শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
গরম ডাইল নাই? গরম ডাইল?
রান্নাঘরের দরজায় এসে বাসন্তী বলে, ডাল ফুটছে। দেব?
আরে আমারে না। খুড়ারে এক বাটি দ্যাও।
এখনও ভাল সেদ্ধ হয়নি যে, ফোড়ন দিতে দেরি হবে।
আরে ফোড়নের কাম কী? এক খাবলা ঘি ঢাইল্যা দিলেই হয়।
ধীরেন কাষ্ঠ আহ্লাদে হাসল। গরম ভালে ঘি হল অমৃত। স্বর্গীয় জিনিস। কিন্তু মুখে ভদ্রতা করতে হয় বলে বলল, না না, এই তো চচ্চড়ি দিয়েই বেশ খাচ্ছি।
রসিক বলে, আরে একটু ডাইলই তো। লজ্জা পান ক্যান? ডাইলটা খুব খাইবেন। ডাইলের মইধ্যে মেলা ভিটামিন আর প্রোটিন।
কথা থামিয়ে রান্নাঘরের দিকে চেয়ে আবার হাঁক মারে রসিক, আগো, আইজ কী ডাইল রানতে আছ?
বাসন্তী বলল, মুসুরি।
তা হইলে তো কথাই নাই। মুসুরি হইল ডাইলের রাজা। ফুটার ডাইল খাইতেও চমৎকার।
ধীরেন কাষ্ঠ খুব হাসে, বাঙাল হল রাজা লোক। এমন দরাজ দিল এ তল্লাটে কখনও দেখেনি ধীরেন। বাঙাল দেশটা কেমন সেটা ভাল জানে না ধীরেন। তবে শুনেছে, সেটা প্রায় মগের মুলুক। বানভাসি, জলকাদার দেশ। সেখানকার লোকগুলো একটু কাটখোট্টা বটে, কিন্তু মনটি খুব সরেস।
বাঙাল দেশে ভাগ্যান্বেষণে যাওয়ার খুব ইচ্ছে ছিল ধীরেনের। মিদ্দার মরার পর যখন তার আগল-পাগল অবস্থা, ঘরে-বাইরে কোথাও শান্তি নেই, বুকের ভিতর সর্বদা হুহু করে মনস্তাপ তখনকার কথা। কাটোয়ায় কিছুদিন আত্মীয়বাড়িতে গিয়ে পালিয়ে ছিল সে। কিন্তু সেটা তো আর পাকা ব্যবস্থা নয়। একদিন ফিরে আসতে হল দেশে। এসে বুঝল, পুলিশের ঝাট কিছু হয়নি। কেউ তার খোঁজখবর বা তল্লাশেও আসেনি। নোটপব মিদ্দার আর তার বউয়ের সঙ্গে তাকে জড়ায়নি কেউ। বুকটার ধুকুর-পুকুর কমল বটে, কিন্তু মাথাটা কেমন পাগল-পাগল হয়ে রইল। নিজের বাড়ি, নিজের গাঁ ভাল লাগছিল না তখন।
মদন সামন্ত বন্ধু লোক। নানারকম ব্যবসা করতে গিয়ে বারবার মার খাচ্ছে। পুঁজিও বেশি ছিল না। মদন তখন বাঙাল দেশে যাতায়াত করছে। সে বলেছিল, ভাবছি ওদিকেই গেড়ে বসব। কিছু জমি কিনতে পারলে না খেয়ে মরার ভয় নেই।
ধীরেন ধরে পড়ল, আমাকেও নিয়ে চল তাহলে।
তুই গিয়ে কী করবি?
যা হোক কিছু করা যাবে। শুনেছি ওটা অন্যরকম দেশ।
তা বটে। কিন্তু গিয়ে হাজির হলেই তো হবে না। আগে থেকে কিছু একটা ভেবেচিন্তে যাওয়া ভাল।
বাঙাল দেশটা দুধ-ভাতের দেশ বলে একটা আবছা কল্পনা ছিল বটে তার। সেটা যে মিথ্যে স্বপ্ন তাও সে বুঝতে পারত। তবু মন দুর্বল হয়ে পড়েছিল বড়। ভেবেছিল, নতুন জায়গায় গেলে কাজকর্ম জুটে যাবে, মাথার পাগল ভাবটাও ঠান্ডা হবে।
মদনের বাড়িতে তখন খুব যাতায়াত। ঘন ঘন মিটিং হচ্ছে দুজনের। কাজের কথা কিছু হত না, আগডুম বাগড়ম নানা ফন্দি আঁটত দুজনে। কারও মাথায় তেমন ঘি ছিল না তো। শুধু কল্পনা ছিল খুব।
তবে মদন চাষবাস-বোঝা মানুষ। বলত, দিনে চাষবাস করব, রাতে নৌকো নিয়ে মাছ ধরতে বেরোব। সেখানে জাল ফেললেই মাছ।
কিন্তু কোথায় শেকড় গাড়বি তা কিছু ঠিক করেছিস?
নাঃ। তবে টাঙ্গাইল জায়গাটা আমার বেশ পছন্দ। সেখানে আমার দাদার এক সম্বন্ধী আছে। বিষয়ী লোক। বলেছে, গেলে ব্যবস্থা করে দেবে।
আমার জন্যে করবে না?
গিয়ে দেখতে পারিস।
তখন ধীরেনের উড়ু-উড়ু অবস্থা। যে-কোনও শর্তেই তখন সে এ-দেশ ছাড়তে রাজি। কিছু টাকাপয়সাও জোগাড় করে ফেলল সে। গাড়িভাড়া আর দু-দশ দিনের খরচ তো কিছু আছেই। তারপর মদনকে তাগাদার পর তাগাদা দিতে লাগল।
প্রথম প্রথম মদনের উৎসাহ ছিল খুব। কিন্তু তারপর হঠাৎই একদিন ভারী লাজুক মুখ করে বলল, ওরে একটু অসুবিধে দেখা দিয়েছে।
কী অসুবিধে?
একটু বাধক হচ্ছে। একজন যেতে দিচ্ছে না।
এ কথায় মাথায় বাজ পড়ল ধীরেনের। দেহটা এখানে পড়ে থাকলেও তার মন বাঙাল দেশেই ঘুরে বেড়াচ্ছে। নানা ছবি ভেসে উঠছে চোখের সামনে। রূপকথার দেশের মতো। সেখানে গিয়ে পড়লেই হয়, সব সমস্যার সমাধান। ভাত-কাপড়, মিদ্দারের ভূত, কপালের ফের, কিছুটি আর নাগাল পাবে না তার।
সে মদনের চোখে চোখ রাখতে গিয়ে দেখল মদনের চোখ পিছলে সরে যাচ্ছে। সেখানে অন্য ব্যাপার।
সে বলল, কে তোকে বারণ করল রে? জ্যোতিষ নাকি?
আরে না। আছে একজন।
খোলসা করে বল। আমাকে এত নাচালি, এখন তুই পিছেলে আমার যে অগাধ জল।
না না, তুই বরং একাই যা। আমি দাদার সম্বন্ধীকে একটা হাতচিঠি লিখে দিচ্ছি।
ভয় পেয়ে ধীরেন বলে, হাতচিঠি দিয়ে কী হবে! ওসবের কোনও দাম নেই। সম্পর্কই বা কী বল। তোর দাদার সম্বন্ধী মানে তো মামার গোয়ালে বিয়োনো গাই। তোর আটকাচ্ছে কোথায়?
মদন ভারি অস্বস্তিতে পড়ে বলে, সে একটা কাণ্ডই হয়েছে।
কী কাণ্ড।
দাদার সম্বন্ধীর ব্যাপারে কয়েকদিন দাদার শ্বশুরবাড়ি মুকুন্দপুরে যাতায়াত করতে হয়েছিল তো!
সে খুব জানি। তুই তো প্রায়ই মুকুন্দপুরে যাস।
হ্যাঁ, সেই কথাই তো। যাতায়াত করতে করতে দাদার ছোট শালি মিনতির সঙ্গে ভারী চেনাজানা হয়ে গেছে। ওই করতে করতে যা হয়। দাদার শাউড়িরও আমাকে ভারী পছন্দ।
তাই বল! আশনাই।
তা একরকম ভাই। মুশকিল কী জানিস, ওদেশে যাব শুনে মিনতি ভারী আপত্তি করছে।
কেন, আপত্তিটা কীসের?
সে এ-জায়গা ছেড়ে যাবে না।
বিয়ে করলেও না?
তাই তো বলছে। মিনতির বাবাও বলছে, আমার ছেলে ওদেশে আছে বটে বাপু, কিন্তু আমি সেটা ভাল বলে মনে করি না। ও না যাওয়াই ভাল।
তুই মেনে নিলি?
কাঁদে যে!
খুবই হতাশ হয়ে পড়েছিল ধীরেন।
তার চোখের সামনেই কয়েক মাসের মধ্যে মদন মিনতিকে বিয়ে করে দিব্যি মুকুন্দপুরে গিয়ে বসবাস করতে লাগল।
ধীরেন তবু তক্কে তক্কে ছিল। বাঙাল দেশ না হোক, দুনিয়াটা তো আর ছোট জায়গা নয়। কোথাও কোথাও চলে গেলেই হল। চলে যাওয়ার ইচ্ছেটা তখন তাকে ভূতের মতো পেয়ে বসেছে। কাউকে ভাল লাগে না, কিছু ভাল লাগে না।
কয়েকজন বন্ধু মানুষের সঙ্গে পৌষের মেলায় হরিহরপুরে গিয়েছিল সে। মাইল দশেক রাস্তা। মেলায় গিয়ে বন্ধুরা সব তাসের জুয়া খেলতে বসে গেল। হরিহরপুরের মেলায় ওইটের খুব চল। ধীরেনের পয়সা নেই, আগ্রহও ছিল না। সে মেলায় ঘুরে ঘুরে বেড়াল খানিক। বেশ জম্পেশ মেলা। ধীরেন দেখতে আর শুনতে বড্ড ভালবাসে। চোখের খোরাক কিছু কম ছিল না সেখানে। জামাকাপড় থেকে শুরু করে খেলনাপাতি। নাগরদোলা থেকে নিয়ে পাঁপড়ভাজা সবই তার কাছে দেখার বস্তু।
দেখতে দেখতেই সে এক ব্যাপারির দোকানে মোমের পুতুল দেখতে দাঁড়িয়ে পড়ল। ছোট, বড় নানা মাপের নানা গড়নের পুতুল। পুতুলে আবার সলতে লাগানো আছে। ইচ্ছে করলে মোমবাতি হিসেবে জ্বালানোও যায়। কে জানে ধীরেনের ভিতরে হয়তো একটু শিল্পবোধও আছে। শিল্পকর্ম দেখতে সে বেশ ভালবাসে। সে দোকানির সঙ্গে ভাব জমিয়ে ফেলল। সে মা কালীর দিব্যি কেটে বলতে পারে, দোকানির সঙ্গে যে কিশোরী মেয়েটি টালুক-টুলুক চারদিকে চাইছিল আর টোপাকুল খাচ্ছিল টুলে বসে তার দিকে একবারের বেশি দুবার তাকায়নি সে।
এ-কথা সে কথার পর সে জানল, দোকানির বাড়ি নদীয়ার গাঁয়ে। সে ভালমানুষের মতো জিজ্ঞেস করল, ওদিকটায় কিছু সুবিধে-টুবিধে হয়?
কীসের সুবিধে বাপু? এদিকও যেমন ওদিকও তেমন।
তা বটে, তবে ইদিকে আমার সুবিধে হচ্ছে না। বাঙাল দেশে চলে যাব ভেবেছিলাম, তাও হল না। এখন ভাবছি ‘জয় মা’ বলে যেদিকে দু চোখ যায় রওনা হয়ে পড়ি।
দোকানি হেসে বলে, তা বাপু, অনেক সময় জায়গার গুণেও কিছু হয়ে পড়ে বইকী। আমার বয়স তো এত হল, অভিজ্ঞতাও কম হল না। মনে হয় কোনও কোনও মানুষের কোনও কোনও জায়গা সহ্য হয় না। অন্য জায়গায় গেলে তাদের ভাগ্যের চাকা ঘুরে যায়।
ধীরেন আশান্বিত হয়ে বলে, আমারও সেরকমই মনে হয়।
তা নদীয়ায় গিয়েও দেখতে পার। বা অন্য কোথাও। তবে বাপু, তাতে হয়রানি বাড়বে। ঘরের খেয়ে লড়াই করা যায়, অন্য জায়গায় গিয়ে আতান্তরে পড়ে গেলে পারবে কি?
টুকটাক পুতুল বিক্রি হচ্ছিল মন্দ নয়। মেয়েটাই বিক্রিবাটা করে পয়সা গুনে নিচ্ছে। বছর পনেরো-ষোলো বয়স, ফ্রক পরা, গায়ে লাল সোয়েটার, দুই বিনুনি ঝুলছে।
ওটা আমার মেয়ে। খুব বাপ-ক্যাংলা। যেখানে যাই সঙ্গে নিয়ে যেতে হয়। তা বাপু, কী করা হয়-টয়?
অনেক কিছুই করে দেখেছি। কিছু তেমন হচ্ছে না।
চাষবাস আছে?
আছে। সামান্য। পেটের ভাতটুকু জোটে।
কারবারে নামতে চাও নাকি?
সে তো খুব ইচ্ছে যায়। কিন্তু টাকা কোথায়?
সেই তো কথা।
এইভাবে আলাপ বেশ জমে গেল।
সন্ধের পর দোকানি হ্যাজাক জ্বেলে দিল, ধূপ-ধুনো লাগাল, হ্যাজাকের আলোয় মেয়েটা যেন হঠাৎ করে ফুটে উঠল। বিকেলের মরা আলোয় তেমন দেখায়নি, এই আলোতে দিব্যি দেখাচ্ছিল। যেন বহুরূপী।
দেখতে ভালবাসে ধীরেন। আর মেয়েটাও ঘন ঘন তাকাতে লাগল তার দিকে। এইভাবেই সব হয়-টয় আর কী।
দোকানির নাম বৃন্দাবন পাল। বলল, মেলার কয়েকদিন আছি। ইদিকে এলে দেখা করে যেও। গল্প-টল্প করা যাবে।
একদিন ফাঁক দিয়ে গেলও ধীরেন। মেয়েটার হ্যাজাকের আলোয় দেখা মুখখানা দুদিন ভুলতে পারেনি। হ্যাজাক বাতির কী জাদু আছে কে জানে!
গিয়ে দেখল, দোকানি সওদা করতে গেছে। মেয়েটা একা দোকান সামলাচ্ছে। মেলার শেষ দিন ছিল সেটা। দোকানে বেশ ভিড়। রমরম করে মোমের পুতুল বিকিয়ে যাচ্ছে। মেয়েটা সামাল দিতে পারছে না। বয়সের মেয়ে দেখে বখাটে ছেলে-ছোকরাও জুটেছিল কয়েকটা।
তা ধীরেনের তখন বেশ শক্ত জোয়ান চেহারা। গায়ের জোরও ছিল মন্দ নয়। সে গিয়ে মেয়েটার পাশে দাঁড়িয়ে যেতেই ভিড়টা একটু একটু করে পাতলা হল।
মেয়েটা কাঁদো কাঁদো মুখে বলল, কতগুলো পুতুল চুরি হয়ে গেছে, জান! চোখের সামনেই পটাপট তুলে নিয়ে গেল। যেই বললুম, দাম দিলে না যে, অমনি বলে, দিয়েছি তো! এই তো গুনে নিলে!
ইস্, আমি একটু আগে এলেই হত।
ভাগ্যিস এলে, নইলে এতক্ষণে সব লুটপাট হয়ে যেত।
মেয়েটাকে ভাল করে দেখল ধীরেন। তখনও দিনের আলো আছে, হ্যাজাক জ্বলেনি। তবু বেশ লেগেছিল দেখতে। ডাগর ফর্সা চেহারা, চোখ দুখানা মিঠে তাতে তখনও রাগ-অভিমান-ভয় মেশানো চাউনি। একটু জলও চিকচিক করছিল চোখে।
ধীরেন ভরসা দিয়ে বলল, আর ভয় নেই। আমি আছি কিছু হবে না।
অবলা নারীকে রক্ষা করা চিরকালই সবল পুরুষের কর্তব্য। মেয়েটা তার দিকে চেয়ে বলল, রোজই ছেলেগুলো আসে, বাবা থাকলে বেশি কিছু করে না। আজ আমাকে একা পেয়ে—
ওরা পাজি ছেলে।
ভীষণ পাজি। কী সব অসভ্য অসভ্য কথা বলছিল শুনিয়ে শুনিয়ে।
তুমি বুঝি সব সময়ে বাবার সঙ্গে থাকো?
না। মাঝে মাঝে। আজকাল মা ছাড়তে চায় না। বড় হচ্ছি তো!
ও, তাও তো বটে।
বাবার একজন কর্মচারী আছে। সব জায়গায় সে বাবার সঙ্গে থাকে। এবার অসুখ করেছে বলে আসেনি।
বড্ড সরল মেয়েটা, নিজের থেকেই অনেক কথা বলে যাচ্ছিল। খুব মন দিয়ে শুনছিল ধীরেন৷
বাড়িতে তোমার কে কে আছে?
মা বাবা দিদি, ছোট দুই ভাই, দাদু আর ঠাকুমা।
ইস্কুলে পড় না?
হ্যাঁ, পড়ি তো। ক্লাস সিক্স-এ।
বাবা বুঝি শুধুই পুতুল গড়েন?
পুতুল আমরা সবাই গড়ি। খুব সোজা। মোম গলিয়ে ছাঁচে ফেলতে হয়। গাঁয়ে আমাদের মুদির দোকানও আছে একটা।
তাহলে তো তোমাদের অবস্থা ভালই।
ওই একরকম।
জমিজমা নেই?
হ্যাঁ, তাও আছে।
গোরু বাছুর?
দুটো দুধেল গাই।
পাকা ঘর?
হ্যাঁ।
তাহলে তো তোমরা বড়লোক।
মেয়েটা লাজুক হেসে বলে, না, না, তা কেন? আমাদের গাঁয়ে বড়লোক হল রায়বাবুরা, মুখার্জিবাবু আর সরকারবাবুরা। তাদের অনেক কিছু আছে।
কী আছে তাদের?
রায়বাবুরা তো খুব বড়লোক। মেলা জমিজমা।
আচ্ছা তোমাদের তো বেশ ভাল অবস্থা, তাহলে তোমার বাবা পুতুল বিক্রি করে কেন?
ওটা বাবার শখ। আমার দাদুর মোমের পুতুলের ব্যবসা ছিল। দাদু এখনও ছাঁচ তৈরি করে দেয়।
প্রায় সন্ধের মুখে বৃন্দাবন ফিরল।
এই যে ধীরেন, এসেছ? আমার একটু দেরি হল।
সঙ্গের দু ব্যাগ মালপত্র নামিয়ে ক্লান্ত বৃন্দাবন একটা শ্বাস ছেড়ে বলল, কালই চলে যাচ্ছি।
হ্যাঁ, আজই তো মেলা শেষ।
তা বাপু, তোমার সঙ্গে একটু কথা ছিল।
বলুন।
কথাটা একটু আবডালে বলতে হবে।
কয়েক পা তফাত হয়ে মেয়ে যাতে শুনতে না পায় এমন দূরত্বে এসে বৃন্দাবন বিনা ভণিতায় বলে ফেলল, বাপু হে, আমার বয়স হচ্ছে, এই মোম দিয়ে পুতুল বানানোর কারবারে আমার আর পোযাচ্ছেও না।
ও। তাহলে কি ব্যবসাটা তুলে দেবেন?
তুলে দিতেও মায়া হয়।
তাহলে?
উপযুক্ত কাউকে পেলে বিদ্যেটা শিখিয়ে ব্যবসা তার হাতে তুলে দিতে পারলে নিশ্চিন্ত হতাম।
সে তো ভাল প্রস্তাব।
তোমাকে আমার খুব পছন্দ।
আমাকে! কিন্তু আমাকে দিয়ে কি হবে?
খুব হবে। ব্যবসাটা খারাপও নয়। খাটাতে পারলে স্বচ্ছন্দে পেট চালাতে পারবে। আমিও সাহায্য করব।
ভেবে দেখি।
ও রে বাপু, ভাবতে বসলে আর কাজ হবে না। আগু-পিছু করতে থাকবে।
বন্দোবস্তটা কী রকম হবে?
বন্দোবস্ত-টস্ত কিছু নেই। সোজাসুজিই বলছি মেয়ে আমার ফ্যালনা নয়।
মেয়ে!
হ্যাঁ। আমার বড় মেয়ে মালতীর কথাই বলছি। এই যে মিনতিকে দেখছ এর চেয়ে দুগুণ সুন্দর দেখতে, আরও ফর্সা। যদি বিয়ে করো তাহলে সব দিক রক্ষে হয়।
বিয়ে! ভ্রূ কুঁচকে খানিক বিয়ে নিয়ে খুব ভাবল ধীরেন। গাঁগঞ্জ জায়গা। লোকে কিছু করার না থাকলে পট করে বিয়ে বসে যায়। ধীরেনের তখনও বিয়ে হয়নি, নানা গণ্ডগোলে মাথায় আসেওনি কথাটা। তবে প্রস্তাবটা পেয়ে তার মনে হল, বিয়ে করলেও হয়তো মনটা অন্য দিকে ঘুরে যেতে পারে। যে কারণে বাঙাল দেশে পালাতে চেয়েছিল সেই একই কারণে বিয়েও করা যেতে পারে। প্রস্তাবটা মন্দ নয়।
ওহে বাপু, বেশি ভেবো না। ভাবনাচিন্তা বড় কৰ্মনাশা। তাতে জীবনে ওই আগু-পিছু চলে আসে। ওতে কাজ ভণ্ডুল হয়।
একটু ভাবতে তো দেবেন মশাই। মাথার ওপর মা-বাবাও আছেন।
শোনো বাপু, মোমের কারবারে আমার পাঁচ হাজার টাকা খাটছে। যদি পুরো ব্যবসাটাই তোমাকে দিই তাহলে বড় কম পাচ্ছ না। হিল্লে হয়ে গেল বলেই ধরে নিতে পারো। আর এ যা মোমবাতি দেখছ এগুলোই তো নয়, আমি গির্জায় সাহেবরা যে মোম জ্বালে তাও বানাই। ব্যবসা ধরে রাখতে পারলে লুটেপুটে খেতে পারবে।
দাঁড়ান, মা-বাবাকে আগে গিয়ে বলি৷
তুমি রাজি তো!
পট করে কী যে বলি!
মোটপর তোমার অমত নেই। কাল সকালে দোকান গুটিয়ে আমি প্রথম তোমার বাড়িতে যাব। তোমার মা-বাবাকে রাজি করিয়ে তবে দেশে ফিরব।
বৃন্দাবন যে কী দেখে তাকে পছন্দ করেছিল কে জানে! দুনিয়ায় কত আহাম্মকই থাকে। ধীরেনের বাবার অবস্থা যে খুব খারাপ ছিল তা নয়। তবে জমিজমার ওপর নির্ভর। নগদ টাকার বিশেষ টানাটানি। একটা পেট বাড়লে খুব ইতরবিশেষ হবে না বটে, কিন্তু নতুন বউয়ের সুখেরও বিশেষ কারণ ঘটবে না। তার ওপর পয়সাওলা ঘর থেকে আসবে।
ধীরেনের দুশ্চিন্তা একটু হচ্ছিল বইকী।
ওই ভাবনাচিন্তার মধ্যেই প্রস্তাব চালাচালি হয়ে গেল। খারাপ প্রস্তাবও তো নয়। মুষলের মতো একটা ছেলে ঘরে বসে বাপের অন্ন ধ্বংস করছে, শ্বশুর যদি হিল্লে করে দেয় তো ভালই।
তা হয়েও গেল বিয়ে।
মালতী দেখতে কিছু খারাপ নয়। রং ফর্সার দিকেই। নাকটা একটু থ্যাবড়া না হলে আরও ভাল হত।
বিয়ের রাতেই মালতী জিজ্ঞেস করেছিল, মদগাঁজার নেশা নেই তো!
না, আমার নেশা নেই। থাকলে কি তোমার বাপ বিয়ে দিত আমার সঙ্গে?
বাবা কি সব খবর নিয়েছে?
নেশা থাকলে কী করবে?
নেশারু লোক আমি সইতে পারি না। নেশা দেখলে বাপের বাড়ি চলে যাব।
কথাটা বিয়ের আগে জানতে চাইলে ভাল করতে।
বিয়ের আগে মেয়েদের কিছু জানতে দেওয়া হয় নাকি? পুঁটুলি পাকিয়ে এনে ফেলা হয় ছাঁদনাতলায়।
ও বাবাঃ! তুমি যে বেশ কটর কটর কথা কও।
হ্যাঁ, আমার সব পষ্টাপষ্টি কথা।
জ্বালাবে দেখছি! ফুলশয্যার রাতেই এত স্পষ্ট কথা!
সব জেনেবুঝে নেওয়া ভাল।
আর কী জানতে চাও?
মেয়েমানুষের দোষ নেই তো!
থাকলে?
থাকলে মুশকিল হবে।
ধীরেন একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। বউকে তার ভারী অপছন্দ হতে লাগল প্রথম থেকেই।
সে বলল, দোষঘাট কোন মানুষের না থাকে বলো! মেয়ে পুরুষ সবার থাকে।
তার মানে আছে।
আমি কি তাই বললুম?
তাহলে পষ্ট করে বললে না কেন যে তোমার মেয়েছেলের দোষ নেই?
বললেই তুমি মেনে নেবে?
বলেই দেখ না!
শোনো মালতী, আমার একটা মানসম্মান আছে। পায়ে ধরে সেধে তো বিয়ে করে আনিনি। তুমি যদি অতই সতী তবে বাপকে বললে না কেন বিয়ের আগে খোঁজখবর নিতে!
বলেছি৷ বাবা পাত্তা দেয়নি। কোন মেলায় তোমাকে দেখেই বাবার পছন্দ হয়ে গিয়েছিল৷
সেখানে তোমার বোন মিনতিও ছিল।
মিনতি ছেলেমানুষ, সে কী বুঝবে?
তাহলে এখন আর বোঝার কিছু নেই। আমি মাতাল বা চরিত্রহীন যাই হই, তোমার স্বামী।
ওটাই কি তোমার জোর? স্বামী বলেই মাথা কিনে নিয়েছ?
আমি কিনতে যাইনি। তোমার বাবা গছিয়েছে। তুমি একটি গেছে মেয়েছেলে।
ফুলশয্যার রাত্রিটা ঝগড়া করেই কেটেছিল দুজনের। আদর সোহাগের নামগন্ধ ছিল না।
তবে একথা সত্যি যে মেয়েদের গতিই বা আর কী। সে আমলে স্বামী ছেড়ে চলে যাওয়ার হিম্মৎই বা কটা মেয়ের ছিল?
সুতরাং মালতীর সঙ্গে তার ভাবও হল দু-চারদিন পরে। গৃহত্যাগ করার ইচ্ছেটাও ধামাচাপা পড়ে গেল।
ধীরেন ভাবে বৃন্দাবন হঠাৎ উদয় না হলে তার জীবনটা অন্য খাতে বইতে পারত। গৃহত্যাগ করে সে হয়তো একদিন এক কেষ্টুবিষ্টু হয়েই ফিরে আসত। এরকম তো কতই হয়।
এতকাল নানা ঝড়ঝাপটা সয়েও মালতীও আছে, সেও আছে, ছেলেপুলেও আছে। তবে সব মিলিয়ে ভাল কিছু হয়ে উঠল না।
এক বাটি ধোঁয়া ওঠা গরম ডাল একটা স্টিলের প্লেটে বসিয়ে নিজেই নিয়ে এল বাসন্তী। হলুদ ডালের ওপর অনেকটা ঘিয়ের দলা ভেসে আছে।
হেঃ হেঃ করে হেসে ধীরেন বলে, ওঃ গন্ধটা যা ছেড়েছে।
খান খুড়া, খান। আগো, আরও দুইখান রুটি দাও খুড়ারে। খুড়া খাইতে ভালবাসে।
আরে না না, রুটি তো আছে।
আরে, লজ্জা কীসের? পেট ভইরা খান।
ধীরেনকে আর বলতে হল না।
উঠোনের ওধারে সুমন চাপা স্বরে মরণকে জিজ্ঞেস করে, লোকটা কে রে?
ও হল কাষ্ঠ জ্যাঠামশাই। রাস্তায় ঘাটে আমরা ওকে ক্ষ্যাপাই।
পাগল নাকি?
কী জানি।
তবে ক্ষ্যাপাস কেন?
একটু কেমন যেন। ছেঁড়া ময়লা জামাকাপড় পরে ঘোরে। একটু লোভী আছে।
এখানে আসে কেন?
বাড়িতে খেতে পায় না তো। গরিব।
খুব গরিব?
তা জানি না। কাষ্ঠ জ্যাঠামশাইকে কেউ পাত্তা দেয় না।
হ্যাঁ রে, বাবা ওকে কাকা ডাকে, তুই তাহলে জ্যাঠা ডাকিস কেন?
কাঁচুমাচু হয়ে মরণ বলে, সবাই ডাকে বলে আমিও ডাকি। ডাকের খুব গোলমাল এখানে।
হঠাৎ হঠাৎ অন্যমনস্ক হয়ে যাওয়া সুমনের একটা স্বভাব। কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে রইল বেভুল হয়ে। তারপর বলল, চল বেড়িয়ে আসি।
দাঁড়াও, মাকে বলে আসি।
সুমন হঠাৎ একটু গম্ভীর মুখ করে বলে, আমিও কিন্তু তোর একজন গার্জিয়ান। আমার সঙ্গে গেলে তোর মা কিছু বলবে না।
তা ঠিক। সুমন যেন গুরুঠাকুরটি। তার প্রতিটি কথাকেই মা ভীষণ গুরুত্ব দেয়। তবু মুখটা মলিন হল মরণের। দাদা এই মাত্র বলল ‘তোর মা’। এটা কানে খট করে বড় লাগল মরণের। দাদা তো শুধু ‘মা’ বললেই পারত।
আজও দাদা তার মাকে ‘মা’ বলে ডাকেনি।
রাস্তায় বেরিয়ে মরণ বলল, আজ কোন দিকে যাবে দাদা?
ওই দিকটায়।
বলে যে দিকটায় দেখাল সে দিকটায় তারা রোজই যাচ্ছে আজকাল। ও পথটা পান্নাদিদের বাড়ির কাছ ঘেঁষে গেছে। দাদা আজকাল এই পথটাই বেশি পছন্দ করে।
দিন পাঁচ-সাত আগে পান্নাদি জ্বর থেকে উঠে মলিন মুখে জানালায় দাঁড়িয়ে ছিল।
দাদা দেখে বলল, কে রে মেয়েটা?
ও তো পান্নাদি।
কী করে?
পান্নাদি! ওঃ পান্নাদি খুব ভাল ছাত্রী। গান গায়, নাচে, নাটকে পার্ট করে।
তাই নাকি?
হ্যাঁ।
কার মেয়ে বল তো।
রামহরি জ্যাঠার মেয়ে। আলাপ করবে?
না থাক।
আমার সঙ্গে খুব ভাব কিন্তু।
তোর সঙ্গে তো দেখছি বিশ্বসুন্ধু সকলের ভাব!
হ্যাঁ। আমি তো পান্নাদিদের বাড়ির নারকোল পেড়ে দিই।
অন্যের ফাই-ফরমাশ খাটিস কেন? তুই কি ওদের চাকর?
কথাটা বুঝতে পারল না মরণ। লোকে কিছু বললে সে করে দেয়। এটাই রেওয়াজ। তার সঙ্গে চাকরের কী সম্পর্ক। দাদার রাগের কারণটা বুঝতে না পারলেও মরণ আর একটা জিনিস বুঝতে পারে যেটা তার বোঝার কথা নয়। সে বুঝতে পারে, তার এই শহুরে দাদাটি পান্নাদিদের বাড়ির সামনে দিয়ে আনাগোনা করতে পছন্দ করে।
পান্নাদি একদিন তাকে ডেকে বলেছিল, তুই আজকাল কার সঙ্গে ঘুরে বেড়াস রে? ছেলেটা কে?
ওমা চেনো না! ওই তো আমার দাদা।
পান্না অবাক হয়ে বলে, দাদা! তোর আবার দাদা কোত্থেকে এল?
বাঃ, আমার কলকাতার দাদা!
বুঝতে তবু একটু সময় লেগেছিল পান্নার। খানিকক্ষণ অবাক হয়ে চেয়ে থেকে হঠাৎ হেসে ফেলেছিল, ওঃ তাই তো! ও বোধহয় তোর বড়মার ছেলে, তাই না!
হ্যাঁ তো। দেখতে সুন্দর না?
হ্যাঁ, বেশ দেখতে। দাদাকে পেয়ে খুব আনন্দ বুঝি তোর! তাই আজকাল আর আসিস না।
তা নয় পান্নাদি। আজকাল বাবা প্রায়ই চলে আসে তো, তাই।
তোর দাদা কী করে?
পড়ে। কলেজে।
কী পড়ে?
বি এসসি বোধহয়। ঠিক জানি না। একদিন নিয়ে আসব।
আনিস।
পান্নাদির কথা সে দাদাকে বলেও দিয়েছিল পরে। তখন লক্ষ করল, দাদার মুখে একটু হাসি খেলা। করে গেল আর উজ্জ্বল হল দুটো চোখ।
এসব সে আজকাল বুঝতে পারে, যদিও এসব তার বোঝার কথা নয়। না বোঝার ভান করেই থাকতে হয় তাকে। কিন্তু ভিতরে ভিতরে সে সব বুঝতে পারে।
দাদা আজও পান্নাদিদের বাড়ির পাশ দিয়ে যাবে এবং আসবে। কিন্তু পান্নাদি জানালায় দাঁড়িয়ে থাকে না। দাদা একটু যেন হতাশ হয়। তার ইচ্ছে করে পান্নাদিকে গিয়ে বলতে, আমি যখন দাদাকে নিয়ে তোমাদের বাড়ির পাশ দিয়ে যাব তখন তুমি একটু জানালায় দাঁড়িয়ে থেকো।
পান্নাদি তখন হয়তো অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করবে, কেন রে?
তখন সে মুচকি হেসে পালিয়ে আসবে।
এসব আগে সে বুঝত না। এখন বুঝতে পারে। তার সামনে একটা নতুন পৃথিবী জেগে উঠছে। তাতে সে খুশি হয় তা নয়। বরং অনেক সময় তার ভিতরে একটা যন্ত্রণা হয়।
একদিন সে তার মা আর বাবাকে মধ্যরাতে দেখে ফেলেছিল। ঘর অন্ধকার ছিল তবু দেখে ফেলেছিল। ভয়ে শ্বাস বন্ধ করে ছিল সে। কী করছে ওসব বাবা আর মা! এঃ মা। ওসব করতে হয়? বাবাকে তার খুন করতে ইচ্ছে হয়েছিল সেদিন।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন