে থাকতে ইচ্ছে হয়নি। এখনও যে এখানে থাকতে তার খুব ভাল লাগছে তা নয়। কিন্তু কলকাতায় ফিরে যেতেও তার তেমন ইচ্ছে হচ্ছে না। কিন্তু কেন? তার মনের গভীরে কি এখনও পারুল-লোভী কেউ লুকিয়ে আছে? ওপর-মন দিয়ে সে ভিতর-মনকে ধরতে পারছে না?
অমল বুঝতে পারল না। একটু আগে পারুলকে দূরতম নক্ষত্র বলে মনে হয়েছিল। বাস্তবের পারুল হয়তো তাই। কিন্তু পারুলের একটা মূর্তি কি প্রতিষ্ঠিত আছে ভিতরে স্বর্ণসীতার মতো? সে-ই কি তার সব গণ্ডগোলের মূল?
মোনা এবার চেঁচাচ্ছে, সোহাগ! সোহাগ! এই, তোমরা সোহাগকে কেউ দেখেছ?
নীচে থেকে সন্ধ্যা বিরক্তির গলায় বলে, না, দেখিনি।
তুমি তো উঠোনেই ছিলে, তবু দেখনি?
সন্ধ্যা গলা চড়িয়ে বলে, কী করে দেখব? আমি তো কাজ করছিলাম! উঠোন দিয়ে কত লোক তো যাচ্ছে আসছে।
মোনা চড়া গলায় বলল, তোমার ঘরে গিয়ে বসে আছে কি না দয়া করে দেখ। আমরা আজ কলকাতায় যাচ্ছি, তাড়া আছে।
আচ্ছা লোক বাপু, তুমি তো আর ফিসফিস করে ডাকছ না! আমার ঘরে থাকলে তো শুনতেই পেত!
শুনেও হয়তো জবাব দিচ্ছে না।
তা হলে আমি আর কী করব বলো! তুমি এসে ঘরে তল্লাশ নিয়ে যাও।
সেটাই নেওয়া উচিত। মেয়েটা তো দিনরাত তোমার ঘরেই পড়ে থাকে। দিনরাত গুজগুজ, ফুসফুস।
উঠোনে সন্ধ্যার কয়েকজন গাহেক এসে দাঁড়িয়ে আছে। ব্যাগে জিনিস বুঝে নিচ্ছে। তারপর সাইকেলে বিলি করতে বেরোবে। তারা কাজ থামিয়ে হাঁ করে ঘটনাটা বুঝবার চেষ্টা করছে।
সন্ধ্যা হেঁকে বলল, ঘরে যাও তো বউদি, আর লোক হাসিও না। তোমার মেয়ে তার পিসির ঘরেই আসে, ডাইনিবুড়ির কাছে নয়। তোমার যদি পছন্দ না হয় তা হলে নিজের মেয়েকে নিজেই সামলে রাখতে শেখো। পাঁচজনের সঙ্গে ঝগড়া করার দরকার কী? সোহাগ তো সকলের ঘরেই যায়, শুধু আমাকে বলছ কেন?
তুমিই ওর মাথাটা খাচ্ছ বলে বলছি।
কী করে খেলাম বলো তো! কী করেছি ওর আমি?
তা আমি জানি না। আগে ও এত অবাধ্য ছিল না, আজকাল হয়েছে। আজকাল মুখে মুখে কথাও বলছে। পাড়াগাঁর মতো ঝগড়ুটে স্বভাব তো ওর আগে ছিল না!
পাড়াগাঁর লোকেরা না হয় বাংলা ভাষায় ঝগড়া করে, আর তোমরা করো ইংরিজিতে, এটুকু ছাড়া আর কোনও তফাত আছে? লেখাপড়া জেনে, বিলেত ঘুরে এসে কি সাপের পাঁচ পা দেখেছ নাকি যে, যাকে-তাকে যা খুশি তাই বলবে!
অমল এই রণাঙ্গনে ঢুকতে চায় না। তার কোনও ভূমিকাও নেই, দর্শক ও শ্রোতা হওয়া ছাড়া। কিন্তু আজকাল চেঁচামেচি শুনলে তার মাথা ঝিমঝিম করে, হাত পা কাঁপে, নার্ভাস লাগে।
সে বারান্দার দরজাটা খুলে আর্তস্বরে বলল, প্লিজ! প্লিজ মোনা, ঘরে চলে এসো।
মোনা তার ক্ষুরধার এবং রক্তাভ মুখ ফিরিয়ে গর্জন করল, চুপ করো! আমার ব্যাপার আমাকে বুঝতে দাও। শি হ্যাজ গন ইনটু হাইডিং।
আহা, তা কেন? হয়তো টয়লেটে গেছে, কিংবা…
না, টয়লেট আমি দেখেছি। এ-বাড়িতেই কারও ঘরে লুকিয়ে আছে।
কী করে বুঝলে? হয়তো কিছু কিনতে-টিনতে গেছে।
না, কোথাও যায়নি। আমি জানি। বুডঢা আশেপাশে দেখে এসেছে।
অমলকে দেখে সন্ধ্যা মুখ তুলে বলল, দেখেছ মেজদা, বউদি কীসব বলছে! সোহাগ আমার ঘরে আসে সে কি আমার দোষ? আমি নাকি আমার নিজের ভাইঝিকে কানমন্তর দিয়ে নষ্ট করছি।
সে রেফারি নয়, আম্পায়ার নয়, বিচারক নয়। সে অসহায় দুর্বল গলায় শুধু বলল, মোনা, প্লিজ…
সন্ধ্যাকে চেনে অমল। দুঃখী মেয়ে, খেটে খায়। এই বোনটার কথা মনেও থাকে না অমলের। এর স্বামী পরিত্যক্ত জীবনে কেউ কিছু সাহায্যে আসেনি। তাই ওর ভিতরে বিষ জমেছে মেলাই। এই অহেতুক আক্রমণে ও যদি মুখে সেই বিষ উগড়ে আনে তা হলে মোনা বিধ্বস্ত হয়ে যাবে।
মোনা ধমক দিল, তুমি চুপ করো।
শোনো মোনা, উঠোনে বাইরের লোক রয়েছে, শুনছে।
ইস্, ভারী লোক রে! সব তো ছোটলোক ক্যানভাসার। তোমার বোন তো ওদের সঙ্গে মিশে মিশেই ছোটলোক হয়ে গেছে।
নীচের লোকেরা পরস্পর একটু তাকাতাকি করে নিল। তাদের সম্পর্কেই এসব কথা বলা হচ্ছে, বুঝতে পারছে তারা। কিন্তু তারা রা কাড়ল না। ওদের এই অহেতুক অপমানে কান ঝাঁ ঝাঁ করে ওঠে অমলের।
চেঁচামেচি শুনে বাড়িসুদ্ধু লোক বেরিয়ে এসেছে উঠোনে। পাড়া প্রতিবেশীরা উঁকিঝুকি মারছে আশপাশ থেকে।
নীচে থেকে বউদি হঠাৎ বলল, সোহাগ তো একটু আগে পেছন দিকের পথটা দিয়ে কোথায় যেন গেল।
মোনা ধমকের গলায় বলল, কোথায় গেল?
আমাকে তো বলে যায়নি ভাই। তবে এক ছুটে বেরিয়ে যেতে দেখেছি।
শি ইজ হাইডিং। আপনারা জানেন, কিন্তু বলবেন না।
অমল ঘরে এসে মাথাটা চেপে ধরে বসে পড়ল বিছানায়। তার শরীর দুর্বল লাগছে। মাথা ঘুরছে। এতক্ষণে খোঁয়াড়ি ভাঙছে নাকি তার?
নীচে হঠাৎ মহিমের গলা পাওয়া গেল, কী হল এত চেঁচামেচি কীসের?
সন্ধ্যা চেঁচিয়ে বলল, সেটা তোমার মেমসাহেব বউমাকে জিজ্ঞেস করো। উনি বিলেত থেকে এসেছেন আমাদের সহবত শেখাতে। ইংরিজি বললেই যদি ভদ্রলোক হত তা হলে তো কথাই ছিল না!
মহিম বলে, কী হয়েছে বউমা, আমাকে বলবে?
সোহাগকে পাওয়া যাচ্ছে না, অথচ আজ আমরা কলকাতা যাব।
কতক্ষণ ধরে পাওয়া যাচ্ছে না?
চল্লিশ মিনিট হয়ে গেছে।
মহিম শান্ত গলায় বলে, দেখ কাণ্ড! এ হল গাঁ দেশ, কোথায় আর যাবে! হারিয়ে যাওয়ার তো জায়গা নেই এখানে। সকালে তো আমার সঙ্গে বাগানে ঘুরছিল। কোথায় আর যাবে।
তার কোথাও যাওয়ার কথা নয়। তার এখন গোছগাছ করার কথা। ইচ্ছে করেই কোথাও গা ঢাকা দিয়ে আছে।
আচ্ছা আচ্ছা, আমিই না হয় খুঁজে আনছি তাকে। তুমি বরং গোছগাছ শুরু করে দাও গে।
আপনাকে বলে রাখছি, সোহাগকে বুদ্ধি পরামর্শ দেওয়ার অনেক লোক কিন্তু এ-বাড়িতে আছে।
শুনছ বাবা! ভাল করে শুনে নাও। আমরাই নাকি ওর মেয়েকে পালানোর পরামর্শ দিয়েছি।
আহা, তুই চুপচাপ নিজের কাজ কর না।
চুপ করে থাকতে দিচ্ছে কোথায়? এখন এই সকালবেলায় খদ্দেরদের ভিড়, হিসেবপত্তর করতে হচ্ছে, এ সময়ে চেঁচিয়ে মাথাটাই গরম করে দিল।
বউমা, তুমি ভেবো না। আমি বেরোচ্ছি খুঁজতে।
খুঁজে পান ভাল, নইলে আমি পুলিশ ডাকব।
মহিম ভয় খেয়ে বলে, না, না, অত কিছু করতে হবে না বউমা ছেলেমানুষ, কোথাও গেছে।
সন্ধ্যা চেঁচিয়ে বলে, ডাকতে দাও না বাবা। ডাকুক পুলিশ। আমাদের কোমরে দড়ি বেঁধে নিয়ে যাক। কিন্তু তাতে তোমার মুখে কালিঝুলি কিছু কম পড়বে না। বুঝেছ? ও মেয়েই তোমার দাঁতের গোড়া ভাঙবে। পুলিশ ডাকবে। এঃ, মুরোদ কত! পুলিশ যেন ওর বাপের চাকর! পায়ে দাসখত দিয়ে বসে আছে, নাচতে বললেই নাচবে! যাও না যাও, পুলিশ ডেকে আনো৷ এখানকার পুলিশে না কুলোলে বাপের বাড়ির পুলিশ ডেকে আনো গিয়ে।
মোনা তীক্ষ্ণ গলায় বলে, শুনলেন! ওর কথা শুনলেন! কত দূর স্পর্ধা একবার দেখুন। বাপের বাড়ি তুলে কথা বলছে! শ্বশুরবাড়ি থেকে তো লাথি খেয়ে পালিয়ে এসেছ, অত বড় বড় কথা মুখে আসে কী করে?
সন্ধ্যা এবার বিকট একটা গলায় চেঁচিয়ে উঠল, আমার দাদা যদি পুরুষের মতো পুরুষ হত তাহলে তোমার মতো বজ্জাত মাগীকে অনেক আগেই পাছায় তিন লাথি মেরে তাড়াত। দাদা ভেড়ুয়া বলে বেঁচে গেছ। কোন গুণীন ধরে ওষুধ করিয়েছ কে জানে বাপু, লোকটা তো ওরকম ছিল না। সোনার মেডেল পাওয়া ছাত্র, এক ডাকে দশটা গাঁ চিনত। তার কী অবস্থা করেছ তা কি আমরা দেখতে পাই না!
ঘরের মধ্যে অমল বিছানায় শুয়ে পড়েছে। তার বুকের মধ্যে ব্যথা হচ্ছে। তার বমি পাচ্ছে। মরে যেতে ইচ্ছে করছে।
হ্যাঁ হ্যাঁ, তোমাদের অনেক গুণ জানি। সোনার মেডেল পাওয়া ছেলে গাঁয়ের মেয়েদের ধরে ধরে রেপ করে বেড়াত। আর তোমার কাছে যারা আসে তাদের কথাও জানি। স্বামী তাড়িয়েছে, এখন যত ওটোলোক ছোটলোক জুটিয়ে নিয়েছ। তোমরা সবাই তো এক ঝাড়েরই বাঁশ, গুণকীর্তির কথা আর বোলো না।
সন্ধ্যা চিৎকার করতে লাগল, বল মাগী, বল আমার দাদা কাকে রেপ করেছে! বল, পাঁচজনের সামনেই বল দেখি তোর কত বড় বুকের পাটা! তোর মুখে পোকা পড়বে হারামজাদী, বেশ্যা মাগী কোথাকার!
এই সময়ে বুডঢা কোথা থেকে দৌড়ে এসে ভিড়ে ভরা উঠোনে ঢুকল। বুদ্ধিমান ছেলে। তরতর করে দোতলায় উঠে মাকে জাপটে ধরে ঘরে নিয়ে দরজা বন্ধ করে দিল।
জ্ঞান হারানোর আগে অমল শুনতে পাচ্ছিল, ঘরের মধ্যে মোনা চিৎকার করছে, বলতে দে, আমাকে বলতে দে। ওর দাদা কাকে রেপ করেছে তা ফাস করে দিচ্ছি—
মা! মা! প্লিজ! ইউ আর আউট অফ ইওর সেনসেস! ওদের সঙ্গে কি তোমার ঝগড়া করা মানায়? চুপ করো, প্লিজ চুপ করো।
তবু ফুঁসছিল মোনা, ছাড়, ছাড় আমাকে। এখনই ওদের ভদ্রলোকের মুখোশ খুলে দিয়ে আসছি।
সেটা ঠিক হবে না মা। এরকম করতে নেই। জাস্ট টেক রেস্ট।
বুড়ঢাকে বোধহয় চটাস করে একটা থাপ্পড় মারল মোনা, কেন ছাড়ছিস না আমায়? ও যে এক তরফা চেঁচিয়ে যাচ্ছে শুনছিস না?
শুনছি মা। লেট দি ডগ বার্ক। তুমি চুপ করো।
তোর বাবাকে শুনতে বল। তোর বাবা বেরিয়ে গিয়ে বলুক কাকে রেপ করেছে।
সন্ধ্যা চিৎকার করছিল, কী রে খানকির মেয়ে, বললি না আমার দাদা কাকে রেপ করেছিল! বললি আমি কার সঙ্গে শোয়াবসা করি! বুকের পাটা থাকে তো আয়, সামনে এসে পাঁচজনকে বল! গুয়ের পোকা, কেলে কুত্তার পায়খানা, ইংরিজি মারাতে আসে!
নীচে যারা জড়ো হয়েছিল তারা সবাই সন্ধ্যাকে শান্ত করতে চেষ্টা করছিল।
ছেড়ে দাও দিদি, বড় মাপের মানুষের কেলেঙ্কারিও বড় মাপেরই হয়। তুমি তোমার মতো থাকো। আমরা তো চিনি তোমাকে।
আরে ওরা সব সাহেব মেম লোক, ওদের ধাত আলাদা।
সন্ধ্যা ফোঁপাচ্ছিল, কী সব বলল শুনলি তো তোরা। শুনি নাকি লেখাপড়া জানা মেয়ে। অমন লেখাপড়ার মুখে আগুন। বাইরের রং ফর্সা হলে কী হবে, ভেতরটা কালো আংরা।
যেভাবে পৃথিবীর সব ঝগড়াই ধীরে ধীরে ক্লান্ত হয়ে কথা ফুরিয়ে দম শেষ হয়ে স্তিমিত হতে থাকে এ ঝগড়াটাও শেষ অবধি থামল। হাত মুঠো করে, দাঁতে দাঁত চেপে বজ্রাঘাতের অপেক্ষায় ছিল অমল। কখন উত্তেজিত বলগাহীন মোনার মুখ থেকে পারুলের নামটা উচ্চারিত হয়। অল্পের জন্য আজ বেঁচে গেল পারুল। খুব অল্পের জন্য। বুডঢা সময়মতো না এলে সারা গাঁয়ে চাউর হয়ে যেত পারুলের নাম।
তীব্র উত্তেজনা, স্নায়ুর দুর্বলতা এবং অবসাদে অমল কিছুক্ষণের জন্য সত্যিই জ্ঞান হারিয়ে ফেলল। এই ক্ষমাহীন পৃথিবীতে মানুষ কী করে যে বেঁচে থাকে!
কী হয়েছে তোমার ঠাকুরপো! কী হয়েছে?
অমল ফ্যালফ্যাল করে যখন চাইল তখন তার মুখে চোখে ছিটোনো জলের শীতল স্পর্শ। সে প্রতিধ্বনি করল, কী হয়েছে আমার বলো তো!
তাই তো জিজ্ঞেস করছি। ঘরে এসে দেখি দাঁতকপাটি লেগে পড়ে আছ।
অমল এত দুর্বল বোধ করছিল যে চোখের পাতা দুটো পর্যন্ত খুলে রাখতে পারছিল না। বারবার বুজে আসছে চোখ, মানুষের শরীর যে এত শক্তিহীন হয়ে যেতে পারে এমন অভিজ্ঞতা তার আগে হয়নি কখনও।
আমার মেয়েটা কোথায় ঠাকরোন?
কোথায় আবার! পান্নাদের বাড়িতে গিয়েছিল। রোজই তো যায়। কী যে আজ অশান্তি হল তাই নিয়ে।
অমলের কিছু বলার নেই। চুপ করে থাকে।
চিন্তা কোরো না। তোমার মেয়েটা একটু ক্ষ্যাপাটে হলেও খারাপ কিছু নয়। বলতে কি বাপু, ও-ই তো আমাদের সঙ্গে যা একটু মেশে-টেশে। তোমরা আর কেউ বাপু আমাদের পাত্তাও দাও না।
সোহাগও মিশুকে নয়। এখানে এসে মিশুকে হয়েছে। সেটা হয়তো তোমাদের গুণ।
না বাপু, গুণের কথা ওঠে কেন? আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে মেলামেশাটাই স্বাভাবিক। আমরা তো পর নই। পর করে রাখলে আর কী করা যাবে।
সোহাগ কোথায়?
এসেছে। দাদুর কাছে বসে আছে। আজ যা কাণ্ড হল তাতে শ্বশুরমশাইয়ের হার্টফেল হতে পারত। ঝগড়া দেখে সোহাগকে খুঁজতে বেরিয়েছিলেন। ফিরে এসে কেঁপেঝেঁপে অস্থির হয়ে শয্যা নিয়েছিলেন। ডাক্তার অবধি ডাকতে হয়েছে। অনল বাগচী এসে ওষুধ ইনজেকশন দেওয়ায় এখন ঘুমোচ্ছেন।
খারাপ কিছু নয়তো?
ডাক্তার তো তেমন কিছু বলল না। শক পেয়ে নাকি হয়েছে। বয়সও তো কম হল না।
সব কিছুর জন্য নিজেকে বড় অপরাধী মনে হয় ঠাকরোন। আমি যদি একটু ভাল মানুষ হতাম।
যা বাবা, ও আবার কী কথা? তুমি আবার খারাপ কীসে?
আমিই তো খারাপ। বিদ্বান গাধা।
ছিঃ, ওরকম বলতে নেই। তুমি তো এ বংশের গৌরব। আর কেউ তোমার মতো হল না।
আশীর্বাদ করো যেন না হয়।
নিজের ঘাড়ে দোষ নিচ্ছ, কিন্তু তোমার বউটি আজ কী কাণ্ড করল বলো। অমন চেঁচিয়ে পাড়া জানিয়ে কেউ নিজের শ্বশুরবাড়ির কথা বলে? আর ওরকম সব অসভ্য কথা!
শঙ্কিত অমল একবার দু ঘরের মাঝখানের বন্ধ দরজাটার দিকে চাইল। বউদি বেশ জোর গলাতেই কথা কইছে। মোনা যদি শুনতে পায়?
কী দেখছ? মোনা তো কখন চলে গেছে!
কোথায়?
বুডঢা তো ঘণ্টাখানেক আগে মাকে নিয়ে কলকাতায় চলে গেছে।
ওঃ!
তোমার ঘরে একটা উকিও দিয়ে গেল না দেখলাম।
কলকাতায় চলে গেল?
যেতে পারবে কিনা দেখ।
কেন ঠাকরোন?
শুনছি কোন পার্টি নাকি সড়ক আর রেল অবরোধ করেছে বেলা দশটা থেকে। কিছুই চলছে না। গাঁয়ের অনেকে যেতে না পেরে ফিরে এসেছে।
অমল সিলিং-এর দিকে চেয়ে রইল।
উঠতে পারবে?
শরীরটা খুব দুর্বল লাগছে।
আগে জানলে ডাক্তারবাবুকে ডেকে আনতাম।
না, তার দরকার নেই। হঠাৎ অত চেঁচামেচি শুনে মাথাটা কেমন ঘুরে গিয়েছিল। আজকাল আমার চেঁচামেচি সহ্য হয় না।
সন্ধ্যারও ওরকম সব কথা বলা উচিত হয়নি। তোমার বউ আর হয়তো আসবেইনা। হ্যাঁ ঠাকুরপো, তোমরা কি শেষে আমাদের সঙ্গে সম্পর্ক তুলেই দেবে?
তা কেন ঠাকরোন, সম্পর্ক কি ইচ্ছে করলেই তুলে দেওয়া যায়!
যায় না? বলো কী? কত বাপ ছেলেতে মুখ দেখাদেখি বন্ধ।
হ্যাঁ, তাও বটে। ভাবছি ওরা যে গেল কোথাও আটকে থাকবে হয়তো। এবাড়িতে ফিরবে না হয়তো।
তোমার দাদা সঙ্গে গেছে, ঠিক ফিরিয়ে আনবে।
দাদা সঙ্গে গেছে?
হ্যাঁ। তার তো ব্যক্তিত্ব বলে কিছু নেই। বড্ড ভালমানুষ। মান অপমান গায়ে মাখে না। তোমার বউ ফাই-ফরমাশ করে, হাসিমুখে মেনে নেয়। ওই একধরনের মানুষ। মান অভিমান যা-কিছু সব আমার সঙ্গে। আর কারও সঙ্গে শত্রুতা নেই।
হেসে ফেলে অমল, দাদাকে খুব চিনেছ তো!
না চিনে উপায় কী বলো! কত বলি ভাদ্দর বউয়ের ফাই-ফরমাশ খাটো, লোকে বলবে কী! কিন্তু সে বলে, ওরা গাঁয়ে এসে অচেনা পরিবেশে পড়েছে, আমার তো দেখা উচিত। কথাটা তো মিথ্যেও নয়।
মোনাও দাদার কথা খুব বলে।
তুমি কি এক কাপ চা বা কফি খাবে?
খাব। তারপর ঘুমোব। স্নান-খাওয়ার জন্য ডেকো না। আমার খিদে নেই।
সোহাগকে ডেকে দেব? একটু বসুক এসে তোমার কাছে।
না ঠাকরোন। ওরা অনেক দূরের লোক। দূরেই থাকুক।
কী যে সব বল না, অলক্ষুণে কথা।
তোমার এক বিছানায় শোওয়ার থিওরি সব জায়গায় খাটে না।
দাসীর কথা বাসি হলে বুঝবে।
কফি খেয়ে অমল ঘুমোল। অনেকক্ষণ ঘুমোল। বিকেলে পড়ন্ত বেলায় ঘুম ভাঙল খিদেয়।
মোনা আর বুড়ঢা ফিরে এসেছে। পাশের ঘরে তাদের ইংরিজি ডায়ালগ শুনতে পাচ্ছিল অমল। এ-দেশের সিস্টেমকে গালাগাল দিচ্ছিল মোনা। রাগ করে বাড়ি ছেড়ে চলে গিয়ে ফের ফিরে আসার লজ্জা তো কম নয়।
বিদ্যুৎ-চমকের মতো মনে পড়ল, আজ পারুল আসবে। সর্বনাশ! এই আগ্নেয়গিরির লাভামুখে সত্যিই কি আসবে নাকি পারুল? তাকে যে আটকানো দরকার। ভীষণভাবে আটকানো দরকার!
তড়িঘড়ি উঠতে গিয়ে বিবশ হয়ে ফের বসে পড়ল অমল। মাথা ঘুরছে। স্পন্ডেলাইটিস ধরা পড়েছিল বছর খানেক আগে। ডান হাতে ঝিঁঝিঁ। ঘাড় টনটন করছে ব্যথায়।
চুপ করে বসে থাকে অমল। সামনেই চৌকাঠের ওপারেই দাঁড়িয়ে আছে সর্বনাশ। পারুলকে কী করে একটা খবর পাঠানো যায়?
কিছুই করতে পারল না অমল। দাড়াতে গেলেই টলে যাচ্ছে মাথা, পায়ের নীচে মেঝে টলমল করছে। একটু হুইস্কি খাবে কিনা ভাবল। খাওয়াটা বোধহয় বিচক্ষণতা হবে না। একটাই ভরসা, গ্রামে কোনও বাড়িতে ঝগড়া কাজিয়া হলে সেটা রটে যেতে দেরি হয় না। যদি তাদের বাড়ির ঝগড়াটার কথা পারুলের কানে পৌঁছে থাকে তাহলে সে হয়তো নিজে থেকেই আসবে না।
এই ক্ষীণ আশাটুকু নিয়ে গায়ে লেপ চাপা দিয়ে শুয়ে থাকে সে।
সন্ধের শঙ্খধ্বনি শেষ হতে না-হতেই হঠাৎ চটকা ভাঙল অমলের। নীচের তলায় হঠাৎ হাসি আর কথার শব্দ হচ্ছে। কারা যেন উঠে আসছে ওপরে।
মোনার কণ্ঠস্বর শোনা গেল। কাকে যেন বলছে, আসুন, আপনার কথা কত যে শুনেছি ভাই।
কে এল? কে আসতে পারে? পারুল? অসম্ভব। অসম্ভব। তবু বুকটা ধড়াস ধড়াস করতে থাকে তার।
পারুলের গীতধ্বনির মতো কণ্ঠস্বর বলে উঠল, ইস, কী সুন্দর দেখতে ভাই আপনি! অমলদার ভাগ্য খুব ভাল।
আপনার কাছে আমি! কী যে বলছেন। ভিতরে এসে বসুন।
এই ইনিই হলেন আমার স্বামী জ্যোতিপ্রকাশ গাঙ্গুলি।
আপনার কথাও খুব শুনেছি। আপনি তো ইন্ডাস্ট্রিয়ালিস্ট।
গম্ভীর এক পুরুষ কণ্ঠ বলে, যা শুনেছেন তার অনেকটাই বাড়াবাড়ি। মিস্টার রায় কোথায়?
বসুন। ডাকছি, ওঁর শরীরটা আজ ভাল নেই।
অমলের ইচ্ছে হল দোতলা থেকে লাফ দিয়ে নেমে পালিয়ে যায়। কিন্তু শরীর আজ বড্ড বাদ সেধেছে। উপায় নেই।
পারুল উচ্চকণ্ঠে বলে, আমার বান্ধবীটি কোথায়?
ও সোহাগের কথা বলছেন?
হ্যাঁ। ও আমাকে পারুল বলে ডাকে। ঠিক বান্ধবীর মতো।
হ্যাঁ, বিদেশ থেকে শিখে এসেছে। চট করে অচেনা কাউকে মাসি পিসি বলতে পারে না।
মাসি বললে খুশিও হই না। পারুল বলেই ডাকুক। সে গেছে কোথায়?
আর বলবেন না। এখানে এখন তার অনেক বন্ধু হয়েছে। দিনরাত আড়া। তবে এসে পড়বে ঠিকই। আপনি আসবেন জানে তো।
খুব ইন্টারেস্টিং মেয়ে।
এমনিতে খুব ভাল, কিন্তু বড্ড খেয়ালি।
কী চমৎকার অভিনয় মোনার। ওকে অস্কার দিতে ইচ্ছে হচ্ছে অমলের। অমল তীব্র শীতে জবুথবু হয়ে জড়বস্তুর মতো বসে রইল অন্ধকার ঘরে। মনে হচ্ছিল, সে আর নড়তে পারবে না। পারুলের মুখোমুখি হওয়াও সম্ভব নয় তার পক্ষে। মোনা বড় বিপজ্জনক জায়গায় চলে গেছে। আজই রাগের মাথায় সে পারুলের কথা বলে ফেলেছিল প্রায়। অমলের কলঙ্কের কোনও ভয় নেই, তার কিছুতেই কিছু যায় আসে না। কিন্তু পারুলের মূর্তিটা ভেঙে পড়ে যেত আর একটু হলেই।
সে শুনতে পেল, পারুল বলছে, অমলদার কি শরীর খারাপ?
হ্যাঁ। স্পন্ডেলাইটিসে কষ্ট পাচ্ছেন। দাঁড়ান, ডেকে আনছি।
থাক না। একটু পরে ডাকলেও হবে। আজ আপনার সঙ্গে আলাপ করতেই তো আসা।
মোনা বলল, আপনার সঙ্গেও আলাপ করার ভীষণ ইচ্ছে ছিল আমার। সোহাগের কাছে তো আপনি একজন গডেস।
খুব করুণ গলায় পারুল বলে, আচ্ছা, দেখুন তো কী কাণ্ড! ও আমাকেও ও কথা বলেছে, শুনে যে আমার কী লজ্জা হয়েছে বলার নয়। আমাকে ওসব ভাবে কেন ও?
মোনা হেসে বলে, ভাবার কারণ আছে বলেই ভাবে।
কারণ! কী কারণ থাকতে পারে?
আপনার মধ্যে একটা অদ্ভুত গ্রেসফুলনেস আছে। এতদিন কেবল আপনার ছবি দেখেছি আর কথা শুনেছি, আজ মুখোমুখি দেখে আমারও যেন মনে হচ্ছে আপনার মধ্যে ডিভাইন কিছু আছে।
যাঃ, আপনিও এসব বলছেন!
আমার ছেলেও বলে।
কী লজ্জার কথা বলুন তো। আমি তো একেবারে সাধারণ একটা মেয়ে।
তাহলে বোধহয় আমাদেরই চোখের ভুল।
জ্যোতিপ্রকাশ চুপ করে ছিল। এবার তার গুরুগম্ভীর গলায় বলল, দেবী হলে কিন্তু এদেশে খুব কদর হয়। দেবী বলে সেই যে গল্পটা—
আহা, ওসব তো গল্প।
সিঁড়িতে দুদ্দাড় পায়ের শব্দ তুলে উঠে এল সোহাগ।
হাই! পারুল পিসি!
এই দুষ্ট মেয়ে আমি আবার পিসি হলুম কবে?
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন