তিয়াত্তর অধ্যায়

শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

তিয়াত্তর

ঘড়ির দুটো কাঁটা হাতজোড় করে রাতের মতো বিদায় জানাচ্ছে সবাইকে। শুভরাত্রি বন্ধুগণ। রাত বারোটা।

আধো ঘুমের ভিতরেই একবার বাঁপাশ ফিরল সে। ফের ডানপাশ। অস্থিরতা, তার ঠোঁটে এখনও লেগে আছে একটি ভীরু চুম্বনের স্বাদ। ইট ওয়াজ এ কাওয়ার্ডলি কিস। আত্মবিশ্বাসহীন, কল্পিত, অগভীর। একটি চকিত চুম্বন থেকেও কত কী বুঝতে পারা যায়। বুঝতে পারা যায়, এই পুরুষটি আর কখনও কোনও মেয়েকে চুমু খায়নি। এই নীতিবাগীশ পুরুষটি তার কৌমার্য হারানোর ভয়ে জড়সড়, এবং চুম্বনের সময়ে তার ভিতরে চিৎকার করছে তার নানা সংস্কার। ফলে প্রাচীন পবিত্রতার শৃঙ্খল ঝনঝন করে বেজে উঠছে হাতে পায়ে। ফণা তুলছে পাপের ভয়। অসহায় পুরুষটি তাকে আলিঙ্গনও করতে পারেনি যথারীতি। গাঢ় শ্বাসে ভয়ের কাঁপন, বুকের ঢিপঢিপ শব্দ শোনা যাচ্ছে দেহের বাইরেও। লজ্জায় চোখ বোজা, কোনও আশ্লেষ নেই, তীব্রতা নেই, অধিকারবোধ বা পৌরুষ নেই। শুধু অধরে অধরে কুশল বিনিময়ের মতো। ভিতর থেকে রাশ টেনে রাখল কে? কে বলো তো! বোধহয় ওর প্রাচীনপন্থী, রক্ষণশীল, গোঁড়া পূর্বপুরুষদের ডি এন এ। নাকি জিন-এর পরম্পরা?

হাসি পেয়েছিল কি সোহাগের? মায়া হয়েছিল কি অসহায় পুরুষটির দিকে গোল গোল চোখে চেয়ে?

আশ্চর্যের বিষয় হল, সেসব হয়নি। সে ওই চকিত লঘু চুম্বনটিকে উপভোগ করেছিল। তার ঠোঁটে পুরুষদের অধরের নিষ্পেষণ কম হয়নি। প্যাশনেট কিস কাকে বলে তা সোহাগ জানে। কিন্তু আজকের ওই স্পর্শটির মতো এমন রোমান্টিক কোনওটাই ছিল না কখনও। ঠোঁটে স্বাদ লেগে আছে এখনও। বারবার তন্দ্রা ছুটে যাচ্ছে তার। বারবার পাশ ফিরছে। এত চঞ্চলতা কখনও বোধ করেনি সে।

জীবনে কোনও পুরুষের প্রয়োজন অনুভব করেনি বলেই এর আগে কখনও হাউড়ে পুরুষের হামলা একটুও ভাল লাগেনি তার। সোহাগ জানত তার জীবন অন্যরকম এবং একক। পুরুষ কেন, কোনও মানুষ না হলেও তার চলে। তার চারদিকের আবহমণ্ডলে নিত্যই সে কত সত্তার সন্ধান পায়। এই গাছপালা, বাতাস, পশুপাখি, জীবজন্তু তার সঙ্গে কত কথা কয়। পৃথিবীতে যত মানুষ জন্মেছে তাদের সকলের যেসব স্পন্দন আর চিহ্ন ছড়িয়ে রয়েছে চারদিকে তারাও কাছে চলে আসে তার। সে টের পায় তাদের। কথাও বলে তাদের সঙ্গে। তার মা আর বাবার ধারণা তার মাথায় ছিট আছে, সে ভূতগ্রস্ত, প্রবলেম চাইল্ড। হয়তো তাদের ধারণা মিথ্যেও নয়। সে জানে সে স্বাভাবিক নয়। তার কথা শুনে অনেকেই অবাক হয়। আর তার ওই বিভোর নাচ দেখে কতজন বলেছে, একে ভূতে পেয়েছে।

হ্যাঁ, ভূতেই পায় তাকে। অনেক ভূত তার। আর ওই ভুতুড়ে জগৎই তার প্রিয়। ঘর সংসার আর মেয়েলিপনা তার একটুও সহা হয় না। তাই তার পুরুষে আসক্তিও জন্মায়নি কখনও।

পিসি সেদিন তার কথাবার্তা শুনে দুঃখ করে বলছিল, হ্যাঁ রে, তুইও কি শেষে আমার মতো হবি? এই যে একা একা টেনে নিচ্ছি নিজেকে এটা কি বেঁচে থাকা?

কেন পিসি, তুমি তো চমৎকার আছ! কত কাজ তোমার, কত রোজগার করছ।

সে তো ঠিকই রে। লোকে বলেও তাই। লোকে ভাবে, পয়সা হলেই হল, আর কিছুর দরকার নেই। কিন্তু পয়সা দিয়ে আমি কী করব বল তো! ব্যাঙ্কে আমার লাখ দুয়েক টাকা জমেছে, কিন্তু এ-টাকা দিয়ে কী করব যখন ভাবতে বসি তখন কূলকিনারা পাই না। কী করব বল তো টাকা দিয়ে? টাকা থেকে যদি নিংড়ে একটু আনন্দ পাওয়া যেত তাহলেও হত। আর কাজ! হাড়ভাঙা খাটুনিরও একটা আনন্দ হয় যদি সেটা কারও জন্য হয়।

তবে কী হলে ভাল হত পিসি?

দীর্ঘশ্বাস ফেলে সন্ধ্যা বলে, ঘরসংসার হলে, স্বামী, ছেলে মেয়ে এসব থাকলে তখন খেটে আনন্দ।

তোমার কেবল এক কথা, পিসেমশাইকে খুব ভালবাসতে বুঝি?

তা নয়, ভাল করে চোখের দেখাই তো হল না, ভালবাসাটা হবে কেমন করে বল। সেরকম ভালবাসা নয়, এ হল অন্যরকম। কীরকম জানিস? বিয়ের পরই মনে হল, এ আমার নিজের মানুষ। এই আমার সম্বল, আমার আশ্রয়, আমার ইহকাল পরকাল, দুনিয়ার কোটি কোটি মানুষের ভিড় থেকে এই যে একজন উঠে এসে গলায় মালা পরিয়ে দিল, অমনি তার সঙ্গে বাদবাকি মানুষের তফাত হয়ে গেল।

এটাই তো প্রেম!

মাথা নেড়ে সন্ধ্যা বলে, না রে, তোরা যাকে ভালবাসা বলিস এ তা নয়, তার চেয়েও বেশি। ও তুই বুঝবি না। আমি তাকে কম খুশি করতে চেষ্টা করেছি? বাইরে থেকে এলে পা থেকে জুতো খুলে দিয়েছি, বাতাস করেছি। তার যত্নের এতটুকু ত্রুটি রাখিনি। তাকে পেয়ে যেন আমি উথলে উঠলাম, ডবল হয়ে গেলাম। আর তাতেই সে হাঁসফাঁস হয়ে গেল কিনা কে জানে। হয়তো অত আদেখলেপনা দেখেই বিমুখ হল। হয়তো সইল না।

যাই বলো পিসি, লোকটা কিন্তু আনগ্রেটফুল ছিল।

তা তো ছিলই। সে কি আর ছিল না। তবে আমি তো তার দোষগুণ বিচার করে দেখিনি, এমনকী সুন্দর না কুচ্ছিত সে কথাও মনে হয়নি।

লোকটা কি হ্যান্ডসাম ছিল পিসি?

আরে না। মাঝারি খেঁকুড়ে চেহারা, রোগা, রংটাও শ্যামলা। মুখের ছিরি ওই একরকম। তুই বুঝবি না, লোকটা বড় কথা নয়, সে হয়তো পছন্দ করার মতোও নয়, তবু তাকে নিয়েই আমার যে মাতামাতি সেটা হল আমার ব্যপার। একটা মানুষকে পেয়েছি, এবার তাকে ঘিরেই লতিয়ে উঠব।

লোকটাকে তো তুমি ডিভোর্স দাওনি, না পিসি?

কী সব কাগজপত্র পাঠিয়েছিল সই করতে। আমি সই করেও দিয়েছি, তবু নাকি হয়নি। আমাকে খুব ধরেছিল যেন মামলা না করি।

করলে লোকটাকে বাইগামির চার্জে জেল খাটাতে পারতে।

লাভ কী বল। সে জেল খাটবে আর তার নতুন বউ চোখের জল ফেলে আমাকে শাপশাপান্ত করবে— সেটা কি ভাল? আমার যা গেছে তা তো আর ফিরে পেতাম না।

তুমি খুব সংসার করতে ভালবাসো, না পিসি?

সন্ধ্যা লাজুক একটু হেসে বলল, এক একটা মেয়ে সংসার করতেই জন্মায়। তারা আর কিছু চায় না। কত মেয়ে গান গায়, লেখাপড়ায় বড় হয়, মিস ইন্ডিয়া হয়। ফিল্মস্টার হয়, মন্ত্রী হয়, তাদের ধরে বেঁধে বিয়ে দিলে বলে, জীবনটা নষ্ট হল। আবার আমার মতো কিছু আছে যারা আর কিছু হতে চায় না। শুধু সংসার নিয়ে মেতে থাকতে চায়।

তুমি যা করেছ পিসি তা যে সংসার করার চেয়ে অনেক বেশি।

জানি রে জানি। লোকে তাও বলে। কিন্তু তারা তো আমার বুকের ভিতরটা দেখতে পায় না। সেই জায়গাটা বড্ড ফাঁকা।

তুমি সেই লোকটার কথা এখনও ভাবো?

দেখ, সত্যি কথা বলতে কি তার মুখটা এখন ভাল করে মনেই পড়ে না। এ তো ঠিক একটা লোকের ওপর টান নয়। ওই লোকটাকে ঘিরে যা গড়ে উঠতে পারত সেই সংসারের ওপর টান। ওসব বুঝবি না তুই।

সোহাগ যে বুঝতে পারে না তা নয়। অন্তত এটুকু বোঝে পৃথিবীতে এক একটা মানুষ এক একটা অবসেশন নিয়ে জন্মায়। পিসির সঙ্গে তার কি যোজন যোজন তফাত? সেটাও মনে হয় না তার। মাঝে মাঝে মনে হয় তার ভিতরেও একটা টোটাল সারেন্ডার আছে। অবশ্যই সেটা কোনও পুরুষমানুষের জন্য নয়। সেরকম প্রাণ সঁপে দেওয়ার মতো পুরুষমানুষ তো জন্মায় না। তবে কার জন্য হবে সেই সমর্পণ তা ভেবে পায় না সে।

পিসি বলে, আমার মতো হোস না রে। বড় কষ্ট।

আবার বিয়ে করতে পারো না কেন পিসি?

সন্ধ্যা হেসে বলে, বয়স বসে নেই রে। মনটাও বড় আঁচড়ে কামড়ে গেছে। এখন আর সেরকম হবে না। আরও কী জানিস? এখন আমার টাকা হয়েছে, কোমরের জোর হয়েছে, এখন কেউ বিয়ে করলে তার নজর থাকবে আমার টাকার উপর। এখন তো একটু একটু করে বুদ্ধিও খুলেছে আমার। আগের মতো বোকা তো নই। তাই স্বার্থপর দুনিয়াটাকে দেখতে পাই।

তাহলে তোমার কী হবে পিসি?

কী আবার হবে! অসুরের মতো খাটব, গুচ্ছের টাকা হবে আর তা দিয়ে কী করব ভেবে কূল পাব না। এখন এ-সংসারে আমার কত কদর হয়েছে দেখেছিস? সবাই তোতাই-পাতাই করে, বড় গলায় কেউ কথাটি কয় না। বিয়ে-ফেরত মেয়েমানুষের বাপের বাড়িতে কদর হয় দেখেছিস কখনও? হয় না। এ কদর আমার নয়, আমার টাকার। তলিয়ে ভাবতে গেলে বড় ঘেন্না আসে সবার ওপর। তাই আর ভাবি না। আস্তে আস্তে একটা যন্ত্র হয়ে যাচ্ছি।

পিসির মানসিকতাটা সোহাগের অদ্ভুত লাগে। এই স্বাধীনভাবে খেটে এত রোজগার করছে, পাঁচজনের কাছে গুরুত্ব পাচ্ছে তা পিসির পছন্দ নয়। এর চেয়ে কী করে বেশি পছন্দের হয় একজন অচেনা পুরুষের সংসারে দাসীবৃত্তি করা এবং তার সন্তান ধারণ ও পালন করা? এবং সে পুরুষটাও নিতান্তই এক সাদামাটা সাধারণ মানুষ। এই বিস্ময়টা অনেক ব্যাখ্যা করেও মেটে না তার।

আজ রাতে পলকা তন্দ্রার মধ্যে বার বার সে পিসিকে দেখছিল। স্বপ্নই, তবে তেমন তাৎপর্যপূর্ণ কিছু নয়। একবার দেখল, আকাশে দিগন্তে ঘোর মেঘ করেছে, পিসি তাকে বলছে, ওই দেখ, আজ ভাসিয়ে নেবে। ফের দেখল, পিসি একটা ব্যাগে জামাকাপড় গুছিয়ে নিচ্ছে। সে বলল, কোথায় যাবে পিসি? সন্ধ্যা একটা পোস্টকার্ড তার দিকে ছুড়ে দিয়ে বলল, ওই দেখ না, ডেকে পাঠিয়েছে। সে অবাক হয়ে বলে, কে ডেকে পাঠিয়েছে পিসি? সন্ধ্যা মুখ টিপে হেসে বলল, কে আবার। আমার যম। কিন্তু সে ডেকে পাঠালে তো না গিয়ে উপায় নেই রে। সে চেঁচিয়ে বলল, তুমি যেও না পিসি। পিসি বলল, তাও কি হয়!

ঘুম ও জাগরণের একটা মাঝামাঝি চৌকাঠে সে স্পষ্ট টের পেল সে কথা কইছে, মেয়েদের কোনওদিন কিছু হয় না কেন জানো? তাদের মনটায় একটা দাসখত লেখাই থাকে।

ঘুম ভেঙে সে চারদিকে চাইল। অন্ধকার। পুঞ্জীভূত অন্ধকার। তারপর স্বপ্নটার কথা মনে পড়ল। সেই লোকটা যদি আজ পিসিকে ডেকে পাঠায় তাহলে কি পিসি সত্যি সত্যিই সব ছেড়ে চলে যাবে নাকি? ভাবতেই ভারী রাগ হচ্ছিল তার, মধ্যরাতে, একা একা।

ঠোঁটে হালকা লিপস্টিকের ছোঁয়ার মতো চুম্বনের সঙ্গে স্বাদ লেগে আছে। তার অধর ধর্ষিত হয়নি, নন্দিত হয়েছে। অন্ধকারে সে ভারী আরামে চোখ বুজল। মুখে একটু হাসি।

তারপর ভাবল, যদি সত্যিই কোনওদিন ডাকে লোকটা আর পিসি যদি সত্যিই চলে যায় তাহলেই বা ক্ষতি কী? যে যার নিজের জীবন তো নিজেই রচনা করবে। দাসীবৃত্তির মধ্যেই যদি কেউ আনন্দ পায় তো সে তাতে বাধা দেওয়ার কে?

ভেবে ফের একটু হাসল সোহাগ। একটু গরম লাগছে। আজকাল বেশ গরম পড়েছে এখানেও। পাখাটা কি চালিয়ে দেবে? না থাক। শেষরাতে হিম-টিম পড়লে তার অ্যালার্জি হবে।

তার শরীরেও সংকেত পৌঁছায়। নির্ভুল সংকেত। গভীর গুহার কবোষ্ণ অন্ধকারে তার শরীরে নানা স্পন্দন ছুঁয়ে যায়। ওঠো। জাগে। ধীরে, খুব ধীরে তোমার চোখ সইয়ে নাও জাগরণে। উপোসী, জীর্ণ শরীরের গ্রন্থিতে গ্রন্থিতে জমে থাকা আলস্য ও ঘুম ধীরে ধীরে অপসৃত হচ্ছে তার। ক্লেশময় তার জীবন। শুধুই ক্লেশ, শুধুই ক্লান্তি, শুধুই পলায়ন।

তার বোধ নেই, বুদ্ধি নেই, স্মৃতিশক্তি নেই, কর্মফল নেই, পাপ বা পুণ্যও নেই। তার আহার বিস্বাদ ও কষ্টকর, তার মৈথুন বাধ্যতামূলক এক প্রক্রিয়ার বেদনা, তার বিশ্রাম উদ্বেগাকীর্ণ। ওই যে বাহির তাকে ডাক পাঠাচ্ছে ওখানেও কোনও মুক্তি নেই তার। সেখানেও বাধা ও বিরুদ্ধতা। বন্ধুর তার গতিপথ, বিপদসংকুল। তবু সে ধীরে ধীরে জেগে উঠছে। তাকে জাগতেই হয়। সংকেতময় শরীরে সুনির্দিষ্ট বার্তা ঠিক পৌঁছে যায়। না তার স্বাধীন ইচ্ছাও কিছু নেই। তাকে চালায় ক্ষুধা, ভয়, মৈথুন। তাকে চালায় সংকেত ও পারিপার্শ্বিক। সে কখনও কোনও সৌন্দর্য দেখেনি, গান শোনেনি, স্থির জলে নিজের ছায়া দেখেও সে কখনও বোধ করেনি—ওই আমি।

আলস্য জড়ানো তার চোখ থেকে নেমে যাচ্ছে ঘুমের ভার। সে জাগছে। জাগছে।

তোমার কী খবর সোহাগ?

আমার! আমার কিছু এগোয় না। থেমে থাকে। আচ্ছা যা থেমে থাকে তাকেই কি স্থবির বলে?

আমি বাংলায় ভীষণ কাঁচা। তা বলে ইংরিজিতে পাকা নই। আমি সব বিষয়ে কাঁচা। তবু স্থবির মানে তুমি বোধহয় ঠিকই বলেছ।

আমার হচ্ছে স্থবির জগৎ। আমার চারদিকে যা কিছু সব থেমে আছে। গাছপালা, মাটি, আকাশ।

আসলে কিন্তু ওসবও কিছু থেমে নেই। আহ্নিক গতি আছে না?

সে আছে। তবু আমার নিজস্ব জগতে কোনও ঘটনা ঘটেই না। বড় জোর পুকুরের স্থির জলে একটা ঢিল পড়ল। ঢেউ ভাঙল, তারপর আবার নিঃঝুম।

আমি সবাইকে কী বলি জানো?

কী বলো?

বলি আমাদের সোহাগ অন্য রকম মেয়ে, আর পাঁচজনের মতো নয়। কথাগুলো এমন যে চমকে উঠতে হয়, ভাবতে হয়। ভারী আচমকা কথা সব। তাই না?

আসলে আমার যা মনে হয় তাই বলি। কেন যেন সাজিয়ে গুছিয়ে কথা বলতেই পারি না।

এরকমই তো ভাল। মাঝে মাঝে এই যে আমাকে চমকে দিয়ে যাও তার রেশ কয়েকদিন থাকে। কথাগুলো নিয়ে মনে মনে নাড়াঘাটা করি। কী খাবে বল তো আজ!

আমি বুঝি খেতে আসি?

আহা তাই বললাম বুঝি? গেরস্তবাড়িতে এলে কিছু মুখে দিতে হয়, এসব গাঁ দেশের নিয়ম যে। আজকাল কেউ আসেও না, খায়ও না। উনি যতদিন ছিলেন বাড়ি গমগম করত। এসোজন-বোসোজনের অভাব ছিল না। মাঝে মাঝে লোকের জ্বালায় বিরক্ত হয়েছি। আর বোধহয় তাই ভগবান শোধ নিলেন। এখন কেউ আসে না।

আচ্ছা উইডোদের খুব কষ্ট, না?

হ্যাঁ মা, বড্ড কষ্ট। আমার যেন ডান হাতখানাই নেই।

আমার পিসিরও খুব কষ্ট। তিনি উইডো নন, কিন্তু—

ওর কষ্ট আরও বেশি। মুখ দেখলে বুঝবে না, ভিতরে কত জ্বালা আর অপমান, শুনি এখন ওর ব্যবসা খুব ভাল চলছে।

স্টিল শি ইজ নট হ্যাপি।

জানি। আগে আসত-টাসত, আজকাল বোধহয় সময় পায় না। সংসারে সবাই ভারী ব্যস্ত, আমারই কেবল দিন কাটে না। ওই দুখুরিই আমার সম্বল, আর কাজের লোকেরা। বোসো, আজ ক্ষীর দিয়ে মোয়া খাওয়াই তোমাকে।

উঠতে গিয়েও থমকায় বলাকা। তারপর হেসে বলে, বুঝেছি মিষ্টি জিনিস তো তোমার আবার পছন্দ নয়। কিন্তু কী জানো, এই বর্ধমানের লোকেরা মিষ্টির পোকা। তুমি কেন মিষ্টি ভালবাসো না বল তো!

আমার বোধহয় সুইট টুথ নেই।

আচ্ছা, তাহলে গরম চপ আনিয়ে দিচ্ছি। এখানে বেশ ভাল একটা খাবারের দোকান হয়েছে, বাজে জিনিস রাখে না। চমৎকার ভেজিটেবল চপ বানায়। খেয়ে দেখ।

তার চেয়ে বরং মোয়াই দিন।

বলাকা বসে পড়ে মোড়ায়, বলে, এ মেয়েকে নিয়ে যে কী করি। আমার বাড়িতে কত খাবারের আয়োজন। কত দুধ, ঘি, সবজি। কে খায় বল তো। বিলিয়েও শেষ করতে পারি না।

শুনেছি আপনি নাকি খুব ফ্রুগাল ইটার।

ও বাবা, তোমার ইংরিজি কি আমি বুঝি! তবে বোধহয় বলছ যে খুব কম খাই কি না। হ্যাঁ, এখন আর গলা দিয়ে ভাল খাবার নামতে চায় না। উনি খুব খেতে ভালবাসতেন। কিছু মুখে তুলতে গেলেই ওঁর কথা মনে পড়ে, আর খেতে ইচ্ছে হয় না।

আচ্ছা এটা কি অদ্ভুত নয়?

কোনটা অদ্ভুত?

এই আনক্যানি লাভ? এখন কেউ তো আপনার মতো ভাবতেই পারবে না।

কেন পারবে না! এরকমই তো হয়।

ইমপসিবল।

ইমপসিবল কেন?

আমার তো মনে হয় আপনাদের পৃথিবী আর নেই। এখন উই আর মোর প্র্যাকটিক্যাল অ্যান্ড মোর লজিক্যাল।

বলাকা হাসে, সে তো ঠিকই। চারদিকে তাই তো দেখছি মা। তা এ-ও বোধহয় ভাল। আমাদের যে বাড়তি ব্যাপারটা আছে তার জন্য তো কষ্টই পেতে হয়। তোমাদের আমলের সম্পর্কই বোধহয় ভাল। কে কার কড়ি ধারে তাই না?

একটুও হাসল না সোহাগ। বরং গভীর একটা দৃষ্টিতে চেয়ে রইল বলাকার মুখের দিকে। অনেকক্ষণ চুপচাপ চেয়ে থেকে বলল, হাউ ক্যান ইউ বি টোটালি মেসমেরাইজড বাই এ পারসন? আপনার অহংকার নেই? ব্যক্তিত্ব নেই? সেলফ রেসপেক্ট নেই?

বাবা রে বাবা! এ মেয়ের আজ হল কী? আজ আবার বুঝি মাথায় পোকা নড়ছে?

মাথা নেড়ে সোহাগ গম্ভীর মুখে বলে, না, আমি সত্যিই জানতে চাই। তর্ক করতে আসিনি। আমার সত্যিই আপনাকে দেখে অবাক লাগে।

এতে অবাক হওয়ার কী আছে বুঝি না বাপু। মায়েরা ছেলে-মেয়েকে যখন ভালবাসে তখন কি আর অহংকার, ব্যক্তিত্ব, সেলফ রেসপেক্ট কোনও বাধা হয়। পারলে প্রাণটা অবধি দিয়ে দেয়। তা সেই ভালবাসাটা তো মায়ের ভিতরেই থাকে, তাই না? তা সেরকম ভালবাসা যদি স্বামীর ওপর হয় তাহলে কি মহাভারত অশুদ্ধ হল?

খুব চিন্তিতভাবে সোহাগ বলাকার মুখের দিকে চেয়ে রইল। চট করে জবাব দিল না। বেশ খানিকটা বাদে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, আপনি ভীষণ বুদ্ধিমতী, তাই আমার প্রশ্নটা এড়িয়ে গেলেন। বাট দেয়ার ইজ এ মিস্ট্রি ইন ইউ।

দুর পাগল। কী যে বলে! শোনো মেয়ে, আমার বিয়ে হয়েছিল মাত্র দশ বছর বয়সে। তখন আমার স্বামীর বয়স পঁচিশ বছর। এরকম বয়সের তফাতে বিয়ের কথা আজকালকার ছেলেমেয়েরা ভাবতেও পারবে না। তখন স্বামী কী জিনিস, তার সঙ্গে কীরকম ব্যবহার করতে হয় তাই তো জানতাম না। অন্য পুরুষ হলে কী করত জানি না, কিন্তু আমার স্বামী আমাকে আগলে আগলে রাখতেন, অনেকটা বাবার মতো। অসুখ হলে বাপের বাড়ি না পাঠিয়ে নিজে সেবা করতেন। ভালবাসা তো এমনি এমনি হয় না।

একটা কথা জিজ্ঞেস করলে কিছু মনে করবেন?

না রে বাপু!

ডিড হি ট্রাই সেক্স?

পাগল নাকি? সে সেইরকম পুরুষমানুষই ছিল না। শক্তিমান পুরুষের লক্ষণ কী জানো? সংযম। আর মেয়েরা শক্তিমানকেই সর্বস্ব দিতে চায়। এ তোমাদের মাসল ফোলানো শক্তি তো নয়।

ওঃ, ইউ রিয়েলি ওয়ারশিপ হিম।

বলাকা হেসে ফেলে বলল, শুনে শুনে কান পচে গেল। আমি তো জানি না কী এমন হাতিঘোড়া করেছি তার জন্য। আমি তো চেষ্টা করে কিছু করিনি। ভালবাসা হলে সব ভেসে যায়। দেখো না, এখন কেমন শূন্য হয়ে বসে আছি।

শূন্য হয়ে বসে আছি— কথাটা একটা মাছির মতো উড়ে উড়ে বারবার এসে বসছে তার মাথায়। গুনগুন করছে, সুড়সুড়ি দিচ্ছে। সোহাগ বড় জ্বালাতন হল সারাদিন।

অ্যাই সোহাগ, কী হচ্ছে শুনি!

কী হচ্ছে?

আমার দাদাটিকে নাকি একদম পাত্তা দিচ্ছো না! তুমি কি চাও বিজুদা সাধু-টাধু হয়ে হিমালয়ে চলে যাক?

গেলে ভালই তো হত। আমার তো মনে হয় সব পুরুষেরই কিছুদিন হিমালয়ে গিয়ে সাধু হয়ে থেকে আসা উচিত।

ওমা! বলে কী রে?

সকল অধ্যায়
১.
প্রথম অধ্যায়
২.
দ্বিতীয় অধ্যায়
৩.
তৃতীয় অধ্যায়
৪.
চতুর্থ অধ্যায়
৫.
পঞ্চম অধ্যায়
৬.
ষষ্ঠ অধ্যায়
৭.
সপ্তম অধ্যায়
৮.
অষ্টম অধ্যায়
৯.
নবম অধ্যায়
১০.
দশম অধ্যায়
১১.
একাদশ অধ্যায়
১২.
দ্বাদশ অধ্যায়
১৩.
ত্রয়োদশ অধ্যায়
১৪.
চতুর্দশ অধ্যায়
১৫.
পঞ্চদশ অধ্যায়
১৬.
ষোড়শ অধ্যায়
১৭.
সপ্তদশ অধ্যায়
১৮.
অষ্টাদশ অধ্যায়
১৯.
ঊনবিংশ অধ্যায়
২০.
বিংশ অধ্যায়
২১.
একবিংশ অধ্যায়
২২.
দ্বাবিংশ অধ্যায়
২৩.
ত্রয়োবিংশ অধ্যায়
২৪.
চতুর্বিংশ অধ্যায়
২৫.
পঞ্চবিংশ অধ্যায়
২৬.
ষড়বিংশ অধ্যায়
২৭.
সপ্তবিংশ অধ্যায়
২৮.
অষ্টাবিংশ অধ্যায়
২৯.
ঊনত্রিংশ অধ্যায়
৩০.
ত্রিংশ অধ্যায়
৩১.
একত্রিংশ অধ্যায়
৩২.
দ্বাত্রিংশ অধ্যায়
৩৩.
ত্রয়োত্রিংশ অধ্যায়
৩৪.
চতুর্ত্রিংশ অধ্যায়
৩৫.
পঞ্চত্রিংশ অধ্যায়
৩৬.
ষট্ত্রিংশ অধ্যায়
৩৭.
সপ্তত্রিংশ অধ্যায়
৩৮.
অষ্টত্রিংশ অধ্যায়
৩৯.
ঊনচল্লিশ অধ্যায়
৪০.
চল্লিশ অধ্যায়
৪১.
একচল্লিশ অধ্যায়
৪২.
দ্বিচল্লিশ অধ্যায়
৪৩.
ত্রিচল্লিশ অধ্যায়
৪৪.
চতুর্চল্লিশ অধ্যায়
৪৫.
পঞ্চচল্লিশ অধ্যায়
৪৬.
ষট্চল্লিশ অধ্যায়
৪৭.
সপ্তচল্লিশ অধ্যায়
৪৮.
অষ্টচল্লিশ অধ্যায়
৪৯.
ঊনপঞ্চাশ অধ্যায়
৫০.
পঞ্চাশ অধ্যায়
৫১.
একান্ন অধ্যায়
৫২.
বায়ান্ন অধ্যায়
৫৩.
তিপ্পান্ন অধ্যায়
৫৪.
চুয়ান্ন অধ্যায়
৫৫.
পঞ্চান্ন অধ্যায়
৫৬.
ছাপ্পান্ন অধ্যায়
৫৭.
সাতান্ন অধ্যায়
৫৮.
আটান্ন অধ্যায়
৫৯.
ঊনষাট অধ্যায়
৬০.
ষাট অধ্যায়
৬১.
একষট্টি অধ্যায়
৬২.
বাষট্টি অধ্যায়
৬৩.
তেষট্টি অধ্যায়
৬৪.
চৌষট্টি অধ্যায়
৬৫.
পঁয়সট্টি অধ্যায়
৬৬.
ছেষট্টি অধ্যায়
৬৭.
সাতষট্টি অধ্যায়
৬৮.
আটষট্টি অধ্যায়
৬৯.
ঊনসত্তর অধ্যায়
৭০.
সত্তর অধ্যায়
৭১.
একাত্তর অধ্যায়
৭২.
বাহাত্তর অধ্যায়
৭৩.
তিয়াত্তর অধ্যায়
৭৪.
চুয়াত্তর অধ্যায়
৭৫.
পঁচাত্তর অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%