শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
ক্ষীণতোয়া নদীটির ধারে ধারে সাবধানী পায়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে মাছলোভী কিছু পাখি। এক কাঠঠোকরা অবিরল ঠুকরে যাচ্ছে কোনও গাছে, তাকে দেখা যাচ্ছে না। একটি দুটি কাঠবেড়ালির ব্যস্তসমস্ত যাতায়াত, এই বিরলে, নির্জনে ভাষাহীন এক কর্মকাণ্ড বয়ে যাচ্ছে। বাতাস কথা কইছে, নদী কথা কইছে, কে জানে গাছে গাছেও কথা হয় কি না, হয় বোধহয়। এই নির্জনতায় বসে সোহাগ তার ভাষাহীন চারদিককার ভাষাহীন কথা যেন শুনতে পাচ্ছিল। তার ভিতরকার অচেনা পুরুষটি তার মতোই চুপ করে আছে। তার মতোই যেন শুনছে এই চারদিকটার কথা।
সোহাগের পৃথিবী আর সকলের মতো নয়। যা দেখা যাচ্ছে, শোনা যাচ্ছে, অনুভব করা যাচ্ছে সেখানেই সোহাগের পৃথিবীর শেষ নয়। তার জগৎ আরও অনেক গভীর। চারদিককার শূন্যতার মধ্যেও লুকিয়ে থাকে কত রহস্য, কত দীর্ঘশ্বাস, কলকাকলি, কত হারিয়ে যাওয়া কথা। তার তো মনে হয় পৃথিবীর প্রথম মানুষ এবং প্রথম মানবীর শ্বাসবায়ু আজও ঘুরে বেড়াচ্ছে তার চারদিকে।
চারদিকটা আজ যেন প্রাণময়। গাছপালা, পাখি, কীটপতঙ্গ সকলের সঙ্গেই তার বড় ভাব করতে ইচ্ছে করে। কিন্তু সকলের সঙ্গে ভাব হয় না, করাও যায় না। বেড়াল, কুকুর, গোরু, ছাগল একরকম। কিন্তু আরও কত প্রাণী আছে পৃথিবীতে তারা আদর ভালবাসা বোঝে না, তাদের প্রেম-ট্রেম নেই। আছে শুধু কাজ, শুধু বেঁচে থাকা এবং প্রজনন। যেমন পিঁপড়ে, যেমন কেঁচো বা সাপ। কিছুতেই ভাব হয় না তাদের সঙ্গে, সে বইতে পড়েছিল, উইপোকাদের কথা, মাটির গোপন গহন প্রকোষ্ঠে রানি উইপোকাটাকে কেমন তোয়াজে রাখে অন্য উইপোকারা, খাওয়ায়, গরমে বাতাস অবধি করে। তার বদলে অলস রানির কাজ হল কেবল প্রসব করে যাওয়া। তার খুব ইচ্ছে হয়েছিল উইপোকাদের সেই বাড়িতে গিয়ে কিছুদিন থেকে আসে। মানুষ যদি মাঝে মাঝে পোকামাকড়ের মতো ছোট্টটি হয়ে যেত তবে বড্ড ভাল হত। ওই যে একটা কাক গাছের ডালে বসে তাকে উদ্দেশ করে অনেকক্ষণ ধরে ডাকছে, সোহাগের মনে হচ্ছে ও কিছু বলতে চাইছে তাকে। কাকের ভাষা যদি সে বুঝত!
বন্ধুদের সঙ্গে গল্পে গল্পে একদম খেয়াল ছিল না পান্নার। হঠাৎ একসময়ে খেয়াল হল সোহাগ কোথায় গেল? তাকে তো দেখা যাচ্ছে না কোথাও!
