শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
মনোরম বন্ধনগুলো এইসব সময়ে টের পাওয়া যায়। যেন লতায় পাতায়, মায়ায়, মোহে বেঁধে রেখেছে হাত-পা, এমনকী মগজ আর মনও। কখন বাঁধা পড়ে যায় তা মানুষ টেরও পায় না। এইসব সংকটের ডাক এলে টের পাওয়া যায়। বোঝা যায় একটা সিস্টেমের কত আঁকুশি, কত ফের-ফেরতা। মায়ের অসুখের খবর পেয়ে সকালেই রওনা হবে বলে তৈরি হতে গিয়ে পারুল এইসব বন্ধনকে টের পেল খুব। মাত্র দু-চার দিনের জন্য যাওয়া, তাতেও কত বাধা, কত অসুবিধে। বড় ছেলেমেয়ে দুটোর স্কুল খোলা বলে যাবে না, তার বর নতুন প্রোজেক্ট নিয়ে ছোটাছুটি করছে দিন-রাত, তার নিজেরও কি শ্বাস নেওয়ার সময় আছে? তাদের ব্যবসা বাড়ছে, কারখানা বড় হচ্ছে, নতুন কারখানা তৈরি হচ্ছে, কোটি কোটি টাকার লগ্নি। কত দায়ভার তার মাথার ওপরে। তার অনুপস্থিতি ঘরগেরস্থালিতেও কত শূন্যতার সৃষ্টি করতে পারে। এইসব বন্ধন সারা রাত তার হাত-পা শিথিল করেছে, মন হয়েছে বিকল। এখন হুট বলতেই ছুটকারা পাওয়া বড় কঠিন। একটা ইংলিশ মিডিয়ম স্কুল করছে তারা, চলছে একটা কম্পিউটার আর স্পোকেন ইংলিশ ইন্সটিটিউট। সবই পারুলের দায়িত্বে। আর দায়িত্বটা বিশাল। সে তার বরের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়েই কাজ করে। কত বেকার ছেলেমেয়ের সামনে সম্ভাবনার পথ খুলে দিচ্ছে তারা।
খুব সকাল থেকেই বারবার ফোন করেছে মাকে। মা ধরেনি, ধরেছে বিজু বা পান্না।
বিজু বলল, আরে, টেনশনের কিছু নেই। তুমি ধীরেসুস্থে এসো।
মায়ের সঙ্গে কথা বলা যাবে না?
কেন যাবে না? কিন্তু এখনও ঘুমোচ্ছে যে।
মা তো এত বেলা অবধি ঘুমোয় না।
এটা তো নরম্যাল ঘুম নয় পারুলদি। শি ইজ আন্ডার সেডেটিভ।
ইস, আমার যে বুকের মধ্যে কেমন হচ্ছে।
ডাক্তার তো অ্যালার্মিং কিছু বলেনি, ভাবছ কেন?
ডাক্তারটা কেমন?
অনল বাগচীর খুব নাম। এদিকে সবাই তো প্রশংসাই করে। বিদেশি ডিগ্রি আছে।
পারুল বাচ্চাটাকে নিয়ে রওনা হল দশটা নাগাদ। তাদের সদ্য কেনা এ-সি গাড়িতে, সঙ্গে আয়া, লাঞ্চের বাস্কেট, জল।
তার মোবাইলে সবসময়ে নেটওয়ার্ক পাওয়া যাচ্ছিল না। তবু ঘণ্টা খানেক বাদে পান্নাকে পাওয়া গেল ফোনে।
কী খবর রে, মা কেমন?
তুমি আসছ তো! ওঃ কী ভালই যে হবে।
দুর মুখপুড়ি, মায়ের কথা বল।
বড়মাকে নিয়ে বিজুদা তো বর্ধমানে গেছে। ই সি জি হবে, আরও কী কী সব টেস্ট যেন।
মা নরমালি যেতে পারল?
হ্যাঁ তো।
ব্রিদিং ট্রাবলটা?
একটু আছে। খুব সামান্য। সবাইকে দেখতে চাইছে। বড়মার ধারণা হয়েছে, আর বাঁচবে না। শুনে আমরা খুব হাসিঠাট্টা করেছি।
আমার ভীষণ টেনশন হচ্ছে।
অত ভেব না। আমরা তো সবাই কাল রাতে বড়মার কাছে ছিলাম।
কে কে?
বাবা, আমি, ছোটমা, বিজুদা। একজন নার্সও ছিল। তুমি একদম ভেব না। বড়মা ঠিক আছে।
মায়ের যদি সিরিয়াস কিছু না-ই হবে তবে তোরা সবাই মিলে মায়ের কাছে রাতে ছিলি কেন?
আমরা একটু ঘাবড়ে গিয়েছিলাম। বড়মার তো কখনও তেমন অসুখ-বিসুখ করে না। তাই শ্বাসকষ্ট হচ্ছে শুনে সবাই চলে এলাম। আজ সকালে সোহাগও চলে এসেছে খবর শুনে। তুমি এখন কোথায় পারুলদি? গলাটা অস্পষ্ট শোনাচ্ছে কেন?
কোথায় তা কি আমিই জানি? একটা পেট্রল পাম্পে থেমেছি। গাড়িতে তেল নেওয়া হচ্ছে। যেতে যেতে বিকেল হয়ে যাবে।
পারুল ফোন কেটে দিল।
সোহাগ বলল, ওয়াজ দ্যাট গডেস?
পাল্লা হেসে বলল, হ্যাঁ। তোমার গডেস এখন একজন বিগ উওম্যান। অনেক টাকা। শুনলাম স্কুল খুলছে। আমাকে বলে রেখেছে, পাস করলেই চাকরি। কী মজা হবে বল তো!
নাক কুঁচকে সোহাগ বলল, চাকরিতে আর কীসের মজা?
মজা নয়! আমার তো ভাবতেই থ্রিল হচ্ছে। চাও তো তোমার জন্যও বলে রাখি।
সোহাগ হাসল, চাকরি-টাকরি আমার ভাল লাগে না। রোজ একটা লোক একই কাজ কীভাবে করে ভাবতে আমার অবাক লাগে।
আহা, আমরা তো রোজ ভাত খাই, ঘুমোই, দাঁত মাজি। সেগুলোও তো একই কাজ।
সোহাগ কথাটার জবাব দিল না। হেসে বলল, ফ্রক পরে আজ তোমাকে একদম বাচ্চা মেয়ের মতো দেখাচ্ছে। ভারী সুইট।
লজ্জা পেয়ে পান্না বলে, ফ্রক পরতেই আমার ভাল লাগে কেন বল তো! আজকাল পরছি কেন জান? শাড়ি পরে ঘুমোলে বড্ড জড়িয়ে যায় পায়ে-টায়ে। আমার শোওয়া তো বিশ্রী। একদিন ভোরবেলা উঠতে গিয়ে পায়ে শাড়ি জড়িয়ে দড়াম করে আছাড় খেয়েছি। সেই থেকে শোওয়ার সময় ফ্রক পরে শুই। আজ বড়মার ঘরদোর সারতে হবে বলে ফ্ৰকই পরেছি। কত সুবিধে বল।
দুখুরি এসে বলল, ও দিদি, ঠাকুরঘর সারবে না! সাড়ে এগারোটা বেজে গেছে যে!
যাচ্ছি, যাচ্ছি, তুই বড্ড হুড়ো দিস।
ইস তাই বইকী। মা তো কোন ভোরবেলা ঠাকুরকে ভোগ দিয়ে দেয়।
সোহাগ বলল, মে আই হেলপ? কিছু কাজ আমিও করতে পারি।
চলো, তাহলে ফুল তুলে আনি।
দোপাটি আর টগর ছাড়া এখন তেমন ফুল নেই বাগানে। আছে, লঙ্কাজবা, দু-পশলা বৃষ্টি হয়ে গেছে কদিন আগে। ঘাস আর আগাছা উঠেছে তেড়েফুঁড়ে। বড় টগর গাছটা থেকে ডিং মেরে ফুল পাড়ছিল পান্না।
হঠাৎ ফোঁস শব্দটা শুনে কেঁপে উঠল। একটু হলেই সাজিটা পড়ে যেত হাত থেকে। চোখ বিস্ফারিত করে নীচে তাকাতেই স্পষ্ট চোখাচোখি হয়ে গেল সাপটার সঙ্গে। একটা চিৎকার দিয়েই স্তব্ধ হয়ে গেল সে। ভয়ে কাঠ। সাপের চোখ চোখের পলকে সম্মোহিত করে ফেলল তাকে। সে চোখ সরাতে পারছে না, নড়তে পারছে না, বাকরুদ্ধ, চোখে পলক নেই।
একটু পিছন থেকে এগিয়ে এল সোহাগ।
এই, চেঁচালে কেন? কী হয়েছে? এনিথিং রং?
সাপটা ফণা তুলে আছে স্থির হয়ে। কুটিল চোখে পলকহীন এক দৃষ্টিতে ধীরে ধীরে বিবশ করে ফেলছে পান্নাকে।
সোহাগ তার হাত ধরে হ্যাঁচকা একটা টানে সরিয়ে নিল। তারপর বলল, ভয় পাচ্ছ কেন? ইট ইজ জাস্ট এ স্নেক।
অজ্ঞানই হয়ে যেত পান্না, সোহাগের হ্যাঁচকা টানে চৈতন্য হল তার।
সে চেঁচাল, পালাও, পালাও।
তাকে একটা মৃদু ঝাঁকুনি দিয়ে সোহাগ বলল, টেক ইট ইজি। দেখ, সাপটা চলে যাচ্ছে। দেখ, হাউ ম্যাগনিফিসেন্ট ইট ইজ। সাপের মতো গ্রেসফুল কিছু হয়? ভয়ের কী?
অবাক হয়ে পান্না বলল, তুমি সাপকে ভয় পাও না, না?
আমি কোনও কিছুকেই ভয় পাই না। নট ইভন লোনলিনেস।
বেলা বারোটার মধ্যেই ভীষণ ক্লান্ত হয়ে গেল বলাকা। সিরিঞ্জ ভরে কত রক্ত শরীর থেকে টেনে নিল ওরা। তারপর এক্স-রে, ইসিজি, ইকো কার্ডিওগ্রাম।
বিজু, এবার রেহাই দে বাবা। বাড়ি চল তো, একটু শুয়ে থাকি।
হ্যাঁ বড়মা, সব হয়ে গেছে। এবার যাব।
তুই তো সকাল থেকে দাঁতে কুটোটিও কাটিসনি। মুখখানা শুকিয়ে গেছে।
যা খেল্ দেখাচ্ছ, খিদে উবে গেছে। শরীর খারাপ লাগছে নাকি?
লাগবে না, কত রক্ত নিয়ে নিল বল তো।
শ্বাসকষ্টটা?
তেমন টের পাচ্ছি না এখন। তবে কোমর টনটন করছে, চোখ মেলে চেয়ে থাকতে পারছি না।
ওটা কাল রাতের সেডেটিভের এফেক্ট। তার ওপর কিছু খাওনি।
রামহরি বিষয়কর্মে কোথাও গিয়েছিল। ফিরে এসে বলল, জল-টল কিছু খাবে বউদি? এখানে একটা দোকানে ভাল রসগোল্লা হয়।
না ভাই। একেবারে বাড়ি গিয়েই যা হয় খাব, স্নানও করিনি তো।
তেষ্টা পেয়ে থাকলে বোতলের জল কিনে আনি।
আমার খিদেতেষ্টা যে কত কমে গেছে আজকাল, তোমরা জান না।
জানব না কেন, খুব জানি। খাওয়া-দাওয়া ছেড়েছ বলেই তো শরীরের এই হাল। আজকাল সত্তর- বাহাত্তর বছরের মহিলারা লিপস্টিক মেখে ঘুরে বেড়াচ্ছে দেখ গে যাও। তোমার সবতাতেই বাড়াবাড়ি।
বলাকা ক্ষীণ একটু হাসল।
বাড়িতে ফিরেই অবশ্য মনটা ভাল হয়ে গেল। ছেলেরা, বউরা ছেলেমেয়ে নিয়ে এসে গেছে। বাড়ি গমগম করছে লোকে। বাড়িতে পা দিতেই সবাই যেন আগলে নিল তাকে।
এই তো তার ওষুধ, এই তো চিকিৎসা। গুচ্ছের ট্যাবলেট গিলে কি আর বেঁচে থাকা যায়! বাঁচতে তো মানুষজনও চাই। এই সত্যি কথাটা বলাকা কাউকে মুখ ফুটে বলতে পারে না। আর পারে না বলেই ভিতরে ভিতরে তার ভূমিক্ষয় হতে থাকে। আজ বুকটা বড় ঠান্ডা লাগছে।
স্নান খাওয়ার পর আজ আর শোবে না বলে ঠিক করেছিল বলাকা, কিন্তু একটু গড়িয়ে নিতে গিয়ে কখন অসতর্কভাবে ঘুমিয়ে পড়ল। যখন ঘুম ভাঙল তখন সন্ধে। ডাক্তার বসে নাড়ি দেখছে। ঘরে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে বাড়ির সবাই।
কী হয়েছে তার? কী হয়েছে? উঠে বসতে যেতেই মাথাটা কেমন করল।
ডাক্তার অনল বাগচী বলল, না না, উঠবেন না, চুপ করে শুয়ে থাকুন।
আমার কী হয়েছে ডাক্তার?
অনল বাগচী বলল, তেমন কিছুই তো নয়। একটু রেস্ট নিন।
রেস্ট! আর কত রেস্ট নেব বাবা!
ডাক্তার জবাব না দিয়ে প্রেশারের যন্ত্র বের করল।
একটু রাতের দিকে এল মহিম রায়। চোখে জল, গলা আবেগে কাঁপছে, চলে যাওয়ার কথা ভাবছেন নাকি বউঠান?
বলাকা হাসে, চলে আর যেতে পারছি কই? দেখছেন না, ডাক্তার বদ্যি, ওষুধপত্রে বাড়ি ভরে গেল। ডাক্তার বলে গেল, ভয়ের নাকি কিচ্ছু নেই। ওরা তো বোঝে না, চলে যাওয়াটা মোটেই ভয়ের ব্যাপার নয়।
আপনার যে ইচ্ছামৃত্যু বউঠান। শরীরে মনে যাদের পাপ নেই তারা যেদিন ইচ্ছে দেহ ছাড়তে পারে। আমাদের মতো পাপীতাপীদেরই নানা ভোগান্তি।
ওসব বলবেন না ঠাকুরপো, মরার কথা ভাবেন কেন?
ও আপনিও ভাববেন না, আপনি চলে গেলে, আমার মনে হয়, গাঁয়ের লক্ষ্মীই চলে যাবে। আপনি নমস্যা।
আমাকে আর পাপের তলায় ফেলবেন না ঠাকুরপো, পায়ে পড়ি, সম্পর্কে বড় হলেও আমি বয়সে আপনার ছোট, মনে রাখবেন।
মহিম মলিন হেসে বলে, বয়সটাই হল, আর কিছু হল না। গৌরদা গিয়ে অবধি বড় কাহিল হয়ে পড়েছি। আপনি গেলে যে সব যাবে।
মহিম চোখের জল মোছে। এ তার মন-ভোলানো কথা নয়। মনে মনে সে এই মহীয়সী নারীকে এই গাঁয়ের লক্ষ্মী বলেই ভেবে এসেছে। গৌরহরিকে বলেছেও সে কথা। গৌরহরি শুধু হাসত। সেই হাসির মধ্যে একটা উজ্জ্বল তৃপ্তি ফুটে উঠত। যেন প্রাইজ জেতার আনন্দ।
টর্চের ব্যাটারিটা বড্ড কমজোরি হয়ে গেছে, বদলাতে হবে। নিবু নিবু আলোয় পথ ঠাহর করে ফিরছিল মহিম। মনটা ভার। বউঠানের অসুখ-টসুখ শোনেনি কখনও। বলতে গেলে এই প্রথম। কিন্তু শরীর কি সিগন্যাল দিচ্ছে? বউঠান চলে গেলে একটা যুগই শেষ হয়ে যাবে যেন।
কাঞ্জিলালের জমিটার কাছ বরাবর রাস্তায় একটা আড়াআড়ি খাঁজ। একটা নালার মতো। টর্চের আলোটা ভাল পড়েনি সেখানে। আনমনে পা বাড়িয়েও হঠাৎ কী যেন মনে হল মহিমের। কে যেন টেনে ধরল পিছন থেকে। টর্চের বাতি আরও ক্ষীণ হয়েছে। চোখের জোরও তো কমে গেছে অনেক। শূন্যে বাড়ানো পা টেনে নিল মহিম। তারপর দেখতে পেল।
বিশাল লম্বা চিত্রিত একটা শরীর খুব ধীরে ধীরে রাস্তাটা পেরিয়ে যাচ্ছে। টর্চটা ধরে রইল মহিম। সাপটা অনেকক্ষণ ধরে রাস্তাটা পার হল।
চিন্তিত মহিম আবার হাঁটতে লাগল। এই রাতের অন্ধকারে সাপটা যে কোথা থেকে কোথায় যাচ্ছে কে জানে।
নিজেও সে জানে না। আলো আর অন্ধকার কোনওটাই তার প্রিয় নয়। সে শুধু এক অনির্দ্দিষ্ট নির্দেশেই চলে। কখনও থামে, চারদিকটা ঠাহর করার চেষ্টা করে। সে ভয় পায়। এই পৃথিবীতে তার বসবাস কখনওই নিরাপদ নয়।
অন্ধকার মাঠের মধ্যে সাপটা একটু থামল। শরীরে একটা চলবলে ভাব। খোলস ছেড়ে যাচ্ছে দেহ৷ একটা ইটের পাঁজার শ্যাওলা ধরা খাঁজে সে প্রবাহিত করে দেয় নিজেকে। ইটের খাঁজে খাঁজে তীক্ষ্ণ যন্ত্রণার অনুভূতি। তবু সে নিজেকে প্রবাহিত রাখে। খাঁজে খাঁজে আটকে যায় তার আলগা খোলস। শরীরে নির্মোক খসে যেতে থাকে। সিরসির করে তার নতুন ত্বক। ধীরে ধীরে দীর্ঘ একটা মোজার মতো নিজের খোলসটি ছেড়ে সে বেরিয়ে আসে।
না, তার কোনও স্থায়ী গৃহ নেই, ঠিকানা নেই, গৃহিণী বা সংসারও নেই। সে একা, সে অসুখী। সে প্রবহমান এক অনন্ত একাকিত্ব।
তার হৃদয় নেই, প্রেম নেই। তবু বীজ বপনের অস্থিরতা আছে। শরীরে সেই চঞ্চলতা টের পায় সে। বারংবার সে শ্বাসবায়ু ত্যাগ করে। ক্ষীণ চোখে, ত্বকে, তার অস্পষ্ট ঘ্রাণশক্তি দিয়ে সে নারীগন্ধ খোঁজে। তার বিবাহের সময় এল। শরীরে অনাগত সন্তানের কোলাহল। সে সংবরণ জানে না। তার নারীশরীর চাই।
সে তাই খোঁজে। সর্পিল শরীরে কত খানাখন্দ, কত গহ্বর কন্দরে সে তার পিছল কামার্ত শরীর প্রবাহিত করে দেয়।
যখন চড়া রোদে ধুধু করছে মাঠঘাট, সে একটা বিশুষ্ক নালা পার হয়ে নিবিড় এক ঘাসজমির ভিতরে অকস্মাৎ দেখা পেল তার। নির্ভুল নারীগন্ধ পেয়ে গেল সে।
পূর্বরাগ ছিল না, ভূমিকাও নয়, তারা উভয়েই উত্তোলিত ফণায় মুখোমুখি হল। চোখে চোখ। নর ও নারী। তার পর মুহূর্তেই তীব্র ছোবল এসে পড়ল তার শরীরে। সে এই মুদ্রা চেনে। পালটা ছোবলে সে তার মহিলাকে আক্রমণ করে। ভাষাহীন, ভালবাসাহীন তাদের এই আক্রমণ ও প্রতি-আক্রমণের ভিতরেই লুকোনো ইচ্ছা বেরিয়ে আসে যেন। তোমাকে চাই। ছোবলে ছোবলে চুম্বন নেই, কিন্তু আসঙ্গ আছে। আর ওই আক্রমণের ভিতরেই পাক খেয়ে জড়িয়ে যায় দুটো বাহুহীন শরীর। কাছাকাছি দুটি মুখে কোনও রূপতৃষ্ণা নেই, পছন্দ অপছন্দ নেই, নেই প্রিয় ফিসফাস। শুধু প্রয়োজন, শুধু মোক্ষণ। রতিক্রিয়া কোনও উপভোগ্য কাজ নয় তার কাছে। এ যেন শরীরের এক বাধ্যতামূলক নির্দেশ মাত্র। সে তার বীজের ভূমি খুঁজে পেল আজ দ্বিপ্রহরে। মাত্র এটুকুই।
ওরে শঙ্খ লেগেছে! শঙ্খ লেগেছে। একটা নতুন কাপড় নিয়ে আয়। ফেলে দে এ দুটোর ওপরে।
জিজিবুড়ির চিৎকার শুনে দোতলায় চমকে উঠল বাসন্তী।
ও মুক্তা, দ্যাখ তো, মা চেঁচায় কেন।
মুক্তা পা ছড়িয়ে বসে একটা কাঁথায় ফোঁড় তুলছিল। নতুন মানুষ আসছে এ-সংসারে কত কাঁথাকানি লাগবে। ঠোঁট উলটে বলল, সারাদিনই তো চেঁচায়, বোধহয় ঘরে ভাম-টাম ঢুকেছে।
তবু দ্যাখ ভাই। ও ঘরে বিছে-টিছে আছে। কামড়াল কি না দ্যাখ।
সে বিছে এখনও জন্মায়নি। কামড়ালে নিজেই মরবে। আফিং-খাওয়া শরীর বাপু, ওকে কামড়ালে রক্ষে আছে?
তোর ওই দোষ। কেবল ফুট কাটিস।
দেখছি বাবা, দেখছি।
মুক্তা উঠে এসে দোতলার রেলিং দিয়ে ঝুঁকে বলল, হয়েছে কী? চেঁচাচ্ছ কেন?
কানে কি ময়দা গুঁজে আছিস তোরা? শুনতে পাস না? এমন যোগ আর পাবি? সাপের শঙ্খ লেগেছে এদিককার বাগানে। একটা নতুন কাপড় নিয়ে আয় শিগগির।
ও মা! বলে মুক্তা ঘরে এসে বলল, একটা নতুন কাপড় দাও তো! সাপের শঙ্খ লেগেছে বলছে।
ওই আলমারিতে আছে, নিয়ে যা।
মুক্তা কাপড় বের করে নিয়ে যাচ্ছিল, বাসন্তী বলল, বেশি কাছে যাসনি। কামড়ে-টামড়ে দেবে। এ সময়টায় ওদের বিরক্ত করতে নেই কিন্তু।
জানি বাবা, জানি। তুমি শুয়ে থাকো তো।
মুক্তা দৌড়ে সিঁড়ি দিয়ে নেমে গেল। বাসন্তী উঠল। শরীর ভাল নেই। তার চেয়েও খারাপ তার মন। সেদিন যে সিঁড়ি থেকে পড়ে যাচ্ছিল সেই থেকে ভয় খামচে ধরে আছে বুক। পেটেরটা নষ্ট হয়ে যাবে না তো!
বারান্দায় এসে রেলিঙে দাঁড়িয়ে দেখার চেষ্টা করছিল বাসন্তী। কিন্তু ওদিকে জিজিবুড়ির ঘর আর উত্তর দিকের দালানের ফাঁকটায় কলার ঝাড় হওয়ায় কিছুই দেখা যাচ্ছে না। জিজিবুড়ি আর মুক্তাকেও না।
সবসময়ে আজকাল তার বড্ড ভয় হয়। সব ব্যাপারেই ভয়। বছর তিনেক আগে শঙ্খ লাগা দুটো সাপকে ঢিল দিয়ে মেরে ফেলেছিল মরণ। বড্ড দস্যি ছেলে। খুব রাগ করেছিল বাসন্তী।
মারলি কেন রে যমদূত? মা মনসার বাহনকে কি মারতে আছে?
বড় করে মনসাপুজো করিয়ে মা মনসার কাছে অনেক মাথা কুটেছিল বাসন্তী, অবোধ ছেলে মা, ভুল করে তোমার বাহনকে মেরেছে। ক্ষমা করে দাও মা।
কিন্তু ওই দুরন্ত ছেলে কি কথা শোনে? বাপ ছাড়া কাউকে ডরায় না। তার পরও কতবার সাপ মেরেছে তার হিসেব নেই। এর ওর তার মুখে খবর পায় বাসন্তী। ছেলের ওপর রাগ করে, তারপর কাঁদে, তারপর ঠাকুর-দেবতার পায়ে মাথা খোঁড়ে। ওই যে মরণ গাছে ওঠে, পাখি কি ফড়িং মারে এসবই বাসন্তীকে ভারী ভয় খাইয়ে দেয়। পাপ হচ্ছে ছেলেটার, অধর্ম হচ্ছে, ভগবান যদি শাস্তি দেয়।
এভাবে মাকে কাঁদিয়ে, ভাবিয়েই এখন একটু বড় হয়েছে মরণ। বোনের দাদা হয়েছে, এখন হাতপায়ের চঞ্চলতা একটু কমেছে, দস্যিপনায় একটু ভাঁটার লক্ষণ। তবু সর্বদা কাঁটা হয়ে আছে বাসন্তী। ছেলেপুলে মানেই তো দুশ্চিন্তা, দুর্ভাবনা, ভয়, উদ্বেগ। এই যে বড় হচ্ছে হাম্মি, কম উৎকণ্ঠা ওকে নিয়ে! কখন পড়ে, কখন ব্যথা পায়, কখন কাঁদতে গিয়ে টাগ ধরে দম আটকায়। তার ওপর আর একজন এসেছেন পেটে। এখনই পেটের মধ্যে তার খলবলানি টের পায় বাসন্তী। ইনিও জানান দিচ্ছেন, কম দুষ্টুটি হবেন না জন্মানোর পর। খলবলানি থেকেই টের পায় বাসন্তী।
সিঁড়ি থেকে যেদিন পড়ে গেল তার পর পুরো একটা দিন বাচ্চাটা পেটের মধ্যে নড়েনি মোটে। কী ভয়ই যে পেয়েছিল সে! রসিক গিয়ে অনল ডাক্তারকে ডেকে আনল পরদিন সন্ধেবেলা। ডাক্তার নল লাগিয়ে কী যেন দেখে-টেখে বলল, মনে হয় বাচ্চা ঠিকই আছে। তবু একবার গায়নোকোলজিস্ট দেখিয়ে নিন।
তা আর দেখাতে হয়নি। একদিন চুপ থাকার পর দুষ্টুটা আবার দ্বিগুণ তেজে হাত-পা নাড়ছে, পাশ ফিরছে মায়ের পেটের মধ্যে।
রসিক বলে রেখেছে এইবার তোমার পোলা হইব। তা তাই হবে বোধহয়। ছেলে হলে বাসন্তীর আরও দুশ্চিন্তা বাড়বে। মেয়েদের তবু হাতে পায়ে দামালপনা নেই, তেমন হার্মাদও হয় না তারা। কিন্তু ছেলে হলে, বাসন্তী জানে, সে হবে মরণেরই দোসর। এইসব আগাম ভেবে তার সর্বদা বুক দুরদুর করে।
বাগানের দিক থেকে শাড়ি হাতে উঠোনে ঢুকে মুক্তা চেঁচিয়ে বলল, ওরেব্বাস! কী বড় বড় দুটো সাপ গো বউদি!
কী সাপ রে?
মাথায় খড়ম, সাক্ষাৎ গোখরো। তোমার নতুন শাড়িতে খুব গড়াগড়ি খেয়েছে দুজন।
ঘরেদোরে আসবে না তো!
না। ওদিক পানে চলে গেছে।
মরণের বাবা আবার ওখানেই রোজ সকালে কাককে রুটি খাওয়াতে যায়। একটু সাবধান করে দিতে হবে।
পৃথিবীটা যে কেন এত ভয়ভীতিতে ভরা কে জানে বাবা। একটা দিনও বাসন্তী নির্ভাবনায় কাটাতে পারে না।
আর ওই যে সম্পর্কের একটা কাঁটা বিঁধে আছে বুকে তাই থেকে সর্বক্ষণ কিছু কিছু রক্তক্ষরণ হয়। কে জানে বড়বউয়েরও তাই হয় কি না। দুজনে কি দুজনের মরণ চায়? না, না, ছিঃ ছিঃ, সে আর ভাববে না ওরকম। বড়বউয়ের একশো বছর পরমায়ু হোক।
শঙ্খ লাগা কাপড়টা এনে তার হাতে দিয়ে মুক্তা বলল, রেখে দাও যত্ন করে। দেখবে ঘরদোরে মা লক্ষ্মী উপচে পড়ছে।
কাপড়টা ফিরিয়ে দিয়ে বাসন্তী বলল, যত্ন করে ভাঁজ কর, তারপর আলমারির ওপরের তাকে রেখে দিগে যা।
শনিবার রাতে এক মধুর রতিক্রিয়ার পর সে যখন তার বরের গলা জড়িয়ে নিবিড় হয়ে শুয়েছে তখনও তার মনে হচ্ছিল, এত মাখামাখি, এত কাছাকাছির পরও কেউ আপন না হয়ে পারে?
গাঢ় স্বরে সে বলল, তুমি কাছে থাকলে আমার মনটা বড় ভাল থাকে। একটুও ভয় করে না, তুমি চলে গেলেই কেমন যেন হয়ে যাই।
রসিক তার সবল হাতে নিজের মেয়েমানুষটিকে আগলে ধরে বলল, এত ডরাও ক্যান? দুনিয়াটারে ক্যাজুয়েলি লইতে পার না?
সেটা কী গো?
সবসময় ভাববা দুনিয়ায় কেডা কার। চক্ষু বুজলেই কে কোনখানে যামু গিয়া তার কি কিছু ঠিক আছে?
এ কথায় কেঁপে উঠে রসিককে আরও জোরে আঁকড়ে ধরে বুকে মাথা ঘষে সে। না না, তারা কেউ কোথাও যাবে না। এক বিশাল অচেনা অন্ধকার মহাবিশ্বে তারা কেউ কখনও ছিটকে যাবে না পরস্পরের কাছ থেকে। মরলেও ফের এই বর, এই ছেলে মেয়ে এদের ঠিক ফিরে ফিরে পাবে সে। পাবেই। না পেলে যে পাগল হয়ে যাবে। অস্ফুট স্বরে আকুল হয়ে সে বলে, আর বোলো না, আর কক্ষনও বোলো না ওরকম…
ভাঙা চাঁদ যে সোনার গুঁড়ো নির্জন নিশুতি রাতে মুঠো মুঠো ছড়িয়ে দিচ্ছিল চরাচরে সেই হিরন্ময় আবছায়ায় এক প্রকাণ্ড মেঠো ইঁদুরকে সে পেয়ে গেল তার হাতে। সে জানে, শুধু সে-ই জানে কী প্রাণান্তকর খাদ্যের সঙ্গে তার এই নিজস্ব লড়াই। খুব ধীরে এক ক্লেশকর প্রক্রিয়ায় সে গিলতে থাকে ইঁদুরটাকে। শরীরের সবটুকু শক্তি ও প্রয়াস দিয়ে, বড় ক্লান্ত লাগে তার, বড় পরিশ্রান্ত।
এই নিশুত রাতে কত কীট ও পতঙ্গ জেগে আছে চারদিকে। কত চোখ জ্বলছে নিবছে। খাদ্য ও খাদকের এই নিষ্ঠুর জগতে ক্ষুধা নিদ্রাহীন। রাতচরা পাখিরা অন্ধকার ডানায় ভর করে চক্কর দিচ্ছে ওপরে। মাটির অন্দরে অন্দরে চলেছে ক্ষুদ্রকায় জীবদের অন্তহীন চলাফেরা, বিষয়কৰ্ম। জেগে আছে পিঁপড়ে, ডাঁশ, জোনাকি। মেঠো ইঁদুরটাকে গিলে সে তার দীঘল শরীরে নিশ্চুপ প্রলম্বিত হয়ে থাকে আলের পাশে। চারদিকে হিরন্ময় আবছায়ায় সে এই জাগ্রত জগৎকে টের পায়।
কখনও এরকম হয়, সারাদিন ধরে মনটা যেন একটু খারাপ হয়ে থাকে। কারণটা বোঝা যায় না, অনেক ভাবলে, ভাবতে ভাবতে হয়তো মনে পড়ে যায়, কারও একটা আলাদা কথা, একটা রূঢ় চাউনি, একটু শীতল ব্যবহার বা ওইরকম তুচ্ছ কিছু। তুচ্ছ, তবু সারাদিন জেদি মাছির মতো উড়ে উড়ে এসে মনের ওপর বসে থাকে, কিংবা শরীরের দুরূহ খাঁজে লুকিয়ে থাকা লাল পিঁপড়ের মতো কুটুস কুটুস করে কামড়ায়। পারুল বড় জ্বালাতন হল।
অথচ মন খারাপের যেটা সবচেয়ে বড় কারণ অর্থাৎ মায়ের অসুখ, সেটা তেমন গুরুতর নয় বলে জানা গেছে। গতকাল যখন জামশেদপুর থেকে নতুন টয়েটো গাড়িটায় আসছিল তখন কী টেনশন! জ্যোতিপ্রকাশ তাকে বলে দিয়েছিল, তুমি টেনশন নিয়ে যাচ্ছ, সাবধান, ড্রাইভ কোরো না কিন্তু। বরের কথাটা রাখেনি পারুল। দুপুরের দিকে ধাবায় নেমে লাঞ্চ করে আসার পর তার ড্রাইভারের বারবার ঢুলুনি এসে যাচ্ছিল বলে পারুল বলল, তুমি পাশের সিটে বসে একটু ঘুমিয়ে নাও, নইলে অ্যাকসিডেন্ট করবে। ততক্ষণ আমি চালাচ্ছি। ড্রাইভার অবশ্য বলেছিল জর্দাপান বা গুটকা খেলেই ঘুম উড়ে যাবে। পারুল রিস্ক নেয়নি।
অনেকটাই ড্রাইভ করেছে পারুল। এক মুহূর্ত সময় যাতে নষ্ট না হয় তার জন্য। সন্ধেবেলা এসে পৌঁছে দেখল, বাড়ি ভর্তি লোকজন জড়ো হয়েছে। দাদারা, বউদিরা, ছেলেমেয়েরা, তবে মা ভাল আছে। শরীর দুর্বল, তবে সিরিয়াস কিছু নয়। তাকে দেখে বলাকা হেসে বলল, হ্যাঁ মা, তুই নাকি অনেক কাজ ফেলে এসেছিস।
হ্যাঁ মা, কিন্তু তোমার চেয়ে তো কাজ বড় নয়।
বিজু বকছিল আমাকে। বলল, জানো পারুলদি এখন কী রকম ভি আই পি হয়ে গেছে? কোটি কোটি টাকার ব্যবসা ওদের। হুট করে আসতে পারে নাকি?
পারুলরা যে সাংঘাতিক বড়লোক হয়ে গেছে এটা সকলের মুখেই ঘুরেফিরে শুনতে পাচ্ছিল পারুল। বিনয়ের সঙ্গে অস্বীকার করছিল বটে, কিন্তু কথাটা তো আর মিথ্যে নয়। তারা এখন সত্যিই বড়লোক। বড়লোক আর ব্যস্ত লোক। এই বড়লোক হওয়ার পিছনে তার অবদানও খুব কম নেই। সে এখন ব্যবসা বোঝে, কারখানা তিনটের অন্ধিসন্ধি জানে, বাজার অর্থনীতির সব খবর রাখে। খুব শিগগিরই জ্যোতিপ্রকাশ তাকে বিজনেস টুরে দিল্লি বোম্বে পাঠাবে। ফিনান্সিয়াল ইয়ারের পর তাদের ইউরোপেও যাওয়ার কথা। আপাতত তার দম ফেলার সত্যিই সময় নেই। তার ল্যাপটপ কম্পিউটারে জমা কত যে তথ্য। এই যে সে মায়ের কাছে এল, নিজেকে ছিঁড়ে আনতে হল কত দায়দায়িত্ব থেকে!
তবে এসে খারাপও লাগছে না তার। যেন একটা পারিবারিক গেট টুগেদার। অসুখ গুরুতর নয় বলে দিব্যি আড্ডাও হচ্ছিল তাদের।
রাত্রিবেলা যখন ল্যাপটপ নিয়ে বসে হিসেবপত্র করছিল তখনই হঠাৎ মন খারাপটা টের পেল। কিন্তু কিছুতেই বুঝতে পারছিল না কেন খারাপ। কী এমন হয়েছে এর মধ্যে? বারবার কাজের মধ্যে অন্যমনস্ক হয়ে যাচ্ছিল সে। ভ্ৰূ কুঁচকে ভাবছিল। কেন, কেন মনটা খারাপ রয়েছে?
অনেকক্ষণ ভাববার পর হঠাৎ চাবুকের মতো মনে পড়ে গেল কথাটা। বড়বউদি আজ তাকে দেখেই বলেছিল, এঃ পারুল, তোমার বেশ ফ্যাট হয়েছে!
হ্যাঁ, ওই কথাটাই। ওটাই তার মন খারাপের কারণ।
আর কারণটা মিথ্যেও নয়। সে নিজেও টের পাচ্ছে, ছেলে হওয়ার পর থেকেই তার শরীরের বাঁধন কিছু আলগা হয়েছে। ব্যবসার কাজে বেশি সময় দিতে গিয়ে কমে গেছে রোজকার ব্যায়াম। খাওয়াও হচ্ছে কিছু উলটোপালটা।
কিছুদিন আগেই জামশেদপুরের একজন পরিচিত বিউটিশিয়ান মেয়ে তাকে বলেছিল, মিসেস গাঙ্গুলি, মুখের মাসাজ করান। আপনার প্রোফাইলের শার্পনেস কমে যাচ্ছে।
খুব দুশ্চিন্তার হয়তো কিছুই নয়। কিন্তু মন কি সব কিছু মেনে নিতে চায়? তিন বারের মাতৃত্ব তার খাজনা নিয়েছে, খাজনা নিচ্ছে বয়স, খাজনা দিতে হচ্ছে ব্যবসার জন্য। অত্যধিক মানসিক টেনশন এবং শরীরকে না খাটানোর জন্য।
কিন্তু সকলের ওপরে হল বয়স।
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ল্যাপটপে মনোযোগ দিতে যাচ্ছিল সে। খেয়াল হল রাত একটা বাজে। ব্যস্ততার সময়ে শরীরের ক্লান্তিও টের পাওয়া যায় না। নইলে যা জার্নি করেছে তাতে এতক্ষণ ঘুমে ঢুলে পড়ার কথা।
তার স্থির করা ছিল, ছোট ছেলেটাকে নিজের হাতে মানুষ করবে। ওর সবকিছু নিজেই করবে সে। বড় দুটোকে সময় দেয়নি, ওরা আয়ার কাছে মানুষ বলে তেমন যেন আপনও হয়নি তার। সূক্ষ্ম দূরত্ব রয়ে গেছে যেন একটু। ভেবেছিল ছোটটার বেলায় পুষিয়ে দেবে। আদর করে ওর নাম রেখেছে জুড়ান। তাকে জুড়িয়ে দেবে। কিন্তু ঘটনা সেরকম ঘটল না। সারাদিন পরিশ্রমের পর আর পারে না সে।
দিনের বেলা অফিস, মিটিং, নতুন স্কুলের জন্য ছোটাছুটি, জুড়ান সেই আয়ার হেফাজতে। রাতে সারাদিনে ক্লান্তিতে শরীর ভেঙে আসে, তখন ঘুম থেকে উঠে কাঁথা পালটানো বা দুধ খাওয়ানোর শক্তিও থাকে না তার। তাই জুড়ানও অন্য দুই ছেলেমেয়ের মতোই আয়াকে মায়ের চেয়ে বেশি চিনেছে।
সন্তানদের একশো পারসেন্ট মা হওয়া আর হল না তার। ছেলেমেয়েরা অতি সৎ ভব্য, কেতাদুরস্ত, মায়ের সঙ্গে তারা সবসময়েই সৌজন্যমূলক আচরণ করে। কোনও বেয়াদপি করে না কখনও, আর সেটাই তার বুক থেকে মাঝে মাঝে দীর্ঘশ্বাস টেনে বের করে।
একা বিছানায় শুয়ে কিছুক্ষণ এইসব ভাবল পারুল। তারপর ঘুমিয়ে পড়ল।
এঃ পারুল, তোমার ফ্যাট হয়ে যাচ্ছে! কথাটা সারা রাত ঘুমের মধ্যেও ক্রিয়া করল পারুলের মনে। অভ্যাসবশে খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠেই কথাটা মনে হল তার, একটু জগিং করা দরকার। তারপর কিছু স্ট্রেচ আর ফ্রি হ্যান্ড। জামশেদপুরে তার অনেক ব্যায়ামের যন্ত্রপতি পড়ে আছে। কতকাল ছোঁয়া হয়নি সেগুলো।
সে উঠে পড়ল। বাথরুম সেরে এসে সে ট্রাকসুট পরে নিল। পায়ে গলাল স্লিপার। ঠিক বটে, গাঁয়ের রাস্তায় ট্রাকসুট পরে দৌড়লে লোকে অবাক হবে। হোক গে। গেঁয়ো ভূতেদের জন্য নিজেকে গুটিয়ে রাখার মানে হয় না। সেই যে মেয়েদের কত বড় শত্রু তা সে খুব ভাল জানে। থপথপে, পেটমোটা, কিম্ভূতকিমাকার হওয়ার চেয়ে বরং মরা ভাল।
স্নিগ্ধ ভোরের আবছা আলোয় সে বেরিয়ে পড়ল।
নির্জন রাস্তায় সে তার পায়ের টুপটাপ শব্দটা শুনতে পাচ্ছিল। না, এখন সে আর আগের মতো হালকাপলকা নেই। শরীরের অনেক ঢিলা অংশ দৌড়ের তালে লাফাচ্ছে, বিশেষ করে পেট, বুক, নিতম্ব। হাঁফ ধরছে, ঘাম হচ্ছে।
গাঁয়ে আর আগেকার মতো ফাঁকা ফাঁকা ভাবটা নেই। কত বাড়িঘর উঠে গেছে। ভরাট হয়েছে কত শূন্যতা, বসত বাড়ছে, লোক বাড়ছে, এখন গাঁয়ে স্পষ্টই শহরের আদল।
ছুটতে ছুটতে রাস্তা ছেড়ে পোড়ো একটা জমি আড়াআড়ি পার হচ্ছিল সে। একটা আল। আলের ওপর সরু রাস্তা ধরে ছুটছিল সে।
আচমকাই—তাকে চমকে দিয়ে আলের পাশ থেকে চাবুকের মতো মাথা তুলল লেলিহান একটা প্রকাণ্ড সাপ।
পারুল শিহরিত হয়ে থেমে গেল, ভয়ে চিৎকার করতে গিয়ে হাঁ করে সে টের পেল গলা দিয়ে কোনও স্বর বেরোচ্ছে না। তার হাত পায়ে শীতল শিথিলতা, নড়তে পারছে না পারুল। মাত্র কয়েক ফুট দূরে পারুলের কোমর সমান উঁচু ফণা তুলে আছে সাপ। পুব আকাশের সিঁদুরে আভায় লকলক করছে, ঝলসাচ্ছে মৃত্যুদূত। শিকড়-বাকড়ের মতো তার কালো চেরা জিব বারবার চেটে নিচ্ছে শূন্যতা।
বিহ্বল, অবশ পারুলের চোখে চোখ রেখে তাকে সম্পূর্ণ সম্মোহিত করে ফেলেছে সাপ। পারুল টের পাচ্ছে, তার আর কিচ্ছুটি করার নেই। সে চোখ সরাতে পারছে না, তার পলক পড়ছে না, হাতে পায়ে সাড় নেই। সাপটা এখন এগিয়ে এসে যদি ছোবল দেয়, পারুলকে বিনা প্রতিরোধে ছোবলটা খেতেই হবে। এত অসহায় নিজেকে কখনও লাগেনি তার। বহু বছর আগে আর একটি সাপ তাকে খেয়েছিল বটে, সে ছিল মানুষ সাপ। তার বিষে জর্জরিত পারুলের মন থেকে বিশ্বাস, প্রেম, নির্ভরতা সব ঝুরঝুর করে সরে গিয়েছিল। আবাল্য প্রণয়ে বিষ ঢেলে দিয়েছিল অমল। সেই বিষে এক পারুল মরল, এক অমলও মরল।
আজ জীবনের আর এক লগ্ন। সামনে কালসাপ ফণা তুলে তার অমোঘ সম্মোহনে আচ্ছন্ন করে ফেলছে পারুলকে। পারুলের দু চোখে জল, তার মন অসংলগ্ন এক সংলাপ বলে যাচ্ছে, আমাকে কামড়াবে তুমি? কেন কামড়াবে বলো। দেখ, আমার মতো রূপ তুমি দেখেছ কখনও? এত রূপ নষ্ট করে দেবে? জানো আমার জীবন কত সুন্দর, কত সুখ আমার! সব নষ্ট করে দেবে? আমার কত কাজ পড়ে আছে, সব যে ভণ্ডুল হয়ে যাবে। আমার ছেলেমেয়েরা আর মা বলে ডাকবে না! তুমি কি জানো, আমার জুড়ান এখনও মা বলে চেনেনি আমাকে! আমাকে ভিক্ষা দাও আয়ু। আমাকে মেরো না। মেরো না…।
আজ এই ভোরে আলের ওপর চিকণ শরীরে দাঁড়িয়ে সম্মোহিত পারুল টের পেল, তার অস্তিত্ব থেকে ঝরে যাচ্ছে রূপ, যৌবন, সুখ, তার চালচিত্রে ঐশ্বর্যের পেখম গুটিয়ে নেতিয়ে পড়ে গেল। সে কাঁদছে, বাচ্চা একটা অবোধ মেয়ের মতো কেঁদে যাচ্ছে সে।
বিস্ফোরক কয়েকটি মুহূর্ত কেটে যাওয়ার পর সাপটা একটা তাচ্ছিল্যের শ্বাস ফেলে টেলিস্কোপের মতো ফণা নামিয়ে নিল। তারপর পোড়ো জমিটার ভিতরে ঝোপজঙ্গলের মধ্যে হারিয়ে গেল চোখের পলকে।
না, পারুল পালাল না, সে থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে নতজানু হয়ে বসল আলের ওপর। সাপের কাছ থেকে ভিক্ষালব্ধ প্রাণ, তুচ্ছ আয়ু যেন কাঙালিনীর মতো কুড়িয়ে নিল সে। সে বুঝতে পারল, কয়েকটা মুহূর্তের মধ্যে তাকে দুমড়ে, মুচড়ে নিংড়ে নিঃশেষ করে দিয়ে গেছে সাপটা, সে ফিসফিস করে বলল, আই অ্যাম নো গডেস, আই ওয়াজ নেভার এ গডেস, ওঃ গড।
কতক্ষণ বসেছিল তার হিসেব নেই, চোখে রোদ পড়ল, মাঠঘাট পরিদৃশ্যমান হল, চারদিকে সমবেত জাগরণের নানা শব্দ, ধীরে সংবিত ফিরে পেয়ে উঠে দাঁড়াল পারুল। চোখ মুছল। তারপর ফিরে এল বাড়িতে।
না, কারও কাছেই সে সাপের গল্পটা বলল না, যতদিন বাঁচবে ততদিন কারও কাছেই কখনও বলবে না। এ তো কোনও গৌরবগাথা নয়। এ তার এক পরাভবের গল্প। আজ ভিখারিণীর মতো লাগছে নিজেকে। অন্য রকম, যেন সে নয়।
সাপটা ঘাসজমি পেরিয়ে গেল। একটা ন্যাড়া ঢাল বেয়ে উপরে উঠে এল সে। এইখানে ঝিরিঝিরি গাছের ছায়া। একটা শ্লথ অবয়ব। একজন মানুষ পাজামা পরা দুটো পা ছড়িয়ে বসে আছে। পায়ে চটি। নিথর। সাপটা একটু থমকাল।
একটি ছোট্ট নৌকো পাল তুলে পাড়ি দিচ্ছে অনন্ত আকাশে। ধীর, অতি ধীর তার গতি, নৌকোয় কয়েকজন মানুষ। একটি শিশু, একটি বালক, এক কিশোর, একজন যুবক এবং জনৈক বৃদ্ধ। নৌকোর গতি ধীর। চারদিকে গাঢ় অন্ধকার। মাঝে মাঝে ছুটে আসছে অনিকেত উল্কা। মহাজাগতিক ধুলো। মাঝে মাঝে শোনা যাচ্ছে দূরাগত মহাবিস্ফোরণ বা সংঘর্ষ বা ঘূর্ণনের শব্দ। নক্ষত্রমণ্ডলীর ক্ষীণ আলোর আভায় তারা পরস্পরের মুখ দেখতে পাচ্ছে। তারা চলেছে ধীরে। কিন্তু অনায়াসে পেরিয়ে যাচ্ছে গ্রহ, নক্ষত্র, অতিকায় তারা বা কৃষ্ণগহ্বর।
বুড়োর হাতে পেনসিল, হাঁটুর ওপর রাখা একটা খাতা। বুড়ো মন দিয়ে একটা অঙ্ক কষছে।
যুবকটি জিজ্ঞেস করে, আর কত দূর?
বুড়ো খরখরে গলায় বলে, আর বেশি দূর নয় বাবারা। এসে গেছি। তবে ঠিকানাটা বড্ড প্যাঁচালো, অনেকটা ধাঁধার মতো। এই অঙ্কটা মিলে গেলেই ঠিকানাটা বেরিয়ে আসবে।
কিশোরটি বলে, আমার যে খিদে পেয়েছে বুড়ো।
আর একটু চেপে থাকো বাবা, কাছেপিঠেই এসে গেছি। অঙ্কটা মিললেই হয়ে গেল।
পিছনের বাচ্চাটা বলে উঠল, তুমি যে বলেছিলে বাবার কাছে নিয়ে যাবে!
হ্যাঁ গো দাদুভাই, বাবাও এখানেই আছেন। এইসব ধাঁধাধন্ধ কেটে গেলেই বাপের কোল। একটু রোখো বাবাসকল, অঙ্কটা মিললেই হয়।
বালকটি বলে ওঠে, আর অঙ্ক না মিললে?
না মিলে কি উপায় আছে শালার? সহজে ছাড়ব ভেবেছ? সেই কবে থেকে কষে আসছি, কষতে কষতে বুড়ো হয়ে গেলুম, না মিললে চলবে কেন?
যুবকটি চড়া গলায় বলে, অনেকক্ষণ ধরে তুমি ধাপ্পা দিয়ে যাচ্ছ বুড়ো, তোমার সব ফক্কিকারি। তোমার চালাকি আমি বুঝে গেছি। নৌকো ঝাঁকিয়ে এবার তোমাকে ফেলে দেব।
বুড়ো ঘ্যাঁস ঘ্যাঁস করে মাথা চুলকোয়। ছেলেগুলোর দিকে চোরা চোখে চায়, তারপর বলে, অঙ্কটার মধ্যে কিছু ফক্কিকারি ভয় আছে বটে, কিন্তু মিলে যাওয়ারই কথা।
বাচ্চাটা চেঁচিয়ে বলল, আমি বাড়ি যাব।
যাবে বইকী বাবা, যাবে বইকী। এখানে কাছেপিঠেই তোমাদের বাড়িঘর। শুধু অঙ্কটা মিলে গেলেই সব পরিষ্কার হয়ে যাবে। বাড়ির ঘাটে ভিড়ে যাবে নৌকো।
এসব তোমার চালাকি বুড়ো।
বুড়ো আর্তনাদ করে ওঠে, না না, মাইরি বলছি। আমি ঘাটের গন্ধ পাচ্ছি।
যুবকটি হিংস্র গলায় বলে, ছাই পাচ্ছ। তোমার সব মিথ্যে কথা।
বুড়ো ভারী জড়সড় হয়ে বলে, না গো, বাবাসকল, এই শেষের পথটুকুই যা গোলমেলে। আর দু-চার লাইনের মধ্যেই অঙ্কটা মিলে যাবে মনে হয়। মেরে এনেছি প্রায়। আর অঙ্ক মিললেই কেল্লা ফতে।
অঙ্ক-ফঙ্ক আমরা বুঝি না। আমরা বাড়ি যেতে চাই।
বুড়ো ভয়ে ভয়ে বলে, সে তো আমিও যেতে চাই বাবাসকল। একটু চেপে বসে থাকো, আর দেরি নেই।
কতকাল ধরে তুমি একই কথা বলে যাচ্ছ বুড়ো! আর নয়, এবার তোমাকে নৌকো থেকে ফেলেই দেব।
বুড়ো ফঁৎ করে নাকটা ঝেড়ে নিয়ে আতঙ্কিত গলায় বলে, তাহলে যে বড্ড পাপ হবে বাবা! আত্মহত্যা যে পাপ।
আত্মহত্যা?
নয়! আমাকে মারলে তুমি যে তোমাকেই মারবে।
তার মানে?
ভাল ঠাহর করে দেখ দিকি বাবা, আমার মুখখানা চেনা লাগছে না?
না তো!
ওই যে একটা বড় তারা আসছে কাছে, তার আলোয় ভাল করে দেখ। চেনা লাগে?
যুবকটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, তাই তো! তুমিই তো বুড়ো বয়সের আমি!
বুড়ো শতখান হয়ে হেসে বলে, তাই তো বলছি বাবা, এক নৌকোয় এই আমরা কজনা কি আলাদা? ওই আঁতুড় থেকে এই সেকেলে বয়স অবধি একটাই যে লোক। আলাদা আলাদা মনে হয় বটে, আসলে একটাই লোক যে, আবার একটা লোক হয়েও আলাদা আলাদা বটে।
তার মানে কী?
ওইটেই তো ধাঁধা। আর ওই ধাঁধার জন্যই তো শালার অঙ্কটা মিলে গিয়েও মিলতে চায় না। কেবলই ফ্যাকড়া বেরোয়। একটু চুপ করে বোসো বাবারা। আর একবার মাথা ঠান্ডা করে অঙ্কটা শুরু থেকে কষে দেখি। কোথায় যে শালা ভুল হচ্ছে।
সবাই চুপ করে বসে রইল। নৌকোটা দুলে দুলে চলতে লাগল। কত যুগ কেটে যেতে লাগল। কত আলোকবর্ষ পার হল তারা। তবু পৌঁছল না। শুধু কাগজের ওপর পেনসিলের শব্দ হয়ে যাচ্ছে খস্ খস্ খস্ খস্।
গাছের নিবিড় ছায়ায় বসে লিখতে লিখতে অমল একটা খড়মড় শব্দ পেল। খেয়াল করল না। কিন্তু আচমকা পায়ের ওপর ঠান্ডা একটা স্পর্শ পেয়ে ঘোর লাগা চোখে চাইল। প্রথমটায় বুঝতেই পারল না ব্যাপারটা। কালো লম্বা ভারী কী একটা জিনিস তার পায়ের ওপর দিয়ে চলে যাচ্ছে।
কিছুক্ষণ অবাক চোখে চেয়ে থেকে হঠাৎ বুঝতে পারল সে, ওটা সাপ। অমল নড়ল না। ভয়ও পেল না তেমন। খুব অন্যমনস্কভাবে যেন, দ্বিতীয় কোনও ব্যক্তির পায়ের ওপর দিয়ে সাপের বিচিত্র গমন অবলোকন করতে লাগল সে।
সাপটা তার পা পেরিয়ে ঘাসজঙ্গলে মিলিয়ে যাওয়ার পর যে একটু হাসল। তারপর আবার মগ্ন হয়ে লিখতে লাগল।
সাড়ে চারটেয় স্কুল ছুটির পর বাড়ি ফিরছিল মরণ। কিছু দূর পর্যন্ত বন্ধুরা থাকে। তারপর খানিকটা পথ সে একা। কাঞ্জিলালদের জমিটা কোনাকুনি পার হওয়ার সময়েই দেখা হয়ে গেল তাদের। মুখোমুখি।
বোধহয় নিজের নিয়তির নির্দেশ টের পেয়েই সাপটা মরণের পথ থেকে দ্রুত সরে যাচ্ছিল। মরণ টক করে একটা ঢিল তুলে নিয়ে ওর মুখের কাছে আলতো হাতে ছুড়ে দিল। জানে, এবার ও ফণা তুলবে। ফণা তোলাটাই দেখতে মজা।
তীব্র শ্বাসের শব্দ তুলে পাকা গোখরোটা প্রশ্ন চিহ্নের মতো উঠে দাঁড়াল শূন্যে।
মরণের ডান হাতে আধলা ইট। একটু নাচিয়ে নিল সে। তার টিপ অব্যর্থ, কখনও ফসকায় না।
ঢিলটা তুলেও ছিল মরণ। কিন্তু আচমকাই তার মনে পড়ে গেল, শিবঠাকুরের গলায় মালা হয়ে দোলে সাপ। ঠাকুরের জটা জড়িয়ে থাকে। সাপ মারলে শিব ঠাকুর রাগ করবেন না? কয়েকদিন আগেই শঙ্কর মাস্টারমশাই ক্লাসে পড়ানোর সময় বলছিলেন, সাপ পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করতে সাহায্য করে।
মরণের মনে পড়ল, আজকাল গাঁয়ে আর বেশি সাপ দেখা যায় না তো আগের মতো। মাঠঘাট জুড়ে কত বাড়িঘর হচ্ছে, সাপের থাকার জায়গাই নেই আর বিশেষ।
মরণ চিন্তিতভাবে আধলাটা দোলাল হাতে।
সাপটা যেন করুণ চোখে চেয়ে ছিল মরণের দিকে। যেন প্রাণভিক্ষা চায়।
মরণ হঠাৎ ঢিলটা ফেলে দিয়ে বলল, যাঃ চলে যা। মারব না।
কৃতজ্ঞ সাপটা তার প্রাণ ভিক্ষা পেয়ে মাথা নত করল। তারপর মিলিয়ে গেল তার নিচু অন্ধকার জগতে।
মহৎ একটা কাজ করার পর প্রসন্ন মনে বাড়ি ফিরতে লাগল মরণ।
______
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন