শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
মরণের লেখাপড়া নিয়ে বাসন্তী বা রসিক বাঙাল কারওই তেমন কোনও মাথাব্যথা ছিল না এতদিন। বাসন্তী লেখাপড়ার মর্ম তেমন বোঝে না। তবু তাড়না করতে হয় বলে তাড়না করে। আর রসিকের বক্তব্য একটু অন্যরকম। একদিন দুঃখ করে বলেছিল, আমার বড় পোলাখান হইল গুড বয়। হ্যায় লেখাপড়া শিখ্যা বিলাত আমেরিকায় যাইব। আমার ব্যবসা-বাণিজ্য লইয়া তার কোনও মাথাব্যাথা নাই। তাই ভাবতাছি দোকানখান মরণন্যারেই দিয়া যামু। বুইঝ্যা চলতে পারলে খাইয়াপইর্যা থাকতে পারব।
বাসন্তীরও অমত ছিল না। তার বাপের বাড়িতেও লেখাপড়ার চর্চা নেই, সে নিজেও বেশি দূর পড়েনি। কাজেই মরণকে নিয়ে মাথাব্যথা ছিল না তার।
কিন্তু সুমন এসে হিসেবের একটু ওলটপালট ঘটিয়ে দিল। এক রাতে খাওয়ার টেবিলে বসে সে তার বাবাকে বলল, মরণের জন্য একজন টিউটর রাখা দরকার।
বাঙাল ইলিশমাছের ঝোল দিয়ে সাপুটে ভাত মাখছিল। মুখ তুলে বলল, নাকি?
হ্যাঁ। আমি ওর বইখাতা সব নেড়েচেড়ে দেখলাম, ওর প্রগ্রেস বেশ খারাপ। টিউটর ছাড়া ও কিন্তু ভাল করতে পারবে না। অঙ্কে ইংরিজিতে বেশ কাঁচা।
রসিক সাহা সঙ্গে সঙ্গে সায় দিয়ে বলল, আরে বান্দরটা তো লেখাপড়াই করে না। আমিও থাকি না এইখানে। বান্দরটা তো ধরাবে সরা পাইছে। তারাপদ নামে এক ছ্যামড়া তো ইংরাজি পড়াইত। হ্যায় নাকি অখন সময় পায় না।
সেইজন্যই বলছি, ওকে ভাল দেখে একজন টিউটর রেখে দাও।
রসিক সাহা সঙ্গে সঙ্গে উত্তেজিত হয়ে উঠে বলে, ঠিকই তো কইছস! আমার মাথায় তো কথাটা আসে নাই! কাইলই মাস্টার ঠিক করতে হইবো। যত টাকা লাগে, বেস্ট মাস্টার চাই।
টেবিলের অন্য ধারে সিঁটিয়ে বসে ছিল মরণ। গেল তার সব সুখ আর আনন্দ। গেল তার টো টো করে ঘুরে বেড়ানো। পড়াশুনোর চেয়ে কষ্ট আর কীসে আছে! তার গলায় ভাতের গ্রাস আটকে রইল কিছুক্ষণ।
রসিক সাহা বাসন্তীর দিকে চেয়ে অত্যন্ত উত্তেজিত গলায় হেঁকে বলল, কও তো এইখানকার বেস্ট মাস্টার কে আছে। কাইলই খবর দিয়া আনাইতে হইবো।
বাসন্তী ভয় খেয়ে বলে, ভাল মাস্টারের খবর কি আর আমি জানি! কাল সকালে খবর নেবোখন।
আহা, সব ব্যাপারেই তোমরা বড় ঢিলা। আইজ রাইতেই খবর পাঠাইয়া দাও। কাইল সক্কালেই য্যান মাস্টার আইয়া হাজির হয়।
বাসন্তী শুকনো মুখে বলে, রাত দশটা যে বেজে গেছে। এখন কাউকে খবর পাঠালেই কি আসবে? কাল রবিবার আছে, কাল সকালেই খবর নেবোখন।
কার কাছে খবর নিবা?
সে অনেক লোক আছে। তুমি চিন্তা কোরো না।
রসিক দমিত না হয়ে মরণের দিকে কটমট করে চেয়ে বলে, এই বান্দর, তর ইস্কুলে ইংরাজি পড়ায় কে?
মরণ ভয়ে ভয়ে বলে, ক্ষেত্রমোহনবাবু।
ক্ষ্যাত্ৰমোহন! কাইল সকালেই গিয়া ডাইক্যা আনবি। আর অঙ্ক করায় কে?
কালীবাবু।
তারেও ধইরা আনবি।
আচ্ছা।
বাঙাল অত্যন্ত উত্তেজিত গলায় বলতে লাগল, কথাটা যে ক্যান আমার আগে মনে হয় নাই! ঠিকই তো, মাস্টার না হইলে কি আইজকাইল চলে? বান্দরটা তো হেই লাইগ্যাই দুই তিন সাবজেক্টে ফেল মাইরা মাইরা ক্লাসে ওঠে।
পর দিন সকালেই খোঁজখবর হতে লাগল। উত্তেজিত রসিক সাহা যার কথা শোনে তাকেই রেখে ফেলে আর কি।
সুমন বাপকে শান্ত করে বলল, এখনই বেশি টিউটর রাখার দরকার নেই। মোটে তো ক্লাস সিক্স। একজন হলেই চলবে। উঁচু ক্লাসে উঠলে সাবজেক্টওয়াইজ টিউটর রাখলেই হবে।
ধীরেন কাষ্ঠ সকালে এসেই ফেরে পড়ে গেল।
খুড়া, এইখানে ভাল মাস্টার কে আছে কন তো! একটু কড়া ধাতের শক্ত মাস্টার। আমার ছোট পোলাটা তো জাহান্নামে যাইত্যাছে।।
তটস্থ ধীরেন কাষ্ঠ বলে, তার আর ভাবনা কী! পূর্ণশশী স্কুলের নরেন মাস্টারকে রাখো। অঙ্ক ইংরিজিতে তুখোড়, কত গাধা পিটিয়ে ঘোড়া করছে।
তারেই লইয়া আহেন।
ধীরেন কাষ্ঠ হেসে বলে, দাঁড়াও বাঙাল, নরেন স্যারের যে অনেক টিউশনি। ব্যাচ ধরে পড়ায়। সে বাড়িতে আসবে না। খাঁইও খুব বেশি। বাড়িতে যদি চাও তাহলে সনাতন মাস্টারকে ধরতে পারো।
বিস্তর আলাপ-আলোচনার পর অবশেষে বদরাগী, কেঠো চেহারার রসকষহীন পবিত্রবাবুকে রাখা সাব্যস্ত হল। কাছেই বাড়ি, মানুষটাও রসিক বাঙালের চেনা। বাইরের ঘরখানা তুলতে গিয়ে একবার রসিকের কাছে হাজার খানেক টাকা হাওলাত করেছিলেন।
পবিত্রবাবু এলেন বেলা এগারোটা নাগাদ। এসেই বললেন, ওর তো ভিতই কাঁচা রয়ে গেছে, খাটতে হবে।
বাঙাল সঙ্গে সঙ্গে বলে, আরে খাটবেন খাটাইবেন তবে না কাম আউগ্যাইব। কত টাকা চান কন।
পবিত্রবাবু গরজ দেখে একটু বেশিই হাঁকলেন। রসিক সঙ্গে সঙ্গে রাজি, আইজই লাইগ্যা পড়েন।
আজ রোববার। রোববারে পড়াই না। কাল থেকে আসব। স্কুলের পর, বিকেল পাঁচটা-সাড়ে পাঁচটায়।
মরণ প্রমাদ গুনল। গেল তার ফুটবল, ব্যাটবল, দৌড় ঝাঁপ। ইস্কুলের পরই এসে পড়তে বসতে হবে। চোখে জল আসছিল তার।
রান্নাঘরে গিয়ে ছলোছলো চোখে মাকে বলল, বিকেলে পড়তে হয় বুঝি! আমি কিছুতেই বিকেলে পড়ব না।
ওরে চুপ! চুপ! তোর বাবার কানে গেলে কুরুক্ষেত্র হবে।
জিজিবুড়ি উনুনের ধারে শীতে জড়সড় হয়ে বসা। হাতে দুধে গোলা চায়ের গ্লাস। বিষ চোখে নাতির দিকে চেয়ে বলে, মাস্টার এসে তো সগ্গে তুলবে। বাপের টাকা তো গাছে ফলেছে কি না, চোখে ভেলভেট দেখছে।
বাসন্তী চাপা গলায় বলে, আঃ, চুপ করো তো মা! ওর বাবা শুনতে পেলে রক্ষে রাখবে না।
বলি ম্যাস্টার কি বইখাতা জলে গুলে খাইয়ে দেবে? বাপেরই বা বিদ্যে কত?
ওর বাপের বিদ্যের খতেন নিচ্ছ কেন? বাবা কি ফ্যালনা?
ফ্যালনা কি না জানি না বাপু। তবে বিদ্যেধর বলেও শুনিনি। বড়বাজারের গদিতে বসে কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা কামায়, এইটুকুই জানি।
তাতে কী হল? সেটা করতেও মুরোদ লাগে।
তা সেই বিদ্যেতে লাগিয়ে দিলেই তো পারে ছেলেকে। লেখাপড়া শিখে তো হচ্ছে লবডঙ্কা। বি এ, এম এ পাস ছোঁড়াগুলো ভেরেন্ডা ভাজছে দেখছিস না চারদিকে? আর পবিত্র মাস্টারেরই বা কী ছিরি! কালও তো দেখলুম দুখনের গোয়ালঘর থেকে গামলাভর্তি গোবর নিয়ে যাচ্ছে। ওই কি আবার একটা মাস্টার হল বাপু? নিত্যি আমাশায় ভুগছে, ঘণ্টায় ঘণ্টায় ঘটি নিয়ে দৌড়োচ্ছে পায়খানায়। ও আবার কী পড়াবে শুনি! গাঁয়ে আব ম্যাস্টার পেলি না!
বাসন্তী একটু দমে গিয়ে বলে, তা মাস্টারের মর্ম আমরা কী জানি বলো! ধীরেনখুড়ো বলল, তাই—
আহা, ওই জুটেছে এক ধীরেন ছুঁচো। সারাদিন এ-বাড়ি ও-বাড়ি ছোঁক ছোঁক করে বেড়াচ্ছে আর কার মাথায় কাঁঠাল ভাঙবে সেই মতলব কষছে। বাঙালের সঙ্গে অত গলাগলি কীসের লা ছুঁচোটার? ইনিয়ে বিনিয়ে অভাবের কথা গেয়ে টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে কি না খবর রাখিস? অত আনাগোনা তো ভাল নয় বাপু!
আহা, ওরকম বোলো না তো! ধীরেন খুড়ো তো দুঃখী লোক।
ভেজা বেড়াল। বাঙাল যেমন হদ্দ বোকা, তেমনি তুই। ধীরেনের ছেলেগুলোর খবর রাখিস? একটা জুয়ো খেলে বেড়ায়, অন্যটার ছ্যাঁচড়ামি করে চলে। সাধ করে আবার ছেলের বিয়ে দিয়েছে ধীরেনের বউ মাগী। এখন শাউড়ি-বউতে চুলোচুলি হচ্ছে রোজ। অভাবী লোক হলেই কি আর ভাল লোক হয়? ঝেটিয়ে বিদেয় করে দিবি এর পর আবার এলে।
বাসন্তী কড়াইতে ফোড়ন ছাড়তে ছাড়তে বলে, ওসব আমি পারব না। ধীরেনখুড়োকে মরণের বাবা ভারী পছন্দ করে।
ওই তো বললুম, শালুক চিনেছে গোপালঠাকুর। যেদিন গাঁটগচ্চা যাবে সেদিন বুঝবি। টাকার দেমাকে বাঙালের কি আর মাথার ঠিক আছে! আর ওই খ্যাঁকশেয়ালটাও টাকার গন্ধে গন্ধে রোজ এসে ঢুঁ মারছে। সেদিন এক গোছা রুটি খেল, একদিন আবার ডিম ভাজা দিয়ে চিড়ের পোলাও। রোজই তো এসে সেঁটে যাচ্ছে দেখছি। অন্নসত্র তো আর খুলে বসিসনি! মুখের ওপর সে কথাটা একদিন শুনিয়ে দিবি।
মরণ এসব শুনে-টুনে খুব আশায় আশায় বলে, পবিত্র মাস্টারমশাই ভীষণ রাগী লোক, খুব মারে।
জিজিবুড়ি বলে, তা মারবে না কেন? পরের ছেলের পিঠ তো। হাতের সুখ করলেই হল!
ও মা, বাবাকে বলে দাও না, আজ থেকে আমি নিজে নিজেই পড়ব। খুব ভাল করে পড়ব।
বাসন্তী ছেলের দিকে চেয়ে চোখ পাকিয়ে বলল, দাদা কী বলল কাল রাতে, শুনিসনি? লেখাপড়া কিচ্ছু হচ্ছে না। দুটো তিনটে বিষয়ে ডাব্বা খেয়ে উঠছ। সেটা কি ভাল দেখাচ্ছে? দাদা কত ভাল ছাত্র। তার ভাই হয়ে—
জিজিবুড়ি চাপা গলায় বলে, আহা, ভাই বড় এক মায়ের পেটের কিনা। সৎ ভাই আবার ভাই! কলকাত্তাই চাল মারতে এয়েছে। তা ওইটুকুন ছোঁড়া এখন তোদের মাথার ওপর ছড়ি ঘোরাবে নাকি? সে বলেছে বলেই মাথা কিনে নিয়েছে?
বাসন্তী বলে, আচ্ছা, খারাপ কথা কি বলেছে কিছু? ভাইয়ের লেখাপড়া নিয়ে ডাকখোঁজ করা কি খারাপ? তোমার কেন গায়ে জ্বালা ধরছে!
বলি কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা খরচা করে ছেলেকে বিদ্যেসাগর বানিয়ে তোর হবে কোন অষ্টরম্ভা? একটা দুটো বিষয়ে ফেল করে তা করুক না। ক্লাসে তো উঠছে ফি বছর! ওর বেশি বিদ্যের দরকারটাই বা কী? আর ও ছোঁড়াই বা এসে গেড়ে বসে আছে কেন কিছু আঁচ করতে পারলি?
তোমার যেমন কথা! গাঁয়ে বেড়াতে এসেছে তাতে দোষের কী হল বলো তো! এটাও তো ওর বাবারই বাড়ি।
সেই কথাই তো বলছি লা! এটা যে ওর বাবার বাড়ি সেটা বুঝে নেওয়ার জন্যই তো এসেছে। বিষয়সম্পত্তির খোঁজখবর নিচ্ছে। যদি ভাল চাস তো দলিলপত্র একজন ভাল উকিলকে দেখিয়ে রাখ। দলিলে কোন ফাঁকফোকর আছে কে জানে বাবা। কোন দিন থাবা মেরে সব নিয়ে নেবে, তোর তখন হাতে হ্যারিকেন।
বাসন্তী ডাল ফোড়নে ছেড়ে বিরক্তির গলায় বলল, তোমার মাথায় সেই যে পোকা ঢুকেছে আজও তা গেল না।
তোর ভালর জন্যই বলি। বেড়াতে এসে কেউ সৎ মায়ের বাড়িতে মাটি কামড়ে পড়ে থাকে? এর পিছনে মতলব নেই বলছিস! তুই আহাম্মক বলেই বিশ্বাস করিস ও কথা। খোঁজ নিলে দেখবি, বড়বউ যুক্তি করে পাঠিয়েছে। ছেলে এসে সব দেখে গেল, এর পর একদিন বড়বউ এসে তোকে উৎখাত করবে।
অত সোজা নয় মা। দেশে আইন আছে।
আইন আছে না হাতি। এই তো মহেশের বিধবা বউয়ের জমি তার ভাসুর গাপ করে নিল। পারল কিছু করতে?
কপালে যা আছে তাই তো হবে! আগে-ভাগে ভেবে কী করব বললা! তা বলে আমি তো ছেলেকে তাড়াতে পারি না। এ-বাড়িতে ওর জোর আছে।
সে তুই হাঁদারাম বলে পারিস না। তোর জায়গায় চালাক মেয়েছেলে হলে ও ছেলে পালাতে পথ পেত না। বলি বাছা, বাঙালকেই বা বিশ্বাস কী? সাঁট হয়তো সেও করেছে। তোকে তো আর বউ বলে ভাবে না। তার মতলবও খারাপ হতে পারে।
এবার দয়া করে যাও মা, বসে বসে আমার মাথাটা আর চিবিয়ে খেও না। তোমার এমন সব কথা যে বুক কাঁপে।
আমারও বুক কাঁপে মা, ছেলেপুলে নিয়ে না তুই পথে বসিস। আমি বলি কী, গোপনে গোপনে কিছু কিছু করে জমি বেচে দে। দিয়ে নগদ টাকা হাতে রাখ। তোর ছোড়দা বলছিল, খালধারের জমিটা পরাণ দাস কিনতে চাইছে। পাঁচ হাজার করে বিঘে। চার বিঘে বেচলে নগদ বিশ হাজার টাকা আসবে হাতে।
টাকাটা হাতে রাখ। অভাবে পড়লে কাজে দেবে।
আর সে বুঝি টের পাবে না? অনেক কুচুটেপনা করেছ, এবার যাও। প্রত্যেক দিন সকালবেলাটায় এসে তুমি আমার মেজাজটা খারাপ করে দিয়ে যাও। বয়স তো হয়েছে, এবার একটু ঠাকুরদেবতার নাম করতে পার না ঘরে বসে?
জিজিবুড়ি সঙ্গে সঙ্গে ভারী ভালমানুষের মতো বলল, কী ডাল রাঁধলি আজ? সোনামুগ মনে হচ্ছে! ডালের মাথায় একটু কাঁচা ঘি ঢেলে দে তো একবাটি, নিয়ে যাই। দুপুরে ভাতের সঙ্গে খাবোখন।
এখন পারব না মা। পরের দিকে এসে নিয়ে যেও, আর বাটিও এনো। গেল হপ্তায় দু দুটো কাঁসার বাটি নিয়ে গেছ, ফেরত দাওনি।
কে বলল দিইনি?
আমার সব হিসেব আছে।
বুড়ো বয়সে ভুলভাল হতে পারে। দেখবখন খুঁজে।
আর খুঁজেছ। ও বাটি আমার গেছে, এখন থেকে কিছু নিতে হলে নিজের বাসন এনো, এই বলে দিলাম।
এ আর খুঁড়িস না বাপু, অভাবে পড়লে লোকে কত কী ভাবে। পেটের মেয়ে হয়ে শেষে আমাকে চোরও বলতে লেগেছিস!
মোটেই চোর বলিনি, বাটি দুটো ফেরত দিতে বলেছি, ভারী খাগড়াই বাটি, এ-তল্লাটে অমন জিনিস পাওয়া যাবে না।
আচ্ছা বাপু, খুঁজে দেখবখন।
মরণের মনে হচ্ছে ভগবান বলে কেউ নেই। তিন দিন হয়ে গেল, বিকেলের নরম রোদে যখন বাইরের মাঠঘাট তার বয়সি ছেলেদের আয়-আয় করে ডাকে, তখন পবিত্র স্যারের রাগী আর চোয়াড়ে মুখের দিকে বেচারার মতো চেয়ে তাকে বসে থাকতে হয়। তিন দিনে তেমন শাসন না হলেও গোটা দুই গাঁট্টা খেতে হয়েছে তাকে।
আজকাল দাদাকে তার বিশেষ ভাল লাগছে না। তার এই সর্বনাশটা দাদা না করলেও পারত।
কদমগাছটার তলায় গিয়ে ছুটির দুপুরে সে শিবঠাকুরকে কম ডাকাডাকি করেনি দুদিন। কিন্তু শিবঠাকুর বোধহয় নেশাভাঙ করে পড়ে আছেন, কান দেননি তার কথায়।
চিকু বলে, আরে শিবঠাকুর বর দিলেও ভুলে যায়। তার চেয়ে কালীকে বল। কালী হচ্ছে জাগ্রত ঠাকুর। দেখসনা জিবটা কেমন লকলক করে!
কালীও তার কথা শুনবে বলে আর ভরসা হয় না মরণের। সে বলে, ধুর, ভগবান-টগবান নেই।
ভগবানের দোষ কী জানিস? ছোটদের কথা একদম শুনতে চায় না।
তাই হবে বোধহয়। মুশকিল হল, ছোটদের কথা কেউই তেমন শুনতে চায় না।
চিকু বলে, ভগবানদের ঘুষ-টুসও দিতে হয়।
কীরকম ঘুষ?
যার যেমন ক্ষমতা। সোয়া পাঁচ আনা বা পাঁচ সিকে।
সোয়া পাঁচ আনা কত পয়সায় হয়? তা বলতে পারব না, আনা-ফানা তো এখন পাওয়া যায় না। মার কাছে শুনেছি তাই বললাম।
আমিও শুনেছি।
স্কুলে এখন পুজোর লম্বা ছুটি চলছে। তাই দিনমানে কিছু সময় পাওয়া যায়। তাও কমে এসেছে।
পবিত্র স্যার মেলা হোম টাস্ক দিয়ে যান রোজ। সকালে আর দুপুরে সেগুলো করতে হয়। এত দিন এসবের বালাই ছিল না।
গত তিন দিন দাদার সঙ্গে প্রায় কথাই বলেনি মরণ। তিন দিন পর দাদা দুপুরে ডাকল।
আয়, রোজ দুপুরে আমার ঘুমোতে ভাল লাগে না। কলকাতায় তো কখনও দুপুরে ঘুমোই না।
দুপুরে তাহলে কী করো?
বাড়িতেই থাকি না। হয় কলেজ থাকে, নয়তো বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে মিট করি, সিনেমা-থিয়েটার- এগজিবিশন কত কী থাকে। বাড়িতে আর কতক্ষণ থাকি? এখানে তো সময়ই কাটতে চায় না।
আমার কিন্তু এখানেই বেশ ভাল লাগে। কত কী করার আছে।
সুমন হাসে, তোর করা তো জানি। এ বাড়ির নারকোল পেড়ে দিস, ও-বাড়ির সুপুরিগাছে উঠিস।
লজ্জা পেয়ে হাসে মরণ, কী করব, সবাই আমাকে ডাকে যে।
এখন থেকে ওসব কাজ করার জন্য পয়সা নিবি।
মরণ অবাক হয়ে বলে, পয়সা?
কেন নয়? বলবি সুপুরি পাড়তে পাঁচ টাকা, নারকোল দশ।।
এ মাঃ, তাহলে আমাকে ডাকবে কেন? কুমোরপাড়ার ছেলেরাই তো আছে। ওরা পয়সা পেলে পেড়ে দেয়।
তোকে পয়সা চাইতে বলেছি অন্য কারণে, চাইলে আর ডাকবে না।
কিন্তু আমার যে খুব ভাল লাগে।
তোর মা জানে যে তুই অত উঁচু উঁচু গাছে উঠিস?
“তোর মা” কথাটা খট করে কানে লাগল মরণের। মৃদুস্বরে বলল, একটু একটু জানে। আগে বকত, আজকাল কিছু বলে না।
বাবা জানে?
উরে বাবা।
বাবাকে ভয় খাস খুব?
খুব।
সুমন বলল, গাছে ওঠা খুব সেফ ব্যাপার নয়।
আমি খুব ভাল গাছ বাইতে পারি। বেলগাছের মগডালে উঠে যাই, কিছু হয় না।
লেখাপড়া করতে ইচ্ছে করে না?
পড়ি তো।
সুমন হাসল, কেমন পড়িস তা জানি।
মরণ লজ্জা পেয়ে চুপ করে রইল।
লেখাপড়া করাটা শক্ত কিছু নয়। তোর তো মাথা আছে।
মাস্টারমশাইরা বলে আমার মাথায় গোবর।
গোবর ভাবলে গোবরই হয়।
আমার খুব কলকাতার ইস্কুলে পড়তে ইচ্ছে করে।
কলকাতা! সেখানে গিয়ে কি থাকতে পারবি? কলকাতায় তো গাছ-টাছ নেই।
মরণ লজ্জার হাসি হাসে।
কলকাতায় যাওয়ার শখ হল কেন?
বাঃ, কলকাতায় বড়মা আছে, দিদি আছে। আমার খুব দেখতে ইচ্ছে যায়।
কথাটা বুঝতে না পেরে চেয়ে রইল সুমন। তারপর বলল, তারা কারা?
বাঃ, বড়মা আর দিদি আছে না সেখানে।
বুঝতে একটু সময় লাগল সুমনের। মুখটা মলিন হয়ে গেল তার। ধীর গলায় বলল, আমাদের বাড়ির কথা বলছিস!
হ্যাঁ তো।
খুব নিস্পৃহ গলায় সুমন শুধু বলল, ও।
একটু দমে গেল মরণ। কই, দাদা খুশি হল না তো! বলল না তো, বেশ তো, যাবি আমাদের বাড়ি!
মরণ ভয়ে ভয়ে বলল, কলকাতার স্কুলও তো কত ভাল।
সুমন একটু চুপ করে থেকে বলে, নিজে যদি পড়িস তাহলে স্কুল নিয়ে ভাবতে হবে না।
বাঙাল না থাকলে সকালবেলাটায় এবাড়িতে মোটা জলখাবারটা জোটে না। তবে চা-বিস্কুটটা দেয় বাসন্তী। ধীরেনের খাঁই বেশি নয়, জোটে ভাল, না জুটলেও ক্ষতি নেই।
আজও সকালবেলাটায় এসে পড়েছে ধীরেন। অন্য সব বাড়িও আছে, কিন্তু সব বাড়িতে সবসময় জুত হয় না। এই তো সেদিন মহিমদার বাড়িতে গিয়ে ভারী বিপদ হল, সকালবেলায় সেখানে তুমুল কাণ্ড। ওপরতলা থেকে অমলের বিলেতফেরত বউ চেঁচিয়ে সন্ধ্যাকে গালমন্দ করছিল আর সন্ধ্যাও সপাটে চোপা করছিল। দূর থেকে কাণ্ড দেখে সটকে পড়েছিল ধীরেন। এসব তার বাড়িতেও নিত্যি হচ্ছে। আকথা কুকথা শুনে শুনে কানেও সয়ে গেছে সব। তবে অশান্তির বাড়িতে গেলে দু-দণ্ড বসার উপায় থাকে না!
সেদিক দিয়ে বাঙালবাড়ি ভাল। এবাড়িতে ঝগড়াঝাঁটি হয় না। আসলে জনও তো নেই তেমন। তবে দু বউ একত্র হলে সে একটা কাণ্ডই হবে বোধহয়।
বারান্দায় বসে গলাখাঁকারি দিয়ে নিজেকে একটু জানান দিল ধীরেন।
কেউ কোনও সাড়া দিল না। দুটো কাজের মেয়ে উঠোন ঝাঁটপাট দিচ্ছে। ভারী ব্যস্ত। তা ধীরেনেরও তাড়া নেই। কাজই বা কী তার? বসে বসে সে উঠোনের রোদ, পেয়ারাগাছের শালিখ, বাঁশের ডগায় কাক, বারান্দার নীচে কুণ্ডলী পাকানো নেড়ি কুকুর—এইসব দেখছিল।
রান্নাঘরের দিক থেকে একটা ঝনঝনে গলার আওয়াজ এল হঠাৎ, ওই যে এয়েছে বাঙালের ধর্মবাপ। এবার যা গিয়ে পিণ্ডি গিলিয়ে আয়।
গলাটা খুব চেনা ধীরেনের। বাসন্তীর মা। গণেশ দাস যখন বিয়ে করতে আতাপুর গিয়েছিল তখন বরযাত্রীদের দলে ধীরেনও ছিল। ঘটাপটার বিয়ে নয়, নমো নমো বিয়ে, মাছটা খাইয়েছিল খুব। সব মনে আছে ধীরেনের। আঠেরো টুকরো মাছ খেয়ে যা একখানা ঢেঁকুর তুলেছিল তার গন্ধ যেন আজও নাকে ভেসে আসে। গণেশদার বউ কিন্তু গাঁয়ের মেয়ে আন্দাজে ভারী লক্ষ্মীমন্ত সুন্দর ছিল দেখতে। হাত পায়ের গড়ন পেটন, মুখের ছাঁচ সবই ভারী ভাল। বলতে নেই, বউ দেখে ধীরেনের এমন কথাও মনে হয়েছিল, আহা, আমার যদি এমন একখানা বউ হত!
সেই তারই গলা। গণেশদা পটল তুলেছে সেই কবে, দুটো ছেলে আর এই মেয়ে বাসন্তীকে নিয়ে বিধবা হল মনোরমা। ক্রমে ক্রমে মানুষ যে কী থেকে কী হয়ে যায় তা দেখলে ভারী ভয় হয় ধীরেনের।
মনোরমা তাকে শুনিয়েই বলল, ভাগাড়ের শকুন সব এসে জোটেও বাপু। গুচ্ছের গিলবে, ছোঁক ছোঁক করবে, মাথায় হাত বুলিয়ে তোতাই পাতাই করে টাকাপয়সা ঝাঁকবে, হাড়ে হাড়ে চিনি বাপু।
আহা, চুপ করো না মা, শুনবে যে।
শোনানোর জন্যই তো বলছি। সক্কালবেলাটায় কাকে গু খাওয়ার আগেই মড়া কেন মরতে আসে ভেবে দেখেছিস? কোন পিরিতের মানুষ রে! আবার জামাই-আদর করে চা-বিস্কুট সাজিয়ে দেওয়া! চা- পাতা, চিনি, দুধ— এসবের দাম জানে না!
পায়ে পড়ি মা, চুপ করো, ওরকম বলতে নেই।
দুদিন চারদিন আসে না হয় কিছু বলতুম না। তা বলে রোজ সকালে এসে থানা গেড়ে বসে কোন আক্কেলে?
ধীরেন কাষ্ঠ বুঝল, শব্দভেদী বাণ তার উদ্দেশ্যেই ছোড়া হচ্ছে।
ধীরেন উঠে পড়ল।
মরণের বাবা শুনলে ভারী দুঃখ পাবে।
তা পায় পাক বাছা, তা বলে স্পষ্ট কথা বলতে আমি ছাড়ব না, তোর বাপ বেঁচে থাকতে কম জ্বালিয়েছে আমাকে? গিয়ে দাঁত বের করে হাত কচলে ধানাইপানাই কথা। তারপর এটা দাও, সেটা দাও।
কথাটা মিথ্যে, গণেশদার অবস্থা মোটেই ভাল ছিল না। ধীরেনও বিশেষ যেত-টেত না। কিন্তু প্রতিবাদ করে হবেটাই বা কী? লোকে যা ভাবে তাই বলে। যা ঘটে তা তো বলে না সবসময়।
রান্নাঘরের দরজায় এসে দাড়িয়েছে বাসন্তী।
ধীরেনখুড়ো কোথায় যাচ্ছেন? বসুন না।
ইয়ে, আজ বড্ড রোদ উঠে গেছে মা। আজ বরং যাই।
চা হচ্ছে তো। বসুন।
ঘরের ভিতর থেকে ঝনঝনে গলাটা বলে উঠল, যেতে চাইছে দে না যেতে। তোর আদিখ্যেতা দেখে বাঁচি না।
ধীরেন একটু দাড়িয়ে থেকে ফের বসে পড়ল। গাঁয়ে তার বসবার জায়গা কমে আসছে। লক্ষণটা ভাল নয়, কথাগুলো গায়ে মাখলে তার চলবে না।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন