শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
মাঘ মাসের রাত দশটায় হঠাৎ বাই চাপল রুইমাছের কালিয়া খাব। খাবেন তত খাবেনই। হ্যারিকেন নিয়ে বড় ছেলে গৌরাঙ্গ আর চাকর শিবু গিয়ে পুকুরে জাল ফেলল। উঠল দশসেরী পেল্লায় এক রুই। কেটেকুটে রান্না করতে করতে রাত বারোটা। তৃপ্তি করে খেয়ে উঠে গৌরহরি গিয়ে শুয়ে পড়লেন। কোনও দিকে ভ্রূক্ষেপ নেই। কালিয়া খেতে চেয়েছিলেন, খাওয়া হয়েছে, ব্যাস আর কী। ওদিকে বাড়ির গিন্নিকে ওই রাতে পাহাড়প্রমাণ সেই মাছ সাঁতলাতে হল। পেটের খিদে পেটেই মরে গেল। যখন এক গেলাস জল খেয়ে শুতে গেলেন তখন ভোর হতে আর বাকি নেই। পরদিন সেই বিপুল মাছ পাড়াপ্রতিবেশীদের বিলি করা হয়েছিল, মাছের সঙ্গে সঙ্গে কালিয়ার গল্পও বিলি হল। বৃত্তান্ত শুনে এসে হাজির হয়েছিল মহিম রায়।
এসব কী হরিদা, বাড়ির পাঁচজনের সুখসুবিধের কথা যে একটুও ভাবেন না। এ কি ভাল?
গৌরহরি অতীব সুপুরুষ, গৌরবর্ণ, লম্বাচওড়া হাড়েমাসে চেহারা। মুখে একটু বিদ্রূপের হাসি, তুই খুব ভাবিস বুঝি? সেইজন্যই তোকে কেউ মানে না।
কথাটা পাথুরে সত্যি। একটা লোক কীভাবে আধিপত্য করে, কোন মন্ত্রবলে মান্যগণ্য হয়ে ওঠে এ তত্ত্বটা আজও বোঝা হল না মহিমের।
একটা মামলার রায় বেরোল বিকেলে। সতেরো জন ফৌজদারি মামলার আসামি। খালাস হতে হতে সন্ধে পেরিয়ে গেল যখন, তখন আর তাদের বাড়ি ফেরার বাস নেই। ট্যাঁকেও নেই পয়সা। গৌরহরি বিন্দুমাত্র চিন্তা না করে বর্ধমান থেকে তাদের সোজা নিজের বাড়িতে এনে তুললেন। সতেরোটা উপোসি ষণ্ডামার্কা গেঁয়ো লোক। এমনিতেই তারা ভাতের পাহাড় এক চোপাটে উড়িয়ে দেয়। সেদিন তারা দুনো খিদে নিয়ে যে পরিমাণ ভাত খেল তা টিকিট কেটে দেখার মতো দৃশ্য। সতেরোটা মুখের ভাত ডাল জোগাতে বাড়ির গিন্নির কী হাল হল তা ফিরেও দেখেননি গৌরহরি। ওটা দেখা যেন তার কাজ বা কর্তব্য নয়।
তিন ভাইয়ের পৈতৃক বাড়ি। দালানকোঠা জমি নিয়ে বিরাট সম্পত্তি। হঠাৎ গৌরহরির খেয়াল হল দুই ভাইয়ের অংশ কিনে নিতে হবে। প্রস্তাব উঠতেই রামহরি আর নরহরি গাঁইগুঁই করতে লাগল। পৈতৃক ভিটে ছাড়বে না। গৌরহরি তখন দাম বাড়াতে লাগলেন। শেষমেশ সেই দাম এত অবিশ্বাস্য রকমের উঁচুতে তুলে দিলেন যা দিয়ে গোটা বাড়িটাই দুবার কেনা যায়। তখন আর ভাইরা আপত্তি করল না, আপত্তি করাটা হাস্যকর হয়ে দাঁড়াত। কিন্তু আপত্তি তুলতে পারত বাড়ির লোকেরাই। দুই উপযুক্ত ছেলে, গিন্নি। তারা বুঝিয়ে বলতে পারত, এরকম আকাশছোঁয়া দাম দিয়ে দুটো অংশ কেনা আহাম্মকি হচ্ছে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, কেউ শ্বাসটুকুও ফেলেনি।
কিন্তু মহিম রায় বলেছিল, দাদা, এ যে হাতির দামে নেংটি ইঁদুর কেনা হল!
গৌরহরির প্রতিক্রিয়া হল সামান্যই। ভ্রূ দুটো একটু উঁচুতে তুলে বললেন, দামের তুই জানিস কী? সারা জীবন চার আনা আট আনার হিসেব কষে মরলি, দাম কাকে বলে তা শিখলি কই?
মহিম আর পারেনি। বলে ফেলেছিল, আপনি যেন শরৎ চাটুজ্জের নবেলের ক্যারেক্টার, রক্তমাংসের মানুষ নন।
গৌরহরির ঠোঁটে বাঁকা বিদ্রূপের হাসিটি বদলাল না। ঠান্ডা গলায় বললেন, তুই বড্ড গেরস্ত। অত গেরস্ত হোস না, কষ্ট পাবি।
যে সুরে চাকর-বাকরকে হুকুম করতেন সেই একই সুরে নিজের দুই ছেলেকেও হুকুম করতেন। ছেলে দুটো দিশেহারা হয়ে বাপের হুকুম তামিল করতে ছুটত। ফুলের মতো সুন্দর দুটো মেয়েও কদাচিৎ আসকারা পেত তাঁর কাছে। ছেলেপুলেদের নাড়াঘাঁটাও করতেন না বড় একটা।
সেই মেজাজি, অহংকারী, দাপুটে এবং খানিকটা আত্মসর্বস্ব ও অত্যাচারী পুরুষটি যখন মারা যাচ্ছিলেন তখন মহিম রায় সেখানে আগাগোড়া উপস্থিত। ডাক্তার নাড়ি দেখছেন, আর পুরো পরিবারটা একাগ্র হয়ে ঝুঁকে আছে তাঁর ওপর। চোখ পলকহীন। শ্বাস পড়ছে না কারও। শিয়রে পাথরপ্রতিমার মতো বউঠান। ডাক্তারের একটা নেতিবাচক মাথা নাড়ার পরই একটা দীর্ঘ হাহাকারে ভরা আর্তনাদ করে বউঠান অজ্ঞান হয়ে সোজা মেঝেতে পড়ে গেলেন। দুই ছেলে আছড়ে পড়ল বাবার বুকে। দুটি পুত্রবধূ দুই পা আঁকড়ে ধরে সে কী কান্না!
সারাটা জীবন যে পরিবারটিকে নাজেহাল করে ছেড়েছেন গৌরহরি, যাঁর মর্জি সামলাতে পরিবারের লোকজনকে ধিন ধা নাচতে হয়েছে, তাঁর মৃত্যুতে তো পরিবারটার হাঁফ ছাড়ার কথা। কিন্তু সেরকম হল না তো! বরং মনে হল, গৌরহরির সঙ্গে সঙ্গে যেন এ বাড়ির সূর্যাস্ত হয়ে গেল।
জ্ঞান ফেরার পর বউঠান কেবল বলছিলেন, আমি ওঁর সঙ্গে যাব, কিছুতেই আমি আর বেঁচে থাকতে পারব না।
মহিম রায় মুগ্ধ চোখে চেয়ে দেখছিল, মুগ্ধ কানে শুনছিল। এ সে শুনছে কী? একজন স্বাধিকারপ্রমত্ত অত্যাচারী স্বামীর নির্যাতিতা স্ত্রী বলছে এ কথা? এও কি সম্ভব?
মেলে না, মেলে না, হিসেব কিছু মিলতে চায় না। এই ঊনআশি বছর বয়সে জীবনের অঙ্কে ভুল ধরা পড়ে সে যেন মনে মনে কানমলা খায়। হরিদার কাছে সে অনেক ব্যাপারেই হেরে-যাওয়া মানুষ, কিন্তু মরার ভিতর দিয়ে সেই পরাজয়ের বিপুলতা যেন আরও উদঘাটিত করে দিয়ে গেছে লোকটা।
যে ছেলেটিকে বাপের খেয়াল মেটাতে মার্চ মাসের হাড়কাঁপানো শীতের রাতে পুকুরে জাল ফেলে মাছ তুলতে হয়েছিল, ফিজিক্সের কৃতী অধ্যাপক সেই ছেলে ঝান্টু বাপের বুক থেকে হঠাৎ মুখ তুলে ছোট ভাইকে ব্যস্তসমস্ত হয়ে বলে উঠল, এই মন্টু, দেখ দেখ, বাবার বুকে যেন হার্টবিট পাচ্ছি! কেমন শব্দ হচ্ছে বুকের মধ্যে। বাবা নিশ্চয়ই মরেনি! ফকিরবাবার জল-পড়া খাইয়েছি, মরতে পারেই না।
কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার ছোট ছেলে মন্টু ভ্যাবলার মতো বাবার বুকে কান পেতে কী শুনছিল কে জানে। কিন্তু মহিমের মনে হচ্ছিল, ফকিরবাবার জল-পড়ার গুণ নয় বাবারা, বেঁচে উঠলে হরিদা তোমাদের পিতৃভক্তির জোরেই বেঁচে উঠত। ঘোর কলিকাল বাবারা, নইলে এত ভালবাসা বৃথা যেত না।
দুটি ছেলে সারাজীবন বাপের সঙ্গে কথা বলার সময় দাঁড়িয়ে কথা বলেছে, কখনও বসেনি। বউমারা এই আধুনিক যুগের মেয়ে হয়েও শশুরের সামনে ঘোমটা ছাড়া আসেনি। শোকের বাড়ি যখন মুহ্যমান, চারদিকে কান্নার রোল, তখন মহিম মৃতের ঘরে আনন্দে অভিভূত হয়ে বসে আছে। তার চারদিকে যেন সত্যযুগের হাওয়া বইছে।
শরীর ভাল নয়, সবাই বারণও করেছিল, তবু মহিম রায় গৌরহরির মৃতদেহের অনুগমন করেছিল। তখন গভীর রাত, তিন মাইল রাস্তা ভেঙে যেতে যেতে মনে মনে বলেছিল, কায়দাটা শিখিয়ে দিয়ে গেলেন না হরিদা! বহুকাল ধরে চেলাগিরি করলুম তবু শিখতে পারলুম কই? না কি এসব শেখার বা শেখাবার জিনিসই নয়, এসব কেউ কেউ নিয়ে আসে!
না, মহিম রায় কখনও গৌরহরি চাটুজ্জের মতো ছিল না। সে বরাবর তার পরিবারের প্রতি অত্যধিক স্নেহশীল। পাঁচজনের দুঃখকষ্টের কথা ভেবে সর্বদাই নিজেকে আরাম আয়েস থেকে গুটিয়ে রেখেছে, এক গেলাস জল কাউকে গড়িয়ে দিতে বলতেও ছিল ভারী কুণ্ঠা। ছেলেদের সঙ্গে এক সারিতে খেতে বসেছে, বড় মাছের টুকরোগুলো ছেলেদের পাতেই দিয়েছে দেবিকা—তার বউ। কখনও তাতে কিছু মনে করেনি মহিম। ভুলটাও কি সেখানেই? তখন থেকেই কি সংসারে সে উদ্বৃত্তের খাতে?
যখন মেজো ছেলে অমল ক্লাসে কাঁড়ি কাঁড়ি নম্বর পেয়ে ফার্স্ট হওয়া শুরু করল তখন হল আরও চিত্তির। প্রথমে আনন্দ এবং বিস্ময়। পুত্রগৌরবে বুক তিন ইঞ্চি বেড়ে গেল। মাধ্যমিকে স্ট্যান্ড করে যখন সেই ছেলে হইচই ফেলে দিল তখন এল ভয়। ছেলেকে সেই থেকে সমীহ করতে শুরু করেছিল সে। বাপকে কোনওদিনই ছেলেরা সমীহ করত না। অমলের তাচ্ছিল্যটা ছিল আরও প্রকট। কৃতী ছেলেদের বোধহয় সেই অধিকার জন্মায়—এই ভেবে মহিম মেনেও নিল ব্যাপারটা। দেবিকা মাঝে মাঝেই বলত, অমল! অমল তো মানুষ নয়, ভগবান।
জিন থেকেই সব হয়-টয় বলে শুনেছে মহিম। বংশধারার কোন গাঁটে কোন জিন যে ঘাপটি মেরে থাকে আর তা থেকে কী করে যে এক একজন এরকম দলছুট জন্মায় কে জানে! নইলে তার মতো অ্যাভারেজ সাদামাটা মানুষের ঘরে অন্য সব সাদামাটা ছেলেমেয়ের মধ্যে একটা কী করে অমন মাথাওলা বেরোল!
ঠোঁটকাটা, বদরসিক রসময় একবার বলেছিল, ওরে, এ যে কাকের ঘরে কোকিলের ছা। তোর হাতে আর কেউ তামাক খেয়ে গেল না তো!
এ কথায় প্রায় হাতাহাতি হওয়ার উপক্রম। ঠাট্টাই হবে, তবু অমন ঠাট্টা কেউ করে? আজ অবশ্য কথাটা ভাবলে রাগ হয় না। অমল কি সত্যিই তার ছেলে? সে কি ওর নির্মাতা? ওর চোখ, কান, মুখ, মন, মেধা এসব তো মহিমের তৈরি নয় হে বাপু। সে জন্মদাতা হতে পারে, সৃষ্টিকর্তা তো নয়।
অমলের সঙ্গে ভাবভালবাসা হয়েছিল গৌরহবিদার ছোট মেয়ে পারুলের। সেটা মহিমের কাছে আনন্দের ব্যাপারই ছিল। হরিদার সঙ্গে একটা আত্মীয়তার সম্পর্ক তার আকাঙক্ষারই বস্তু! তা ছাড়া ও-বংশের মেয়ে ভালই হওয়ার কথা। যে মেয়ে নিজের বাবার সেবা করে বড় হয়েছে সে স্বামীর ঘরে এসেও সবাইকেই সুখী করে।
কিন্তু আচমকাই পারুলের অন্য পাত্রের সঙ্গে বিয়ে ঠিক হয়ে গেল।
মহিম রায় দৌড়ে গিয়েছিল গৌরহরির কাছে।
হরিদা, এ কী শুনছি!
গৌরহরি বৈঠকখানায় বসে দলিলপত্র দেখছিলেন। তলচক্ষুতে তাকে একটু দেখে নিয়ে বললেন, কখনও প্রেমে-ট্রেমে পড়েছিস?
আমি! কী যে বলেন! আমাদের সুযোগ ছিল কোথায়?
তাহলে বুঝবি কী করে? ও-বস্তু আমারও তো হয়নি। পঁচিশ বছর বয়সে একটা দশ বছর বয়সি মেয়ের সঙ্গে বিয়ে দিয়েছিল বাবা। সে প্রেম করবে কী, ভয়েই মরে। তাই বলছি এসব আমাদের বোঝবার কথা নয়।
কিন্তু ওদের যে ভালবাসা ছিল, বিয়ের কথা হয়ে আছে।
তাই তো বলছি। তুই কি ভাবছিস আমি জোর করে পারুলের বিয়ে অন্য জায়গায় দিচ্ছি? সেসব ভাবিসনি। অমল ভাল ছেলে, আমাদের সকলেরই পছন্দ। কিন্তু বিয়েটা হচ্ছে পারুলের ইচ্ছেতেই।
কেন এরকম হল হরিদা?
বললুম যে, তুই আর আমি দুজনেই পুরনো আমলের মানুষ, এসব আমাদের বোঝার কথা নয়। তবে এসব প্রেম-ট্রেম হল কাঁচা মাটির কাজ। জলে বৃষ্টিতে গলে ধুয়ে যায়। সংসারের আঁচে না পড়লে কি এসব পাকাপোক্ত হয়? ওদের প্রেম কেঁচে গেছে।
মনটা বড় দমে গেল মহিমের।
গণ্ডগোলটা কোথায় হল হরিদা?
গৌরহরি মাথা নেড়ে বলেছিলেন, সবটাই গণ্ডগোল, আগাপাশতলাই গণ্ডগোল। মন খারাপ না করে বাড়ি যা। অমলের একটা ভাল দেখে বিয়ে দে।
দেবিকা ফুঁসেছিল খুব, হুঁ, অমন সুন্দরী কত আমার অমলের পায়ে গড়াগড়ি যাবে। কত বড় ঘরের মেয়ে যেচে আসবে। দেখে নিও।
দেখা ছাড়া মহিমের কিছু করারও ছিল না। সংসারের প্রায় কোনও ব্যাপারেই তার মতামতের তোয়াক্কা কেউ করত না কখনও। পারুলের বিয়ের মাসখানেকের মধ্যেই অমল আর তার মায়ে মিলে বিয়ের ব্যবস্থা করে ফেলল। সেই বিয়েতে মহিমের ভূমিকা বরকর্তার মতো ছিল না, ছিল আমন্ত্রিত একজন অতিথির মতোই। বড় ঘরেরই মেয়ে, সুন্দরীও। কিন্তু মহিমের তেমন কোনও আহ্লাদ হল না। বিয়ের পরই ছেলে-বউ উধাও হয়ে গেল বোম্বেতে। তারপর বিদেশে। মুছেই গেল জীবন থেকে। যেমনটা হয়ে থাকে।
আজ তৃষিত চোখে বসে গৌরহরিদার দুই ছেলের পিতৃতর্পণ মন দিয়ে আগাগোড়া দেখছিল মহিম। দুটো ছেলেই নিষ্ঠার সঙ্গে হবিষ্যি করেছে, ন্যাড়া হয়েছে, নাবালক দুটি অনাথের মতো বসে বাবার স্বর্গের পথ পরিষ্কার করার চেষ্টা করছে। প্রচুর দানসামগ্রী, বিরাট আয়োজন। কোথাও কিছু অভাব রাখেনি। দেখে চোখ জুড়িয়ে যায়। স্বর্গের পথ পরিষ্কার না হোক এত ভালবাসার কি দাম নেই নাকি? মহিম মরলে তার ছেলেরাও হয়তো নেড়া হবে। কিন্তু হবে বিরক্তির সঙ্গে। শ্রাদ্ধও কি করবে না? করবে, তবে তাচ্ছিল্যের সঙ্গে। মনে মনে বলবে, বাপটা মরে বড্ড ফাঁসিয়ে দিয়ে গেছে।
কাকা, অমন চুপটি করে বসে আছেন যে!
চোখ তুলে চোখ দুটো জুড়িয়ে গেল মহিমের। পারুল।
ক্লিষ্ট হেসে বলল, এই বসে বসে দেখছি।
ওসব আপনাকে দেখতে হবে না। বরং ঘরে এসে মায়ের সঙ্গে বসে গল্প করুন।
বুদ্ধিমতী মেয়ে। হয়তো ভেবেছে, বুড়ো মানুষের এই বসে বসে অন্যের শ্রাদ্ধ দেখাটা বোধহয় ভাল হচ্ছে না।
মহিমের চোখে জল আসছিল। বলল, মরার কথা মনে হচ্ছে না মা, ভালবাসার কথা মনে হচ্ছে। হরিদা বড় ভাগ্যবান।
না কাকা, ওসব ভাবতে হবে না। ঘরে চলুন, এখানে যজ্ঞের ধোঁয়া লাগছে আপনার। মুখটাও তো শুকিয়ে গেছে! ডাবের জল খাবেন?
না মা, ওসব দরকার নেই।
তাহলে বরং আপনাকে এক কাপ চা দিই।
হাতে চায়ের কাপ নিয়ে অভিভূতের মতো বসে রইল মহিম। এইটুকু সমাদরও যেন অনেক। অমলের সঙ্গে পারুলের বিয়েটা হয়নি বলে আজ বিশ বছর বাদে নতুন করে বুকটা ব্যথিয়ে উঠছিল তার। চায়ে চুমুক দেওয়া হল না। হাতে ধরা চায়ের কাপ ঠান্ডা হয়ে গেল, বুকের ভিতরটা হল না। একটা চাপা-পড়া আগুন বহুকাল বাদে ধীইয়ে উঠল।
সারাদিন আজ শ্রাদ্ধবাড়িতেই কেটে গেল মহিম রায়ের। গৌরহরিদা নেই, না থেকেও বাড়ির সর্বত্র ছড়িয়ে আছেন। মরে যাওয়ার পরও এক একটা মানুষ বহুকাল থেকে যায়। ধ্যানে, শোকে, মনে পড়ায়, শূন্যতায় সে বারবার জয়ন্ত হয়ে ওঠে। কারও কারও মরার পরেও মরে যেতে অনেক সময় লাগে।
সন্ধের পর ফিরছিল মহিম। বেলা ছোট হয়ে গেছে, টক করে বড্ড অন্ধকার হয়ে যায়। টর্চটাও আনেনি সঙ্গে। চোখের তেমন জোর নেই আজকাল। বেগুনক্ষেতের পাশ দিয়ে মেটে রাস্তা ধরে আনমনে ধীর পায়ে হেঁটে ফিরছে মহিম। বিষণ্ণতায় সামান্য নুয়ে-পড়া শরীর।
হঠাৎ আবছা আঁধারে একটা সাদা ছায়ামতো ঝোপঝাড় থেকে বেরিয়ে এসে আবার অন্ধকারে দ্রুত মিলিয়ে গেল। থমকাল মহিম। কে ওটা? আবার সাদা ছায়ামতো কী যেন দুলে উঠল সামনে। লহমায় মিলিয়ে গেল।
কে? কে রে?
কেউ জবাব দিল না। সামনে বুক সমান ফণীমনসার আড়াল। তার ওপাশে ফটিক কাঞ্জিলালের পতিত জমি। ফটিক বাড়ি করবে বলে জমিটা কিনে ভিতপুজো অবধি করেছিল। তারপর বউয়ের সঙ্গে ঝগড়া করে আমগাছে ফাঁসি দিয়ে মরে। বাড়িটা আর হয়নি। জমিটা আগাছায় ভরা। মাঝখানে অভিশপ্ত আমগাছটা ঝুপসি হয়ে দাঁড়িয়ে। সাপ-খোপের আড্ডা। লোকে অশরীরীর ভয়ও পেত আগে। ফটিক নাকি ওখানেই গেড়ে বসে আছে, জ্যান্ত লোকদের মরার জন্য ডাকাডাকি করে।
মহিমের ভূতের ভয় নেই। কিন্তু সাদাটে ছায়াটা কীসের তা বুঝতে পারল না। এ সময়ে কুয়াশা একটু হয় বটে, কিন্তু কুয়াশা তো ছুটে বেড়াবে না। চোখেরই ভুল হল কি?
মহিম রায় গুটি গুটি আরও কয়েক পা এগোল। না, চোখের ভুল নয়। ফটিকের পতিত জমিতে বাস্তবিক একটা সাদা মূর্তি দু হাত দুদিকে পাখির ডানার মতো ছড়িয়ে দিয়ে ধীরে ঘুরে ঘুরে ঢেউ হয়ে নেচে বেড়াচ্ছে। শিউরে উঠল মহিম। কত ইট কাঠ পড়ে আছে জমিতে, কত আগাছার দুর্ভেদ্য জঙ্গল। সাপ-খোপ এবং হীন দংশক প্রাণীদের আড্ডা। কোনও মানুষ এই সন্ধেবেলা ওখানে যায় পাগল না হলে?
কে? কে রে ওখানে?
মূর্তিটা যে মেয়েছেলের তাতে সন্দেহ নেই। মহিম স্তম্ভিতের মতো দাঁড়িয়ে দৃশ্যটা দেখতে লাগল। মেয়েটা ঢেউয়ের মতো শরীর বইয়ে দিচ্ছে, নানা বিভঙ্গে হেলে যাচ্ছে ডাইনে বাঁয়ে পিছনে। ঝুঁঝকো আঁধারে বোঝা যাচ্ছে গলা থেকে গোড়ালি অবধি একটা সাদা পোশাক পরে আছে মেয়েটা।
হঠাৎ তার মনে পড়ে গেল এরকম একটা পোশাক কয়েকদিন আগে সোহাগকে পরতে দেখেছিল মহিম। পোশাকটার ওপর জরির বুটি আছে। নিজের নাতনি, কিন্তু ওর সঙ্গে ভাল করে পরিচয়ই নেই মহিমের। ওরা কথা-টথা বিশেষ বলতে চায় না কারও সঙ্গে। একটা কঠিন, নীরব দূরত্ব বজায় রাখে। কিছুদিন আগে অমল হঠাৎ একদিন এসে ওদের পৌঁছে দিয়ে গেল। বলে গেল, ওরা এখন কিছুদিন এখানেই থাকবে। মেয়ের নাকি একটু চেঞ্জ দরকার। খরচের টাকাপয়সাও দিয়ে গেল দাদা কমলের হাতে।
একটু অবাকই হয়েছিল মহিম। ওরা কস্মিনকালেও কেউ এখানে আসে না। দু মাস চার মাস পরে হয়তো কখনও অমল এসে হাজির হয়, এক বেলা থেকেই চলে যায়। হয়তো চেনা দিয়ে যায়, সৌজন্য বজায় রাখে। অমল এলেও পরিবার কখনও আনে না। তাই ওদের সঙ্গে ভাব বা ভালবাসা কিছুই হল না। আত্মীয়তা বা রক্তের সম্পর্ক ইত্যাদি ব্যাপারগুলো ক্রমেই বস্তাপচা বর্জ্য ধারণা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। একদিন হয়তো বাপ-ছেলের সম্পর্কও ঘুচে যাবে। যাবে কেন, যাচ্ছেও ক্রমে ক্রমে। শ্বশুর, ভাসুর, দেওর, ননদ এসব শব্দ থাকবে শুধু ডিকশনারিতে। সেটা মহিম এই জীবনেই টের পেয়ে যাচ্ছে।
বউমাটি এসে প্রথম দিন তাকে একটা প্রণাম করেছিল। খুব ভক্তিভরে নয়, পা দুটো ভাল করে ছোঁয়ওনি, একটু ভান করেছিল মাত্র। ব্যস, তারপর সেই যে আলগোছ হল, তারপর আর মুখোমুখিই হল না একই বাড়িতে থেকেও। নিজেরা নিজেরা থাকে, নিজেদের মধ্যেই ইংরিজিতে কথা কয়, ঝগড়া-টগড়ার শব্দও কানে আসে।
মহিমাদীপ্ত রায় নামে যে ছেলেটি একসময়ে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরিজিতে এম এ পাস করেছিল তাকে আজকের মহিম রায় বলে চেনা মুশকিল। না, দুটো লোক এক নয়। মহিমাদীপ্তর দীপ্তি আর মহিমা দুটোই অস্তাচলে গেছে। এখন এই যে মহিম রায় নামে লোকটি এ এক গেঁয়ো ভিতু মানুষ, দেখলে মুখ্যু বলেই ধরে নেবে মানুষ। মুখ্যু ছাড়া আর কী? কবে দু পাতা অংবং ইংরিজি পড়েছিল তার জোরে কি আর বিদ্বান বলে পরিচয় দেওয়া যায়। লোকে ভুলে গেছে, মহিম রায় নিজেও ভুলে গেছে। কোন তোরঙ্গের অন্ধকারে লজ্জায় মুখ লুকিয়ে পড়ে আছে সার্টিফিকেটখানা।
তবে ওই ডিগ্রির জোরে রেলে চাকরি পেয়েছিল মহিম রায়। শিয়ালদার ক্রু ইন চার্জ। কিন্তু বেশিদিন চাকরিটা করে উঠতে পারেনি। বদলির চাকরি, ঘুরে ঘুরে কয়েক জায়গায় বদলি হওয়ার পর শরীর খারাপ হতে লাগল, পেটে জাপ্পো আমাশা। বাবা বলল, চাকরির দরকার নেই, জোতজমি যথেষ্ট আছে, গাঁয়ের হাই স্কুলে ইংরিজির মাস্টারও দরকার। এলেই হয়।
সেই চলে আসা। কিছুদিন হাই স্কুলে ইংরিজি পড়িয়েছিল। তারপর বিদ্যাচর্চা সেই যে থেমে গেল আর চালু হয়নি।
ভুলেই গিয়েছিল সবাই, হঠাৎ বুঝি একদিন সন্ধ্যার মনে পড়ে গেল যে, তার বাবা ইংরিজিতে এম এ পাস। একদিন সন্ধেবেলা সে এসে হামলে পড়ল, ও বাবা, তুমি কী গো!
কেন, হলটা কী রে?
ওরা যে অত কটর কটর করে ইংরিজি বলে আমাদের দিনরাত জব্দ করছে, আর তুমি চুপ করে বসে আছ! তুমি না ইংরিজিতে এম এ পাস!
তাতে কী হল?
মুখের ওপর দুটো ইংরিজি কথা শুনিয়ে দিতে পারো না ওদের?
অবাক হয়ে মহিম বলল, কেন রে, ওরা ইংরিজি বলছে বলে আমি কেন ইংরিজি বলতে যাব?
কেন বলবে না শুনি? ওরাও দেখুক, আমরা ওদের চেয়ে কিছু কম নেই।
মায়াভরে একটু হেসেছিল মহিম। তার এই মেয়েটির লেখাপড়ার মাথা ছিল না। ক্লাস সিক্স অবধি উঠতেই গলদঘর্ম হয়ে ইস্তফা দিল। হয়ত সেইজন্য মনে মনে নিজেকে ছোট ভেবে কষ্ট পায়, হিংসেতে জ্বলেও হয়তো একটু।
মহিম রায় স্নিগ্ধ গলায় বলেছিল, তুই কি ভাবিস ওরা ইংরিজি শুনে জব্দ হয়ে যাবে? ব্যাপারটা তা নয় রে।
না বাবা, দিনরাত বড় অপমান লাগছে আমার। ইংরিজিতে আমাদের নিয়ে খারাপ খারাপ কথা বলে, ঠাট্টাইয়ার্কি করে। অন্তত আমরা যে ওদের কথা বুঝতে পারছি সেটা ওদের জানিয়ে দেওয়া দরকার। তাহলে সাবধান হবে, আর বলবে না। যখনই ওরা কেউ উঠোনে নেমে আসবে তখনই এই জানালা দিয়ে তুমি ওদের লক্ষ করে খুব ইংরিজি বলে দিও। দু-চারবার বললেই দেখবে কাজ হচ্ছে।
মহিম রায় কী বলবে ভেবে পেল না। মুখ্যু-সুখ্যু মেয়েটার জীবনে অনেক দুঃখ। তার ওপর এই ইংরিজি না-জানার দুঃখটা চেপে বসায় মাথাটা গরম হয়েছে। জানালা দিয়ে খামোখা ইংরিজি আউড়ে যাওয়ার হাস্যকরতা ও বুঝতেই পারছে না।
সন্ধ্যা বুঝবে না, ইংরিজি কোনও বাধা নয়। ওদের সঙ্গে তাদের দূরত্ব শুধু ইংরিজিই তো রচনা করেনি। করেছে মনোভাব। সেটা সন্ধ্যা বুঝবে না।
মহিম রায় দীর্ঘশ্বাস ফেলেছিল।
সন্ধ্যা ফিস ফিস করে বলল, অত দেমাক দেখাচ্ছে, জানো তো মেয়েটা কলকাতায় একটা কিছু কেলেঙ্কারি করে এসেছে।
কেলেঙ্কারি! কী করেছে?
কিছু একটা হবে। যখন মায়ে মেয়েতে ঝগড়া হয় তখন বুঝতে পারি।
মহিম ক্লান্ত বোধ করে। সন্ধ্যা ওদের পছন্দ করে না বলেই বানিয়ে বলছে বোধহয়। বড্ড জ্বলুনি হচ্ছে মেয়েটার। কিন্তু এসবের নিদান তো তার জানা নেই।
ঘরে বসে অবশ্য লক্ষ করে মহিম। ছেলেটা, মেয়েটা, বউমা মাঝে মাঝে আলাদা আলাদা উঠোনে নেমে আসে। জানালা দিয়ে দেখে ওদের মহিম। আপনজন বলে মনে হয় না। বহু দূরের মানুষ বলে মনে হয়। ওরা ভাল না খারাপ তা জানে না মহিম। জেনে হবেটাই বা কী? এ-ঘরে কখনও উঁকিও দেয় না তারা। একটা হ্যাগার্ড বুড়ো এক কোণে পড়ে থাকে, উকি মারার আছেটাই বা কী?
এই সন্ধেবেলা মেয়েটাকে ফটিকের পতিত জমিতে নেচে বেড়াতে দেখে প্রমাদ গুনল মহিম। সাপে কামড়ালে মরবে যে। এ সময়ে সাপ-খোপ বেরোয়।
কে রে? সোহাগ নাকি তুমি! অ্যাঁ।
কোনও জবাব নেই। নৃত্যের কোনও বিরতিও পড়ল না। যেন শুনতেই পায়নি। উপেক্ষা করছে কি?
শোনো সোহাগ, ওখানে সাপ-খোপ আছে, চলে এসো।
জবাব নেই।
কথা বলছ না কেন? আমি দাদু। ওখান থেকে চলে এসো। ও-জায়গাটা ভাল নয়। মেলা কাঁটাগাছ আছে, কাচের টুকরো আছে, ইট আছে। পড়ে যাবে যে!
মেয়েটা তেমনই বিভোর হয়ে হালকা পরির মতো ঘুরে ঘুরে নেচে বেড়াতে লাগল। মহিম শুনতে পেল, মেয়েটা গুন গুন করে কী যেন বলছেও। গান কি? না, গান নয়, অনেকটা স্তোত্রের মতো কিছু। ভাল শোনা যাচ্ছে না।
মহিম ব্যাপারটার অস্বাভাবিকতা হঠাৎ টের পেল। হয়তো মাথার গণ্ডগোল আছে বা আর কিছু। এভাবে মেয়েটাকে রেখে তো চলে যাওয়া যায় না। অন্ধকার ক্রমশ গাঢ় হচ্ছে। মেয়েটা নিজের বিপদ বুঝতে পারছে না। নিরস্ত্র, টর্চহীন মহিম রায় রাস্তা ছেড়ে ছোট শুখা নালাটা পার হয়ে জমিতে ঢুকল।
সোহাগ! সোহাগ! আমি দাদু। এই যে—বলতে বলতে এগিয়ে গিয়ে হঠাৎ খপ করে নৃত্যপর মেয়েটার একটা হাত চেপে ধরল সে। সঙ্গে সঙ্গে একটা অস্ফুট আর্তনাদ করে মেয়েটা আছড়ে পড়ে গেল মাটিতে। ঘটনার আকস্মিকতায় হকচকিয়ে গেল মহিম। এ আবার কী হল? মূর্ছা গেল নাকি?
হাঁটু গেড়ে পাশে বসে মেয়েটাকে একটু নাড়া দিয়ে সে ডাকছিল, সোহাগ! দিদিভাই! কী হয়েছে তোমার?
মেয়েটার গায়ে জবজব করছে ঘাম। গায়ের পোশাক ভিজে সপসপ করছে। শরীরে একটা কাঁপুনিও উঠে আসছে। হঠাৎ অস্ফুট বিড়বিড় করে স্তোত্রপাঠের মতো কী যেন বলে যেতে লাগল মেয়েটা। কিছু বোঝা গেল না।
কী করবে মহিম? ভয়ে তার শরীর হিম হয়ে গেল। এই তল্লাটে লোকজনের যাতায়াত নেই, বাড়িঘরগুলোও একটু দূরে দূরে। উলটোদিকে নির্জন আমবাগান। দৌড়ে গিয়ে তোকজন ডেকে আনা যায় বটে, কিন্তু ততক্ষণ এই নিরালায় মেয়েটা অরক্ষিত থাকবে। কাজটা ঠিক হবে না।
একা নিয়ে যেতে পারবে সে? ঊনআশি বছর বয়সের শরীরে কি আর সেই ক্ষমতা আছে? মেয়েটাও তেমন রোগাপটকা নয়। কিন্তু চেষ্টা তো করতেই হবে। কিছুতেই তো ফেলে যাওয়া যায় না।
দু হাতে পাঁজাকোলা করে যখন সোহাগকে তুলতে যাচ্ছিল মহিম তখনই হঠাৎ এক অলৌকিক ঘটনা ঘটল। অলৌকিক! সম্পূর্ণ অলৌকিক! যখন মেয়েটাকে প্রাণপণে তুলতে চেষ্টা করছে তখনই হঠাৎ তার নিজের ভিতরেই ঘটে গেল সেই অলৌকিক।
হঠাৎ যেমন জলভারনম্র মেঘ থেকে অঝোর বৃষ্টি নেমে আসে ঠিক তেমনই বুকের ভিতরে এক রক্তের কলরোল উঠল। সমস্ত শরীর ভেসে গেল মায়ায়। এ তো তারই প্রাণ থেকে প্রাণ পেয়ে জন্মানো মেয়ে, এ যে তারই রেতঃবাহী, শোণিতবাহী একজন! ওরা মানে না। জানে না বলে মানে না। না মানুক, আজ এই সন্ধ্যায় পরম্পরার এক সূত্রপথ উদঘাটিত করে দিল ওই অলৌকিক অনুভূতি। এ সোহাগ, এ তো সে নিজেই, মহিমাদীপ্ত রায়।
শরীর ভেঙে আসছিল মেয়েটাকে তুলতে। ঊনআশি বছরের শরীর তবু হার মানেনি। ধীরে ধীরে পাঁজাকোলে তুলে নিয়ে একটু টলোমলো পায়ে বন্ধুর জমিটা পা চেপে চেপে পার হয়ে মেটে পথে উঠে এল মহিম। হাঁফ ধরে যাচ্ছে, হাত ভেরে আসছে। পারবে কি?
পারত না। পথে উঠে সোহাগের এলানো শরীরটাকে একটু দাঁড় করাল সে, তারপর নিচু হয়ে ডান কাঁধে পাট-করা চাদরের মতো তুলে নিল সে। তাতে একটু সহজ হল ব্যাপারটা। কিন্তু তবু শরীর দিচ্ছে না। বহুকাল পর গায়ত্রী জপ করতে লাগল মহিম। আর কোনও মন্ত্র তো জানা নেই। গায়ত্রীতে কাজ হবে কি না জানা নেই। অন্তত কিছু একটা চলতে থাকুক ভিতরে। কুলি মজুররাও তো শক্ত কাজের সময় হেঁইও-হেঁইও করে। সেরকমই একটা কিছু ধরা যাক।
পথটুকু পার হতে ঘেমে গেল মহিম। বুকটা যেন ফেটে যেতে চাইছে। এই পরিশ্রম শরীর হয়তো সইবে না। হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোক হয়ে যেতে পারে। হলে হোক। সারা জীবন কার কোন উপকারে লেগেছে মহিম। আজ এই বাচ্চাটাকে উদ্ধার করে আনতে গিয়ে যদি মরতে হয় তো দুঃখের কিছু নেই।
সন্ধ্যার এক সাপ্লায়ার ছোকরা তার সাইকেলের হ্যান্ডেলে ক্যাম্বিসের ব্যাগে মাল বোঝাই করছিল। মহিম উঠোনে পা দিতেই সে চেঁচিয়ে উঠল, কী হয়েছে জ্যাঠামশাই? দাঁড়ান, দাঁড়ান, আমি ধরছি!
সাইকেল রেখে ছুটে এসেছিল ছেলেটা।
কিন্তু মহিম রায় বারণ করলেন, তুমি ছুঁয়ো না বাছা। এতদূর এনেছি, বাকিটুকুও পারব। তুমি বরং ওর মাকে ডেকে দাও।
নিজের ঘরে এনে বিছানায় সোহাগকে শুইয়ে দিল মহিম। তারপর চেয়ারে বসে কলকল করে ঘামতে আর কুকুরের মতো হাঁফাতে লাগল। হার্টফেল হওয়ারই কথা। তবু হচ্ছে না এখনও। শরীরটা যন্ত্রণায় অবশ।
খবর পেয়ে দৌড়ে এল মোনা। মোনালিসা না কী যেন নাম বউমার। অমল মোনা বলেই ডাকে।
ঘরে ঢুকেই মেয়ের দিকে চেয়ে স্তব্ধ হয়ে গেল মোনা। দুটো শ্বাস ফেলার সময়টুকু ফাঁক দিয়ে বলল, কী হয়েছে?
পরে শুনো। এখন ওর চোখেমুখে জল দাও। ওই ঘটিতে জল আছে।
মোনার মুখে কোনও উদ্বেগ দেখা দিল না। দেখা দিল চাপা রাগ। চোয়াল দুটো শক্ত হয়ে গেল, কপালে ভ্রূকুটি, ফর্সা মুখটায় লাল আভা। ঘটিটা তুলে নিয়ে তীব্র আক্রোশে কয়েকটা জলের ঝাপটা মেরে রাগে গনগনে গলায় বলতে লাগল, ইউ আর ডুয়িং দি ভুডু এগেইন, ইউ বিচ… ইউ বিচ… বিচ…
বুকটা শান্ত হচ্ছিল না মহিমের। মস্ত হাঁ করে শ্বাস নিচ্ছিল।
সন্ধ্যা ঘরে ঢুকে এসে তাড়াতাড়ি বাবাকে ধরল, কেমন লাগছে বাবা? ডাক্তার ডাকব?
মহিম মাথা নেড়ে বলল, না। ঠিক হয়ে যাবে।
সন্ধ্যা হঠাৎ এবার মোনার দিকে ফিরে বলল, ওভাবে জল ছিটোচ্ছ কেন মেজো বউদি? বিছানাটা যে ভিজে যাচ্ছে!
মোনা তীব্র বেগে ঘুরে দাঁড়িয়ে ধমকে উঠল, তা নিয়ে তোমাকে মাথা ঘামাতে হবে না। গেট আউট ফ্রম হিয়ার…
সন্ধ্যা ফুঁসে উঠে বলল, অত মেজাজ দেখাচ্ছ কেন? বিছানাটা ভিজে যাচ্ছে, তাই বলেছি। খারাপ কথা বলেছি কিছু?
মোনা তেমনই বিষাক্ত গলায় বলে, মেয়েটার চেয়ে বিছানাটা বেশি হল? ক্রাঙ্ক হেড কোথাকার?
সন্ধ্যা ছাড়বার পাত্রী নয়, সমানে গলা তুলে বলল, বাঃ বেশ তো! আমার বুড়ো বাবা তোমার ন্যাকা মেয়েকে ঘাড়ে করে বয়ে নিয়ে এল, আর এখন একেবারে দরদ উথলে উঠছে! একটু আগে তো মেয়েকেই গালাগাল করছিলে।
বেশ করেছি। তুমি তোমার কাজে যাও।
আমি কোথায় যাব সেটা আমি বুঝব। এটা আমার বাবার ঘর। আমাকে যদি সইতে না পার তাহলে তুমি নিজের ঘরে যাও। আমাকে যেতে বলার তুমি কে?
ঝগড়া থামানোর জন্য যে দুজনের মাঝখানে পড়ে সামাল দেবে সেই শক্তিও নেই মহিমের। অসহায়ভাবে সে দেখছিল, যেন দুটো বনবেড়াল কথা দিয়ে আঁচড়াআঁচড়ি কামড়াকামড়ি করছে। সে একবার হাতটা তুলল। দুর্বল হাতটা পড়ে গেল ধপাস করে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন