ত্রিংশ অধ্যায়

শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

ত্রিশ

একটা চারকোনা কাগজের মধ্যে থেমে আছে সময়, থেমে আছে ইতিহাস। গৌরহরি দাঁড়িয়ে আছে একটা মৃত বাঘের পেটের ওপর এক পা রেখে। হাতে বন্দুক। মাথায় শোলার হ্যাট। পরনে খাকি প্যান্ট আর সাদা হাফশার্ট। দুখানা চোখ ছবিতেও জ্বলজ্বল করছে। পিছনে জঙ্গলের সিনারি।

হেসে কুটিপাটি হচ্ছিল পারুল, আচ্ছা, বাবা আবার কবে বাঘ মারল বলো তো! জীবনে কখনও শিকার-টিকার করেছে বলে তো শুনিনি!

বলাকা মুগ্ধ চোখে চেয়ে ছিল। ছবিটা মিথ্যে এবং সাজানো। গৌরহরি কখনও বাঘ মারেনি। মনোরঞ্জন সাহা ছিল গৌরহরির মক্কেল। তার স্টুডিওতে শখ করে ছবিটা তুলে দিয়েছিল। হোক মিথ্যে, তবু কী পৌরুষদীপ্ত দেখাচ্ছে মানুষটাকে! বাঘ মারতে চাইলে গৌরহরি কি মারতে পারত না? পারত। তার স্বামীর পক্ষে অসম্ভব কিছুই ছিল বলে বলাকার কখনও মনে হয় না।

বলাকা মৃদু হেসে বলে, এ ছবিটা তুই দেখিসনি, না?

না তো!

এক মক্কেল তুলে দিয়েছিল। তার স্টুডিওতে ট্যাক্সিডার্মি করা বাঘ-ভালুক ছিল বলে শুনেছি। ছবিটা অনেকদিন খুঁজে পাইনি। এই সেদিন আলমারি হাঁটকাতে গিয়ে কাগজপত্রের মধ্যে পেলুম। সুন্দর না?

সুন্দর। আমার বাবা তো সুন্দরই ছিল। কিন্তু ছবিটা বড্ড নাটুকে। বাঘশিকারি বীর সাজার কী দরকার ছিল বাবার?

দরকারটা তোর বাবার ছিল না, ছিল মক্কেলের। শুনেছি, ছবিটা সে স্টুডিওর শো-কেসে সাজিয়ে রেখেছিল। লোকে ভাবত কোনও সাহেবের ছবি।

তাই বলো! তার মানে এটা হল মডেল হিসেবে বাবার পোজ দেওয়া।

তাই হবে বোধহয়। ছবিটা আমার বেশ লাগে। বাঘ না মারলেও ডাকাবুকো তো ছিল।

তা সত্যি। আমার বাবার মতো সাহসী মানুষ আমি অন্তত দেখিনি। সেই ডাকাতের গল্পটা বলো না মা! সেই যে হরিপুরের দাদুর বাড়িতে—

বলাকার শরীর এতকাল পরেও শিউরে উঠল। কতকাল আগেকার কথা, তবু যেন মনে হয় এই সেদিন—না, কত নয়—মনে হয়, গতকালকের কথা। না, আরও টাটকা। যেন আজকের ঘটনা, যেন এখনই ঘটছে।

হরিপুরের খুড়শ্বশুর ছিলেন দিলদরিয়া মানুষ। বাগানের শখ ছিল খুব। বাগানের শাকসবজি, আম কাঁঠাল নিয়ে মাঝে মাঝে চলে আসতেন। জমিয়ে গল্প করতেন। খাওয়া-দাওয়ারও খুব শখ ছিল। সেই মানুষটার সেবার এখন তখন অবস্থা। মরার সময় ঘনিয়ে এলে মানুষ সূক্ষ্মভাবে ঠিক টের পায়, আর তখন আত্মীয়স্বজনকে দেখার জন্য আকুলি-ব্যাকুলি হতে থাকে। হরিপুর থেকে খবর এল, খুড়শ্বশুর তাদের দেখতে চান।

একটু বৈষয়িক দরকারও ছিল। খুড়শ্বশুরের বড় ছেলে নিজের পছন্দে বিয়ে করেছিল বলে তাকে আগেই ত্যাজ্যপুত্র ঘোষণা করেছিলেন। এখন উইল করে সম্পত্তি থেকে তাকে বঞ্চিত করার জন্য পাকা ব্যবস্থা করতেও গৌরহরিকে ডাকা।

সেটা মাঘ মাস ছিল, মনে আছে বলাকার। দুপুরে তারা বাসে চেপেছিল। ঘরের বার বেশি হত না বলেই সেই সামান্য সামান্য ভ্রমণগুলোই অসামান্য লাগত বলাকার কাছে। জানলার ধারে বসে ঠান্ডা বাতাস উপেক্ষা করে বাইরের জগতটা দেখছিল সে।

তখন এক গা গয়না পরে থাকতে হত বলাকাকে। শ্বশুরমশাই এবং শাশুড়ি ঠাকরুন দুজনেই পছন্দ করতেন তাঁদের বড়বউ সবসময়ে গয়না পরে থাকুক। পথেঘাটে তখন এত বিপদ-আপদ ছিল না বলেই গয়নাগুলো খুলেও রেখে যায়নি বলাকা। যোলো-সতেরো বছর বয়সে অত হিসেবনিকেশ করে চলার বুদ্ধিও তো হয়নি।

বাসে একটা লোক গৌরহরির সঙ্গে বেশ গায়ে পড়ে আলাপ জমিয়ে ফেলল। কোথায় যাচ্ছেন, কী করা হয়, কোথা থেকে আগমন—এইসব অকারণ কৌতূহল।

তারা যেখানে নামল লোকটাও সেখানেই নামল। বাসরাস্তা থেকে হরিপুর মাইল দুই হাঁটা পথ। গোরুর গাড়ি যায় বটে, কিন্তু রাস্তা খারাপ বলে সময় বেশি লাগে। তাই তারা হেঁটেই যাচ্ছিল। লোকটাও তাদের সঙ্গে কিছু দূর এল। তারপর, “এবার আমি গাঁয়ের রাস্তায় যাব” বলে হঠাৎ হাওয়া হয়ে গেল।

বলাকা দেখল, গৌরহরির মুখটা একটু গম্ভীর। তখন স্বামীর মুখ গম্ভীর দেখলেই বলাকার মন খারাপ হত।

সে বলল, কী ভাবছ গো! কাকার জন্য মনখারাপ?

গৌরহরি বলল, হুঁ।

কয়েক কদম গিয়ে গৌরহরি দাঁড়িয়ে ডাইনে বাঁয়ে দেখে নিল একটু। দেখার অবশ্য কিছু ছিল না। নির্জন মাঠঘাট, ঝোপঝাড়, বাঁশবন।

কী হল গো?

গৌরহরি মৃদু হেসে বলল, গয়নাগুলো পরে এসে ভুল করেছ বলাই। কিন্তু কী আর করা যাবে।

বলাকা ভয় পেয়ে বলে, হঠাৎ গয়নার কথা বলছ কেন?

এমনি বললাম। ভয় পেও না।

না, তুমি মোটেই এমনি বলোনি। কিছু হবে নাকি গো?

আরে না। আর হলেই বা কী! চলো।

খানাখন্দে ভরা রাস্তায় চলতে চলতেই শীতের বেলা ফুরিয়ে আসছিল। কে যেন আলোর বিছানো চাদরটা টেনে নিচ্ছে দ্রুত। চারদিকে ঝুঁঝকো আঁধারের জাল নেমে আসছিল। বলাকার বুক ঢিপঢিপ করছিল।

হ্যাঁ গো, ওই লোকটা তোমাকে কিছু বলেছে?

না তো!

তাহলে তুমি চিন্তা করছ কেন?

গৌরহরি মৃদু হেসে বলল, লোকটা মুখে কিছু বলেনি। তবে চোখ দিয়ে বলেছে।

তার মানে কী গো! চোখ দিয়ে কী বলল?

উকিল মানুষ তো, ক্রিমিন্যাল চিনতে পারি।

কিন্তু লোকটা তো চলে গেল।

হ্যাঁ।

বলাকা রাগ করে বলল, তুমি কিছু খুলে বলছ না।

ভয়ের কী! আমি তো সঙ্গে আছি।

আমার ভয়-ভয় করছে যে!

ভয় পেও না। ভয় পেলে বুদ্ধিনাশ হয়। আর বুদ্ধিনাশ হলেই বিপদ।

আমাদের কি কোনও বিপদ হবে?

মনে হয় না। তবু ভালর জন্য যে কটা গয়না পার খুলে ফেল গা থেকে।

গয়না খুলব?

হ্যাঁ। সব খোলার দরকার নেই। যেগুলো সহজে খোলা যায় শুধু সেগুলো খুলে আমার হাতে দাও।

বলাকা খুব তাড়াতাড়ি নেকলেস, বালা, দুল, আংটি খুলে ফেলতে পেরেছিল। গৌরহরি সেগুলো রুমালে জড়িয়ে পাঞ্জাবির পকেটে ঢুকিয়ে দিল। ডান হাতে চামড়ার স্যুটকেস আর বাঁ হাতে বলাকার হাত ধরে হাঁটতে হাঁটতে নিরুদ্বেগ গলায় বলল, ছুটছাট ঝামেলা বিপদ তো জীবনে ঘটেই থাকে। শুধু বলে রাখি বিপদ ঘটলে দৌড়ে পালাতে যেও না। মাটিতে উবু হয়ে বসে পোড়া।

কথা শুনে বলাকার বুকে কাঁপুনি শুরু হয়ে গেল। সে প্রাণপণে আঁকড়ে ধরল গৌরহরির হাত।

তখনও আলো সম্পূর্ণ মরে যায়নি। হরিপুরের গাছপালা দেখা যাচ্ছিল দূর থেকে। দু-চারটে আলোও জ্বলে উঠছিল। হঠাৎ বাঁ ধারের মাঠ বরাবর সাত-আটজন লোককে দৌড়ে আসতে দেখা গেল। হাতে লাঠি, সড়কি, দা।

ও ওরা কারা আসছে গো? অ্যাঁ! ওরা কারা?

আমার পিছনে আড়াল হও বলাই।

ওরা কি ডাকাত?

শান্ত স্বরে গৌরহরি বলেছিল, এরা ছ্যাঁচড়া ডাকাত। ভয় নেই।

গৌরহরি লোকগুলোকে দেখে ঘাবড়াল না, পালাল না। বলাকাকে উবু হয়ে বসতে বলে শান্তভাবে তাকে আড়াল করে দাঁড়িয়ে রইল। বলবান শরীরটা ছাড়া তার কোনও অস্ত্র ছিল না। না ছিল, চরিত্র ছিল, দুর্জয় সাহস ছিল। সেগুলোও কি মানুষের অস্ত্র নয়?

লোকগুলো এত তাড়াতাড়ি চলে এল কাছে যে, বলাকা কিছু ভাববারও সময় পেল না। চোখের পলকে ঘিরে ধরল তাদের। লম্বা চওড়া একটা লোক গৌরহরির বুকে বল্লম ঠেকিয়ে বলল, দিয়ে দে, দিয়ে দে। প্রাণে মারব না। দিয়ে দে।

কী চাও?

গয়নাগুলো দে। তাড়াতাড়ি…তাড়াতাড়ি…অ্যাই, ওই যে মেয়েটা ঘাপটি মেরে বসে আছে, খুলে নে তো গা থেকে…

একটা লোক এগিয়ে এসে বলাকাকে হ্যাঁচকা টানে দাঁড় করিয়ে দিল।

বোধহয় এইটেই ভুল করেছিল ডাকাতেরা। বলাকার গায়ে হাত না দিলে গৌরহরি হয়তো গয়নাগুলো দিয়ে দিত, ঝামেলা করত না।

হাতের স্যুটকেসটা একবার দুলিয়ে গৌরহরি প্রথম মারল সর্দার লোকটাকে। সে ছিটকে যেতেই কার হাত থেকে একটা লাঠি হ্যাঁচকা টানে কেড়ে নিয়ে গৌরহরি যেন দশটা গৌরহরি হয়ে গেল।

কাঁপতে কাঁপতে কাঁদতে কাঁদতে দৃশ্যটা দেখছিল বলাকা। আবার ওই ভয় উত্তেজনা উদ্বেগে ভাল করে দেখেওনি কিছু। শুধু দেখল, লোকগুলো কেমন দিশেহারা হয়ে গেল। দু-চারজন মার খেয়ে এবং বাকিরা ভড়কে গিয়ে তফাত হচ্ছিল যেন। বলাকা চোখ বুজে ফেলেছিল এরপর।

লোকগুলো তেমন উঁচুদরের ডাকাত নয়। হয়তো চাষি-বাসি। মাঝেমধ্যে শৌখিন ডাকাতি করে। গৌরহরির রুদ্রমূর্তি আর রাগ দেখে তারা পালিয়ে গেল। দুটো লোক পড়েছিল মাঠে।

টর্চ জ্বেলে গৌরহরি দুজনের মুখ দেখে নিল। তারপর বলল, চলো বলাই, আর ভয় নেই।

গৌরহরি অক্ষত ছিল না। সড়কি লেগেছিল হাতে। লাঠির ঘায়ে কান ছেঁচে গিয়েছিল। বেশ রক্তপাত হয়েছিল। বলাকা যখন তাকে দুহাতে আঁকড়ে ধরে হাউ হাউ করে কাঁদছিল তখন গৌরহরি বলল, কাঁদো বলেই তো লোকে পেয়ে বসে।

তোমাকে যদি মেরে ফেলত?

আচ্ছা বলাই, আমাকে মেরে ফেলত বলেই তুমি শুধু ভয় পেয়ে কাঠ হয়ে থাকবে? বরং এক আধটা ঢ্যালা তুলে ছুড়ে মারতেও তো পারতে। পুজোর সময় মা দুর্গাকে তো খুব প্রণাম করো, অঞ্জলি দাও, মা দুর্গার লড়াইটা নিতে পারো না?

বলাকা কথাটা আজও ভুলতে পারে না। খুব শিক্ষা দিয়েছিল তাকে গৌরহরি। উপদেশ দিলে মানুষ শেখে না, কিন্তু পরিস্থিতির মধ্যে পড়ে যখন উপদেশ উঠে আসে তখন মানুষ সহজেই শেখে।

খুড়শ্বশুরের বাড়িতে ঢুকবার আগে গৌরহরি বলেছিল, ঘটনাটা কাউকে বলার দরকার নেই। হোঁচট খেয়ে পড়ে গিয়েছিলাম বলে চোট হয়েছে, এটা বলাই ভাল।

আশ্চর্যের বিষয় নিজের এই বীরত্বের কাহিনী কখনও গৌরহরিকে কারও কাছে বলতে শোনেনি বলাকা। যেন কিছুই ঘটেনি, এমনই নির্লিপ্ত থেকেছে মানুষটা।

গল্পটা পারুলের কাছে বলতে বলতে সেই সন্ধেটা যেন ঘিরে ধরল চারিদিকে। যেন পাশেই রয়েছে গৌরহরি। বাঘের মতো চোখ জ্বলছে, দুই সবল হাতে লাঠি চালাচ্ছে প্রবল বিক্রমে।

শুনতে শুনতে চোখ ছলছল করছিল পারুলের।

আচ্ছা মা, সেদিন যদি বাবা ডাকাতের হাতে মারা যেত তা হলে আমাদের তো জন্মই হত না, তাই না?

তাই তো মা।

আর তুমি বোধহয় পাগল হয়ে যেতে।

না মা, আমি মরেই যেতাম। হার্টফেল হত।

খুব হাসল পারুল, সবাই বলে বাবার প্রতি তোমার যেমন ভালবাসা তেমনটা আর দেখা যায় না। নিঃশব্দে নীরবে তুমি বাবার জন্য সব কর্তব্য করেছ।

তারা ভুল বলে মা।

ভুল বলে?

বলাকা হাসলেন, একদম ভুল। কর্তব্য হিসেবে আমি তার জন্য কখনও কিছু করিনি।

কী যে বলো মা! আমরা তো জানি বাবা কেমন মেজাজি আর খেয়ালি ছিল। সময়-অসময়ে কত অন্যায় বায়না করত, তুমি কখনও রাগ করোনি। সব বায়না সামলেছ, তোমার জন্য আমাদের কষ্ট হত, বাবার ওপর রাগও হত, ভয়ে কিছু বলতাম না। সময় অসময়ে বাবা কতদিন অতিথি এনে হাজির করেছে, মনে নেই? অসময়ে তোমাকে ফের উনুন ধরিয়ে রাঁধতে হত। রান্নার তোক তো রাখা হয়েছে অনেক পরে।

সব মনে আছে মা। মনই তো এখন আমার বন্ধু। মন খুলে বসে সেসব দিনকে ফের কাছে নিয়ে আসি, চোখ ভরে সব দেখি। কিন্তু তুই যা বললি তা তোর নিজের মতো করে বিচার। আমি তো ওভাবে দেখি না। আমার কখনও কোনও কষ্ট হয়নি যে!

হয়নি?

না, কখনও হয়নি। যদি কর্তব্য হিসেবে করতাম তা হলে হত। আমি যা করেছি তা ওই মানুষটাকে ভালবেসে করেছি। কর্তব্যের মধ্যে কষ্ট থাকে, অনিচ্ছে থাকে, নিজের ওপর জোর খাটাতে হয়, শ্রদ্ধা থাকে না। ভালবাসায় ওসব নেই। ভালবাসলে সব করা যায়।

তোমার মতো ভালবাসা কিন্তু এ যুগে অচল। আরও পঞ্চাশ বছর পর জন্মালে তুমি পারতে না।

আরও দুশো বছর পরে জন্মেও যদি তোর বাবার সঙ্গে আমার বিয়ে হয় তাহলেও ঠিক একই রকম আমাকে দেখবি তোরা। ভালবাসা তো মুখের কথা নয় মা, ভসভসে আবেগও নয়, ভালবাসার মধ্যে তার জন্য করাটাও আছে। খুব ভালবাসি, কিন্তু তার জন্য কিছু করতে ইচ্ছেও করে না, সে ভালবাসা হচ্ছে সোনার পাথরবাটি।

পারুল হাসছিল, ইউ আর ইমপসিবল। বাবার ব্যাপারে তোমাকে কখনও টলতে দেখলাম না। হ্যাঁ, মা, একটা কথা বলবে?

বড্ড পেছনে লাগছিস আজ। আবার কী কথা?

বলছি ধরো বাবা যদি এত হ্যান্ডসাম না হত, এত পারসোনালিটি বা সাকসেস না থাকত তা হলে কি এত ভালবাসতে পারতে?

তা তো জানি না। তাকে যেমনটি পেয়েছি তেমনটিই পেয়েছি। আমার তো নালিশ নেই। রূপের আকর্ষণ তো বেশি দিন থাকে না। থাকে অন্য কিছু।

যাই বলো, আমার বাবা ওরকম না হলে কিন্তু তুমি কিছুতেই—

দুর পাগলি! এই যে বললি তোর বাবা খামখেয়ালি ছিল, আমার ওপর অন্যায় অত্যাচার করত। আরও অনেকে অনেক কথা বলে। আমার শাশুড়ি তো বুড়ো বয়সে আমাকে প্রায়ই বলত, ও বউমা, ওকে অত আসকারা দাও কেন বলো তো! তোমাকে ভাজা ভাজা করে খেল যে! কখনও-সখনও একটু মুখনাড়া দিও মা, নইলে পুরুষমানুষ নৃসিংহ অবতার হয়ে ওঠে কি না।

বলত বুঝি?

শাশুড়ি বলত, দেওর ননদরা বলত।

তুমি মানতে না?

মানব কি, শুনে তো আমার ওর জন্য কষ্টই হত। মনে হত বেচারার আমি ছাড়া তো বন্ধু নেই।

ওঃ, এ যে দারুণ ডায়ালগ।

পেছনে লাগছিস তো!

না মা, বাবার গল্প শুনতে আমার ভাল লাগে। এক গল্প কতবার শুনি, তবু পুরনো হয় না। তুমি বলো।

হৈমর গল্প তো শুনেছিস?

শুনিনি আবার! মুখস্থ। তবু বলো।

রায়বাড়ির হৈমর কথা ভাবলে আজও বলাকার মনটা মেদুর হয়ে যায়। ফর্সা টুকটুকে পুতুল-পুতুল চেহারা ছিল হৈমর। হাত পায়ের ডৌল কী সুন্দর। রক্তমাংসের মানুষ বলে মনেই হয় না। রায়েদের ছিল বংশানুক্রমিক বন্ধকী কারবার। বিস্তর পয়সা। হৈমর বাবা মাধবানন্দ রায়ের আমলে ব্যবসা যেন আরও ঠেলে উঠেছিল। তখনও বিয়ে হয়নি গৌরহরির। এম এ পাশ করে ল পড়ছে। ছুটিছাটায় বাড়ি এলে হৈম গিয়ে গৌরহরিকে বলত, তোমার আমার তো সামাজিক বিয়ে হওয়ার নয়, চলো পালিয়ে যাই। হৈমর রাখঢাক ছিল না, স্পষ্টাস্পষ্টি কথা।

গৌরহরি তাকে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে নিরস্ত করার চেষ্টা করত। সমস্যা হল হৈমরা বৈদ্য। আরও সমস্যা হল হৈম বালবিধবা।

গৌরহরি যদি হৈমকে মন থেকে অপছন্দ করত তা হলে সমস্যা হত না। কিন্তু মেয়েটির প্রতি গৌরহরিরও একটু আকর্ষণ ছিল। শুধু চেহারাই নয়, হৈমর একটা ভারী সুন্দর, সরল স্বভাব ছিল। কোনও উগ্রতা ছিল না। বয়সে গৌরহরির কাছাকাছি। খুব অল্প বয়স থেকেই তাদের মধ্যে একটা মনের সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। কিন্তু তখন তো হুট করে কেউ সামাজিক সম্পর্ক ভেঙে ফেলত না।

হৈম বলত, আমি সেই কোন ছেলেবেলা থেকে তোমাকে ভালবাসি। তোমাকে মনে করেই এতকাল শিবের মাথায় জল ঢেলেছি। আমার কী অপরাধ বলো।

গৌরহরি বলত, শুধু ভালবাসা সম্বল করে যদি পালিয়ে যাই তা হলে দেখবে ভবিষ্যতে কষ্টে পড়লে ভালবাসাটাও থাকবে না।

তাই কি হয়? আমি চিরকাল তোমাকে ভালবাসব।

ভালবাসাবাসিতে যেরকম সব কথা হয় তেমনই হত তাদের মধ্যেও। গৌরহরির বিয়ের জন্য যখন পাত্রী দেখা হচ্ছে তখন একদিন হৈম এসে কেঁদে পড়ল, তা হলে আমার কী হবে? আমি কী করে বাঁচব?

গৌরহরি বলল, হৈম, তোমাকে যদি বিয়ে করি তা হলে এমন একটা বিশ্রী পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে যে শেষে আমাদের পরিণতি ভাল হবে না।

গৌরহরির হাত ধরে অনেক সাধাসাধি করেছিল হৈম, অনেক কেঁদেছিল, শেষে এরকম অসম্ভব প্রস্তাবও করে বসেছিল, তা হলে আমাকে অন্তত একটা সন্তান দাও, তাকে নিয়ে বেঁচে থাকব।

গৌরহরি বলেছিল, দুনিয়ায় কি পাপের অভাব আছে হৈম? আমরা সেটা আর বাড়াব কেন?

বলাকা তখন নিতান্তই বালিকা। কানাঘুষো কিছু কানে এলেও ব্যাপারটা ভেবে দেখার মতো মনই তৈরি হয়নি তার। বিয়ের পর হৈম তার কাছে আসত প্রায়ই। হাঁ করে তাকে দেখত, কাছ ঘেঁষে বসে তার মুখে হাত বুলিয়ে দিত। বড় অস্বস্তি হত বলাকার। তারপর একদিন তাকে বলল, হ্যাঁরে, ভাগ করে নিবি?

কী ভাগ করে নেব?

কেন, তোর বরকে?

বলাকা ভারী অবাক হয়ে যেত। বালিকা হলেও এবং কথাটার নিহিত অর্থ না বুঝলেও তার প্রস্তাবটা মোটেই ভাল লাগত না। সে আড়ালে কেঁদে ফেলেছিল। এবং রাতে গৌরহরিকে বলেও দিয়েছিল।

গৌরহরি তাকে বলল, ভয় পেয়ো না। ও দুঃখী মেয়ে। এর জন্য আমাদের কিছু করার নেই।

ও আবার এলে আমি কী করব?

আমার মায়ের কাছে গিয়ে বসে থেকো।

ধীরে ধীরে হৈমর ভিতরে একটা পরিবর্তন আসছিল। ছোট হলেও বলাকা সেটা বুঝতে পারত। বিধবা হলেও হৈম চওড়া পাড়ের শাড়ি পরত, মুখে পাউডার দিত, কপালে টিপ পরত। গাঁয়ে নিন্দে হলেও গ্রাহ্য করত না। কিন্তু ধীরে ধীরে সাজগোজ কমে যেতে লাগল। চুল আঁচড়াত না। আর বলাকার কাছে এসে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে এক কথা, আয় না রে, ভাগ করে নিই। আমি অর্ধেক, তুই অর্ধেক!

বলাকা সবসময়ে শাশুড়ির ঘরে পালিয়ে যেতে পারত না। শাশুড়িরও কাজকর্ম, পুজো-আচ্চা সংসার আছে। খুব মন খারাপ হত তার। বলত, ওসব কথা বলতে নেই।

কেন রে। তুই তো একটুখানি এক ফোঁটা মেয়ে। বরের কথা তুই কী বুঝিস?

নানা অসভ্য কথাও জিজ্ঞেস করত হৈম। বলাকার খুব রাগ হত। কিন্তু রাগ করে তো কিছু করার ছিল না। তার চেয়ে অন্তত তেরো চোদ্দো বছরের বড় ছিল হৈম, কাজেই বকেও দিতে পারত না।

তবে এটাও ঠিক, বরের মহিমা সে নিজেও বুঝত না তখন। শুধু বুঝত, এ লোকটা আমার সম্পত্তি। তার বেশি কিছু নয়।

আমাকে কি তোর হিংসে হয়?

হিংসে হবে কেন?

জানিস, তোর বরকে আমি নিয়ে পালিয়ে যেতে পারতাম!

কেন?

ও তো আমারই ছিল। তুই কেড়ে নিলি।

বাঃ রে, কেড়ে নেব কেন? আমাদের তো বিয়ে হয়েছে!

ওঃ ভারী তো বিয়ে! ও বিয়ে আমি মানিই না।

কান্না আসত বলাকার।

একদিন হৈম বলল, তোর বরকে বলবি আমাকে একটা ছেলে দিতে!

বলাকা হ্যাঁ।

বল না রে। আমি বললে শোনে না। তুই বললে ঠিক শুনবে। এটুকু তো পারে। বল না রে।

একথাটাও গৌরহরিকে বলে দিয়েছিল বলাকা।

গৌরহরি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, পাগলামির লক্ষণ।

ও তোমাকে কেড়ে নিতে চায় কেন?

একটু বড় হলে সব বুঝিয়ে দেব। মন খারাপ কোরো না।

আমার ওকে ভীষণ ভয় করে।

করারই কথা।

সন্তানের ইচ্ছেটাই বোধহয় শেষ অবধি প্রবল থেকে প্রবলতর হয়ে উঠেছিল হৈমর। সেইসময়ে এসে আর স্বামীর ভাগ চাইত না। শুধু বলত, একটা ছেলে হলেই আমার হয়, আর কিছু চাই না। বল না একটু ওকে।

কথাটার মধ্যে অসভ্যতা আছে তা বোঝার মতো মনের অবস্থা বলাকার তখন হচ্ছিল। সে রাগ করত।

হৈম শেষ অবধি যে পন্থা নিয়েছিল তা পাগল না হলে নেওয়া যায় না। বলাকার বিয়ের এক বছরের মাথায় সে গর্ভবতী হয়ে পড়ল। সে যুগে গাঁয়ের চূড়ান্ত কেলেঙ্কারি। তবু এরকম ঘটনা ঘটতও অনেক। হৈম কার সঙ্গে মিশেছিল, কার কাছে নষ্ট করেছিল নিজেকে তা প্রকাশ পায়নি। ভোগী, লোভী পুরুষের অভাব তো নেই।

বলাকার বিয়ের দেড় বছরের মাথায় গর্ভপাত করাতে গিয়ে হৈম মারা যায়। অনেকে বলে, মাধবানন্দ রায়ই নাকি তাকে গলা টিপে মেরে ফেলেছিল। রহস্যের মীমাংসা হয়নি।

কিন্তু এই ঘটনা থেকে গৌরহরির যে ছবিটা ভেসে ওঠে তা এক অমলিন পুরুষের ছবি। হৃদয় দৌর্বল্যকে সে প্রশ্রয় দেয় না। অধিকার সীমাবদ্ধ রাখে। চৌকাঠ ডিঙোয় না। বলাকার মতো আর কে তাকে জানবে?

বাবা এক অদ্ভুত মানুষ, না মা?

হ্যাঁ মা, লোকটার থই পেলাম না।

ছবির পর ছবি দেখে যাচ্ছে তারা। নির্জন দুপুর। বাইরে ঘুঘু ডাকছে।

হ্যাঁ রে, সময় বলে কি কিছু সত্যিই আছে?

পারুল অবাক হয়ে বলে, কেন থাকবে না মা? সময় তো একটা সত্যিকারের জিনিস।

কী জানি। আমার মনের মধ্যে সময় বলে কিছু যেন কাজ করে না। পুরনো কথা ভাবতে গেলে সব যেন সাঁই সাঁই করে কাছে চলে আসে। যেন মনে হয় এই তো সেদিনের কথা!

ও তো স্মৃতি মা।

জানি বাবা, জানি। কিন্তু সময় জিনিসটা তো মানুষের কল্পনা।

পারুল একটু ভেবে বলে, তা ঠিক। কল্লনা মানে তো মিথ্যে নয়।

মিথ্যেই।

কেন বলছ?

মনে হয় বলে বলছি।

সূর্য উঠছে, সূর্য ডুবছে, দিন যাচ্ছে, মাস যাচ্ছে, বছর ঘুরছে, আমরা বুড়ো হচ্ছি, এটাই তো সময়।

এমন কিছু নেই যেখানে সব থেমে আছে, বাড়ছে না, বুড়ো হচ্ছে না, ওই ছবিগুলোর মতো!

পারুল হেসে ফেলে, ছবির তো প্রাণ নেই মা।

কথার মাঝখানে কখন নিঃশব্দে ঘরে ঢুকে মেঝেতে বলাকার কাছ ঘেঁষে বসেছিল দুখুরি। চাপা গলায় বলল, ওই আবার এসেছে গো!

কে আবার এল।

কে আবার! বাবা। আমাকে হাতছানি দিয়ে ডাকছিল।

তা গেলি না একটু বাবার কাছে?

ইস্। গায়ে যা ঘেমো গন্ধ, তার ওপর খইনির ঝাঁঝ। মুখ ভেঙিয়ে পালিয়ে এসেছি।

ছিঃ, বাবাকে মুখ ভেঙাতে হয়?

সকল অধ্যায়
১.
প্রথম অধ্যায়
২.
দ্বিতীয় অধ্যায়
৩.
তৃতীয় অধ্যায়
৪.
চতুর্থ অধ্যায়
৫.
পঞ্চম অধ্যায়
৬.
ষষ্ঠ অধ্যায়
৭.
সপ্তম অধ্যায়
৮.
অষ্টম অধ্যায়
৯.
নবম অধ্যায়
১০.
দশম অধ্যায়
১১.
একাদশ অধ্যায়
১২.
দ্বাদশ অধ্যায়
১৩.
ত্রয়োদশ অধ্যায়
১৪.
চতুর্দশ অধ্যায়
১৫.
পঞ্চদশ অধ্যায়
১৬.
ষোড়শ অধ্যায়
১৭.
সপ্তদশ অধ্যায়
১৮.
অষ্টাদশ অধ্যায়
১৯.
ঊনবিংশ অধ্যায়
২০.
বিংশ অধ্যায়
২১.
একবিংশ অধ্যায়
২২.
দ্বাবিংশ অধ্যায়
২৩.
ত্রয়োবিংশ অধ্যায়
২৪.
চতুর্বিংশ অধ্যায়
২৫.
পঞ্চবিংশ অধ্যায়
২৬.
ষড়বিংশ অধ্যায়
২৭.
সপ্তবিংশ অধ্যায়
২৮.
অষ্টাবিংশ অধ্যায়
২৯.
ঊনত্রিংশ অধ্যায়
৩০.
ত্রিংশ অধ্যায়
৩১.
একত্রিংশ অধ্যায়
৩২.
দ্বাত্রিংশ অধ্যায়
৩৩.
ত্রয়োত্রিংশ অধ্যায়
৩৪.
চতুর্ত্রিংশ অধ্যায়
৩৫.
পঞ্চত্রিংশ অধ্যায়
৩৬.
ষট্ত্রিংশ অধ্যায়
৩৭.
সপ্তত্রিংশ অধ্যায়
৩৮.
অষ্টত্রিংশ অধ্যায়
৩৯.
ঊনচল্লিশ অধ্যায়
৪০.
চল্লিশ অধ্যায়
৪১.
একচল্লিশ অধ্যায়
৪২.
দ্বিচল্লিশ অধ্যায়
৪৩.
ত্রিচল্লিশ অধ্যায়
৪৪.
চতুর্চল্লিশ অধ্যায়
৪৫.
পঞ্চচল্লিশ অধ্যায়
৪৬.
ষট্চল্লিশ অধ্যায়
৪৭.
সপ্তচল্লিশ অধ্যায়
৪৮.
অষ্টচল্লিশ অধ্যায়
৪৯.
ঊনপঞ্চাশ অধ্যায়
৫০.
পঞ্চাশ অধ্যায়
৫১.
একান্ন অধ্যায়
৫২.
বায়ান্ন অধ্যায়
৫৩.
তিপ্পান্ন অধ্যায়
৫৪.
চুয়ান্ন অধ্যায়
৫৫.
পঞ্চান্ন অধ্যায়
৫৬.
ছাপ্পান্ন অধ্যায়
৫৭.
সাতান্ন অধ্যায়
৫৮.
আটান্ন অধ্যায়
৫৯.
ঊনষাট অধ্যায়
৬০.
ষাট অধ্যায়
৬১.
একষট্টি অধ্যায়
৬২.
বাষট্টি অধ্যায়
৬৩.
তেষট্টি অধ্যায়
৬৪.
চৌষট্টি অধ্যায়
৬৫.
পঁয়সট্টি অধ্যায়
৬৬.
ছেষট্টি অধ্যায়
৬৭.
সাতষট্টি অধ্যায়
৬৮.
আটষট্টি অধ্যায়
৬৯.
ঊনসত্তর অধ্যায়
৭০.
সত্তর অধ্যায়
৭১.
একাত্তর অধ্যায়
৭২.
বাহাত্তর অধ্যায়
৭৩.
তিয়াত্তর অধ্যায়
৭৪.
চুয়াত্তর অধ্যায়
৭৫.
পঁচাত্তর অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%