একটা ট্রাকে কমলবাবু আর কোটারারের লোকজন এসেছে। একটা ভাড়া করা বাসে এসেছে তারা। তবু লোকজন বেশি হয়নি। মেরেকেটে সতেরো আঠেরোজন হবে। তার মধ্যে বিজুর ক্লাবের সাত-আটজন ছেলে। সবই এক গাঁয়ের লোক, সবাই চেনা জানা। শুধু সোহাগই এদের মধ্যে নতুন। সে কাউকে ভাল চেনে না। বলতে গেলে এই দঙ্গলে সে-ই একমাত্র সোহাগের বন্ধু। যারা এসেছে তারা অধিকাংশই একটু জায়গাটা দেখতে গেছে ঘুরেফিরে। শুধু কয়েকজন একটু দূরে ব্যাডমিন্টন খেলছে। দু-তিনজন বয়স্কা মহিলা রোদে পিঠ দিয়ে উল বুনছে বা গল্প করছে শতরঞ্চি পেতে, কোথাও সোহাগ নেই।
পান্না উঠে চারদিকটা দেখে এল। কোথাও নেই।
বন্ধুদের কাছে এসে বলল, এই, সোহাগ কোথায় বলতে পারিস?
টুসকি বলল, ও তো একটা পাগল। কোথায় গিয়ে কার সঙ্গে ভাব জমিয়েছে দ্যাখ। কয়েকদিন আগেই তো দেখছিলাম কুমোরপাড়ায় সন্ধিবুড়ির দাওয়ায় বসে কী যেন বকবক করে যাচ্ছে।
পান্না বলল, মোটেই পাগল নয়, একটু খেয়ালি আছে।
ইতু বলল, যাই বল ভাই, বড্ড দেমাক। আমেরিকায় ছিল তো, তাই মাটিতে পা পড়ে না।
পদ্মা বলল, দেমাক হলে কি কেউ সন্ধিবুড়ির ঘরে গিয়ে বসে?
সে যাই বলিস, আমাদের সঙ্গে তো মিশতেই চায় না।
পান্না মাথা নেড়ে বলে, বললাম তো, একটু খেয়ালি। কিন্তু ভীষণ ভাল মেয়ে।
টুসকি বলল, মা তো আমাকে বলেই দিয়েছে অমল রায়ের মেয়ের সঙ্গে যেন না মিশি।
কেন রে! কী করেছে এমন সোহাগ?
দেমাক আছে ভাই, সে তুই যাই বলিস।
গাঁয়ের মহিলামহলে সোহাগ যে জনপ্রিয় নয় তা পান্না জানে।
সে বলল, মেয়েটা কোথায় গেল একটু খুঁজে দেখা দরকার।
নন্দিনী এতক্ষণ কিছু বলেনি। এবার বলল, অ্যাডাল্ট মেয়ে বাবা, অত চিন্তার কী আছে? এখানে তো আর হারিয়ে যাওয়ার ভয় নেই, গাড়িও চাপা পড়বে না। অস্থির হচ্ছিস কেন? চারদিকটা ঘুরতে গেছে হয়তো।
চল না, আমরাও একটু চারদিকটা দেখি। সেই তখন থেকে তো বসে গল্পই করে যাচ্ছি।
সবাই উঠে পড়ল।
হঠাৎ একটা খটকা লাগল পান্নার। ধারেকাছে বিজুদাকেও কোথাও দেখা যাচ্ছে না। এমনকী হতে পারে যে বিজুদা আর সোহাগ কোথাও নির্জনে গিয়ে গল্প-টল্প করছে! এরকমই তো হওয়ার কথা। সে তো নিজেও তাই চায়। ওদের মধ্যে ভাব হোক। খুব ভাব হোক। চায় না কে?
কিন্তু সমস্যা সোহাগকে নিয়েই। নিকষ্যি নারীবাদীরা যেমন হয় সোহাগ তেমন নয়। কিন্তু ওর পাগলা খেয়ালিপনা আছে। কোনও পুরুষ কি পারবে ওকে সামাল দিতে! বিজুদাকে পান্না চেনে। বিজুদা বড় ভাল ছেলে। ভীষণ মরালিস্ট এবং বিশুদ্ধতাবাদী। অন্যায় দেখলে রুখে দাঁড়ায়। বোধহয় পুরুষের সুপ্রিমেসিতেও বিশ্বাস প্রবল। ওর সঙ্গে কি সোহাগের বনবে?
ইস, যদি ওদের মিলমিশ হত কী ভালই হত তবে!
বনভূমি পার হয়ে খানিকটা এগোতেই সোহাগের দেখা পাওয়া গেল। তন্ময় হয়ে, বিভোর হয়ে বসে আছে। বাহ্যচেতনা নেই যেন।
সোহাগ! এই সোহাগ!
সোহাগ চমকাল না। ধীরে মুখ ফিরিয়ে তাকাল। ভারী সুন্দর দেখাল ওকে এখন। কী নিস্পাপ, ভাবলেশহীন মুখ! মুখে একটু মিষ্টি হাসি।
কী করছ এখানে বসে? আমরা তখন থেকে খুঁজছি তোমাকে!
নদীর ধারে এসে বসেছিলাম। নদী আমার ভীষণ ভাল লাগে।
ও মা! আমরা তো নদীর ধারেই পিকনিক করছি।
এমনই একা হতে ইচ্ছে করছিল বড্ড। একা না হলে ঠিক ফিল করা যায় না।
ও বাবা! আমরা তো বসে কলকল করে কথা বলেছি এতক্ষণ। কথাই আর ফুরোয় না।
আমারও কি কথা ফুরোয়! কত কথা জমা হয়ে আছে।
কার সঙ্গে কথা বলছিলে তুমি?
কে জানে! কথা হচ্ছিল, তবে কার সঙ্গে তা জানি না। বোধহয় নিজের সঙ্গে নিজের।
পান্না হেসে ফেলল, মাথায় পোকা আছে তোমার।
তা আছে।
বন্ধুরা একটু ছড়িয়ে গেছে। নদীর অগভীর জলে চটি হাতে নিয়ে নেমে পড়েছে সবাই। ওপাশে যাবে। নদীটায় মাত্রই কয়েক হাত চওড়া জলস্রোত। পেরোনো কোনও সমস্যা নয়।
টুসকি মুখ ফিরিয়ে ডাকল, এই পান্না ওপারে যাবি? ছোলার খেত দেখা যাচ্ছে, কাঁচা ছোলা খেতে বিউটিফুল।
তোরা যা আমি একটু পরে আসছি।
পান্না সোহাগকে বলল, হ্যাঁ সোহাগ, তোমাকে একটা কথা বলব?
বলো না।
এত একা তুমি কী করে থাক?
একা? বলে ভ্রূ কুঁচকে একটু ভাবল সোহাগ, তারপর মাথা নেড়ে বলল, না, একা নই তো!
একা নও! এই তো একা বসে আছ।
তোমার তাই মনে হচ্ছে বুঝি?
হ্যাঁ তো।
মাথা নেড়ে সোহাগ বলল, আমার তো একা বলে মনেই হয় না। আমার সঙ্গে কত কে থাকে।
শুনে পান্নার গায়ে একটু কাঁটা-কাঁটা দিল।
কে থাকে তোমার সঙ্গে?
সোহাগ হেসে ফেলে বলল, তোমাকে কতবার বলেছি, তুমি ভুলে যাও।
ভূতপ্রেত তো!
ওরকমভাবে ভাবলে হবে না। আমার মনে হয় আজ অবধি পৃথিবীতে যত মানুষ জন্মেছে এবং মরে গেছে তাদের সকলের ইমপ্রেশন আমাদের অ্যাটমসফিয়ারে রয়ে গেছে। আমি তাদের ফিল করি। এমনকী আদম আর ইভকেও, তারা ঠিক ভূতপ্রেত নয়, তবে একটা এনটিটি।
তুমি তাদের সঙ্গে কথা বল?
ঠিক তা নয়, তবে আমি অনেক কথা যেন শুনতে পাই, বাতাসে একটা ফিসফিসানির মতো, সব কথার কোনও অর্থও নেই, বেশিরভাগ সময় কথাগুলো বোঝাও যায় না। কিন্তু অ্যাটমসফিয়ারটা খুব বাঙ্ময় বলে মনে হয়।
বাবা গো, শুনে এই দিন দুপুরেও আমার ভয় করছে।
শুধু ওরা কেন পান্না, চারদিকে কত জীবজন্তু, পোকামাকড়, এমনকী ওই নদী বাতাস গাছপালা সকলকেই যে আমার ভারী জীয়ন্ত বলে মনে হয়। বন্ধুর মতো, সঙ্গীর মতো। তাই আমি কখনও একা বলে নিজেকে মনে করি না। তোমাকে বলিনি আমার খুব ইচ্ছে করে গভীর জঙ্গলের মধ্যে একদিন সম্পূর্ণ নগ্ন হয়ে বাস করতে। গায়ে কেন পোশাক থাকবে না জানো? অসভ্যতা করার জন্য তো নয়, সম্পূর্ণ নগ্ন হলে চারপাশটাকে আরও বেশি করে অনুভব করা যাবে।
আমি বাবা মরে গেলেও পারব না।
পৃথিবীর কোনও জীবজন্তুরই তো পোশাক নেই।
আহা, মানুষ বুঝি জীবজন্তু?
বায়োলজিক্যালি তাই।
এখন তো বিটকেল বন্ধুদের ছেড়ে মেয়েবন্ধুদের সঙ্গে একটু মিশবে এসো, চলো, নদীর ওপাশটায় যাই।
ওরা বোধহয় আমাকে খুব একটা পছন্দ করে না পান্না।
মিশলেই করবে। না মিশলে নানারকম ভেবে নেয়। ওরা কেউ কিন্তু খারাপ মেয়ে নয়।
মিশলে ওরা আমাকে পছন্দ করবে বলছ?
খুব করবে, ভাব হলে অনেক ভুল ধারণা কেটে যায়।
আসলে আমি ওদের মতো অত হাসতে-টাসতে পারি না তো।
তোমাকে জোর করে হাসতে হবে কেন? চলো তো, আগে থেকেই ওদের নিয়ে অত চিন্তা করার কিছু নেই। গাঁয়ের মেয়ে তো সব, একটু বোকা হয়তো, আমিও তো তাই। আমার সঙ্গে ভাব হল কী করে তোমার?
সোহাগ একটু হাসল, তারপর উঠে পড়ল।
আমি কী ভেবেছিলাম জানো সোহাগ?
কী?
ভেবেছিলাম তুমি হয়তো বিজুদার সঙ্গে একটু কেটে পড়েছ।
বিজুবাবু! তার সঙ্গে কেন?
এমনি ভেবেছিলাম। বিজুদার তো তোমাকে খুব পছন্দ।
তাই বুঝি?
টের পাও না?
না তো!
বিজুদাকে তোমার কেমন লাগে সোহাগ?
বড় ভাল।
তার মানে?
গুডবয় বলতে যা বোঝায় তাই।
তার মানেটা কী দাঁড়াল? অপছন্দ?
তাই বললাম বুঝি?
আমি তো হাঁদা নই। মেয়েরা মোটেই গুডবয়দের বিশেষ পছন্দ করে না।
এ মাঃ। পান্না, চটি খুলেছ, কিন্তু মোজা খোলোনি!
পান্না জিভ কেটে দেখল সত্যিই সে মোজা সমেত জলে পা ডুবিয়েছে।
এখন কী হবে?
সোহাগ বলল, কী আর হবে! খুলে রোদে মেলে দাও। সিন্থেটিক মোজা, কয়েক মিনিটে শুকিয়ে যাবে।
জল হিলহিল করছে ঠান্ডা। পা থেকে শরীর বেয়ে উঠে আসছে ওপরে। গোড়ালি ছাড়িয়ে প্রায় হাঁটু অবধি জল, একেবারে মাঝখানটায় খপাৎ গভীরতা।
এ মাঃ! শাড়ি ভিজে গেল!
সোহাগ তার ঘাগরার মতো পোশাকের ঘেরাটোপটা অনেকটা ওপরে তুলে নিয়েছে। হেসে বলল, অত ভয় পাচ্ছ কেন, শীতের টান বাতাস আর এত রোদে শুকিয়ে যাবে। শাড়ি পরে এসে ভুল করেছ।
হ্যাঁ, কী যে হল, শাড়ি পরে ফেললাম।
এখন আর কী করবে!
দুজনে ফের বালি জমিতে উঠে চটি পরে নিল। চটির মধ্যে বালি কিরকির করছে।
হ্যাঁ সোহাগ, বললে না তো!
কী বলব?
গুডবয়কে নিয়ে ওই কথাটা।
গুডবয়দের নিয়ে আবার কথা কীসের? গুডবয়রা গুডবয় থেকে যায়।
তার মানে বিজুদাকে তোমার পছন্দ নয়।
আমার মুখে কথা বসাচ্ছ পান্না, বিজুবাবু বেশ লোক।
যাঃ, আমার মনটা খারাপ হয়ে গেল।
ওমা, কেন?
কত আশা করেছিলাম।
কীসের আশা?
বলতে এখন একটু লজ্জা করছে, আশাটা হয়তো একটু বেশিই করেছিলাম।
আগে আশার কথাটা বলো তো।
আসলে বিজুদা আমাদের কাছে হিরো হলেও তোমার কাছে তো কিছুই নয়। কেরিয়ার বলতে ওকালতি, সেটাও এমন কিছু গ্ল্যামারাস কেরিয়ার নয় আজকাল তার ওপর গাঁয়ে থাকে, শহুরে পালিশ নেই।
কিন্তু বিজুদাকে নিয়ে এত কথা হচ্ছে কেন? প্রবলেমটা কী?
আমি যে ভেবেছিলাম তোমার সঙ্গে বিজুদার প্রেম-ট্রেম কিছু একটা হবে।
সোহাগ হেসে ফেলল, তাই বলো। ছেলেতে মেয়েতে ওই একটা ছাড়া আর বুঝি কিছু হতে নেই?
তুমি যে কেন বিজুদাকে পাত্তা দিলে না, অবশ্য দেবেই বা কেন। তুমি কত বড়লোকের মেয়ে, কত স্মার্ট, কত আধুনিক।
তোমাব আজ কী হল বলো তো পান্না! আজ একদম উলটোপালটা কথা বলছ।
না সোহাগ, সত্যিই আমার খুব আশা ছিল। বিজুদার সঙ্গে তোমাকে ভীষণ মানায়।
সোহাগ মৃদু হেসে বলল, পুয়োর গার্ল!
পান্না একটু লজ্জা পেয়ে বলল, কথা উইড্র করছি।
আমি কিছু মনে করিনি পান্না। তোমার বিজুদা অনেস্ট অ্যান্ড গুডম্যান, সেটা কিন্তু তার ডিসক্রেডিট নয়। এ-যুগে ওরকম মানুষের সংখ্যা কমে যাচ্ছে।
এটা প্রশংসা হতে পারে, কমপ্লিমেন্টও হয়তো, কিন্তু বড্ড ক্যারেক্টার সার্টিফিকেটের মত শোনাচ্ছে যে!
সোহাগ একটা কপট দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, কী করব বলো, আমি যে ঠিক গুছিয়ে কথা বলতে পারি না। পুয়োর ভোকাবুলারি।
ধ্যুৎ তুমি ভীষণ বুদ্ধিমতী মেয়ে, তোমাকে আমি চিনি।
তা হলে ওকথাটা এখন থেমে থাক।
পান্না হেসে বলল, থাক।
দুপুরে রোদে ঘুরে লাল হয়ে ঘেমে-চুমে তারা যখন ফিরে এল তখন খাবার সার্ভ করা হচ্ছে। ঘাসের ওপর শালপাতার থালা আর বাটিতে সুস্বাদু সব পদ।
টুসকি অভিমানের গলায় বলল, পিকনিকে আজকাল কত গানবাজনা, নাচানাচি হয়, অন্তাক্ষরী হয়, কমপিটিশন হয়, আমাদের কিচ্ছু হল না। বিজুদার পিকনিক তো, বেশি আর কী হবে। যা নীরস লোক!
নিরু ঠোঁটকাটা আছে, বলল নীরস লোক তো তবে লাইন দিয়েছিলি কেন?
টুসকি লাল হয়ে সিঁটিয়ে গেল।
ব্যাপারটা আগাগোড়া লক্ষ করল সোহাগ। এগিয়ে গিয়ে বলল, আমরা একটু সেলিব্রেশন তো করতেই পারি। পিকনিক মানেই তো তাই।
নিরু বলল, কী করে হবে! মিউজিক সিস্টেমই তো আনা হয়নি।
তাতে কী! গান তো গাইতেও পারি আমরা। পারি না?
টুসকি করুণ মুখ করে বলল, ঝিনচাক মিউজিক ছাড়া কি জমবে?
চেষ্টা করতে দোষ কী?
কে কে গান জান বলে। খুব ভাল না জানলেও চলবে।
নবীনা বলল, বিজুদার পারমিশন নিয়ে নাও। নইলে পরে আবার বকবে।
চাপা গলায় সোহাগ বলল, বিজুদা তো আমাদের অভিভাবক নন, অত ভয় পাবার কী আছে? ইনোসেন্ট গান, সঙ্গে একটু নাচ তো হতেই পারে। এ তো ডিসকোথেক নয়।
ভয়ে ভয়ে তিন চারজন নাম দিল। একটা জায়গায় কাঠকুটো জড়ো করে আগুন দেওয়া হল চারদিকে গোল হয়ে বসল তারা।
সোহাগ বলল, এটা ক্যাম্প-ফায়ার। বিকেলের দিকে হলে ভাল হত কিন্তু দুপুরেও দোষ নেই। লেট আস সিং।
পান্না খুব অবাক হয়ে দেখল সোহাগ ভারী সুরেলা গলায় গান ধরেছে, উই শ্যাল ওভারকাম…
সুরটা সকলের চেনাজানা। সহজ গানটার মধ্যে একটা চোরা আবেগ আছে, সহজেই ভাসিয়ে নিয়ে যায়। হাততালির সঙ্গে সঙ্গে এই গানে মুহূর্তেই জমে গেল আসর। যারা দূরে দূরে ছিল সব এসে জড়ো হয়ে গেল চারধারে। একটু বাদে গলা মিলিয়ে ফেলল সবাই। আর নাচবার জন্য কাউকে আহ্বান করতে হল না। প্রথমে শরীরের দোল তারপর নাচের ব্যাপারটা আপনা থেকেই ঘুরতে লাগল। সোহাগ এরপর “ডো রে মি…” ধরল। তারপর রবীন্দ্রসংগীত। সব চেনা গান। হিন্দিও হল, গানের উৎসমুখ খুলে যেতেই লজ্জা সংকোচ ঝেড়ে ফেলে সবাই একে একে নিজের জানা প্রিয় গান গেয়ে উঠতে লাগল। গলা মেলাল সবাই।
পান্না চোরচোখে একবার খুঁজে দেখল, বিজুদা কোথায় দাঁড়িয়ে। বেশি খুঁজতে হল না। দেখা গেল, গোল চক্করটার একটু বাইরে বিজুদা বসে আছে, মুখে স্মিত হাসি।
কেটাবারের লোকেরাও গানের আসরে চলে আসায় মধ্যাহ্নের ভোজ স্থগিত রইল। প্রায় ঘণ্টাদুয়েক চলল গানের আসর।
খাওয়ার পর ঘণ্টাখানেক অন্তাক্ষরা হল। রোদ মরে আসছিল ক্রমে। ঠান্ডা হাওয়া দিচ্ছিল খুব।
ফেরার সময় পান্না চাপা গলায় বলল, ইস তুমি কী ভাল গাও!
দুর! ওটা শিক্ষিত গলার গান নয়। তবে এসব অকেশনে কাজে লাগে।
আমি গলা চিনি সোহাগ। তোমার গলায় ভীষণ সুর আছে।
আমি কিন্তু গান-টান শিখিনি। স্কুলে-টুলে যা শিখিয়েছে তাই।
তা হলে এখন শেখো। প্র্যাকটিস করলে দারুণ হবে।
কী হবে শিখে? গ্র্যামি অ্যাওয়ার্ড পাব, না কি গানকে কেরিয়ার করব বল তো! আমার ওরকম হতে ভাল লাগে না। গান গাইতে হলে মনের আনন্দে গাওয়াই ভাল। ব্যায়াম বা শরীরচর্চার মতো রেগুলার গলা সাধা ওসব আমার একটুও ভাল লাগে না।
তোমাকে নিয়ে আর পারি না। কী যে তোমার ভাল লাগে!
সোহাগ হাসল, তোমার বন্ধুরা আর আমাকে অপছন্দ করছে না তো!
না না, তারা তো তোমার ফ্যান হয়ে গেছে।
আচ্ছা, আমরা সকলের সঙ্গে বাসে না ফিরে একটা মারুতি গাড়িতে ফিরছি কেন বলো তো পান্না। এটা খারাপ দেখাচ্ছে না?
কী জানি। শুনছি তো এ-গাড়িটা বিজুদা কিনবে। তার কোন মক্কেলের গাড়ি। ট্রায়াল দিচ্ছে। বোধহয় তোমাকে ইমপ্রেস করার জন্যই এই অ্যারেঞ্জমেন্ট। কিন্তু তুমি তো ইমপ্রেসড হচ্ছ না।
না। মানুষটার বদলে গাড়ি কি বেশি ইমপ্রেস করতে পারে? বরং ব্যাপারটা খারাপ দেখাল। কেউ হয়তো কিছু ভাববে।
তা ভাবুক না। মানুষের স্বভাবই হল নিজেদের ইচ্ছেমতো কিছু একটা ভেবে নেওয়া।
তোমার বিজুদা কিন্তু এ-গাড়িতে ওঠেনি।
উঠলে খুশি হতে?
দুঃখিতও হতাম না। হি ইজ এ গুড কম্পানি।
সেটা আরও খারাপ দেখাত। সবাইকে ছেড়ে উনি কি আলাদা গাড়িতে ফিরতে পারেন? আফটার অল বিজুদাই তো আজকের হোস্ট।
গাড়ি তাকে বাড়ির দোরগোড়া অবধি পৌঁছে দিয়ে গেল।
সোহাগ ঘরে ফিরে আগে দাদুর ঘরে উঁকি দিল।
কফি খেয়েছ দাদু?
এই খেলাম। কেমন হল তোর পিকনিক?
যে রকম হয়।
যা ঘরে গিয়ে বিশ্রাম কর। সারাদিন ধকল গেছে।
না, সারাদিনের ধকল কিছু টের পাচ্ছে না সোহাগ। তার বেশ ভাল লাগছে। বেশ ভাল।
আজকাল মা বাবা একসঙ্গে ও-ঘরে থাকে। নতুন নিয়ম। বুডঢা এবার আসেনি, তার পরীক্ষা। এ-ঘরে সোহাগ একা।
ফিরে এসে সোহাগ চুপ করে চেয়ারে কিছুক্ষণ বসে রইল। আলো জ্বালল না। খুব চুপচাপ কিছুক্ষণ বসে সে একটু ধ্যান করল। মেডিটেশন তার প্রিয় এক প্রক্রিয়া। ধ্যানে সে নিজের মনটাকে আঁতিপাঁতি করে খুঁজে দেখতে চায়। তার মনের মধ্যে আজ অনেক ধাঁধা। অনেক প্রশ্ন।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন