শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
মানুষ যে কথা কয় সেটা দুনিয়ার এক অত্যাশ্চর্য জিনিস। মনের মধ্যে ভাবের যেসব গ্যাঁজলা ওঠে সেগুলো এই যে দিব্যি ভাষায় ভেসে ওঠে, ভাবলে ভারী অবাক লাগে। কথা জিনিসটা যে কে আবিষ্কার করেছিল কে জানে! ভারী ভাল জিনিস! ধীরেন লক্ষ করেছে, চারপাশে যেসব কথা-টথা হয় সেগুলোর বেশির ভাগই আগড়ম বাগড়ম। তবে তার মধ্যে হঠাৎ হঠাৎ দু-চারটে কথা যেন খচ করে মনের মধ্যে গেঁথে যায়।
ধীরেন কথা শুনতে ভালবাসে। দোকানপাটে, রাস্তায় ঘাটে, চেনা অচেনা লোকের কথা মনে দিয়ে শোনে সে। বেশির ভাগই ফেলে দিতে হয়, দুটো চারটে থাকে, ভদ্রলোক হোক বা ছোটলোক, লেখাপড়া জানা হোক বা মুখ্যু-সুখ্যুই হোক এক একজন এমন মোক্ষম কথা বলে বসে যে আক্কেল গুড়ুম হয়ে যায়। ইরেব্বাস! কথা তো নয়, যেন কুড়ুল।
তার ঘোরাফেরার চৌহদ্দি এই গাঁয়ের মধ্যেই। এক মুঠো তো জায়গা। আর লোকজনই বা কী এমন! ঘুরেফিরে সেই যোদো-মোধো-রেমো। তবু এইটুকু চৌহদ্দির মধ্যেই নিত্যনতুন কথা ফুট কাটছে। ভাবে, একখানা খাতা কিনে কথাগুলো লিখে রাখলে হয়। ভাবাই অবশ্য সার, হয়ে ওঠে না।
এই সেদিন বিকেলের দিকটায় গিয়ে পড়েছিল মহিম রায়ের বাড়ি। মহিমদের বাড়ি সেদিন ভারী সুনান। জনমনিষ্যি নেই। শুধু কুকুরটা কুণ্ডলী পাকিয়ে শুয়ে আছে আর ইজিচেয়ারে আধশোয়া হয়ে একখানা বই পড়ছে অমল। ধীরেনকে দেখে কেউ খুশি হয় না এটা ধীরেন জানে। কিন্তু কী আশ্চর্য— সে যখন মহিমার এই বিদ্বান ছেলেটিকে দেখে সসংকোচে ফিরে আসবে বলে মুখ ঘুরিয়েছে তখন অমল ভারী খাতির করে বলল, আরে ধীরেনকাকা না! বসুন।
বসার জন্য চেয়ার বা মোড়া কিছু ছিল না ধারে কাছে। তাই ইতিউতি চেয়ে ধীরেন যখন দাওয়ার এক ধারে বসতে যাচ্ছিল তখন অমল বলল, করেন কী! দাঁড়ান চেয়ার এনে দিচ্ছি।
বিদ্বান মানুষ অমল, তার বাবার ঘর থেকে চেয়ার এনে বসতে দিল তাকে। বড় সংকোচ হচ্ছিল।
বই পড়ছিলে বাবা, এসে রসভঙ্গ করলুম।
অমল মুখটা তেতো করে বলে, দুর! বই পড়ে কি সময় কাটে! লেখাপড়া করে লোকে মুখ্যুই হয়।
বলে কী ছোকরা! কথাটা ভারী অদ্ভুত শোনাল।
বেশ বাবা, ওকথা বলছ কেন? লেখাপড়া তো ভাল জিনিস!
না কাকা, লেখাপড়া হল ধার করা জিনিস। অন্যের চিন্তাভাবনার জঞ্জাল টেনে এনে নিজের মাথায় বোঝাই করা। লেখাপড়া করে তো দেখলাম, ওতে কিছু হয় না!
এ কথাটা ভারী নতুন শোনাল ধীরেনের কানে। লেখাপড়ার মেলা গুণগানই তো করে লোকে। তা হলে লেখাপড়া জানা এ ছেলেটা উলটো কথা কয় কেন?
ধীরেন ভারী আগ্রহী হয়ে জিজ্ঞেস করে, লেখাপড়া করে কী হয় না বাবা?
অমল একটা আলস্যের আড়মোড়া ভেঙে বলে, মানুষ তো কত কী জানল বুঝল, কত কেরাদানিই দেখাল, কিন্তু শেষ অবধি নিজের মনের কাছে জব্দ হয়ে রইল। আপনি ভগবান মানেন কাকা?
এ কথায় একটু ফাঁপরে পড়ে গেল ধীরেন। আমতা আমতা করে বলল, তা মানি বইকী বাবা, একটু আধটু মানি। তবে তেমন মাথা ঘামাই না।
ভগবান কাকে বলে জানেন কাকা?
ধীরেন আবার ডুবজলে। এসব কঠিন প্রশ্নের জবাব কি তার জানা থাকার কথা?
অমল অবশ্য তার জবাবের জন্য অপেক্ষা করল না, বলল, মনই হচ্ছে ভগবান। ওইমনই ভগবান-টগবান বানায়, আবার মনই ভগবানকে নাকচ করে দেয়। মনের মতো বন্ধু হয় না, আবার অমন শত্ৰু কেউ নেই।
বাঃ, এ যে বেশ কাজের কথা হচ্ছে! ধীরেন ভারী আপ্লুত হয়ে নড়েচড়ে বসল, একেই তো এই মহা বিদ্বান মানুষটি তার সঙ্গে যেচে কথা কইছে বলে সে বর্তে যাচ্ছে। তার ওপর কথাগুলো কইছেও ভারী ভাল। টুকে রাখার মতোই কথা সব।
ধীরেন হেঁ হেঁ করে হেসে বলে, বড্ড ভাল বলেছ বাবা।
ভাল-মন্দ যে ধীরেন বোঝে এমন নয়। তবে সে কথা শুনতে ভালবাসে। যেসব কথা শুনতে ভাল সেগুলোই তার কাছে ভাল কথা।
অমলকে আজ কথায় পেয়েছে। ধীরেন কাষ্ঠ যে একটা মনিষ্যির মতো মনিষ্যিই নয় সে কথা ভুলে গিয়ে কথা কয়ে যাচ্ছে। লক্ষণটা চেনে ধীরেন এক এক সময়ে মানুষ মনের ভার নামাতে দেয়ালের সঙ্গেও কথা কয়। তা ধীরেন দেয়াল ছাড়া আর কী!
বুঝলেন কাকা, একটা লোককে চিনতুম। ইউনিভার্সিটির ভাইস চ্যানসেলর ছিলেন, একগাদা সরকারি কমিশনের চেয়ারম্যান বা মেম্বার ছিলেন, নামের পাশে বিরাট বিলিতি ডিগ্রি। সাউথ ক্যালকাটায় বিরাট বাড়ি, অগাধ টাকা কিছুর অভাব নেই। দেখে মনে হত দুনিয়াটা যেন ওঁর পকেটে। শেষে কী হল জানেন?
ধীরেন বাঁয়া কোলে করে বসে আছে। প্রতিধ্বনি করল, কী হল?
বুড়ো বয়সে তাকে যখন দেখলুম বউ মারা গেছে, ছেলে বিদেশে, চাকরি থেকে রিটায়ার করে লোকটা একরকম নিষ্কর্মা। কিছু লেকচারে ডাকাডাকি হয়, কিছু মিটিং-টিটিং থাকে বটে, কিন্তু বড্ড ফাঁকা হয়ে গেছে মানুষটা। একদিন আমাকে বাড়িতে ডেকে নিয়ে গিয়ে বললেন, আচ্ছা তুমি ভূতের গল্প জানো? বলো তো একটা শুনি। আমার আজকাল বড় ভূতের গল্প শোনার ইচ্ছে হয়।
ভূতের গল্প?
তাই তো বলছি কাকা। এত লেখাপড়া জানা মানুষ, কিন্তু নিজের একা বোকা ভাবটা কাটাতে পারছেন না। শরীরটা আছে, কিন্তু মনটা অথর্ব হয়ে পড়েছে। ভূতের গল্প শুনে ভারী খুশি, আমাকে আর ছাড়তেই চান না। শেষে আমাকে বললেন, ওহে, এত বড় বাড়িটা বড্ড হাঁ হাঁ করে। আমার তো জন নেই। একটা ভাল ফ্যামিলিতে পেয়িংগেস্ট হিসেবে যদি থাকতে চাই ব্যবস্থা করতে পারবে? আর কিছু না হোক, পাঁচ জনের মধ্যে তো থাকা যাবে।
বলো কী?
তাই তো বলছি কাকা, ওসব বইপড়া বিদ্যে দিয়ে জীবনে সত্যিকারের কিছু হয় না। সেই বিরাট মানুষটা শেষ অবধি এক বন্ধুর বাড়িতে গিয়ে জুটলেন। সেখানেই মারা যান। ঘটনাটা আমাকে জোর একটা ধাক্কা দিয়েছিল৷
তা তো দেবেই।
সেই থেকেই আমার বড় ভাবনা হয়। মানুষ এত শেখে, এত তড়পায়। এত কাজকর্ম করে। কিন্তু শেষ অবধি তাকে তার মনের ভূত ভয় দেখাতে থাকে। মনই তাকে খায়। মনের সঙ্গে আজও পেরে উঠল না মানুষ।
মনের ভূত ধীরেনকেও কি কম খেয়েছে। আজও সেই ভরা বর্ষার ছাইরঙা সকালটার দৃশ্য পট করে চোখের সামনে বায়স্কোপের মতো ভেসে ওঠে। ডবকা সেই যুবতীর শবদেহ কাঁধে নিয়ে এক বুক জল ভেঙে পিছল উঠোন পেরোচ্ছে, গলায় তারের ফাঁস। ফাঁসের প্রান্ত মিদ্দারের হাতে ধরা। এক চুল এদিক ওদিক হলেই তারের ফাঁস গলা কেটে বসে যাবে। উরে বাবা, সে কী একটা সময় যাচ্ছিল তখন!
মিদ্দার তার গুরুই ছিল একরকম। নিরীহ, ঝঞ্ঝাটহীন গুণী এক মানুষ নিজের কাজে মজে থাকত। তাঁতির যেমন এঁড়ে গোরু, মিদ্দারের পোয়ের তেমনি কাল হল যুবতী বউ। আর তা থেকে কত কী পাকিয়ে উঠল। সাদামাটা সম্পর্ক ছড়িয়ে গেল জটিল কুটিল নানা খানাখন্দে।
মিদ্দারকে মেরে ফেলেছিল বটে, কিন্তু সে তো ইচ্ছে করে নয়! না মারলে মরতে হত। গৌরদা তাকে বুঝিয়েছিল, ওতে পাপ নেই, আত্মরক্ষার জন্য নরহত্যা করলে পেনাল কোডে সাজাও হয় না। তবু মন কি মানে! কৃতকর্মের জন্য আজও বুক টনটন করে বড়। একা হলেই যেন মিদ্দারের ভূত কাছেপিঠে চলে আসে। ভয় করে, বড্ড ভয় করে।
তখন, সেই খুনের ঘটনার পর তার ঘুম, খিদে সব ছুট হয়ে দিয়েছিল। সারাদিন পাগল পাগল অবস্থা। এই হাসে, এই কাঁদে। আর তখন চারদিকে যেন ভুতুড়ে এক জাল তাকে ঘিরে থাকত। রাতবিরেতে মিদ্দার এসে হানা দিত। দেখা যেত না, কথাও কইত না, কিন্তু তাকে খুব টের পেত ধীরেন।
অমন নিরীহ, ভাল মানুষটা কী থেকে কী হয়ে গিয়েছিল!
মনের ভূতে খায় বইকী বাবা, খুব খায়। মনের ভূতই তো খাচ্ছে আমাদের।
অমল একটু কেতরে হেলে পড়ে আছে ইজিচেয়ারে। কথা কইল না। চোখ চাওয়া, কিন্তু সে চোখের দৃষ্টি কোথায় চলে গেছে কে জানে!
ধীরেন দু-একবার গলা খাঁকারি দিল। বুঝল অমল আর বাইরের জগৎটায় নেই। নিজের ভিতরে ঢুকে অন্ধি-সন্ধি খুঁজে বেড়াচ্ছে কিছু। ধীরেন এসব বুঝতে পারে।
গৌরদার ছোট মেয়ে পারুলের সঙ্গে ভাব ভালবাসা ছিল ছেলেটার। সেই বৃত্তান্ত সবাই জানে। তা বিশ-বাইশ বছরের পুরনো কথা। তখন সারা গাঁয়ে বেশ মুখরোচক প্রসঙ্গ ছিল সেটা। তবে নিন্দেমেন্দ হয়নি তেমন। কারণ ছেলেটি ছিল রত্ন, আর মেয়েটিও ছিল ডাকের সুন্দরী। তার ওপর গৌরহরি ছিলেন গাঁয়ের মাথা, মহিম রায়ও পণ্ডিত মানুষ। সবাই ধরে নিয়েছিল বিয়েটা হবেই।
সেই বিয়ে যে ফসকাতে পারে সেটাই অষ্টম আশ্চর্য! এমন হওয়ার কথাই নয়। গৌরহরিকে ব্যাপারটা নিয়ে একবার জিজ্ঞেস করেছিল ধীরেন।
দাদা, পারুলের বিয়েটা অন্য জায়গায় দিচ্ছেন যে!
বিয়ে জিনিসটাই যে ওইরকম রে, কার যে কার সঙ্গে ঘাট বাঁধা তা কে বলবে!
তা অবিশ্যি ঠিক। তা পারুল কান্নাকাটি করছে না?
আরে সে কাঁদবে কী! তার ইচ্ছেতেই তো হচ্ছে।
ধীরেন প্রেম ভালবাসার রহস্য যে খুব ভাল বোঝে তা নয়। শুধু বোঝে, ওসব বিয়ে পর্যন্ত গড়ায়, তারপর থমকে যায়। তার নিজের জীবনে তাও হয়নি। বিয়ের রাত থেকেই ফোঁসফোঁস শুরু করেছিল। কাজেই ভাব ভালবাসা নিয়ে তার উচ্চবাচ্য করার কিছু নেই।
কিন্তু পারুল নিজের ইচ্ছেয় অন্য জায়গায় বিয়ে বসছে এটা যেন তার কাছে একটু কেমনধারা মনে হয়েছিল। এরকম তো হওয়ার কথা নয়।
তা পারুলের বিয়ে বেশ ঘটা করেই হল। গাঁ দেশে এমন বিয়ে দেখা ভাগ্যের কথা। গৌরদা টাকাও ঢেলেছিলেন জলের মতো। সেই বিয়েতে বারো পিস মাছ খেয়েছিল ধীরেন, খুব মনে আছে। না, পারুলের হাসি হাসি মুখখানায় কোনও দুঃখের চিহ্ন খুঁজে পায়নি ধীরেন। হাত বাড়িয়ে ধীরেনের হাত থেকে যখন খবরের কাগজে মোড়া শস্তার তাঁতের শাড়িটা উপহার নিচ্ছিল তখনও পারুলের মুখখানা ভাল করে দেখেছিল ধীরেন। বেশ ঢলঢলে মুখ, তাতে হাসির মিশেল, বিরহের ভাব-টাব নেই।
বছর না ঘুরতেই অমলের বিয়ে। তা তাতেও ধীরেন হাজির ছিল। বরযাত্রী যেতে বলেনি বটে, কিন্তু বউভাতে গাঁ ঝেঁটিয়ে নেমন্তন্ন খেয়েছিল লোকে। অমলকে তখন বেশ ভাল করেই দেখেছিল ধীরেন। গরদের পাঞ্জাবি আর ধাক্কাপাড়ের ধুতি পরে অতিথিদের দেখভাল করছিল। মুখে হাসি ছিল, কিন্তু খুশিটা ছিল না যেন। খুশিটা আজও নেই।
অঙ্কটা মেলেনি ধীরেনের। মেয়ে জাতটাই নিমকহারাম বললে এক রকমের মেলে, কিন্তু কথাটা সত্যি হয় না। কোথাও একটা খিচ থেকে যায়।
ধীরেন দেখল, ইজিচেয়ারে কেতরে শুয়ে অমল ঘুমিয়ে পড়েছে, কোলে উপুড় করা বই, রাজ্যের মশা ঝাঁক বেঁধে উড়ছে মাথার ওপরে। ধীরেন চোরের মতো উঠে নিঃশব্দে বেরিয়ে পড়ল। ছোকরা সেই প্রেমের ফেরেই আজও পড়ে আছে কি না কে জানে! বইয়ে কেতাবে ওরকম হয়-টয় বটে, কিন্তু ধীরেনের দুনিয়ায় ওসব এতকাল টিকে থাকতে দেখেনি কিনা। প্রেম একটা ফুসমন্তর বই তো নয়, হুস বলতেই উড়ে যায়। ফঙ্গবেনে জিনিস। খিদে তেষ্টা বাহ্যে পেচ্ছাপের মতোও স্থায়ী জিনিস নয়। একটা জীবনে প্রেম অনেকবার পাশ ফেরে।
দিনের আলো মরে এলে অসুবিধেটা বাড়ে। চোখে এমন ঝাপসা একটা ভাব হয় যে, চলাফেরায় আজকাল মুশকিল হচ্ছে। চোখ কাটানোর পাকা তারিখ এখনও পাওয়া যায়নি। সামনের মাসে হতে পারে বলে খবর একটা পাওয়া গেছে। পরের দয়া, জোর তো নেই। তবু এই দয়াধর্ম, সেবা-টেবা পতিতোদ্ধারে বড় মানুষরা যে একটু আধটু কাজকর্ম করে তাতেই বাঁচোয়া।
সন্ধেবেলাতেই কেন যে মশারা এমন রক্তপাগল হয়ে ওঠে কে জানে বাবা! এটাই কি ওদের ডিনারটাইম? রাতে উৎপাত অনেক কমে যায়। কিন্তু সন্ধেবেলায় ওদের ণত্ব-ষত্ব জ্ঞান থাকে না, তখন প্রাণ তুচ্ছ করে ঝাঁপিয়ে পড়ে।
বউদি ডাকছে, ওঠো! মশায় যে ছেঁকে ধরেছে একেবারে। ঘরে গিয়ে বোসো, ধোঁয়া দিয়ে এসেছি।
অমল একটু হাসল, ওদের জীবনও তো নিষ্কণ্টক নয় ঠাকরোন।
কে? কাদের কথা বলছ?
মশাদের কথা। প্রাণ হাতে করেই তো খায়।
আহা, মশাদের জন্য যে দরদ উথলে উঠছে দেখছি! গান্ধীবাবা হলে নাকি?
আচ্ছা, আজ বাড়িটা এত ফাঁকা কেন বলো তো! কোথায় গেল সবাই। তুমিও তো বাড়ি ছিলে না!
আমি গিয়েছিলুম একটু শীতলাবাড়িতে। বিষ্ণুর মায়ের দয়া হয়েছিল সেই কবে। পুজোটা আর দেওয়া হয়নি এতদিন। দিয়ে এলুম।
বেশ করেছ। জলবসন্তের চিকিৎসা নেই, তা জানো? পুজো দিলেও একুশ দিনে সারে, না দিলেও তাই।
আচ্ছা, আর নাস্তিকপানা করতে হবে না। ঘরে যাও, চা আনছি।
তুমিই সবসময়ে চা দাও, খাবার দাও। কেন বলো তো? আর সবাই কোথায় থাকে?
কেন গো, বউয়ের হাতে ছাড়া চা খাবার পছন্দ নয় বুঝি!
আহা, তা নয়। এটা একটা জয়েন্ট ফ্যামিলি, সকলেরই তো কিছু না কিছু করা উচিত।
বউদি একটা শ্বাস ফেলে বলে, কী করব বলো! আমি তো বাড়ির বড়বউ। বড়বউ হলে দায়িত্বও যে বড়।
ওটা কথা নয় ঠাকরোন, তোমাকে আমি সারাদিন কাজ করতেই দেখি, একজন এত পরিশ্রম করবে কেন?
একটু হেসে বউদি বলে, আমি খাটিয়ে পিটিয়ে মেয়ে হিসেবেই তৈরি হয়েছি যে! বিবিয়ানি করার জন্যে তো নয়। পেটে বিদ্যে বা অন্য গুণ না থাকলে যে গতর দিয়ে পুষিয়ে দিতেই হয় ভাই। মেয়ে হয়ে না জন্মালে বুঝবে না।
তা নয় ঠাকরোন। লজিকটা ভুলে ভরা। তুমি যদি দশভুজা হয়ে সব কাজে ঝাঁপিয়ে না-পড়ার অভ্যাস করো, তা হলে দেখবে সবাই যে যার নিজের কাজ করে নিতে শুরু করবে। তুমি করো বলেই অন্যেরা গা বাঁচিয়ে চলে।
সে গুড়ে বালি। উঠোনের কোণে যদি ঘটিটা পড়ে থাকে, বাড়ির সবাই ওর আশপাশ দিয়ে শতেকবার হেঁটে যাবে, কেউ তুলে রাখবে না। আমি না তুললে বাইরের লোক এসে নিয়ে চলে যাবে।
অভ্যাস তুমিই খারাপ করেছ।
দাসী হয়ে জন্মেছি যে ভাই, দাসত্ব না করে উপায় আছে? তবে সবাইকে দোষ দিয়ে লাভ নেই।
মোনাও তো কিছু করতে পারে।
সে দুদিনের জন্য বেড়াতে এসেছে, তাকে কেন ঘানিগাছে জুড়তে যাব বলো! তা ছাড়া সব সংসারেরই কাজকর্মের আলাদা রকম ধাঁচ থাকে। সে অত বুঝবে না। ছোঁয়াছুঁয়ি, পয়পরিষ্কার ওসব কি ওর অভ্যাস আছে, বলো! আর সন্ধ্যাকে তো দেখছ, বেচারা দিনরাত ব্যবসার পেছনে খেটে মুখে রক্ত তুলছে। তাই ওকে আমি সংসারে জড়াই না, দুঃখী মেয়ে তো!
ব্যস, সব জল করে বুঝিয়ে দিলে! এগুলো কোনও যুক্তি নয় ঠাকরোন, এসব হল অজুহাত।
বেশ, না হয় তাই হল। কিন্তু এই বাঘা শীতে তুমি খোলা উঠোনটার মধ্যে বসে আছ কী করে বলো তো! তোমার বউ বাড়ি থাকলে বকুনি দিত।
অমল ম্লান হেসে বলে, তা হলে তো বর্তে যেতুম। সে আমাকে ততটা লক্ষ করে না ঠাকরোন।
আর বউয়ের নিন্দে করতে হবে না। ঘরে গিয়ে ঢাকাচাপা দিয়ে বোসো। ঘরের জানালা দরজা হুট করে খুলো না, এ সময়ে মশা ঢোকে।
মোনা কোথায় গেছে? এখানে তো তার যাওয়ার জায়গা নেই! কারও সঙ্গে মেশেও তো না।
রতনের সঙ্গে মোটরবাইকে চেপে বর্ধমানে গেছে।
মোটরবাইকে! রতনের সঙ্গে!
অত অবাক হওয়ার কী আছে?
এ তো জলে ভাসে শিলা! রতনের সঙ্গে তার ভাব হল কবে?
বউদি মুখ টিপে হেসে বলে, থাকতে থাকতে হয়েছে। ভাব না হওয়ার কথা নাকি!
কিছু বললেই তো বলবে বউয়ের নিন্দে করছি। আমার মুখে মোনার নিন্দে তো তুমি মোটেই পছন্দ করো না।
তাই কী হয় ভাই? গাঁয়ের মেয়েরা তো নিন্দে দিয়ে মেখেই ভাত খায়, জানো না? নিন্দেমন্দ হল আমাদের থিয়েটার বায়স্কোপের মতো। তবে কি না তুমি তো আর পাঁচটা মানুষের মতো নও। তুমি ওসব হ্যাতান্যাতা জিনিস নিয়ে মাথা ঘামাবে কেন?
একটু হেসে অমল বলে, আমি কিন্তু আমার নিজেরও নিন্দে করি।
খুব খারাপ করো। ওরকম করা ভাল নয়।
তোমরা যেরকম ভাবো আমাকে, সেরকম আর হতে পারলাম কই?
অনেক হয়েছ ঠাকুরপো, অনেক হয়েছ। কটা লোক তোমার মতো হয়েছে বলো তো!
গাছে তুলো না, ঠাকরোন, গাছে তুলো না। একগাদা লেখাপড়া করে লম্বা মাইনের চাকরি করছি— এই তো! এটা কিন্তু অনেক হওয়া নয়।
আমাকে আর বোঝাতে হবে না। এখন কি তোমার চশমা পরে নিয়ে তোমাকে বিচার করতে হবে নাকি? আমারও তো একটা বিচার আছে!
বরাবর তুমি আমাকে একটু অন্য চোখে দেখ, আমি জানি। দেখাটা কিন্তু ভুলও হতে পারে।
সেটা আমি বুঝব। অনেক ঠান্ডা লাগিয়েছ কিন্তু, এর পর জ্বরজারি বাধিয়ে বসবে। ঘরে যাও। এসে দেখি, অকাতরে ঠান্ডার মধ্যে পড়ে পড়ে ঘুমোচ্ছ, মশা ছেঁকে ধরেছে। এমন মায়া হল। যেন কেউ নেই তোমার।
কেউ নেই-ই তো!
ফের ওসব কথা?
অমল হাসল। বলল, ফাঁকা বাড়িতে চুপচাপ একা বসেছিলাম। বসে বসে ঢুলুনি পেয়ে গেল।
হ্যাঁ, আজ তোমাকে একটু ফাঁকাতেই থাকতে হয়েছে বটে। সন্ধ্যা গেছে আদায় উশুল করতে। বাবা আজ বড়শুলে গেছেন নিমাইকাকার বাড়ি। রাতে হয়তো ফিরবেন না। সোহাগ দুপুরে খেয়েই বেরিয়েছে পান্নার বাড়ি যাবে বলে। দুজনের তো কথার শেষ নেই। আর তোমার দাদাকে তো জানোই। ঘরের খেয়ে কোন বনের মোষ তাড়াতে বেরিয়েছেন কে জানে!
অমল উঠতে উঠতে বলল, তোমার বাজারহাট বা দোকানপাটের জিনিস লাগবে কি না দেখো তো। লাগলে বোলো, একটা পাক দিয়ে গিয়ে নিয়ে আসবখন।
তোমাকে আর কাজ দেখাতে হবে না। ঘরে গিয়ে লেপচাপা দিয়ে বসে থাকো। যা ঠান্ডা পড়েছে আজ!
এই ঠান্ডায় তুমিও আর বসে থাকবে না।
বউদি হিহি করে হেসে বলল, মেয়েমানুষের দুঃখু অত দেখতে নেই গো পুরুষমানুষের। ওতে যে পাপ হয়।
কেন, পাপ হয় কেন?
হবে না? মেয়েমানুষের দুঃখ বুঝলে পুরুষমানুষের পুরুষত্ব থাকে নাকি?
ঠাট্টা করছ?
না গো, সত্যি কথাই বললুম। ভেবে দেখলেই বুঝবে।
তুমি একটু নারীবাদী আছ কিন্তু ঠাকরোন!
আমি নারীবাদী হলে এ-বাড়ির কারও আর খাওয়াপরা জুটত না, বুঝলে!
নারীবাদীদের দোষ কী জান?
কী?
তারা খোঁটা দেবে, আবার সেবা-টেবাও করবে। দুরকম চলে না ঠাকরোন। একরকম হও।
উরেব্বাস! তা হলে তো সংসার ভেসে যাবে গো।
ওইজন্যই তোমরা ঠিকঠাক নারীবাদী হতে পারলে না।
অমল ধীর পদক্ষেপে দোতলায় উঠল। তারপর নিজের ঘরটিতে এসে দরজা ভেজিয়ে দিয়ে হাঁটু অবধি লেপটা টেনে আধশোয়া হল। জানালা দরজা বন্ধ থাকায় ঘরটা বেশ গরম। যেন রুম হিটার চলছে।
কিছুক্ষণ পর দরজায় টক টক শব্দ হল।
এসো ঠাকরোন, তোমাকে আর ভদ্রতা করে নক করতে হবে না।
বউদি একগাল হেসে ঘরে ঢুকে বলল, ছোটদের কাছেও কত কী শেখার আছে আমাদের।
কে আবার তোমাকে কী শেখাল?
এই যে দরজায় টোকা দিয়ে ঘরে ঢোকা এটা আমাকে সোহাগ শিখিয়েছে। বলেছে, এটা অভ্যাস করে নিলে কোথাও অপ্রস্তুত হতে হবে না।
তা বিলিতি কায়দা রপ্ত করছ?
তা বাপু, শিক্ষাটা খারাপ নয় কিন্তু। আজকাল তোমার দাদা ঘরে থাকলেও আমি দরজায় টোকা দিয়ে ঘরে ঢুকি। প্রথম প্রথম কায়দা দেখে হাসত। আজকাল দেখি নিজেও তাই করছে।
হাঃ হাঃ করে হাসল অমল, এইসব হচ্ছে তা হলে আজকাল?
তাই ভাই, ভাল জিনিসকে ভাল বলতেই হয়।
হাতে চায়ের কাপ ধরিয়ে দিয়ে বউদি চেয়ার বসে বলল, সাঁজাল দিতে একটু দেরি হল, নইলে আরও আগে তোমাকে চা দিতে পারতাম।
সন্ধের পর চা খাওয়া তো ভুলেই গেছি। প্রায়ই পার্টি বা বন্ধু বা কলিগের বাড়িতে নেমন্তন্ন থাকে। সেখানে তো আর চা দেয় না।
জানি বাপু, জানি৷ মদ খাও তো!
হ্যাঁ ঠাকরোন।
তাই মাঝে মাঝে মদের গন্ধ পাই। এখানেও তো খাও, তাই না?
খাই ঠাকরোন। বাজে অভ্যাস।
তা বাপু, তোমার দাদাও কখনও-সখনও খায়। আমি তার জন্য বকাঝকা করি না। শুধু চোখ পাকিয়ে তাকাই।
তাতেই ঠান্ডা হয়ে যায় দাদা?
হয় ভাই। জানে তো, বউ ছাড়া গতি নেই। বউ বিগড়োলে তার দুনিয়া অন্ধকার।
বেশ আছ তোমরা।
সে তো আছি। কিন্তু তুমি বেশ নেই কেন? তোমার বউটা খারাপ নয়, মেয়েটা ভাল, ছেলেটা ভাল, তবে তোমাদের পট খায় না কেন বলো তো!
ঠিক বুঝতে পারি না ঠাকরোন।
ভাল করে ভাবো তো একটু। তোমার মতো এমন ভাল একজন মানুষের সংসারে অশান্তি থাকার কথা নয়।
ভালমানুষ কথাটা শুনেই কেমন যেন বিকল হয়ে গেল অমলের মনটা। চায়ে চুমুক দিয়ে তেতো মুখ করে বলল, ঠাকরোন, আমার মধ্যে যেটুকু ভাল বলে তোমার মনে হয় তা হল মেধা। আমি ছাত্র ভাল ছিলাম, ঠিক কথা। কিন্তু মেধা আর চরিত্র এক নয়।
এখন নিজের চরিত্র নিয়ে কথা তুলবে নাকি?
নিজের চরিত্র সম্পর্কে যে আমার কোনও বিশ্বাস নেই। যখন ছোট ছিলাম তখন বেশ ভালমানুষ ছিলাম। দুষ্টুমি নষ্টামি করতাম না, মিথ্যে কথা বলতাম না, মা বাবার বাধ্য ছেলে ছিলাম। কিন্তু সমস্যা কখন দেখা দিল জানো?
কখন?
যখন ক্লাসে ফার্স্ট হতে শুরু করলাম। অনেক নম্বর পেতাম, মাস্টারমশাইরা প্রকাশ্যে প্রশংসা শুরু করলেন, পাঁচজন ধন্য ধন্য করতে লাগল, তখনই একদিন অহংকার চলে এল। খুব সূক্ষ্ম ব্যাপার, বুঝলে? বাইরের লোক ততটা টের পেত না। কিন্তু মনে মনে আমি ক্লাসমেটদের তুচ্ছতাচ্ছিল্য বা করুণা করতে শুরু করি। কোনও মাস্টারমশাই কখনও কিছু ভুল করলে মনে মনে অনুকম্পা বোধ করতাম, অশ্রদ্ধার ভাব আসত। আমার বাবা যে ইংরিজিতে এম এ পাশ তা জানো?
জানব না কেন?
আমি বাবাকেও তুচ্ছতাচ্ছিল্য করতে শুরু করি। বঙ্কিমচন্দ্র বলেছিলেন, যত বড় মূর্খ ছেলে তত বড় লেকচার। আমারও ঠিক তাই হয়েছিল। বাবা, মা, দাদা এদের কাউকে তেমন পাত্তা না দেওয়ার মনোভাব এসে গেল।
তাতে কী? ওরকম তো হতেই পারে। এখন তো আর তুমি অহংকারী নও!
অনেক ঠেকে শিখতে হয়েছে যে, অহংকার করার মতো আমার কিছুই নেই। অধীত বিদ্যা আমাকে জীবনে শান্তি বা স্বস্তি কিছুই দেয়নি। এমন কী যৌবন বয়সে আমার পদস্খলনও ঠেকাতে পারেনি। আমি কীসের ভাল ছেলে ঠাকরোন?
দেখ কাণ্ড! নিজের নিন্দে শুরু করে দিলে যে!
সব তো জানো না ঠাকরোন। জানলে আমাকে ঘেন্না করতে।
কী জানি না বলো তো?
সেটা তো তোমাকে বলা যায় না। আমার অধঃপতন যে কবে, কীভাবে শুরু হয়েছিল তা আমিই শুধু জানি।
আচ্ছা ভাই, যে নিজের সম্পর্কে এ কথা বলতে পারে তাকে কি খারাপ বলা যায়?
অমল হাসল, তোমার চোখে খারাপ না হলেই কি আর আমি ভাল?
অত মনস্তাপের দরকার নেই। আমি সব জানি। জেনেও বলছি, তুমি মোটেই খারাপ নও।
একটু অবাক হয়ে অমল বলে, জানো?
হ্যাঁ জানি। কিন্তু তোমাকে বলি বাপু, সব কথা কি সকলের কাছে বলতে হয়? পাত্রভেদ নেই? কাক তো এঁটো ছড়ায়।
তুমি কী জানো ঠাকরোন?
সব জানি। পারুলের সঙ্গে তোমার শরীরের সম্পর্ক হয়েছিল। অবাক হয়ো না। অবাক হওয়ার কিছু নেই।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন