শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
দুঃখী দীননাথ বউয়ের সঙ্গে ঝগড়া করে গলায় দড়ি দেবে বলে ভরসন্ধেবেলা মাধবপুরের জঙ্গলে এসে একটা বেশ মজবুত গাছে উঠে বসে আছে। যে দড়িটা গলায় দেবে সেটা সদ্য গোরুর গলা থেকে খুলে আনা, গোরু-গোরু গন্ধ ছাড়ছে। দড়িটা কোমরে পেঁচানো। দীননাথের গায়ে একটা ময়লা গেঞ্জি, কাঁধে গামছা। পবনে ময়লা ধুতি। গাছের ডালে বসে দীননাথ এখন বিড়ি খাচ্ছে। ঝুলে পড়ার আগে এই যে একটু সময় আরাম করে কাটাচ্ছে সে, এ সময়টা বড়ই মূল্যবান। সময় জিনিসটা যে কী ভীষণ দামি তা জীবনে এই প্রথম টের পাচ্ছে দীননাথ। চারদিক ভারি সুনসান, ধারেকাছে জনমনিষ্যি নেই, গাছের তলায় তার তাপ্তি দেওয়া পুরনো হাওয়াই চটিজোড়া পড়ে আছে। অনেক দিনের সঙ্গী, টেনে-মেনে দু-আড়াই বছর চটিজোড়া দিয়ে কাজ চালিয়েছে সে। আজ থেকে চটিজোড়ার বিশ্রাম। বেঁচে থাকতে কত কী লাগে। বড়লোকেদের বায়নাক্কা বেশি বটে, কিন্তু গরিব কাঙালদেরও বেঁচে থাকার হ্যাপা তো কম নয়। খিদেতেষ্টা, লজ্জা নিবারণ, শীত-বর্ষার আচ্ছাদন, বিড়িটা-আশটা, একটা মেয়েমানুষ বা একটু ঘরদোর, হিসেব করলে কম নয় ব্যাপারটা। আর ভেবে দেখলে এই দেহখানার জন্যই যা ঝঞ্ঝাট। এটি না থাকলে আর কোনও ঝামেলা থাকে না। তার বউ ফুলি বড্ড গেছে মেয়েছেলে, একটা দিন শান্তিতে তিষ্ঠোতে দেয়নি তাকে। মেয়েছেলের শরীরের ক্ষ্যামতা না থাক, গলার জোরেই পুরুষ কাত। আর সেই জোরটা দীননাথের মোটেই নেই। কিছুক্ষণ চেঁচামেচি করে পাল্লা দেয় বটে, তারপর বাক্যে না পেরে কিলোয়। কিন্তু তাতেও লাভ হয়েছে লবডঙ্কা। কিল-চড় খেয়ে যেন ফুলির গলার জোর দুনো হয়। বাক্যে বড্ড ঝাঁঝরা হয়েছে দীনু। কতবার ভেবেছে বাক্যে তো আর শরীরে ছ্যাঁকা লাগে না, কানে না তুললেই হল। তা সে চেষ্টাও কম করেনি সে। বাক্যেরও কিছু কেতদানি আছে বইকী, বাক্য দিয়ে বোধহয় মানুষও মারা যায়।
দীন, অর্থাৎ দীননাথ বিড়িটা ফেলে আর একটা ধরাল। বেশ ধকওলা ঝাঁঝালো বিড়ি। কালিপদর দোকানের বিড়ির স্বাদই আলাদা। কালো সুতোর মুগুর ব্র্যান্ড এই বিড়ির দাম দেড়া। আজ জীবনের শেষ দিন বলে কিনেছে দীনু। পুরো এক বান্ডিল। সঙ্গে নতুন দেশলাই।
মাধবপুরের জঙ্গলে আগে বাঘ ছিল। আরও নানা জানোয়ার দেখা যেত মাঝে মাঝে। কয়েকটা হরিণও দেখেছে সে ছেলেবেলায়। এখন শেয়ালও নেই বড় একটা। জঙ্গলটাই উঠে যাবে কিছুদিন পর। পুব ধার, পশ্চিম ধার সব দিক দিয়েই ধীরে ধীরে জঙ্গল হাসিল হচ্ছে। ঘন জঙ্গল ছিল এক সময়ে, এখন ভিতরটা অনেক ফাঁকা ফাঁকা। গাছপালা কাটা হচ্ছে রোজই। কাঠের দাম এখন আগুন।
অন্ধকার নেমে আসছে ক্রমে। তবে খুব একটা ভয় নেই। আজ পূর্ণিমা। একটু বাদেই মস্ত চাঁদ উঠবে পুব ধারে। উঠেও গেছে বোধহয় খানিকটা। গাছপালার জন্য দেখা যাচ্ছে না। বিড়ি খেতে খেতে একটু কাশল দীনু। গুন গুন করে একটু গানও গাইল। মরার আগে একটু ফুর্তি করে নেওয়ার ইচ্ছে ছিল। কিন্তু সে ভেবেই পেল না, ফুর্তিটা কীভাবে করবে। অভাবি মানুষ সে, ফুর্তি কীভাবে করতে হয় তা জানেই না। মাংস দিয়ে ভাত খেলে কি ফুর্তি হয়? কেত্তন শুনলে? যাত্রা দেখলে? অনেক ভেবেও সে ফুর্তির পথটা খুঁজে পায়নি। বিড়ি খেতে খেতে সে একটু ফুলির কথাও ভাবল। কতবার ফুলি তাকে গলায় দড়ি দিতে বলেছে, কিন্তু যখন সে সত্যিই গলায় দড়ি দেবে তখন মাগীর তেজ থাকবে কোথায়? হুঁ হুঁ বাবা, তখন তো গড়াগড়ি দিয়ে কেঁদে ভাসাবে। ভাসাক, তাই তো চায় দীনু। তবে তার কচি মেয়েটার জন্য বুক একটু টনটন করে। মাত্র বছর চারেক বয়েস। খুব বাপ-ন্যাওটা। তবে মায়া বাড়িয়ে লাভ নেই।
একটা দীর্ঘশ্বাসের শব্দ শুনে দীননাথ চমকে উঠে ডানধারে তাকাল। অবাক হয়ে দেখল, কখন নিঃশব্দে আরও একটা লোক তার কাছ ঘেঁষেই এসে বসেছে। কখন গাছে উঠল, কখন এসে বসল তা দীনু মোটেই টের পায়নি। তারই মতো বয়স হবে। গরিব-দুঃখী মানুষ বলেই আবছা অন্ধকারে মনে হল।
দীনুও একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। আজকাল নিরিবিলি জায়গা খুঁজে পাওয়াই ভার। মাধবপুরের জঙ্গলে নিশ্চিন্তে মরতে এসেছে সে, এখানেও উটকো একটা লোক এসে জুটে গেল। কী মতলব কে জানে। সন্ধেরাতে গাছ-টাছে উঠতে নেই, সবাই জানে। তবু যদি উঠতেই হয় তবে অন্য গাছে গিয়ে ওঠো না বাপু, দীনুব গাছটাতেই উঠতে হবে এমন তো কথা নয়।
উত্তেজিত হলেও দীনু ফস করে কিছু বলল না। বিড়ি খেতে খেতে আড়ে আড়ে চেয়ে লোকটাকে ঠাহর করতে লাগল। লোকটার হাবভাব কিছু অন্ধকারে বোঝা গেল না। এও কি গলায় দড়ি দেবে বলেই গাছে উঠেছে? কে জানে বাবা। তবে ফাঁসি দেওয়ার জন্য গাছেরও তো অভাব নেই। আর ফাঁসিই বা কেন, মরার কত উপায় আছে। আড়াই মাইল হেঁটে গেলেই রেলরাস্তা। গামছা পেতে লাইনে মাথা দিয়ে শুয়ে ঘুম লাগাও। এক সময়ে ট্রেন এসে কাজ ফর্সা করে দিয়ে চলে যাবে। টেরটিও পাবে না। কিংবা এক বোতল অ্যাসিড বা পোকা মারার বিষ কিনে ঢক ঢক করে মেরে দাও, লম্ফ মেরে আকাশে উঠে পড়বে।
এখন মুশকিল হল, লোকটা কেমন এবং কী মতলব তা না বুঝে দীনু গলায় দড়ি দিতে পারছে না। লোকটার হয়তো দয়া উথলে উঠবে, দীনুকে বাঁচানোর চেষ্টা করবে। নয়তো উপদেশ-টুপদেশ দেবে। ওসব ভ্যাজর ভ্যাজর এখন আর তার সহ্য হবে না।
দীনু অগত্যা বিড়িটা ফেলে গলাখাঁকারি দিয়ে বলল, বলি কোথা থেকে আসা হচ্ছে?
লোকটার মুখ ভাল দেখা যাচ্ছে না। তবে গলার স্বর শুনে মনে হল, কথা কওয়ার তেমন জো নেই। বলল, কাছে-পিঠেই থাকি।
বিড়ি-টিড়ি চলে?
তা চলে।
খাবে নাকি একটা?
লোকটা হাত বাড়াল। দীনু একটা বিড়ি আর দেশলাই এগিয়ে দিল হাতে। লোকটা বিড়ি ধরিয়ে উদাসভাবে টানতে লাগল।
ভাবসাব করতে হলে বিড়ির মতো জিনিস নেই। চট করে একটা সম্পর্ক তৈরি হয়ে যায়। দীনু ফের একটা বিড়ি ধরিয়ে বলল, তা মতলবটা কী? সাঁঝেরবেলায় গাছে এসে উঠেছ যে বড়!
কেন, উঠতে বাধা কীসের? ইচ্ছে হল তাই উঠে পড়লাম।
হাসালে বাপু। গাছে উঠতে ইচ্ছেটাই বা হবে কেন? পাগল নাকি হে তুমি?
তা পাগলও একটু আছি বোধহয়। মাথায় একটু গণ্ডগোল আছে যেন।
তা তোমার হাবভাব দেখেই বুঝেছি। তা বাপু, এ-গাছটাই তোমার পছন্দ হল যে! জঙ্গলে কি আর গাছ নেই?
তা আছে।
তবে?
অন্য গাছে তো আর তুমি নেই!
যাঃ বাবা, তুমি কি আমাকে দেখেই এ-গাছে উঠলে নাকি? এ তো বড় মজা মন্দ নয়। কেন হে বাপু, আমি যা করব তোমাকেও কি তাই করতে হবে?
লোকটা তেমন নির্বিকার গলায় বলল, না, ঠিক তা নয় বটে।
তাহলে?
মনে হল তোমার সঙ্গে এ সময়টায় থাকলে ভাল হবে।
এ সময়টা বলতে কী বোঝাতে চাইছ?
তুমি তো মরতে এসেছ?
কী করে বুঝলে?
না, তা অবশ্য বোঝা যায় না বটে, কেমন যেন সন্দেহ হল।
দুর দুর, মরা-টরা নয় রে বাপু, গাছে উঠেছি চন্দনা পাখি ধরতে। সন্ধের পর হলে ধরতে সুবিধে।
ও। তা হবে।
বিশ্বাস হল না বুঝি?
তা হবে না কেন? দুনিয়া জুড়ে কত মানুষ কত অদ্ভুত মতলব নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে।
তাহলে তো বুঝতেই পারছ তোমার সন্দেহটা ঠিক নয়।
তাই হবে হয়তো। চিরটা কাল তো কত ভুলই বুঝলাম। তোমার ওই ছেঁড়া হাওয়াই চপ্পলজোড়া দেখেই পুরনো কথা সব মনে পড়ছিল কি না। তাই গাছে ওঠার আগে বসে বসে তোমার চপ্পলজোড়ার সঙ্গে কথা কইলাম।
চপ্পলজোড়ার সঙ্গে! পাগল আর কাকে বলে। তা চপ্পল তোমাকে কী বলল?
জিজ্ঞেস করলাম, ওরে বাপু, তোরা এখানে এমন একাবোকা পড়ে আছিস কেন? তো তারা বলল, জানো না বুঝি! আমাদের কর্তা গলায় দড়ি দিতে গাছে উঠেছেন। আজ থেকে আমাদের ছুটি।
বলল?
হ্যাঁ গো, পষ্ট বলল, তা আমি জিজ্ঞেস করলাম, কর্তা মরতে চায় কেন। চপ্পলজোড়া ভারী কাঁচুমাচু হয়ে বলল, কর্তার মনে বড় অশান্তি। পরিবারের সঙ্গে খুব ঝগড়া হয় কিনা।
দীননাথের একটু প্রেস্টিজে লাগল। একটু ঝাঁঝের গলায় বলল, ঝগড়া হয় তো হয়, তাতে ওদের কী? বড় আস্পদ্দা তো তুচ্ছ হাওয়াই চপ্পলের।
আহা, শুধু চঞ্চলই বা কেন, এই যে গাছটায় উঠে বসে আছ, এও তো সাক্ষী আছে।
বটে!
তবে আর বলছি কী, গাছে ওঠার সময় জিজ্ঞেস করলাম, ওহে বাপু, লোকটা কি ঝুলে পড়েছে। গাছ হাই তুলে বলল, আর বোলো না ভায়া, সাঁঝবেলাতেই আমার রাজ্যের ঘুম পায়। কিন্তু ঘুমুবার কি জো আছে! চোখটি লেগে আসছিল সবে এমন সময় হাড়হাভাতেটা এসে হাজির। কী না গলায় দড়ি দেবে। সেই যে ঘুমটা চটকে গেল আর চোখের পাতা এক করতে পারিনি। নবাবপুত্তুর গাছে উঠেছেন ঝুলবেন বলে, আর আমাকে ফাঁসিকাঠ হতে হবে।
বলল?
তবে আর বলছি কী! আমি বললুম, ঝুলে পড়েছে নাকি? গাছ তখন ভারী তেতো গলায় বলল, তাহলে তো বাঁচতুম। ঝুলবার বায়নাক্কা কি কম! বাবু এখন আরাম করে বসে বিড়ি ফুঁকছেন আর জ্বলন্ত বিড়ি আমার গায়েই টিপে টিপে নেবাচ্ছেন। ছ্যাঁকার চোটে প্রাণ অতিষ্ট হয়ে গেল। কী বিড়ি-খেকো লোক রে বাবা। সবাই মরার আগে কেন যে এত বিড়ি ফোঁকে কে জানে বাবা। আমার তো এটা নিয়ে ছয় নম্বর। তার মধ্যে একটা বউমানুষও ছিল, তা সে বিড়ি খায়নি বটে, কিন্তু গলায় দড়ি দেওয়ার আগে দু কলসি চোখের জল ফেলেছিল। বড্ড ঝামেলা হে। তা যাও বাপু, গিয়ে লোকটাকে বলল যা করবে তা ঝটপট করে ফেলতে। আমি আর কতক্ষণ রাত জেগে থাকব বলতে পারো?
এবার বিড়িটা আর গাছের গায়ে টিপে নেবাল না দীননাথ। একটু ধরে রইল। বিড়ির আগুন ক্ষণস্থায়ী, সহজেই নিবে যায়।
দীনু বলল, বানিয়ে বানিয়ে বলছ না তো!
লোকটা উদাস গলায় বলল, কী লাভ?
পাগলের মাথায় নানা রকম নতুন কথা আসে জানো তো!
তা জানব না? পাগল কি কম দেখেছি জীবনে?
আর একটা বিড়ি খাবে নাকি?
আছে?
মেলা আছে। এক বান্ডিল কিনেছিলাম, সব কটা কি আর মরার আগে খেতে পারব? এই নাও, ধরাও।
লোকটা বিড়ি ধরিয়ে বলল, তুমি যা ভাবছ তা কিন্তু নয়।
দীনু অবাক হয়ে বলে, কী আবার ভাবলাম।
ভাবছিলে দিব্যি চুপি চুপি মরতে পারবে, কেউ টেরও পাবে না। তা কিন্তু নয়। সবাই টের পাচ্ছে, তুমি মরতে এসেছ।
আ মোলো যা, আবার কে টের পেল?
পোকামাকড়, কাকপক্ষী, হাওয়াবাতাস, গাছপালা সবাই।
তারাও সব তোমার কাছে আমার কুচ্ছো গাইছে নাকি?
ঠিক তা নয় তবে দেখছ না চারদিকটা কেমন ঝিম মেরে আছে!
তা আছে। তাতে কী?
ওই ঝিম মেরে থাকা মানেই সবাই অপেক্ষা করছে সর্বনাশটার জন্য। দুঃখও পাচ্ছে।
বাজে কথা।
কান থাকলে ঠিক শুনতে পেতে, বাতাসে একটা হায় হায় শব্দ ছড়িয়ে যাচ্ছে।
তুমি নির্যস পাগলই বটে হে। তবে স্বীকার করি, তুমি বেশ কথা কইতে পারো। আগড়ম বাগড়ম বলছ বটে তবে বেশ গুছিয়ে বলছ।
কথা আমি মোটেই কইতে পারি না। আমাকে কথা কওয়ায় পরিস্থিতি। যখন যেমন কথার জোগান পাই তখন তেমন বলি। বললে প্রত্যয় যাবে না, আমাকে কথা কওয়াচ্ছে তোমারই চারদিকটা।
বেড়ে বলেছ ভায়া। কথাটা বোধহয় খানিকটা ঠিকই। মানুষ কি আর সাধে আজেবাজে কথা কয়। আমার বউমাগী ফুলি যদি অমনধারা কুরুক্ষেত্তর না করত তাহলে কি আমিই অমন সব মুখখারাপ করতাম!
আহা, তোমার শোনার কানই নেই কিনা।
তার মানে?
ফুলি মুখে যা কয় তাই কি কথা? তার মনেও তো কিছু কথা ভুড়ভুড়ি কাটে, না কি?
তা কাটতে পারে।
সেইটে কি তুমি শুনতে পাও?
না বাপু, আমার অত শোনার প্রবিত্তি নেই।
সেইজন্যই তো বলি, তোমার শোনার কান নেই। ফুলি তোমাকে যখন মরতে বলে তখন কি আর সত্যিই মরতে বলে? তুমি মরলে তার লাভটা কী বলল তো!
ওই বজ্জাত মাগীকে তো চেনো না, তাই বলছ। হাড়মাস চিবিয়ে খাচ্ছে হে।
আচ্ছা বাপু, সে না হয় বুঝলুম। কিন্তু তোমাদের তো কখনও-সখনও আদর সোহাগও হয় নাকি?
সে কালেভদ্রে।
তখন ফুলি কী বলে? ভাল ভাল কথা কয় না তখন?
তা কইবে না কেন? খুব আঁঠালো কথাই কয়। তবে সেগুলো ওর মনের কথা নয়।
তাহলে বাপু যখন রেগেমেগে গালাগাল দেয় সেও তার মনের কথা নয়। বুঝলে?
তুমি আমাকে প্যাঁচে ফেলার চেষ্টা করছ বুঝি? সুবিধে হবে না। আমার পরিবারকে আমি খুব চিনি। গলায় দড়ি দিয়ে মাগীকে কাঁদিয়ে ছাড়ব, তবে আমার নাম দীনু দাস।
বেশ কথা। ফুলি কাঁদলে খুশি হও বুঝি?
তা নয় তো কী?
কিন্তু ফুলি কাঁদলে খুশি হবে কেন তা ভেবে দেখেছ কী?
ও আর ভাবার কী আছে। মাগী আছাড়ি-পিছাড়ি খেয়ে কাঁদছে এটা ভাবতেই সুখ।
বলি ভেবে দেখেছ কী, ফুলিই বা কাঁদবে কেন? তোমার তাকে কাঁদিয়ে সুখ, আর ফুলির তোমার জন্য কেঁদে সুখ। ব্যাপারটা কী দাঁড়ায়?
কী আর দাঁড়াবে? এবার বুঝবে দীনু দাস ছাড়া কেমন চলে।
ওই তো বললাম, কান নেই বলে শুনতে পেলে না।
কী শুনলুম না বলো তো!
এই যে গাছ কথা কইছে, হাওয়াই চপ্পল কথা কইছে, ঝিঝি কথা কইছে, বাতাস কথা কইছে, গাছের কোটরে ব্যাঙ্গমাব্যাঙ্গমী কথা কইছে, বিবেক কথা কইছে সব কি শুনতে পাচ্ছ?
দুর! ওসব তোমার মনগড়া কথা। কেউ কিছু কইছে না।
কইছে হে কইছে। ফুলির মনেও ভুড়ভুড়ি ওঠে হে, তুমি শুনতে পাও না।
চুলোয় যাক ভুড়ভুড়ি। ভুড়ভুড়ি ধুয়ে কি জল খাব! খান্ডার মাগীর মনটাও তো আস্তাকুঁড়।
না হে, কথাটা ঠিক হল না। এ হল মাথাগরমের কথা। ঠান্ডা মাথায় ভাবলে অন্যরকম মনে হবে।
তুমি ঠিক কে বলো তো! পাগল যে তাতে সন্দেহ নেই। কিন্তু নামটা কী?
আমার নাম আমি।
যাঃ, ও আবার একটা নাম হল নাকি?
ওইটেই যে আমার নাম। আমি, ইচ্ছে হলে আমি দাসও বলতে পারো।
ও আবার কেমনধারা নাম! আমি দাস।
কেন, নামটা কি খারাপ? তুমি দীননাথ হলে আমার নাম আমি হতে বাধা কী?
তা বটে। তবে কিনা কাউকে আমি বলে ডাকলে পাঁচজন না আবার আমাকেই পাগল ভাবে।
কিন্তু আসল কথাটাও যে তাই।
তার মানে?
তুমি যে আসলে আমিই!
দুর পাগল! আমি আবার তুমি হব কী করে?
হতে হবে না, হয়েই আছ।
দেখ বাপু, পাগুলে কথা কয়ে আমার মাথাটা আর গুলিয়ে দিও না। একটু বাদেই আমি পটল তুলব, মেলা কাজ রয়েছে হাতে। দড়িখানা ভাল করে গাছের ডালে বাঁধতে হবে। ফাঁসটা ভাল করে ফাঁদিয়ে তুলতে হবে। তারপর ধরো ঠাকুর-দেবতাকেও একটু ডাকতে হবে। এ সময়ে মাথা গুলিয়ে গেলে চলবে না। তুমি এবার বরং এসো গিয়ে।
ব্যস্ত হয়ো না। মরাটা এমন হাতিঘোড়া ব্যাপার নয়। নিত্যি দুনিয়া জুড়ে হাজারে হাজারে মরছে। দু দণ্ড দেরি হলেও ক্ষতি নেই। সারা রাত তো পড়ে আছে সামনে।
না হে বাপু, শুভস্য শীঘ্রম। দেরি হলে আবার মন ঘুরে যেতে পারে। তাই দেরি করাটা ঠিক হবে না।
আহা, তার আগে যে দুটো কথা ছিল।
কী কথা?
তুমি তো কানেই তুলতে চাইছ না। এই যে বললুম আমার নাম আমি, তাও তুমি ব্যাপারটা ধরতে পারলে না।
ভেঙে বলবে তো!
তাই বলছি। এই যে আমাকে দেখছ এই আমি আসলে তুমিই। তবে পটল তোলার পর।
ফের প্যাঁচ মারছ?
মাইরি না। তুমি পটল তোলার পর তোমার যে অবস্থাটা দাঁড়াচ্ছে সেটাই হচ্ছে আমি।
ইয়ার্কি মারার আর জায়গা পাওনি। আমি তো এখনও পটলই তুলিনি। তুলতে যাচ্ছি মাত্র। ঝুলব, ছটফট করব, মরব, সে এখনও ঢের দেরি।
ওরে বাপু, মরা তোমার হয়েই গেছে। তোমার ভিতর থেকে আমি বেরিয়ে পড়েছি যে। এখন ও শরীর ঝোলাও, না ঝোলাও একই কথা। মোট কথা, তুমি মরেই গেছ।
অ্যাঁ!
তাই তো বলছি। তুমি মরেই তো আমি হলুম। না মরলে আমার দেখা পেতে নাকি?
বটে! তাহলে তুমি হচ্ছ মরা আমি?
এইবার ধরেছ ঠিক।
তা মরে কেমন লাগছে তোমার?
দুর, নতুন কিছু তো বুঝছি না। একই রকম। বরং ফুলির জন্য বড্ড মনটা আনচান করছে, মেয়েটার কথা ভেবে কান্না আসছে।
অ্যাই! ফুলির কথা তোলার তুমি কে? ফুলি তো আমার বউ!
সে আমারও বউ।
বললেই হল! ফুলি তোমার বউ হতে যাবে কেন?
আহা, হতে বাধা কী?
বাধা আছে বইকী!
ভাল করে ভেবে বলো। বরং ফের একটা বিড়ি ধরাও।
দীনু বিড়ি ধরাল, আমি দাসকেও একটা দিল। তারপর কষে ভাবতে লাগল। তারপর বলল, না হে একটা গোলমাল হচ্ছে।
কীসের গোলমাল?
ঠিক বুঝতে পারছি না। আরও ভাবতে হবে। আজ আর মরা হবে না। বরং বাড়ি যাই। ভেবে ব্যাপারটা বুঝে কাল বা পরশু এসে ফাঁসি যাব।
তা প্রস্তাবটা মন্দ নয়। এসো গিয়ে।
গাছটা হাই তুলে আপনমনে বলল, বাঁচা গেল। সারা রাত হাতে লাশ ঝুলিয়ে কি ঘুমোনো যায়!
একটা হাওয়াই চটি আর একটাকে ডেকে বলল, ওরে ঘুমোলি নাকি? ওরে ওঠ, কর্তা আজ মরছে না, ওই নামছে গাছ থেকে।
যাঃ বাবা, লম্বা ছুটি ভেবে জিরোচ্ছিলুম, ছুটি কাটা গেল যে!
মোনা ঘরে ঢুকে বলল, শোনো, গ্রীষ্মকালে বোধহয় এখানে উইক এন্ডে আসা যাবে না।
লেখার কাগজ থেকে গভীর অন্যমনস্ক চোখ তুলে অমল বলল, কেন বলো তো!
এখানে যা গরম পড়ে, আর লোডশেডিং।
তা বটে। তারপর একটু চুপ করে থেকে অমল স্নিগ্ধ গলায় জিজ্ঞেস করল, হ্যাঁ মোনা, তোমার এখানে আসতে এমনিতে খারাপ লাগে না তো!
মোনা তার দিকে চেয়ে একটু ভাবল। তারপর বলল, আগে লাগত। এখন লাগে না।
আমার বাড়ির লোকেরা তত কিছু ভাল নয়। কালচার-টালচার নেই তেমন।
একটা কথা শুনে রাখো। মেয়েদের অ্যাডজাস্ট করতে একটু সময় লাগে, কিন্তু যদি সে তার স্বামীর সাহায্য আর সহানুভূতি পায় তাহলে সে রাক্ষসের সঙ্গেও অ্যাডজাস্ট করে নেয়। বুঝেছ?
অমল মলিন মুখে বলল, হ্যাঁ, তাই বোধহয়।
বোধহয় বললে কেন?
আমার মাথা আজকাল তেমন কাজ করে না মোনা। আমি তো তোমাকে তেমন সহানুভূতি দেখাইনি, সাহায্যও করিনি। তাই ভাবছি…
মোনা এগিয়ে এসে তার মুখখানা দু হাতে তুলে ঠোঁটে ঠোঁট ডুবিয়ে একটা চুমু খেল। বলল, অত বুঝতে হবে না।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন