শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
রান্নার বামুনঠাকুর আছে। সম্প্রতি একজন বামুনদিকেও রাখা হয়েছে। বলাকার একার জন্য এত কাজের লোকের দরকার নেই। তবু রাখা হয়েছে এই নিরিবিলি বাড়ির জনহীনতার ভাবটা কমানোর জন্য। ছেলে আর মেয়েরা চায় মাকে ঘিরে একটা নিরাপত্তার বলয় রচনা করে দিতে। বলাকার তাতে ঘোর আপত্তি। প্রথম কথা হল খরচ। মাইনে এবং খাইখরচ মিলে এই মাগ্গিগণ্ডার দিনে বড় কম দাঁড়ায় না খরচের বহরটা। তা ছাড়া মুনিশ আছে, মালি আছে, পুষ্যি আছে। খরচ অবশ্য ছেলে-মেয়েরাই দেয়, কিন্তু বলাকার সেটা গায়ে লাগে। তার তো এত মানুষের দরকার নেই। কিন্তু কে শোনে কার কথা!
বামুনঠাকুর বা বামুনদিকে বললেই এক কাপ কফি করে দিতে পারত। কিন্তু কফি করতে উঠে এল পারুল নিজেই। আসলে অমলকে কী বলবে, কীভাবে বলবে তা ভাবতেও একটু ফাঁক দরকার ছিল তার। রান্নাঘরে অসময়ে পারুলকে দেখে তটস্থ বামুন রাঁধুনি হরনাথ বলল, কী দিদিমনি, কিছু লাগবে?
না হরদা, আমি একটু কফি করতে এসেছি।
আপনি করবেন কেন? আপনার শরীর খারাপ, আমি করে দিচ্ছি।
আমিই করব। গ্যাস খালি আছে?
খালি করে দিচ্ছি।
জল গরম করতে করতে ভাবছিল পারুল। তাদের বাল্যপ্রেম কবেই উবে গেছে। ভাঁটিয়ে গেছে বয়স। সময়ের অনেক পলিমাটির আস্তরণ পড়েছে ক্ষতচিহ্নের ওপর। বেড়েছে তাদের প্রিয়জন। পৃথিবীর কোনও ট্র্যাজিক ঘটনাই বেশিদিন স্থায়ী হতে পারে না। তার ব্যথা-বেদনার উপশম করে দিয়ে যায় সময়। অমলের এই ভাঙচুরের জন্য পারুল কি দায়ি হতে পারে? সে কোনও অপরাধ করেনি। তার বাবার কাছ থেকে সে একটা জিনিস পেয়েছিল। সেটা হল মনের দুর্জয় শক্তি। নৈতিক সবলতা। তাই ওই বয়ঃসন্ধি পেরোনো বয়সে জীবনের প্রথম উজ্জ্বল পুরুষটিকে সে প্রত্যাখ্যান করেছিল। প্রেমিকই যদি হও তবে শরীরের ওপর লোভ করবে কেন? কেন রচনা করলে না প্রেমটাকে? শেষ অবধি সম্পর্কটা হয় তো বায়োলজিই, তবু কি মানুষ তার মধ্যেও সুন্দরের সঞ্চার ঘটায় না। পারুলকে কুমারী বয়সে ধ্বংস করে দিয়েছিলে তুমি, তারপর এখন দেবী বলে স্তবগান করো, এ কেমন ভড়ং।
অমলের কফি করা সোজা। চিনি নয়, দুধ নয়, শুধু কালো কফি।
হরনাথ বলল, দিদিমনি, আমি দিয়ে আসছি। ভরা গরম কাপ নিতে গিয়ে যদি পড়ে-টড়ে যান।
কিছু হবে না হরদা। পারব।
সাবধানী হরনাথ তবু বারান্দার বাতিটা জ্বেলে রান্নাঘরের সিঁড়ি পর্যন্ত সঙ্গে রইল। লোকটা বেশ বিনয়ী, কাজের লোক। তবে বলাকা বলে, হরনাথ কাজের হলে হবে কী, হাতটান আছে বাপু। জিনিসপত্র পাচার করে।
তা অবশ্য করতেই পারে। বলাকা একা কত দিকে নজর রাখবে! মাইনে-করা লোকের ওপর নির্ভর করতে গেলে কিছু ক্ষয়ক্ষতি মেনে নিতেই হয়। বস্তুবাদী বলাকা তাই বেশি ঘাঁটায় না।
উঠোনটা সাবধানে পেরুল পারুল। পেটে বাচ্চাটা আসার পর আজকাল সে ভীষণ সাবধানী হয়ে গেছে। খুব হিসেব করে পা ফেলে, খুব সাবধানে চারদিকে নজর রেখে চলে।
চুপ করে বসে আছে অমল। চোখে ভারী সুদূরে-হারিয়ে-যাওয়া দৃষ্টি।
তোমার কফি!
অমল সাড়া দিল না।
দুবার বলতে হল।
ওঃ হ্যাঁ। বলে তটস্থ অমল অপ্রতিভ একটু হাসল।
গরম কফিটা যেন গো-গ্রাসে খাওয়ার চেষ্টা করছিল অমল। পারছিল না। হাত কাঁপছে, কফি চলকে যাচ্ছে, ঠোঁটে ছ্যাঁকা লাগছে। একবার বিষমও খেল।
তাড়াহুড়ো করছ কেন বল তো! আস্তে খাও।
অমল থমকে গেল। তারপর ম্লান মুখে বলল, আমার আজকাল হাত কাঁপে কেন বল তো পারুল! এ কি নিউরোলজিক্যাল কিছু?
ডাক্তার দেখাও। এই বয়সে হাত কাঁপার কথা তো নয়!
তাই ভাবছি। কনস্ট্যান্ট হাত কাঁপে। আজকাল লিখতে বা ড্রয়িং করতে রীতিমতো কষ্ট হয়।
সবসময়ে কাঁপে?
হাতটা কোথাও রাখলে বা জোরে চেপে ধরে থাকলে কাঁপে না। কিন্তু যখনই চায়ের কাপ বা জলের গেলাস বা কলম কিছু একটা ধরতে হয় তখন এত কাঁপে যে অবাক হয়ে যাই। এটা যে আমারই হাত তা যেন বিশ্বাস হয় না। এই হাত দুটো নিয়ে যে এরকম সমস্যা হবে তা তো কখনও ভাবিনি। তাই ভারী অবাক হয়ে যাই।
কাঁপা-কাঁপা হাতেই প্লেটসুদ্ধু কফির কাপটা মুখের কাছে তুলে চুমুক দিচ্ছিল অমল। কাপে আর প্লেটে মৃদু ঠকাঠক শব্দ হচ্ছে। মলিন মুখ করে বলল, ডাক্তার দেখিয়ে কিছু হবে না পারুল। একে একে নিভিছে দেউটি।
তার মানে কী?
হাত যাবে, পা যাবে, চোখ যাবে, মাথা যাবে। সব নিবে যাবে। একদিন আমিও নিবে যাব, কিছুই থাকবে না আমার।
মরার কথা ভাব বুঝি খুব?
মাথা নেড়ে অমল বলে, আরে না। রোমান্টিক মৃত্যুচিন্তা আমার হয় না। কেন জানো? মরার রোমান্টিক চিন্তা তখনই হয় যখন তার জন্য কাঁদার বা হাহাকার করার বা অনুতপ্ত হওয়ার মতো কেউ থাকে। ভালবাসার লোক, আপনার লোক।
পারুল ভ্রূ কুঁচকে বলল, কী বলতে চাও তুমি বলো তো? তোমার জন্য ভাববার বা কাঁদবার কেউ নেই নাকি! পুরুষমানুষগুলো কি সবাই ন্যাকা আর বোকা? আজ না হয় তোমার সঙ্গে তোমার বউয়ের একটু খটাখটি আছে, তাই বলেই কি ধরে নিতে হবে যে সে তোমাকে ভালবাসে না? ছেলেমেয়ে দুটোকেই বা তুমি কতটা চেনো? ওসব ধরে নেওয়া সেন্টিমেন্টাল কথা বোলো না তো! ওসব শুনলে আমার ভারী রাগ হয়।
অমল এ কথায় যেন একটু লজ্জা পেয়ে বলল, না, সেরকম ভেবে কিছু বলিনি।
পুরুষমানুষের দোষ কী জানো? তারা বউ বা ছেলেমেয়ের কাছে হান্ড্রেড পারসেন্ট চায়। আর চাওয়াটা সে নিজেই ঠিক করে নেয়। বউ যে একটা আলাদা সত্তা, আলাদা পারসোনালিটি, ছেলেমেয়েদেরও যে নিজের মতো করে ভালবাসার রকম থাকতে পারে, সেটাই তারা বুঝতে চায় না।
মৃদু মাথা নেড়ে অমল হাসিমুখে বলে, আরে না। আমি ওসব ভাবি না।
তাই ভাব। ভাল করে নিজের মনের ভিতরটা খুঁজে দেখ। বুঝতে পারবে।
অমল একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে খুব মৃদু স্বরে বলে, মরার কথা ভাবতে আমি যে ভয় পাই পারুল। ভীষণ ভয় পাই।
তবে বলছ কেন?
বলিনি। আসলে মনে হচ্ছে, আমি খুব বুড়ো হয়ে গেছি। জীবনীশক্তি ফুরিয়ে আসছে। খুব দুর্বল হয়ে যাচ্ছি। হাত কাঁপে, স্মৃতিশক্তি কমে যাচ্ছে, কেমন যেন হয়ে যাচ্ছি।
কারণটা খুঁজে দেখেছ?
খুঁজি তো! খুব খুঁজি। খুঁজে কিছু পাই না। আমার কি আলঝাইমারস ডিজিজ হল! কে জানে?
কিছু হয়নি তোমার। একটা ঝাঁকি মেরে সোজা হয়ে যাও।
একটু অবাক হয়ে অমল বলল, কথাটা কার বল তো! কে যেন কথাটা খুব বলত। মনে পড়ছে।
পারুল হেসে ফেলে বলল, আমার বাবা। বাবার খুব প্রিয় স্লোগান ছিল এটা। সবসময় সবাইকে বলত একটা ঝাঁকি মেরে সোজা হয়ে যাও।
অমল ফের গরম কফিতে হাঘরের মতো চুমুক দিয়ে বলল, কৃতকর্ম ভুলে, অতীত ভুলে যারা ফের সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারে তারা নমস্য। আমার মনে আছে জ্যাঠামশাই কথাটা আমাকেও কয়েকবার বলেছেন। টেস্টে খারাপ রেজাল্ট করেছিলাম, তখন একবার বলেছিলেন। মনে আছে, তাতে কাজ হয়েছিল। তখন কাজ হত। এখন আর হয় না।
বউয়ের সঙ্গে ঝগড়া করে এসেছ নাকি? সত্যি কথাটা বল তো!
মাথা নেড়ে অমল বলে, না। ঝগড়া করে বিবাগী হওয়ার মতো অবস্থাটা আর নেই। আমি এমনই এসেছি। কিছু ভাল লাগছিল না। ফ্ল্যাটবাড়ির মধ্যে আজকাল আমার কেমন যেন দম বন্ধ হয়ে আসতে চায়।
কেন, ফ্ল্যাটবাড়ি আবার কী দোষ করল! তোমারটা তো শুনেছি দক্ষিণ খোলা সুন্দর বড় ফ্ল্যাট।
ফ্ল্যাটবাড়ির দোষ নয় পারুল। দোষ আমার। কেবলই মনে হয়, যে-জায়গায় আছি সেটা আমার সহ্য হচ্ছে না।
তোমার কি এ জায়গাটা ভাল লাগছে আজকাল?
মাথা নেড়ে অমল বলে, তাও নয়। তবে এখানটায় ওরা নেই বলে আর চারদিকটা খোলামেলা বলে একটু হাঁফ ছাড়তে পারি।
চাকরিটার কী অবস্থা?
চাকরি! বলে খুব চিন্তিতভাবে তার মুখের দিকে চেয়ে রইল অমল। তারপর হাত দুটো উলটে অসহায় ভঙ্গি করে বলল, কী জানি! চাকরির কথা তো ভাবিনি।
অফিসে না জানিয়ে চলে এসেছ?
হ্যাঁ।
এবার বোধহয় চাকরিটা যাবে তোমার। শুধু মুখ দেখে তো আর মাসের শেষে মোটা মাইনে দেবে না তারা।
অমল একটু হাসল, মৃদুস্বরে বলল, ওসব ভাবতেও আমার আর ভাল লাগে না। যদি তাড়িয়ে দেয় দিক। ক্রীতদাস তো নই।
বাড়িতেও কি কিছু জানিয়ে আসোনি?
আবার চিন্তিত হয় অমল। বলে, জানানোর কী আছে? রাতে আমার ঘুম হচ্ছিল না। একটু তন্দ্রা এলেই ভীষণ সব দুঃস্বপ্ন দেখে চটকা ভেঙে যাচ্ছিল। মদ খাওয়ার চেষ্টা করলাম, বমি হয়ে গেল। ঝিম মেরে পড়েছিলাম। হঠাৎ মনে হল, এভাবে পড়ে থাকার মানেই হয় না। খুব ভোরবেলা উঠে বেরিয়ে পড়লাম। ট্রেন ধরে সোজা বর্ধমান।
আচ্ছা মানুষ যা হোক। বাড়ির লোক ভাবছে না! একটা টেলিফোন তো করা উচিত ছিল, করেছ সেটা?
আমি করিনি। তবে মনে হয় দাদা খবর দিয়েছে।
ঠিক জানো যে খবর দিয়েছে।
জানি না। তবে বউদিও তোমার মতোই চোখ পাকিয়ে আমাকে অনেক বকেছে। তাতেই মনে হচ্ছে কলকাতায় খবর দেবার দায়িত্ব ওরাই নিয়েছে।
পারুল একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, কেন যে তুমি এরকম হয়ে যাচ্ছ কে জানে!
সবাই সংসারী হবে, হিসেবি হবে, সাবধানী হবে, স্বাভাবিক হবে বলে আশা কর কেন? এক আধজন অন্যরকম হলে ক্ষতি কী? সবাই একরকম হলে কি ভাল হত?
পারুল হেসে ফেলে বলল, তুমি কি পৃথিবীর বৈচিত্র্য আনার জন্য হিসেব কষে অন্যরকম হতে চাইছ?
মৃদু হেসে অমল বলে, তাহলে তো অভিনয় করতে হত! কিন্তু আমি ভাল অভিনেতা নই। পারুল, আমি মনে বড় কষ্ট পাচ্ছি। বড্ড কষ্ট।
কীসের কষ্ট তাও তো এতদিনে বুঝিয়ে বলতে পারলে না।
সে কি বোঝানো যায়? আমার ভিতরে যেন এক রুক্ষ ঊষর প্রান্তর। আর সেখানে কেবল হাহাকারে ভরা বাতাস বয়ে যাচ্ছে। ভীষণ ভয় করে। পারুল, আমি কি পাগল হয়ে যাব একদিন?
শঙ্কিত অমলের মুখের দিকে চেয়ে বুকটা টনটন করে উঠল পারুলের। নরম গলায় বলল, ওসব ভেবো না। পাগল হবে কেন? একটা কথা বলব?
বলো।
তুমি কি নাস্তিক?
হঠাৎ ও প্রশ্ন কেন?
বলোই না।
মাথা নেড়ে অমল বলে, সেটাও তো ভেবে দেখিনি। ভগবান নিয়ে মাথাই ঘামাইনি কখনও। ওকথা জিজ্ঞেস করলে কেন?
তোমাকে বলতে ভয় করে। তুমি মস্ত লেখাপড়া জানা মানুষ, ভগবানের কথা বললে হয়তো তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেবে। নাস্তিকরা ভীষণ তার্কিক হয়।
অমল হাসল। বলল, নাস্তিক আস্তিক আমি কিছুই নই। নাস্তিক হলেও ভাল ছিল। নাস্তিকদেরও একটা ভগবান আছে বোধহয়।
সে আবার কী?
নাস্তিকদেরও একজন নেগেটিভ ভগবান থাকে।
কী যে বলো অমলদা, কিছু বুঝতে পারি না!
অমল কফিটা শেষ করে বলল, ওসব থাক পারুল। ভগবান আমাকে ভাল চোখে দেখবেন, এমন চান্স খুবই কম। তাঁকে ডেকে আমার লাভ হবে না।
আমি বলি বউয়ের কাছে ফিরে যাও। শান্তভাবে দুজনে মুখোমুখি বসে কথা বল। মিটিয়ে নাও।
তোমার কি ধারণা, আমার মানসিক সব অশান্তির মূলে বউয়ের সঙ্গে ঝগড়া?
তা ছাড়া আবার কী?
সমস্যা অত সরল হলে তো কথাই ছিল না পারুল।
দুজনেই স্তব্ধ হয়ে কিছুক্ষণ বসে রইল।
পারুল বলল, ঠান্ডা বাড়ছে, রাত হচ্ছে। বাড়ি যাও অমলদা।
তটস্থ অমল উঠে দাঁড়াল সঙ্গে সঙ্গে। বলল, হ্যাঁ পারুল, যাচ্ছি। একটা কথা বলব?
বল।
আমার মাথায় তো এখন স্থিরতা নেই। আমি ভূতের মতো রাতবিরেতে বেরিয়ে পড়ি! অন্ধকারে আঘাটায় ঘুরে বেড়াই। আমাকে হঠাৎ তোমার জানালার ধারে বা বাগানের কোণে কোথাও দেখতে পেলে ভয় পেয়ো না। কিংবা মায়া করে ডেকে এনে ঘরেও বসিয়ো না। ওইভাবে ঘুরে ঘুরে ক্লান্ত হয়ে হয়ে হয়তো একদিন আমি নিজেকে ফিরে পাব।
পারুল চুপ করে রইল। অমল ধীরে ধীরে বারান্দা পেরিয়ে সিঁড়ি দিয়ে আবছায়া উঠোন ডিঙিয়ে বাইরের অন্ধকারে মিলিয়ে যাচ্ছিল। মদ খায়নি, তবু কেমন যেন অনিয়ন্ত্রিত ছোটবড় পদক্ষেপ। গায়ে তেমন শীতবস্ত্র নেই। শীত-গ্রীষ্মের বোধও নেই বোধহয়।
মা, কে এসেছিল বল তো! অমলমামা?
পারুল মেয়ের মুখের দিকে চেয়ে অন্যমনস্ক ভাবে বলল, হ্যাঁ।
অমলমামার কী হয়েছে মা?
মনে নানা অশান্তি।
কাল আমি অমলমামাকে দুপুরবেলায় দেখেছি। কাঞ্জিলালদের জমিতে রোদে বসে আছে। আমি তিতলিদের বাড়ি থেকে ফিরছিলাম। দেখি বসে আপনমনে বকবক করছে। আমাকে দেখে হাতছানি দিয়ে ডাকল। আমি কিন্তু যাইনি, দৌড়ে পালিয়ে এসেছি।
আজকাল ওকে দেখলে বোধহয় সবাই ভয় পায়। অথচ অমলদা কত ব্রাইট ছিল।
গোঁসাইবাড়ির মানুদি বলছিল। তোমার সঙ্গে বিয়ে হয়নি বলেই নাকি অমলমামা পাগল হয়ে গেছে!
বিরক্তিতে ভ্রূ কোঁচকাল পারুল। দুধের মেয়েটার কানে ওসব কথা না ঢোকালেই কি নয়! গাঁয়ের মেয়েগুলোর স্বভাবই হল লোকের কানে বিষ ঢালা। কাজকর্ম তো নেই। গম্ভীর হয়ে পারুল বলে, ওসব কথায় কান দিও না।
আমাকে ডাকছিল কেন বল তো মা! অমলমামা তো আমাকে ভাল করে চেনেই না।
হয়তো চিনেছিল।
না মা, অমলমামা আমাকে চেনে না। মানুদি বলছিল, অমলমামা নাকি বাচ্চা মেয়েদের দেখলেই ডাকে।
ওঃ গড!
আমি কি পালিয়ে এসে অন্যায় করেছি?
না না। ঠিকই করেছ। অমলদার এখন মাথার ঠিক নেই।
পারুল খুব চিন্তিতভাবে দোতলায় উঠল। খুব ধীরে ধীরে।
কে এসেছিল রে পারুল? কার যেন কথা শুনতে পেলাম।
অমলদা।
বলাকা একটা পুরনো বালাপোশে নতুন ওয়াড় পরাচ্ছিল। সঙ্গে দুখুরি।
দুখুরি খিকখিক করে হেসে বলল, পাগলাটা?
চিন্তিত পারুল তার মায়ের দিকে চেয়ে বলল, হ্যাঁ মা, অমলদা কি শেষ অবধি পাগলই হয়ে যাচ্ছে?
বলাকা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, কার কী কর্মফল বাছা, তা কি জানি? ওদের বংশে তো কেউ পাগল ছিল না। ওর যে কী হল কে জানে। কী বলছিল তোকে?
কথাবার্তা তেমন অস্বাভাবিক বলছিল না। তবে কষ্টের কথা বলছিল। কীসের কষ্ট তা বুঝিয়ে বলতে পারল না।
বউটা কেমন রে?
কিছু খারাপ বলে তো মনে হয়নি।
বাইরে থেকে আর কতটুকু বুঝবি?
হ্যাঁ মা, পুরুষমানুষদের কিছু হলেই বুঝি বউকে দায়ি করতে হবে! এ তোমাদের ভীষণ একপেশে ধারণা।
তা নয় মা। আজকাল যে মেয়েগুলো স্বামীদের বড্ড জ্বালিয়ে মারে।
তাই বুঝি? পুরুষেরা কি ধোয়া তুলসীপাতা? তুমিও তো একজন মেয়ে, কেমন করে বল ওসব কথা?
আমি মেয়ে হলেও তোমাদের আমলের মেয়ে তো নই!
তাতে কী মা? সেই আমলের মেয়ে বলে এই আমলের মেয়েদের বুঝতে চেষ্টা করবে না।
বলাকা ফের একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, বুঝতে পারলে কি আর বলতাম? তবে জানি সংসারের বেশির ভাগ অশান্তির মুলেই থাকে মেয়েরা।
বেশ কথা! তোমাকে নিয়ে আর পারা যায় না।
পারুলের শরীর ভাল লাগছিল না। মাথাটা একটু গরম। সে গিয়ে শোওয়ার ঘরে অন্ধকারে লেপ চাপা দিয়ে শুয়ে রইল। আজকাল মন খারাপ লাগলে সে তার পেটের দুষ্টুটার কথা ভাবে। ভাবতে ভাবতে মন ভাল হয়ে যায়। এখন তার ইচ্ছে হয় আরও কয়েকটা ছেলেপুলের মা হতে। শরীর দেবে না বলে, নইলে সে বহুপ্রসবিনী হত।
বে-খেয়ালে বাসরাস্তার কাছে চলে এসেছিল অমল। এখানে আলো-টালো আছে, দোকান পাটে লোকজন। একটা বাস থেকে হুড়মুড় করে লোক নামছে।
হঠাৎ তার ভিতর থেকে কে যেন বলে উঠল, এ কিস উইল কিওর ইউ। এ কিস… এ কিস… বাই দ্যাট উওম্যান…
হঠাৎ বহুকালের ছাইচাপা একটা ক্ষুধা যেন সর্বাঙ্গে জেগে উঠল তার। বহুকাল আগে পারুলদের দোতলার নির্জন ঘরে এক দুরন্ত দুপুরে সে এক সুন্দরীর দেহের মধ্যে ডুবে গিয়েছিল। সেই কাণ্ডজ্ঞানহীন, অন্ধ, দেহগত কামনা ফুঁসে উঠল হঠাৎ।
দৈববাণীর মতো তার ভিতরে কে যেন ক্রমাগত বলে যাচ্ছে এ কিস উইল কিওর ইউ…এ কিস উইল কিওর ইউ… এ কিস…
মাথা টলছে তার। …দেবীদুর্লভ পারুলের কাছেই কি রয়েছে তার অমেয় আরোগ্য? …সে যাবে পারুলের কাছে, হাঁটু গেড়ে বসে ভিক্ষা চাইবে। একবার, মাত্র একবার চুম্বন করো আমাকে। হরণ করো আমার বিষাদ, আমার অন্ধকার।
অমল পারুলের কাছে যাবে বলে ফিরে দাঁড়িয়েছিল। হঠাৎ ডান কাধে একখানা ভারী হাত এসে পড়ল।
আরে মশয়, আপনে অমলবাবু না? মহিম রায়ের পোলা?
বিরক্ত অমল মুখ ঘুরিয়ে রসিক সাহাকে দেখতে পেল। বলল, হ্যাঁ।
রসিক বিস্ময়ের চোখে তার দিকে চেয়েছিল। বলল, আপনারে তো চিননই যায় না মশয়। শরীর খারাপ নাকি?
না না, ঠিক আছে। সব ঠিক আছে।
এই কাল ঠান্ডার মইধ্যে গরম জামা গায়ে নাই, দাড়িদুড়ি ফালান নাই! কী হইছে কন তো!
লজ্জা পেয়ে অমল বলল, কিছু হয়নি তো!
দূর মশয়, কিছু হয় নাই মানে? শীতে তো কাপতে আছেন। আহেন আমার লগে।
কোথায় যাবো?
লন আমার বাড়িত। এক কাপ গরম চা খাইয়া যান। ভাল চা আছে।
অমল মাথা নেড়ে বলল, না না, আজ থাক।
আরে লজ্জা পান ক্যান? আপনে তো ফালাইন্যা মানুষ না। ব্রাহ্মণ সন্তান, তার উপর প্যাটে বিদ্যা গিজগিজ করতে আছে। বিলাত আমেরিকা ঘুইরা আইছেন। আপনের শ্বাসেপ্রশ্বাসে বাতাস পবিত্র হয়। লন, গরিবের বাড়িতে একটু পায়ের ধুলা দিয়া আইবেন।
হঠাৎ শীতটা খুব টের পাচ্ছে অমল। তার হাত পা ঠকঠক করে কাঁপছে। নাকে জল আসছে, চোখে জল আসছে, গলা কেঁপে যাচ্ছে।
কইলকাতা থিক্যা আইলেন বুঝি অখন!
অমল ভুল ভাঙার চেষ্টা না করে বলল, হুঁ।
ডান হাতে একটা মেটে হাঁড়ি সেইটে উঁচু করে দেখিয়ে রসিক বলল, গঙ্গার ইলিশ আনলাম। চলেন, কয়েকখান গরম গরম মাছভাজা খাইয়া যাইবেন। খুব ভাল জাতের ইলিশ পাইছি। ত্যালে এক্কেবারে পিছলাইয়া যাইতাছে।
অমল মৃদু একটু হাসল। হ্যাঁ তার খিদে পেয়েছে, তার শীত করছে, সে ভারী ক্লান্ত। রসিক বাঙালকে তার মোটেই খারাপ লাগছে না।
রসিক পিছন ফিরে হঠাৎ হাঁক মারল, কী রে পুঁটি, তর কিননকাটন হইল? আয় তাড়াতাড়ি।
ফ্যান্সি স্টোর নামে নতুন একটা দোকান খুলেছে সম্প্রতি। ঝাঁ চকচকে দোকান। সেখানে দাঁড়িয়ে একটা ছিপছিপে চেহারার মেয়ে কেনা-কাটা করছিল। বলল, যাচ্ছি বাবা।
রসিক অমলকে বলল, আমার মাইয়া। গ্রামেগঞ্জে আইতে চায় না। অগো জান গাড়া আছে কইলকাতায়। তুয়াইয়া-বুয়াইয়াও আনতে পারি না। এইবার কী খেয়াল হইছে কে জানে, হঠাৎ দেখি জিনিসপত্র গুছাইয়া লগ লইছে।
এসব কথার কী উত্তর দেবে তা ভেবে পাচ্ছিল না অমল।
রসিক হাঁক মারল, আমরা আউগাইলাম রে পুঁটি। তুই তাড়াতাড়ি আয়।
হ্যাঁ বাবা, যাচ্ছি, তুমি এগোও।
তাকে দেখে আকাশ থেকে পড়ল বাসন্তী, ওমা! এ কাকে এনেছ তুমি! কী ভাগ্যি আমার! এসো, এসো অমলদা, এসো!
রসিক যেন দৌড় প্রতিযোগিতায় ফার্স্ট হয়েছে এমন মুখ করে বলল, আগো, তাড়াতাড়ি আগুনের পাতিলটা লইয়া আহ। আর পাঞ্জাবের আলোয়ানটা দিয়া ভদ্রলোকরে একটু ঢাকাচাপা দাও। দেখতাছ না, ঠান্ডায় এক্কেবারে কাপ উইঠ্যা গেছে।
এই দিই! ও মা এই বুঝি পুঁটি! কই, আগে জানাওনি তো!
জানামু ক্যামনে? হুট কইরা রওনা হইয়া পড়ল।
এসো মা, এসো। বলে মেয়ের দুহাত ধরে নিয়ে ঘরের বাইরে চলে গেল বাসন্তী।
কাঠকয়লার আগুনে ভরা একটা হাঁড়ি এনে রাখা হল অমলের পায়ের কাছে। একটা মোটা কুটকুটে আলোয়ানে তার গা ঢেকে দিল বাসন্তী। বলল, বোসো অমলদা, চা করে আনছি। চা না কফি?
চা-ই কর।
রসিক মুখোমুখি একটা চেয়ারে বসে বলল, জুইৎ কইরা বহেন। আর কী খাইবেন কন।
অমল মৃদু হেসে বলল, আপনি একটি বেশ লোক, তাই না!
না মশয়, বাজারে আমার খুব বদনাম। দুইটা বিয়া করছি, মাইনষের জমিজমা সব গাপ করত্যাছি। আরও কত কী কয় লোকে! তবে মশয় আমি ওইসব গায়ে মাখি না। খাইট্যা পিট্যা খাই, অসুরের মতো কাম করি। কুটকচালি কইরা তো সময় কাটাই না! গ্রামের মানুষগুলা অলস, বইয়া বইয়া কার মাগ্গে কত গু তা হুইঙ্গা বেড়ায়। বোঝলেননি?
অমল আগুনের তাপ আর আলোয়ানের ওমে ভারী আরাম পেয়ে চোখ বুজল। রসিক বাঙাল একজন তেজি লোক। ভোগীও বটে। কিন্তু কী সুন্দর ঘরদোরের ছিরিছাঁদ! বাসন্তীর সঙ্গে সম্পর্কও ভারী ভাল। এদের কোনও ইগো প্রবলেম নেই। অকারণ চিন্তা নেই, পাপবোধে কষ্ট পায় না।
হাফসাইয়া পড়ছেন নাকি অমলবাবু? একটু শুইবেন?
আরে না। একটু ক্লান্তি লাগছে।
একটু ব্রান্ডি আছে, খাইবেন? মরণের মায়ের লিগ্যা কিন্যা রাখছিলাম। হ্যায় তো একবার চুমুক দিয়াই থু থু কইরা ফালাইয়া দিল। বোতলটা পইড়াই আছে।
অমল মাথা নেড়ে বলল, না, না, থাক। আজ ওসব নয়।
না ক্যান? শরীর একটু গরম হইব।
এই বেশ লাগছে।
শুধু মাছভাজা নয়, সেই সঙ্গে ঘিয়ে ভাজা পরোটা, আলুর দম, বেগুনভাজা সাজিয়ে দিল সামনে বাসন্তী।
এ কী কাণ্ড রে! এত কে খাবে!
খাও অমলদা। রাতে না হয় একটু কম খেও বাড়িতে। আজ প্রথম এলে তো! দাঁড়াও, হাত ধোয়ার জন্য উঠতে হবে না। আমি গামলায় গরম জল আনিয়ে দিচ্ছি, এখানে বসেই হাত ধুয়ে নাও।
কৃতজ্ঞতায়, কুণ্ঠায় এতটুকু হয়ে যাচ্ছিল অমল। এই বাসন্তী, এই রসিক বাঙাল—এইসব তুচ্ছ লোকজনের কোনও খোঁজখবরই তো এতকাল রাখত না অমল। তবে এরা তাকে এত যত্ন করছে কেন!
তুই খুব ভাল আছিস, না রে বাসন্তী?
বাসন্তী ভারী লজ্জা পেয়ে বলে, ভাল থাকার কথা আর বোলো না। সংসারের ঝামেলা কি কম! উনি তো বড়বাজারের দোকান নিয়ে ব্যস্ত। সব বিষয় সম্পত্তি আমার ঘাড়ে।
বাসন্তীর মুখে চাপা অহংকার আর খুশির উজ্জ্বলতা গোপন থাকল না। অমল দেখল। দেখে মুগ্ধ হল। একটু হিংসেও কি হল তার?
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন