শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
ওই দেখুন, ভারতসুন্দরী মিস ইন্ডিয়া দাঁড়িয়ে আছে এক মোহিনী বিভঙ্গে। কাঁধ থেকে কোমর অবধি লম্বমান সোনালি ম্যাশ, তাতে সমুদ্রনীল রঙের অক্ষরে লেখা “মিস ইন্ডিয়া..”। ভারী রূপবতী মেয়ে। দীর্ঘকায়া, নির্মেদ। চোখে বৌদ্ধিক আলো আর কলঙ্কহীন দাঁতে শ্বেতশুভ্র হাসি।
কী বললেন! ভোগ্যপণ্য? আপনি দোষদৃষ্টিপরায়ণ বলেই কি একথা বলছেন না? আপনার সৌন্দর্য দেখার চোখই নেই। শুনুন মশাই, সৌন্দর্যের সবটুকুই শুধু শরীরীনয়, শরীরের অতিরিক্ত কিছুও নিশ্চয়ই আছে। সেইটে উপভোগ করুন। মেয়েটিকে ভাল করে লক্ষ করুন, ওকে ঘিরে কি এক আশ্চর্য চৌম্বক- বলয় রচিত হয়নি?
একজন রসিক বিচারক ওকে প্রশ্ন করেছিল, হে সম্ভাব্য ভারত সুন্দরী, আপনি ভূত ও আরশোলার মধ্যে কাকে বেশি ভয় পান?
সুন্দরী সহাস্যে বলেছিল, আরশোলাকে।
আর একজন বিচারক প্রশ্ন করে, দুজন পুরুষ মানুষের মধ্যে একজন খুব একটা সুন্দর নয়, খুব একটা চালাক-চতুর বা চটপটে নয়, খুব মানিয়ে-গুছিয়ে চটকদার কথা বা জোক্স বলতে পারে না, কিন্তু সে খুব সৎ, সত্যবাদী, চরিত্রবান। আর একজন চৌখশ, চালাক, বেশ স্মার্ট, মাচো হ্যান্ডসাম চেহারা, কথাবার্তায় খই ফুটছে, কিন্তু সে ঘুষখোর, মিথ্যেবাদী এবং লম্পট। এ দুজনের মধ্যে যদি একজনকে বেছে নিতে হয় তবে আপনি কাকে নেবেন?
একটু মিষ্টি হেসে সুন্দরী বলেছিল, দুজনের মধ্যে যার টাকা বেশি আমি তাকেই বেছে নেব।
কী বিপুল হাততালি পড়েছিল শুনেছেন? কী চোখধাঁধানো জবাব বলুন তো! জবাবটা কি আপনার পছন্দ হল না? না! টাকা জিনিসটাকে কি আপনি পুরুষের সর্বোত্তম গুণ বলে মনে করেন না? আশ্চর্য মশাই, আপনি নিতান্তই সেকেলে লোক দেখছি! এরপর আবার বর্ণাশ্রমের কথাও তুলবেন নাকি? বস্তাপচা সব ধারণা নিয়ে বসে থাকলে এই শৃঙ্খলমুক্ত মানসিকতার যুগকে আপনি বুঝবেন কী করে? মেয়েটা কী ভীষণ প্র্যাকটিক্যাল, স্মার্ট এবং ডাউন টু আর্থ বলুন তো!
কী বললেন! এই শরীর-দেখানো, কটাক্ষ-মদির সৌন্দর্য প্রতিযোগিতা একধরনের বিপণন! তার মানে কী মশাই? বিপণন কথাটা আসছে কোথা থেকে? মার্কেটিং-এর বঙ্গানুবাদ নাকি? তার মানে আপনি কী ইঙ্গিত করছেন বলুন তো! ঝেড়ে কাশুন তো মশাই। ঘুরিয়ে ফিরিয়ে কি বলতে চাইছেন এটা একধরনের সূক্ষ্ম বেশ্যাবৃত্তি? শুনুন মশাই, এখন যৌনকর্মীরাও মেইনস্ট্রিমে চলে আসছে। তারাও এখন আর আলাদা কিছু নয়। তাদের এখন এক ধরনের শ্রমজীবী বলেই ধরা হয়। সুতরাং আপনার ওরকম কটাক্ষ করাটা মোটেই যুগোপযোগী হচ্ছে না।
আপনি একটা অদ্ভুত লোক মশাই, এঁড়ে তর্কের ওস্তাদ। যৌনকর্মী কথাটার তাৎপর্য স্বীকার করতে চাইছেন না তো! বলতে চাইছেন নাম বা অভিধা পালটে দিলেই বিষয়বস্তুটা পালটে যায় না? আপনার মতে বারাঙ্গনা বা বারবধূ যৌনকর্মীর চেয়ে অনেক ভাল শব্দ! এই প্রসঙ্গে আপনি হরিজন শব্দটিও লক্ষ করতে বলছেন আমাকে! অন্ত্যজ শ্ৰেণীকে মর্যাদা দিতে গান্ধীজি যে হরিজন শব্দটা ব্যবহার করেছিলেন তাতে মোটেই তাদের সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি পায়নি!
কী বললেন? বেশ্যাদের যৌনকর্মী আখ্যা দিয়ে আদিখ্যেতার চেয়ে তাদের নিয়মিত ডাক্তারি পরীক্ষা, চিকিৎসা, মাসি ও গুণ্ডা তোলাবাজদের হাত থেকে বাঁচানোর ব্যবস্থা করা অনেক বেশি জরুরি? আহা, আস্তে আস্তে হবে, সব হবে। আগে মর্যাদা দিতে শিখুন তো, তারপর চিকিৎসা ইত্যাদিও হতে থাকবে! দেশে এখন একটা নবজাগরণ শুরু হয়েছে। মানুষ সচেতন হচ্ছে। ভাল-মন্দের নতুন বিন্যাস শুরু হয়েছে।
আচ্ছা মশাই, আচ্ছা, আমি মেনে নিচ্ছি যে নবজাগরণ কথাটা একটু বাড়াবাড়ি হয়ে গেছে। তবে এটা তো মানবেন যে পুরনো মূল্যবোধগুলি ধীরে ধীরে পালটে যাচ্ছে। যেমন ধরুন, পৃথিবীতে নাস্তিকের সংখ্যা বাড়ছে। ধরুন, জাতপাত বর্ণাশ্রম এসব আজকাল আর তেমন মানতে চাইছে না কেউ। মেয়েরা আবদ্ধ থাকতে চাইছে না সতীত্বের সংজ্ঞায়। পাপ বা বিকৃতি বলে ধরা হচ্ছে না সমকামিতাকে। আপনি মানতে না চাইলেও এসব তো ঘটছে। এগুলো কি প্রগতির লক্ষণ নয়?
নয়? জানতাম আপনি এসব বুঝতে চাইবেন না। তর্ক থাক, আসুন আমরা ওই সুন্দরী নারীটির সৌন্দর্য কিছুক্ষণ অবলোকন করি। আমাদের ভাঁটিয়ে-যাওয়া যৌবনের জন্য একটু শোক হবে হয়তো। তা হোক। শরীর বুড়ো হয় বটে, কিন্তু মন তো হয় না। ওই সৌন্দর্য আমাদেরও স্পর্শ করে।
কী বললেন? একজন নরখাদক বাঘের কাছে ভারতসুন্দরীর সৌন্দর্যের কোনও আবেদন নেই? শুধু রক্তমাংসের লোভ আছে। কী বীভৎস চিন্তা আপনার! ধন্যি মশাই, এমন চমৎকার এক সন্ধ্যায় হঠাৎ আপনার নরখাদকদের কথা মনে হল কেন? আপনি দর্শকদের মধ্যে সেই নরখাদকদেরই দেখতে পাচ্ছেন বলে? না মশাই, সত্যিই আপনাকে নিয়ে পারা যায় না…
পাশের ঘরে একটা খুটখাট শব্দ হচ্ছিল। কে যেন তালা খুলে ঘরে ঢুকল। একটু গলাখাঁকারির শব্দ। মেয়েলি গলা। ঘরটা বন্ধই থাকে। তবে কি কাজের মেয়েটা ঘর পরিষ্কার করতে ঢুকেছে?
চিন্তার সূত্রটা ছিড়ে যাওয়ায় অমল কলমটা রেখে দিয়ে চেয়ারে বসেই আড়মোড়া ভাঙল। শরীর দুর্বল লাগছে। সকালে দুবার চা খেয়েছিল সে, আর কিছু খায়নি। টেবিলের একপাশে এখনও জলখাবারের প্লেটটা পড়ে আছে যা স্পর্শও করেনি সে। দুটো মাখন মাখানো টোস্ট, ডিম সেদ্ধ আর দুটো কলা। খেতে ইচ্ছে হয়নি, তারপর ভুলেও গেছে। এখন খিদেয় পেট জ্বলে যাচ্ছে তার।
ঘড়ি দেখে একটু অবাক হল অমল। বেলা পৌনে একটা। এখনই বউদি খেতে ডাকবে নীচে। কয়েকটা মাছি উড়ে উড়ে বসছে টোস্ট আর ডিমের ওপর। সে প্লেটটা তুলে নিয়ে পিছনের বারান্দায় এসে নীচে আগাছার জঙ্গলে খাবারগুলো ফেলে দিল। ভূতভুজ্যিতে লাগুক। কাক-কুকুরেরা সন্ধান করে ঠিক খেয়ে নেবে।
গায়ে বহুকাল তেল মাখে না সে। ছেড়েই দিয়েছে ওসব। বড়জোর স্নানের পর একটু ক্রিম জাতীয় কিছু মেখে নেয় হাতে, পায়ে, মুখে। তার বড় শুস্ক শরীর, সহজেই খড়ি ওঠে গায়ে, ঠোঁট ফাটে। শরীরে স্নেহজাতীয় পদার্থের অভাবই হবে হয়তো। শরীরে আরও অনেক অভাব নিশ্চয়ই রয়েছে তার। কে সেসবের খবর রাখে? এখানে ক্রিম-ট্রিম নেই বলে তার শরীরে প্রায় বিভূতির মতো খড়ি উঠেছে। ঠোঁট ফেটে প্রায়ই রক্তের স্বাদ পায় জিভে। চুল ছাটতে খেয়াল থাকে না বলে লম্বা চুল ঘাড় অবধি নেমেছে। মাথা চুলকোয়ও খুব। উকুন হয়ে থাকতে পারে। বা খুসকি। কে জানে কী। নিজের দিকে বহুকাল নজর দেওয়া হয়নি।
পিছনের বারান্দার কোণে ত্রিভুজের মতো এক টুকরো রোদে দাঁড়িয়ে থাকে অমল। স্নান করতে হবে। বড্ড শীত। ঠান্ডা জল গায়ে ঢালতে হবে ভাবলেই যেন শরীর সিরসির করে।
একটা শব্দ পেয়ে আনমনা চোখ ঘুরিয়ে লম্বা বারান্দায় অন্য প্রান্তে সে একজন ফর্সা মহিলাকে দেখতে পেল। নীল শাড়ি, তার ওপর কাশ্মীরি শাল। দেখতে বেশ সুন্দরীই মনে হল।
কেমন আছ?
প্রশ্ন শুনে বেশ কুঁকড়ে গেল অমল। কী লজ্জা! এ তো মোনা!
আমাকে দেখে কি ভয় পেলে নাকি?
অপরাধবোধ, লজ্জা, ভয় সব একসঙ্গে চেপে ধরল অমলকে। হঠাৎ বড্ড ঘাবড়ে গেছে সে। একটু ক্যাবলা হাসি হাসতে গিয়ে ফাটা ঠোঁট চড়াক করে আরও একটু ফেটে গেল। এক ফোঁটা রক্ত গড়িয়ে নামল ঠোঁট থেকে থুঁতনি বেয়ে। আলোয়ানটা তুলে ঠোঁট চেপে ধরল সে।
এমনভাবে চেয়ে আছ যেন চিনতেই পারনি!
ভারী অপ্রস্তুত অমল বলে, আরে না না, চশমাটা চোখে নেই বলেই বোধহয়—
চশমা তো তোমার চোখেই রয়েছে।
ওঃ হ্যাঁ। তাও বটে। কী আশ্চর্য! কখন এলে?
এই মাত্র।
কেউ বলেনি তো আমাকে!
বললে কী করতে? আহ্লাদে নেচে উঠতে?
তা নয়। আসলে আমি একটু অন্যমনস্ক ছিলাম হয়তো!
সে তো দেখতেই পাচ্ছি। কার কথা ভাবছিলে?
আরও ঘাবড়ে ভয় খেয়ে অমল বলে, না তো! কারও কথাই ভাবছিলাম না তো! একটু লেখালেখি করছিলাম তো! তাই বোধহয়—
তুমি কি সাহিত্যিক হওয়ার চেষ্টা করছ?
পাগল নাকি! ওসব নয়। এটা একধরনের ক্যাথারসিস। ওই যে কী বলে যেন, মোক্ষণ না কী যেন।
আমি আজই চলে যাব। তোমার সাহিত্য সাধনায় বাধা দিতে আসিনি।
কী বলবে ভেবে না পেয়ে অমল বলল, ও, আচ্ছা।
আমি তোমাকে খুঁজতেও আসিনি, ফিরিয়ে নিয়ে যেতেও আসিনি।
বিপন্ন অমল তার ভীত চোখে চেয়ে থাকে মোনর দিকে। তার গালে কয়েক দিনের দাড়ি, প্রায় জটবাঁধা চুল, আধময়লা পোশাকে মোনার সামনে নিজেকে খুব নিম্নস্তরের জীব বলে মনে হচ্ছে তার। বড় অপরাধবোধও হতে থাকে।
তুমি আমাদের কাছ থেকে দূরে থাকতে চাও?
অমল আবার ঘাবড়ে গিয়ে বলে, না না, কে বলেছে ওসব?
কেউ বলেনি, তোমার আচরণই বলছে।
অমল কথা খুঁজে না পেয়ে মাথা নিচু করে।
পালিয়ে আসার দরকার ছিল না।
অমল দ্রুত ভাববার চেষ্টা করছে। এই আকস্মিক আক্রমণের বিরুদ্ধে তার কোনও পূর্বপ্রস্তুতি ছিল না। তাই কথা আসছে না মুখে। নিজের অস্বাভাবিক আচরণের সপক্ষে কোনও যুক্তিও খুঁজে পাচ্ছে না সে। তার মাথা আজকাল কাজ করে না। তার রিফ্লেক্স বলে কিছু নেই।
সে অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসহীন গলায় বলার চেষ্টা করল, না ঠিক পালিয়ে নয়। কী যে একটা ব্যাপার হল, আমি ঠিক জানি না।
তুমি না জানলেও আমি জানি। তুমি আমার হাত থেকে মুক্তি চাইছ! তাই তো!
না, তা বলিনি।
তুমি কী বলবে তা তুমিই জান। আমিও তোমার হাত থেকে রেহাই চাইছি।
অ্যাঁ? বলে অমল হাঁ করে চেয়ে থাকে।
তুমি কবি-সাহিত্যিক হবে না দার্শনিক হবে তা নিয়ে আমার একটুও মাথাব্যথা নেই। কিন্তু তোমার ছেলে-মেয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে কিছু ভেবেছ?
ছেলে-মেয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে কী ভাববে তা কেউ প্রম্পট করে দিলে সুবিধে হত অমলের। সে ভেবেই পেল না ছেলেমেয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে এই শীতের দুপুরে তাকে মাথা ঘামাতে হবে কেন?
সে নির্বোধের মতো চেয়ে রইল।
এর পর যখন-তখন তোমার উধাও হয়ে গেলে তো চলবে না। কারণ আমি তোমার ঘরদোর সংসার আগলে পড়ে থাকতে পারছি না। আমাকে আমার পথ দেখতে হচ্ছে। ছেলে-মেয়ের ভার তোমাকেই নিতে হবে। তুমি সক্রেটিস হবে না শেকসপিয়র হবে তা জানি না, কিন্তু ওদের দায়িত্ব তোমাকেই নিতে হবে। আই অ্যাম লিভিং ফর এভার।
অপমানিত নয়, বরং ভারী উদ্বিগ্ন হয়ে উঠল অমল। কিছুক্ষণ মোনার মুখের দিকে চেয়ে থেকে বলল, কোথায় যাচ্ছ?
সেটা ইর্রেলেভেন্ট। আমার যাওয়ার অনেক জায়গা আছে।
অমল সঙ্গে সঙ্গে একমত হয়ে বলল, সে তো বটেই।
তুমি কয়েক বছর আমাকে আশ্রয় দিয়েছিলে বলে অনেক ধন্যবাদ। কিন্তু তুমি ছাড়াও আমার যে আশ্রয় আছে এটা তোমার জানা দরকার।
অমল মাথা নেড়ে জানাল যে এ ব্যাপারেও সে একমত।
আমি উকিলের সঙ্গে পরামর্শ করে এসেছি। মিউচুয়াল ডিভোর্সের কাগজপত্রও সব তৈরি হয়েছে। তুমি কলকাতায় ফিরে গিয়ে সইসাবুদ করে দিয়ে এসো।
ডিভোর্স! বলে আবার হা হল অমল। মাথার ভিতরে একটা বজ্রপতনের মতো শব্দ হল। তার ফুলকিও যেন দেখতে পেল সে। মাথাটা কেমন ঝিমঝিম করছে তার। টলে উঠে হাত বাড়িয়ে রেলিং চেপে ধরল অমল।
হ্যাঁ, ডিভোর্স। অবাক হওয়ার তো কিছু নেই! তুমি তো মনে মনে দূরে সরেই গেছ। আইনের সেপারেশন তো তার চেয়ে বেশি কিছু নয়। তোমার মন যা চাইছে সেটাকেই লিগালাইজ করে নেওয়া।
অমল যে বুঝতে পারছে না তা নয়। আবার বুঝতে পাবছে বললেও ভুল হবে। ধারালো তলোয়ারের মতো সামনে লকলক করছে মোনা। তার সর্বাঙ্গে ধার, চোখে ধার, মনে ধার, কথায় ধার। কতখানি ক্ষতবিক্ষত হল তা নিজেও বুঝতে পারছে না অমল। শুধু ঠোঁট থেকে রক্ত মুছতে গিয়ে জিবে নোনতা স্বাদ পায় সে।
ক্লিষ্ট, মার-খাওয়া জন্তুর মতো সে বোধহীন চোখে চেয়ে থেকে অনেকক্ষণ বাদে বলে, ডিভোর্স।
হ্যাঁ। কথাটা কি নতুন শুনলে!
এইবার অমল অদ্ভুতভাবে বলে উঠল, একটু নতুন লাগছে।
সে কী! নতুন লাগার মতো কথা তো নয়!
অমল নিজেকে সামলাতে রেলিং ছেড়ে দেয়ালে পিঠ দিয়ে দাঁড়াল। তার হাঁফ ধরছে কেন কে জানে। বলল, নতুন নয়, বড় আকস্মিক।
কাব্য করে লাভ নেই। তুমিও তো এটাই চাইছিলে!
অমল নেতিবাচক মাথা নাড়ল, কিন্তু জবাব দিল না।
ডিভোর্স পেলেই বা তোমার কী সুবিধে হবে তা জানি না। যে বিদ্যাধরীর জন্য তুমি সংসার ছেড়ে এখানে পালিয়ে এসেছ সেও তো দুটো বাচ্চার মা, সে কি স্বামী ছেড়ে তোমাকে নিয়ে থাকতে রাজি হয়েছে?
অবাক অমল বলে, কে? কার কথা বলছ?
আকাশ থেকে পড়লে নাকি? জান না কে?
মোনার পিছনে বউদি এসে দাড়িয়েছে। হাত বাড়িয়ে পিছন থেকে মোনার কাঁধটা ধরে বলল, ওসব কথা পরে হবে ভাই। এখন এসো তো আমার সঙ্গে।
মোনা একটু ঝাঁঝের গলায় বলে, কোথায় যাব?
এতটা রাস্তা এসেছ, পরিশ্রম তো কম হয়নি। একটু জিরিয়ে নাও আগে। কথা তো পরেও হতে পারবে। ধুলো-পায়ে ওসব এখন বলতে হবে না।
বউদির বলাটার মধ্যে একটা দীন ভাব ছিল। ভারী নরম গলায় বলা। মোনা কী ভাবল কে জানে, একবার অমলের দিকে চোখ হেনে চলে গেল।
শরীরটাকে সামলাতে একটু সময় নিল অমল। আজকাল তার কী হয়েছে কে জানে, একটু উত্তেজনার ব্যাপার হলেই শরীর কাঁপতে থাকে, মাথা টাল খায় এবং দুর্বল লাগতে থাকে।
একরকম টাল খেতে খেতেই সে ঘরের লাগোয়া বাথরুমে এসে ঢুকল। স্খলিত হাতে আলোয়ানটা খুলে রডে রাখতে গেল সে, পারল না। আলোয়ানটা পড়ে গেল মেঝের ওপর। সেটা আর তুলল না সে। একইভাবে গায়ের সোয়েটার, জামা আর পায়জামা ছেড়ে রডে ঝুলিয়ে রাখার চেষ্টা করল। পায়জামাটা ঝুলে রইল বটে, জামা আর সোয়েটার খসে পড়ল নীচে। পড়েই রইল।
শীতকালে শাওয়ারে চান করতে বড় কষ্ট। শরীরে যেন লক্ষ ছুঁচ ফোটার যন্ত্রণা হয়। কিন্তু মগে করে গায়ে জল ঢালার সাধ্যই নেই অমলের। মগ জলে ডুবিয়ে ভোলাও যেন অগাধ পরিশ্রমের কাজ। সে শাওয়ার ছেড়ে ঝরনা জলের নীচে দাঁড়াল। প্রচণ্ড ঠান্ডা জলে তার শরীর শিহরিত হতে লাগল। অবশ হয়ে যেতে লাগল।
জলের ঝরোখার নীচে দাঁড়িয়ে সে আবছায়া বাথরুমটা দেখতে পাচ্ছিল। গ্রামদেশে কেউ এত মহার্ঘ্য বাথরুম করে না। ছেলেবেলায় তারা কতবার মাঠঘাটে মলত্যাগ করতে গেছে, স্নান করেছে পুকুরে বা খালে। শখ করে দোতলায় এই অ্যাটাচড বাথ তৈরি করিয়েছে সে নিজের খরচে। ডিজেল পাম্প বসিয়েছে, ওভারহেড ট্যাঙ্কও। সব বড্ড অর্থহীন মনে হচ্ছে তার কাছে।
সে কি এরকমই চেয়েছিল? তাও এই দুর্বল মাথায় বুঝতে পারছে না অমল? মানুষের অবচেতনে অনেক বাসনা থাকে। হয়তো অমলেরও ছিল। ঝগড়ার সময় কতবার তারা ডিভোর্সের কথা বলেছে, কতবার। কিন্তু এরকম কঠিন, প্রস্তুত হয়ে তো কখনও শেষ সিদ্ধান্ত জারি করা হয়নি। ঝগড়ার পর আবার ডিভোর্সের কথা ভুলে গেছে তারা। এ তো তা নয়। মোনা সিদ্ধান্ত নিয়েই এসেছে।
অনেকক্ষণ ঠান্ডা জলের নীচে দাঁড়িয়ে থাকে অমল। তার হয়তো সর্দি হবে, জ্বর হবে, নিউমোনিয়া হবে। হোক। তার এখন নিজের জন্য কোনও ভাবনা হচ্ছে না। তার যা খুশি তোক।
কতক্ষণ গেল কে জানে। হঠাৎ দরজায় ধাক্কার শব্দ হল।
মেজদা! এই মেজদা!
সচকিত অমল বলল, কে?
আমি সন্ধ্যা। কতক্ষণ ধরে চান করছিস?
মাথাটা গরম লাগছে।
ঠান্ডা লাগবে যে! বেরিয়ে আয় এবার।
যাচ্ছি।
কলটা বন্ধ কর।
করছি।
অমল কল বন্ধ করল। তোয়ালে দিয়ে মাথা, গা মুছল। পায়জামা পরে জামা আলোয়ান কুড়িয়ে নিতে গিয়ে দেখল সেগুলো একদম ভিজে গেছে।
বাথরুম থেকে বেরোতেই বড় বড় চোখ করে সন্ধ্যা বলল, তুই কী রে মেজদা? এতক্ষণ ধরে কী করছিলি?
অমল কাঁপছিল শীতে। কঁপতে কাঁপতেই বলল, মাথাটা বড্ড গরম লাগছিল বলে—
ইস! জলে সাদা হয়ে গেছিস। শিগগির গায়ে জামা দে। তারপর রোদে গিয়ে দাঁড়া।
পরিশ্রান্ত অমল জামা গায়ে দিতে দিতে যেন প্রচণ্ড পরিশ্রমে হাঁফিয়ে পড়ছিল। বলল, তোর বউদি চলে গেছে?
মুখটা বিকৃত করে বলল, কোথায় আর যাবে। বউদির ঘরে গুজগুজ ফুসফুস হচ্ছে। আমি তো খেয়ালও করিনি, হঠাৎ বাবা ডেকে বলল, যা তো সন্ধ্যা, দেখে আয় তো অমলের বাথরুমে এতক্ষণ ধরে শাওয়ারে জল পড়ে যাচ্ছে কেন! শুনে আমি দৌড়ে এলাম। ভয় পাচ্ছিলাম, অজ্ঞান-টজ্ঞান হয়ে পড়ে গেছিস নাকি।
অনেকক্ষণ চান করেছি নাকি?
অনেকক্ষণ নয়! চল্লিশ-পঁয়তাল্লিশ মিনিট তো হবেই।
অবাক হয়ে অমল বলে, কই, টের পাইনি তো!
কী যে হয়েছে তোর কে জানে। ওই রাক্ষুসীই তোকে খাবে। কেন যে পারুলদিকে বিয়ে করলি না কে জানে বাবা। এখন যা তো রোদে গিয়ে বোস। আমি চেয়ার পেতে দিচ্ছি।
আর কেউ আসেনি রে?
কার কথা বলছিস?
সোহাগ বা বুডঢা!
বুডটা আসেনি। সোহাগ এসেছে।
একটু উদ্দীপ্ত হয়ে অমল বলে, এসেছে?
হ্যাঁ, মন খুব খারাপ।
কোথায় বল তো!
আমার সঙ্গে একবার চুপটি করে দেখা করে এসে বোধহয় দাদুর ঘরে বসে আছে।
কী বলল তোকে?
তেমন কিছু নয়। শুধু বলল, মন খারাপ। পরে কথা হবে পিসি।
সন্ধ্যার পিছু পিছু উঠোনে নেমে রোদে চেয়ারে বসল অমল। দুপুরের ঝাঁঝালো রোদ যেন বন্ধুর মতো বুকে টেনে নিল তাকে। আরামে ঘুম এসে যাচ্ছিল তার। মাথাটা ব্যথা করছে স্নানের পর থেকেই। তার কি জ্বর আসবে?
ঘুম আর জাগরণের মাঝখানে বসে রইল সে। কতক্ষণ গেল কে জানে।
ভাইঝি চটপটি এসে ডাকল, কাকা, খাবে এসো।
অমল উঠল। খাবার ঘরে গিয়ে ভাতের থালার সামনে বসলও। কিন্তু খিদে মরে গিয়ে পেটের ভিতরে কেমন একটা ঘোলানো ভাব। টক জল উঠে আসছে গলায়।
কিছু খেয়ে, কিছু ফেলে উঠে এল অমল।
ফের রোদে এসে বসল।
সামনেই সন্ধ্যা তার বিষয়সম্পত্তি ছড়িয়ে নিয়ে বসেছে। আচার, কাসুন্দি, আমলকি রোদে দিচ্ছে বসে। ওই সবই ওর ধ্যানজ্ঞান।
মেয়েটা কোথায় রে?
দেখছি না তো। কোথাও গেছে বোধহয়।
আমার শরীরটা খারাপ লাগছে, বুঝলি!
যাও না, লেপচাপা দিয়ে শুয়ে থাকো গিয়ে। সোহাগ এলে তোমার কাছে পাঠিয়ে দেবোখন।
অমল ফের উঠে এল দোতলায়। মাথার ভিতরে যেন একটা কলকারখানা চলার শব্দ হচ্ছে। শরীর টালমাটাল। ঘরে এসেই সে বিছানায় শুয়ে পড়ল লেপমুড়ি দিয়ে। কিন্তু ঘুমিয়ে পড়ল না। ঘুম এলই না তার। অবসন্ন শরীর শুধু ঝিমঝিম করছে।
একথা ঠিক যে, মোনার প্রতি আর সে কোনও আকর্ষণই বোধ করে না। যৌন আকর্ষণ দূরে থাক, মোনার মুখোমুখি হতে সে আজকাল অস্বস্তি বোধ করে, ভয় পায়। এও ঠিক তাদের ভিতরে কোনও সম্পর্কই গড়ে ওঠেনি। একসময়ে যা-ও একটু বোঝাপড়ার চেষ্টা ছিল তাও শেষ হয়ে গেছে কবে। অভ্যাসবশে দুজনে একসঙ্গে থাকে মাত্র। তবু মোনা চলে যাবে ভাবতেই বুকটা ছ্যাঁত করে ওঠে কেন? কেন ভয় খামচে ধরে বুক!
তবে কি ভালবাসা নয়, মানুষ দাস হয়ে থাকে তার অভ্যাসের কাছে? এ যেন দাবার ছক-এ সাজানো গুটির মতো ব্যাপার। একটা খোপ ফাঁকা হয়ে গেলে, গুটিটা উধাও হলে হঠাৎ যে ভ্যাকুয়াম সৃষ্টি হয় সেটাই যেন অনিশ্চয়তায় ফেলে দেয় তাকে। সাহেবদের এ-সমস্যা নেই। তারা ছক পালটে ফেলে, শূন্যতা পূরণ করে নেয় নতুন গুটি বসিয়ে। সে কেন পারে না। তার মধ্যে নেই কেন কোনও অ্যাডভেঞ্চার? খাত বদলের আগ্রহ?
চোখ খোলা রেখে, চালি করা নীল মশারির পর্দায় সে নানা দৃশ্যের প্রক্ষেপ ঘটাতে থাকে। নানা সম্ভব অসম্ভব কথা। নানা সম্ভাবনা। নানা উদ্বেগ। অনেক দিন বাদে উদ্বেগ। তার জরাগ্রস্ত মন থেকে উদ্বেগও উধাও হয়ে গিয়েছিল। আবার ফিরে এসেছে। মোন চলে যাবে। নতুন করে শুরু করতে হবে জীবন। সে কি পারবে?
মোনার সন্দেহ, পারুলের টানেই তার এই পালিয়ে আসা। কিন্তু পারুলের কাছে সে তো যায়ও না। কতদিন দেখা হয়নি। পারুলের শরীর লুট করেছিল এক দুপুরে বিশ বছর আগে। কৃতকর্মের জন্য কত গুনোগার দিতে হল।
একটা দীর্ঘশ্বাস ঘনিয়ে উঠল বুকের মধ্যে। অনেকক্ষণ ধরে শ্বাসটা বেরোল।
চোখ বুজে সে টের পাচ্ছিল তার দুচোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে। সে কি কাঁদছে? হয়তো। কিন্তু বুঝতে পারছে না কেন কাঁদছে।
তুমি কি ঘুমোচ্ছ?
চোখ খুলে ঘরের দরজায় মোনাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখতে পেল অমল। তাড়াতাড়ি উঠে বসতে গিয়ে মাথাটা ঝিম করে উঠল।
না, ঘুমোচ্ছি না। কিছু বলবে?
আমরা যাচ্ছি।
আজই যেতে হবে?
আমি তো থাকব বলে আসিনি। কথাটা তোমাকে জানিয়ে যাওয়ার দরকার ছিল। জানিয়ে গেলাম।
আমাকে কী করতে হবে যেন!
যদি দয়া করে কলকাতায় আসতে পারো তা হলে আমার উকিল তোমাকে সব বলে দেবে। তোমাকে কোর্টে অ্যাপিয়ার হতে হবে না।
তুমি কোথায় চলে যাবে মোনা?
সেটা জেনে কী হবে?
এমনি জানতে চাইছি।
জেনে তো লাভ নেই।
তুমি চলে যাবে, ধরো আমিও হারিয়ে গেলাম। তারপর কী হবে?
সে তো আমার জানা নেই।
বড় মুশকিল হল।
মুশকিল! তোমার আবার মুশকিল কীসের?
আমি তো আজকাল কিছুই পারি না।
তোমার কোনও মুশকিল নেই, গায়ে হাওয়া লাগিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছ, প্রেমিকার পিছনে ছুটছ, তোমার তো খুশির প্রাণ গড়ের মাঠ। শুধু বলে যাই, বুডঢা আর সোহাগকে ভাসিয়ে দিও না।
কিছুক্ষণ আবার বোকা চোখে মোনার দিকে চেয়ে থাকে অমল। তারপর বলে, কোথায় একটা গণ্ডগোল হচ্ছে। বুঝলে! কোথাও একটা ভীষণ ভুল হচ্ছে।
সেটা তুমি বসে বসে ভেবে বের করো। আমার অত সময় নেই। আমাকে নতুন করে নিজের জীবনটা গুছিয়ে নিতে হবে। কাজেই আমার এখন সময় নেই।
মোনা।
বলো।
একটা কথা যদি জানতে চাই?
কী কথা?
তুমি কি আর কাউকে বিয়ে করবে?
মোনার ফর্সা রং হঠাৎ টকটকে লাল হয়ে উঠল। কঠিন চোখে অমলের দিকে চেয়ে বলল, সেটা জেনে তোমার লাভ কী? তুমি তো আর আমার জন্য ডুয়েল লড়তে যাবে না!
তা বলিনি তো!
আমার বয়স ত্রিশের কোঠায়। মেয়েদের পক্ষে অনেক বয়স। আর সবাই তো তোমার মতো নয় যে একটা ছেড়ে আর একটা ধরে বেড়াবে।
মার খেয়ে বিবর্ণ মুখে বসে রইল অমল। এর চেয়ে থাপ্পড় ভাল ছিল। শুধু মিনমিন করে আবার বলল, ভুল হচ্ছে, কোথাও বড় ভুল হচ্ছে।
আমার কোনও প্রেমিক নেই। জুটলে তোমাকে জানিয়ে দেব। আমার দেরি হয়ে যাচ্ছে, চলি।
দরজাটা ফাঁকা হয়ে গেল। বুকটা ছ্যাঁত করে উঠল ফের। ধড়াস ধড়াস শব্দ হচ্ছে তার হৃৎপিণ্ডে।
খোলা দরজা দিয়ে একটা ভারী সুন্দর গেরুয়া আর খয়েরি রঙের প্রজাপতি এসে ঘর জুড়ে ঘুরতে লাগল।
আবার চোখ বুজতেই জলে ভেসে যেতে লাগল চোখ।
কী গো, শরীর খারাপ?
চোখ চাইল অমল, এসো ঠাকরোন।
কাঁদছিলে নাকি?
না না, এমনি চোখে জল এল হঠাৎ।
এতকালের সম্পর্ক কাটান-ছাড়ান হলে কান্না তো পাবেই ভাই।
অমল চেয়ে রইল। অঝোর ধারায় জল পড়ছে চোখ দিয়ে।
এই জন্যই তোমাকে বলেছিলাম পাগলামি না করে কলকাতা ফিরে যাও। কথা তো শুনলে না!
আমি যে ওদের ভয় পাই।
ওসব অলক্ষুণে কথা বোলো না তো! শুনলে রাগ হয়।
মোনা তোমাকে কী বলল ঠাকরোন?
কী আবার বলবে। মেয়েমানুষের কি দুঃখের শেষ আছে? তোমরা তো মনেও রাখো না, ওই মেয়েমানুষই ঘরদোর সন্তান সংসার আগলে থাকে বলে তোমরা ভেসে যাও না। ঘরের মহিলাটি ঘাঁটি আগলে না থাকলে এত পাগলামি, বাউণ্ডুলেপনা করে বেড়াতে পারতে বুঝি? অত সোজা নয়, বুঝলে?
বউদির সঙ্গে একমত হয়ে মাথা নাড়ল অমল। বিড়বিড় করে বলল, ভুল হচ্ছে, কোথাও বড় ভুল হচ্ছে আমাদের।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন